#বোনাস_পর্ব
#সুরভী_আক্তার
( অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষেধ )
লোকটার শান্ত জবান টা উঁচু হতেই খিটখিটে শোনালো । সহসা মুখ ভোঁতা করে ফেললো শাফাহ্ । বাড়ির সবার উপস্থিতি এখানে । যুবকের উচ্চকণ্ঠে তারাও তাকালেন একই সাথে । তবে এই ধমকে রাগ খুঁজে পেলেন না কেউ । বরং পেলেন একরাশ উহ্য উদ্বেগ ।
শাফাহ্ সোফার উপর রাখা খাবারের প্লেটটা ইশারা করে মিনমিন করে…..
” খাবো তো এক্ষুনি ! এভাবে গলা চড়িয়ে কথা শোনাচ্ছেন কেনো ? ভালো লাগে না কিন্তু !
” গলা চড়িয়ে কথা বললাম কখন ? নরমালি তো বলছি । আচ্ছা স্যরি,, খেয়ে নাও ।
মেঘা দুজনের কথায় এক পশলা হাসে…..
” ভাইয়া,, তুমি এখানেই বসো । আমি তোমার খাবার এখানেই এনে দিচ্ছি ।
বলেই টেবিলের দিকে এগোলো সে । ইয়াশ দম ছেড়ে শাফাহ্’র পাশে বসে । মেয়েটাকে এখনো নিশ্চল দেখে মাথা নাড়ে দুটিকে । খাবারের প্লেট হাতে তুলে নিয়ে বলে নিচু গলায়…..
” টকেটিভ লেডি,, বড্ড অবাধ্য হয়েছো তুমি । কিছু বললেই গাল ফুলিয়ে বসে থাকো । খাওয়ার সময় পেরিয়ে যাচ্ছে, সে খেয়াল আছে ? টাইম টু টাইম খেতে হবে তো জান….
বলেই নিজ হাতে খাইয়ে দিতে লাগলো স্ত্রীকে ।
খাওয়া শেষে সিঁড়ি ওঠার ফুরসতে অতৃপ্ত আড়চোখে দুটোকে অবলোকন করে নিলো শুভ্র ।
সে আবার আরেক অবাধ্য,, জেদ চেপে বোনের সাথে কথা বলে নি চারটে বছর । এখনো অবিরাম রয়েছে সেই জেদ । তবে অসহায় লাগে এখন । অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর গোলগাল বোনটাকে দেখতে বেশ মায়া মায়া লাগে । ওর বোন কতটা বড় হয়ে গেছে, মা হবে কদিন বাদ । ডেলিভারি ডেট আসতে এখনও দেড় মাস আছে বোধহয় ।
শাফাহ্’র সাথে কথা বলার জন্য মনটা বড্ড আঁকুপাঁকু করে । বোনকে সামনে বসিয়ে চোখ ভরে দেখার সাধ জাগে । আগের মতো ওর আহ্লাদ, আবদার গুলো পূরন করতে ইচ্ছে করে ।
তবে ওই যে জেদ আর মনোকষ্ট, সেটার পিষ্টে সব আশা আকাঙ্ক্ষা বিসর্জন দেয় যুবক । নিজেকে বহু কসরতে ধাতস্থ রাখে । এতো বছর পর শাফাহ্ কে আগের মতো স্নেহ করতে বাঁধে কোথাও একটা । হয়তো শাফাহ্ও ভাইয়ার থেকে দূরে গিয়ে সেই শূন্যতা টা মানিয়ে নিয়েছে এতো দিনে ।
শুভ্র যতদূর বোঝে, তাতে ইয়াশ ওর অযত্ন হতে দেয় না । তবে বোধহয় সায়ান আরো বেশি যত্ন নিতে পারতো ।
এই মেয়েটার যত্নের ভার না পেয়ে, সে ছেলে এখন নিজের যত্ন ও ভুলে গেছে ।
ভাবতে ভাবতে সিঁড়ি ডিঙিয়ে উপরে ওঠে শুভ্র । করিডোরে থেমে আরেকবার তাকায় নিচে । কথা বলতে বলতে ইয়াশ খাইয়ে দিচ্ছে ওর বোনকে । সে না চাইতেও মুচকি হাসলো । ছলছল করলো চোখ । খুব বেশি ঝাপসা হওয়ার আগেই হাতের পিঠে চোখ মুছে দীর্ঘ শ্বাস ছাড়লো ।
অফিসে বেরোবে এখন । ঘরে ঢুকলো সে ।
খেতে খেতে ডাকে শাফাহ্……
” মেঘার ভাইয়া ?
” হু, মেঘার ননদ !
” আমার বেবি তো এখানেই হবে, তাই না ?
একটু থামলো যুবক । তাকিয়ে বললো নরম গলায়…..
” হু,, আর জার্নি করা ঠিক হবে না । একবার যখন এসেই গেছো, তখন বেবি হওয়া পর্যন্ত এখানেই থাকবে তুমি । এমনিতেও এখানে সবাই আছেন । কোনো প্রবলেম হবে না । তোমার টেক কেয়ার করার জন্য অনেককে পাবে তুমি !
” আপনি হলেই আমার চলবে !
মেয়েটা আমুদে গলায় কথা টুকু শেষ করে খাবার চিবুতে চিবুতে ইয়াশের কাঁধে মাথা নামিয়ে রাখে ।
ইয়াশ হাসে তৃপ্ত ।
” শোনো,, আমি কিন্তু চারদিন পর ফিরে যাবো !
ঝট করে মাথা তুললো রমনী…..
” ফিরে যাবেন মানে ?
” হু । তোমার ডেলিভারি ডেট তো দেরি আছে এখনো । এতো দিন এখানে থাকা পসিবল হবে না । খারাপ দেখায় । তার উপর হসপিটাল আছে আমার । তোমাকে এখানে রেখে যাবো সবার কাছে । আবার ডেলিভারি ডেটের পনেরো বিশ দিন আগেই আসবো ফিরে আবারো ।
” নাআআআ,, কোথাও যাবেন না আপনি !
মেয়েটার কন্ঠে ধরা জেদ….
” যেতে হবে, জান । জাস্ট কটা দিনের জন্য । এই কদিন বাকিরা তোমার খেয়াল রাখবে । মেঘাও আছে এখন । কোনো সমস্যা হবে না ।
” কিন্তু আমার শুধু আপনাকে লাগবে,, কোত্থাও যাবেন না আপনি ! আপনি চলে যাওয়ার পর যদি আমার খারাপ কিছু হয়ে যায় ?
” টুকটুকি !
কন্ঠ চড়িয়ে বাজখাঁই করলো যুবক ।
রমনীর সমাপ্ত বাক্য মোটেও পছন্দ হলো না তার । চোখ রাঙিয়ে তাকালো সে । উচ্চ ধমকে উপস্থিত বাকিরা ফিরে চাইলেন অগত্যা ।
মেঘা তড়িঘড়ি করে শুধোয়…..
” কি হলো, ভাইয়া ?
ফোঁস করে শ্বাস ফেলে তপ্ত যুবক । হাতের প্লেট খট করে রাখে সামনের কাঁচের টেবিল টায় । এঁটো হাত ঝাড়া মেরে বলে মাড়ি খিচে….
” তোর ননদ কথা মেপে বলতে বল ! মুখে কিছু আটকায় না ওর । যা ইচ্ছে তাই বলে দেয় । শোনো,, আমার কিন্তু মোটেও পছন্দ নয় এমন কথাবার্তা । ফার্দার নিজের বিষয়ে খারাপ চিন্তা ভাবনা করলে ভালো হবে না বলে দিলাম । কিচ্ছু হবে না তোমার, বুঝলে ?
বাকহারা হয়ে চেয়ে রয় চঞ্চলা । সে তো এমনি এমনি বলছিলো আরকি । ইয়াশ এতোটা গায়ে মাখবে, বুঝতে পারে নি ।
ধমক ঝেড়েই উঠে দাঁড়ালো যুবক । খাওয়া ফেলে ঘরের দিকে এগোলো ওকে একা রেখে ।
ওকে বাঁধা দিতে তাৎক্ষণিক চট করে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে কুকিয়ে ওঠে রমনী । কিঞ্চিত টানে পেট চেপে গুঙ্গিয়ে ওঠে মৃদু শব্দে । থমকে যায় তপ্ত যুবকের ঔদ্ধত্য কদম । ফিরে চায় চট করে । মেয়েটাকে পেট চেপে ধরতে দেখে তেড়ে আসে…..
” টুকটুকি,,, কি হলো ?
দাঁত চেপে নিজের ব্যাথা গিলে নেয় রমনী । শাহিনা কাবির সহ মেঘা ছুটে…..
” কি হলো টুকটুকি,, ঠিক আছিস ?
” হু ।
ওকে ধরে বসানো হলো । উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লো যুবক…..
” প্রবলেম হচ্ছে কোনো ?
ডেলিভারি ডেট দেরি আছে এখনো । সেই চিন্তা করে শাফাহ্ নিজের অবনতির কথা বলে ইয়াশের দুশ্চিন্তা বাড়ালো না আর । ছল কাটালো…..
” না,, তেমন কিছু না । পায়ে টান ধরেছে একটু । হাঁটতে গেলে ব্যাথা পাচ্ছি ।
তপ্ত যুবক কি বুঝলো কে জানে । অযুহাত ধরতে পারলো না । মেয়েটাকে হেলান দিয়ে বসিয়ে পাশে বসলো । আগাম বার্তাহীন ওর পা দুখানি আলগোছে তুলে নিলো উরুর উপর ।
তার এহেন কান্ডে সবার দৃষ্টির সম্মুখে হকচকিয়ে যায় শাফাহ্…..
” মেঘার ভাইয়া,,, কি করছেন ?
” পায়ে ব্যাথা হচ্ছে তো ? ফুলে গেছে ! বসে থাকো, একটু ম্যাসাজ করলে ব্লাড সার্কুলেশন নরমাল হয়ে যাবে । ডোন্ট ওয়ারি জান, কিচ্ছু হবে না তোমার । আর জাস্ট কটা দিন । তারপর আর কোনো সমস্যা হবে না ।
গোটা লিভিং রুমে যে এতো গুলো মানুষ উপস্থিত, তা কি খেয়ালে আছে যুবকের ? চোখ তো শাফাহ্ ব্যাতীত কোনো দিকেই নেই । সবাই বৃহৎ সন্তুষ্ট নয়নে চেয়ে রয়েছেন এই যুবকের পানে । কে বলবে, এই ছেলে তাদের মেয়েকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে জোর করে বিয়ে করেছে ! তাও আবার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ।
এই চিন্তা মনের কোণে উঁকি দিতেই ওষ্ঠ প্রসার হতে বাকি রইলো না কারোর । অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে প্রশান্ত হাসলেন প্রত্যেকে ।
সেই যুবকের খেয়াল নেই আদৌও । নিজের স্ত্রীর পদ যুগল উরুতে তুলে খুব যত্নের সহিত মালিশ করতে ব্যস্ত সে । তার ধ্যান না থাকলেও শাফাহ্ তো আর বেখেয়ালি নয় এ বেলায় । ভারী লজ্জা পেলো রমনী । ইশশ্, আব্বু আম্মু, বাবাই মামনি, সবাই আছেন এখানে । মেয়েটা চিবুক নত করে নিলো । আদ্র মুচকি হেসে ঘাড় নাড়িয়ে ভার্সিটির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যায় । বাকিরাও ওদের একলা রেখে চলে যান যে যার ঘরে ।
মিনিট কয়েক বাদ রেডি হয়ে নিচে নামে শুভ্র । প্রথমেই দৃষ্টি আটকায় সোফার নিকট । কিছু মূহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয় সে । শাফাহ্ মাথা কাত করে রেখেছে ইয়াশের বাহুতে, আর ঐ ছেলে এখনো দুহাতে রমনীর পায়ে ম্যাসেজ করতে মগ্ন । এতে বেশ আরাম পাচ্ছে রমনী । এর মধ্যেই আবদারের সুরে মিনমিন করে বললো…..
” মেঘার ভাইয়া,,, আমার না আইসক্রিম খেতে করছে !
যুবকের উত্তর…..
” ঠান্ডা লেগে যাবে !
” লাগবে না । খেতে ইচ্ছে করছে,, আমি খাবো ! ব্যস, কোনো বারন শুনবো না ।
” শুনতে হবে বারন । বেবির ও তো ঠান্ডা লাগবে ।
” যে আসেনি এখনো, তার চিন্তা করছেন ! অথচ এদিকে যে আমার খেতে ইচ্ছে করছে ! তার চিন্তা করছেন না ?
” তোমার চিন্তা করতে বয়েই গেছে আমার । কে তুমি, যে আমি তোমার চিন্তা করবো ?
যুবক টিটকারী কাটলো রসিক স্বরে ! শাফাহ্ সরে আসে । বুঝেও গাল ফোলায়….
” মেঘা ভাইয়া,, ভালো হচ্ছে না কিন্তু !
” মেঘার ননদ, খারাপের কি দেখলে ?
” ধ্যাত,,, আপনি আমাকে একটুও ভালোবাসেন না !
” বাসি না তো । আই হেইট ইউ,, বুঝলে ? আই হেইট ইউ, জানননননন !
ফিক করে হেসে ওঠে রমনী । লাজে রাঙা হয়ে ফের যুবকের বাহু পেঁচিয়ে নিয়ে বলে নিচু গলায়….
” আইসক্রিম খাবো !
এ বেলায় সায় দিলো যুবক ।
” আচ্ছা,, বিকেলে বাইরে গেলে নিয়ে আসবো, ওকে ?
খুশিতে গদগদ হলো রমনী ।
শুভ্রর কানে পড়লো সবি । দৃষ্টি কুঞ্চিত হলেও মানে বুঝলো সবের ।
সে চোখ ফিরিয়ে গলা তুলে বললো…
” মেহের,, আমি অফিসে গেলাম ।
ঝট করে মাথা তোলে রমনী । বেখেয়ালে চোখাচোখি হয় ভাইয়ার সাথে । শুভ্রর দৃষ্টি একে একে দুজনের সাথেই মিললো । সাবলীল ভাবে দৃষ্টি ফিরিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো সে ।
★
বিকেল গড়িয়েছে ।
মেঘার ঘরে রোশ্, ইবাদ , আদ্রিজা,, তিনটে বাচ্চাই ছিলো । খেলনা ছড়িয়ে বিছানার উপর খেলছিলো ওরা ।
তবে আকস্মিক চিৎকার জুড়ে কেঁদে উঠলো আদ্রিজা । এই একটু আগেই তো খেলছিলো খুশি মনে ।
মেঘা যেইনা একটু চোখের আড়াল হয়েছে, অমনি তীব্র কান্নার রোল ভাঙলো ঘরে । শিশির সহ আবারো ওদের কাছে ছুট্টে গেলো মেঘা ।
তড়িঘড়ি করে মেয়েকে কোলে টেনে নেয় শিশির । বিচলিত হয়ে পড়ে…..
” কি হলো মা,, কাঁদছো কেনো ?
ইবাদ ইনোসেন্ট মুখে খাটের একপাশে হাত গুটিয়ে বসে আছে । পিটপিট করে দেখছে । রোশ্ আঙ্গুলের ইশারায় অভিযোগ করে ঝেড়ে উঠলো…..
” ইপাদ ব্যাদ বয়, ও মেলেচে !
ছেলের দিকে চোখ পাকিয়ে তাকায় মেঘা….
” ইবাদ,, সিস কে মেরেছো তুমি ?
ছেলেটার বাচ্চা সুলভ অকপট জবাব…..
” ও আমাল সিস নয় ।
” ও তোমার সিস । মেরেছো কেনো ওকে ?
” মালিনি,,, তুমু কেয়েতি ।
চুমুর সাথে সাথে খামচি দিয়েছে, সেটা আর স্বীকার করলো না ভয়ে । মেঘা ছেলেকে কথা শোনায় । ভালো মতো বোঝায়, রোশের মতো এটাও তার বোন । কিন্তু এই ছেলে এ অবধি কোনো সম্পর্কই বুঝে ওঠেনি এখনো । রোশ্ সবাইকে চিনেছে মোটামুটি ।
রৌদ্র আর আদ্র বাড়িতে নেই কেউ । দুপুরে ভার্সিটি থেকে ফেরার পর ভাইকে নিয়ে বেরিয়েছে আদ্র । হাঁটতে গেলে রৌদ্রের পায়ে খুব বেশি বল আসে না । সেটার জন্যই বেশ কিছু মেডিকেল স্ক্যান করানোর ছিলো আজ ।
ওরা ফিরলো আরো আধা ঘন্টার মধ্যে । শাফাহ্ তখন ড্রইং রুমে বসে আছে ক্লান্ত হয়ে,, খানিক আগে হাঁটাহাঁটি করছে একটু । আর পারছে না । সে যথেষ্ট বুঝতে পারছে, এবারে অসুবিধা বাড়ছে বোধহয় । পেট শক্ত হয়ে গেছে । পিঠে টান ধরেছে বড্ড । ব্যাথা ব্যাথা অনুভব হচ্ছে । বাড়ছে পাল্লা দিয়ে । সহ্য ক্ষমতা ছাড়াচ্ছে এবার । হাঁপিয়ে উঠে হাঁসফাঁস করে শ্বাস টানছে রমনী । আদ্র ওকে ওভাবে দেখে কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করে…..
” টুকটুকি,,, এমন করছিস কেনো ?
মেয়েটা না তাকিয়ে উত্তর করে…..
” একটু হাঁটাহাঁটি করেছি তো,, তাই বোধহয় শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে । আমি ঠিক আছি ভাইয়া ।
আর কথা বাড়ালো না আদ্র । গা ম্যাজ ম্যাজ করছে । রৌদ্রকে ঘরে ছেড়ে ফ্রেশ হতে নিজের ঘরে উঠলো সে ।
আরো মিনিট কয়েকের মধ্যেই শুভ্র ফিরলো অফিস থেকে । হাতে একটা মাঝারি আকারের থার্মাল ক্যারি ব্যাগ । ভেতরে কিছু আছে । পেছন থেকে শাফাহ্ কে দেখলো যুবক । ঢোক গিললো ।
হাতের ব্যাগটা চেপে ধরে দাঁড়িয়ে রইলো এক মুহুর্ত । অতঃপর বুক ভরে শ্বাস টেনে হনহনিয়ে এগিয়ে ব্যাগটা রাখলো ঠিক শাফাহ্’র সামনে ।
শাফাহ্ তাকালো ঘোলাটে সিক্ত নয়নে । এতক্ষণে রমনী ঘেমে নেয়ে একাকার । শুভ্রর দৃষ্টি নত । মেয়েটার দিকে চোখ তুলে তাকালো না আর । কিছু আন্দাজও করতে পারলো না । আইসক্রিম টাব এনেছে বোনের জন্য । এ কথাও মুখ ফুটে বললো না । তার আগেই পা বাড়ালো সিঁড়ির দিকে । অমনি হাঁসফাঁস ডাক পেলো…..
” ভাইয়াআআআআআহ্ !
থমকালো যুবক । সব ভুলে সাঁড়া দিতে চাইলো এবার । তবে পিছু ফেরার আগেই ব্যাথিত গলা চিরে গুঙ্গিয়ে উঠলো তার বোন…….
” আআআআআহ্,,,, আম্মুউউউ !
তাৎক্ষণিক আঁতকে ঘাড় ফেরায় শুভ্র । শাফাহ্ কাতরাচ্ছে যন্ত্রণায় । চোখ মুখ খিচে রক্ত বর্ন হয়ে এসেছে ।
যুবক স্তম্ভিত হয় । তাৎক্ষণিক সবটা বুঝতে বেগ পায় । ফের অবিকল এক গলায় গুঙ্গিয়ে ডাকে রমনী…..
” আম্মুউউউ,,,
ধক্ করে ওঠে শুভ্র । ধড়ফড়ে কদম বাড়িয়ে ছুটে যায় । ঢোক গিলে নীরস গলা চুবিয়ে আমতা আমতা করে । বহু বছর পর ডাকে বোনকে…..
” টুকটুকি…..
অগত্যা ঠোঁট ভেঙে হু হু করে কেঁদে ওঠে রমনী । ব্যাথায় চিৎকার দেয় । জবান চিরে কথা ফোটাতে হিমশিম খেয়ে যায় । ভেঙ্গে ভেঙ্গে বাক্য খসায়…
” ভাইয়া,,, আমার,,, আমার যন্ত্রণা হচ্ছে ভাইয়া !
মুখ মন্ডলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে যুবকের । হন্নে হয়ে বোনের মুখোমুখি বসে । ওকে টেনে নেয় নিজের কাছে । মুখ আজলে তুলে না বুঝে ব্যাকুল হয়ে পড়ে……
” কি হয়েছে বনু ? এমন করছিস কেনো ? যন্ত্রণা হচ্ছে মানে ? কেমন লাগছে তোর ? কোথায় যন্ত্রণা হচ্ছে বল ?
মেয়েটার ব্যাথা বাড়ে তড়তড় করে । শ্বাস রোধ হয় যন্ত্রণায় । শব্দ করে কাঁদে !
শঙ্কিত হয় শুভ্র । কিছু আন্দাজ করতে পেরে বাড়ি কাঁপিয়ে চিৎকার দেয়…..
” আম্মু, মেহের, কে কোথায় আছো তাড়াতাড়ি এসো প্লিজ !
হাঁক ছেড়ে সে ছটফট করে বোনের দিকে ধ্যান ফেরায় । শাফাহ্ তড়পাচ্ছে । শুভ্র দিশেহারা হয়ে পড়লো । এলোমেলো হয়ে এলো মস্তিষ্ক । মেঘা এক ছুটে ঘর থেকে বেরোয় । উপর থেকে বাদ বাকিরা নিচে নামার আগেই ছুটে যায় রমনী ।
” টুকটুকি, কি হয়েছে তোর ? শুভ্র ভাইয়া, চেঁচালে কেনো এভাবে ? টুকটুকির কি হয়েছে ?
” দেখনা মেঘা, ছটফট করছে ও ! এই বনু, কি হয়েছে বলবি তো ? পেটে ব্যথা উঠেছে ?
এই শোন, আমি আইসক্রিম এনেছি তোর জন্য । খেতে চেয়েছিলো তো ! খাবি না ? কোথায় যন্ত্রণা হচ্ছে বল আমায় !
শাহিনা কাবির, রুবিনা কাবির, মেহের হন্তদন্ত হয়ে আসলো । আদ্র আর শিশির ও বাদ পড়লো না । মেয়েকে আগলে ধরলেন ভদ্রমহিলা ।
” শাফাহ্, কি হয়েছে মা ? ব্যথা হচ্ছে পেটে ? কিন্তু, তোর তো ডেলিভারি ডেট দেরি আছে এখনো । নরমাল পেইন,, না খুব বেশি ব্যাথা হচ্ছে, বল ?
মেয়েটা ব্যাথায় কুল পায় না । গলা ফুটে উচ্চারণ হয় না ধ্বনি । সবার প্রশ্নের বিপরীতে ব্যাথা সয়ে নেওয়ার মুহুর্তে মনে হলো,, শরীরের ভেতর থেকে উষ্ণ একটা স্রোত পা বেয়ে নেমে যাচ্ছে বোধহয় ।
আতঙ্কে ধক্ করে ওঠে চঞ্চলা । ঝাপসা চোখে পায়ের দিকে তাকায় । লাল তরলের ধারা গোড়া ছুঁইয়ে ঝকঝকে মেঝেতে নকশা এঁকেছে । তা দেখে থরথর করে কেঁপে উঠলো রমনী । কিয়ৎ কালের জন্য খাঁচা ছাড়া হলো আত্মারাম । টুপ টাপ পানি ঝড়লো চোখ হতে । বুক খিচে এলো তার । শ্বাস টানার জন্য হয়ে উঠলো ব্যাকুল । সবার আগে অসহায়ত্ব জাগলো,, ইয়াশ নেই ওর সাথে । লোকটা তো ওর জন্য আইসক্রিম আনতে গেছে ! কি হবে শাফাহ্’র ? ঐ লোকটাকে কি আর দেখতে পাবে না রমনী ? এই ভাবনা আসতেই ফিকড়ে ওঠে মেয়েটা । আওড়ায় অস্ফুটে কিছু একটা ।
আদ্রের চোখেও পড়ে মেঝেতে গড়িয়ে পড়া রক্তের স্রোত টুকু । শঙ্কিত হয়ে অসার গলা তোলে সে….
” ভাইয়া,, ব্লাড !
আতঙ্কবিহ্বল চোখে মেঝের দিকে তাকায় শুভ্র । ছ্যাত করে ওঠে । শাহিনা কাবির ও আঁতকে ওঠেন ।
শুভ্র আর থামলো না, বুঝতে চাইলো না আর কিছু । দিলো না কাউকে কিছু বলার সুযোগ । কি হতে চলেছে, তা দিকবিদিক জ্ঞান শূন্য হয়েও যথেষ্ট বুঝতে পারলো সে । মেহেরের মিসক্যারেজের সময় ঠিক এমনটাই হয়েছিলো । যদিও এর সাথে ঐ পরিস্থিতি ভিন্ন । শাফাহ্’র লেবার পেইন উঠেছে নিশ্চিত । তবুও ত্রাসে আত্মহারা হয়ে পড়লো যুবক । উঠে দাঁড়ালো ধড়ফড় করে । বোনের ভারী দেহখানা খুব সাবধানে পাঁজাকোলা করে নিতে নিতে হুংকার ছাড়লো কাঁপা গলায়…..
” আদ্রওওও, গাড়ি বের কর,, ফাস্ট !
আদ্র থামে না ।
রুমে ঢুকে ফ্রেশ ও হওয়া হয় নি । সে দিকভ্রান্ত হয়ে আবারো ছুটলো বাইরের দিকে ।
পিছু পিছু বোনকে আগলে নিয়ে হন্নে হয়ে ছুটলো শুভ্র । রমনীর প্রসব রুধিরে রাঙা হয়ে উঠলো যুবকের দেহের অর্ধেকাংশ । বোনের ভারী দেহের ভারটা খুব হালকা লাগলো তার নিকট । শঙ্কায় বুকে চললো তীব্র তোলপাড় তান্ডব । বুকে পানি নেই ।
বাড়ির সবাই উৎকন্ঠায় দিশেহারা হয়ে পড়লেন । বাচ্চাদের খেয়াল শিশিরের উপর রেখে মেঘা ছুটলো ওদের সাথে । দুই কর্তা কেউই বাড়িতে নেই । কান্নার রোলে ভরে উঠলো গোটা কাবির ম্যানশন ।
ড্রাইভিং সিটে আদ্র । পাশে মেঘা । পেছনের সিটে বোনকে নিয়ে বসেছে শুভ্র । মেয়েটা হাঁসফাঁস করছে, কাতরাচ্ছে । এ যে ভীষণ যন্ত্রণা, কাকে বোঝাবে সে ? মনে হচ্ছে শরীরের হাড়গুলো মটমট করে ভাঙছে কেউ । হাজারো সংশয় জাগছে ভেতর ঘরে । দুনিয়ার আলো, বাতাস, ফুরিয়ে আসছে না তো তার জন্য ?
শুভ্র ব্যাতি ব্যস্ত হয়ে বোনকে বুকে চেপে ধরে সামলায়….
” বনু, এইতো আমরা হসপিটাল চলে যাবো এক্ষুনি ! কিচ্ছু হবে না তোর । একটু সহ্য কর প্লিজ ।
শাফাহ্ চোখ তুলে তাকালো । প্রচন্ড ব্যাথা গিলে নিলো অনায়াসে । কত বছর পর শুভ্র ফিরে চেয়েছে ওর পানে । যন্ত্রণার মাঝেও কি ভীষণ আনন্দ লাগছে রমনীর ।
এই আনন্দে চোখ জ্বলছে । কান্না পাচ্ছে ভীষণ । সে আর নিজেকে সংবরণ করলো না । অঝোরে ডুকরে উঠলো….
” ভাইয়াহ্,, তুমি আমার সাথে কথা বলো নি অনেক দিন । আমি কিন্তু রাগ করেছি ! তখন আমার খুব কষ্ট হয়েছে ভাইয়া ! আজও কষ্ট হচ্ছে ভীষণ । তুমি এখনো রাগ করে আছো আমার উপর ? সব ভুলে যাও, কেমন ? আমার কিছু হয়ে গেলে রাগ ধরে রেখো না । আমি কিন্তু তোমাকে খুব ভালোবাসি ভাইয়া !
শুভ্র নিজের চোখকে বাধ্য করতে অক্ষম হলো । কোটর ফেটে ঝরঝরিয়ে পানি গড়িয়ে ভিজলো গাল দুখানি । বোনকে চেপে ধরলো আরো বেশি….
” না বনু,, তোর ভাইয়াও তোকে ভীষণ ভালোবাসে । আ’ম স্যরি টুকটুকি । আমি আর অমন করবো না ।
কিচ্ছু হবে না তোর । বাজে কথা বলিস না প্লিজ । আমরা এক্ষুনি ডক্টরের কাছে যাবো তো । কিচ্ছু হতে দেবো না তোর । আদ্র, ভাই তাড়াতাড়ি গাড়ি চালা প্লিজ । আমার বোনের কষ্ট হচ্ছে ।
শাফাহ্ ফিক করে মুচকি হাসে । ভেজা চোখ পাশে তাক করে । লুকিং গ্লাসে দেখতে পায় আদ্রের মুখাবয়ব ।
সে পানে চেয়েই বলে নিভে আসা ভাঙা গলায়…..
” আ….আদ্র ভাইয়া, তুমি জানো,, আমি তোমাকেও ভীষণ ভালোবাসি । তোমাকে বলা হয়নি কখনো,, আই লাভ ইউ ভাইয়া !
বলেই ফিকড়ে উঠলো ।
দম খিচে গাড়ির গতি বাড়ালো আদ্র ।
খুশি মনে বাড়ি ফিরলো ইয়াশ । সদরের দরজা হাট করে খুলে রাখা । খানিক আগে বাড়ির দুই কর্তা ফিরে আসতেই সবাই বেরিয়ে পড়েছেন হসপিটালের উদ্দেশ্য । রৌদ্র ছিলো ওয়াশ রুমে, তখন বেরিয়েই সেও ছুটেছে ।
এখন বাড়িতে কেউ নেই শিশির ব্যাতীত । আকুল মনে তিনটে বাচ্চাকে সামলাতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে শ্যামলিনী । চিন্তায় চোখ ভিজে আসছে বারবার । বাচ্চাদের নিয়ে ড্রইং রুমে পায়চারি করছে সে ।
এমন সময় ইয়াশের আগমন । বাড়িতে ঢুকে এপাশ ওপাশ চাতক চিত্তে তাকালো যুবক । হাতে আইসক্রিম ভরা শপিং ব্যাগ । এসব আনতে গিয়ে একটা বাড়তি কাজে ফেঁসে গিয়ে ফিরতে দেরি হয়ে গেলো ।
বাচ্চাদের দেখে মুচকি হাসলো তপ্ত যুবক । আর কেউ নেই । সে এগোতে এগোতে শিশির কে শুধালো…..
” টুকটুকি রুমে আছে ?
তড়াক করে চায় রমনী । ইয়াশ কে দেখে দৃষ্টি বৃহৎ হয় । শুষ্ক ঢোক গেলে ।
” ভাইয়া….
” জি ! টুকটুকি কোথায় ? আইসক্রিম গলে যাবে ! দিয়ে আসি ওকে !
বলেই পা বাড়ালো ঘরের দিকে । শিশির বিচলিত হয়ে পিছু ডাকে……
” ভাইয়া,, বাড়িতে কেউ নেই ! আপনি কোথায় ছিলেন এতক্ষণ ? শাফাহ্ কে নিয়ে হসপিটালে গেছে সবাই । লেবার পেইন উঠেছে ওর ।
কথা টুকু বাতাসের বেগে তীরের ন্যায় ঠাস করে বিধলো যুবকের কর্নকুহরে ।
সহসা হাত পিচলে পড়ে গেলো আইস্ক্রিমে ভরা প্যাকেটটা । মেঝেতে লুটিয়ে পড়লো সব ।
যুবকের দৃষ্টি ছলকে কেবল একটা পলক পড়লো । গায়ে কাঁটা দিতেই ঘাড় বাঁকালো সে । অবিশ্বাস্য কিছু শুনেছে, বিশ্বাস হলো না তাই । কথাটা উড়িয়ে দিতে আওড়ালো অস্ফুটে…..
” হোয়াট ?
” হ্যাঁ ভাইয়া, কিছুক্ষণ আগে ওকে নিয়ে হসপিটালে বেরিয়েছে সবাই ।
ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে দানবীয় দেহ খানা । এ বেলায় দু ঢোক গেলে সে ।
চোখ নামায় এক সেকেন্ডের জন্য । পরক্ষণে হুবড়ি খেয়ে এলোমেলো কদমে ছুট লাগায় বাইরের দিকে ।
#চলবে……
Share On:
TAGS: আসবো ফিরে আবারো, সুরভী আক্তার
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
আসবো ফিরে আবারো গল্পের লিংক
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩৯
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ২১
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৯২
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৫৬
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩৬
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৪
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৬২
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৫
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ১৭