Golpo romantic golpo জাহানারা

জাহানারা পর্ব ৯৭(প্রথমাংশ)


#জাহানারা

#জান্নাত_মুন

পর্ব :৯৭(প্রথমাংশ)

🚫ক’পি করা নিষিদ্ধ

🔞 সতর্কবার্তা:

এই গল্পে অ’কথ্য ভাষা এবং স”হিং’সতার উপাদান রয়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সী বা সং’বে’দনশীল পাঠকদের জন্য উপযুক্ত নয়। পাঠক নিজ দায়িত্বে পড়বেন।

বিখ্যাত ইংরেজ কবি জিওফ্রে চসারের সেই অমোঘ বাণী আজ বড় বেশি সত্যি মনে হয়—”সময় ও স্রোত কারও জন্য অপেক্ষা করে না”। দেখতে দেখতে মহাকালের অবিনশ্বর নিয়মে বর্ষপঞ্জির পাতা থেকে মুছে গেছে আরও পাঁচটি বছর, অথচ মনে হয় এই তো সেদিনের কথা।

সময়টা এখন নভেম্বরের দুই তারিখ, কাশ্মীরে এখন হালকা শীতের অলস ছোঁয়া। চর্তুদিকে চেনার গাছের পাতায় সোনালী আর টুকটুকে লাল রঙের মেলা, যার দু-একটি পাতা ঝরে পড়ছে শান্ত চত্বরে। দূরের পীর পাঞ্জাল পর্বতমালাগুলোর চূড়ায় সদ্য জমতে শুরু করা শুভ্র বরফের আস্তরণ, যা হালকা কুয়াশার চাদরে একটু একটু ঢাকা পড়ে এক রহস্যময় নীরবতায় দাঁড়িয়ে আছে। ওদিকে ডাল লেকের জল শীতে জমে যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে এক শান্ত কাচের আয়নার মতো স্থির ও নিস্তরঙ্গ।

এই হিমশীতল প্রকৃতির বুকেই নিজস্ব মহিমায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে শ্রীনগরের বিখ্যাত কাশ্মীর ইউনিভার্সিটি। ডাল লেকের ঠিক পশ্চিম তীরে, হজরতবালের শান্ত ও পবিত্র পরিবেশে ঘেরা এই ক্যাম্পাসটিতে এখন সকাল এগারোটা। আকাশ আজ কিছুটা মেঘে ঢাকা, কদিন ধরে এখানে সূর্যের খুব একটা দেখা নেই বললেই চলে। তবে সূর্যের দেখা না মিললেও, প্রাচীন লাল ইটের ভবনগুলোর চত্বরে ঠিক এই সময়ে ক্লাস শেষ হওয়া একঝাঁক শিক্ষার্থীর চঞ্চল কোলাহলে নিস্তব্ধ ক্যাম্পাসটি হঠাৎ প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠেছে। ভারী জ্যাকেট, ওভারকোট আর রঙিন মাফলারে জড়ানো তরুণ-তরুণীদের আড্ডা, চত্বরের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা কানন বা ক্যাফেটেরিয়া থেকে বাতাসে ভেসে আসা ধোঁয়া ওঠা নুন-চা আর কফির তীব্র সুবাস—সব মিলিয়ে এই মেঘলা আকাশ আর হাড়কাঁপানো ঠান্ডার মাঝে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ জুড়ে এখন এক অদ্ভুত জমজমাট ও স্নিগ্ধ আবহ।

ঠিক এই সময়ে ভার্সিটির প্রধান ফটকের সামনে এসে একটি ট্যাক্সি থামল। দরজা খুলে সেখান থেকে নেমে এলো এক বাঙালি রমণী। সে চালকের ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে খানিকটা বিস্মিত চোখে সামনের বিশাল ভবনগুলোর দিকে তাকাল। অপরিচিত এই বিশাল চত্বরে কোনদিকে যাবে, তা প্রথমে কিছু বুঝে উঠতে পারল না সে। অতঃপর কিছুটা ইতস্তত পায়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেল। কোনদিকে যাবে কিছু বুঝতে না পেরে ভাঙা ভাঙা হিন্দি ভাষায় একজন শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞেস করল,

–“এক্সকিউজ মি! ক্যা আপ মুঝে বতা সকতে হ্যায় কি প্রফেসর জাহানারা শেখ কো ম্যায় কহাঁ মিল সকতি হুঁ?”

মেয়েটি তক্ষুনি দাঁড়িয়ে পড়ল। সৌহার্দ্য দেখিয়ে স্মিত হেসে বলল,“আই থিংক, আপু, ম্যাম তো অভি ফার্স্ট ইয়ার কি ক্লাস মে হোঙ্গি। শায়দ আপকো ওয়াহিঁ মিল জায়েঙ্গি।”

–“কিধর জানে পর মিলেঙ্গি, থোড়া বতা দেঙ্গে?”

মেয়েটি হাতের ইশারায় পথ বুঝিয়ে দিল। রমণী কৃতজ্ঞতা স্বরূপ অমায়িক হেসে বলল,“শুকরিয়া!”

মেয়েটিও ভদ্রতা দেখিয়ে সহাস্যে বলল,“আপকা স্বাগত হ্যায়।”

কথাটি বলেই মেয়েটি চঞ্চল পায়ে সামনের দিকে হেঁটে চলে গেল। রমণী নিজের কাঁধের সাইড ব্যাগের ফিতাটা একটু শক্ত করে চেপে ধরল। অচেনা এই বিশাল আঙিনায় এক রাশ গভীর শ্বাস টেনে বুকটা হালকা করে সে ভেতরের দিকে এগিয়ে গেল। লাল ইটের সেই ভবনের দোতলায় উঠে সে চারদিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিপাত করে ক্লাসরুমটি খুঁজতে লাগল। কিন্তু গোলকধাঁধার মতো করিডোরে যখন সে কিছুটা বিভ্রান্ত, তখনই হঠাৎ পিছন থেকে একটি মেয়েলি গলা ভেসে এলো,

–“এক্সকিউজ মি!”

চকিতে রমণী পিছনে ফিরে তাকাল। একজন মধ্যবয়সী মহিলা দাঁড়িয়ে। চেহারায় এক ধরণের প্রাজ্ঞ গাম্ভীর্যের স্পষ্ট ছাপ। বুকের সাথে বই ধরে রাখা। রমণী আন্দাজ বলছে সামনের মহিলাটি বোধহয় এই ভার্সিটির কোনো প্রফেসর। রমণী তক্ষুনি নম্রভাবে সালাম দিল,

–“আসসালামু আলাইকুম।”

প্রফেসর শাহনাজ চেহারায় গম্ভীরর্য রেখেই সালামের জবাব দিয়ে শুধাল,“ওয়ালাইকুম আসসালাম। কোই প্রবলেম হ্যায়?”

রমণী ইতস্তত গলায় বলে উঠলো,“অ্যাকচুয়ালি ম্যাম, ম্যায় প্রফেসর জাহানারা শেখ কো ঢুঁঢ রহি হুঁ। কাইন্ডলি থোড়া বতা সকতি হ্যায় কি ম্যায় উনহেঁ কহাঁ মিল সকতি হুঁ? তো মেরি বহুত মদদ হো জায়েগি।”

এতক্ষণে প্রফেসর শাহনাজের গম্ভীর চেহারা হাস্যোজ্জ্বল দেখা গেল। তিনি বেশ চনমনে গলায় সহাস্যে বলে উঠলেন,“আপ মিসেস চৌধুরী কো ঢুঁঢ রহি হ্যায়? বো তো ক্লাস খতম করকে আপনে কেবিন মে চলে গয়ি হ্যায়। ওয়াহিঁ আপকো মিল জায়েঙ্গি।”

কথা শেষ করেই মহিলাটি সামনের মেয়েটিকে আপাদমস্তক পরখ করে শুধালেন,“সরি, আপ ইয়াহাঁ কি স্টুডেন্ট নেহি লাগতিঁ। অউর না হি ম্যায়নে আপকো কবি ইউনিভার্সিটি মে দেখা হ্যায়! আপ কৌন হ্যায়?”

সামনের রমণী স্মিত হেসে বলল,“ম্যায় তন্নি রহমান হুঁ। জাহানারা শেখ কি সহেলি হুঁ। আজ হি বাংলাদেশ সে ইয়াহাঁ আই হুঁ।”

প্রফেসর শাহনাজের ঠোঁটের হাসি আরও প্রশস্থ হলো। তিনি অত্যন্ত আন্তরিকভাবে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,“ম্যায় ইস ইউনিভার্সিটি কি সোশিওলজি প্রফেসর শাহনাজ বেগম হুঁ। নাইস টু মিট ইউ।”

তন্নিও ভদ্রতাসুলভ শাহনাজকে অভিবাদন জানিয়ে জিজ্ঞেস করল জাহানারার কেভিন কোন দিকে? শাহনাজ বললেন,“টপ ফ্লোর কে বায়িঁ তরফ ওয়ালে কেবিন মে আপকো মিসেস চৌধুরী মিল জায়েঙ্গি।”

তন্নি প্রফেসর শাহনাজকে ধন্যবাদ জানিয়ে স্থান ত্যাগ করল।

____________

নিজস্ব অন্ধকারাচ্ছন্ন কেবিনে স্তব্ধ হয়ে বসে আছে জাহানারা। তার বি’ষণ্ণ মুখের ওপর আ’ছড়ে পড়ছে ল্যাপটপের স্ক্রিনের ধূসর আলো। সেখানে ডিজিটাল হরফে ভাসছে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় নিউজ পোর্টাল ‘প্রথম আলো’র একটি পাতা। সেখানে শুরুতেই দেখা যাচ্ছে প্রয়াত মাফিয়া বস ইফান চৌধুরীর একটি ছবি। ছবির নিচে জ্ব’লজ্ব’ল করছে তার আকস্মিক মৃ’ত্যু’র খবর। বিজ্ঞাপনটি আজ থেকে প্রায় ছয় বছর আগের। সময়ের ধুলো জমলেও সেই শিরোনাম আজও র”ক্তে কাঁপন ধরায়,

“২০২৫ সালের ২রা জুন ইন্টারন্যাশনাল ক্রি’মি’নাল এবং আ’ন্ডারওয়ার্ল্ডের সবচেয়ে পাওয়ারফুল টে”রো’রি’স্ট গ্যাং ব্ল্যাক-ভেনম এর লিডার মাফিয়া বস ইফান চৌধুরী নিজেই নিজের বুকে গু”লি চালিয়ে আ”ত্মাহু”তি দিয়েছেন।” তারপর নিচে সেই অযাচিত মৃ’ত্যু’র নানান বিবরণ দেওয়া।

জাহানারা এই নিউজ এই ছয় বছরে কতবার যে পর্যবেক্ষণ করেছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। তবুও অতৃপ্ত এক তৃষ্ণা যেন তার মনের ভেতর ছটফট করে। প্রতিটি শব্দ মুখস্থ, তবুও প্রতিবার পড়তে গেলে মনে হয় কোথাও একটা শূন্যস্থান রয়ে গেছে, কোনো এক অদৃশ্য সত্য আড়ালে ঢাকা পড়ে আছে। ২০২৫ সালের সেই অ”ভিশপ্ত জুনের পর একটা পুরো মাস ধরে পৃথিবীর এমন কোনো ছোট-বড় নিউজ চ্যানেল, দৈনিক পত্রিকা বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছিল না, যা এই খবরে প্র’ক’ম্পিত হয়নি। জাহানারা সেই ঝড়ের দিনগুলোর প্রতিটি নথি চষে ফেলেছে। কিন্তু তার মনের কোণে যে প্রশ্নগুলো দানা বেঁধে আছে, তাকে প্রতিটিদিন, প্রতি মুহূর্তে খুঁ’ড়ে খুঁ’ড়ে খাচ্ছে সেই প্রশ্নের উত্তরগুলো এখনো তার মিলেনি। এমনকি তার আপন ভাই সাবেক সিআইডি অফিসার জিতুও তাকে জুতসই উত্তরগুলো দিতে পারেনি।

জাহানারা কাঁ’পতা আঙুলে কিবোর্ড চেপে স্ক্রিনের লেখাগুলোকে আরও জুম করল। কাঁচের ওপারে থাকা অক্ষরেরা যেন এক একটা জীবন্ত রহস্য হয়ে তাকে গ্রাস করতে চাইল। সে অবশ ঠোঁটে বিড়বিড় করে পড়তে লাগল সেই বহু চেনা, র”ক্তক্ষ”য়ী ই’তি’হাস,

“২০২৫ সালের ২রা জুন মাফিয়া বস খ্যাত মিস্টার ভি অর্থাৎ শীর্ষ ধনী ব্যবসায়ী ইফান চৌধুরীর ডে’ড ব’ডি নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল বাংলাদেশ তদন্ত ডিপার্টমেন্ট সিআইডির আন্ডারের ফরেনসিক ল্যাবের দিকে। সাথে অ্যা”রেস্ট করা হয়েছিল তৎক্ষণাৎ লন্ডনের ডন খ্যাত ইন্টারন্যাশনাল ক্রি”মিনাল গডফাদার পলক কাইসার এবং ইফান চৌধুরীর তিন সঙ্গী সহ তাদের টিমের কিছু সদস্যদের। কিন্তু পু’লি’শ এবং সিআইডি তাদের আ”টক করে জে’ল অব্দি নিয়ে যেতে ব্যর্থ হয়। হঠাৎই মাঝরাস্তায় অ’জ্ঞা’ত এক বিশাল দুর্ধর্ষ হা”না’দার বাহিনীর অতর্কিত আ”ক্রমণে সেদিন পুরো উত্তরাজুড়ে চলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাথে সেই হানাদার বাহিনীর ভ”য়া”বহ সং’ঘ’র্ষ। সেই অ’তর্কিত হা”ম’লায় প্রা’ণ হা’রায় বাংলাদেশের প্রায় আড়াই হাজার সে”না সদস্য। এমনকি সেই হা”ম’লায় মৃ”ত্যু’বরণ করেন সিআইডি হেড অফিসার আরাজ আহমেদ সহ অনেকে। সেই সময় অসংখ্য লা”শ গু’ম করা হয়। ধারণা করা যায় তার মধ্যে ছিল মাফিয়া বস ইফান চৌধুরীর ডে”ড বডিও।”

পত্রিকার পাতার আরও একটু নিচেই ধোঁয়াশাপূর্ণ একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য দেওয়া। তা হলো সেইদিনের অ’জ্ঞা’ত বা’হি’নীদের শনাক্ত না করা গেলেও তাদের অধিকাংশের পোষাকে সূর্যের ছোট্ট একটি করে প্রতীক লক্ষ করা যায়। কিন্তু ভেনমদের প্রতীক তো কালো বি”ষা’ক্ত বিছা! তবে এই রহস্যময় সূর্য-প্রতীকী বাহিনী আসলে কাদের? আর তারা কেন ভে’ন’মদের হয়ে লড়ল? জাহানারার ফর্সা চেহারায় গা’ম্ভীর্যের কালচে ছায়া আরও ঘনীভূত হলো। অ’তিরি’ক্ত চিন্তার ভারে তার মসৃণ কপালে সূক্ষ্ম কয়েকটি ভাঁজ দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। চশমার কাচের আড়ালে থাকা রমণীর নিষ্প্রভ, অতল ভ্রমর-কালো চোখ দুটো এখনো ল্যাপটপের আলোয় স্থির। হঠাৎ তার মনযোগ ক্ষুন্ন হয় একটি অতিপরিচিত মেয়েলি কণ্ঠ শুনে,

–“মে আই কাম ইন?”

ভাবনার সুতো ছিঁড়ে গেল। ভ্রুকুটি করে সহসা পিছন ফিরে তাকাল জাহানারা। আর তক্ষুনি তার বি”ষ’ণ্ণ চোখের ক্যানভাসে ধরা দিল এক জোড়া চেনা ঠোঁটের মিষ্টি, এক চিলতে হাস্যোজ্জ্বল রেখা। পরণে থ্রিপিস আর তার উপর সুয়েটার। মাথায় ওড়না টেনে, বাকি অংশটুকু গলায় পেঁচিয়ে পরম যত্নে সামনে ফেলে রাখা। জাহানারা বিস্মিত কণ্ঠে আওড়াল,

–“তন্নি!’

তন্নির চোখ দুটো ছলছল করে ওঠল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রমণীকে দেখে। যার পরনে একখানা শাড়ি, কাঁধে শীতের শাল জড়িয়ে রাখা। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা। কিন্তু সেই চেনা লাবণ্যময়ী চেহারায় আজ বসন্তের হাসির লেশমাত্র নেই। সেখানে কেবলই এক অনড় গাম্ভীর্যের যবনিকা। তবে তন্নি সেসবে ধর ধারল না। চোখের সামনে বহুদিন পর বান্ধবীকে দেখে সহাস্যে ছুটে এগিয়ে গেল। জাহানারা উঠে দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই তাকে গিয়ে জড়িয়ে ধরল। সহসা তন্নি কা’ন্না মিশ্রিত ভেজা কণ্ঠে বলে উঠল,

–“কেমন আছিস তুই, জাহান? কতগুলো বছর পর তোকে সচক্ষে দেখলাম? ভুলে গেছিস আমায় তাই না?”

হঠাৎ এভাবে এসে জড়িয়ে ধরায় কিঞ্চিৎ অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিল জাহানারা। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে সে দুই হাতে বান্ধবীকে জড়িয়ে ধরল। স্মিত হেসে বলে উঠল,

–“তোকে ভুলে যাব কি করে? তুই তো আমার বেস্টি। কেমন আছিস তুই?”

ঢুকরে কেঁ’দে উঠল তন্নি। ক’ন্দ’নরত গলায় বলল,“তোকে ছাড়া সত্যি দিনগুলো পানসে ছিলরে, জাহান। খুব মিস করেছি তোকে। তুই যে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছিস বিশ্বাস হচ্ছে না। আমার এখনো মনে হচ্ছে এটা আমার স্বপ্ন!”

__________

শ্রীনগরের কাশ্মীর ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে ট্যাক্সি চেপে মিনিট বিশেকের মধ্যেই বুদগামে এসে পৌঁছেছে জাহানারা আর তন্নি। এখানকার প্রকৃতির রূপ যেন আরও আদিম, আরও নিস্তরঙ্গ। পাহাড়ি শালীগঙ্গা নদীর ঠিক গা ঘেঁষে জেগে থাকা শান্ত, নিটোল এক ছবির মতো গ্রাম। পিচঢালা মূল রাস্তার একপাশে বসেছে গ্রামীণ এক চিলতে বাজার, যেখানকার কাঠের দোকানগুলোর ওপর হালকা কুয়াশার আস্তরণ জমে আছে। জাহানারা আর তন্নি গ্রাম্য এই মেঠো বাজারটির বুক চিরে ধীরপায়ে গল্প করতে করতে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। উদ্দেশ্য বাজারের পাশেই কারাতে একাডেমি থেকে জাহানারার মেয়েকে নিয়ে আসা। তারপর একসাথে কোঠিতে ফিরবে।

হাঁটতে হাঁটতে জাহানারা নিজের বুকের সাথে ভার্সিটির দুটো ভারী বই পরম যত্নে আগলে ধরে রেখেছে। আর কাঁধে ঝুলছে ভ্যানিটি ব্যাগ। পাশে হাঁটতে থাকা তন্নি আপাদমস্তক পরখ করতে লাগল জাহানারাকে। রমণীর পরণে একটি সাদামাটা হালকা রঙের শাড়ি। শাড়ির কুঁচি আর আঁচল বেশ পরিপাটি। দুই কাঁধে জড়িয়ে রেখেছে শীতের কাশ্মীরি শাল। সময়ের চাকা ঘুরে বয়স কিছুটা বাড়লেও, জাহানারার চেহারার সেই চিরচেনা লাবণ্য যেন একটুও কমেনি। বরং কাশ্মীরের হিমেল হাওয়া আর মাতৃত্বের ছোঁয়ায় তা আরও কয়েক গুণ খোলতাই হয়েছে। তন্নিকে এভাবে হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখে জাহানারা শান্ত গলায় শুধাল,

–“কি দেখছিস?”

তন্নি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে স্মিত হেসে বলল,“দেখছি তুই কতটুকু পাল্টেছিস!”

জাহানারা অধর বাঁকাল। রসাত্মক গলায় শুধাল,“তো কি মনে হলো, কতটুকু পাল্টেছি?”

–“দেখছি আগের মতোই সুন্দরী আছিস তুই৷ বরং এখন আরও অদ্ভুত রকম স্নিগ্ধ সুন্দরী লাগে। মা মা একটা কোমল ছায়া আছে তোর মধ্যে। স্বাস্থ্যটা আগের থেকে উন্নতি হয়েছে। দেখতে বেশ লাগছে। এই জাহান, তুই কি আরও একটু লম্বু হয়েছিস?”

তন্নির অদ্ভুত বিবরণ শুনে নিঃশব্দে হাসল জাহানারা। চশমাটা নাকের ডগায় সামান্য ঠিক করে নিয়ে সে বলল,“বুঝলাম। এবার বল তোর কি খবর? বিয়েসাদী তো আর করেছিসনি! ভবিষ্যৎ প্ল্যান কি?”

তন্নির হাস্যোজ্জ্বল চেহারাটা নিমিষেই মিইয়ে গেল। সেখানে ভর করল একরাশ মলিনতা। সেভাবেই মেকি হেসে বলল,“আপাতত কোন প্ল্যান নেই। চলতে থাক এভাবে। দেখি জীবন আমাকে কোথায় নিয়ে যায়।”

তন্নির এমন নিস্পৃহ, নিরস কথা শুনে জাহানারা অলক্ষ্যে একটি ত’প্তশ্বাস ছাড়ল। উদাস গলায় বলল,“তার জন্য অপেক্ষা করা ঠিক না, যার জীবনে তোর কোনো জায়গা নেই।”

বান্ধবীর মনের অবদমিত ভাবটা বুঝতে পেরেও তন্নি নিজের ওষ্ঠপুটে হাসির রেশটুকু জোর করে ধরে রাখল। হালকা চালে বলল,“কে বলল আমি কারো জন্য অপেক্ষা করছি? সবাইকে যে বিয়ে করে সংসার করতে হয় এমন কোনো মানে নেই। আমি ভালো আছি একাকী জীবনে। পরিবার নিয়ে দিনগুলো ভালোই চলছে।”

–“ভালো থাকলেই ভালো।”

খুব অস্ফুটে, স্বগতোক্তির মতো শব্দ দুটো আওড়াল জাহানারা। তার কণ্ঠে এক ধরণের প্রচ্ছন্ন ক্লান্তি। তারপর দুই বান্ধবীর মধ্যে নীরবতা নেমে এলো। খানিকটা এগিয়ে যেতেই জাহানারার দৃষ্টি আঁটকে যায় বাজারের একটি ছোট্ট মুদির দোকানে। সেখানে আজ এক অসহায় বৃদ্ধা শূন্য চোখে বসে আছে। অথচ মাত্র একটা সপ্তাহ আগেও এই চেনা দোকানে বসত বৃদ্ধাটির টগবগে তরুণ ছেলেটি। কিন্তু হঠাৎ করেই ছেলেটা র’হস্যজনকভাবে খু’’ন হয়ে গেল। অথচ মৃ’ত্যু’র আগেরদিনই জাহানারার সাথে ছেলেটির সাক্ষাৎ হয়। সেদিন এখান দিয়েই ইমিকে একাডেমি থেকে নিয়ে যাওয়ার সময় জাহানারা ইমির জন্য কেক কিনতে দোকানে যায়। কেকটির প্যাকেট দেখে জাহানারা শুধু জিজ্ঞেস করেছিল ডেট আছে তো? ব্যাস! এতেই ছেলেটা চড়া গলায় জাহানারাকে বলে– নিলে নিন, না নিলে যান। জাহানারা কথা বাড়ায়নি। সে চলে যায়। আর বিষয়টি এখানেই শেষ হয়।

কিন্তু ঠিক তার পরদিন সকালে ছেলেটির লা’’শ পাওয়া যায় বাজারের শেষ প্রান্তে। জাহানারা কিছুতেই বিষয়টি মাথা থেকে সরাতে পারছে না। তার সাথে ছেলেটির এমন একটা ছোট খাটো সমস্যা হওয়ার পরদিনই কেন এমন অ’ঘটন ঘটল ছেলেটির সাথে। সবচেয়ে অ’দ্ভুত আর র’হস্যময় বিষয় হলো, এটা কোনো বি’চ্ছি’ন্ন ঘটনা নয়। গত দীর্ঘ ছয়টি মাস ধরে জাহানারার জীবনের চারপাশে এমন কিছু অ’বিশ্বা’স্য ও অ’দ্ভুত ঘটনা ঘটে চলেছে। অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে কোনো পুরুষের সাথে রাস্তায় সামান্য ধা’ক্কা লাগা, কিংবা অবহেলাবশত কারও সাথে একটুখানি সমস্যা হওয়া—ব্যস, অলৌকিক কোনো ইশারার মতো ঠিক তার পরদিনই সেই নির্দিষ্ট ব্যক্তির গু”লিবি”দ্ধ লা”শ উ”দ্ধার করা হচ্ছে! প্রথম প্রথম এসব নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথা ঘামায়নি রমণী, কাকতালীয় ভেবে এড়িয়ে গেছে। কিন্তু তার মনের কোণে সন্দেহের কালো মেঘ ও জুতসই প্রশ্নের দানা বাঁধতে শুরু করেছে মূলত তিন সপ্তাহ আগের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে। সেদিন ভার্সিটির একটি ছেলে জাহানারাকে লাভ লেটার পাঠায়। অদ্ভুত বিষয়, পরদিন সকালে ভার্সিটির পাশের লেকের কাছে ছেলেটির বি”ভৎস লা’’শ পাওয়া যায়। সেইদিনের পর থেকেই বিষয়টা জাহানারাকে প্রচন্ড ভাবাচ্ছে। কিছুতেই সে এই র’হ’স্যের সমাধান করতে পারছে না।

মাঝপথে জাহানারাকে থমকে যেতে দেখে তন্নি ভ্রুকুটি করে শুধাল,“কিরে! দাঁড়িয়ে পড়লি কেন? কিছু কিনবি?”

তন্নির গলার আওয়াজ পেয়ে সংবিৎ ফিরল জাহানারার। তবে প্রত্যুত্তর করার কোনো ফুরসত পেল না। হঠাৎই একটি মেয়েলি কণ্ঠ ভেসে আসে,“মিসেস চৌধুরী?”

ডাক শুনে দৃষ্টি ঘুরাল জাহানারা। দেখল খানিকটা দূরে একজন মধ্যবয়সী মহিলা দাঁড়িয়ে আছে। তার উৎসুক আর অনুসন্ধানী দৃষ্টি জোড়া স্থির হয়ে আছে জাহানারার মুখের ওপর। মেয়েটিকে ডাকে সারা দিতে দেখে মহিলাটি সন্নিধ্যে এগিয়ে আসল। জাহানারার দিকে তাকিয়ে ইতস্তত গলায় শুধাল,

–“ক্যা আপ মিসেস চৌধুরী হ্যায়?”

জাহানারা মহিলাটিকে দেখতে দেখতে প্রত্যুত্তর করল,“ইয়েস! আই অ্যাম মিসেস চৌধুরী, প্রফেসর জাহানারা শেখ।”

মহিলাটির চেহারায় এবার প্রছন্ন হাসির ঝলকানি দেখা গেল। তিনি সামনের রমণীকে আপাদমস্তক দেখতে লাগলেন। জাহানারা ভনিতা নিয়ে জিজ্ঞেস করল,

–“মাফ কিজিয়ে, ম্যায় আপকো পহচান নেহি পা রহি হুঁ। আপ কৌন হ্যায়?”

মহিলাটি সহাস্যে বলল,“আপ মুঝে নেহি পহচানেঙ্গি। লেকিন আপ বহুত খুশনসিব হ্যায়। আল্লাহ তাআলা আপকা ভলা করে। ম্যায় আপকে লিয়ে দুআ করুঙ্গি। আচ্ছা, ফির চলতি হুঁ।”

মহিলাটি নিজের কথা শেষ করেই যেদিক দিয়ে এসেছিল ঠিক সেদিকেই চলে গেল। জাহানারা সেই পথের দিকে কৌতুহলী নেত্রে তাকিয়ে রইল ক্ষীণকাল। তার বোধগম্য হলো না কে এই মহিলা, আর তাকে কি করে চিনল! তবে প্রৌঢ়ার পরনের ঐতিহ্যবাহী ফেরান আর পোশাক দেখে মনে হচ্ছে এখানকারই স্থানীয় লোক হবে! জাহানারার ভ্রম ছুটে তন্নির গলা শুনে,

–“কিরে! এটা কে ছিলো?”

–“কি জানি! জানি না।”

একেবারে অন্যমনস্ক, নিচু কণ্ঠে জবাব দিল জাহানারা। তার চোখ দুটো তখনও সেই শূন্য রাস্তার দিকেই নিবদ্ধ। অতঃপর নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে সে যখন আবার সামনের দিকে পা বাড়াতে যাবে, ঠিক তখনই চারপাশের কনকনে ঠাণ্ডা বাতাসকে চিঁ’ড়ে এক আ’কস্মিক সংবাদের চড়া আওয়াজ তার কান অব্দি এসে পৌঁছাল। চায়ের কাপের টুংটাং শব্দকে ছাপিয়ে টিভির সেই চেনা সংবাদ পাঠকের কণ্ঠস্বর শুনে চকিতে বাঁ দিকে নিজের দৃষ্টি ঘোরাল জাহানারা। সে লক্ষ করল একটি চায়ের দোকানে টিভিতে ভারতীয় একটি চ্যানেলে নিউজ চলছে,

–“ব্রেকিং নিউজ! হঠাৎ করেই গত ছয় মাস ধরে দেশ সহ দেশের বাইরে, আনাচে-কানাচে র’হস্য’জনক খু”নের অহরহ ঘটনা ঘটে চলেছে। অত্যন্ত অদ্ভুত ও চাঞ্চল্যকর বিষয় হলেও, প্রতিটি খু”নের ধরন এবং মো’ডাস অ’পা’রেন্ডি প্রায় একই রকম। কিন্তু এই ধারাবাহিক খু”নের পেছনের কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা বা অ’কা’ট্য প্রমাণ পু”লিশ প্র’শা’সন আজও উ”দ্ধার করতে পারেনি। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক গো”য়েন্দা মহলে তী’ব্র গু’ঞ্জন উঠেছে– আজ থেকে প্রায় ছয় বছর আগে অ”পরাধ জগত থেকে আড়াল হয়ে যাওয়া কু”খ্যাত টে”রোরিস্ট গ্রুপ ব্ল্যাক-ভেনম হঠাৎ করেই অ”প”রাধ জগতে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠেছে। ফের আ”ন্ডারওয়ার্ল্ডে ছড়িয়ে পড়েছে তাদের পাওয়ারের আধিপত্য। বিশ্বজুড়ে প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়া ভেনমদের পুরোনো ক্যা’সি’নো, ক্লাব সহ সব ধরণের অ”বৈধ কারবারগুলো নাকি রাতারাতি আবারও রমরমা হয়ে উঠেছে। অ”প”রাধ বিশেষজ্ঞদের অনেকের মতে ধারণা করা যাচ্ছে এসব খু”নের পেছনে ভেনমদেরই হাত রয়েছে। যদিও সুনিদিষ্ট তথ্য প্রামাণ পাওয়া যায়নি। তবে এ নিয়ে আ’ন্তর্জা’তিক মহলে বর্তমানে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা।”

তন্নি ফের জাহানারাকে দাঁড়িয়ে পড়তে দেখে প্রশ্ন করতে যাবে অমনি তার দৃষ্টি স্থির হয় ঠিক রাস্তার ওপাড়ে। সেখানে কালো পোশাকে মোড়ানো বেশ কিছু লোক গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে ছিল। সেই জটলার মাঝেই তন্নির মনে হলো আজ বহুবছর পর এইমাত্র সে অতি পরিচিত একজন ব্যক্তিকে দেখেছে। কিন্তু এক ঝলক দেখতে না দেখতেই, হঠাৎ চোখের সামনে দিয়ে কটা বড় গাড়ি রাস্তা মাড়িয়ে চলে গেল। আর সেই গাড়ির দ্রুতগামী বহর পার হতেই উক্ত ব্যক্তিটি কালো পোশাক পরিহিত দলটির মাঝখান থেকে চোখের আড়াল হয়ে গেল নিমেষেই।

জাহানারা টিভির নিউজ শুনে উদাসীন হয়ে সামনের দিকে হাঁটা ধরেছিল। কিন্তু কয়েক পা এগিয়ে যেতেও যখন অনুভব করল তন্নি পাশে নেই তক্ষুনি পিছনে ফিরে তাকাল। দেখল, তন্নি এক অত্যন্ত উ”দ্বি”গ্ন আর বি”ভ্রান্ত চেহারায় রাস্তার ওপারে তাকিয়ে নিশ্চল দাঁড়িয়ে আছে। রাস্তা দিয়ে তখন একের পর এক গাড়ি ছুটে যাচ্ছে। আর রাস্তার ওপারে দেখা যাচ্ছে পাহাড়ি শালিগঙ্গা নদী। নদীর তীরবর্তী বিস্তীর্ণ ফাঁকা মাঠটায় নভেম্বরের এই হালকা শীতের মিঠে আমেজকে উদযাপন করতে জমজমাট এক লোকজ মেলা বসেছে। কাশ্মীরের বিখ্যাত বেগুনি রঙের জাফরান ফুল তোলার এই বিশেষ মরশুমকে কেন্দ্র করেই মূলত আয়োজন করা হয়েছে ঐতিহ্যবাহী ‘জাফরান উৎসবের’। আর সেই উৎসবের রঙিন আমেজেই মেলা প্রাঙ্গণ আজ লোকারণ্য। দূর থেকেই নজরে পড়ছে সারিবদ্ধ মাটির ও কাঠের খেলনার দোকান, রঙিন কাপড়ের পসরা আর কাঠের নাগরদোলার চাকা। নদীর রুপোলি জলের পটভূমিতে কাশ্মীরি প্রথাগত ফেরান আর রঙিন শাল জড়িয়ে দলে দলে মানুষের মেলা প্রাঙ্গণে আনন্দমুখর যাতায়াত, আর তার ঠিক পেছনে শুভ্র বরফ ঢাকা পাহাড়ের চূড়াগুলো পুরো উপত্যকাকে যেন এক জীবন্ত, জাদুকরী ক্যানভাসে রূপ দিয়েছে।

জাহানারা সেদিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। তন্নির দিকে তাকিয়ে শুধাল,“কি হয়েছে?”

একটু আগে চোখের পলকে দেখা, সেই যন্ত্রমানবের মতো নি’র্বিকার লোকটিকে তার কাছে সব সময়ের মতো আজও এক ম’রী’চিকাময় বিভ্রম বলেই মনে হলো। তাই নিজের ভেতরের তোলটাপল লুকিয়ে, এক মি’থ্যার আশ্রয় নিয়ে বলল,“কই! কিছু না?”

_________

–“বেশ করেছি লা”থি মে’রে’ছি। আরও মা”রব। তাতে তোর বাপের কি? কে তুই হে? কে তুই?

–“আমি কে মানে?”

কারাতে একাডেমির বিশাল হলরুম জুড়ে তখন চলছে ছোট-বড় সব শিক্ষার্থীদের নিয়মিত মার্শাল আর্টের ক’ঠো’র অনুশীলন। পুরো হল প্রাঙ্গণ শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত ও গুরুগম্ভীর ‘কিয়াই’ আওয়াজে মুখরিত। কিন্তু হঠাৎ করেই সেই চিরচেনা সব আওয়াজকে ছাপিয়ে, কারও তী”ব্র ও ক্ষু”ব্ধ চি’ৎ’কারে পুরো শোরগোল পরিবেশ এক লহমায় থমকে গেল। হলের সবাই চট করে নিজেদের দৃষ্টি ঘুরিয়ে পেছনের দিকে তাকাতেই লক্ষ করল—একটি ছোট্ট মেয়ে নিজের মুখ থেকে এক তী”ব্র ‘কিয়াই’ আওয়াজ বের করে আচমকা হাওয়ায় লাফিয়ে উঠল! আর ঠিক তার পরের মুহূর্তেই, বাতাসের গতিতে সজোরে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বড় ছেলের বুকে বি”দ্যুৎবেগে ফ্লাইং কিক অর্থাৎ লা”থি বসিয়ে দিল সে। আ”ঘা’তের তী”ব্রতা এতটাই প্র’চণ্ড ছিল যে, ছেলেটি তৎক্ষণাৎ ভারসাম্য হারিয়ে কিছুটা দূরে ছিটকে গিয়ে কাঠের মেঝেতে সশব্দে আছাড় খেয়ে পড়ল। ওদিকে মেয়েটি শূন্য থেকে ফের নিখুঁত ভঙ্গিতে জমিনে পা ফেলে, দু-হাত সামনের দিকে সটান মুষ্টিবদ্ধ করে ডি’ফে’ন্স প’জিশনে দাঁড়িয়ে পড়ল।

মেয়েটির বয়স আনুমানিক বড়জোর পাঁচ কি সাড়ে পাঁচ বছর হবে। পরনে তার সাদা কারাতেগি পোশাক আর কোমরে বাঁধা কালো বেল্ট। পিঠ ছুঁয়ে পড়া ঘনকালো চুলগুলো মাথার ওপর শক্ত করে ঝুঁটি করা। তবে কপালের দুপাশে কিছু ছাঁটাই করে রাখা অবাধ্য চুল অবেলায় আলতো করে লেপ্টে আছে। ছোট্ট মেয়েটির পেলব, আদুরে চেহারাখানায় এখন এক চ”রম কা’ঠি’ন্যের স্পষ্ট ছাপ। ধূসর বাদামী অক্ষিযুগল বড়ই তীক্ষ্ণ আর তাতে ক্ষো”ভের ছায়া। চোয়াল বড্ড শক্ত। মেয়েটি জমিনে স্থির হয়ে দাঁড়িয়েই নিজের কচি দন্তপাটি একে অপরের সাথে ঘ’র্ষণ করল। তারপর হলরুমের স্তব্ধতা ভেঙে, এক অসীম দর্পে ও শক্ত কণ্ঠে বলে উঠল,

–“আমি ন্যাশনাল কারাতে চ্যাম্পিয়ন ইমি চৌধুরী। মাফিয়া বস ইফান চৌধুরীর একমাত্র প্রিন্সেস।”

উপস্থিত কয়েকজন সিনিয়র শিক্ষার্থী তৎক্ষণাৎ ছুটে এসে মেঝেতে পড়ে থাকা ছেলেটিকে ধরাধরি করে তুলে দাঁড় করাল। আ”ঘা’তে ছেলেটির ঠোঁট ফে’টে লো’হিত র”ক্ত ঝরছে। সরাসরি বুকে আ”ঘাত পাওয়ায় সেখানে তী”ব্র ব্য”থার কারণে সে এক হাত দিয়ে বুকটা শক্ত করে চেপে ধরে অনবরত হাঁ’পা’চ্ছে। পরিবেশের এমন অনাকাঙ্ক্ষিত রূপ দেখে, উপস্থিত একজন সিনিয়র ট্রেইনার কড়া চোখে ইমির দিকে তাকিয়ে বেশ শক্ত গলায় ধমকে উঠল

–“ইয়ে ক্যা কর রহি হো, ইমি? বো তুমসে সিনিয়র হ্যায়।”

ছেলেটিকে আর কিছু বলতে না দিয়ে তৎক্ষনাৎ রুম কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠল ইমি,“ম্যায় উসে মা”র ডা’লুঙ্গি। উসকি হিম্মত ক্যায়সে হুই মে”রে অপ্পা(বড় ভই) পর হাত উঠানে কি?”

ইমির এই ক্রু”দ্ধ হুং’কার কানে পৌঁছাতেই, এতক্ষণ এককোণে দাঁড়িয়ে থাকা ব্রুনোও যেন নিজের ক্ষো”ভ আর অভিযোগের সুরে ‘ভাউ ভাউ’ করে ডেকে উঠল। অথচ, এইতো কিছুক্ষণ আগেও একাডেমির ভেতরের সবকিছু বেশ শান্ত আর ভালোই চলছিল। প্রতিদিনের চেনা নিয়ম মেনেই ব্রুনো আজ তার ছোট্ট বোনটির দে’হর’ক্ষী হয়ে কারাতে একাডেমিতে এসেছিল। ইমি যখন ম্যাটের ওপর পুরো মনোযোগ ঢেলে দিয়ে নিজের দু’র্ধ’র্ষ কসরতগুলো প্র্যাকটিস করছিল, ব্রুনো তখন একপাশে জবুথবু হয়ে বসে পরম মুগ্ধতায় বোনের সেই পা’র’দর্শিতা লক্ষ করছিল।

অবোধ প্রাণীটি একাকী বসে থাকতে থাকতে আচমকা পাশে একটা পড়ে থাকা কাপড়ের ব্যাগ পেয়ে যায়। তাই আপন খেয়ালে সেটাকে নিজের থা”বা আর মুখ দিয়ে নাড়াচাড়া করে খেলছিল। তখনই নিশাদ নামক ছেলেটি এসে আচমকা ব্রুনোকে লা”থি মে”রে ফেলে দিয়ে ব্যাগ ছি”নিয়ে নেয়। লা”থির আ”ঘাতে ব্য”থায় তক্ষুনি কুঁ”কড়ে উঠে এক করুণ আ”র্ত’নাদ করে উঠেছিল ব্রুনো। কিন্তু সে ছেলেটিকে পাল্টা আ”ঘাত করেনি তার মাতৃতুল্যা মালকিন রা”গ করবে বলে। কিন্তু নির্বাক প্রাণীর ওপর করা এই নি”ষ্ঠুর দৃশ্যটি বিন্দুমাত্র এড়ায়নি ইমির প্রখর দৃষ্টি। নিজের প্রাণের চেয়ে প্রিয় ব্রুনোর ওপর আ”ঘা’ত আসায় তক্ষুনি সে প্র্যাকটিস ছেড়ে ঝড়ের বেগে এগিয়ে আসে। তার চেয়ে বয়সে ও উচ্চতায় বেশ বড়, কয়েক বছরের সিনিয়র নিশাদকে অত্যন্ত শক্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে, কেন আ”ঘাত করেছে? আর কোন সাহসেই? জুনিয়রের এহেন সাহসে নিশাদ উল্টোপাল্টা কথা বলে বসে। এমনকি শেষে ইমির বাবা নিয়েও বা”জে মন্তব্য করায় এতক্ষণের আ”ত্মসংযম হারিয়ে বসে সুভগা কণ্যা।

ওদিকে হলের একপাশে এমন বড়সড় ঝা”মেলা হচ্ছে শুনে, পাশের হলরুম থেকে দ্রুত পায়ে ছুটে আসলেন একাডেমির প্রধান কোচ, কুংফু মাস্টার শিজিয়াং। মাস্টারকে হলরুমে প্রবেশ করতে দেখামাত্রই উপস্থিত ছোট-বড় সকল শিক্ষার্থী পরম শ্রদ্ধায় মাথা নত করে ঐতিহ্যবাহী সম্মান প্রদর্শন করল। ব্যতিক্রম রইল কেবল একজন, আর সে হলো ইমি চৌধুরী। সে অ’বাধ্যের মতো সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মাস্টার শিজিয়াং অবশ্য ইমির এই উ’দ্ধ’ত আচরণে বিন্দুমাত্র কিছু মনে করলেন না। ইমি চৌধুরী যে কারো সামনে মাথা ন’ত করে না সে কথা তার জানা। তিনি এসে জিজ্ঞেস করলেন,

–“ক্যা সমস্যা হ্যায়? তুম সব প্র্যাকটিস ছোড়কর ইয়াহাঁ ক্যোঁ খড়ে হো?”

সিনিয়র ছেলেটি বলল,“মাস্টার, ইমি ফির সে পরেশানি কর রহি হ্যায়। উসনে নিশাদ কো মা”রা হ্যায়।”

ঐ সিনিয়র ছেলেটির নালিশ শুনে মাস্টার শিজিয়াং নিজের ঘন ভ্রু জোড়া সামান্য কুঁচকালেন। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় তিনি খুব ভালো করেই জানেন ইমির মতো শা’ন্তশিষ্ট আর আ”ত্মকেন্দ্রিক মেয়ে কখনো বিনা কারণে বা নিজে থেকে কারও সাথে এমন মা”রমুখী ঝা”মেলায় জ’ড়ায় না। তাই এই গুরুতর অভিযোগ শুনেও প্রবীণ মাস্টার বিন্দুমাত্র বি’চলিত হলেন না। তিনি অত্যন্ত শান্ত ও নরম গলায় ইমিকে জিজ্ঞেস করলেন,

–“ইমি, তুমনে নিশাদ কো কিয়োঁ মা”রা?”

–“ইমি চৌধুরী সাফাই দেনা পসন্দ নেহি করতি।”

মাস্টারের চোখে চোখ রেখে সপাটে জবাব দিল ইমি। তার ডাগর ডাগর অক্ষিপটে বিন্দু পরিমাণ ভ”য়ের লেশমাত্র নেই। শিজিয়াং হ”তাশ হলেন। তিনি জানতেন ইমির থেকে এই ধরনের উত্তরই পাওনা ছিল। এদিকে ইমির এই উদ্ধত কথা শেষ হতে না হতেই, হলের প্রধান প্রবেশদ্বারের দিক থেকে এক সুতী”ব্র মেয়েলি কণ্ঠের ব”জ্র-ধমক সবার কর্ণগোচর হলো,

–“ইমি…!”

ইমিসহ হলের উপস্থিত প্রত্যেকেই চ’মকে উঠে চকিতে দরজার দিকে তাকাল। সেখানে মূ”র্তিমতি রা”গের মতো দাঁড়িয়ে আছে জাহানারা, আর তার ঠিক পেছনেই বিস্ময় নিয়ে উঁকি দিচ্ছে তন্নি। মায়ের সেই ক্রু”দ্ধ আর অ”গ্নিশর্মা চাহনি দেখামাত্রই এতক্ষণের অবাধ্য বা”ঘিনী ইমি এতক্ষণে ধীরলয়ে নিজের মাথাটা নিচু করে নিল। তবে মাথা নিচু করলেও, তার কচি চেহারায় কোনো অ’নুতা’প কিংবা ভ”য়ের লেশমাত্র নেই। সেখানে কেবল মায়ের শা”সনের প্রতি এক ধরণের নীরব সম্মানটুকু প্রকাশ পেল। জাহানারা দা”ম্ভিক পায়ে এগিয়ে এসেই মেয়ের বাহুতে হেঁচকা টান মে”রে নিজের দিকে ঘুরালো। ধ”মকে বলে উঠল,

–“তুম ভি ফির সে ব’দতামিজি কর রহি হো?”

কিন্তু এবারও কোনো উত্তর এল না ইমির তরফ থেকে। সে পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে মাথা নিচু করেই দাঁড়িয়ে রইল। ওদিকে নিজের রা”গা”ন্বিত মালকিনকে ওমন রু”দ্রমূর্তিতে দেখে ব্রুনোও ভ”য় পেয়ে লেজ গুটিয়ে ইমির ঠিক পেছনে গিয়ে মুখ লুকাল। ইমি এখনো নিরুত্তর। জাহানারা আবারও ধ”মক দিবে অমনি দরজার নিকট থেকে এগিয়ে আসতে আসতে তন্নি বলল,

–“আহ্ জাহান! বাচ্চাদের কেউ এভাবে ধ’ম’কায়?”

ইমির বাহু ধরে আলতো করে টেনে নিজের কাছে আনল তন্নি। ইমি এখনো মাথা নিচু করে রেখেছে। চেহারায় কোনো বি’চলিত ভাব নেই। জাহানারা নিজের তী”ব্র রা”গটুকু সামাল দিতে খানিকটা অন্য দিকে ঘুরে এক রাশ ত’প্ত শ্বাস ছাড়ল। তারপর আবারও নিজের ক”ঠিন আর বরফশীতল কণ্ঠস্বর মেয়ের দিকে ছু”ড়ে দিয়ে বলল,

–“মাস্টার সে অভি কে অভি মাফি মাঙ্গো।”

ইমি নির্লিপ্ত। মেয়ের এহেন দুঃ’সাহ’স দেখে জাহানারা নিজের ভেতরের পু’ঞ্জী’ভূত রা”গ আর কোনোভাবেই ধরে রাখতে পারল না। সে সপাটে একটা চ”ড় মা”রার জন্য হাত উঠাতে যাবে, অমনি মাস্টার শিজিয়াং অত্যন্ত শান্ত ও পরিপক্ব কণ্ঠে বাধা দিয়ে বললেন,

–“শান্ত হো জাইয়ে, মিসেস চৌধুরী। বাচ্চে হ্যায়। গলতি আসল মে হামারি হি হ্যায়। হমেঁ বাচ্চোঁ পর অউর জ্যাদা নজর রাখনি চাহিয়ে থি।”

নিশাদ তক্ষুনি পাশ থেকে না’লিশ করে বলে উঠল,“আন্টি, আপকি বেটি নে মুঝে লাত মা”রি হ্যায়।”

অভিযোগ শুনে সেদিকে তাকাতেই র”ক্তা”ক্ত ছেলেটিকে দেখে বুঝতে আর বাকি রইল না মেয়ে তার আবারো গ’ন্ডগো’ল পাকিয়েছে। এরমধ্যেই ইমি নিশাদের দিকে ক্র”দ্ধ চোখে চেয়ে গ”র্জে ওঠল,

–“আচ্ছা কিয়া। অউর কভি মে’রে অপ্পা কো হাত লগানা তো দূর, উনকে আস-পাস ভি দিখাই দিয়ে না, তো তুমহারে হাত-প্যায়র তোড়কর চুর-চুর কর দুঙ্গি।”

মেয়ের লা”গাম”হীন স্প”র্ধা দেখে জাহানারা আবারো হাত উপরে তুলল। কিন্তু তন্নি তক্ষুনি ইমিকে ছপ করে নিজের আড়াল করে নিল। তন্নি উল্টে জাহানারাকেই ইমির হয়ে বুঝাতে লাগল। পরিস্থিতি সামাল দিতে মাস্টার শিজিয়াং অন্য সব উৎসুক শিক্ষার্থীদের যার যার প্র্যাকটিসে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে দিলেন। অতঃপর একান্তে জাহানারার সাথে কিছুক্ষণ কথা বলল। মাস্টারের সাথে কথা বলা শেষ করে জাহানারা যখন করিডোরে এলো, ততক্ষণে তন্নি ইমিকে তার কারাতেগি পোশাকটি ছাড়িয়ে সাধারণ চেনা পোশাক পরিয়ে বাইরে নিয়ে এসেছে। জাহানারা আর কোনো কথা বাড়াল না। চরম ক্ষো”ভ আর অ’ভি’মানে মেয়ের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে হিড়হিড় করে টেনে কারাতে একাডেমি থেকে বাইরের দিকে নিয়ে যেতে লাগল। মায়ের এমন আ’ক’স্মিক টানে ইমির পিঠের স্কুল ব্যাগটি এক কাঁধ থেকে পিছলে পড়ে যেতে নিলেও, সে অত্যন্ত চটপটে ভঙ্গিতে নিজেকে সামলে নিল। ওদিকে ব্রুনোও নিজের রা”গা”ন্বিত বড় মালকিনের রু”দ্রমূ”র্তি দেখে ভ”য়ে একেবারে জড়সড় হয়ে, লেজ গুটিয়ে ইমির গা ঘেঁষে ঘেঁষে ধীরপায়ে এগোতে লাগল।

ফরসা আকাশ চিরে যখন তারা আবার সেই ব্যস্ত গ্রামীণ বাজারে এসে উঠল, তখন জাহানারা নিজের দাঁতে দাঁত পিষে চরম রা”গত স্বরে মেয়েকে উদ্দেশ্য করে বলল,

–“আমি তোমাকে লাস্টবার ও’য়ার্নিং করছি ইমি, এখনো আদবকায়দা শিখ। অ’সভ্য’তামি ছেড়ে দাও। না হলে আমি তোমাকে আর বাসা থেকে বেরোতে দিব না। তোমাকে কারাতেও শিখতে দিব না। সামনে তোমার ইন্টারন্যাশনাল কারাতে টুর্নামেন্ট তাই না? দেখব কে নিয়ে যায় পার্টিসিপ্যান্ট করাতে!”

ইমি এখনো নির্লিপ্ত। স্বভাবতই মায়ের ধমকেও সে টুঁটি উচ্চারণ করছে না। চেহারা তার শীতল। তন্নি অনবরত জাহানারাকে শান্ত হতে বলছে। ঠিক তখনই, মেলা প্রাঙ্গণ থেকে ধেয়ে আসা বাতাসের ঝাপটার মাঝে ইমি হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। বিস্মিত গলায় অস্ফুটে আওড়ালো,

–“বাবা আংকেল।”

চলবে,,,,,,,,

সকলে রিয়েক্ট কমেন্ট করো। আল্লাহ বাঁচিয়ে রাখলে ইনশাআল্লাহ আগামীকাল শেষ অংশটুকু পেয়ে যাবে। আমিও মুক্ত হবো। তার আগে, সবাই রিয়েক্ট দিতে কিন্তু ভুলো না।🥹🫶

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply