Golpo romantic golpo জাহানারা

জাহানারা পর্ব ৯৬(প্রথমাংশ)


#জান্নাত_মুন

পর্ব :৯৬(প্রথমাংশ)

🚫ক’পি করা নিষিদ্ধ

🔞 সতর্কবার্তা:

এই গল্পে অ’কথ্য ভাষা এবং স”হিং’সতার উপাদান রয়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সী বা সং’বে’দনশীল পাঠকদের জন্য উপযুক্ত নয়। পাঠক নিজ দায়িত্বে পড়বেন।

কুয়াশা আর মেঘের চাদরে ঢাকা আকাশটা যেন একদম মাটির কাছাকাছি নেমে এসেছে, যার নিচে নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে লন্ডনের পাতাশূন্য ন্যাড়া গাছগুলো। জানুয়ারির এই হাড় কাঁপানো কনকনে শীতে বিকেল সাড়ে চারটা বাজতেই পুরো শহর জুড়ে এক অদ্ভুত আঁধার নেমে এসেছে। নিয়ন বাতির আবছা আলোয় ভিজে থাকা পিচঢালা পথগুলো কৃষ্ণসর্পের পিঠের ন্যায় চকচক করছে। আর জবুথবু হয়ে কোটের কলার উঁচিয়ে মেতে থাকা মানুষগুলো দ্রুত ফিরছে ঘরের উষ্ণতায়। প্রকৃতির এই নিথর, ধূসর রূপ যেন পুরো শহরের ব্যস্ততাকে এক কুহকী থমথমে চাদরে মুড়িয়ে দিয়েছে।

যুক্তরাজ্যের এই ঐতিহাসিক রাজধানীর কৃষ্ণবর্ণ ম্যাকাডাম রাস্তার বুক চিরে রাজকীয় শৃঙ্খলায় ছুটে চলা লাল ডাবল-ডেকার বাস আর টিউব রেলের চাকাগুলো মনে করিয়ে দেয় এই প্রাচীন সাম্রাজ্যের যান্ত্রিক শ্রেষ্ঠত্ব। গথিক স্থাপত্যের শতাব্দী প্রাচীন দালানগুলোর গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা কাঁচের গগনচুম্বী অট্টালিকাগুলো যেন ইতিহাস আর আধুনিকতার এক আশ্চর্য মেলবন্ধন। ডাবল কোটের পকেটে হাত গুঁজে, কানে হেডফোন চেপে যান্ত্রিক নিয়মে ছুটে চলা প্রতিটি মানুষের ব্যস্ততায় মিশে আছে এক অভিজাত নাগরিক নিস্পৃহতা। শীতের এই তীব্র স্তব্ধতার মাঝেও আন্ডারগ্রাউন্ডের নিখুঁত গতি আর আধুনিকতম জীবনযাত্রার স্পন্দন জানান দেয়, প্রকৃতি থমকে গেলেও এই তিলোত্তমা নগরী কখনো থামতে জানে না।

লন্ডনের অন্যতম শীর্ষস্থায়ী ধনী ব্যবসায়ী এবং ক্ষমতাবানদের মধ্যে পলক কাইসার অন্যতম। এই শহরের অতলগহ্বর পর্যন্ত গেঁথে আছে তার ক্ষমতার শিকড়। এখানের আন্ডারওয়ার্লডের সর্বোচ্চ ক্ষমতাশালী হওয়ার জন্যই পলক কাইসারকে লন্ডনের ডন বলা হয়। এই ডনের নাম শুনলেই পুরো লন্ডন কেঁপে ওঠে। যার সামনে প্রয়াত মাফিয়া বস ইফান চৌধুরী ব্যতিত আজ পর্যন্ত কেউ চোখ তুলে তাকিয়ে শির উঁচিয়ে কথা বলার দুঃসাহস দেখায়নি।

দেশ বিদেশে পলক কাইসারের বৈধ-অবৈধ নানান ব্যাবসা ছড়িয়ে থাকলেও তার প্রধান ঘাঁটি লন্ডন শহরে। এই শহরের বুকে শির উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার কাঁচের ৭০তলা ভবনের এক এক্সক্লুসিভ গগনচুম্বী অট্টালিকা। ভবনের চূড়ায় ঝলঝল করছে “PK Industry” লেখাটা। এই ভবনের ৫২ তলা পর্যন্ত রয়েছে কর্পোরেট অফিস, ক্যাসিনো সহ নানান বৈধ-অবৈধ কারবার। ভবনের পঞ্চান্ন তলার বিশাল বড় এক্সক্লুসিভ পেন্টহাউজে পলক কাইসারের রাজত্ব। বাকি অ্যাপার্টমেন্টগুলো তার বিশাল, অতন্দ্র গার্ড বাহিনীর জন্য বরাদ্দ।

পুরো শহর আধার আর কুয়াশার আড়ালে মুখ লুকানোর কিছুক্ষণ পরই পিকে ইন্ডাস্ট্রির বিশাল ভবনটির সামনে কয়েকটি কালো মার্সিডিজ এসে আওয়াজ তুলে থামল। সহসা পিছনের গাড়িগুলো থেকে একদল কালো পোশাকধারী গার্ড নেমে এসে সামনের ভিআইপি গাড়ির দরজা খুলে দিল। সেখান থেকে বড্ড অনিহা নিয়ে নেমে এলো জিতু। পরনে তার বিলেতি বেশভূষা। দীর্ঘ এগারো ঘণ্টার ক্লান্তিকর আকাশপথ পাড়ি দিয়ে আজই সে হিথরোতে পা রেখেছে। কথা ছিল সে নিজের আদুরে ছোট বোনের বিয়ের বহুদিন পর, এই প্রথমবার দেখতে আসবে। কিন্তু এয়ারপোর্টে নামতেই সে দেখে একগাদা গার্ড গাড়ি নিয়ে তার জন্য অপেক্ষা করছে তাকে ড্রপ করে নিয়ে যাওয়ার জন্য। অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও গার্ডের সাথেই এয়ারপোর্ট থেকে সোজা এখানে এসে পৌঁছেছে সে৷

গাড়ির হেডলাইটের আলোয় চারপাশ ঝলমল করছে। জিতু দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেখল আঁধার নামার সাথে সাথেই চারপাশ ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়েছে। বিকেল থেকেই আকাশ ফুঁড়ে নামছে ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টির সাথে শ্বেতশুভ্র তুষার কণা। একজন গার্ড মাথা নুইয়ে সম্মানের সহিত জিতুকে বলল তাকে অনুসরণ করতে। জিতু আর এক মূহুর্ত নিচে দাঁড়াল না। আলতো হাতে মাথার চুলগুলো থেকে তুষারকণাগুলো ঝেড়ে ফেলতে ফেলতে সে ভারী বুটের শব্দ তুলে সামনে এগিয়ে গেল। বাইরে প্রচন্ড ঠান্ডা। আটলান্টিক থেকে ধেয়ে আসা প্রচণ্ড উন্মত্ত হিমেল বাতাস যেন এই প্রাচীন শহরকে এক টুকরো বরফখণ্ডে পরিণত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এই মূহুর্তে কেউ বাইরে দাঁড়িয়ে থাকলে নির্ঘাত ঠান্ডায় জমে যাবে।

—

রাজকীয় ভঙ্গিতে ক্রিস্টাল ওয়াইনের গ্লাস হাতে নান্দনিক কাউচে বসে আছেন মাফিয়া ডন পলক কাইসার। তার দু’পাশে বসে আছে গ্যাংস্টার মাহিন চৌধুরী এবং ইনান খন্দকার। সামনের কাউচে বসে মনযোগ দিয়ে ল্যাপটপ ঘাটছে মীরা। পুরো লাউঞ্জ জুড়ে তাদের সেই গম্ভীর, অতিমানবীয় কণ্ঠধ্বনি ছাড়া আর একটা বাড়তি সুতোর শব্দও তৈরি হচ্ছে না। সমগ্র লাউঞ্জ ঘিরে যন্ত্রমানবের মতো সটান হয়ে অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে আছে একদম গার্ড। আর মাথার ওপর সিলিং থেকে ঝুলতে থাকা বিশাল রাজকীয় ঝাড়বাতিটির আলো লাউঞ্জের প্রতিটি কোণকে হিরের দ্যুতির মতো ঝলমলে করে তুলেছে।

মাহিন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সেন্টার টেবিল হতে ওয়ানের বোতল থেকে লাল তরল গ্লাসে ডালতে ডালতে উদাস কণ্ঠে বলল,

–“পুরো ভেনম ওয়ার্ল্ড এখন প্রাণহীন। আমি শপথ করেছিলাম আমার বসকে রক্ষা করবো, তাতে আমি ব্যর্থ। আমি এ-ও শপথ করেছিলাম তার অনুপস্থিতিতে আমি ব্ল্যাক-ভেনম মাফিয়া গ্রুপের সেকেন্ড লিডার হিসেবে সব দায়িত্ব পালন করব, আমি এটাতেও ব্যর্থ। আমি কোনোদিন মিস্টার ভি’র জায়গা নিতে পারব না। অসম্ভব! আর আমি সেই জায়গা নিতেও চাই না।”

ইনান ওয়াইনের পুরো গ্লাস সাবার করে সশব্দে সেন্টার টেবিলে রাখল। অতঃপর ক্লান্ত কণ্ঠে বলে উঠলো,“আমার পক্ষেও অসম্ভব হয়ে দাড়াচ্ছে। আমি উনার ছায়াসঙ্গী ছিলাম। উনাকে ছাড়া আমার পথচলা অসম্পূর্ণ। উনার অবর্তমানে বর্তমান লিডারের ছায়াসঙ্গী হয়েও আমি সেই দায়িত্ব পালন করতে পারছি না। শুধু আমি নই, পুরো ভেনম ওয়ার্ল্ড এখন স্তব্ধ, নীরব। মি. ভি শুধু আমাদের বস ছিল না, আমাদের পথনির্দেশক ছিল। তাকে ছাড়া এই পথচলা ক্লান্তিকর।”

হতাশার এক তপ্ত নিঃশ্বাস বাতাসে মিলিয়ে দিয়ে ইনান কাউচে গা এলিয়ে চোখ দুটো বুজল। পলক কাইসার নিঃশব্দে শুনল মাহিন আর ইনানের কথাগুলো। তিনি গ্লাসোর ওয়াইন শেষ করে গ্লাসটা রাখলেন। অতঃপর দু’হাত দু’দিকে ছড়িয়ে মাহিন আর ইনানের বাহু জড়িয়ে ধরে, তাদের বাহু আলতো করে চাপড়ে সান্ত্বনা দিলেন। ভারী নিশ্বাস ছেড়ে বললেন,

–“ইয়েহি হামারি কালির দুনিয়া কা নিয়ম হ্যায়, বেটা। হামারি জিন্দেগি কি কোই গ্যারান্টি নেহি হ্যায়। হাম হামেশা মৌত কে লিয়ে তৈয়ার রেহতে হ্যায়। হামারে দিল মে কিসি কে লিয়ে মোহাব্বত ইয়া লাগাও নেহি হোনা চাহিয়ে। অউর আগর হো ভি, তো উসে জাহির নেহি করনা চাহিয়ে। ওয়ারনা বারবাদি তয় হ্যায়।” (এটাই আমাদের কালো দুনিয়ার নিয়ম বেটা। আমাদের জীবনের কোনো নিশ্চিয়তা নেই। আমরা সবসময় মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতই থাকি। আমাদের কোনো মায়া মহব্বত থাকতে নেই। এগুলো থাকলেও প্রকাশ করতে নেই। না হলে ধ্বংস নিশ্চিত।)

পলক কাইসারের কথার পর কেউ কিছু বলল না। পুরো লাউঞ্জজুড়ে ক্ষীণকাল নিশ্ছিদ্র নৈঃশব্দ্য ভর করল। মীরা আজকাল ভীষণ নির্লিপ্ত। তবে এই নিস্পৃহতার আড়ালে সে অত্যন্ত একাগ্রতা ও নিষ্ঠার সাথে নিজের দায়িত্বের চাকা ঘুরিয়ে যাচ্ছে। পুরো আন্ডারওয়ার্ল্ডের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে আছে ভেনমদের শত্রুরা। তারা কখনো কেউ কল্পনা করেনি দুর্ধর্ষ মাফিয়া বস একজন নারীর জন্য এভাবে সেচ্ছায় নিজের পতন ঘটাবে। আর এমন মুখ্যম সুযোগ কি আর হাতছাড়া করতে পারে অন্যান্য মাফিয়া গ্রুপরা!

মাফিয়া বসের মৃত্যুর পরই তারা মরিয়া হয়ে ওঠেছে প্রভাবশালী গ্রুপ ব্ল্যাক-ভেনম নিজের করে নেওয়ার জন্য। যদিও বর্তমান লিডার কোনো অংশে কম নয়। মাহিন ঠান্ডা মাথার ধূর্ত দাবাড়ু। ইফানের মতো ক্রোধের বশে হুটহাট কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়ার লোক সে নয়। কিন্তু সে এই মূহুর্তে শোকাহত। ইনান তো আরও ভেঙে পড়েছে। সে ছিল মাফিয়া বসের ডান হাত, এক অতন্দ্র ছায়াসঙ্গী। যখন পুরো ভেনম সাম্রাজ্যের শক্ত ভিত্তিটা ধীরে ধীরে নড়বড়ে হয়ে উঠছে তখনই গ্রুপ ক্যাপ্টেন হিসেবে হাল ধরেছে মীরা। কারণ এই মূহুর্ত হাল ছাড়া মানেই তাদের ধ্বংস ডেকে আনা। কালো দুনিয়ায় এই এক নীতি, এখানে প্রবেশের পথ আছে কিন্তু বেরিয়ে আসার কোনো পথ নেই।

পলক কাইসার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সকল নিস্তব্ধতা ভেঙে বলে উঠলেন,

–“ইফান মেরে কালিজে কা টুকড়া থা। ম্যায় উসে আপনে বেটে সে ভি জ্যাদা পেয়ার করতি থি, উস পর ভরোসা করতি থি। তুমহেঁ ক্যা লাগতা হ্যায়, উসকে লিয়ে মেরা সীনা নেহি জলতা? জলতা হ্যায়, বহুত জলতা হ্যায়। লেকিন কুছ নেহি কিয়া যা সকতা। ইস কমজোরি কো কিসি ভি তারাহ বাহার জাহির নেহি কিয়া যা সকতা। ওর্না ঘাত লাগায়ে বৈঠে দুশমন মৌকা লপক লেঙ্গে। ইসিলিয়ে কহ রহি হুঁ, মজবুত বনো তুম লোগ। মেরা বেটা কভি হার নেহি মানা। তিনকে তিনকে জোড়কর উসনে আপনা ইয়ে সাম্রাজ্য খড়া কিয়া হ্যায়। ইসে বচানে কি জিম্মেদারি তুম তিনোঁ ভাই-বেহনোঁ কি হ্যায়। কোই ডর নেহি হ্যায়। জব তক ম্যায় তুমহারে সির পর হুঁ, তব তক কোই তুমহারা কুছ নেহি বিগাড় সকতা।” (ইফান আমার কলিজার টুকরা ছিল। আমি তারে নিজের বেটার চেয়েও বেশি ভালোবাসতাম, ভরসা করতাম। তোমাদের কি মনে হয় তার জন্য আমার বুক পুড়ে না? পুড়ে, খুব পুড়ে। কিন্তু করার কিছু নেই। এই দূর্বলতা কোনো ভাবে বাইরে প্রকাশ করা যাবে না। তাহলে উত পেতে থাকা শত্রুরা সুযোগ লুফে নিবে। তাই বলছি শক্ত হও তোমরা। আমার বেটা কোনোদিন হার মানেনি। তিলে তিলে গড়ে তুলেছে তার এই সম্রাজ্য। এটা রক্ষার দায়িত্ব তোমাদের তিন ভাই বোনের। কোনো ভয় নেই। তোমাদের মাথার উপর আমি যতদিন আছি ততদিন কেউ কিচ্ছু করতে পারবে না।)

লাউঞ্জ জুড়ে আবারও সেই নিরেট নীরবতা চেপে বসল। পলক কাইসার বিরতি নিয়ে বলে উঠলেন,“মেরি বাত ধ্যান সে শুনো। তুম লোগোঁ পর মুঝে বহুত ভরোসা হ্যায়। ম্যায় জানতি হুঁ তুম লোগ সব ঠিকঠাক সাম্ভাল লোগে। লেকিন অভি সবকো খামোশ রেহকর…” (আমার কথা মনযোগ দিয়ে শোন। তোমাদের উপর আমার অনেক আস্থা আছে। আমি জানি তোমরা সব ঠিকই সামলে নিবে। কিন্তু এখন সকলে নীরব থেকে…)

পলক কাইসার বাক্য সম্পূর্ণ করে ওঠতে পারলেন না। তার আগেই সদর দরজা খুলে যাওয়ার আওয়াজ পেয়ে সবাই দৃষ্টি ঘুরালো সেদিকে। জিতুকে দেখে কেউ বিস্মিত হলো না। তবে জিতু দৃষ্টি সংকুচিত করে ফেলল সবাইকে এভাবে বসে ড্রিংকস করতে দেখে। মাহিন অপ্রস্তুত হয়ে ওঠে দাঁড়াল। জিতুর সাথে ওদের সকলের সম্পর্ক এখনো আগের মতোই নীরব। জিতুর সাথে মাহিনের এই কদিনে হাতেগোনা যে কয়েকবার কথা হয়েছে তা শুধু জুইকে নিয়ে। মাহিন ভদ্রতার সাথে বলল,

–“ভেতরে আসেন।”

জিতু ভেতরে আসল। তার পিছনে গার্ডরা জিতুর নিয়ে আসা জিনিসপত্রগুলো ভেতরে এনে রাখল। পলক কাইসার ড্রিংক করতে করতে রাশভারি কণ্ঠে বললেন,

–“ইধার আকে বৈঠো বেটা। আনে মে কোই দিক্কত তো নেহি হুই?” (এখানে এসে বসো বেটা। আসতে তো অসুবিধা হয়নি?)

জিতু কোনো রকম আড়ষ্টতা না দেখিয়ে একদম নিস্পৃহভাবে প্রত্যুত্তরে বলল,“না, আসতে কোনো অসুবিধে হয়নি।”

মাহিনের দিকে তাকিয়ে শুধালো,“আমার বোন কোথায়?”

মাহিন শান্ত গলায় বলল,“ভেতরে আছে।”

মাহিন ইশারায় একজন গার্ডকে বলল জিতুকে দেখিয়ে দিয়ে আসতে। জিতু গার্ডকে অনুসরণ করে ভেতর দিকে চলে গেল। মাহিন জিতুর যাওয়ার পানে এক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। জুই এখন তিন মাসের গর্ভবতী। এই খবর শোনার পর পরিবারের হয়ে বড় ভাইয়ের দায়িত্ব থেকে জিতু বোনকে দেখতে বাংলাদেশ থেকে সূদুর লন্ডন এসেছে। জুইয়ের সাথে তার পরিবারের কম বেশি ফোনে যোগাযোগ আছে৷ তবে এত দূরে মেয়ে থাকার কারণে আজ পর্যন্ত কেউ এখানে আসেনি। জিতুই এই প্রথমবার আসল পরিবারের পক্ষ থেকে। পরের জন্য তো আর নিজের বোনকে এভাবে দূরে ঠেলে রাখতে পারে না সে। জিতু চোখের আড়াল হতেই মাহিন ফের গা ছাড়া ভাব নিয়ে সোফায় বসে পড়ল।

________

হুইলচেয়ারে বসে আছে নোহা। তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে আছে দু’জন মেইড। নাবিলা চৌধুরীর মৃত্যুর দিনই নোহাকে লন্ডন নিয়ে আসা হয়। সেদিন থেকেই লন্ডনের সবচেয়ে উন্নতমানের চিকিৎসা চলছে তার। তবে তাতে আহামরি কোনো সুফল পাওয়া যায়নি। মেয়েটার খাঁচাবন্দী প্রাণটুকু এখনো দেহে আছে, এই যা। অ্যাক্সিডেন্টের ফলে নোহার সারা শরীর আজ প্যারালাইসিসের ঘোর অন্ধকারে অবশ হয়ে পড়েছে। চলাফেরা, কথাবার্তা, কারো ডাকে সারা দেওয়া ইত্যাদি কিছুই সে করতে পারে না। যাকে বলে বেঁচে থেকেও মৃতের মতো। মাথায় আঘাত পাওয়ার ফলে নোহার মাথা ন্যাড়া করে ফেলা হয়েছিল। এখন সবে ছোট্ট ছোট্ট চুল গজিয়ে ওঠছে। যদিও মাথা তার উষ্ণ ওলের টুপি দিয়ে ঢাকা। গায়েও জড়িয়ে আছে শীত থেকে বাঁচার জন্য উষ্ণ মখমলে কাপড়।

সুপের বাটি হাতে নিয়ে নোহার সামনে বসে আছে জুই। বেশ অনেক্ক্ষণ ধরে গল্প করে করে নোহার মুখে একটু একটু সুপ তুলে দিচ্ছে মেয়েটা। যদিও জুইয়ের জানা নেই তার কথাগুলো আধও নোহার মস্তিষ্কে কোনো সাড়া ফেলছে কিনা। কারণ নোহা পুতুলের মতো অনড়ভাবে হুইলচেয়ারে বসে আছে। তার অনুভূতিহীন চোখের পলক স্থির, নিষ্পলক দৃষ্টি কোনো এক বিন্দুতে আবদ্ধ। জুই চামুচে গরম সুপ তুলে ফুঁ দিয়ে ঠান্ডা করে নিল। এতক্ষণে নোহার মুখের সুপটুকু পেটে চলে গেছে বুঝতে পেরেই জুই আরও এক চামুচ নোহার মুখে তুলে দিল। কিছুটা সুপ মুখ থেকে গড়িয়ে চিবুক বেয়ে পড়তে নিলে জুই চামুচের সাহায্যে ফের মুখে তুলে দিল। জুই এখনো নোহাকে গল্প শুনাচ্ছে,

–“তাই বলছি তুমি খেয়ে তারাতাড়ি সুস্থ হয়ে যাও। সুস্থ হলেই দেখবে তোমার জন্যও এমন একটা ভালো রাজকুমার আসবে। যে কিনা তোমাকে মাথায় তুলে রাখবে। তার সেবা পেয়ে আমার নোহা আপু একদম আগের মতো সুস্থ হয়ে যাবে।”

–“বনু..!”

জুই আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল তখনই পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে থমকে গেল। চকিতে দৃষ্টি দরজার পানে রাখতেই তার চেহারায় বিস্ময় আর আনন্দ ফুটে উঠল। সে বিহ্বল কণ্ঠে অস্ফুটে আওড়ালো,“ভাইয়া!”

জিতুকে দেখে জুই যেমন থমকে গেল ঠিক তেমনই ঘরের দোর পর্যন্ত পা রাখতেই থমকাল জিতুর পা। বোনের উপর দৃষ্টি পরার আগেই তার শূন্য দৃষ্টি স্থির হলো হুইলচেয়ারে নিশ্চল বসে থাকা বিবর্ণ রমণীর ওপর। জিতু পলক ফেলতে ভুলে গেল যেন। সে আজ বহুদিন পর নোহাকে সচক্ষে দেখল। ইতির মৃত্যুর পর জিতু এতটাই অন্তরালে চলে গিয়েছিল যে তার মাথায় আর কারো কথা আসেনি। কিংবা নোহা নামক যে একটা মেয়ে ছিল সেটাও বোধহয় তার স্মরণে ছিল না। আজ নোহাকে দেখে ফেলে আসা স্মৃতিগুলো তীব্র জলোচ্ছ্বাসের মতো জিতুর মনের মণিকোঠায় পুনরাবৃত্তি করতে লাগল। তার চোখে অনুভূতির রেশ এতক্ষণ না থাকলেও এখন তার চোখে সুক্ষ্ম অনুতাপ ভেসে উঠল। কোনো না কোনো ভাবে কি সে নোহার আজ এই অবস্থার জন্য দায়ী কিনা নিজের মনকে প্রশ্ন করলেও তার উত্তর মিলল না।

জুই তার ভাইয়ের দৃষ্টি অনুসরণ করে নোহার দিকে তাকাল। মূহুর্তেই রমণীর চেহারাটা ফ্যাকাসে হয়ে গেল। তার মনের পর্দায় ভেসে উঠল এক ঝাপসা স্মৃতির মিছিল। চোখের সামনে ধরা দিল দুটো হাস্যোজ্জ্বল চেহারা। ইতি আর নোহার সাথে আনন্দমুখর দৃশ্যগুলো চোখের পাতায় ভাসতেই জুইয়ের চোখদুটো জ্বালা করা শুরু করলো। সে প্রতিনিয়ত মায়ের থেকে খবর নেয় তার আপন মানুষগুলোর। ইতির মৃত্যুতে জিতুর অবস্থা কেমন হয়েছিল সে তা ভালো করেই জানে। যদিও এখন কিছুদিন ধরে জিতু নিজেকে সামলে পারিবারিক বিজনেসের হাল ধরেছে। শেয়ার বাজারে তাদের কোম্পানি যে হারে ধসে পড়ছিল, জিতু হাল না ধরলে বোধহয় বাপ-দাদার আমলের তিলেতিলে গড়ে তোলা শেখ বংশের ব্যবসাটুকু ধূলিসাৎ হয়ে যেতো।

জুই ঢোক গিলল। বুকের গহ্বরে সবে জমা হতে থাকা একরাশ মেঘ ও ক্লেশকে এক ঝটকায় দূরে ঠেলে অধরকোণে মেকি হাসি টানল। তরল গলায় বলে উঠল,

–“ভাইয়া বাইরে দাঁড়িয়ে আছ কেন? ভেতরে এসো।”

জিতুর সংবিৎ ফিরল৷ নোহার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আড়ালে তপ্ত শ্বাস ত্যাগ করল। অতঃপর ভারী পদচারণে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করল। জুই হাতের সুপের বাটিটি পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেইডটির হাতে দিয়ে বসা থেকে ওঠে দাঁড়াল। সহাস্যে শুধালো,

–“কেমন আছ তুমি ভাইয়া? আর কখন এসেছ তুমি?”

জিতু অধরকোণে স্মিত হাসি টানল। হাত বাড়িয়ে ছোট বোনের মাথায় আদুরে পরশ দিয়ে সহাস্যে বলল,“এইতো সবেই। তুমি কেমন আছ?”

জুইয়ের মনে অভিমান দানা বাঁধল। হঠাৎই তার কান্না পাচ্ছে। পাবেই বা না কেন? আজ কতগুলো মাস হয়ে গেলো নিজের আপন মানুষগুলোকে সামনে থেকে দেখে না। সে বুঝদার মেয়ে হলেও মনটা তার বাপের বাড়ির মানুষগুলোর জন্য আড্ড পুড়ে। সে মনে মনে সবসময় আশা করতো তাকে কেউ এসে দেখে যাক। কিন্তু এই বিশাল দূরত্বের জন্য কেউ দেখতে আসে না। জুইয়ের ভ্রমর কালো চোখদুটো টলমল করে উঠল। গলা ধরে এসেছে তার। নাক টেনে ভাঙা গলায় বলল,

–“হুম ভালো আছি।”

জিতু অনুধাবন করতে পারল ছোট বনের অভিমান। সে আলতো করে বোনকে বুকে টেনে নিল। জুই ভাইয়ের ব্লেজার খামচে ধরে ফুপিয়ে উঠল। আর ধরে রাখতে পারলো না আবেগ। জিতু বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে সহাস্যে বলল,

–“বোকা মেয়ে কাঁদে না। এই সময় হাসিখুশি থাকতে হয়।”

জুই সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নাক টেনে নিজেকে সামলে নিল। জিতুর দিকে তাকিয়ে বলল,“অনেকটা কষ্ট করে এসেছ তুমি। চলো আমার সাথে, রুমে গিয়ে আগে রেস্ট নাও। আমি তোমার জন্য খাবার-দাবার ব্যবস্থা করছি।”

বলেই জুই চোখ মুছল। সমস্ত অভিমান ভুলে এখন তার মনে এক অনাবিল আনন্দের জোয়ার জেগে উঠেছে। তাই খুশি মনে দ্রুত রুম থেকে বের হওয়ার জন্য পা বাড়াল। জিতু বলতে চাইল, সে এখানে থাকতে আসেনি। এক নজর বোনটিকে দেখতে এসেছে, কেমন আছে বোন তার! তবে জুইয়ের হাস্যোজ্জ্বল চেহারা দেখে এখনই কিছু বলল না। নিশ্চয়ই এটা জানতে পারলে বোন তার খুব দুঃখ পাবে। তাই আপাতত না বলায় তার কাছে শ্রেয় মনে হয়েছে। জিতু আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। রুম থেকে বের হওয়ার জন্য উদ্যুত হতেই বেখেয়ালি দৃষ্টি তার সামনের হুইল চেয়ারটাই পড়ল। জিতু এখনো নোহার সম্পূর্ণ চেহারা দেখতে পায়নি। পিছন থেকে একাংশ লক্ষ করেছে। জিতু এক মূহুর্ত স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল দৃষ্টি সামনের দিকে রেখে। অতঃপর কিছু একটা ভেবে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল সম্মুখে।

জিতু নোহার সম্মুখে গিয়ে দাঁড়াল। মেয়েটা যেন এক পাথরের ভাস্কর্য, নড়চড়বিহীন স্থির হয়ে বসে আছে। জিতু জানে উত্তর পাবে না, তবুও সে মৃদু কণ্ঠে শুধাল,

–“কেমন আছ?”

এক প্রগাঢ় মুহূর্ত পেরিয়ে গেলেও কোনো প্রত্যুত্তর আসল না। জিতু নিষ্প্রভ নয়নে অনড় হয়ে বসে থাকা মেয়েটাকে দেখেই গেল। অথচ একটা সময় এই মেয়েটা একদণ্ড স্থির থাকতো না। মৌটুসী পাখির মতো সর্বদা অস্থির হয়ে চঞ্চলতায় এখান থেকে ওখানে ছুটত। জিতু লক্ষ করল নোহার এই নিথর, জীবন্ত অথচ প্রাণহীনের ন্যায় নিষ্পলক শুভ্রমুখানা। একসময়ের টসটসে প্রাকৃতিক গোলাপি রঙা অধরযুগল আজ শুষ্ক। সেখানে নেই কোনো হাসির রেশ, নেই কোনো সতেজতা। কিন্তু একটা সময় ছিল যখন মেয়েটার ঠোঁট জোড়া থেকে হাসি সরতো না। জিতু মনে মনে ভাবল, পরিস্থিতি মানুষকে ঠিক কতটা বদলে দেয় তাই না!

জিতু অনুভূতিহীন শূন্য দৃষ্টিতে নোহাকে কিছুক্ষণ দেখল। যেই দৃষ্টি ঘুরাবে অমনি থমকালো। আবারও দৃষ্টি পাথরের ন্যায় স্থির বসে থাকা মেয়েটার দিকে ঘুরিয়ে নিল। লক্ষ করল মেয়েটার পেলব গাল আগের চেয়ে একটু ভরাট লাগছে। বোধহয় ঔষধের উপর থাকায় মেয়েটার দেহ কিছুটা ভারী মনে হয়েছে। কিন্তু সেই গোলগাল পুতুলের ন্যায় গোলাপি আভা ছড়ানো শুভ্র মুখশ্রীটা আরেকজনের সাথে খুব সদৃশ লাগছে। জিতুর চোখে ভেসে উঠল তার হাস্যোজ্জ্বল লজ্জাবতীর পেলব মুখশ্রীখানা। যে মুখশ্রী আজও সে ভুলতে পারে নি। আর সামনেও পারবে না। আজও সেই লজ্জাবতী একজন পুরুষের সবটা জুড়ে বিরাজ করে। তবে তার বিচারণ এখন শুধুই কল্পনায়। তবুও একজন পুরুষ সেই কল্পনাটুকু আকড়ে ধরেই বেঁচে আছে। আর বেঁচে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করছে।

জিতু দৃষ্টি সরিয়ে নিল নোহার থেকে। জিতুর চেহারা বরফের ন্যায় শীতল। নেই কোনো উদ্বেগ, আর নেই কোনো অনুভূতির রেশ। সে আর এক মুহূর্তও সেই স্মৃতির দহনকক্ষে দাঁড়িয়ে রইল না। ধীর পায়ে এক কদম, দু কদম এগিয়ে, অতঃপর নিজের চেনা ভারী পদচারণায় ঘর থেকে হড়বড় করে বেরিয়ে গেল। বাচ্চাদের মতো বাহারি জিনিসপত্র দিয়ে সুন্দর করে গোছানো রুমটায় শুধু পড়ে রইল হুইল চেয়ারে বসে থাকা নোহা আর তার দেখাশোনার জন্য দুজন মেইড। মেইড দুজন গোছানো ঘরটিকে আরও নিখুঁতভাবে গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কেউ আর লক্ষ করল না জিতু বেরিয়ে যাওয়ার পরপরই হুইল চেয়ারে নিথর হয়ে অনড় বসে থাকা মেয়েটার পেলব দু’গাল বেয়ে একফোঁটা অব্যক্ত তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।

*

*

||কাশ্মীর||

সকাল হতেই ঘন কুয়াশার ওড়না ছিঁড়ে অলস রোদের এক ফালি সোনালি রশ্মি এসে আঁচড়ে পড়ছে ধরিত্রীর বুকে। আর সেই আলোয় মাথা তুলে দাঁড়ানো দূর-দূরান্তের সুবিশাল, আদিম পাহাড়গুলো আজ ধবধবে সাদা বরফের চাদর মুড়ি দিয়ে মহাকাব্যিক এক স্তব্ধতায় আকাশ ছুঁয়ে আছে। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসা চারপাশের পাইন আর দেবদারু গাছগুলো ভারী বরফের মুকুট মাথায় পরে দাঁড়িয়ে আছে এক অপার্থিব নিস্তব্ধতায়। বুদগামের দুধপথরি কিংবা ইউসমার্গের যে সবুজ মখমল গ্রীষ্মে চোখ জুড়িয়ে দিত, এই জানুয়ারির তীব্র হিমে তা চোখের সামনে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত এক নিটোল শ্বেতশুভ্র চাদরে রূপ নিয়ে থমকে আছে।

এই হিমারণ্যের বুক চিরে শালিশাঙ্গা নদী যেন এক স্তব্ধ রূপোলি ফিতে হয়ে শুয়ে আছে। তার চঞ্চল স্রোত আজ তীব্র হিমে জমে স্ফটিকের মতো অসাড়, যেন কোনো জাদুকরী শান্ত ঘুমে মগ্ন। নদীর দুপাশের পাথরের বুকে জমে থাকা বরফকুচিগুলো রোদের আলোয় হীরের কুচির মতো চিকমিক করে উঠছে। ওদিকে সাদা বরফের একচ্ছত্র গ্রাসে সম্পূর্ণ ঢাকা পড়ে গেছে চেনা রাস্তাঘাটগুলো। কোনো কোনো পথ যেন অনন্ত এক শ্বেত-সমুদ্রের মাঝে হারিয়ে গেছে, যেখানে চাকার দাগ তো দূরের কথা, মানুষের পায়ের চিহ্নও নিমিষেই মুছে দিচ্ছে নতুন করে আকাশ থেকে ঝরে পড়া নরম তুলো-বরফ। তীব্র তুষারপাতে পথগুলো এখন এক নিঝুম, বিবাগী রূপ ধারণ করে উপত্যকার বিচ্ছিন্নতাকে আরও বেশি রহস্যময় আর গভীর করে তুলছে—যেন পুরো পৃথিবী থেকে আলাদা এক মায়াবী ভূখণ্ডে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে সময়।

প্রকৃতির এই চরম বাস্তবতার মাঝেই লোকালয়ের জীবনযাত্রা কিন্তু থমকে যায়নি, বরং তা এক অদ্ভুত ধীরগতির, ওম মাখানো ছন্দে চলছে। তুষারাবৃত মেঠো পথ ধরে লম্বা ‘ফেরান’ পোশাক গায়ে জড়িয়ে, কোলের কাছে পরম নির্ভরতায় ওম ছড়ানো ‘কাংড়ি’ আগলে হেঁটে চলছেন স্থানীয় মানুষেরা। কাঠের তৈরি পাহাড়ি কোঠিগুলোর ঢালু ছাদ পুরু বরফে ঢেকে আছে, আর তাদের চিমনি বেয়ে কুণ্ডলী পাকানো হালকা ধোঁয়া অলস পায়ে নীলচে-ধূসর আকাশে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। আর ঘরের ভেতর? সেখানে এখন চলছে তামাটে সামোভারে ফুটতে থাকা গরম গরম ‘কাহওয়া’ পানের চিরচেনা এক নিবিড় আড্ডা, যা বাইরের এই হিমশীতল পৃথিবীর বুকেও এক টুকরো স্বর্গের ওম ছড়িয়ে দিচ্ছে।

আরিফের কোঠি থেকে চতুর্দিকে ভেসে বেড়াচ্ছে একটি বাচ্চার চিৎকার করে কান্না করার আওয়াজ। কান্নার আওয়াজ শুনে এই হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় উষ্ণ কাপড় পরে ঘর থেকে বেরিয়ে আসলেন শাহাবুদ্দিন। অতঃপর দ্রুত কদমে পাশেই দাড়িয়ে থাকা কোঠিটির দিকে পা বাড়ালেন। ঘরের ভেতরে হিটার চলার কারণে এক আরামদায়ক ও মোলায়েম উষ্ণতা ছড়িয়ে আছে। সোফায় শীতের জন্য ওমের কাপড় পড়ে বসে আছে আরিফ, জিয়াদ আর পলি। পলির কোলে ওলের ভারী চাদরের অভ্যন্তরে লুটোপুটি খাচ্ছে একটি মাস তিনেকের শিশু। পলির গা ঘেঁষে মেঝের পাটির উপরে বসে আছে ব্রুনো৷ চোখে তার বিচলিত ভাব নিয়ে বারংবার পলির কোলের বাচ্চাটার দিকে উৎসুক উঁকিঝুঁকি দিয়ে বিচক্ষণতার সাথে পর্যবেক্ষণ করছে সে। যেন ব্রুনোই শিশুটির অভিভাবক।

পলির আরেক পাশে গুটিসুটি মেরে সোফায় বসে আছে কাব্য। তার ছোট্ট দেহ অভার সাইজ শীতের পোশাকে ডেকে আছে। মাথা থেকে কান পর্যন্ত টুপি দিয়ে ঢাকা। কাব্য একটু নড়েচড়ে উঁকি দিয়ে দেখল পলির কোলের বাচ্চাটিকে। বাচ্চাটা কান্না থামাচ্ছে না। বরং চিৎকার করে কাঁদছে। পলি কোলে নাড়িয়ে বাচ্চাটিকে আদুরে কণ্ঠে কান্না থামাতে বলছে। কাব্য পলিকে শুধাল,

–“আম্মু, বোন কাঁদছে কেন?”

পলি বিচলিত কণ্ঠে বলল,“আব্বু, আমিও বুঝতে পারছি না তোমার বোন কাঁদছে কেন! ওকে তো এইমাত্রই ভাবি বুকের দুধ খাইয়ে দিয়ে গেছে। খিদে লাগার তো কথা না। তবে কাঁদছে কেন!”

জিয়াদ চা কাপ টি-টেবিলের উপর রেখে কাব্যের সাথে চেপে বসল। ঝুকে বসে কন্দনরত বাচ্চাটির দিকে দু’হাত বাড়িয়ে তালি বাজিয়ে বাজিয়ে বলে উঠল,“আমার মামার কি হয়েছে, হুম? কে বকেছে? মামিমা বকেছে? আচ্ছা তোমার মামিমাকে পিটুনি দিব। কান্না করে না আমার লক্ষী মামা।”

পলির কোলের বাচ্চাটির কান্না তৎক্ষনাৎ থেমে গেল। খুব মনযোগ দিয়ে জিয়াদের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থেকে শুনল কথাগুলো। জিয়াদ বাচ্চাটিকে কান্না থামাতে দেখে পলির দিকে তাকিয়ে সহাস্যে এক ভ্রু উঁচিয়ে চোখের ইশারায় বলল,“দেখছ কিভাবে বাচ্চাদের কান্না থামাতে হয়?”

পলি জিয়াদের কথায় অসন্তোষ হলো। সে কিনা বাচ্চাটিকে বকেছে, এটা জিয়াদ বলতে পারলো! পলি জিয়াদের থেকে পাংগুটে মুখ করে দৃষ্টি সরাতে না সরাতেই তার কোলের ছোট্ট বাচ্চাটি ফের চিৎকার করে কেঁদে উঠল। কান্নার তেজ দেখে যে কেউ ঘাবড়ে যাবে। পলি কোলের বাচ্চাটিকে দোলাতে দোলাতে বলে উঠল,

–“আমার মামিমা কাঁদে না। কেন কাঁদছে আমার মামিমা? মামা বকেছে? আচ্ছা তোমার মামাকে আমি ধরে কেলানি দিব। এবার আমার সোনা কান্না থামাও।”

পলির কথা শুনে ফিক করে হেসে উঠল আরিফ। সে চায়ের কাপে সবে চুমুক দিয়েছিল। ঠিক তক্ষুনি পলির কথা শুনে হেসে দেওয়ায় মুখের চা ফিরকি দিয়ে সামনে ছিটকে পড়ল। কাব্য দাঁত কেলিয়ে হেসে উঠল,

–“হিহিহি।”

লজ্জায় চেহারা পাংগুটে হয়ে গেল জিয়াদের। আরিফকে এভাবে উদাত্ত হাসতে দেখে অপ্রস্তুত ও অনুযোগের সুরে বলে উঠল,

–“আরিফ ভাই!”

আরিফ দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে ঠোঁট টিপে একদম ভদ্র সেজে বসল। তবে হাসির অবরুদ্ধ বেগ সামলাতে গিয়ে তার প্রশস্ত কাঁধ দুটো এখনো মৃদু কম্পিত হচ্ছে। ওদিকে কাব্য মুখে তার ছোট্ট দু’হাত চেপে অবিরাম ফুচফুচ করে হেসেই চলেছে, হিহিহিহি। জিয়াদের অবস্থা দেখে ঠোঁট টিপে হাসছে পলিও। তবে নিজেকে সামলে কোলের বাচ্চাটির দিকে নজর দিল। বাচ্চাটা আরও দ্বিগুণ চিৎকার করে কাঁদছে। নিশ্চয়ই তার মাকে খুঁজছে। শাহাবুদ্দিন ভেতরে ঢুকতে ঢুকতেই রাশভারি গলায় কাশ্মীরি ভাষায় বলে উঠলেন,

–“কস ছু ইত্থ কথ হিম্মত, মে নানু বেস কুন বকুন?” (কার এত বড় সাহস আমার নানুভাইকে বকেছে?)

শাহাবুদ্দিন মাথার টুপিটি ঠিক করতে করতে দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসলেন। পলির কোলের বাচ্চাটির উপর ঝুঁকে হেসে বললেন,“মে নানাবেস কিস লাগি কারান রোন,হুম?” (কাঁদছে কেন আমার নানা ভাই, হুম?)

শাহাবুদ্দিন একনাগাড়ে সহাস্যে এটা-ওটা বলতে লাগলেন শরীর কিছুটা দুলিয়ে। কখনো তিনি দুষ্টুমি করে ঘরের উপস্থিত সকলকে মিছিমিছি বকাঝকা করছেন, তো কখনো নানুভাইকে আদর দিচ্ছেন। পলির কোলের বাচ্চাটা হঠাৎ কান্না থামিয়ে চুপ হয়ে গেল। তীক্ষ্ণ ফলার মতো দৃষ্টি তার শাহাবুদ্দিনের দিকে স্থির। শাহাবুদ্দিনের কথাবার্তা শুনে বাচ্চাটির কপালের মধ্যে সুক্ষ্ম কয়েকটি ভাজের সৃষ্টি হলো। পলি নিষ্প্রভ মায়া ভরা দৃষ্টিতে বাচ্চাটিকে দেখতে লাগল। পেলব গোলাপি আভা ছড়ানো মিষ্টি চেহারা বাচ্চাটির। কান্নার ফলে চোখদুটো অশ্রুকণায় টলমল করছে। পলি আনমনে জিয়াদকে বলে উঠল,

–“ও একদম ওর বাবার মতো হয়েছে। দেখো, ধূসর বাদামী চোখজোড়া। সোজা, তীক্ষ্ণ নাক। ধারালো চোয়ালের পেশী। দেখো কিভাবে কপালে ভাজ ফেলে সরু চোখ করে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে? ওর বাবাও বিরক্তবোধ করলে কিংবা কেউ তার সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা বললে ঠিক এভাবেই কপালে ভাজ ফেলে, সরু চোখ করে, তীক্ষ্ণ নিষ্প্রভ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতো। আর..আর ওর টগবগে গায়ের রঙ একদম ওর ছোট ফুপির মতো। চেহারার আদল অনেকটা তার বড় ফুপি আর বাপ-চাচাদের সাথে একদম নিখুঁত মিলে যায়। নির্ঘাৎ কেউ পরিচয় না জেনেও বলে দিতে পারবে, এ চৌধুরীদের রক্ত!”

জিয়াদও পলির কথা শুনতে শুনতে কল্পনা করল পুরাতন মুখগুলো। সত্যিই এই বাচ্চাটির সাথে চৌধুরীদের সকলের অদ্ভুত মিল রয়েছে। বিশেষ করে ইফান চৌধুরীর সাথে। জিয়াদ তার বোকাসোকা ভাবনায় হাসলো। মিল তো থাকারই কথা। এ যে সাক্ষাৎ চৌধুরীদেরই রক্ত। ইফান চৌধুরীর রক্ত।

চলবে,,,,,,,,

এই পর্ব বিশাল বড় হয়ে গিয়েছিল। তাই বাধ্য হয়ে আমাকে পর্বটিকে দুইভাগ করতে হয়েছে। এই পর্বটি পড়ে অনেকের মনে কিছু প্রশ্ন জাগতে পারে যা খুবই স্বাভাবিক। আপনাদের প্রশ্নের উত্তর পরের অংশটিতে পরিষ্কারভাবে পেয়ে যাবেন।

আর হ্যা, পরের অংশ আমার লেখা হয়ে গেছে। যারা পড়েছেন সকলে রিয়েক্ট কমেন্ট করুন। আমিও তাহলে বাকি অংশটি এডিট করে আগামীকাল দিয়ে দিব। তবে হ্যা আগে রিয়েক্ট কমেন্ট করতে হবে। তাহলেই গল্প দিয়ে দিব আগামীকাল। হ্যাপি রিডিং।🥹🫶

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply