Golpo romantic golpo জল তরঙ্গের প্রেম

জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ২৬


পর্ব সংখ্যা;২৬

#লেখনীতে_নবনীতা_চৌধুরি

তরী এক ভাবে দাঁড়িয়ে আছে গত পনেরো মিনিট ধরে। তা নিয়ে অবশ্য তরঙ্গের মধ্যে কোনো ভাবলেশ দেখা যায়নি। সে আগের মতোই নির্বিকার ভাবে শুয়ে আছে।

চোখ ঘুরিয়ে পুরো রুমটা পরোখ করলো তরী। মাঝারি ধরণের রঙ উঠে যাওয়া একটি রুম। মেঝেতে ঢালাই করা। টাইলসের বালাই নেই। দেখেই বোঝা যাচ্ছে বেশ বয়স হয়েছে দেয়াল গুলোর। রুমের দু’পাশে দুটো সিঙ্গেল বেড। মাঝখানে খালি জায়গায় দুই সাইডে দুটো পড়ার টেবিল। আর একটা আলমারি। টেবিল জুড়ে হরেক রকমের বই। পাশাপাশি ল্যাপটপ, মোবাইল স্ট্যান্ডার্ড সহ হাবিজাবি জিনিসপত্র। তরঙ্গের পাশের টেবিলটা গোছানো হলে ও অপরটি অগোছালো।

পুরো রুম জুড়ে রশি টানিয়ে রাখা। সেখানে ছেলেদের পোশাক ঝুলছে। রুমের উত্তরের জানলা টা খুলে দেওয়া আছে। সেখান দিয়ে ফুল শূন্যে বড় এক কৃষ্ণচূড়া গাছ দেখা যাচ্ছে। রোদের ঝলকে ঝলমল করছে কৃষ্ণচূড়া গাছের সবুজ পাতা গুলো। চোখ ঘুরিয়ে সেদিকে তাকিয়ে রইলো তরী। পেছনের দিকে ফিরলেই তরঙ্গের উদোম পিঠে তার নজর পড়বে। দু’বার না তাকাতেই, অবাধ্য মন ফন্দি ফিকির জুড়েছে ওই তিলটা কে ছুঁয়ে দেবার।

ঘাড় ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা তরীকে দেখলো তরঙ্গ। নিমিষেই তার কপালের ভাঁজ মুছে গেল। করুণ দৃষ্টিতে তাকালো সে। এই সুন্দর সুশ্রী মেয়েটি তার! তাদের দু’জনের মাঝে সুন্দর হালাল এক সম্পর্ক প্রবাহমান। কিন্তু পরিপূর্ণ স্ত্রীর অধিকার এবং হৃদয়ে অপার ভালোবাসা থাকার পর ও তাকে ছুঁয়ে দেবার অধিকার নেই তরঙ্গের। পরক্ষণেই ভরাট কণ্ঠে বলে উঠলো সে;-

–” এখানে বসুন!”

তরঙ্গের পানে চেয়েই তার পাশে বসে পড়লো তরী। তা দেখে ফের বালিশে মাথা এলিয়ে দিলো তরঙ্গ। রঙ খসে যাওয়া দেয়ালের দিকে তাকিয়ে শক্ত কন্ঠে তরী তরঙ্গ কে ডাকলো।

–” শুনুন?”

–” হুমমম “

ওভাবেই থেকে গম্ভীর স্বরে জবাব দিলো তরঙ্গ। তার কণ্ঠের গম্ভীরতায় কেঁপে উঠলো তরী। বলতে চাওয়া কথা গুলো মনে মনে আর ও একবার আওড়ে নিলো সে। নিজের মনের কথা গুলো গুছিয়ে নিয়ে ধীর কণ্ঠে বলতে শুরু করলো তরী।

–” আমি তোর থেকে এক বছরের বড় তরঙ্গ।”

রুক্ষ স্বরে জবাব দিলো তরঙ্গ,

–” ঘটা করে শাড়ি পরে এই কথাই জানাতে এসেছেন আমাকে?”

–” দেখ!”

–” স্পেলিং ঠিক করুন আগে!”

–” দেখুন,”

–” দেখালে তো দেখবো।”

–” সরি, শুনুন আমি আপনার থেকে পাক্কা এক বছরের বড়।”

–” এইজ জাস্ট এ নাম্বার মাই ম্যাম। এটা ছাড়া আর কি সমস্যা বলুন! ফিজিক্যাল কোনো সমস্যা?”

তরঙ্গ থামলো, ফের তাড়াহুড়ো করে বললো;-

–” ওয়ান সেকেন্ড তাতে ও আমার সমস্যা নেই। আই উইল ম্যানেজ। বউ সেজে ডির্ভোস চাইতে এসেছেন? আমি কোনো ডির্ভোস টির্ভোস দিবো না। বাসর সারতে চাইলে বলবেন। আমি আছি,”

তরী চুপ করে গেলো। পুনরায় দাঁড়িয়ে পড়লো সে। এখানে আসাটাই বৃথা। ছেলেটা কেন তার কথা গুলো বুঝতে চাইছে না। নিজের কথায় অনড় সে। একটু ও বোঝার চেষ্টা করছে না তরীকে। ঘাড় ত্যাড়া টা একটু শান্ত মাথায় কথা শুনলে কি হয়? সেটাই মাথায় ঢুকে না তরীর। এসব আর সহ্য হচ্ছে না তার। মা – ছেলের মাঝখানে পড়ে তার অবস্থাটা দিন দিন অসহ্য হয়ে উঠছে। না ছেলে তার কথা শুনছে, না মা তাকে কথা শোনানো বন্ধ করছেন। হতাশার শ্বাস চাপলো তরী। উফ, সব কিছু এত কঠিন লাগছে কেন তার কাছে? কেন যেন মনে হচ্ছে, চারপাশের সব সম্পর্ক ধীরে ধীরে জট পাকিয়ে যাচ্ছে, আর সেই জটের মাঝখানেই আটকে যাচ্ছে সে নিজে।

–” আপনাকে বসতে বলেছি তো! বারবার উঠে দাঁড়াচ্ছেন কেন? পতির সম্মান আমি চাইনি… চেয়েছি শুধু ভালোবাসার অধিকার।”

বিরস মুখে তরী আওড়ালো;-

–” আমি এতক্ষণ কি বলেছি আপনাকে! একটু তো সিরিয়াস হোন।”

–” বারবার নিজেকে লম্বা দাবি করার জন্য। লাফিয়ে লাফিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লে কথা বলবো কিভাবে?”

তরঙ্গের দিকে তাকিয়েই তরী বসলো। তা দেখে আবার বালিশের মাঝে মুখ ডুবিয়ে দিলো তরঙ্গ। এলোমেলো চুল গুলো নেমে এসে ঢেকে দিলো তার ঘুমঘুম চোখ জোড়া। দৃশ্যটা দেখে অদ্ভুত এক লোভ জাগলো তরীর মনে। ইচ্ছে করলো তরঙ্গের চুলের মাঝে নিজের হাত ডুবিয়ে ছুঁয়ে দিতে ছেলেটার অগোছালো চুল গুলোকে। ফ্যানের বাতাসে উড়তে থাকা চুল গুলোকে আরো ও বেশি বুনো আর ছন্নছাড়া লাগছে। প্রতি সপ্তাহে চুল কাঁটার সময় চুল গুলো প্রয়োজনের তুলনায় কিছুটা বড় রাখে তরঙ্গ। যার দরুন, মাথার মাঝ বরাবর হাত রাখলেই সেই ঘন কালো চুলের মাঝে নির্দ্বিধায় ডুবে যাবে হাতের আঙুল।

নিজের ইচ্ছেটাকে জোর করে চেপে রাখলো তরী। কিন্তু তরঙ্গ যেন না বলতেই পড়ে ফেললো তার মনের গোপন বাসনাটা। ধীর ভঙ্গিতে বালিশ থেকে মাথা তুলে এসে জায়গা করে নিলো তরীর কোলের মাঝে। তরীর উরুতে মুখ রেখে শাড়ির ঘ্রাণ টানলো তরঙ্গ। অতঃপর, মেয়েটার দু’হাত টেনে এনে নিজের মাথার উপর রেখে দিলো সে।

–” চুল গুলো একটু টেনে দিবেন? শরীরটা ম্যাজ ম্যাজ করছে।”

–” মাথার সাথে শরীরের কি সম্পর্ক?

–” ওমা জানেন না! মাথার সাথেই তো শরীরের কানেকশন। চোখের সাথে মনের! আর…”

–” আর? আর কী?”

পুরো কথাটা শোনার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠলো তরী। কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে রইলো সে তরঙ্গের দিকে। তরঙ্গ ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি টেনে ধীরে ধীরে বাকি বাক্যেটা শেষ করলো;-

–” আর… দেহের সাথে দেহের।”

কথাটা শুনেই থমকে গেলো তরী। বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন কেঁপে উঠলো তার। চোখ সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে ও পারলো না সে। তরঙ্গ তখন ও মিটিমিটি হাসছে। যেন খুব স্বাভাবিক কিছু বলেছে সে। ওমন ভাবেই তাকিয়ে রইলো তরীর মুখপানে। অথচ তার সেই গভীর কণ্ঠস্বর আর চোখের চাহনি মুহূর্তেই এলোমেলো করে দিলো তরীর সমস্ত টা। তরঙ্গ কে ধাক্কা দিয়ে উঠিয়ে দিতে চাইলো তরী। তবে বেহায়া ছেলেটা একটু ও নড়লো না। হাত দুটো গলিয়ে দিলো তরীর উরুর নিচে। শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো তাকে।

–” ছাড়ছি না আপনাকে তরকারি জান। বাই দ্য ওয়ে, ইউ ডোন্ট আন্ডার স্ট্যান্ড মাই ল্যাঙ্গুয়েজ?”

আনমনা তরী অতশত না ভেবেই প্রশ্ন করে বসলো।

–” কি?”

–” আই মিন টু সে দ্যাট, ফিজিক্যাল টু ফিজিক্যাল কানেকশন! ইউ রিলেটেড দিস?”

পুনরায় কথাটা বলেই ভ্রু নাচালো তরঙ্গ। চোখে মুখে সেই চিরচেনা দুষ্টু হাসি। তরী কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। অতঃপর, লজ্জা মেশানো বিরক্তিতে আলতো করে তার চুলে টান দিয়ে বললো;-

–” আপনার মাথায় সারাক্ষণ এসবই ঘুরে, তাই না? পড়াশুনা তো একটু ও করেন না।”

তরঙ্গ হেসে ফেললো। অতঃপর আরেকটু গা এলিয়ে দিলো তরীর কোলের উপর। ওভাবেই শুয়ে থেকে পুনরায় মুখ খুললো সে। আজ যেন উপওয়ালা তার কথার সব বাঁধন খুলে দিয়েছেন। যে ছেলেটা সাধারণত স্বল্পভাষী, সেই তরঙ্গই আজ একের পর এক কথা বলেই চলেছে। তাকে কখনো এতটা প্রাণবন্ত, এতটা উৎফুল্ল দেখেনি তরী।

–” আমি আপনাকে ছাড়ছি না, মিসেস। আপনি আমার র*ক্তে*র সঙ্গে মিশে গেছেন… একেবারে শিরায় শিরায়। আমার হৃদয়ের প্রতিটি র*ক্ত কণিকায় আপনার অস্তিত্ব জড়িয়ে আছে। শুধু দেহের ভাঁজে ভাঁজে মিশে যাওয়াটাই বাকি। তবে সেটাও হয়ে যাবে… একটু সময়ের অপেক্ষা।”

–” এতো পাগলামি ভালো না তরঙ্গ। একটু বুঝুন!”

–” একটা কবিতা শুনবেন?”

–” না,”

–” আপনার শোনা লাগবে না। আমি বলি,

শিরায় শিরায় র*ক্ত,

আমি আমার সিনিয়র বউয়ের

ভক্ত!”

তরী চমকে হা হয়ে গেলো। তরঙ্গ গা কাঁপিয়ে মন খুলে হেসে ফেললো। যেন এই মুহূর্তটার চেয়ে শান্তির আর কিছু নেই তার নিকট। কথার রেশ থেমে যেতেই দু’জনের মাঝে নীরবতা এসে জেঁকে বসল। সেই নীরবতা ফের তরঙ্গ ই ভাঙলো।

–” আপনি অনুতপ্ত! দ্যাট মিন’স, আমি ওইদিন অন্যায় কিছু করিনি।”

শুকনো ঢোক গিললো তরী।

–” আ…মি চড় মারার জন্য অনুতপ্ত! অন্য কিছু না।”

মুচকি হাসলো তরঙ্গ। লাফিয়ে উঠে বসে পড়লো সে। পেছন থেকে তরীকে জড়িয়ে ধরে মুখ গুঁজে দিলো তার ঘাড়ে।

-” তাহলে চলুন, ওইদিনের বাকি পার্টটা ও শেষ করে ফেলি। অ্যাসাইনমেন্ট বাকি রাখা আমার একদম পছন্দ না। তার মধ্যে এই অ্যাসাইনমেন্ট তো আমার জীবনের সবচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট প্রজেক্ট।”

–” আ…হহ, মুখ সরান। দাঁড়ির খোঁচা লাগছে আমার ঘাড়ে।”

–” এমন করছো কেন? মনে হচ্ছে, আমাদের দু’চারটা বাচ্চা হয়ে গেছে। তাই রোমান্স ‘র’ ও ভুলে গেছো!”

তরঙ্গের মুখে হঠাৎ “তুমি” সম্বোধন শুনে শিরশির করে উঠলো তরীর সর্বাঙ্গ। বুকের ভেতরটা অদ্ভুত কাঁপনে কেঁপে উঠলো। এই সম্বোধনটুকু অচেনা এক অনুভূতির শিহরণ বইয়ে দিল মুহূর্তেই। অনুভূতিটা নতুন, এমন অনুভূতির সাথে তো তরীর পরিচয় নেই! তরী দ্রুত নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলো। লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছে তার কান দু’টো। না না, তরঙ্গ কে দেখতে দেওয়া যাবে না সে যে লজ্জা পাচ্ছে। বদ টা আরো ঘাড়ে চেপে বসবে। কাঁপা কণ্ঠে বললো;-

–” আপনি দিন দিন খুব অসভ্য হয়ে যাচ্ছেন।”

তরঙ্গ হেসে উঠলো মৃদু স্বরে। আর ও একটু ঝুঁকে এসে ফিসফিসিয়ে আওড়ালো;-

–” অসভ্য না গো বউ! তোমার প্রতি একটু বেশিই আসক্ত হয়ে গেছি।”

কথা গুলো শুনে তরীর বুক ধক করে উঠলো। চোখ নামিয়ে ফেললো সে। ঠোঁটের কোণে অজান্তেই ফুটে উঠলো ক্ষীণ এক হাসি।

#চলবে

( প্রিয় পাঠক মহল,

অনেকটা ব্যস্ত আছি। লেখালেখির সুযোগ ই পাচ্ছি না। দম ফেলার সুযোগ ও পাচ্ছি না। তার মধ্যে শরীর ভালো নেই। সব মিলিয়ে বেশ প্যারায় আছি। আপনারা তো না বুঝেই চিৎকার করছেন।🙂 সময় পেলে আমিই বড় পর্ব দিতাম। যাইহোক, কেমন হয়েছে বলবেন!)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply