Golpo romantic golpo জল তরঙ্গের প্রেম

জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ২৮


#জল_তরঙ্গের_প্রেম

পর্ব সংখ্যা;২৮

#লেখনীতে_নবনীতা_চৌধুরি

তরঙ্গের হল থেকে ফিরতে ফিরতে দুপুর পেরিয়ে বিকেল হয়ে গিয়েছিল তরীদের।

সূর্যাস্তের পর গাড়ো লালাভ রঙ আকাশের বুক থেকে বিলীন হবে ওমন সময় বাড়িতে প্রবেশ করেছিলো তরী আর তরঙ্গ। রাস্তায় জ্যামে পড়াতেই এতো দেরী হয়ে ছিলো। ভাগ্য সহায় ছিলো বলে মেয়েটার সাথে তরঙ্গ ফিরে ছিলো। নয়তো নার্ভাসনেসের চাপে রাস্তায়-ই অজ্ঞান হয়ে যেতো তরী। কখনো একা একা এতোটা চলাচল করেনি সে। তবুও সাহস করে ভোর সকালে বেরিয়ে পড়ে ছিলো তরঙ্গের কথা ভেবে। তখন ওতো কিছু ভাবেনি সে।

হল থেকে ফিরেই শাওয়ারে ঢুকলো তরী। গরমের মধ্যে সারাদিন সিল্কের শাড়ি পরে থাকায়; ইতিমধ্যে ব্লাউজের স্লিপে থাকা জরি সুতো গুলোর দরুন তার হাতে ক্ষ*ত হয়ে গেছে। শ্যামবর্ণের শরীর হওয়া শর্তে ও জায়গা গুলো লাল বর্ণ ধারণ করেছে। শাওয়ার নিয়ে বেরিয়েই তরী বুঝলো জায়গা গুলো আগে থেকে এখন বেশ জ্ব*লছে। এতক্ষণ এতোটা জ্ব*লেনি। সুতির থ্রি-পিজ পরার পর ও পানির স্পর্শ পেতেই ক্ষ*ত গুলো দ্বিগুণ জ্ব*লতে শুরু করেছে। পিঠের কাছে ও জ্ব*লছে। হতাশ শ্বাস চেপে ওড়না গলায় ঝুলিয়ে রুম থেকে বেরোলো তরী।

তিন্নি টা রুমে নেই। নিশ্চয়ই তরঙ্গের ঘরে গিয়ে তার সাথে খিচুড়ি পাকাচ্ছে। ওরা দু’জন একসাথে থাকলে তরীর হার্টবিট কয়েকগুণ দ্রুত বিট করে। বিচ্ছু দুটো সারাদিন তাকে ট্র্যাপে ফেলার ধান্দা করে কি-না। বিরক্তি নিয়ে তরঙ্গের রুমের সামনে এসে দাঁড়ালো তরী। দরজা টা কিঞ্চিত ফাঁক করে রাখা। কিছু একটা ভেবে, সেই ফাঁকের মাঝে মাথা গলিয়ে দিলো তরী। বিছানার মাঝ বরাবর ব্যাঙের মতো হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে শুয়ে কাটুন দেখছে তিন্নি। একটু ও নড়চড় করছে না সে। খুব মনোযোগী দৃষ্টিতে তরঙ্গের ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে আছে।

তরঙ্গ বাঁদর টা নেই। সস্থির শ্বাস ফেললো তরী। বাঁদর দুটো এক সাথে না থাকলেই শান্তি। উল্টো ঘুরে ফিরে যাবে তার আগেই এক জোড়া আড়ষ্ট হাত নিদ্বির্ধায় তার কোমর চেপে ধরে; থুতনি ঠেকালো ঘাড়ে। হঠাৎ, এমন গভীর স্পর্শে শির শির করে উঠলো তরীর কায়া। মানুষটা কে সে জানে। লজ্জা আর দ্বিধান্বিত হয়ে তরঙ্গের হাত ছাড়ানোর নিমিত্তে ছটপট শুরু করে দিলো তরী। তাতে ও একচুল পরিমাণ ও নড়লো না তরঙ্গ। আরো শক্ত করে নিজের সাথে চেপে ধরলো তরীকে। কানের কাছে ঠোঁট এনে ধীরে ধীরে বললো সে।

–” জামাই কে মিস করছিলেন মনে হয় মিসেস দেওয়ান?”

তরঙ্গের ওমন ধীর কন্ঠের কথা গুলো কর্ণপাত হতেই কোমর থেকে পায়ের পাতা অব্দি অবশ হয়ে এলো তার। অনুভূতি আর মনের দোলাচলে বুকের ভেতরের বন্দি পাখিটি জাপটে উঠলো। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে অনিচ্ছা স্বত্তে ও কঠিন স্বরে তরী বললো।

–” ছাড়ুন অসভ্য। কেউ এসে পড়লে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।”

হো হো করে হেসে উঠলো তরঙ্গ। যেন তরীর খুব মজার কিছু বলেছে। সদ্য শ্যাম্পু করে আসা তরীর চুলের মাঝে মুখ ডুবিয়ে দিলো তরঙ্গ। ভেজা চুল গুলো থেকে ফুলের সুভাষ আসছে। লম্বা করে শ্বাস টানলো সে।

–” কেউ দেখলেই বা কি? আমি আমার বউ কে জড়িয়ে ধরেছি। তুমি আমার বউ! কারো বাপের সম্পত্তি না। যে আমি ভয় পাবো।”

তরঙ্গের ঠোঁট ছুঁইয়ে প্রতিধ্বনিত হওয়া “বউ” শব্দটি কানে আসতেই বুকের ভেতর অচেনা এক সুখের ঢেউ আছড়ে পড়লো তরীর। যেন এক মুহূর্তেই সমস্ত পৃথিবী নরম হয়ে এলো তার কাছে। লাজুক হাসিতে রাঙা হয়ে উঠলো মুখশ্রী। অকারণে কাঁপতে থাকা অধরদ্বয় সামলে নিতে ধীরে জিভ ছুঁইয়ে ভিজিয়ে নিলো সে। নিচু হয়ে আসা চোখের পাতার আড়ালে তখন লুকিয়ে ছিলো হাজারটা না বলা অনুভূতি।

–” আমার সামনে বার বার ওমন করে ঠোঁট ভেজাবে না তো! অনর্থ হয়ে যাবে তরকারি জান। ভাত হওয়ার অপেক্ষা করবো না। শুধু তরকারি টুকুই খেয়ে ফেলবো।”

লজ্জায় থরথর করে কেঁপে উঠলো তরী। তরঙ্গের বাহু বন্ধনে আবদ্ধ শরীরের সেই কম্পন তার অজানা রইলো না। ঠোঁটের কোণে দুষ্টু এক হাসি ফুটিয়ে তরঙ্গ মুখ ঝুঁকিয়ে আলতো করে চুমু এঁকে দিলো তরীর নরম গালে। পর পরই মাথায় দুষ্টুমি বুদ্ধি এঁটে দাঁতের ছোঁয়া বসিয়ে দিলো তরীর কোমল গালে। ব্যথার তীব্রতায় মেয়েটা মৃদ্যু চেঁচিয়ে উঠলো।

–” আহহহ,”

তরীর ওমন ক্ষীণতর চিৎকারে তরঙ্গ আরো উন্মত্ত হয়ে উঠলো। এক টানে তরীকে নিজের দিকে ফিরিয়ে নিলো সে। মেয়েটার কাঁপতে থাকা দু’হাত নিজের এক হাতের মুঠোয় বন্দী করে অন্য হাতে আলতো ভাবে চেপে ধরলো তার গাল। পরমুহূর্তেই অস্থির চুমুর ছোঁয়ায় ভরে উঠলো তরীর গলা আর ঘাড়। চুমুতে চুমুতে থিতিয়ে দিলো তরীর শরীর। এলোমেলো নিশ্বাসে কেঁপে উঠলো মেয়েটা। তরঙ্গ সেই কাঁপনটুকু ও অনুভব করলো নিজের সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে।

সময় নিয়ে নিজেকে সামলে তরঙ্গ থামলো। বাম হাতের উপর পৃষ্ঠে নিজের ঠোঁট জোড়া মুছে ফিচেল হাসলো সে। ডান হাতটা বাড়িয়ে আলতো করে ছুঁয়ে দিলো কামড় দেওয়ার স্থানটা। চোখ মুখ কুঁচকে নিলো তরী।

–” খুব তো আমাকে দূরে সরাতে চান। এবার যতবার আয়নায় চোখ রাখবেন, ততবারই আপনার সেই প্রতিচ্ছবিতে আমার ভালোবাসার পরশ লেগে থাকবে। প্রতিটি প্রতিচ্ছবির আড়ালে আপনি আমাকেই খুঁজে পাবেন, ম্যাডাম। তখনি, আপনার মনের গোপন কুঠুরির আয়নায় ও ভেসে উঠবে আমার মুখ। আমি এমনভাবেই থেকে যাবো আপনার মনের ভেতরে, বাহিরে সবখানে। যেন চাইলে ও আমাকে ভুলে থাকা সম্ভব না হয়।”

*******

ড্রয়িং রুমে সবাই উপস্থিত।

তরী একে একে সবার পাতে ভাত বেড়ে দিচ্ছে। ছেলে এবং স্বামী থাকার দরুন আজ সাহনারা ও তরীর সাথে হাতে হাতে কাজ করে দিচ্ছে। ফোরকান দেওয়ানের অপর পাশের চেয়ারে ফারহান দেওয়ান বসেছেন। বুশরা আর সাহনারার মাঝে তিন্নি বসেছে। তরঙ্গ এক সাইডে একাই বসেছে। সে বুদ্ধি করে মাঝের চেয়ারে বসেছে। যাতে তরীকে তার পাশেই বসতে হয়। সবাই কে খাবার দেওয়া শেষ হতেই ফোরকান দেওয়ান মুখ খুললেন।

–” তুমি ও বসো পড়ো তরী।”

–” না আব্বু, আমি পরে খাবো।”

ভাতের প্লেটে চোখ রেখেই ঘাড় বাঁকিয়ে সুধালো সে।

–” বেশি খাবি বললেই হয়। এখনি নে, নিষেধ তো করছে না কেউ।”

তরঙ্গের খোঁচা দেওয়া কথা শুনে তাজ্জব বনে গেলো। সহসা প্রতিবাদের সুরে বললো সে।

–” আমি তা কখন বললাম?”

–” তবে এখন বসবি না কেন?”

তরঙ্গের কথার খোঁচায় না পারতে তার পাশে গিয়ে বসে পড়লো তরী। তরীকে বসতে দেখেই ভুবন ভোলানো হাসি দিলো তরঙ্গ। বাম হাত বাড়িয়ে খপ করে তরীর হাতটা নিজের মুঠোয় পুরে নিলো সে। নিজের হাত আর তরঙ্গের হাতের দিকে তাকিয়ে মিনমিনে কন্ঠে বলে উঠলো তরী;-

–” এটা কেমন অসভ্যতামি তরঙ্গ?”

তরীর মতোই নিচু স্বরে জবাব দিলো তরঙ্গ।

–” নরমালি ছুঁলেই অসভ্যতামি হয়ে যায় তাই না? ছুঁয়ে দিবো নাকি অসভ্যের মতো? অসভ্যতামি করলে সামলাতে পারবি আমাকে?”

সহসা চুপ করে গেলো তরী। লজ্জায় আইঁ ঢাঁই করে উঠলো সে। এই অসভ্যের সাথে কথা বলাটাই পাপ। যখন তখন তার রোমান্টিক মুড অন হয়ে যায়। জবানখানা হয়েছে একদম ননস্টপ রের্কোডার। বাজতে শুরু করলে আর বন্ধ হওয়ার নাম নেয় না।

খাওয়ার মাঝেই করুণ সুরে ফারহান দেওয়ান সুধালেন।

–” কি রে মামনি, তোমার গালে কি হয়েছে? ফুলে আছে কেন?”

চাচ্চুর কথায় চমকে সহসা নিজের ডান গালে হাত রাখলো তরী। মূহুর্তেই সন্ধ্যার ঘটনা মনে পড়ে গেলো তার। অসভ্যটা সন্ধ্যায় কু*কু*রের মতো কামড়ে দিয়ে ছিলো। তাই এখন তার গাল ফুলে আছে। তরীর ইচ্ছে করলো চাচ্চুকে বলতে;-

–” তোমার কু*ক্তা ছেলে মাংস খেতে না পেরে আমার গালের মাংস কেড়ে নিয়েছে চাচ্চু। তোমার ছেলেটাকে একটু শাসন করো তো। সে খুব জ্বালায় আমাকে।”

কিন্তু মনের কথা মনে রেখেই ভদ্র ভাবে সে জবাব দিলো।

–” বিকেলে ঘুমিয়ে ছিলাম। তখন মশা কামড় দিয়েছে চাচ্চু।”

–” ইশশ মা, কীভাবে ঘুমিয়েছিলে তুমি? কয়েল জ্বালাবে না?”

ভাই আর মেয়ের কথা শেষ হতেই। গম্ভীর কন্ঠে ফোরকান দেওয়ান সুধালেন।

–” তুমি নিজের প্রতি বড্ড অবহেলা করছো তরী। তোমার মায়ের যাওয়ার পর থেকে এমন অগোছালো হয়ে পড়লে কেনো?”

বাবার কথায় চোখ ছলছল করে উঠলো তরীর। গাল গড়িয়ে দুই ফোঁটা পানি পড়লো তার ভাতের প্লেটে। চাচা-বাবার তোয়াক্কা না করেই। সযত্নে হাত বাড়িয়ে তরীর গাল মুছিয়ে দিলো তরঙ্গ।

–” উফফস, এসব কি! আই ডোন্ট লাইক টিয়ার। প্লিজ স্টোপ দিস গাইজ।”

–” হ্যাঁ, খাও সবাই।”

পরপর সবাই আবার খাওয়ায় মনোনিবেশ করলো। খাওয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত আর তরীর হাত ছাড়লো না তরঙ্গ। সবাই খাওয়া শেষ করে উঠে যেতেই তরঙ্গ তরীর হাত ছাড়লো। মাথা নামিয়ে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো তার হাতে। পর পর উঠে গিয়ে হাত ধুয়ে সোফায় বসে টিভি ছেড়ে দিলো তরঙ্গ। টেবিলের সব কিছু গুছিয়ে তরী সিঁড়ির দিকে যেতেই নিচু স্বরে গান ধরলো ছেলেটা।

–” আমাদের প্রেমের পরোয়ানা জারি,,

হয়ে গেছে অনেক ই আগে!

ও তরী রে তরী।

আয় না একটু কাছে!

ও তরীরে তরী একগুচ্ছ ভালোবাসা তোকে দেওয়ার আছে।”

#চলবে

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply