#আমি_তোমার_হতে_চাই
#পর্ব_৬
#সুরভী_আক্তার
( অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষেধ
)
খানিকক্ষণের মধ্যেই লাঞ্চে বসেছে সবাই ।
অরিধ ও আছে । ওয়াহাজ খান আর এই যুবকের ব্যাক্তিত্ব কোনো অংশেই ভিন্ন নয় । দুজনাই এক ও অভিন্ন । রসকস হীন, দাম্ভিক , কাঠখোট্টা । অবশ্য তাদের স্বভাবটা বিরক্তিকর হলেও তাদের ব্যাক্তিত্বের জন্য একেবারেই পারফেক্ট । পুরুষদের এমন আত্মম্ভরী ব্যক্তিত্বের অধিকারী হতে হয় । তবেই না তাদের পুরুষ বলে মনে হয় ।
সেই দাম্ভিক পুরুষেরা চুপচাপ খাচ্ছে মাথা নামিয়ে । ঘাড় তুলে চায়নি একবারও । যেনো তাদের আশেপাশে কেউই নেই ।
খাওয়ার মাঝে ওয়াহিদা খান অরিধকে ডাকলেন…..
” অরিধ ?
” জি আন্টি ।
ছেলেটার চকিতে উত্তর ।
ভদ্রমহিলা পৃষ্ঠে কিছু বলার আগেই গলায় খাবার আটকে খুক খুক করে কেশে উঠলো দিশা । তড়িঘড়ি করে ওর দিকে এক গ্লাস পানি বাড়িয়ে দিলো ভূমি ।
ঝটপট দু ঢোক পানি গিলে বুকে হাত রাখলো রমনী । লম্বা লম্বা শ্বাস টেনে অরিধের দিকে তাকালো আশ্চর্য হয়ে ।
ওয়াহিদা খান বলে উঠলেন শক্ত গলায়…..
” দিশা, দেখে খাবে তো । খাওয়ার সময় ধ্যান কোথায় থাকে তোমার ?
দিশা পাত্তা দিলো না তার কথায় । বড় বড় চোখে অরিধের দিকে তাকিয়ে শুধালো ব্যস্ত হয়ে…
” আপনি নানুকে আন্টি বলে ডাকেন ?
ওয়াহিদা খান কপাল কুঁচকে ফেললেন…..
” হ্যাঁ ডাকে । তো কি ?
চমকানোর অভিব্যক্তি প্রগাঢ় হলো রমনীর মুখাবয়বে ।
” আরে নানু,,, তুমি যদি আমার নানু হয়ে থাকো তাহলে ওনার আন্টি হও কি করে ? সম্পর্ক ঘুরে যায় তো ।
” তোমার নানু হওয়ার সাথে ওর আন্টি হওয়ার ভেদ করছো কেনো ? তোমার নানু আমি, ওর নই । আমাকে তোমার এতোটা বৃদ্ধ মনে হয় ? অরিধ তো অনেকটা নীলয়ের বয়সী হবে । আমার ছেলের মতোই…..
চেঁচিয়ে উঠলো মেয়েটা…..
” নানুউউউ,,
এহেন উঁচু গলায় অরিধ ব্যাতীত একে একে সবাই ওর দিকে তাকালেন সচকিতে । সবার দৃষ্টিতে ভ্যাবাচ্যাকা খায় রমনী । গলা ভিজিয়ে মিনমিন করে…..
” না মানে,,, উনি তোমার ছেলের মতো হয় কি করে বলতো ? ওনার বয়স সবে সাতাশ । নীলয় মামার ত্রিশ । আর বড় মামার তো আটত্রিশ, তোমার ছেলেদের থেকে অনেক ছোট উনি । ছেলের বয়সী নন মোটেও । ওনাকে ছেলের মতো বলে দাবি করবে না । উনি তোমার নাতির বয়সী ।
আর এইযে জাওয়াদ সাহেব,, আপনি আজ থেকে নানুকে নানু বলে ডাকবেন । আমার নানু মানে, আপনার ও নানু । অতিরিক্ত স্মার্ট হতে বলেনি কেউ আপনাকে । ওনাকে নানু বলে ডাকবেন, বুঝলেন….
অরিধ আহম্মক বনে এক পলকের জন্য তাকালো । কেউ কিছু না বুঝলেও সে বুঝেছে । খাওয়ার মাঝে হাত থমকালো যুবকের । ওয়াহিদা খান না বুঝে ঘাড় ঝাকালেন । রাশভারী গলায় বললেন ওয়াহাজ খান….
” খাওয়ার সময় কথা বলতে নেই, দিশা । চুপচাপ খাও ।
এদিকে ভূমি থ বনে বসে আছে । সবাই চুপ করতেই মেয়েটা আশ্চর্য হয়ে মুখ খুললো….
” বড় মামা,, আপনার বয়স আটত্রিশ ? এত্তো বড় আপনি ? ইয়া আল্লাহ,, দেখে তো মনেই হয় না । তাইতো ভাবি, মিহাজের মতো একটা ছেলে আছে আপনার । আমি তো ভেবেছিলাম আপনি খুব কম বয়সে বিয়ে করেছিলেন । কিন্তু এখন দেখি তা নয়,, আপনি তো অনেক বড় ।
ঝট করে চোয়াল খিচে নিলেন ওয়াহাজ খান । বিগড়ানো মেজাজ চড়ে উঠলো ।
তবুও নিজেকে ধাতস্থ রেখে তাকালেন না, বললেন না কিছু । দিশা ভূমির হাত চেপে ধরে মুখ ফসকানোর আগে থামিয়ে দিলো ওকে ।
ওয়াহিদা খান ফাঁক পেয়ে বললেন অরিধ কে উদ্দেশ্য করে….
” আচ্ছা অরিধ,,, যে জন্য ডাকলাম তখন, শুনলাম তোমার বোনের বিয়ে ঠিক হয়েছে । ভোটের আগেই তো, তাই না ?
” জি আন্টি,,, আমার বোনের আকদ হয়ে আছে এক বছর আগে থেকেই । এবার শুধু একটু অনুষ্ঠান করে বিদায় দেওয়া হবে । আমি চেয়েছিলাম ভোটের পরে নিতে । কিন্তু ওর শশুর বাড়ি থেকে সময় নিলো না আর । এই নির্বাচনের ঝামেলার মধ্যেই বিয়ের আরেকটা ঝামেলা ।
” কবে বিয়ে ?
” আগামী দশ সেপ্টেম্বর, অর্থাৎ পরের শুক্রবারে ।
” বাহ্,, ইনভাইট করলে না তো ?
ঠোঁট টিপে খানিক রসিকতা করলেন ভদ্রমহিলা । অরিধ শব্দহীন হাসলো ।
” ইনভাইট করতেই এসেছি আজ । আপনারা না হলে চলবে কি করে ? স্যার তো আগে থেকেই অবগত । উনি ব্যাতীত আমি কিচ্ছু নই । আর আপনারা ব্যতীত ও আমাদের আর খুব বেশি আত্মীয় নেই । বরপক্ষ মিলিয়ে ঘরোয়া ভাবেই বিদায় দেওয়া হবে । আপনাদের আসা চাই কিন্তু ।
ওয়াহিদা খান নরম হাসেন ।
” অবশ্যই আসবো । তোমার বোনের জন্য অনেক অনেক দোয়া রইলো । আর তুমি একটু ছুটি নাও আপাতত । বোনের বিয়ে সামলাও । একলা ভাই তুমি, অনেক দায়িত্ব তোমার উপর । এই দিকটা ধরে রাখতে গেলে বেশি চাপ পড়ে যাবে ।
অরিধ মৃদু হেসে খাওয়ায় মনযোগ দিলো ।
দিশা প্লেটে ভাত নাড়তে নাড়তে আড়চোখে দেখছিলো ওকে । লোকটা আর একবারও তাকালেন না ওর দিকে । খাওয়া শেষে উঠে যাওয়ার আগে ভূমিকেও বিয়েতে আসার জন্য ইনভাইট করে গেলেন । অথচ দিশাকে বললেন না কিচ্ছুটি । কি আজব লোকরে বাবা !
বিকেলে মিহাজ কে পড়ানো শেষ করার পর থেকেই ভূমি হোস্টেলে ফিরতে চাইছে,, কিন্তু ওয়াহিদা খান কিছুতেই ছাড়ছে না ওকে ।
রাতে মেয়েটার অমন অবস্থা দেখে এখনো তটস্থ তিনি । রমনী সম্পুর্ন সুস্থ নয় । যদি রাতে কিছু একটা হয়ে যায় আবার ? কে সামলাবে তখন ?
এদিকে ভূমির অস্বস্তি হচ্ছে এভাবে অন্যের বাড়িতে পড়ে থাকতে গিয়ে । একেই রাতে ঝামেলায় ফেলে দিয়েছিলো সবাইকে । ভাগ্যিস ভদ্র ফ্যামিলি,, নয়তো কি হতো কে জানে । আর থাকা যাবে না এখানে । ফিরতে হবে যে করেই হোক ।
এনারা তো পর, তাও একটুও বিরক্ত হননি এখনো । উল্টে আবারো ঝামেলা কাঁধে চাপিয়ে নিতে উঠে পড়ে লেগেছেন । আর ওদিকে নিলুফা নাজমিন, তিনি কখনো ভূমির দিকে ফিরেও তাকান নি ।
এতো সব যত্নের ভিড়ে আজ সেই অযত্ন অবহেলা গুলোর কথা বড্ড মনে পড়ছে ভূমির ।
কত রাত অসুস্থতা আর জ্বরের ঘোরে কাটিয়েছে, কেউ কখনো ঘুরেও তাকায় নি । জ্বরে পোড়া শরীর নিয়ে বাড়ির সব কাজ করেছে রমনী । নতুবা খাবার জোটেনি দু বেলা ।
আহাদ আলীও থাকতেন না বাড়িতে ।
মেয়েটার উপর দিয়ে কতকি বয়ে গেছে বছর দুয়েক আগেও । আহাদ আলী রিটায়ার্ড হওয়ার পরও আড়ালে আবডালে অনেক কিছুই সইতে হয়েছে ।
তবে ইদানিং সে মুক্ত ।
কাল থেকে বাবার সাথে কথা বলাও হয়নি । ফোন নেই । দিশার ফোনে ব্যালেন্স নেই ।
ড্রইং রুমে ওয়াহিদা খান বসে আছেন । কুশিকাটা দিয়ে কুশন বুনছেন তিনি । ভূমি ব্যাগ নিয়ে নিচে নামলো । এখন অবাধ্য হয়েই হোস্টেলে ফিরবে সে ।
ওয়াহিদা খানকে দেখে মিনমিন করলো রমনী….
” নানু,, আমি বেরোচ্ছি । বাঁধা দেবেন না প্লিজ । হোস্টেলে ফিরতে হবে আমায় । অনেক জ্বালিয়েছি আপনাদের । আর জ্বালাতে চাইছি না ।
” এ কি,, তোমাকে বললাম তো ফেরা হবে না । আবার ব্যাগ নিয়ে বেরিয়েছো তুমি ? যাও উপরে, কোত্থাও যাওয়া হবে না ।
” না নানু, আমাকে ফিরতে হবে ।
হোস্টেল থেকে নোটিশ আসবে নয়তো । একেই একরাত ছিলাম না । আজ যেতেই হবে । আমি তো সুস্থ হয়ে গেছি, কোন সমস্যা হবে না । কাল আমার জন্য অনেক কিছু করেছেন, তার জন্য আমি অনেক কৃতজ্ঞ নানু । এ জীবনে অসুস্থ থেকে কখনো কারোর সেবা পাইনি । সে জায়গায় আপনারা অনেক করেছেন ।
ওয়াহিদা খান গম্ভীর মুখে বলেন….
” ভূমি, অবাধ্য হচ্ছো তুমি । উপরে যাও বলছি ।
আমাদের বাসায় থাকতে সমস্যা কোথায় তোমার ? আমরা কি আপন নই ? হোস্টেলেই বা থাকছো কেনো ? এতো বড় বাড়ি আমাদের, মানুষের অভাব শুধু । তুমি একটু অভাব পূরণ করতেই পারো । ভালো লাগে তোমায় । এক কাজ করো, হোস্টেল থেকে আমাদের বাড়িতে পুরোপুরি শিফট করে যাও । এখান থেকেই পড়াশোনা করবে । মিহাজ কেও পড়ানো হবে । সুবিধা হবে তোমার ।
ভূমি আশ্চর্য হয় ।
কি সাবলীল ভাবে কথা গুলো বলে দিলেন ভদ্রমহিলা । পরের প্রতি এতোটা সহজ হয় কেউ ? এতো সহজে মানিয়ে নিতে পারা যায় ?
মিহাজ ভদ্রমহিলার কথায় নেচে উঠলো । জাপটে ধরলো ভূমির লতানো কোমর…..
” হ্যাঁ মিস, তুমি আমাদের বাড়িতে চলে এসো প্লিজ । খুব ভালো হবে । ইউ নো, তোমাকে মিস করি আমি । তুমি সবসময়ের জন্য চলে আসলে আর মিস করবো না । প্লিজ থেকে যাও আমাদের সাথে ।
জড়বুদ্ধতা গিলে তাৎক্ষণিক নাকোচ করলো রমনী….
” কি যে বলো মিহাজ,,, এটা হয় নাকি ? আমাকে হোস্টেলে ফিরতে হবে এখন । দেরি হয়ে যাচ্ছে ।
আচ্ছা নানু এসব বাদ দিন,, আমাকে আপনার ফোনটা একটু দেবেন ? বাড়িতে আব্বুর কাছে কল করতাম । কাল থেকে কথা হয়নি । আব্বু ফোন করেছিলো বোধহয়, পায়নি হয়তো । আমার ফোনটা তো কাল ভেঙ্গে গেছে কাল ।
ওয়াহিদা খান সোফার উপর নিজের ফোন খুঁজলেন । পেলেন না । হয়তো ঘরে ফেলে এসেছেন ।
ভদ্রমহিলা চোখ তুলে কিছু বলার আগেই ওয়াহাজ খান নজরে পড়লেন । নেমে আসছেন ভদ্রলোক ।
ভদ্রমহিলা কথা পাল্টালেন,,,,
” ওয়াহাজ, তোমার ফোনটা একটু দাও তো আমায় ।
ওয়াহাজ খান দ্বিরুক্তি করলেন না এক মুহুর্তেও । পাঞ্জাবির পকেট থেকে ফোন বের বাড়িয়ে দিলেন মায়ের দিকে । অতঃপর পায়ে পা তুলে বসলেন পাশেই ।
ওয়াহিদা খান ছেলের ফোনটা ভূমির দিকে বাড়িয়ে দেন…
” এই নাও ভূমি, কথা বলে নাও বাড়িতে ।
তৎক্ষণাৎ মুখখানি কুঁচকে আসে ভদ্রলোকের ।
চোয়াল খিচে মায়ের দিকে তাকাতেই বললেন ওয়াহিদা খান…..
” ওর ফোনটা নষ্ট হয়ে গেছে । বাড়িতে কথা বলেনি কাল থেকে । একটু কথা বলে নিক ।
রক্তিম চোখ নামিয়ে নিলেন ওয়াহাজ ।
ভূমি ফোন হাতে নিয়েই শুধোয়…..
” ফোনে তো পাসওয়ার্ড দেওয়া । মামা,, খুলে দিন ।
মিহাজ ঝট করে বললো…..
” বাবার ফোনের পাসওয়ার্ড নীলিমা । ইংরেজিতে লেখো, খুলে যাবে ।
ভূমি খুব বেশি ভাবলো না । আর না কেউ খুব একটা উদ্বেগ দেখালো । ওয়াহাজ খানের বিষয়ে এটুকু নিয়ে সবাই অবগত ।
পাসওয়ার্ড টাইপ করার সাথে সাথে ফোনের হোম স্ক্রীন ওপেন হতেই আকস্মিক স্তম্ভিত হলো বিংশী রমনী । দৃষ্টি জোড়া হলো বৃহৎ । যেনো কোটর ছাড়িয়ে বেরোবে এক্ষুনি । ফোনের হোম স্ক্রীনে হাস্যোজ্জ্বল এক রমনীর ছবি ভাসছে । নীল শাড়ি পরিহিত নীলিমা সে । তাৎক্ষণিক বুঝতে বেগ পায় না ভূমি । অবাক লোচনে চেয়ে রয় স্ক্রিনের পানে । ছবির মেয়েটা অনেকটা কম বয়সী । অনেক আগের ছবি এটা, দেখেই বোঝা যাচ্ছে । ভরা গালে হাসি ঝুলছে সেই রমনীর ।
খোঁপায় থরে থরে গুঁজে রাখা লাল গোলাপ । সাজ প্রসাধনী নেই মুখাবয়বে । টুকটুকে ফর্সা সেই রমনীর সাজের কোনো প্রয়োজন পড়ে নি । কেবলই নীল শাড়ি আর বাঁধা খোঁপায় লাল গোলাপ, এতেই চমৎকার দেখাচ্ছে তাকে । চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার মতো সুন্দর সেই রমনী ।
ছবিটা বোধহয় দূর থেকে তোলা । ঝাপসা হলেও তার সৌন্দর্য ঝাপসা নয় মোটেও ।
ভূমি আপ্লুত চোখে চেয়ে দেখে নিষ্পলক । কি ভীষণ সুন্দর রমনী সেই জনা । চোখ জুড়িয়ে আসছে । এই তবে খান সাহেবের অর্ধাঙ্গিনী ?
ভাবতে গিয়ে এক চিলতে হাসে বিংশী । ঘোরে বিঘ্ন ঘটে এমপি সাহেবের তপ্ত আওয়াজে…..
” দিশা, তাকে পাঁচ মিনিটের মধ্যে কথা বলা শেষ করতে বলো । ফোন লাগবে আমার ।
নড়েচড়ে ওঠে ভূমি । ওয়াহাজ খান সটান বসে আছেন ।
রমনী ঢোক গিলে গলা ভেজায় । ধ্যান ফিরিয়ে তড়িঘড়ি করে কল লাগায় আব্বুর নাম্বার তুলে । সিঁড়ির পাশে গিয়ে দাঁড়ায় সে । ওপাশ থেকে ফোন রিসিভ হতেই গলা নামিয়েও ছটফট করে ডাকে…..
” হ্যালো আব্বু,, আমি অনামিকা ! শুনতে পাচ্ছো ?
আহাদ আলী কাল থেকে চিন্তায় চিন্তায় নাজেহাল । উদগ্রীব হয়ে পড়েছিলেন । হাজার বার ফোন করেও মেয়ের খবর জোগাতে পারেননি । এই এতক্ষণ পর মেয়ের কন্ঠ পেয়ে বসা থেকে সহসা উঠে দাঁড়ালেন তিনি…..
” অনামিকা, কোথায় তুমি মা ? কাল থেকে ফোনে পাচ্ছি না কেনো ? কত চিন্তায় ছিলাম আমি, জানো ? ঠিক আছো তুমি ?
” আমি একদম ঠিক আছি আব্বু । চিন্তা করো না । ঐ আসলে আমার ফোনটা নষ্ট হয়ে গেছে । তাই কথা বলতে পারিনি কাল থেকে । তুমি ভালো আছো তো ? ঔষধ নিচ্ছো নিয়ম করে ? রোজ রাতে কিন্তু প্রেসারের ঔষধ খেতে হয় । খাচ্ছো তো মনে করে ?
আহাদ আলী খানিক প্রশান্ত হাসেন ।
ভূমির কথা শুনে ওয়াহিদা খান ও মুচকি হাসলেন । টুকটাক কথা শেষে মেয়েকে বললেন ভদ্রলোক….
” মা,, আমি তোমাকে টাকা পাঠিয়ে দেবো । খুব তাড়াতাড়ি নতুন ফোন কিনে নিও । তবুও এভাবে চিন্তায় রেখো না আমায় । ভয় হয় মা । বোঝোই তো, তুমি একা আছো ওখানে ।
” টাকা পাঠানোর প্রয়োজন নেই আব্বু, আমি এই ফোনটাই ঠিক করে নেবো । কিছু টাকা আছে আমার কাছে ।
আর শোনো, আমি পরের মাসে বাড়ি চলে আসবো কিন্তু । যাই হোক না কেনো, আমার ভালো লাগছে না এখানে । হোস্টেলের রুমে একা থাকি এখন, ভয় লাগে আমার । তুমি জানো তো এসব । আমি আর থাকবো না এখানে । কষ্ট করে হলেও বাড়ি থেকে যাতায়াত করবো । যদি তাও না হয়, তাহলে কিছুদিন থেকে ফিরে আসবো আবার ? প্লিজ আব্বু, অনেক দিন দেখিনা তোমায় । বাড়িতে যাই একবার….
মেয়েটার কন্ঠ ভিজে নুইয়ে এসেছে । তবুও কথাগুলি কানে পড়লো সবার । ওয়াহাজ খান বিরক্তি গিলে তাকালেন আড়চোখে ।
ওপাশ হতে আহাদ আলী কিছু একটা বলে ফোন কাটলেন । ভূমি কান থেকে ফোন নামিয়ে অগোচরে হাতের উল্টো পিঠে ভেজা কার্নিশ মুছে নেয় । মুচকি হেসে ফিরে আসে । ফোনটা সোফার উপর রাখতে রাখতে বলে ধরা গলায়…..
” কথা বলা হয়ে গেছে । থ্যাংক ইউ মামা ।
আর হ্যাঁ,, ফোনের স্ক্রিনে আপনার বউয়ের ছবি দেওয়া, তাই না মামা ? খুব সুন্দর তিনি !
মেয়েটা আমুদে হয়ে শেষ কথাটা বললো । না তাকালেও ওর কথাটায় বেশ প্রশন্য হলেন ওয়াহাজ খান । ঠোঁটের কোণে হাসি খেলে গেলো তার ।
তার স্ত্রী সুন্দর, তিনি জানেন । চোখ জুড়ানোর মতো সুন্দর ছিলো নীলিমা । যে সৌন্দর্যের বেড়াজালে আটকে আজ অবধি কোনো নারীর দিকে ঘন, গভীর দৃষ্টি তুলে তাকান নি ভদ্রলোক । প্রয়োজন পড়ে নি ।
স্ত্রীর শূন্যতা আছে । তবে এতো বছরেও ভেতর ঘরে স্ত্রীর প্রতি অগাধ ভালোবাসায় শূন্যতা আসেনি চিলতে পরিমাণ ও । তিনি তার স্ত্রী কে ভালোবাসেন । ভীষণ ভালোবাসেন । যার কথা উঠলেই তার বক্ষস্থল হীম হয়ে যায় । এখন ও হলো ভূমির প্রশংসায় ।
তবে পরক্ষণেই ভূমি বললো আবার…..
” একটা কথা বলি মামা,,, শুনেছি মৃত মানুষের ছবি রাখতে নেই । আমার আব্বুও রাখেন নি । রাখলে হয়তো আমি আমার মাকে দেখতে পেতাম ।
ফের নুইয়ে আসলো রমনীর গলার স্বর । ওয়াহাজ খানের হাসিও বিলিন হলো । ওয়াহিদা খান শুধোলেন….
” তুমি তোমার মাকে দেখোনি কখনো ?
” দেখবো কি করে, আমার জন্মের সময়ই তো চলে গেছেন তিনি ! দেখিনি….
” ছবিতেও না ?
” আব্বু তো মায়ের কোনো ছবি রাখেই নি । দেখবো কি করে ? তবে শুনেছি,, আমার মা আমার মতো দেখতে । একজন চলে গেছে, আর তার আদল দিয়ে আমাকে রেখে গেছে ।
বলেই ফিক করে হেসে উঠলো মেয়েটা । বোঝা গেলো না তার হাসির কারন । ওয়াহিদা খান বললেন আবার….
” বাড়িতে যাবে ? বাবা কি বললো ? যেতে বললো বাড়িতে ?
ঠান্ডা প্রশ্নে জোর পূর্বক মুচকি হাসে রমনী….
” উঁহু, এখানে থাকতে বললো । একবার বাড়ি গেলে এখানে আসার পথ বন্ধ হয়ে যাবে আমার । তাই থেকে যেতেই বললো । আব্বু এসে দেখে যাবেন আমায় ।
” বাবা ভালোবাসে তোমায় ?
ঠোঁটে টানা কাষ্ঠ হাসি টুকু চওড়া হলো রমনীর । এ বেলায় সত্যি সত্যিই আপ্লুত হলো সে…..
” বাবা ছাড়া আমাকে ভালোবাসার আর কেউ নেই নানু । কেবল আব্বুই ভালোবাসে ।
কথা ফুরোতেই পরিপ্রেক্ষিতে তাৎক্ষণিক দিশা অভিযোগি স্বরে বলে উঠলো ওর বাহু টেনে…..
” শুধু আঙ্কেল,,, আর আমি ? আমি ভালোবাসি না তোকে ?
ভূমি ঝট করে তাকায় । মৃদু হাসে । দিশার সাথে সাথে মিহাজ ও যোগ হলো আদুরে গলায়….
” শুধু দিশা আপি,,, আর আমি ? মিস, আমি ভালোবাসি না তোমায় ? বাসি তো ! ইউ নো, মিহাজ তোমাকেও ভালোবাসে এখন ।
” আর আমিও ! মিষ্টি একটা মেয়ে,, তোমাকে ভালো না বেসে থাকা যায় ?
কুশন পাশে রেখে মোলায়েম কন্ঠে কথা টুকু বললেন ওয়াহিদা খান । মিহাজ বাচ্চা সুলভে তড়াক করে বলে মুখ ফসকে….
” আর বাবাও । বাবাও তোমাকে ভালোবাসে মিস । সবাই ভালোবাসে তোমায় । তুমি খুব ভালো ।
কথাটাকে পরোয়া করলেন না কেউ ।
ভূমি উদাসীন চিত্তে জোর পূর্বক হাসার চেষ্টা করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে । হোস্টেলে ড্রাইভার পৌঁছে দেয় রোজ । আজও তাই । হোস্টেলের পাশেই মেইন রোডে নামিয়ে দেওয়া হয় ওকে ।
সেখান থেকে গলির মধ্যে ঢুকে দু মিনিট হাঁটলেই রোকেয়া ছাত্রীনিবাস । সেখানেই তিন তলায় থাকে ভূমি ।
মেইন রোডে নেমে প্রথমেই পাশের একটা ফার্মেসিতে ঢুকলো রমনী । আসার সময় ও বাড়ি থেকে মেডিসিন গুলো নিয়ে আসা হয় নি । ভুলে ফেলে এসেছে তাও নয় । ইচ্ছে করেই রেখে এসেছে ।
নাম গুলো মনে ছিলো , সেই অনুযায়ী কিছু ঔষধ কিনলো মেয়েটা । অতঃপর গলির দিকে পা বাড়াতেই ডাক পড়লো পেছন থেকে । কেউ বোধহয় ডাকলো ওর নাম ধরে । অন্যমনস্ক থাকায় প্রথমেই চকিতে ঠাহর করতে পারলো না মেয়েটা । পরক্ষণে আবারো ডাক পেতেই ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো পেছনে ।
স্বল্প পরিচিত একখানা পুরুষালি মুখ । ভূমির কপাল কুঁচকে আসে সহসা ।
নাভিদ এগিয়ে গেলো ওর দিকে । ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ঝুলছে । আরো কয়েকজন আছে ওর সাথে । ভূমি হতবিহ্বলতা কাটিয়ে ওঠার আগেই যুবক নিদারুণ হেসে বললো….
” কেমন আছো ভূমি ?
” আ… ভালো ! কিন্তু আপনারা এখানে ?
” তোমার খোঁজে । কালকের পর আর তো দেখা হলো না । রাতে খান বাড়িতেই ছিলে, তাই তো ?
” আপনি জানলেন কি করে ?
” ওয়াহাজ খান বলেছেন । তার থেকেই শুনলাম । শরীর খারাপ হয়ে গেছিলো কি খুব ? ব্যাথা – ট্যাথা আছে এখনো ?
ভূমি কপালের ভাঁজ সমেত মুখখানি জোর পূর্বক শিথিল করার চেষ্টা করে । ওয়াহাজ খান এনাকে বলেছেন এসব ? কেনো যেনো অপ্রস্তুত লাগলো এটা মানতে গিয়ে ।
আবার হতেও পারে । ইনি তো বলেছিলেন, ওয়াহাজ খানের সাথে এনার সম্পর্ক ভালো । প্রতিদ্বন্দ্বী হলেই যে সম্পর্কে দ্বন্দ্ব থাকবে, তা তো নয় ।
দ্বিধা ঠেলে মিষ্টি হাসলো রমনী । বললো….
” রাতে জ্বর এসেছিলো,, তাই ও বাড়ি থেকে আসতে দেয়নি কেউ । এখন ঠিক আছি ।
” এটাই জানার ছিলো । আর হ্যাঁ, তোমাকে একটা জিনিস দেওয়ার আছে ।
ভূমি প্রশ্ন সূচক দৃষ্টিতে চায় । আগ বাড়িয়ে কিছু বলে না । তার আগে পেছনে হাত বাড়াতেই নাভিদের হাতে একটা শপিং ব্যাগ ধরিয়ে দিলো ওর সাঙ্গপাঙ্গদের মধ্যে একজন । নাভিদ সেই ব্যাগটা ভূমির দিকে বাড়িয়ে দেয়…..
” এটা তোমার জন্য ?
” কি এটা ?
” ফোন আছে একটা । কাল তোমার ফোনটা নষ্ট হয়ে গেছে তো । তাই আমার পক্ষ থেকে এটা তোমার জন্য প্রথম উপহার । নাও, ধরো….
চমকে যায় ভূমি । এক কদম পেছায় । হাত নেড়ে বাঁধ সাধে অগত্যা…..
” এমা, না না,, কি বলছেন ? আশ্চর্য ! আমি কেনো এটা নিতে যাবো ? আমার ফোন আজ বা কাল রিপেয়ার করে নেবো আমি । আপনি এটা কেনো এনেছেন ?
ঠোঁট কামড়ে নেয় নাভিদ । কালো চশমার আড়ালে তার প্রখর দৃষ্টি বোঝা দায় । মুখাবয়ব শিথিল । সে বলে নরম গলায়….
” তোমাকে দেওয়ার জন্যই এনেছি । আমি কি তোমাকে কিছু দিতে পারি না ?
” না, পারেন না ! আপনি তো আমাকে চেনেন না, আর না আমি আপনাকে খুব ভালো করে চিনি । আর আমি দশ আসনের ভোটার ও নই । যাই করুন না কেনো, আপনার বাক্সে একটা ভোট বাড়িয়ে দিতে পারবো না আমি ।
মেয়েটার ভনীতা হীন কথায় এক মুহুর্ত বাদ ঠোঁট কাঁপিয়ে শব্দ করে হাসলো নাভিদ । পেছনের ছেলে গুলোও হাসলো তাল মিলিয়ে ।
ভূমি থতমত খায় ওদের হাসি দেখে । নাভিদ বলে হাসি আটকে নিয়ে……
” পিচ্চি মেয়ে,,, তোমার কি মনে হচ্ছে , ভোট পাওয়ার জন্য আমি তোমাকে কনভেন্স করছি ? হাউ ফানি ! আমি জানি তুমি দশ আসনের ভোটার নও । চিনিও না তোমায় । তবে চিনতে কতক্ষন । চাইছি চিনতে । অ্যাজ অ্যা সিনিয়র ফ্রেন্ড,, আমার পক্ষ থেকে এটা নিয়ে নাও । উপহার দিচ্ছি । ফিরিয়ে দিলে ভালো লাগবে না আমার ।
ভূমি আড়ষ্ট হলো ।
ইশশ্, লোকটা কি না কি ভাবলো । সে ওভাবে ঠাস ঠাস করে কথা বলতে চায়নি । আমতা আমতা করলো মেয়েটা….
” কিছু মনে করবেন না প্লিজ, বাট আমি এটা নিতে পারবো না । উপহার এনেছেন এই অনেক । আজ আসি, হ্যাঁ ? দেরি হয়ে যাচ্ছে আমার । ভালো থাকবেন । আবার দেখা হবে ।
বলেই পিছু ফিরে পা বাড়ালো রমনী ।
নাভিদ চোয়াল খিচে নেয় উপেক্ষিত হয়ে । হাত মুঠিয়ে সামলায় নিজেকে । মেয়েটা আর ফিরেও চাইলো না । খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে গলির ভেতর চোখের আড়াল হলো ।
ফোঁস করে ওঠে নাভিদ । পেছন থেকে একজন শুধোয়…..
” আপনি ঠিক কি করতে চাইছেন, স্যার ? এই মেয়েটার সাথে এতো খাতির জমাচ্ছেন কেনো হঠাৎ ? ও তো আসলেই ভোটার নয় ।
ফিচেল হাসলো যুবকটি । বিড়বিড় করলো ঠোঁট বাঁকিয়ে….
” ভোটার নয়, তবে আমার পক্ষে হাজার হাজার ভোট কেড়ে এনে দেবে ও । নারী বিদ্বেষী ওয়াহাজ খানকে এই নারীতেই বদ করতে হবে, বুঝলে ? কাটা দিয়েই কাটা তুলতে হবে । তার সাথে লাগাটা এতো সহজ নয় । জানোই তো ? ওয়াহাজ খান চতুর । তার চতুরতা কে রুখতে হবে সরলতা দিয়ে ।
তার ফুলের মতো পবিত্র চরিত্রে কিঞ্চিত দাগ বসাতে পারলেই কিচ্ছা খতম । তাকে ভোটের আগেই আসন থেকে টেনে হিড়হিড়িয়ে নামাবে পাবলিক ।
কথা শেষ করে হিসহিসিয়ে পৈশাচিক হাসলো সে । পেছনের ছেলেগুলো চোখ কপালে তোলে । বলে একজন,,,,
” কিন্তু এই বাচ্চা মেয়ে টাকেই কেনো বাছাই করলেন ? ও কি করবে ? পারবেন ওকে কাজে লাগাতে ? শুনবে ও আপনার কথা ?
” ওকে শুনতে হবে না কিছু,,, কাউকেই শুনতে হবে না । সবাই দেখবে শুধু । উপস্থিত মুহুর্তে সবাই চমক পাবে ।
আর ওকেই বাছাই করেছি, কারন খান মঞ্জিলে আর কোনো মেয়ের পদার্পণ ঘটে না । ওর পা পড়েছে, লোকের চোখে পড়েছে ও । চোখের দেখা মিথ্যেও সত্য প্রমাণিত হয় খুব সহজে । আর সেটাই হবে । জাস্ট ওয়েট এন্ড ওয়াচ……
” তার মানে এই কারনেই কাল ঐ রিকশার এক্সিডেন্ট…….
পুরো কথা শেষ হওয়ার আগেই ঠোঁটে আঙুল চেপে থামিয়ে দিলো নাভিদ । হিসহিসিয়ে উঠলো…..
” হুশশশ,,, বাতাসের ও কান আছে । চুপ, একদম চুপ । নাভিদ ইশরাক ভালো মানুষ, শান্ত মানুষ । এবারের নির্বাচনে কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে না । খুব শান্তিতে ভোট খেলবে নাভিদ ইশরাক । নির্বাচনের দিন ফাঁকা মাঠে গোল দেবে সে । আর তার জন্য এই মেয়েটাকে লাগবে আমার । এই ভূমিকে লাগবে । ভূমিকে দিয়েই ভূমি দখল করবো আমি ।
রেসপন্স করবেন সবাই । হ্যাপি রিডিং । 
#চলবে……..
Share On:
TAGS: আমি তোমার হতে চাই, সুরভী আক্তার
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৮২
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৭৮
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৮৪
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৬৪
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৫৩
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৬৬
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৮৭
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৬৩
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৭৭
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ১৮