Golpo romantic golpo জাহানারা

জাহানারা পর্ব ৯৬(শেষাংশ)


#জাহানারা

#জান্নাত_মুন

পর্ব :৯৬(শেষাংশ)

🚫ক’পি করা নিষিদ্ধ

🔞সতর্কবার্তা:

এই গল্পে অ’কথ্য ভাষা এবং স”হিং’সতার উপাদান রয়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সী বা সং’বে’দনশীল পাঠকদের জন্য উপযুক্ত নয়। পাঠক নিজ দায়িত্বে পড়বেন।

শাহাবুদ্দিনের কথার খই ফুটছে এখনো। পলির কোলে গুটিসুটি মেরে থাকা ছোট্ট শিশুটির সাথে তাঁর একতরফা কথোপকথন যেন থামবার নয়। অবুঝ চোখ দুটির অবিচল দৃষ্টি নিজের ওপর থমকে থাকতে দেখে শাহাবুদ্দিনের মনের ভেতর আনন্দের জোয়ার বয়ে গেল। একগাল চওড়া হেসে, আহ্লাদে তিনি বলে উঠলেন,

–“কিয়া নানা বেস, তুহ্য ছিও মে পসন্দ ক্রমুত? বহ ছুস আজ তাম জওয়ান। তুহ্য সিত্য বহ ছুস বহত সুহান লাগিথ, হাহাহা!” (কি নানাভাই আমাকে পছন্দ হয়েছে তো? আমি কিন্তু এখনো ইয়াং আছি। তোমার সাথে আমাকে দারুণ মানাবে। হাহাহা!)

বাচ্চাটির মধ্যে কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না। সে এখনো একইভাবে নিষ্প্রভ নয়নে তাকিয়ে রইল শাহাবুদ্দিনের দিকে। তবে শাহাবুদ্দিনের এই অতর্কিত অট্টহাসি যেন তার যাপনচিত্রে কিছুটা ছন্দপতন ঘটাল। তার নিষ্পাপ, কোমল অবয়বে আলতো করে ফুটে উঠল বিরক্তির এক চিলতে মেঘ। শাহাবুদ্দিন বুঝলেন নাতনি তার বিরক্তবোধ করছে। তিনি ঝুঁকে বাচ্চাটির গায়ে চুমু খাওয়ার জন্য মুখ নামাতে নামাতে আওড়ালেন,

–“ওলে বাবালে বাবালে!”

শাহাবুদ্দিনের ঠোঁট শিশুটির ত্বক স্পর্শ করার আগেই তিনি হতবিহ্বল হয়ে পড়লেন। মখমলের মতো নরম, ওলের তৈরি ওম জড়ানো চাদরটার ভেতর থেকে বিদ্যুৎগতিতে বেরিয়ে এলো একজোড়া ছোট্ট হাত। আর নিমেষের মধ্যে এক হ্যাঁচকা টানে শাহাবুদ্দিনের মাথার লাল ওলের টুপিটি শূন্যে ছুড়ে ফেলে দিল। মুহূর্তের স্তব্ধতা ভেঙে ঘরজোড়া মানুষ একসাথে হোহো করে হেসে উঠল। সেই হাসির রোল বাতাসে ছড়িয়ে দিয়ে আরিফ কৌতুকভরা কণ্ঠে টিপ্পনী কাটল,

–“ইমি চৌধুরী সুন্দ হিরো পসন্দ নাহ গ্যশ।” (ইমি চৌধুরীর পছন্দ হয়নি হিরোকে।)

শাহাবুদ্দিনের চেহারা পাংশুটে হয়ে গেল। তাই সবাই হাসি চেপে গেল। শাহাবুদ্দিন কৃত্রিম গোমড়া মুখ করে ছোট্ট ইমিকে বললেন,“সারি কাশীর গ্যশিভ তেহ, মে সুন্দ জওয়ান তেহ হ্যান্ডসাম হিরো নাহ মিলিভ হু!” (পুরো কাশ্মীর ঘুরেও আমার মতো জোয়ান হেন্ডসাম হিরো পাবে না হু!)

শাহাবুদ্দিনের কথা শুনে সকলে ঠোঁট টিপে হাসল। ইমি এখনো নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে শাহাবুদ্দিনের দিকে। তিনি এইটুকু বাচ্চার কঠিন চেহারা দেখে মজার ছলে বলে উঠলেন,

–“বিলকুল বাপস কুর! সুহ ছু মে সুনেহ যে তুহুন্দ বাও তেহ অসেই তেজ তপেহ হুন্দ। বাপরে বাপ, সুহ ছু কথ দাপট তুহুন্দ বাও হুন্দ! সুহ হুন্দ আখ নজর সিত্য ছি ইনসান প্যান্ট গ্যশান মূত! হাহাহা!” (একদম বাপকা বেটি। শুনেছি তোর বাপও নাকি এমনই তেজি ছিল। বাপরে বাপ! শুনেছি, সেই কি দাপট ছিল তোর বাপের! তার একটা চাউনিতেই নাকি মানুষ পেন্ট ভিজিয়ে দিত! হাহাহা!)

শাহাবুদ্দিন এতক্ষণ মজার ছলে কথাগুলো বললেও এবার তার চেহারা মলিন হয়ে গেল। অদ্ভুতভাবে, ইমির চেহারার কাঠিন্যও যেন হঠাৎ গলে পড়েছে। শাহাবুদ্দিন কোমল গলায় ইমির মায়াভরা চেহারার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন,

–“তুহ্য শায়দ আজ তাম নাহ সামঝিভ তুহ্য কস হুন্দ খুন ছিও। তুহ্য ছিও মাফিয়া বাস হুন্দ খুন। চৌধুরী খানদান হুন্দ খুন ছু তুহুন্দ জিসমস মাঞ্জ বহান। দুনিয়াহস মাঞ্জ নাম কামাওয়িথ দৌলতমন্দ চৌধুরী ইন্ডাস্ট্রি হুন্দ মুস্তাকবিল মালকিন। মাফিয়া বাস হুন্দ আখ ইয়িউথ বেটি ছিও তুহ্য। আগর আজ তুহুন্দ বাও জিন্দ আসেহ, তেহ শায়দ দুনিয়াহস মাঞ্জ সরি সিত্য ভান্দে খুশ আসেহ। মে সুনেহ ছু তুহুন্দ বাও হুন্দ বড় শওক আসেহ কে সুহ হুন্দ আখ বেটি গ্যশি, তিমিস মিসাল যিমিস মাইজিস পাথি। আফসোস, সুহ হুন্দ ইচ্ছা পুরো গ্যশ, মগর সুহ খুদ নাহ রোস। তথ পেঠেই…” (তুই হয়তো এখনো বুঝতে পারিস নি তুই কার র’ক্ত। তুই মাফিয়া বসের র’ক্ত। চৌধুরী বংশের র’ক্ত বইছে তর শরীরে। বিশ্বে নামকরা ধনী চৌধুরী ইন্ডাস্ট্রির ভবিষ্যত মালকিন। মাফিয়া বসের একমাত্র বেটি তুই। যদি আজ তোর বাপ বেঁচে থাকতো তাহলে বোধহয় পৃথিবীর সবার থেকে সবচেয়ে বেশি খুশি হতো। শুনেছি তোর বাপের বড় ইচ্ছে ছিল তার একটা মেয়ে হোক, ঠিক তার মায়ের মতো। আফসোস তার ইচ্ছে পূরণ হলো, তবে সে রইল না। তার আগেই….)

–“আব্বা, আগে ধোঁয়া ওঠা গরম চা খেয়ে নিন। পরে নাতনির সাথে গল্প করুন।”

শাহাবুদ্দিনের কথার মাঝপথে থামিয়ে বলে উঠলো আরিফ। কারণ ইতোমধ্যে জাহানারা চায়ের কাপ নিয়ে লিভিং রুমে এসে উপস্থিত হয়েছে। আরিফ জাহানারাকে লক্ষ করতেই শাহাবুদ্দিনের কথায় লাগাম টেনে ধরল। যদিও তাতে কোনো লাভ হয়নি। জাহানারার কানে এসেছে কথাগুলো। শাহাবুদ্দিন দৃষ্টি ঘুরিয়ে জাহানারাকে দেখে অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। কথাগুলো তিনি খুব নিচু স্বরেই বলছিলেন। জাহানারার জন্য এই বাড়িতে চৌধুরীদের নিয়ে কখনো কথাবার্তা হয় না। বিশেষ করে জাহানারার সামনে। মেয়েটা এসব শুনলে কষ্ট পাবে এই ভেবে। উপস্থিত সকলেই লক্ষ করল জাহানারার হিম শীতল চেহারা। সবসময়ের মতোই এখনো সে নিশ্চুপ আর নির্বিকার। চেহারায় গাম্ভীর্যের এক গাঢ়, দুর্ভেদ্য আবরণ। জাহানারার এহেন নির্লিপ্ততা দেখে কেউ কিছু আন্দাজ করতে পারল না তার মধ্যকার অবস্থা। পরিস্থিতি স্বভাবিক করতে আরিফ বলে উঠল,

–“কিরে জাহান, তুই রান্নাঘরে কি করিস? জানিস না তোর মেয়ে তুই ছাড়া কারো কাছে থাকতে চায় না?”

জাহানারা শাহাবুদ্দিনের হাতে চায়ের কাপ দিতে দিতে নিরাসক্ত কণ্ঠে বলল,“নাদিয়াকে সাহায্য করছিলাম একটু।”

জাহানারা শাড়ির আচলে ভেজা হাতজোড়া মুছে নিল। অতঃপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কাঁধে জড়িয়ে রাখা কাশ্মীরি শালটা আরও ভালোভাবে গায়ে জড়িয়ে নিতে লাগল। আরিফ বলল,

–“দেখ, তোর কাজ করতে হবে না কোনো। তুই তোর মেয়ের কাছে সবসময় থাকবি। নাদিয়া একলাই সব করতে পারে। তবুও ওকে ঘরের সব কাজে সাহায্য করার জন্য লোক রাখা হয়েছে। তুই মেয়েকে ভালো করে দেখাশোনা কর।”

এইটুকু বলে আরিফ রসাত্মক কণ্ঠে বলে উঠল,“তোর মেয়ে একদম তোর মতোই হয়েছেরে জাহান। যা বুঝলাম মেয়েটা তোর মতোই কাদুরী হবে। মনে আছে তোর, ছোটবেলা একবার আমি ক্লাসে পড়া পাড়িনি বলে মাস্টার আমাকে বেত দিয়ে বাড়ি মেরেছিল, তা দেখে তুই ভয়ে ভ্যা ভ্যা করে কেদে সবার সামনে উরাধুরা দৌড়ে ক্লাস থেকে পালিয়ে গিয়েছিলি।”

উপস্থিত সকলে উচ্চ স্বরে হেসে উঠল। জাহানারা কড়া চোখে তাকাতেই আরিফ চুপসে গেল। বাকিরাও হাসি চেপে গেল। জাহানারা এগিয়ে গেল তার সন্তানের নিকট৷ সে ঝুঁকে ইমির দিকে দু’হাত বাড়িয়ে দিতেই মেয়েটার অধর প্রসারিত হলো। তার হাসির ঝলকে বাম গালে দেখা দিল চমৎকার একটি সুক্ষ্ম খাঁজের। সন্তানের নিষ্পাপ হাসি দেখেই জাহানারার চেহারার কাঠিন্য সরে তার অধরে ফুটে উঠল স্নিগ্ধ হাসি। তারও অবশ্য দুগালে চমৎকার টোল পড়ল। তবে মেয়ে তার জন্মদাতার ধাঁচ পেয়েছে৷ বাপের মতোই শুধু বাম গালে টোল পড়ে।

ছোট্ট ইমি হাত-পা ছুঁড়ে তার আবরণী চাদর থেকে হাত-পা বের করে আনল। জাহানারা অতি সন্তর্পণে সন্তানকে কোলে তুলে নিল। ইমি খিলখিল করে হেসে জড়িয়ে ধরল জন্মদাত্রীর গ্রীবা। জাহানারা সন্তানের পেলব গালে চুমু আঁকলো। ইমিও মাকে অনুসরণ করে অবুঝের মতো দন্তহীন মাড়ি দিয়ে মায়ের গাল কামড়ে ধরল এবং ছোট্ট জিহ্বা দিয়ে ভিজিয়ে দিল সেই অংশটুকু। জাহানারা পলির থেকে চাদর নিয়ে মেয়ের শরীর আবৃত করতে করতে সহাস্যে বলল,

–“হয়েছে আম্মা, হয়েছে। অনেক আদর হয়েছে। চলো এবার, নিশ্চয়ই খুব খুদা লেগেছে?”

ইমি ‘আ আ’ শব্দ আওড়ালো। শক্ত করে আহ্লাদে মাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরল। ব্রুনোও যেন কম যায় না। এটা দেখে সেও দু’পা জাহানারার দেহে তুলে ধরে জিহ্বা বের করে আহ্লাদ দেখিয়ে ডাকল তাকেও কোলে নিতে৷ এটা ব্রুনোর স্বভাব সুলভ অভ্যাস, জাহানারা ইমিকে আদর করছে দেখলেই সেও যেন আদর পেতে বাইনা ধরে। জাহানারা এক হাতে ব্রুনোর মাথায় আদর করে দিল। অবুঝ ব্রুনোর চেহারায় খুশির ঝলক দেখা গেল। সে আহ্লাদে জাহানারার শরীরে মাথা ঘেঁষল। জাহানারা স্মিত হাসল। অতঃপর কঠোর কণ্ঠে বলল,

–“আজ কিন্তু একদম দুষ্টুমি করবে না। বাইরে আজ অনেক ঠান্ডা। তুষার পড়ছে খুব। তোমার জন্য রান্না বসিয়ে এসেছি। হলেই গরম গরম খেয়ে চুপটি করে ঘরে বসে থাকবে।”

ব্রুনো যেন বুঝল মালকিনের কথা। সে ভদ্র ছেলের মতো শান্ত হয়ে গেল। জাহানারা বুকের মানিককে আগলে ধরে নিজের ঘরের দিকে চলে যেতে লাগল। ব্রুনোও পিছু নিল। শাহাবুদ্দিন চা খেতে খেতে মেঝেতে তাকালো তার টুপিটি নেওয়ার জন্য। কিন্তু সামনে কোথাও টুপির অস্তিত্ব দেখা গেল না। তিনি উচ্চ গলায় বলে উঠলেন,

–“মে টোপি কুথ গ্যশ?” (আমার টুপিটা কই গেল?)

শাহাবুদ্দিনের কথায় সকলে চারদিকে দৃষ্টি বুলাল। জিয়াদ লক্ষ করল সদর দরজার বাইরে লাল রঙের কাপড় দেখা যাচ্ছে। সে বলে উঠল,

–“ওটা কি দেখা যাচ্ছে? ওটা নাকি।”

শাহাবুদ্দিন বসা থেকে দাঁড়িয়ে সেদিকে তাকাল। সত্যিই সদর দরজার বাইরে টুপিটি পড়ে আছে। মেজাজ হারালেন শাহাবুদ্দিন। চড়া গলায় বললেন,

–“মে টোপি তত্থ কথ গ্যশ?” (আমার টুপি ওখানে কি করে গেল?)

কেউ প্রত্যুত্তর করতে পারলো না। সত্যিই ওখানে কি করে গেল তাদের মনে প্রশ্ন জাগল। তক্ষুনি শাহাবুদ্দিনের নজর পড়ল দেয়ালের আড়াল থেকে ব্রুনো তার দিকে উঁকি মেরে তাকিয়ে আছে। শাহাবুদ্দিনের আর বুঝতে দেরি হলো না এটা কার কাজ। শাহাবুদ্দিন ধমকে উঠলেন,

–“ওরে হত্ছুর!” (ওরে হতচ্ছাড়া!)

শব্দ দু’টো আওড়েই তিনি তেড়ে যেতে উদ্যুত হলেই পরিস্থিতি বেগতিক দেখে চতুর ব্রুনো ভাউ ভাউ ডাকতে ডাকতে ভো দৌড় লাগল। এহেন কান্ডকারখানা দেখে উপস্থিত সবাই ঠোঁট টিপে নিজেদের হাসি সংবরণ করতে লাগল। অন্যথায়, শাহাবুদ্দিন দেখলে আবার খেপে না যায়।

______________

ঘড়ির কাঁটায় বেলা এখন দুপুর বারোটা নাগাদ। কোঠির নিচে দাঁড়িয়ে আছে বাড়ির সকলে। পলি আর জিয়াদ আজ ফিরে যাবে বাংলাদেশ। তারা মোট পনেরো দিন এখানে থেকেছে। তবে আজ তারা দু’জন বাংলাদেশ ফিরবে না। তাদের সাথে নিয়ে যাবে কাব্যকে। জিয়াদ আর পলির পরিণয়সূত্রে বাঁধা পড়ার বয়স মোটে মাস তিনেক। যদিও বিয়ের এতদিন পরও তাদের দাম্পত্য জীবনে অদৃশ্য এক দেয়াল তুলে রেখেছে রমণী। কারণ পলি প্রথমে বিয়েতে মত দেয়নি। সে প্রায় দুইমাস জেল খেটেছিল। তারপর জেল থেকে বেরিয়ে বাপের বাড়িতেই আশ্রয় নিয়েছিল। কিন্তু তখনই সে বিয়েতে রাজি হয়েছিল, যখন জানতে পেরেছিল তার মৃত স্বামীর অবৈধ এক সন্তান আছে! যে কিনা এখন অনাথ, অন্যের সন্তানের পরিচয়ে মানুষ হচ্ছে। সেদিন বুক কেঁপে উঠেছিল পলির। সে আজীবন নিসন্তান থাকবে, কোনোদিন মা হতে পারবে না। সেই পথ সে নিজেই বন্ধ করেছে। কিন্তু যখন জানল তার স্বমীর অবৈধ সন্তানের কথা, তখনই এই রমণীর মাতৃমন উতলা হয়ে উঠল। তাই আর কোনোকিছু না ভেবে সব অতীত গ্লানি মুছে বিয়ে করল জিয়াদকে। যে তার প্রাক্তন প্রেমকি।

হ্যা, কাব্য আহসানই সেই অবৈধ সন্তান। যে জন্মের পর হারিয়েছে মাকে, পায়নি পিতৃপরিচয়। যে মানুষ হচ্ছিল শেখ বাড়িতে তার মায়ের আপন মানুষদের কাছে। কথা ছিল জিয়াদ বড় হয়ে বিয়ের পর কাব্যকে নিজের সন্তানের পরিচয়ে মানুষ করবে। কিন্তু নিয়তির দাবাখেলায় চাল বদলে গেল সেদিন, যেদিন কাশ্মীর থেকে ছুটে বাংলাদেশ আসল আরিফ। এসে জানাল তার স্ত্রীর শারীরিক অসুস্থতার জন্য সাত মাসেই সন্তান ভূমিষ্ট হয়। আর জন্মের পরই মা’রা যায়। ছোট্ট রমণী নাদিয়া অল্প বয়সে সন্তান হারানোর শোকে তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা বেহাল হয়ে পড়ছিল। নাদিয়ার সেই শূন্য বুক আর ক্ষ’তবি’ক্ষ’ত মাতৃত্বকে একটুখানি সান্ত্বনা দিতেই আরিফ সাময়িক সময়ের জন্য কাব্যকে নিজেদের কাছে নিয়ে এসেছিল। কথা ছিল জিয়াদ বিয়ে করলে কাব্যকে তাদের কাছে দিয়ে দিবে। ততদিনে হয়তো-বা তাদেরও একটি সন্তান হয়ে যাবে! আরিফ ছেলেটা কাছের চেনা মানুষ, তদুপরি আরিফের শ্বশুরবাড়িও শেখ বাড়ির ঘনিষ্ঠ আপনজন। তাই এটাকে শেখ বাড়ির মানুষও ভালো সিদ্ধান্ত মনে করেছিল। বাচ্চাটাও ততদিন একটা মা-বাবা পাবে। তাই আরিফের হাতে তুলে দিয়েছিল কবিতার সন্তানকে। কিন্তু এখন সময় এসেছে বাড়ির সন্তান বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য।

ওদিকে, বিদায়ের এই অন্তিম ক্ষণে নিজের পালিত সন্তানকে বুকের পাজরে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে উ’ন্মা’দের মতো ডুকরে কাঁদছে নাদিয়া। আরিফ সহ সকলে বুঝানোর চেষ্টা করছে নাদিয়াকে। কিন্তু রমণী শুনতে বা বুঝতে নারাজ। কাব্য বুঝতে পারছে না পরিস্থিতি কি! তবে মায়ের কান্না দেখে তারও কান্না পেল। সে মায়ের গালে চুমু খেয়ে বলল,

–“তুমি কাঁদছ কেন আম্মি? আমি তো কয়েকদিনের জন্য নতুন আম্মু-আব্বুর সাথে বাংলাদেশ বেড়াতে যাচ্ছি। আমি বেড়িয়ে আবার চলে আসব।”

অবুঝ সন্তানের কথা শুনে কান্না আরও বাড়ল নাদিয়ার। জাহানারা তার বুকের মানিককে কোলে নিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে আছে। সে ইশারায় পলিকে বলল নাদিয়াকে বুঝ দিতে। পলি কালো বোরকার নিকাপ উপরে তুলে নাদিয়ার কাছে গেল। নাদিয়ার বাহুতে হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে বলল,

–“কেঁদো না আপা। আমি জানি কাব্যকে তুমি কতো ভালোবাস। ও তো তোমারই সন্তান। আমি তো একেবারে কেড়ে নিচ্ছি না। আমি যেমন কাব্যর মা, তুমিও কাব্যর মা। বরং আমার থেকে বেশি তার উপর তোমার অধিকার আছে। তুমি ওকে বুকে আগলে বড় করেছ। তুমি সারাজীবন ওর আরেকটি মা হয়েই থাকবে। কিন্তু ওকে যে এবার আমাদের সাথে নিয়ে যেতে হবে। বাবার শরীর ভালো যাচ্ছে না। তিনি চাইছেন জীবনের শেষ সময়টা উনার মেয়ের শেষ স্মৃতিটুকু আগলে বাঁচতে। তুমি একদম মন খারাপ করো না। আমরা সময় সুযোগ পেলেই কাব্যকে নিয়ে তোমার কাছে আসব। তুমি আর আরিফ ভাইও যাবে আমাদের বাড়িতে, বেড়িয়ে আসবে। আর কেঁদো না বোন আমার।”

তবুও মন মানে না নাদিয়ার। পলিকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে বলতে লাগল,“আমার কোনো সন্তান নেই, কোনোদিন সন্তান জন্ম দিতে পারব কিনা সেটাও এখনো জানি না। আমি ওকে আমার সন্তানের চেয়েও বেশি কিছু মনে করি। ওকে আগলে ধরেই আমি বেঁচে ছিলাম। ওকে ছাড়া আমি বাঁচব কেমনে?”

পলিও শক্ত করে নাদিয়াকে জড়িয়ে ধরে পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,“আমি জানি তো। আমি কথা দিচ্ছি কিছুদিন পর আমরা আবার বেড়াতে আসব কাব্যকে নিয়ে। আর কেঁদো না আপা।”

আরিফ ছেলেকে শেষবার বুকে জড়িয়ে আদর করল। অতঃপর নাদিয়াকে নিজের বুকে টেনে নিয়ে সান্ত্বনা দিতে লাগল। শাহাবুদ্দিন সহ তাদের পরিবারের সকলে কেঁদে শেষ বিদায় জানল কাব্যদের। পলি এগিয়ে এসে জাহানারার কোলের ছোট্ট ইমির কপালে চুমু খেলো। ইমি ফ্যালফ্যাল করে পুরো দৃশ্যটা দেখছিল। এখন সে পলির দিকে তাকাল। পলি ইমির মাথায় আদুরে হাত বুলিয়ে দিল। জাহানারাকে বলল,

–“ভাবি আসি। আপনি সাবধানে থাকবেন। মেয়েটাকেও দেখে রাখবেন। চোখের আড়ল কইরেন না কখনো।”

জাহানারা মাথা নাড়াল। আলতো করে এক হাতে পলিকে বুকে টেনে বলল,“তোমরাও ভালো থেকো। আমার মা-বাবা, বড় আম্মু, বড় আব্বু সহ সবাইকে দেখেশুনে আগলে রেখো। সময় পেলে সবাইকে নিয়ে আবারও এসো।”

–“আপনি চিন্তা করবেন না। আমি সবাইকে নিজের পরিবারের মতো আগলে রাখব।”

জিয়াদ এগিয়ে এসে বোনকে জড়িয়ে ধরল। আবেগি কণ্ঠে বলল,“জাহান আপু, তুমি ভালো থেকো। কখনো যদি মনে হয় বাংলাদেশ ফিরবে তবে আমাকে একটিবার বলো। আমি এসে তোমাদের দুজনকে নিয়ে যাব।”

জাহানারা স্মিত হাসল। ছোট ভাইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,“আচ্ছা। তুইও এবার সংসারী হ। এখন তোর বউ-বাচ্চা আছে ভুলে যাস না। এখন আর ছন্নছাড়া হয়ে ঘুরে বেড়াস না। বাড়ির ব্যবসায় হাত দে। এখন তোর উপর পুরো পরিবারের দায়িত্ব। জিতু ভাইকেও দেখে-শুনে রাখিস। চিন্তা হয় আমার।”

–“তুমি চিন্তা করো না, আমি সবাইকে দেখে রাখব।”

কথা শেষ করে জিয়াদ ভাগিনীর কপালে চুমু খেল। হেসে বলল,“মামা, মায়ের খেয়াল রেখো কেমন? আর একদম মায়ের লক্ষী মেয়ে হয়ে থাকবে। আমি আবার আসবো তোমাদের দেখতে।”

ইমি একবার নিজের মায়ের দিকে তাকিয়ে মায়ের শুভ্র মুখশ্রীখানা দেখল। অতঃপর সামনের জিয়াদকে দেখল। পেলব হাতখানা বাড়িয়ে ছুয়ে দিল জিয়াদের মুখ। জিয়াদ ইমির ছোট্ট হাতখানা ধরে সেখানে চুমু খেলো। তারপর জাহানারার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা ব্রুনোর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,

–“মা-বোনকে দেখে রেখো ব্রুনো। ওদের দায়িত্ব তোমার কাছে আমি দিয়ে গেলাম। আরেকবার আসলে আবারও তোমার জন্য মজা নিয়ে আসব। কেমন?”

ব্রুনো খুশি হলো। আনন্দে সে ডাকল কয়েকবার। কাব্যও এসে আদর করল ব্রুনোকে। ব্রুনোও কাব্যর গায়ে শরীর ঘেঁষে আদর করে দিল। অতঃপর জিয়াদ বিদায় নিয়ে গাড়িতে ওঠে বসল। গাড়িটা চলে যেতে লাগল তুষারের আস্তরে মুড়ানো শুভ্র রাস্তাটি মাড়িয়ে। সকলে তাদের চলন্ত গাড়ির দিকে ততক্ষণ তাকিয়ে থাকল যতক্ষণ চোখের আড়াল না হয়। নাদিয়া কাঁদতে কাঁদতে এক পর্যায়ে জ্ঞান হারালো। সকলে ওকে ধরে নিয়ে ঘরে ফিরে আসল। জাহানারাও দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মেয়েকে বুকের সাথে লেপ্টে ঘরের ভেতরে পা রাখল।

*

*

*

দিন গড়িয়ে বিকেল হলো। আজ এই কদিনের তুলনায় বেশি তুষারপাত হচ্ছে। বাইরে হার কাঁপানো কনকনে ঠান্ডা। সকাল গড়িয়ে দুপুরের পর একটু সূর্যের সোনালী আলো কুয়াশা ভেদ করে উঁকি দিয়েছিল ধরিত্রীর বুকে। তাও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। জাহানারা তারমধ্যেই মেয়ের ভেজা কাঁথা, জামা-কাপড়গুলো ধুইয়ে রোদে দিয়েছিল ব্যালকনিতে। তারপর হাতের কিছু কাজও সেড়ে নিল। সব কাজ কোনোমতে শেষ করে সে এখন গিয়ে পাশের কোঠি থেকে নাদিয়ার মার থেকে মেয়েকে নিয়ে আসল বুকের দুধ খাওয়ানোর জন্য। ইদানীং এই রমণী মেয়েকে সামলে ঘরের বাকি কাজগুলো করতে হিমশিম খাচ্ছে। জিয়াদরা বাংলাদেশ ফিরেছে দুদিন হলো। পলি থাকতে রমণীর চিন্তা ছিল না কোনো। সারাদিন পলি আগলে রেখেছে তার দুধের শিশুকে। শুধু সময় করে এসে সে দুধ খাইয়ে গেছে। আজকাল জাহানারা মাঝেমধ্যে মেয়ের উপর বড্ড ত্যাক্ত হয়। এইটুকুনি মেয়েটা তার, একদম বাবার মতো জেদি আর রাগী স্বভাবের হয়েছে। সে ছাড়া কারো কোলে বেশিক্ষণ থাকতে চায় না। তবুও রেখে আসলে চিৎকার করে কেঁদে ভাসায়।

জাহানারা ঘরে এসে মেয়েকে কোলে নিয়ে বিছানায় এক পা তুলে বসল। আজ সারাদিন পর্যাপ্ত বুকের দুধ খাওয়াতেে পারেনি মেয়েকে। তাই তার স্তনে দুধ জমে ব্যথায় টনটন করছে। জাহানারা শাড়ির আচল সরিয়ে ব্লাউজের দু’টো বোতল খুলে মেয়েকে স্তন্যপান করাতে লাগল। ছোট্ট ইমি ছোক ছোক করে তৃপ্তিতে দুধ খেতে লাগল। জাহানারা বুঝল তার মেয়েটার অনেক খিদে পেয়েছিল, দেখো তাই কেমন কেঁদেকুটে চোখমুখ ফুলিয়ে ফেলেছে। কান্নার তোড়ে মেয়েটার পেলব চেহারার গমরঙা রঙটাও এখন গাঢ় রক্তিম বর্ণ ঠেকছে। জাহানারা ফুস করে ক্লান্তির নিশ্বাস ত্যাগ করল। শাড়ির আচল দিয়ে মেয়ের ভেজা নেত্রপল্লব মুছে দিল। মুখ বাড়িয়ে মেয়ের মাথায় চুমু খেল। হাত বুলিয়ে মেয়ের সারাদেহ পরখ করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই দুধ খেতে খেতে ইমি মায়ের কোলে ঘুমিয়ে পড়ল। জাহানারা মেয়েকে ঘুমিয়ে যেতে দেখে ওঠে গিয়ে দোলনায় শুয়ে ওমের চাদর টেনে দিল তার ছোট্ট দেহের উপর। এখন মেয়ে যতক্ষণ ঘুমাবে এই সুযোগে রমণী গোসল সেড়ে পরিষ্কার হয়ে যাবে। আজ সারাদিন কাজের চাপে ভালো করে তার খাওয়াও হয়নি। তাই তার এখন খুব জোরে খিদেও পেয়েছে বটে।

জাহানারা আর সময় অপচয় করলো না। কাপড়চোপড় হাতে নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াবে তখনই মাথায় আসল, মেয়ের শুকনো কাপড়গুলো এখনই ঘরে এনে ফেলা উচিত। না হলে তুষারপাতের শীতল আদ্রতায় কাপড়গুলো আবারও ভিজে উঠবে। জাহানারা এগিয়ে গেল বেলকনিতে। টানিয়ে রাখা দড়িতে কাপড়গুলো মেলে দিয়ে গিয়েছিল সে। ছুঁইয়ে দেখল কিছু কাপড় শুকিয়েছে। আবার কিছু আধ ভিজা। জাহানারা টেনে কাপড়গুলো নিতে লাগল। তক্ষুনি আচমকা তার বেখেয়ালি দৃষ্টি বাইরে স্থির হলো। সেখানে কোঠির নিচে বরফ ঢাকা জমিনের উপর বসে আছে ব্রুনো। গায়ে একটা উষ্ণ কাপড় ছিল তাও তুষারপাতের ফলে ভিজে গেছে। জাহানারার বুক কেঁপে উঠল। কাজের জন্য ভুলেই গিয়েছিল আজ যে দুপুর বেলা সে ব্রুনোকে শাস্তি দিয়েছে। কারণ ব্রুনো আবারও আজ রমণীর কথার অবধ্য হয়ে পাকনামি কান্ড ঘটিয়েছে।

জাহানারা কাজের চাপে যখন ব্যস্ত ছিল তখন ব্রুনো সকালে বেলকনিতে খেলা করছিল। তখন সে দেখে নিচে একটি ভেড়া তার মালকিনের বাগানের চন্দ্রমল্লিকা ফুলগাছটা প্রায় খেয়ে ফেলেছে। ব্রুনো গর্জে তেড়ে নিচে পৌঁছানোর আগেই ভেড়াটা আগেভাগে পালিয়ে যায়। কিন্তু ব্রুনো তো হার মানার পাত্র নয়। সে তর্কেতর্কে ছিল, যেই ভেড়াটা দুপুরের দিকে আবারো ঘাস খেতে বাইরে বেরিয়েছে অমনি ব্রুনো ছুটে গিয়ে আচ্ছা মতো কামড়ে দিয়ে এসেছে। অতঃপর ভেড়ার মালিক এসে নালিশ করে গেছে জাহানারার কাছে। জাহানারা রাগে ব্রুনোকে তাই শাস্তি দিয়েছিল ঘরে না ঢুকতে। ব্রুনোও মালকিনের উপর অভিমান করে এখনো সেখানেই বসে আছে। জাহানারা চোখ বুঁজে তপ্ত শ্বাস ছাড়ল। ক্ষুদ্ধ কণ্ঠে বিড়বিড়িয়ে আওড়ালো,

–“একদম বাপটার মতো হয়েছে!”

জাহানারা কাপড়গুলো ঘরে রেখে দ্রুত নিচে নেমে এলো। বাইরে তুষার পড়ছে অনবরত। জাহানারা ব্রুনোর কাছে যেতেই ব্রুনো চোখ তুলে আড়চোখে এক পলক মালকিনের দিকে তাকাল। তারপর আবারো দৃষ্টি নত করে রাখল। শীতে বেচারার শরীর কাঁপছে। জাহানারা আহ্লাদ না দেখিয়ে মেকি রাগ নিয়ে বলল,

–“সারারাত কি তুমি এখানে থাকবে? ঘরে চল এখন।”

ব্রুনো কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। জাহানারা বুঝতে পারল ব্রুনোর অভিমানের পাল্লা আকাশচুম্বী। তাই সে বসল পাশে। মাথায় হাত বুলিয়ে নরম গলায় বলল,“হয়েছে অনেক অভিমান। এবার ঘরে চলো। এমন দুষ্টামি কর কেন যে শাস্তি পেতে হয়? এমন কাজ যেন আর কোনোদিন না হয় ব্রুনো।”

মৃদু কণ্ঠে দু’বার ডাকল ব্রুনো। জাহানারা ব্রুনোর মাথায় লেগে থাকা তুষার কণাগুলো মুছে সেথায় চুমু খেলো। তাতেই যেন আহ্লাদে গলে পড়ল ব্রুনো। সে জাহানারার শরীর ঘষল। জাহানারা বলল,“এবার রুমে চলো।”

ব্রুনোর অভিমান সম্পূর্ণ গলল না। জাহানারা বুঝল এই ছেলেকে কোলে করে ঘরে না নিয়ে গেলে এখন কোথাও যাবে না। মূলত এখন কোলে ওঠার বাহানায় অভিমান দেখাচ্ছে। জাহানারা কোনোমতে বিশাল দেহী ব্রুনোকে বাচ্চাদের মতো কোলে নিল। অতঃপর খুব কষ্ট করে ঘরে নিয়ে আসল। তাতেই যেন রমণী হাঁপিয়ে উঠল। মেঝেতে মখমলে পাটির উপর ব্রুনোকে সে নামিয়ে ব্রুনোর পরনের ভেজা পোষাকটি খুলে দিল। জাহানারা নিজ সন্তানের মতোই ইমির পোষাক বানানোর সময় ব্রুনোর জন্যও নিজ হাতে ওলের সোয়েটার বুনে, আর সেগুলোই তাকে পরায়।

জাহানারা তোয়ালে দিয়ে ব্রুনোর শরীর মুছে দিয়ে তার সারা শরীরে থকথক করে সরিষা তেল মেখে দিল। তারপর ব্রুনোকে নতুন আরেকটি উষ্ণ সোয়েটার পরিয়ে দিল। ব্রুনো শীতের তোপে এখনো কুঁকড়ে আছে। নিশ্বাস তার ঘনঘন পড়ছে। বোধহয় বেশ অনেকটা সময় ধরে এই ঠান্ডার মধ্যে বাইরে থাকায় শ্বাসকষ্ট দেখা দিয়েছে।

ব্রুনোর এহেন নাজেহাল দশা দেখে জাহানারার গলায় কান্নার দলা আঁটকে এলো। যেন এটা কোনো প্রাণী নয়, নিজেরই সন্তান। তবুও রমণী নিজেকে সামলে, ব্রুনোকে কিছুক্ষণ বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করল। ব্রুনোও শান্ত ছেলের মতো মায়ের বুকের মধ্যে চুপটি করে মুখ গুঁজে রইল। তারপর জাহানারা ব্রুনোকে ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। রান্নাঘর থেকে গরম-গরম পুষ্টিকর স্যুপ এনে বাটিটা ব্রুনোর সামনে রেখে বলল,

–“একদম দুষ্টুমি না করে লক্ষী ছেলের মতো গরম স্যুপটা খেয়ে নাও। আমি গোসলে যাচ্ছি। তুমি এখান থেকে কোথাও যাবে না, কোনো শব্দ করবে না। তোমার বোন ঘুমচ্ছে। ওকে নিহাস করো। আমি যাচ্ছি।”

ভদ্র ছেলের মতো মাতৃতুল্যা মালকিনের কথা শুনল ব্রুনো। শান্ত ছেলের মতো আরাম করে গরম স্যুপটুকু আয়েশ করে খেতে লাগল। জাহানারা শাওয়ার নিতে চলে গেল। বেশ খানিকটা সময় নিয়ে জাহানারা গোসল করতে লাগল। ব্রুনো খাবার শেষ করে দোলনার কাছেই চুপটি করে বসে নিজ দায়িত্ব পালন করতে লাগল। কিন্তু হঠাৎ করেই ঘুমের মধ্যে ছোট্ট ইমি ঠোঁট ভেঙে চিৎকার করে কেঁদে উঠল। ব্রুনো ছুট্টে গিয়ে দোলনার উপর দু’পা তুলে উঁকি দিলো। ইমিকে কাঁদতে দেখে সে কোমল গলায় ডাকল,“ভাউ ভাউ।”

অন্যসময় হলে ব্রুনোর গলা শুনেই ছোট্ট ইমি শান্ত হয়ে যায়। কিন্তু আজ তার কান্না থামালো না। টলমটলে ডাগর ডাগর চোখে তাকিয়ে চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। ব্রুনো বিচলিত হয়ে পড়ল। সে ছুটে গিয়ে কাউচের উপর থেকে ঝুনঝুন শব্দ করা রঙিন খেলনাটা মুখে তুলে নিয়ে ফের ফিরে এলো। আবারো সে দু’পা দোলনার উপরে তুলে ইমির দিকে তাকিয়ে ঝুনঝুনিতে শব্দ করতে লাগল। যেন ছোট্ট ইমি তার অবাধ্য কান্না থামায়। কিন্তু না, ইমি কিছুতেই কান্না থামাচ্ছ না। মেয়ের এই বুকফাটা কান্নার আওয়াজ ওয়াশরুমের ভারী দেয়াল ভেদ করে জাহানারার কানে পৌঁছাতেই তার ভেতরের মাতৃহৃদয় চনমন করে উঠল। রমণী দ্রুত গায়ে শাড়ি জড়িয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসল। ক্ষিপ্র হাতে গামছা দিয়ে চুলগুলো পেচিয়ে দোলনা থেকে মেয়েকে তুলে কোলে নিল। তখনই সে অনুভব করল, ইমির পরনের ডায়াপার ভারী হয়ে লোড হয়ে গেছে, আর সেই স্যাঁতসেঁতে শীতল আর্দ্রতায় ভিজে একাকার হয়ে গেছে মেয়ের পেলব, তুলতুলে শরীর। জাহানারা মেয়ের কাপড় খুলে শরীর মুছে দিল। অতঃপর নতুন উষ্ণ কাপড় পরিয়ে দিল। ইমি তবুও কেঁদে যাচ্ছে। জাহানারা মেয়েকে কোলে নিয়ে দোল খাওয়াতে খাওয়াতে বলতে লাগল,

–“কাঁদে না আমার মা। কি হয়েছে আমার আম্মার? এইতো তোমার মা এখানে। কাঁদে না মানিক আমার।”

তবুও তিন মাসের ছোট্ট ইমি ফুপিয়ে যাচ্ছে অনবরত। জাহানারা শাড়ির আঁচল দিয়ে তার নাজুক মেয়ের অশ্রুসিক্ত নেত্রপল্লব মুছে বুকের দুধ পান করতে দিল। ইমি অল্পক্ষণ মায়ের বুকের সুধা টেনে খানিক তৃষ্ণা মিটতেই স্তনবৃন্ত ছেড়ে দিল। আর্দ্র ডায়পারের এই অবাধ্য অস্বস্তিটুকু না থাকলে মেয়েটা আরও কিছুক্ষণ আরাম করে ঘুমাতো। জাহানারা বসা থেকে ওঠে দাঁড়াল। মায়ের উষ্ণ বক্ষে লেপ্টে থাকা ছোট্ট অবুঝ প্রাণটুকু এখনো কিঞ্চিৎ ফুপিয়ে যাচ্ছে, যার কারণে নধর গোলাপের পাপড়ির ন্যায় রক্তিম ও সরু অধরযুগল ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠছে।

জাহানারা নিজের অস্তিত্বের এই অনুপম স্পন্দনটুকুকে বুকের গভীরে নিবিড় আলিঙ্গনে আগলে ধরে রুম জুড়ে মন্থর পায়ে পদচারণা করতে লাগল। অনুগত ব্রুনোও ছায়ার মতো জাহানারার পদাঙ্ক অনুসরণ করছে। সে তার গ্রীবা উঁচিয়ে ক্রমাগত উঁকি দিয়ে বোনের পেলব মুখশ্রীখানা দেখার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। জাহানারা অনুধাবন করতে পারছে মেয়ে তার আবারও ঘুমের দেশে পাড়ি জমাবে। রমণী মেয়েকে বাহুডোরে জড়িয়ে ধরে ঈষৎ দোলা দিতে লাগল। সে তার মানিকের পেলব পৃষ্ঠদেশে আলতো হাতের স্পর্শে ঘুমের জাদু বুনে দিতে দিতে গুনগুন গুঞ্জনে সুর বাঁধল,

“ওরে আমার ময়না পাখি

চিনোনি তারে

পাখি চিনোনি তারে..

যে জন আমার মন হারিলো

বাঁশির ও সুরে

পাখি চিনোনি তারে..!”

চলবে,,,,,,,,,

হাহ্! তবে শেষ প্রান্তে চলেই আসলাম। খুব শীগ্রই শেষ পর্বটি পেয়ে যাবেন। পর্বটি লেখার জন্য আমি ভীষণ এক্সাইটেড। এই পর্ব যারা পড়েছেন সকলে রিয়েক্ট কমেন্ট করুন। কেমন হয়েছে জানাবেন। ভুল ত্রুটি থাকলে ধরিয়ে দিয়েন, আমি পরে সংশোধন করে নিব।

আর হ্যা, পুরো উপাখ্যান জুড়ে আপনাদের কোন জায়গাগুলো এখনো অপরিষ্কার তা আমাকে জানাতে পারেন। যদিও নেক্সট অর্থাৎ লাস্ট পর্বে অনেক কিছু জানতে পারবেন। যা আমি এখনো উল্লেখ করিনি কিংবা ধোঁয়াশা রেখেছি। তবুও আপনারা আপনাদের প্রশ্নগুলো জানাতে পারেন। আমি খুব শীগ্রই শেষ পর্বটি দিয়ে দিব।

হ্যাপি রিডিং।🥹🫶

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply