#আলতো_ছোঁয়ায়_সমুদ্রকথন__(২০)
#নুসরাত_সুলতানা_সেঁজুতি
ঢাকার অন্যতম নামি-দামি শপিংমলের মধ্যে এটাও বোধ হয় একটা। যেখানে এর আগে পিউ কখনো আসেনি। ওদের কেনাকাটার দৌড় তো গুলশান অবধিই থাকে। গাড়ি করে যায়,একটা মল ঘুরে কেনে,তারপর বাড়ি ফিরে আসে ব্যাস। আর নাহলে এখন যুগ কত পাল্টেছে! অনলাইন শপিং তো আছেই। আজ সেখানে পিউ মা-চাচি আর বোনের হাত ধরার গণ্ডি পেরিয়ে প্রথম কারো সাথে শপিংমলে এলো! আর নিয়ে আসা সেই মানুষটা ধূসর? ওর প্রাণের ধূসর ভাই! ওর স্বপ্নের নায়ক ওকে নিয়ে মল ঘুরতে এসছে? পিউ এই কথা বিশ্বাস করবে কীভাবে? হাতে খামচে মাংস তুলে আনলেও কি এসব বিশ্বাস হয়?
অথচ পিউ পোড়া শ্বাস ফেলল। ভালো লাগছে না ওর। ধূসর চেইন কিনে দেবে শুনে আরো বেশি খারাপ লাগছে। ও আসলেই ইমম্যাচিউর। গলা থেকে চেইন চুরি হয় আর টেরও পায় না মানুষ? এই খেয়াল আর ব্রেইন নিয়ে পিউ কিনা ধূসরের মতো লোককে পটাতে চায়!
ধূসর হাঁটছে সোজা চেয়ে। মলের একেকটা কাচের দেওয়াল আর শো রুমের ঝলকে দেখা যাচ্ছে সাদা ইউনিফর্ম পরা পুচকে মেয়েটা পিছু পিছু আসছে তার। মুখখানা ভীষণ বিষণ্ণ তবে! আলোর ছিঁটেফোঁটা নেই। কেন? যার জন্যে দুঃখ পাচ্ছিল,নাক-চোখ ভাসাচ্ছিল দিচ্ছে তো; তাহলে আবার? ধূসর ওইভাবেই হঠাৎ খেয়াল করল পিউয়ের পায়ের গতি থেমেছে কিছুটা। কোনো এক দিক চেয়ে চেয়ে দাঁড়িয়েছে আচানক। কৌতূহলে নিজেও সেদিকে চাইল ধূসর। এটা অর্নামেন্টসের লেভেল ছিল।
চারদিকে মেয়েদের সাজসজ্জার জিনিস। কিন্তু পিউ যেখানে চেয়ে আছে সেখানটায় শুধু চুড়ি আর চুড়ি দিয়ে ভরতি। দোকানের ওপরেওও লেখা- কাচের চুড়ি।
একেক রঙের, একেক ডিজাইনের,একেক সাইজের। শেল্ফে শেল্ফে সাজানো। কাচ আর রঙের ঝলকানিতে চোখ ধাঁঢিয়ে যাওয়ার জোগাড়। ধূসর কপাল কুঁচকে ফেলল। পিউ এত মুগ্ধ আর উৎসুক হয়ে দেখছে। দেখার মতো কী জিনিস ওটা? একবার পিউ আরেকবার চুড়ির দিকে দেখল সে। পিউয়ের যেন তক্ষুনি হুশ ফিরল, ও কোথায় যাচ্ছিল,কার সাথে ছিল। ভেবেছিল, ধূসর এগিয়ে গেছে ওকে রেখে। তটস্থ হয়ে ফিরতেই ধাক্কা খেল একটু। ধূসর পাশেই দাঁড়িয়ে। এখনো গুটিয়ে আছে কপাল। ও থতমত খেয়ে বলল,
“ কিছু না,এমনি- এমনি দাঁড়িয়েছি।”
ধূসর আর কথা বাড়াল না। ফের ঘুরে হাঁটা ধরল এস্কেলেটরের সিঁড়ির দিকে।
জুয়েলার্সের দোকান গুলো এলো এবার। গাঢ় সোনালী রঙের, স্বর্ণের দোকান। হীরেও আছে বহুল। সুলতান জুয়েলার্সের শোরুমটা দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে এই মলের সব চেয়ে বড়ো। ধূসর কাস্টমার ডেস্কে গিয়ে থামল সোজা। এক কথায় বলল, চেইন দেখাতে।
পিউ এসে দাঁড়াল পাশে। ওর সামনেই মোটা-চিকণ,বড়ো-ছোটো সব রকম চেইনের কালেকশন বের করে ডেস্কের টেবিলে রাখা হলো। সেলসম্যান বললেন,
“ দেখুন ম্যাম,কোনটা ভালো লাগে!”
পিউ তাকাল ধূসরের দিকে। মুখজুড়ে দোটানা। অমন মৃদূ স্বরে ডাকল,
“ ধূসর ভাই!
চাইল ধূসর। ও জিভে ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
“ না কিনলে হতো না?”
“ কেন?”
“ আমার খামখেয়ালির জন্যে শুধু শুধু আপনার টাকা নষ্ট হ…”
মাঝপথেই কথা কেড়ে নিলো ধূসর। শক্ত গলায় বলল,
“ আমার টাকা নিয়ে তোর ভাবার দরকার নেই। চাচার দেয়া চেইন হারিয়ে যেভাবে নাকের পানি ফেলছিলি,এখন মুখ বন্ধ রেখে কোনটা নিবি সেটা দ্যাখ!”
পিউয়ের মুখটা চুপসে গেল। নাকের পানি ফেলছিল কথাটায় লজ্জায় পেলো খুব। কিন্তু তাও চেইন ধরল না,দেখল না।
এদিকে ধূসর বড্ড অধৈর্য মানুষ ! ওর ধৈর্য -সহ্য কমই দিয়েছেন আল্লাহ। পিউয়ের গাইগুই হাবভাবে খেই হারিয়ে নিজেই একটা চেইন তুলল হাতে। ঠেলে দিলো ওর দিকে। কথা খরচ ছাড়াই প্রশ্ন ছুড়ল যেন – পছন্দ কিনা!
পিউ ব্যর্থ শ্বাস ফেলল। বুঝল,নিতেই হবে।
চোখ না তুলে বলল,
“ আপনার পছন্দ হলেই হবে।”
ধূসরের মুখায়ব বদলায় না। চেইন প্যাক করতে বলে দেয়। লম্বা -চিকণ লাল বাক্সে ভরতে গেলে,বাধ সাধল পিউ। বলল,
“ প্যাক করতে হবে না৷ আমাকে দিন,পরে যাব।”
তারপর যেন সাফাই দিলো ধূসরকে,
“ না মানে খালি গলায় গেলে আম্মু তো ধরে ফেলবে,তাই!”
ধূসর ভ্রু নাঁচিয়ে বলল,
“ তো? এই না বলছিলি কিনলে টাকা নষ্ট হবে?”
পিউ ঠোঁট উলটে চিবুক নুইয়ে বলল,
“ লজ্জা দিচ্ছেন কেন?
কিনে দিয়েছেন বলেই তো পরব বললাম।”
সেলস ম্যানের দায়িত্বে থাকা ছেলেটা মিটিমিটি হাসল। চেইন খুলে দিলো ওর কাছে। পিউ নিজের চপলতায় যেন ফিরে এলো এবার। কিনে যখন দিয়েছেই,আর মুখ ভার রেখে কী লাভ? বরং ধূসর ভাইয়ের দেয়া উপহার এটা। পিউ বুকে আগলে রাখুক না!
ও এসে আয়নার সামনে দাঁড়াল। ঘাড়ের দুইপাশ থেকে পনিটেইল করা চুলগুলো সরিয়ে সরিয়ে চেইনটা পরল নিজেই। আফতাবের দেয়া চেইনের থেকে এটা মোটা আর লম্বা একটু। আয়নার মধ্যেই পিউ দেখতে পেলো ধূসর কার্ড দিয়ে বিল পে করছে। কষ্ট লাগল ওর! মানুষটা যতই এটিটিউড দেখাক, টাকা তো কম গেল না। এখন যা দাম সব কিছুর।
পিউ চেইনে হাত বোলায়৷ এটাকে ও হারাতে দেবে না। দরকার পড়লে পিউ নিজে হারিয়ে যাবে,কিন্তু চেইন অক্ষত রাখবেই-ইনশাআল্লাহ।
ততক্ষণে কাজ শেষে হাঁটা ধরল ধূসর। একবার বললও না,সাথে আয়,চল বা কিছু। সব সময় আগে আগে হাঁটে। পিউ আবার বিড়ালের মতো কুটিকুটি কদমে পিছু নিলো তার। অমন চলতে চলতেই চঞ্চল চিত্তে বলল,
“ একটা কথা বলব?”
আবার নিজেই বলল,
“ আপনাকে অনেক অনেক অনেকগুলো ধন্যবাদ ধূসর ভাই!”
ধূসর হাঁটতে হাঁটতেই তাকাল। পিউয়ের চোখমুখ ঝলমল করছে। হাসছে ওর সুন্দর দুই চোখ।
বলল,
“ ধন্যবাদের কী আছে?”
“ আছে তো অনেক কিছু। আচ্ছা আরেকটা, আরেকটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
“ কী?”
“ কেন কিনে দিলেন এটা?”
“ ইচ্ছে হয়েছে।”
“ তাই বলে এত দাম দিয়ে!”
“ মন চেয়েছে!”
পিউ গাল দুটো ফোলাল। বিড়বিড় করল একা একা,
“ সব সময় ব্যাঁকা কথা।”
ধূসর তক্ষুনি বলল,
“ বাপেরটা হারিয়ে কাঁদছিলি,এখন ছেলেরটা নিয়ে খুশি থাক। এত প্রশ্ন করবি না!”
পিউ আর এ নিয়ে কথা বাড়ানোর সাহস পেলে তো প্রশ্ন করবে? এক কথায় ঘাড় কাত করল। তবে হনহনে গতিবেগের সাথে কূলোতে গিয়ে একটু টাল হারিয়ে ফেলছিল মেয়েটা। এদিকে যা খিদে পেয়েছে! ফের বলল,
“ এটার ওপরে মনে হয় রুফটপ আছে। ওখানে খাবার পাওয়া যায়।”
ধূসর থামল এইবার। ফিরে তাকাতেই সাফাই দিলো পিউ,
“ না মানে লেখা দেখলাম,রেস্টুরেন্ট ওপরে।”
“ তোর খিদে পেয়েছে?”
পিউ আনত হয়ে ঘাড় নাড়ল। ধূসর রাস্তার মোড় বদলে বলল- আয়।
খুশিতে আপ্লুত হয়ে পড়ল মেয়েটা। উচ্ছ্বসিত স্বরে বলল – আপনি অনেক ভালো!
ফোন হাতে তুলে আরিফকে কল দিলো ধূসর। জিজ্ঞেস করল,
“ কিছু খাবে?”
“ না ভাই। খিদা নাই,গ্যাসের যা সমস্যা। আপনি শপিং করেন,আমি একটু ঘুমাই। এসি চলে কিন্তু।”
ধূসর লাইন কাটল। মলের রুফটপে এলো ওরা। বেলা গড়িয়ে এখন বিকেল হওয়ার সময় । আলো কমছে, লাইটিং বাড়ছে। তবে খুব ভিড় এখানে। টেবিল খালি পাওয়ার জো নেই। পিউ অদূরে একটা খালি টেবিল দেখেই চড়ুইয়ের মতো ছুটে গেল। একটা চেয়ার টেনে বলল – বসুন।”
ধূসর বসল না। তবে খেয়াল করল, মেয়েটা খুব হাসছে। কী স্ফূর্তি! কী উচ্ছ্বল! সেই সাথে আবিষ্কার করল,রাস্তায় হেচকি তুলে কাঁদতে থাকা ছিচকাঁদুনে মেয়েটা,আর এই হাসিতে খলবল করা মেয়ে দুটোতে যেন বিস্তর ফারাক। ধূসর স্বভাবসুলভ শান্ত ভাবে বলল,
“ তুই বোস। আমি ঠিক আছি।”
উৎফুল্ল পিউ কিছু মুষড়ে গেল। বসল দীর্ঘশ্বাস ফেলে। বলল – আপনি কিছু খাবেন না?”
“ না।”
হাত তুলে ওয়েটারকে ডাকল ধূসর। বলল,
“ যা চাইবে,নিয়ে আসবেন। বিল আমি পে করব।”
“ জি,স্যার।”
ও যেতে নিলে পিউ বলল,
“ ধূসর ভাই!”
ফিরল সে।
“আমাকে না পেয়ে তানহা তো বাড়িতে ফোন করবে। আপনার ফোনটা দিন,আম্মুকে কিছু একটা বলে দিই!”
“আমি বলেছি যা বলার।”
ধূসর চলে গেল।
পিউ মলিন চোখে ঠোঁট উলটে মন দিলো মেন্যুতে। কিন্তু, এত দাম এখানে! ইতোমধ্যেই কতগুলো টাকা খসে গেছে। না না,যতটা সম্ভব কম খেতে হবে। একটা থাই স্যুপের প্লেটার অর্ডার করল ও। ফ্রাইড রাইস,ভেজিটেবল,স্যুপ, চিকেন ফ্রাই আর একটা কোক থাকবে এতে।
অর্ডার করার পর একা বসেছিল পিউ। এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে চোখ পড়ল রুফটপের পাচিল ঘিঁষে বসানো লোহার বেঞ্চের একটায় বসে আছে ধূসর। ঐ তো,একটু দূরে। পায়ের ওপর পা তুলে,ফোন টিপছিল। পিউয়ের মনটা ঝুঁপ করে খারাপ হলো অমনি। ওখানে তো ঠিকই বসেছে,এখানে বসলে কী হতো! সমস্যা সব ওকে নিয়েই,তাই না?
খাবার এলো সেসময়। সব এত গরম! পিউ ফুঁ দিচ্ছিল বড়ো বড়ো করে। স্কার্ফ দিয়ে বাতাস করছিল যাতে দ্রুত ঠান্ডা হয়।
পাশের টেবিলে ছিল ৪ জন ছেলে। খুব জোর ইউনিভার্সিটির হবে। একা এক টেবিলে মেয়ে মানুষ দেখে, চোখ ওদের এদিকেই আটকে। তারওপর পিউয়ের কাণ্ডে হাসছিল ওরা। একজন বলল,
“ আমাদের কাছে দিতে পারেন,সবাই মিলে ফুঁ দিলে তাড়াতাড়ি ঠান্ডা হবে।”
পিউ বিরক্ত হয়, কপাল কুঁচকে বসে থাকে। কিন্তু উত্তর করে না। মিনা বেগম বলেন,
বাইরে ছেলেপেলে কখনো বাজে ইঙ্গিত করলে তাদের সাথে তর্কে জড়াতে নেই। এড়িয়ে যেতে হয়। ও যতটা পারছিল মাথা নুইয়ে নিচ্ছিল প্লেটে। খেতেও তো অস্বস্তি হচ্ছে এখন!
আরেকজন বলল- “ আপু কি রাগ করলেন? আমরা তো উপকার করতে চেয়েছি।”
কণ্ঠে ওদের রসিকতা। হাসিতে ঠাট্টা। খাবে কী, পিউয়ের বসে থাকাই দুষ্কর হয়ে পড়ছে। তক্ষুণি টের পেলো পাশের চেয়ারটা ক্যাচ করে শব্দ তুলে টেনেছে কেউ একজন।
চকিতে চাইল পিউ। কিছু চমকাল ধূসরকে দেখে। একদম পাশেই বসেছে ওর। ওই পাশের ছেলেদের টেবিল আর পিউ,ঠিক দুটোর মাঝামাঝি। ছোটোখাটো মেয়েটা মূহুর্তে আড়াল হয়ে যাওয়ায় পাশের ছেলেগুলো আর দেখতে পারল না। তবে পিউয়ের চোখমুখে বিস্ময়ের সাথে সাথে আনন্দের ঢল ছুটে এলো।
রক্তাভ ঠোঁট দুটো হাসির তোড়ে চলে গেল দুদিকে। মুচকি হাসল পিউ। নিশ্চিন্তে মুখে পুরলো খাবার। ধূসর ফোন টিপছিল তখনো। পিউ ওর থেকে চোখ সরাতেই,ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনের টেবিলের দিকে এতক্ষণে চাইল সে। শব্দ খরচ করল না,হুমকিও দিলো না। অথচ কেবল মাত্র তার
বরফ-শীতল ছুরির মতো শাণিত চোখদুটো বর্তাতেই ছেলেগুলো মূহুর্তে সটান হয়ে বসল। হূলস্থুল হাবভাব করে মন দিলো নিজেদের কাজে!
পিউয়ের খাওয়ার গতি ধীরুজ। দ্রুত খাওয়ার অভ্যেস নেই। কিন্তু ধূসরের তাড়া আছে। বারবার হাতঘড়ি দেখছিল। পার্টি অফিসে তো যায়নি আজ। একবার হলেও হাজিরা দেয়া নিয়ম। ইকবালের বন্ধু বলে, কোনো ফেসিলিটি ও নেয় না। নিতে চায় না। ওখানে বাকিরা যা,সেও তাই এমন ভাবে থাকে। পিউয়ের কচ্ছপের গতি দেখে বলল,
“ তাড়াতাড়ি!”
পিউ হাতের বেগ বাড়ায়। বড়ো বড়ো বাইট নেয় খাবারে। শেষে যা ছিল সব একবারে মুখে ঠুসে ফেলল। গোলগাল মুখ বলে,গাল দুটো ফুলে ঢোল হলো অমনি। টুকুস টুকুস চোখের পাতা ফেলতে ফেলতে চিবোচ্ছিল মেয়েটা। ওইভাবেই বেখেয়ালে একবার ধূসরের দিক চাইল,বুকের ধারে আস্তে করে বাঁজ পড়ল অমনি। তার চেয়েও ত্রস্ত বেগে নজর সরিয়ে আরেক দিকে চাইল ধূসর। পিউ আজও বিভ্রান্তিতে লুটোপুটি খায়। স্পষ্ট করে বুঝে উঠতে পারে না। প্রশ্ন করে নিজেকে- ধূসর ভাই কি আমাকে দেখছিলেন?
ধূসরের কল এলো সেসময়। আরিফ বলল,
“ ভাই,এক বন্ধু থাকে এইখানে। দেখা করতে চাইল। আপনার গাড়ি পার্কিং এ রাইখা যাব?”
“ তুমি কীসে যাবে?”
“ রিকশা নিতাম।”
“ গাড়ি নিয়ে যাও। আমি আছি এখানে।”
আরিফ খুশি হয়ে বলল,
“ থ্যাংকিউ ভাই। থ্যাংকিউ!”
কল কেটে আরিফ বড়ো শ্বাস ফেলল। মনে মনে আরো বেশি করে ধন্যবাদ দিলো ধূসরকে।
এমনিও ওর পকেট খালি। রিকশা নিতো না।
পিউ এক দমে পানি খেয়ে বলল,
“ শেষ!”
ধূসর উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“ আর খিদে নেই?”
“ না। পেট ভরে খেয়েছি। এখন কি চলে যাব?”
“ বসতে হবে। আরিফ আসুক।”
একটু আগে বসে থাকা বেঞ্চটায় ফিরে এলো ধূসর। পিউকে বলল বসতে। ও শুধায়,
“ আর আপনি?”
“ আমি আছি।”
বেঞ্চটায় কালো রঙ দিয়ে বার্নিস করা। তারওপর লোহার তৈরি। পানি পড়লেও স্পষ্ট বোঝা যায় না এমন। পাশে পিঠ ব্যাগটা রেখে বসল পিউ। ধূসর গিয়ে দাঁড়াল পাঁচিলের কাছে। তার দিকে এক পল দেখে গলার চেইন আঙুল দিয়ে নেড়েচেড়ে হাসল পিউ। ধূসর ভাইয়ের সাথে ও আজ প্রথম বাইরে এলো। একদম একা,নিজেরা দুজন। আচ্ছা, এটা কি ওদের ফার্স্ট ডেট?
একটা কলেজ পড়ুয়া বাচ্চা মেয়ে। ১৬+ বয়স। যার ইন্টারমিডিয়েটের জার্নি শুরু হয়েছে আজ মোটে দেড় মাস হবে! লম্বা-ঘন চুল,গোলাকার ছোট্ট একটা মুখ। অর্ধেকটা জুড়ে ডাগর ডাগর চোখ। আর সেই চোখে পড়ন্ত বিকেলের আলোটা কেমন দর্প নিয়ে বসেছে। ধূসর সূচালো চোখদুটো সেকেন্ড খানিক পিউয়ের মুখে ফেলে রাখল। কানে ফোন,রিং হচ্ছে। ইকবাল ধরতেই নজর সরাল সে। জিজ্ঞেস করল,
“ কোথায় তুই?”
“ অফিসেই তো। তুই কোথায়? আসলি না কেন? রওনকতো এলো।”
“ রওনক আসার সাথে আমাকে টানছিস কেন?”
“ ভাবলাম পেয়ারি বন্ধু,ও আসলে তুইও আসবি।”
“ একটা মেইল পাঠিয়েছি। দেখে আমাকে জানা।”
“ তুই কি গুলশানে নেই?”
“ না। দূরে আছি। আটটার মধ্যে আসব।”
ইকবাল খুব দ্রুত কথা শেষ করেই,পুষ্পকে কল করল। ব্যস্ত ভাবে বলল,
“ দেখা করো মাই লাভ। সাড়ে সাতটার মধ্যে বাড়ি পৌঁছে দেব।”
“ এ-এখন? এখন তো আম্মু ঘরে।”
“ তো কী? তোমার বন্ধু আছে না,ইংকি না পংকি!”
“ রিংকি ইকবাল!”
“ হ্যাঁ হ্যাঁ,
বলবে ওর বাসায় যাচ্ছো। এসো প্লিজ,প্লিজ!”
“ আচ্ছা দেখছি।”
****
ধূসর পাশ ফিরতেই চোখের হোচট খেল। একটু আগে চাঁদের মতো মুখখানা কেমন আতঙ্কিত করে এদিক-ওদিক দেখছে পিউ। দৃষ্টি জুড়ে ভয়,ততোধিক অস্বস্তি তার। ধূসরের
খটকা লাগল। দেখল আশপাশ। ছেলেগুলো তো নেই। কী হলো তাহলে? এগিয়ে এলো ও। ডাকল,
“ পিউ?”
পিউ ঢোক গিলতে গিলতে মুখ তুলে চাইল। যার দরুন আরো অবাক হলো ধূসর। মেদুর চেহারা ছাপানো ত্রাস দেখে গুছিয়ে গেল ভ্রু দুটো। কেমন অন্যরকম জড়োতা যেন। বেঞ্চ খুঁটছে হাত দিয়ে। জিভে ঠোঁট চাটছে বারবার। এত উশখুশ করতে দেখে ধূসর জিজ্ঞেস করল,
“কিছু হয়েছে?”
পিউ মাথা নুইয়ে নিলো। চোখের দীঘল পাঁপড়ি গুলোর সাথে রাঙা ঠোঁট জোড়া পাল্লা দিয়ে কাঁপছে। ধূসর পাশে বসল,তবে দুরুত্ব রেখে। তীক্ষ্ণ নয়ন মেলে লক্ষ্য করল পিউয়ের হাবভাব। এক হাত দিয়ে কামিজ খামচে আছে। আরেক হাত দিয়ে বেঞ্চ খুটছে। পা দুটো কেমন কেমন করে মেশাচ্ছে ফ্লোরে। ঠোঁট টিপছে বারবার। ঘামছেও! ধূসর অপেক্ষা করল,মুখ খোলে কিনা। শেষে বলল,
“ বসে থাকবি,
নাকি বলবিও কিছু?”
পিউ বুকের খাঁজে থুতনি লুকায়। ধূসর পড়ল ধাঁধায়,এইত কী হাসছিল; হলো কি হঠাৎ?
কণ্ঠ মোলায়েম করার চেষ্টা করে বলল,
” পিউ কী হয়েছে? তোকে এক কথা এত বার জিজ্ঞেস করতে হয় কেন!”
উত্তরের বদলে আরো গাঢ় করে ঠোঁট টিপল মেয়েটা। ধূসর বুঝে নিলো, ও বলবে না। ধৈর্য হারাল। রেগেমেগে উঠে যেতে নিলেই,আচমকা কালো শার্টের পেছন দিকটা খামচে টেনে ধরল পিউ। টলমলে চোখে বলল,
” রাগবেন না,ধূসর ভাই!
আপনি রাগলে আমি কোথায় যাব!”
এইটুকু কথায় কী ছিল? কিছু না। অথচ পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল ধূসর। অটল দেহের মাঝে লুকিয়ে থাকা হৃদয়টাও কিছু নড়বড়ে হলো হয়ত!
এক পল থমকে থেকে আস্তেধীরে ঘুরে চাইল সে। পিউয়ের চোখ দিয়ে একটা জলের রেখা নেমে এলো গালে। ফ্যাকাশে চেহারায় স্পষ্ট, কিছু নিয়ে ঘাবড়ে আছে ও। ধূসর আরেকদিক চেয়ে শ্বাস টেনে আবার চাইল ওর দিকে। রুক্ষ স্বরে বলল,
“ কথায় কথায় এত কাঁদার কী আছে? তুই কি ছিচকাঁদুনে?”
পিউ মাথা নত করে।
ও বলল,
“ যা, চোখেমুখে পানি দিয়ে আয়।”
পিউ গাট হয়ে বসে রইল তাও। বরং একটু শক্ত করে মুঠোর মাঝে বেঞ্চ আকড়ে ধরল।
কিছু বলছে না,কথাও শুনছে না দেখে ধূসর পুরু স্বরে বলল,
“ তুই কি যাবি?”
উপায়ন্তর না পেয়ে মোচড়াতে মোচড়াতে উঠে দাঁড়াল পিউ। রুফটপে ওয়াশরুম আছে। মেঝের ওদিক -এদিক চোরা দৃষ্টি ফেলে সেই দিকে পা বাড়াল ও। ধূসরের অবাধ্য চোখ মূহুর্তে গিয়ে পড়ল ওর পেছনের সাদা কামিজে। তুরন্ত বেগে দু পা ফেলে এগিয়ে এসেই পিউয়ের পিঠের সাথে মিশে গেল সে। তাজ্জব হয়ে ফিরতে নিলো মেয়েটা। ধূসর বাঁধ সাধল এইবার। নিজের দিকে ঘুরে চাইতে দিলো না। মাথাটা এক হাত দিয়ে চেপে ধরে রাখল। গম্ভীর স্বরে বলল,
“ চুপচাপ হাঁট!”
পিউয়ের মনের ভেতর খচখচ করছে। মেয়েটা উচ্চতায় ওর বুক সমান। পেটানো দেহ পেছনে এমন লেপ্টে থাকায়, দেখাও যাচ্ছে না। ও আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। চুপচাপ ওয়াশরুমের দিকে এগোলো। চাপানো দরজা হাত বাড়িয়ে নিজেই ঠেলে খুলে দিলো ধূসর। ঢুকল পিউ। দরজা আটকে দিলো।
ধূসর থুতনি,ঘাড় ডলতে ডলতে কী যেন ভাবল। তড়বড়িয়ে এসে বেঞ্চ থেকে পিউয়ের পিঠব্যাগটা তুলল নিজের কাঁধে। এরপর চটপট সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল।
এদিকে পিউয়ের মাথায় হাত পড়েছে। সাদা কামিজের শেষাংশে লাল ছোপ ছোপ দাগ দেখে লজ্জায় মরমর দশা। এই ভয়টাই পাচ্ছিল তখন। শেষমেশ এত লজ্জা পাওয়া বাকি ছিল জীবনে? এর মানে এই কারণেই ধূসর ভাই তখন ওভাবে হাঁটছিলেন? ইস রে পিউ, ইস,ইস! কপাল চাপড়াল মেয়েটা।
একদম মনেই ছিল না। পিউ এখন কী করবে মাথায় কিছু এলো না। যতটুকু পারল পানি দিয়ে দিয়ে কামিজ পরিষ্কার করতে চাইল। কিন্তু হচ্ছিল না। এদিকে তো বাড়ছে। আস্তে আস্তে সব মেখে যাবে। ব্যাগে কি রেখেছিল কিছু? কিংবা কোনো টিস্যু! পিউ তৎপর হাতে ফের দরজা খুলল। কিন্তু, ধূসর নেই। বেঞ্চের
ওপর ব্যাগও নেই ওর। পিউ হাহুতাশ করে উঠল যেন। এখন কী করবে? এই অবস্থায় ওকে ফেলে কোথায় গেলেন উনি! ওয়াশরুম তো একটাই। ছেলেমেয়ে সবাই বেসিনে হাত ধুতে আসছে। পিউ এখানে আর দাঁড়াল না। তাড়াহুড়ো করে টয়লেটের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে গেল। একটু পরই টোকা পড়ল সেখানে। সেই চেনা স্বর ডাকল,
“ পিউ!”
তড়িৎ অল্প ফাঁকা করে দরজা খুলল মেয়েটা। মাথা বার করতেই, ধূসরকে দেখা যায়। পিউ কিছু বলতে চাইছিল,তবে এর আগেই আরেকদিক চেয়ে চেয়ে পেপারে প্যাঁচানো কিছু একটা বাড়িয়ে দিলো সে। অমনি কুণ্ঠার ছোবলে নীল হয়ে গেল মেয়েটা। সারামুখ লালচে দাগে ফেঁপে উঠল মূহুর্তে। মাথা নুইয়ে হাত বাড়িয়ে ধরল তাও। ধূসর গলা ঝারে। অমন আরেকদিক চেয়েই বলে,
“ আমি বাইরে আছি।”
পিউ কিছু বলল না। লজ্জায় বিধ্বস্ত সে। ধূসর ফিরতে নিয়েও থামল। কী যেন ভাবল আবার। তারপর হুট করে গায়ের কালো শার্টটা খুলে ফেলল সে। পিউ তব্দা খেয়ে যায়। চেয়ে থাকে গোল গোল চোখে। ধূসরের পরনে ক্রিউ নেকের টিশার্ট ছিল। সমস্যা হয়নি। শার্টটা পেছনে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“ এটা কোমরে বেঁধে নিস।”
বেরিয়ে গেল সে। পিউ চোখ খিচে জিভ কাটল। শার্টটা বুকে চেপে, শরীর ছেড়ে দিলো দেওয়ালে। প্রথম ডেট ভাবছিল এটাকে? প্রথম ডেটেই পিরিয়ড! ছিঃ
পিউ বেরিয়ে এলো কাচুমাচু মুখে। সাদা কামিজের ওপর কোমর থেকে ধূসরের কালো শার্ট প্যাঁচানো। কিছু বোঝা না গেলেও,ওর যে মরে যাওয়ার দশা। মানুষটার সামনে এখন যাবে কী করে? কী ভাবলেন উনি! হায় আল্লাহ…
যার কাছে আমরা পরিপাটি থাকতে চাই,সব এলোমেলো কেন তার সামনেই হতে হবে। প্রথম বার দেখা করতে এসে আছাড় খেয়েছিল। আর আজ এসব।
পিউয়ের চোখ মাটিতে। বাইরে আসা মাত্রই চকচকে শু নজরে পড়ল। বুঝল,এটা ধূসর ভাই। আরো বেশি করে চিবুক গেড়ে রাখল বুকে। কানে এলো একটা নরম প্রশ্ন,
“ কম্ফোর্টেবল?”
প্রশ্ন শুনে আরো নুইয়ে গেল ও।
ঘাড়টা নাড়ল তাও। চেহারার এমন দশা দেখে
ধূসর নিজেই বলল,
“ It’s quite natural….
এত লজ্জার কিছু নেই! আয়।”
এগিয়ে গেল সে। পিউ চেষ্টা করল সহজ হতে। এরকম বিড়ম্বনায় ও এই জীবনে পড়েনি কিনা! তারওপর তলপেটে ব্যথা করছিল। কিন্তু পরপর এত কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছে, কথাটা তাই মুখে আনতে পারল না। এমনিও কম লজ্জা পাচ্ছে এখন? ধূসর খুব দ্রুত হাঁটে, যার সাথে তাল মেলাতে সুস্থ পিউই হিমশীম খেয়ে যায়। সেখানে এখন তো আরো দিশা হারানোর কথা। পিউ তাও মুখ কুঁচকে পা টেনেটুনে হাঁটছিল। হঠাৎ এস্কেলেটরে পা রাখতে গিয়েও, ফিরে এলো ধূসর। কথা নেই বার্তা নেই,ঝট করে প্রশ্নবিদ্ধ পিউয়ের কব্জি চেপে ধরল মুঠোতে। বিস্মিত হয়ে মুখ তুলে চাইল মেয়েটা। ধূসর সেই বিস্ময় দেখে না, এগিয়ে যায়। এস্কেলেটর এড়িয়ে লিফটে গিয়ে ওঠে। পুরোটা সময় পিউয়ের ওই টুকু হাতটা ধরে রাখল সে। একবারও চেয়ে দেখল না,ষোড়শী মেয়েটা কী আশ্চর্যরকম হতবুদ্ধি হয়ে চেয়ে দেখছে তাকে। ধূসর হাত ছাড়ল গাড়ির কাছে এসে। আরিফ দাঁড়িয়ে ছিল বাইরে। ধূসরকে দেখে সিগারেট ছুড়ে ফেলেই ভদ্রের বেশ ধরল। তবে অবাক হয়ে গেল,পিউয়ের কোমরে বাঁধা ধূসরের শার্টটাকে দেখে। গাড়ির পেছনের দোর টেনে খুলল ধূসর। পিউ উঠে বসল দোনামনা করে।
ধূসর দরজা আটকায় না। খোলা রেখেই আরিফকে বলে- যা বলেছিলাম,এনেছো?”
মনে পড়েছে এমন ভাবে পকেটে হাত দিলো আরিফ। দুটো ট্যাবলেট এক পাতায়।
“ এই ওষুধটা না?”
“ হ্যাঁ।”
তারপর ওষুধ পাতা থেকে ছাড়িয়ে পিউয়ের মুঠো খুলে হাতে ধরিয়ে দিলো ধূসর। পানি গাড়িতেই ছিল। ছিপি খুলে এগিয়ে দিলো নীরবে। পিউ বুঝে নেয়,খেতে হবে এটা।
চুপচাপ রা না করে ওষুধ মুখে পুরলো,পানি খেলো দু ঢোক। ধূসর ওর পাশের দরজাটা আটকাল এবার। নিজে ঘুরে গিয়ে ড্রাইভিংএ বসল। আরিফ সব খেয়াল করল,সব। দুই চোখ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে স্ফূর্ত চিত্তে ভাবল,
এদের কি কিছু চলছে? এ কি ওদের ভাবি?
গাড়ি ছুটল। ধূসর মনোযোগী ব্যস্ত রাস্তার দিকে। ওপরে ঝোলানো ভিউ মিররে দেখা যাচ্ছে তাকে। পিউ তন্ময় হয়ে চেয়ে রইল সেদিকে। এত যত্ন,এত যত্ন ভালো না বেসেই যে করছে,ভালোবাসলে সে কী করবে? মাথায় তুলে রাখবে,না বুকে মিশিয়ে ফেলবে! পরপর পিউ মেরুদণ্ড সোজা করে বসে। ধূসর ভাই কি সত্যিই কেয়ারিং,নাকি ওর প্রতি হচ্ছে? ও যে পেটে ব্যথার কথা বলেনি, তাহলে উনি কী করে বুঝলেন? কোথাও না কোথাও ভালোবাসা না থাকলে এমনটা হয়!
চলবে
Share On:
TAGS: আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন, নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৩০
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৫৫
-
হেই সুইটহার্ট পর্ব ৬
-
হেই সুইটহার্ট পর্ব ৯
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৫১
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৪৯
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ২১
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৫
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৬৮.২
-
হেই সুইটহার্ট পর্ব ৮