Golpo romantic golpo জল তরঙ্গের প্রেম

জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ৩০


#জল_তরঙ্গের_প্রেম

পর্ব সংখ্যা;৩০

#লেখনীতে_নবনীতা_চৌধুরি

ভোরের আলো না ফুটতেই তরীদের রুমের দরজায় কড়া নাড়লেন সাহনারা।

ঘুম ঘুম চোখে কাঁধের ওপর ওড়না পেলে উঠে এসে দরজা খুলে দিলো তরী। ঘুম ঘুম চোখে, চাচিকে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চোখের ঘুম উবে গেলো তার। এই সাজ সকালে চাচির আগমন মানেই বিপদের সংকেত। তরীর আপাদমস্তক পরোখ করে নিয়ে বিরস মুখে ঝাঁঝালো কন্ঠে সুধালো তিনি।

–” মহারাণী হয়ে গেছিস নাকি? দরজা ধাক্কিয়ে ঘুম থেকে তুলতে হচ্ছে তোকে। আর কতক্ষণ পড়ে পড়ে ঘুমাবি?”

–” কিছু হয়েছে চাচি?”

তরীর মুখে এহেন প্রশ্ন শুনে মুখ কালো হয় উঠলো সাহনারার। মেয়েটা আজকাল মুখে মুখে ছড়ার অনুরূপ কথা কাটছে। কিছু বলা যাচ্ছে না। মুখের উপর প্রশ্ন করে বসছে।

–” কিছু না হলে কি আপনাকে ডাকা যাবে না? লায়েখ হয়েছেন নাকি?”

ভোর সকালে এমন তর্ক করতে মোটে ও ভালো লাগছে না তরীর। উপায়ন্তর না পেয়ে; করুণ চোখে তাকিয়ে রইলো সে। সেই দৃষ্টির পরোয়া না করেই মুখ বাঁকালেন সাহানারা।

–” সকাল সকাল মাছ ওয়ালা ছোটো মাছ দিয়ে গেছেন। ওগুলো কুটে আমাকে উদ্ধার কর। রান্না বসানো লাগবে। তোর বাপ – চাচা অফিসে যাবে।”

–” আচ্ছা তুমি যাও। আমি আসছি।”

তরীর থেকে কথা আদায় করে নিচে চলে গেলেন সাহনারা। তরী ও আর দাঁড়ালো না। বেণুণি বাঁধা চুল গুলো হাত খোঁপা করে নিলো। ওড়না টা বিছানায় রেখে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়লো সে। এক সাথে ফ্রেশ হয়ে নিচে নামলো মেয়েটা। কিচেনের পেছনের দরজা দিয়ে কল পাড়ে উপস্থিত হতেই মাথায় শুকনো বজ্রঘাত হলো তরীর। শিং মাছ, কৈই মাছ, তার সাথে আরো তিন কেজি সমেত গুঁড়ো মাছ। বাড়িতে গুঁড়ো মাছ আনা হয়।

তবে এতো মাছ কখনো একসাথে আনা হয় না। তার চেয়ে বড় কথা, এতো মাছ কাটবে কে? সেখানে দাঁড়িয়েই চাচিকে ডাক দিলো তরী।

–” চাচি? চাচি?”

দু’বার ডাকতেই সাহনারা এসে উপস্থিত হলেন।

–” ডাকছিস কেন?”

কাঁচুমাচু মুখে তরী বললো।

–” মতিয়া খালা কোথায় চাচি? এতো মাছ একা কাটবো কীভাবে? সারাদিন চলে যাবে তো।”

–” কীভাবে কাটবি আমি কি জানি। মতিয়া আজ আসেনি। জলদি মাছ কেঁটে আমাকে উদ্ধার কর।”

কথা শেষ করে; ঠোঁটের কোণে মিটিমিটি হাসির রেখা টেনে গটগট পায়ে প্রস্থান করলেন সাহানারা। মনে বেশ শান্তি শান্তি বোধ হচ্ছে ওনার। এইবারে অন্তত মেয়েটাকে জব্দ করা যাবে। এতো গুলো মাছ কাটা মুখের কথা না। এক সপ্তাহ কোমর নিয়েই হাঁটতেই পারবে না। মনে মনে নিজেকে বাহবা দিলেন সাহানারা। এখন থেকে এভাবেই তরীকে হাতে রাখবেন তিনি। হাতে না মেরে ভাতে মারাটা সহজ।

অসহায় চোখে চাচির যাওয়ার পথে তাকিয়ে রইলো তরী। পর পর ওড়না টা কোমরে পেঁচিয়ে পিঁড়ি টেনে মাছ কাটতে বসে পড়লো সে।

*******

শাওয়ার শেষে, কোমরে টাওয়াল পেঁচিয়ে উদোম শরীরে স্টাডি টেবিলের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ফোন স্ক্রল করছে তরঙ্গ।

আজ ভার্সিটিতে যাবে সে। সেজন্যই এই সকাল সকাল আরামের ঘুম হারাম করে বিছানা ছাড়া। অবশ্য বউটা যদি তার পাশে থাকতো তবে ভার্সিটি বা ইমপোর্টেন্ট ক্লাস কোনটার ই পরোয়া করতো না তরঙ্গ। সব কিছু ফেলে তরীকে বুকে নিয়েই দিন-রাত কাটিয়ে দিতো সে। ফোন স্ক্রল করা শেষ হতেই; সাদা শার্ট আর নেভি ব্লু জিন্স পরে তৈরি হয়ে নিলো তরঙ্গ। ফর্সা দেহের সুঠাম শরীরে বেশ মানিয়েছে রঙ দুটো। তার মাঝে ভেজা চুল। এই মূহুর্তে অসম্ভব সুর্দশন বলা চলে তরঙ্গ কে।

অলরেডি সাড়ে সাতটা বেজে গেছে। আর বসে থাকলে ক্লাসে যেতে দেরী হয়ে যাবে তার।

ঘড়িটা বাম হাতের কব্জিতে পরতে পরতে বারান্দায় এসে দাঁড়ালো তরঙ্গ। অন্যমনস্ক দৃষ্টিতে চারপাশে তাকিয়ে নিচের দিকে চোখ পড়তেই থমকে গেলো সে। কল পাড়ের পাশে বসে হাতে ছাই মেখে মাছ কাটছে তরী। বেশ সিরিয়াস ভঙ্গিতে মাছ কাটছে সে। কোনো দিকেই তার মন নেই। দৃশ্যটা দেখা মাত্র তরঙ্গের কপালে ভাঁজ পড়লো। তরীর চারপাশে বেশ কয়েক পদের মাছ। উপর থেকে মাছ গুলো চিনতে পারলো না তরঙ্গ। এই মেয়ে আজ কাল মাছের দোকান খুলেছে নাকি? নাকি খাবারের হোটেল দিয়েছে? এই ভোর সকালে এতো মাছ দিয়ে সে করবেই বা কি?

ঠোঁট বাঁকিয়ে নিচের দিকেই তাকিয়েই বিড়বিড় করলো তরঙ্গ;-

–” বেয়াদব জানটা আমাকে একটু ও সময় দিতে পারে না। সময়ের কথা বললেই যেন ভীমড়ি খায়। আর এখন দেখো, দিব্যি মাছের দোকান খুলে বসেছে! এসব তো আর সহ্য করা যাচ্ছে না।”

বারান্দা থেকে ফিরে ড্রেসিং টেবিলের উপর রাখা আইডি কার্ডটা গলায় ঝুলিয়ে দ্রুত পায়ে নিচে নেমে এলো তরঙ্গ। কিচেনে ঢুকতেই সাহানারার সঙ্গে মুখোমুখি হলো সে। সাহনারা মাত্রই চুলা থেকে সবজি ভাজির কড়াই নামিয়ে। চায়ের পানি বসাচ্ছিলেন তিনি। তরঙ্গ একবার মায়ের দিকে তাকালো। কিছু বলবে ভেবে ও বললো না সে। নির্বিকার মুখে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিতেই পেছন থেকে শান্ত স্বরে তাকে ডাক দিলেন সাহানারা।

–” নেমেছিস বাপ? আয় তোকে নাশতা দিচ্ছি। ভার্সিটি যেতে দেরী হয়ে যাবে যে।”

ভোঁতা মুখে মায়ের দিকে না তাকিয়েই তরঙ্গ জবাব দিলো।

–” এক শিশি বি*ষ দিও তো মা। ছেলের চোখের সামনে তার বউকে এভাবে খাটিয়ে; ছেলেকে তিলে তিলে কষ্ট দিয়ে মেরে ফেলার চেয়ে। আমাকে বি*ষ খাইয়ে দাও এক সাথে। মরে যাই।”

আঁচলে মুখের ঘামটুকু মুছে ক্লান্ত কন্ঠে সুধালেন সাহনারা।

–” কি বলছিস তুই আব্বা? আমি তোকে কষ্ট দিলাম কখন? ছিঃ ছিঃ, বি*ষের কথাই বা আসছে কোথা থেকে!”

–” আমার বউকে দিয়ে এতো মাছ কাটাতে শুরু করেছো যখন থেকে। তখনই এসেছে।”

উপরের দাঁতের পাটির সঙ্গে নিচের দাঁতের পাটি শক্ত করে চেপে ধরলেন সাহানারা। ইদানীং, তরী টা একেবারে হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। তার সাথে সাধ দিচ্ছে তরঙ্গ। সে তো দিন দিন সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। উগ্রতা যেন নিত্য দিনের সঙ্গী। শুধু নিজের পেটের ছেলে বলেই নিজেকে সংযত রাখছেন তিনি। নয়তো এমন বেয়াড়া ছেলেকে উচিত শিক্ষা দিতে সাহানারার বেশি সময় লাগতো না।

–” বেহায়াপনা বন্ধ কর তরঙ্গ। আমি তোর মা হই। ও তোর বড় চাচাতো বোন। এর বেশি কিছুই না। তোর গায়ে হাত তুলতে আমাকে বাধ্য করিস না তরঙ্গ।”

কথা শেষ করে; ছেলের দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে তরঙ্গের পিঠের শার্ট খামচে ধরলেন তিনি। মুখের চাপ দেখেই বোঝা যাচ্ছে, রাগে ভেতরটা ফুটছে তার। মায়ের রাগের সুযোগ নিয়ে। আরো একধাপ এগিয়ে তরঙ্গ ও ইচ্ছে করে আগুনে ঘি ঢালার কাজে নেমেছে। মায়ের কড়া দৃষ্টি উপেক্ষা করে বিরক্ত ভঙ্গিতে ফোঁস করে শ্বাস ছাড়লো তরঙ্গ। পর পর, টেনে টেনে কথা গুলো বললো সে;-

–” কটটা যেন কে দিয়ে ছিলো মা? আমার শাশুড়ি আম্মু মনে হয়। কবর থেকে উঠে এসে কট দিয়ে আবার কবরে গিয়ে শুয়ে পড়েছেন। তাই না?”

কথাটা শেষ হতেই সাহানারার চোখ মুখ আরো শক্ত হয়ে গেলো। তরঙ্গকে ছেড়ে দিয়ে হাতের খুন্তিটা শক্ত করে চেপে ধরে ধমকে উঠলেন তিনি;-

–” থাপ্পড়ে তোর দাঁত ফেলে দিবো তরঙ্গ! বয়স কত হয়েছে তোর? মায়ের সঙ্গে মুখে মুখে তর্ক করছিস?”

এবারে ও থামলো না তরঙ্গ। এক পা এগিয়ে রান্না ঘরের বাইরের উঠোনের দিকে তাকালো সে। সেখানে এখনো ছাই মাখা হাতে মাছ কাটছে তরী। দৃশ্যটা দেখেই মুখটা আরো গম্ভীর হয়ে উঠলো তার। চোয়াল শক্ত করে নিচু স্বরে বললো;-

–” আমার বউটাকে বি*ধ*বার মতো কলপাড়ে বসিয়ে রেখেছো কেন? ওকে কি কাজের খালা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছো?”

নিজের শেষ কথার বো*মটা ব্লা*স্ট করে। উঠোনে নেমে এলো তরঙ্গ। তরীর পাশে পিঁড়ি টেনে বসে পড়লো সে।

–” এই ভোর সকালে এতো মাছ কাটছো কেন বউ? তুমি কি চাইছো? পড়াশোনা ছেড়ে ভাত – মাছের হোটেল দেই আমি!”

আচমকা তরঙ্গের কথায় তরী চমকে উঠলো। মাছ কাটা রেখে সামনের দিকে তাকালো সে। সকালের মৃদ্যু রোদের মাঝে এক সুদর্শন যুবক বসে আছে তরীর সন্নিকটে। পুরুষটির কপাল ছুঁড়ে একরাশ বিরক্তি। অথচ কন্ঠে তাহার অপার মায়া। যেনো তরীর সামনে এলেই তার সকল উগ্রতা, রাগ, জেদ, ছন্নছাড়া ভাব সব মায়ার রূপান্তরিত হয়। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চুল সরানোর ব্যর্থ প্রয়াস চালালো তরী।

–” ভার্সিটি না গিয়ে এখানে এসেছেন কেন? শরীর থেকে মাছের গন্ধ আসবে তো।”

হাতের ঘড়িটা খুলে পকেটে পুরে নিলো তরঙ্গ। তরীর চুল গুলো কানের পেছনে গুঁজে দিয়ে। তরীর সামনে থেকে ব*টি টা টেনে নিলো সে।

–” আমার বউয়ের শরীর থেকে মাছের গন্ধ আসলে। আমার শরীর থেকে ও আসবে। সমস্যা কি! বিনা নোটিসেই সবাই বুঝে যাবে আমরা কাপল।”

–” ফাজলামি করছেন? ব*টি দিয়ে কি করবেন আপনি? এখন কি মাছ কাটবেন নাকি? চাচি কিন্তু এসব সহ্য করবেন না।”

শীতল চোখে তরীর দিকে দৃষ্টি পাত করলো তরঙ্গ। কন্ঠে একরাশ মায়া ঢেলে সুধালো সে।

–” তোর চাচি আমি মাছ কাটলে সহ্য করতে পারবে না। এদিকে যে, আমার বউটা মাছের সাথে সংসার জুড়েছে। আমি কীভাবে তা সহ্য করি?”

#চলবে

( আজ শরীরটা বেশ খারাপ তবুও আপনাদের জন্য লিখলাম। রেসপন্স করবেন দয়া করে। রেসপন্সের অভাবে সবার কাছে গল্প পৌঁছাচ্ছে না। কেমন হয়েছে জানাবেন প্লিজ। নেক্সট, নাইস বাদে এক দুই লাইন লিখিয়েন।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply