Golpo romantic golpo আমি তোমার হতে চাই

আমি তোমার হতে চাই পর্ব ২


#আমি_তোমার_হতে_চাই

#পর্ব_২

#সুরভী_আক্তার

( অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষেধ ❌ ) 

ধাক্কা খেয়ে চরম বিরক্তি নিয়ে এক ধাপ পিছিয়ে আসে ভূমি ‌। চোখ দুটি কুঁচকে উপরে তোলে ‌। অপরিচিত একটা মুখ । একটা ছেলে দাঁড়িয়ে সামনে । ভূমির আঁখি জোড়া আরো বেশি কুঞ্চিত হয় । 

চোখ উপর নিচ করে ছেলেটাকে ‌আগাগোড়া পরখ করতে গিয়ে পরক্ষণেই দৃষ্টি থমকায় মেয়েটার । সামনে লম্বা দেহি তাগড়া এক ফর্সাটে সুদর্শন যুবক । পড়নে ক্রেজ ঢিলেঢালা ব্যাগি প্যান্ট আর ওভারসাইজ ক্যাপ-স্লিভ টিশার্ট । চওড়া কাঁধ ছাপিয়ে গলায় ঝুলে আছে একটি ম্যাট ব্ল্যাক হেডফোন । হেডফোনের একপাশ থেকে স্প্রিংয়ের মতো কুণ্ডলী পাকানো মোটা তারটা নেমে গেছে তার ব্যাগি প্যান্টের নিচ অবধি । কাঁধ ছুঁই ছুঁই ঝাঁকড়া চুল গুলো পেছনের দিকে আটকে রাখার জন্য জিগ-জ্যাগ হেয়ার ব্যান্ড পড়েছে মাথায় । 

শক্তপোক্ত পেটানো বাহু উন্মুক্ত । আহম্মক বনে যায় ভূমি । গোল গোল চোখে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়েই রয় । বোহেমিয়ান গোছের অদ্ভুত ছেলেটা আয়েশি ভঙ্গিতে চুয়িংগাম পিষছে দাঁতের ফাঁকে । দৃষ্টি সূচালো তার । অচেনা অজানা একটা মেয়েকে এভাবে সামনে দেখে খানিক গলা ভার করে শুধালো….

” হেয়য়য়,,, হু আর ইউ ? এ ঘরে কি করছিলে ? 

ভ্যাবাচ্যাকা খায় মেয়েটা । দ্রুত দৃষ্টি নামায় । ঢোক গিলে ঠোঁট ভেজায় । সাহজ যুগিয়ে গলা তুলে বলে মিনমিন করে…..

” আ…আপনি কে ? এ বাড়িতে কি করছেন ? 

” হোয়াট ? এটা আমার বাড়ি ! 

” বললেই হলো ! মামার বাড়ির আবদার ? আগে তো দেখিনি আপনাকে ‌। কে আপনি এ বাড়ির ?

নীলয় কপাল কুঁচকে ফেলে । থু করে মুখের চুয়িংগাম ছুড়ে ফেলে মেঝেতে । মেয়েটার মুখের সামনে তুড়ি বাজিয়ে বলে….

” হেয়য়য় ইউ,,, তুমি কে ? আগে তো দেখিনি ।

” আগে তো আমি ছিলামই না । দেখবেন কি করে ? কাল থেকে এ বাড়িতে আসছি আমি, বুঝলেন ? ওয়াহাজ খানের ছেলেকে চেনেন ? আমি ঐ ছেলে, মানে মিহাজের নতুন টিউশন টিচার । ওকে পড়াতে এসেছি আমি । 

নীলয় আশ্চর্য হয় । অনুচ্চ মেয়েটাকে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করে ! ব্যাঙ্গ করে অবিশ্বাসে বলে….

” তুমি ? 

পেছনে থেকে দিশার উত্তর….

” হ্যাঁ ছোট মামা । ও,,, ও আমার ফ্রেন্ড #অনামিকা_ভূমি । ‌আজ থেকে ভাইকে ওই পড়াবে । তুমি তো কাল ছিলে না বাসায় । তাই দেখোনি, জানো না এসব । 

ভূমি ভ্যাবাচ্যাকা খায় । দিশার ছোট মামা আছে, এ কথা বেমালুম ভুলে গেছিলো । কি না কি বললো মুখ ফসকে । মেয়েটা নিজের ভুল বুঝে জিভে কামড় বসায় । মিনমিন করে….

” ইনি ছোট মামা ? 

ওওও আল্লাহ,,, স্যরি । আমি বুঝতে পারিনি ! স্যরি মামা,,, 

” হুমমম, ইটস্ ওকে । তা,, পড়াতে এসে বাইরে যাচ্ছো কোথায় ভাগ্নি ? 

আরো বেশি ভ্যাবাচ্যাকা খায় ভূমি । আমতা আমতা করে….

” ঐ মিহাজের জন্য ওর পছন্দের কিছু একটা খাবার বানাতে যাচ্ছিলাম । ও তো কথা শুনছে না কিছুতেই । বলেছি,, যদি পড়তে বসে তাহলে ওর ফেভারিট কিছু বানিয়ে খাওয়াবো । আচ্ছা দিশা, মিহাজের ফেভারিট খাবার কি ? 

দিশা আর নীলয় একে অপরের দিকে চাওয়া চাওয়ি করে । বলে মেয়েটা….

” ভূমি,, তোকে অনেকবার বলেছি । একচুয়েলি বড় মামা একটু স্ট্রিক । মিহাজের রুমে হিডেন ক্যামেরা আছে । ওকে বেশি আশকারা দিস না প্লিজ । যা যা করবি, মামা সব দেখে নেবে নয়তো । তুই ওকে কঠোর ভাবে পড়ানোর চেষ্টা কর । নয়তো মানাতে পারবি না । 

ভূমি নিচের অধর কামড়ে খানিক ভাবে । 

ছটফট করে পিছু ফিরে রুমে ঢোকে । গলা ছেড়ে বলে….

” আচ্ছা,, তোরা যা । আমি ওকে পড়াচ্ছি । 

বিছানার উপর এখনো মুখ ভার করে বসে আছে মিহাজ । ভূমি ছটফট করে ঘরে ঢুকে কিছু বুঝতে দেওয়ার আগেই ওর হাত টেনে হিড়হিড়িয়ে নিয়ে গিয়ে পড়ার টেবিলে বসালো । নিজে পাশে একটা চেয়ার টেনে বসতেই হিসহিসিয়ে উঠলো মিহাজ….

” আহহহ্ ,, আমি বলেছি না আমি পড়বো না । চলে যান এখান থেকে । নয়তো টমিকে পেছনে লাগিয়ে দেবো । ডাকবো টমিকে ? 

ভূমি দুই ঠোঁটের মাঝে আঙ্গুল চেপে ফিসফিস করে…..

” হুসসসস্,,, কথা বলো না । মিহাজ, ইউ আর গুড বয় । তুমি কি জানো, তোমার রুমে হিডেন ক্যামেরা আছে । বাবা সবকিছু দেখছে । তুমি যা যা দুষ্টুমি করো,,, সব দেখে নেয় তোমার বাবা । তাইতো পানিশমেন্ট দেয় । 

মিহাজ আশ্চর্য হয় । বাচ্চা বাচ্চা চোখে অবাক হয়ে দেখে । সে জানতো না এসব । ভূমি সুযোগ কাজে লাগিয়ে আবার বলে ইনোসেন্ট ফেস বানিয়ে…..

” লিসেন মিহাজ,,, বাবা খুব স্ট্রিক, তাই না ? বাবা স্ট্রিক, কারণ তুমি কারোর কথা শোনো না । তোমার সব বদমাইশি সিসি ক্যামেরায় দেখে দেয় বাবা । 

আজ থেকে তুমি ক্যামেরার সামনে একদম বদমাইশি করবে না , ক্যামেরার সামনে গুড বয় হয়ে থাকবে , ওকে ? ক্যামেরার বাইরে সব বদমাইশি হবে । কিন্তু বাবাকে দেখানোর জন্য ক্যামেরার সামনে তুমি পুরো গুড বয় হওয়ার ভান করবে । কিভাবে গুড বয় হয়ে থাকতে হয়, সেটা আমি শিখিয়ে দেবো । একদিন গুড বয় হয়ে দেখোতো, বাবা কেমন করে ট্রিট করে তোমায় ‌। ওকে,, ডিল ? আজকে গুড হয়ে থাকবে ? দেখবে,, গুড বয় হয়ে থাকলে সারাদিন পর কাজ সেরে বাবা যখন বাড়ি ফিরবে, তখন তোমার কপালে আদর করে চুমু খাবে । নরম সুরে কথা বলবে । খুব ভালোবাসবে তোমায় । বাবা আর রাগবে না তোমার উপর । 

বাচ্চা ছেলেটা সব মনযোগ দিয়ে শুনলো । কি বুঝলো কে জানে । ভাবুক মুখো ভঙ্গিমা তার । অবাক হয়ে বললো অস্ফুটে…..

” গুড বয় হলে বাবা আর রাগবে না ? 

” উঁহু ! 

” বকবেও না ? 

” একদম না ! 

” আদর করবে ? ভালো করে কথা বলবে আমার সাথে ? 

” বলবে তো । খুব আদর করবে । কারন ভালো ছেলেদের সবাই ভালোবাসে ! 

চোখের কোনে ঝিলিক বয়ে যায় বাচ্চাটার । হতচকিত হয়ে শুধোয়….

” গুড বয় হবো কিভাবে ? 

চিকচিক করে ওঠে বিংশী রমনীও । ছটফট করে বলে….

” তুমি বই খুলে পড়ার অভিনয় করো । বাবা যখন ক্যামেরায় তোমাকে পড়তে দেখবে, তখন খুব খুশি হবে । নাও, বই খুলে বসো এখন । আজ বাবার পরীক্ষা নেবো, ওকে ?

মিহাজ ইন্টারেস্টিং কিছু অনুভব করলো । ভূমির কথাগুলো বেশ প্রভাব ফেললো তার মাঝে । চটপট একটা বই টেনে মুখের সামনে খুলে ধরলো । চোখ ডোবালো বইয়ের পাতায় । এদিকে ফিক করে হাসে ভূমি । বাচ্চাটা সরল । অবশ্য বাচ্চারা সরলই হয় । ঠান্ডা থেকে তাদের মানিয়ে নিতে হয় নিজের মতো করে । 

বইটা উল্টো ধরেছে মিহাজ । ভূমি সোজা করে ধরিয়ে দিলো । ঝুঁকে ফিসফিস করলো…..

” শুধু তাকিয়ে আছো বইয়ের দিকে ? পড়ছো না ? 

বাবা যদি এসে জিজ্ঞেস করে কি কি পড়েছো, তাহলে কি বলবে ? এক কাজ করো, কয়েক লাইন পড়া মুখস্থ করে নাও । বাবা ধরলেই যেনো চট করে বলতে পারো । তাহলে পুরো গুড বয় হয়ে যাবে তুমি । 

এ কথাও মনযোগ দিয়ে ভাবলো মিহাজ । এবারে পড়ায় পুরোপুরি মন বসালো । বেশ কিছুক্ষণ পর ভূমি ডাকলো আবার….

” হয়েছে পড়া ? 

মিহাজ ফিরে তাকায় ! 

” হু । পুরো পয়েম মুখস্থ করেছি ! বাবা ধরলেই বলে দেবো । তাহলে গুড বয় হবো আমি ? 

” একদম ! কিন্তু বাবাকে পড়ে শোনানোর আগে, আমাকে পড়ে শোনাও একবার । যদি ভুল থাকে, তাহলে এক্ষুনি ঠিক করে নেবো আমরা । বাবার সামনে কোনো ভুল করবো না । 

ভূমির কথামতো বাচ্চা টা তাই করলো । 

প্রশান্ত হাসলো মেয়েটা । একটা খাতা টেনে সাদা পৃষ্ঠা বের করলো । কিছু লিখতে লিখতে বললো…..

” আচ্ছা মিহাজ,, এবার একটু গল্প করি । তোমার পছন্দের খাবার কি ?

” ডিম ! 

” কি করতে ভালো লাগে ? 

” পেইন্টিং করতে । আর গেমস খেলতে ! কিন্তু বাবা গেমস খেলতে দেয় না ।

বাচ্চাটার আহত কন্ঠ । 

” বাবাকে ভয় পাও ?

” হু । 

” সবচেয়ে বেশি ভালোবাসো কাকে ? 

মিহাজ তাৎক্ষণিক উত্তর করলো না । সময় নিয়ে খুব ভেবেচিন্তে বললো ভেজা নিভু স্বরে…..

” বাবা ! 

” তাহলে বাবাকে ভয় পাও কেনো ? যাকে ভালোবাসতে হয়, তাকে ভয় পেতে নেই । বুঝেছো ? বাবা আসার সময় হয়ে গেছে, তাইনা ? এখন তুমি আবার গুড বয়ের মতো এই ম্যাথ গুলো সলিউশন করবে । এই দেখো, আমি কয়েকটা ম্যাথ দিয়েছি । বাবা এসে শুধু পড়া ধরবে না । যদি লেখা দেখতে চায়, তাহলে আমরা এই ম্যাথ গুলো দেখাবো, কেমন ? ডাবল গুড বয় হয়ে যাবো তখন । তুমি ঝটপট করে নাও । বাবা আসার আগেই সব করে নেবো । মিহাজ বাবার সামনে পুরো গুড বয় হয়ে যাবে আজ । 

চিকচিক করে ওঠে বাচ্চাটা । খাতা টেনে ম্যাথ গুলোর সলিউশন করতে শুরু করে । 

মিনিট কয়েকের মাথায় দরজার নিকট খট করে শব্দ হয় । ওয়াহাজ খান ফিরেছেন । বাড়ি ফিরে রোজকার মতো সবার আগে হাজির হয়েছেন ছেলের ঘরে । 

দরজার সামনে দাঁড়ানো মাত্রই আশ্চর্য হলেন তিনি । মিহাজ বেশ মনযোগ দিয়ে খাতায় লিখছে কিছু । পাশেই ভূমি বসে । ছেলেকে পড়ার টেবিলে এতোটা মনযোগী দেখে দু’পা বাড়িয়ে ভেতরে আসেন ভদ্রলোক । গলা খাঁকারি দেন । 

হকচকিয়ে যায় ভূমি । চকিতে তাকায় । ওয়াহাজ খানের দৃষ্টি ছেলের পানে । মিহাজ হাতের গতি বাড়িয়েছে । বাবার উপস্থিতির আভাস পেয়ে তড়িঘড়ি করে সলিউশন বের করছে । সব শেষ করে বাবাকে দেখাবে । 

ছেলের প্রতিক্রিয়া না পেয়ে দ্বিতীয় বার গলা খাঁকারি দেন ওয়াহাজ খান । তবুও ছেলের হেরফের নেই । আঁখি লতা কুঁচকে আসে ভদ্রলোকের । হঠাৎ কি হলো আজ,, এই ছেলে এতোটা মনযোগ দিয়ে কি করছে খাতায় ? আরো দুই কদম এগোলেন তিনি । তাৎক্ষণিক তেড়ে আসলো ভূমি । চাপা স্বরে বললো…..

” মামা,, ডিস্টার্ব করবেন না । মিহাজ ম্যাথ সলিউশন করছে । 

বিব্রত হন ওয়াহাজ খান । ফিরেও তাকান না । 

এগিয়ে যান ছেলের কাছে । রাশভারী গলায় ডাকেন…

” মিহাজ,,, পড়ছো তুমি ? দেখি কি করছো ? 

ছটফট করে হাতের কাজ শেষ করে দীর্ঘ দম ছাড়লো বাচ্চাটা । চেয়ার ছেড়ে নেমে দাঁড়ালো । খাতাটা দেখিয়ে বললো ভূমির উদ্দেশ্যে….

” মিস,,, আমার ম্যাথ সলিউশন শেষ । বাবাকে দেখাবো ? 

মাথা ঝাঁকায় ভূমি । ওয়াহাজ খান পূনরায় আশ্চর্য হন । কপালে ভাঁজ পড়ে আরো বেশি । বসার চেয়ার টায় উঠে দাঁড়ায় মিহাজ । ওয়াহাজ খানের সমান হয়ে চোখে চোখ রাখে । বাচ্চা সুলভ হেসে খাতাটা বাবার দিকে বাড়িয়ে দেয়…..

” বাবা,,, তুমি দেখো, মিহাজ আজ ম্যাথ সলিউশন করেছে । পয়েম মুখস্থ করেছে । মিহাজ গুড বয়, তাই না বাবা ? 

ছেলের এহেন কথায় অবাক হন ওয়াহাজ খান । খাতাটা হাতে নিয়ে এক ঝলক দেখেন । নীরবে হাসেন কিছুটা….

” নতুন টিউটর কেমন ? 

নিজের প্রশ্নের উত্তরের বিপরীতে পাল্টা প্রশ্ন পেয়ে পিটপিট করে ভূমির দিকে তাকায় মিহাজ । 

ভূমি ছুটে যায় । আগ বাড়িয়ে বলে….

” নতুন টিউটর খুব ভালো । আমি খুব ভালো,, মামা ! দেখুন,, মিহাজ আমার কাছে পড়েছে আজ । গুড বয় হয়ে গেছে আপনার ছেলে । একবার গুড বয় বলুন ওকে । 

ওয়াহাজ খানের কানে মেয়েটার কোনো কথাই পৌঁছালো না । তিনি প্রতিক্রিয়া দেখালেন না । খাতাটা টেবিলের উপর থেকে ভারী গলায় বললেন ছেলের উদ্দেশ্যে….

” বাড়িতে পড়লে হবে না শুধু । কাল থেকে স্কুলে যাবে । মাঝে এক সপ্তাহ যাওনি । যদি এরপরও স্কুলে না যাওয়ার জন্য কোনো বাহানা দাও, তাহলে পানিশমেন্টের কথা মনে করে নিও একবার । 

চুপসে যায় বাচ্চাটা । মাথা নামিয়ে চেয়ার ছেড়ে নিচে দাঁড়ায় । ভূমির হাসি হাসি মুখখানাও চুপসে যায় একই ভাবে । ওয়াহাজ খান আর কিছু না বলে ত্রম্ভ পায়ে ঘর ছেড়ে বেরোতে নিলেন । তার আগেই ছটফট করে তার পথরোধ করে দাঁড়ালো ভূমি । বিচলিত হয়ে চাপা স্বরে বলে উঠলো….

” মামা,, একটা কথা রাখবেন প্লিজ ? 

ওয়াহাজ খানের দৃষ্টি নত । এ অবধি মেয়েটার দিকে চোখ তুলে তাকান নি । অবশ্য তার দৃষ্টি মেয়েদের প্রতি সংযত থাকে সর্বদা । তবে এ বেলায় অনেকটা বিব্রত হয়ে কুঁচকানো আঁখি যুগল তুললেন তিনি । মুখশ্রী স্বভাবসুলভ নিরেট । সোজাসুজি চোখাচোখি হলো মেয়েটার সাথে । ঝেড়ে কিছু বলার আগেই রমনী গলা আরো বেশি নত করে বললো এক প্রকার ফিসফিস করে,,,,

” একটা চুমু খাবেন,, প্লিজ মামা । 

আকস্মিক এহেন কথায় ভিড়মি খান সটান ভদ্রলোক । অর্থ না বুঝে তপ্ত স্বরে ঝেড়ে ওঠেন….

” হোয়াট ? 

” আরে আস্তে । আপনারই তো ছেলে,,, আমি ওকে বলেছি,, যদি ও গুড বয়ের মতো নিজের পড়া কমপ্লিট করে, তাহলে আপনি ওর সাথে নরম হয়ে কথা বলবেন । গুড বয় বলবেন, চুমু খাবেন কপালে । কিন্তু আপনি তো তেমন কিছুই করলেন না । শিখিয়ে দিচ্ছি তাই ।

ও আপনার এটেনশন চায় একটু । ওর সাথে হালকা গলায় কথা বলুন একটু । এমন চটচটে হয়ে কথা বললে ও তো অবাধ্য হবেই । বাচ্চাদের সাথে ঠান্ডা হয়ে কথা বলতে হয় । শান্ত হয়ে আদর করে যা করতে বলবেন, বাচ্চারা তাই করবে । ঠিক তেমনি, আপনিও মিহাজের সাথে একটু নরম হয়ে কথা বলে দেখুন, যা বলবেন তাই শুনবে ও । প্লিজ মামা,,, 

ওয়াহাজ খান দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করেন । 

থোরিই না পাত্তা দেন মেয়েটার কথায় । তোয়াক্কা না করে চোখ ফিরিয়ে গটগট করে বেরিয়ে যান ঘর থেকে । তাজ্জব বনে যায় ভূমি ‌। কি লোকরে বাবা,, কথা গুলো কি শুনলো না ? এভাবে তিরষ্কার করে চলে গেলো কেনো ? 

আরেকবার পিছু ডাকে মেয়েটা । লাভ হয় না । মিহাজের উপর তার এমন উদাসীনতা দেখে বেশ বিভ্রান্ত হয় ভূমি ‌। 

ঘাড় ফিরিয়ে মিহাজের দিকে তাকায় ‌। ততক্ষণে বাচ্চাটার মন বিগড়ে গেছে । সে টেবিলের উপরের খাতাটা হাতে নিয়ে ছুড়ে ফেললো মেঝেতে । জেদ দেখিয়ে রেগে বললো থেমে থেমে….

” পড়বো না আমি । বাবা আমাকে ভালোবাসে না । রাগ করে শুধু । তুমি বলেছিলে তো, বাবা আমাকে গুড বয় বলবে, চুমু খাবে কপালে । কই বললো না তো । কপালে চুমুও খেলো না । মিহাজকে ভালোবাসে না বাবা । মিহাজ গুড বয় হবে না তার কাছে । চলে যাও তুমি ‌। আমি পড়বো না আর । 

মুখ ফুলিয়ে বিছানায় উঠে টানটান হয়ে বসেছে বাচ্চাটা । ভূমি কদম কয়েক এগিয়ে সাফাই গাইলো….

” মিহাজ,,, বাবার তো বাইরে অনেক কাজ থাকে । কাজ করে ফিরেছে তাই না ? ক্লান্ত ভীষণ । ওনার এখন রেস্ট প্রয়োজন । তারপর দেখবে, সব ঠিক হয়ে যাবে । বাবা তোমাকে ভালোবাসে খুব । 

” না , বাসে না বাবা আমাকে ভালো । 

তুমি চলে যাও এখান থেকে । আমি কারোর কথা শুনবো না । চলে যাও বলছি….

শেষের কথাটুকু শেষ করেই উঠে দাঁড়ালো বাচ্চাটা । ছোট হাতে শক্তি যুগিয়ে ভূমিকে ঠেলে ঘরের বাইরে বের করে দিলো । মেয়েটা কিছু বলে বাঁধা দেওয়ার আগেই মুখের উপর ঠাস করে দরজা লাগিয়ে দিলো । 

চমকায় ভূমি । ডাকে…..

” মিহাজ,,, এমন করতে নেই । দরজা খোলো । তুমি না গুড বয় হয়ে থাকবে বলেছিলে । 

দরজা আটকানোর শব্দের পাশাপাশি ভূমির কন্ঠ পেয়ে ওয়াহিদা খান আর দিশা তড়িঘড়ি করে করিডোরে আসে । ওয়াহিদা খান বিচলিত হয়ে শুধান…..

” কি হয়েছে ভূমি ? মিহাজ কথা শোনে নি,,, পড়তে বসেনি এখনো ? 

” না নানু,,, ও পড়েছে । কিন্তু….

” কিন্তু কি ? 

চোখ নামায় ভূমি । মিহাজ কে একলা ছেড়ে দরজার সামনে থেকে সরে আসে । হোস্টেলে ফিরতে হবে ওকে । ড্রইং রুমে নেমে ওয়াহিদা খান আবার শুধালেন…..

” ভূমি, বললে না তো কি হয়েছে ! মিহাজকে মানাতে পারোনি তুমিও ? ও পড়ছে না তোমার কাছেও । ওয়াহাজ কে বলবো আমি ? 

মেয়েটা শুকনো মুখ তুলে চায় । বলে মলিন কন্ঠে….

” আচ্ছা নানু,,, বড় মামা মিহাজের ব্যাপারে এতোটা উদাসীন কেনো ? আপনি জানেন,, মিহাজ কথা শোনে । ওকে আদর করে বোঝালে ও বোঝে । আমি বলেছিলাম, যদি ও পড়াশোনা করে তাহলে বড় মামা খুশি হবে । এটা বলার পর ও পড়েছে । আমি কঠিন কঠিন ম্যাথ দিয়েছিলাম,,, ওকে আলাদা করে বোঝানোর আগেই সব সলিউশন বের করেছে । ও সব পারে নানু । ব্রেইন শার্প ওর । বিশ্বাস করুন, একটুও জোর করতে হয়নি ওকে । 

কিন্তু বড় মামা ফেরার পর ঠিকভাবে কথাও বললো না ছেলেটার সাথে । বাচ্চাদের মনে ভুল ধারণা ঢুকতে সময় লাগে না । যা বুঝলাম,,, ও ওর বাবার কাছ থেকে এটেনশন চায় । আদর চায় । বড় মামা ওর সাথে নরম করে কথা বলুক, এটা চায় ও । কিন্তু বড় মামা তেমনটা করেন না বোধহয়…..

মেয়েটার কথা শেষ হতেই ওয়াহিদা খান দিশার দিকে তাকান । তপ্ত শ্বাস ফেলেন । কথা লুকিয়ে বলেন ভূমির কাঁধে হাত রেখে….

” তেমন কিছু না । আসলে সামনে তো ইলেকশন । ওয়াহাজ খুব চাপে আছে । তাই মিহাজ কে সময় দিতে পারে না খুব একটা । এমনিতেও আমার ছেলেটা একটু গম্ভীর । ওর মুখ দেখে ভেতরের কোমলতা বোঝা যায় না । আমার ছেলেটাকে বোঝার ক্ষমতা সবার নেই, ভূমি । 

বাদ দাও এসব ‌। তুমি আজ যাও । কাল সময় করে আবার এসো । ড্রাইভার আছে, পৌঁছে দেবে তোমায় । 

ভূমি এসব চিন্তা উড়িয়ে শ্বাস ফেললো…..

” আমি একা যেতে পারবো নানু । 

” উঁহু,, তুমি এখন আমাদের দায়িত্ব । একলা ছাড়ি কি করে ? যাও, ড্রাইভার কে বলা আছে । পৌঁছে দেবে তোমায় ! 

ভূমিকে বিদায় দিয়ে উপরে ওঠেন ভদ্রমহিলা । 

ছেলের ঘরের দরজার সামনে যান । কড়া নাড়েন বাইরে থেকে । ভেতর থেকে অনুমতি পেতেই ধীর কদমে পা বাড়ান ভেতরে । 

ডিভানের উপর বসে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাগজ ঘাঁটাঘাঁটি করছে ওয়াহাজ । সামনেই ইলেকশন । মাস চারেক আছে । প্রচুর চাপ যাচ্ছে মাথার উপর দিয়ে । 

তবুও ছেলেটা কোনো কিছুই প্রকাশ করে না বাড়ির কারোর সামনে । মায়ের উপস্থিতি বুঝে চোখ তোলে সে । বলে স্বভাব সুলভ ভারী গলায়…..

” কিছু বলবেন মা ? 

” হুম । 

” বলুন । 

” খুব চাপে আছো তুমি ? 

” হঠাৎ এই প্রশ্ন ? 

” আজকাল খুব বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছো, তাই জিজ্ঞেস করছি ! 

” জানেনই তো সামনেই ইলেকশন,, ব্যস্ততা বেড়েছে । 

ভদ্রমহিলা মহিলা লম্বা শ্বাস ফেলে পাশে বসেন । বলেন আসল কথা….

” তোমার মনে হয় না, মিহাজের উপর আসলেই খুব কঠোর হয়ে যাচ্ছো তুমি ! 

থমকায় ওয়াহাজ খান । চকিতে তাকায় মায়ের দিকে । 

” মানে ? 

” ভূমি মেয়েটা বেশ ভালো । মিহাজকে নাকি পড়াতেও পেরেছে আজ । ওর কথা গুলো ভালো লাগলো । আসলেই বাচ্চাদের উপর অল্পতেই অনেক প্রভাব পড়ে । এতো দিনে তোমার ব্যাবহারে তোমাকে নিয়ে মিহাজের মধ্যে অনেক ধারনা জন্মে গেছে । তুমি কেবলই রূঢ় ওর কাছে । 

ওয়াহাজ,, নয় বছর পেরিয়ে গেছে বাবা । এবারে তো স্বাভাবিক হও একটু । মিহাজের উপর অযথা বাড়াবাড়ি করো তুমি । ও তোমার নিজের সন্তান । নয় বছরের ছেলে ও তোমার । #নীলিমার মৃত্যুতে ঐ ফুটফুটে বাচ্চা টাকে দায়ী করে তিন বছর ওর দিকে ফিরেও তাকাওনি তুমি । ও যে তোমার সন্তান, এটা মানো নি । অগ্রাহ্য করেছিলে ওকে । এটা ভাবোনি, শুধু তুমি একা নীলিমাকে হারাও নি । একটা নবজাতক ও তার মাকে হারিয়েছিলো তখন । মা ছাড়া দুনিয়াটা খুব কঠিন, বাবা । ও জন্মের পরেই ওর মাকে হারিয়েছে । তোমাকেও পায়নি বাবা হিসেবে । ওর মনে কি চলে জেনেছো কখনো ? বাচ্চাটা ঘরবন্দি থাকে সবসময় । কারোর সাথে কথাও বলে না ঠিকভাবে । বাচ্চাদের জেদ থাকাটা স্বাভাবিক । কিন্তু তাকে কঠোরতা দিয়ে মানিয়ে নেওয়া টা অস্বাভাবিক । 

তিন বছর ছেলের দিকে তাকাও নি তুমি । এখন যখন ছেলেকে মেনেছো, তখন ওর সামনে কঠোর ভাবে তুলে ধরেছো নিজেকে । কেনো বলতে পারো ? তুমি তো এমন ছিলে না । নিজের ছেলে ও তোমার,, তোমার রক্ত । বোঝো বাবা । আমি কত বোঝাবো আর তোমায় ? মিহাজ বড় হচ্ছে । দিনকে দিন তোমার কঠোরতায় খারাপ প্রভাব পড়ছে ওর মাঝে । 

এবার অন্তত ছেলেটাকে একটু ভালোবাসো । ভুলে যাও সব । নীলিমার মৃত্যু হওয়ারই ছিলো । 

থামলেন ভদ্রমহিলা । কথার মাঝে গাল ভিজেছে তার । ছেলেকে অনেক বার বলেছেন এসব কথা । আজও বললেন । গম্ভীর ছেলের থেকে প্রতিক্রিয়া না পেয়ে শ্বাস ফেললেন তিনি । 

হয়তো এসব বলে লাভ নেই । 

উঠে দাঁড়ালেন । বললেন আরো একবার….

” নিজের জীবন টা গোছাবে না আর, এটা মেনেছি । তবে নিজের বাচ্চা ছেলেটার জীবন ছোট থেকেই অগোছালো করে দিও না আর । পারলে এবার থেকে ওর উপর সদয় হও একটু । নিষ্পাপ বাচ্চাটাকে বোঝার চেষ্টা করো । বাচ্চারা কিন্তু আদর চায়, যেটা মিহাজ পায়না তোমার থেকে । 

ভদ্রমহিলা কথা শেষ করে বেরিয়ে গেলেন । 

এদিকে সব কথা শোনার পর থম মেরে বসে রয় ওয়াহাজ খান । হাঁটুতে কনুই ঠেসে মাথা চেপে ধরে । বুজে নেয় চোখ দুটো । বন্ধ চোখের পাতায় ভাসে তার স্ত্রীর নির্ভেজাল মুখখানা । হুট করেই খানিক যন্ত্রণায় চট করে চোখ খোলেন তিনি । বুক ফুলিয়ে লম্বা শ্বাস ফেলেন । 

🛑 গল্পটা কি ভাল্লাগছে না ? রেসপন্স করেন না ক্যান ভাগ্নিরা 😒? রেসপন্স করুন । আর দুটো পর্ব পড়ার মাধ্যমে সবটা বুঝতে পারবেন আশা করি । 🛑

#চলবে………

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply