Golpo romantic golpo আসবো ফিরে আবারো

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৮৭


#আসবো_ফিরে_আবারো

#পর্ব_৮৭

#সুরভী_আক্তার

শাফাহ্ অবিশ্বাসে দুদিকে মাথা নাড়ে । ঠোঁট ভেজায় । পরপর ঢোক গেলে বেশ কবার । অস্পষ্টে বলে থেমে থেমে….

” দেখো ভাইয়া,, মজা করবে না । মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোমার ? আমি কোনো ডিভোর্স পেপারে সাইন করবো না ! ওনার থেকে মুক্তি চাই না আমি । 

শুভ্র হাত মুঠিয়ে নেয় । এক ধাক্কায় দাঁড়িয়ে যায় । বাড়ি কাঁপিয়ে বাজখাঁই সুরে বলে…..

” কোনো মজা করছি না আমি । তুই যদি আজ এই পেপারে সাইন না করিস, তাহলে আমি ভুলে যাবো যে তুই আমার বোন । এটা ভুলে যাবো আমি, যে আমার একটা আদরের বোন ছিলো । যদি তোর লাইফে আমার কোনো ইম্পর্ট্যান্স থেকেই থাকে, তাহলে তুই ঐ ইয়াশকে ডিভোর্স দিয়ে বীনা বাক্যে সায়ানকে বিয়ে করবি । নতুবা ভাইয়াকে হারাবি । 

পূণরায় কেঁপে ওঠে শাফাহ্ । এ বেলায় টপাটপ পানি গড়ায় চোখ হতে । ফিকড়ে ওঠে মেয়েটা । সিটিয়ে বসে । তৌসিফ কাবির তেতে ওঠেন ছেলের উপর…..

” শুভ্র,, সব কিছুর একটা লিমিট থাকে । লিমিট ক্রস করবে না । কিসের ঔদ্ধত্যতা দেখাচ্ছো আমার মেয়ের উপর ? একটা বিয়ে হয়ে গেছে । সেই বিয়ে ভাঙাটা এতোটা সহজ মনে হয় তোমার কাছে ? বাড়িতে একেই অনেক ঝামেলা লেগে আছে,, দয়া করে নতুন কোনো ঝামেলার সৃষ্টি করো না । চলো এখান থেকে…..

” না আব্বু । আমি ঝামেলা বাড়াচ্ছি না, বরং কমানোর চেষ্টা করছি । আমাকে আটকানোর চেষ্টা করবে না কেউ । সবাই যাও এখান থেকে । আমি একা ওর সাথে কথা বলবো । 

শাহিনা কাবির ধমকে উঠলেন এবারে…..

” শুভ্র,, তোর বাবার উপর ঔদ্ধত্য হবি ? কথা কানে যাচ্ছে না ? কি বলছিস তখন থেকে ? 

” আমি যা বলছি তাই । প্লিজ বাইরে যাও তোমরা । ঐ ছেলে আর আসবে না । লাভ কি ওর জন্য অপেক্ষা করে ? এতো দিন আমিও অপেক্ষায় ছিলাম । এখন বুঝে গেছি,, ও ফিরবে না আর । 

” না,,, মেঘার ভাইয়া ফিরবেন । কথা দিয়েছেন আমায় ! উনি ফিরে আসবেন, ভাইয়া । আমি ডিভোর্স দেবো না ওনাকে । 

সহসা অগ্নি দৃষ্টিতে তাকায় শুভ্র । যেনো চোখেই ভস্ম করে দেবে ‌। শাফাহ্ মুখ চেপে ধরে চুপসে যায় ‌। নিঃশব্দে শ্বাস রুখে ফুঁপিয়ে ওঠে মেয়েটা । তৌসিফ কাবির এসবে অতিষ্ঠ ‌‌। ইদানিং কোনো চাপ ঝামেলাই সহ্য হয় না তার । তিনি ছেলেক বকাঝকা করতে করতে গটগটিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন । 

বড় ভাইয়ের পিছু পিছু ঘর ছাড়লেন তোফায়েল কাবির ও । একে একে বাড়ির দুই কর্তীও । 

শাফাহ্’র গোঙানির শব্দ শোনা যাচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে । মেয়েটার বুক চিরে যাচ্ছে । পারছে না শব্দ করে কাঁদতে । আদ্র ফোঁস করে শ্বাস ফেলে । 

” ভাইয়া,,, এসব ঝামেলা বাড়িও না । মাথা ঠান্ডা করে গিয়ে ঘুমাও । বিশ্রাম প্রয়োজন তোমার ! 

শুভ্রর সটান বাক্য…..

” ডিভোর্স পেপারে সাইন কর টুকটুকি । 

” আ…আমি সাইন করবো না । 

বোনের অবাধ্যতায় মাড়ি খিচে নেয় শুভ্র । ঠাস করে পেপার গুলো টেবিলের উপর রাখে । বোনের কনুই ঠেসে এক টানে দাঁড় করায় ওকে । বজ্র ধমক দেয় চোখ মুখ রাঙিয়ে….

” সাইন করবি তুই । কিসের আশায় আছিস হ্যাঁ ? এতো দিনেও ও তোর খোঁজ নেয় নি । আর কখনো নেবেও না । 

ফেলে গেছে ও তোকে ! রৌদ্রের থেকে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ও জাস্ট ইউজ করেছে তোকে । এর বেশি আর কিচ্ছু নয় ‌। এখন তোর আর কোনো প্রয়োজন নেই ওর । সব শেষ, তাই ফেলে গেছে । বুঝলি ? চেষ্টা কর বোঝার ! সাইন কর ডিভোর্স পেপারে ! 

মেয়েটার কান ঝালাপালা হয়ে যায় । শব্দ করে ডুকরে কেঁদে ওঠে এবার । আদ্র তেড়ে গিয়ে ওকে ছাড়িয়ে নিজের বাহুডোরে আবদ্ধ করে নেয় । 

” ভাইয়া,,, মাইন্ড ইউর ল্যাংগুয়েজ । পাগল হয়ে গেছো ? কি যা তা বলছো ? ও ছোট বোন তোমার ! আরে কি শুরু করেছো তখন থেকে ? প্লিজ থামো,, ওর উপর জোর খাটাতে পারো না তুমি । 

” আদ্র,, ছাড় ওকে । আমি ওর ভাইয়া, ওর খারাপ চাইনা নিশ্চয়ই । তুই ছাড়, ও ডিভোর্স পেপারে সাইন করবে । 

টুকটুকি,, ঘোর এদিকে । সাইন করবি তুই । 

মেয়েটা আঁতকে উঠে আদ্রকে আঁকড়ে ধরলো ! লুকিয়ে নিলো নিজেকে । সে এখন ইয়াশের স্ত্রী । স্বামী স্ত্রীর বন্ধন তৈরি হয়েছে ওদের মাঝে । চঞ্চলা এখন ইয়াশের ভালোবাসায় সিক্ত, পূর্নাঙ্গ রমনী । সে কি করে পারে ইয়াশ কে ডিভোর্স দিতে ? তাও আবার সায়ানকে জড়ানো হচ্ছে এখানে । না, এ হতে পারে না । সে ইতোমধ্যে অন্য কারোর হয়ে গেছে সম্পুর্ন রুপে । ভাবতে গিয়ে কাঁপে রমনী । 

” আমি সাইন করবো না, আদ্র ভাইয়া । আমি ডিভোর্স দেবো না ওনাকে । উনি ফিরে আসবেন । আমাকে অপেক্ষা করতে বলেছেন ! আমি অপেক্ষা করবো ওনার জন্য । উনি আমার হাসবেন্ড । আমি আর ছাড়তে পারবো না ওনাকে । 

শুভ্র আর সহ্য করলো না । ধৈর্য শক্তির বাঁধ ভাঙলো এবার । ফর্সা মুখাবয়ব ঠিকড়ে উঠলো । ক্ষুব্ধ মস্তিষ্কে আকস্মিকই ভুল করে বসলো একটা । 

আদ্রের বাহুডোর থেকে শাফাহ্ কে টেনে হিচড়ে সরিয়ে ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে সপাটে একটা থাপ্পর বসালো মেয়েটার নরম গালে । 

শব্দ হলো বিটক । ঠাস করে ওঠা আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হলো চার দেয়ালের মাঝে । শিশির আর মেহের চমকে ওঠে । 

শাফাহ্ থাপ্পরের টালে ছিটকে পড়ে সোফার উপর । মাথা চক্কর কেটে ভনভন করে ওঠে মেয়েটার । 

ঝি ঝি ধরে কোমলাঙ্গে । আদ্র হতবুদ্ধতা কাটিয়ে অস্ফুটে উচ্চারণ করলো…..

” ভাইয়া,,, 

ধড়ফড়িয়ে সে বসলো শাফাহ্’র পাশে । মেয়েটাকে আগলে টেনে ঘোরালো নিজের দিকে । মুখখানা আজলে ধরার চেষ্টা করলো । শাফাহ্ স্তব্ধ হয়ে গালে হাত চেপে ধরেছে । নিরিবিলিতে পানি ঝড়ছে চোখ হতে । 

” টুকটুকি,,, লেগেছে খুব ? দেখি হাত সরা ।

মেয়েটা হাত সরালো না ‌। 

মেহের ছুটে গেলো । শাফাহ্ কে টেনে নিলো নিজের দিকে । গাল হতে হাত সরাতেই আঁতকে উঠলো সে । এর মধ্যেই চার আঙ্গুলের দাগ স্পষ্ট ফুটে উঠেছে টুকটুকে ফর্সা গালে । টকটকে লাল বর্ন ধারন করেছে মেয়েটার বাম কপোল । 

মেহের শুভ্রর উপর চেঁচায়….

” এটা কি করলে তুমি ? 

শুভ্র নিজেও স্তব্ধ । জড়বুদ্ধ সে । হাত উঠে গেছে বেঘোরে । কখন এতোটা ক্রোধ ঠিকড়ে বেরোলো, নিজেও বুঝতে পারেনি যুবক । সে বোনের দিকে তাকায় । তাজ্জব বনে যায় নিজের নিয়ন্ত্রণ হীন কান্ডে । শুষ্ক ঢোক গেলে । 

সেকেন্ড কয়েকের নীরবতা ভেঙে শাফাহ্ শব্দ করে হাসলো । হাসি ঠেলে আলগোছে চোখ মুছে থেমে থেমে উত্তর করলো মেহেরের উদ্দেশ্যে…..

” ভাইয়া আমাকে মারলো, মেহের আপু ! জীবনে প্রথম বার মারলো । 

মেয়েটা ফের হাসে । চোখের জল গালে মিশতেই চিনচিনে ব্যথা হয় তার । দাঁত চেপে সহ্য করে রমনী । 

শুভ্র এগোয় এক কদম । ঢোক গিলে বলতে চায় ধরা গলায়…..

” টুকটুকি..

” বলো ভাইয়া ! কি বলবে জানি আমি,,, আমার লাগেনি একটুও । আমি ঠিক আছি । একদম ঠিক আছি । একটু মাথা ব্যথা করছে শুধু । ঘুমাবো আমি ! আরো মারবে ? কিছু বলবে আরো ? না বলার থাকলে যাও এখান থেকে,,সবাই যাও আমি ঘুমাবো । 

আশ্চর্য হয়ে ওকে দেখে সবাই । 

জিভে অধর ভেজায় শুভ্র । সবার অগোচরে ডান চোখের কার্নিশ ঘেঁষে এক ফোঁটা পানি ঝরে তার । 

শাফাহ্ নতজানু হয়ে মুহুর্ত কয়েক বসে থাকলো । অতঃপর উঠে দাঁড়িয়ে নিস্তেজ শরীর টাকে টেনে টুনে নিয়ে গেলো বিছানার কাছে । তখন খিদে পেয়েছিল বড্ড । খাওয়াও হলো না আর । মেয়েটা বেড সাইড টেবিলের উপর থেকে পানির গ্লাস নিয়ে ঢকঢক করে গোটা গ্লাস ফাঁকা করে । 

অতঃপর সাবলীল ভাবে শুয়ে পড়ে বিছানায় । শরীরে কম্ফোর্টার টেনে নিতে নিতে বলে….

” গুড নাইট ভাইয়া,,, যাওয়ার আগে কষ্ট করে লাইট’টা অফ করে যেও । 

মেয়েটা শুয়ে চোখ বুজে নেয় । 

চার জোড়া দৃষ্টি মূর্ত হয়ে দেখে তাকে । কে কেমন শাফাহ্ কে দেখছে তারা ? কাবির পরিবারের ছোট মেয়ে তো এমন‌ ছিলো না ! সে তো ছিঁচকাদুনে ছিলো, আদুরে ছিলো বড্ড !তিলকে তাল করে গোটা বাড়ি মাথায় তুলতো । সামান্য ধমক ও সহ্য করতো না ! শুভ্র আহ্লাদ ব্যাতীত ওর উপর চড়া গলাতেও কথা বলেনি আগে ! আর এখন ? এখন সে সজোরে আঘাত করলো বোনকে । 

আদ্রের রাগ উঠলো ভীষণ । দাঁতে দাঁত চেপে ফোঁস করে উঠে দাঁড়ালো । তাচ্ছিল্য করলো…..

” ছিঃ ভাইয়া,,, তোমার কাছে এমন কিছু আশা করিনি আমি । উন্মাদ হয়ে গেছো । বন্ধুর কথা ভাবছো, অথচ নিজের বোনের কথা না ! 

আর কিছু বললো না সে । শিশিরের হাত খপ করে চেপে ধরে গটগটিয়ে বেরিয়ে গেলো রুম থেকে । 

শুভ্র বোনের পানে চেয়ে থেকেই পিছিয়ে ধপ করে বসে সোফায় । হাঁটুতে কনুই ঠেসে মাথা চেপে ধরে । খামচে ধরে চুল । 

মেহের মাথা নাড়ে দুদিকে । বিড়বিড় করে…

” এবারে একটু বেশি বেশিই করে ফেলছো তুমি । একলা জেদ খাটিয়ে লাভ নেই । ভাইয়া কখনো শাফাহ্’র উপর জবরদস্তি মেনে নেবে না । 

শুভ্রর ধরা জবান….

” আমি ওকে মারতে চাইনি মেহের । আমি ওর খারাপ চাইনা । সায়ানের থেকে ওর জন্য বেটার আর কেউ হবে না । কেনো বুঝতে চাইছে না ও ? আমি ভালো চাই আমার বোনের । ও আমার বোন ‌। আমার আদরের টুকটুকি । ওকে মারলাম আমি ? কি করে পারলাম মারতে ? 

গলা কাঁপে যুবকের । অনুতপ্ত সে । মেহের ওর কাঁধে হাত রাখে । শুভ্র তাকাতেই চোখের ইশারায় শান্তনা দেয় । 

পরদিন দুপুর গড়িয়েছে । 

সারাটা রাত থেকে এ অবধি তীব্র জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে শাফাহ্’র । তাপমাত্রা ১০৩° উঠেছে । জ্বর নামার নামই নিচ্ছিলো না । বাড়িতে একেই আতঙ্কে আছেন সবাই । তার উপর রাত থেকেই মেয়েটা কাতরে যাচ্ছে । 

খানিক আগে ডক্টর এসেছিলেন । টুকটাক চেকআপ করে মেডিসিন দিয়ে গেছেন । চোখ ও খুলতে পারছে না মেয়েটা । শাহিনা কাবির কোনো রকমে মেয়েকে একটু খানি খাইয়ে দিয়ে চলে গেলেন । শুভ্র একে একে সব ঔষধ বের করলো । খসানোর আগেই দরজা ঠেলে হাঁসফাঁস করে ঢোকে কেউ । সচকিতে চায় শিশির, মেহের আর শুভ্র । ওরাই ছিলো ঘরে । শাফাহ্ তখনো চোখ বুজে আধশোয়া হয়ে আছে । 

সায়ান থামে না । ছুটে যায় বিছানার কাছে । খবর পেয়েছে কোনো ভাবে । ধড়ফড় করে বললো সে…..

” মেহের,, কি হয়েছে ওর ? জ্বর আসলো কি করে ? 

মেহের শুভ্রর দিকে তাকায় । 

হাঁফ ছাড়ে । সায়ান বিচলিত হয়ে শাফাহ্’র কাছে বসে । ডাকে…..

” কিউটিপাই ! তাকা আমার দিকে,, কি হয়েছে তোর ? জ্বর….

বলতে বলতে হাত বাড়িয়ে ছুঁতে গিয়েও অনুচ্চারিত দ্বিধায় থেমে গেলো যুবক । ঢোক গিলে শুধালো বোনকে….

” মেহের , জ্বর কত ওর ? 

” একশ দুইয়ে নেমেছে এখন । 

সবে খেয়েছে । মেডিসিন নেয়নি । নিলে নেমে যাবে । 

তুমি দাঁড়িয়ে আছো কেনো, খুলে দাও ঔষধ গুলো ! 

শেষের কথাটা শুভ্রর উদ্দেশ্যে । সায়ান ব্যাকুল হয়ে শুভ্রর থেকে মেডিসিন গুলো ছিনিয়ে নেয়….

” এ সবগুলো খাওয়াতে হবে ? 

” হ্যাঁ ভাইয়া ! 

সায়ান একে একে সবগুলো ঔষধ বের করলো । এক গ্লাস পানি ধরলো শাফাহ্’র সামনে । 

” কিউটিপাই, চোখ খোল । মেডিসিন গুলো খেয়ে নে । দেখবি, খুব তাড়াতাড়ি ঠিক হয়ে যাবি । শাফাহ্ ,, তাকা আমার দিকে….

চঞ্চলা পিটপিট করে চায় । সায়ান কে দেখে মনে মনে হাসে । বীনা বাক্যে ঔষধ গুলো খেয়ে নেয় । কথা না বলে ফের মাথা এলিয়ে দেয় ব্যাক বোর্ডে । আধো আধো খোলা চোখ জোড়া । 

সায়ান তখনো উদ্বিগ্ন । ছটফট লাগছে । সে ফিরে চাইলো..

” হঠাৎ এতো জ্বর আসলো কি করে ? 

” তোমার বন্ধু থাপ্পর মেরেছে কাল ওকে । আর তারপর থেকেই এই জ্বর । সারারাত কুকিয়েছে মেয়েটা । 

মেহেরের সোজা উত্তরে ক্ষুব্ধ হয়ে তড়াক দৃষ্টিপাত করে সায়ান । শুভ্রর হেলদোল নেই । চোখে অবিষন্নতা, নিভে আসছে পত্র যুগল । 

সায়ান আবারো শাফাহ্’র দিকে ফেরে । তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তাক করে রমনীর গালের পানে । লক্ষ্য করে দেখে, এখনো আঙ্গুলের ছাপে লাল হয়ে আছে গোটা গাল । 

তা‌ দেখা মাত্রই যেনো তড়তড়িয়ে উঠলো মেজাজ । ক্ষুব্ধতা চড়ে উঠলো শান্ত ছেলেটার মস্তিষ্কে । 

এক মুহুর্ত বিলম্ব হলো না । আকস্মিকই আক্রমণ করে বসলো যুবক । তেড়ে গিয়ে শুভ্রর কলার চেপে ধরলো । হকচকিয়ে যায় উপস্থিত সবাই । নিজের উপর হামলা হওয়া সত্ত্বেও শুভ্র খুব একটা উদ্বেগ দেখালো না । এদিকে সায়ান ক্রোধে কাঁপে । চোয়াল খিচে হিসহিসিয়ে ধমকায়….

” তোর সাহস কি করে হয় ওর গায়ে হাত তোলার ? কোন স্পর্ধায় মেরেছিস তুই ওকে ? ও তোর বোন, তাই বলে যা খুশি তাই করবি ? তুই জানিস না ও সেনসিটিভ ? ওর অল্পতেই ব্যাথা লাগে ! কান্না করে দেয় ! ওর ব্যাথাতে আমার কষ্ট হয়, জানিস না ? মেরেছিস কেনো ওকে ? গাল লাল হয়ে গেছে । কত জোরে মেরেছিস হ্যাঁ ? খুব শক্তি হয়েছে হাতে ? 

শাফাহ্ পিটপিট চোখে নীরব থেকে সবি দেখছে । এক ধ্যানে পরখ করছে সায়ান কে । 

মেহের এগিয়ে গেলো । আস্তে করে বললো…..

” ভাইয়া,,, কি করছো ? শাফাহ্ আছে এখানে ! প্লিজ শান্ত হও ? শুভ্র ভাইয়া ইচ্ছে করে মারেনি ওকে । ভুল করে হাত উঠে গেছে । এর জন্য অনুতপ্ত সে । সারারাত জেগে ছিলো বোনের কাছে । জ্বর পট্টি দিয়েছে মাথায় । এক মুহুর্তের জন্যও চোখের পাতা এক করে নি । কেঁদেছে একা একা । তুমি জানো , শাফাহ্ কে ও কতটা ভালোবাসে । ও মারতে চায়নি…..

” মারতে চায়নি তো মেরেছে কেনো, জিজ্ঞেস কর তোর হাসবেন্ডকে ! এইই , কেনো মেরেছিস ওকে ? তোকে বলেছিলাম না তুই আমার কিউটিপাইকে কিচ্ছু বলবি না ! তবুও কি বলেছিস তুই ওকে ? কিসের পাগলামো শুরু করেছিস তুই ? 

এবার ঝটকা মেরে সায়ান কে ছাড়িয়ে দিলো শুভ্র । 

গর্জে উঠলো…..

” পাগলামো,,, আমি যা করছি, তা পাগলামো মনে হচ্ছে তোদের সবার কাছে ? আরে আমি তো তোদের কথাই ভাবছি । তবুও দোষ দিচ্ছিস কেনো তোরা আমায় ? তুই পারবি ওকে ছাড়া থাকতে ? যদি পারিসই, তাহলে এখনো কিসের এতো টান ওর প্রতি তোর ? আমি আমার বোনকে মেরেছি, ব্যাথা তুই কেনো পাচ্ছিস ? ও অন্য কারোর স্ত্রী, এটা যখন এতোই মেনেছিস, তাহলে কষ্ট পাচ্ছিস কেনো ওর ব্যাথায় ? 

সায়ান পিছিয়ে এলো । ঘাড় কাত করে শাফাহ্’র দিকে তাকালো । ততক্ষণে মেয়েটা নিজেকে আড়াল করে পুরোপুরি চোখ বুজে নিয়েছে । 

শুভ্র থামলো না আজ…..

” তুই ওকে ভালোবাসিস সায়…..

” চুপ,,, একদম চুপ । চল এখান থেকে ! 

সম্পুর্ন কথা শেষ করার আগেই শুভ্রর হাত চেপে ধরে গটগটিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে সায়ান । 

পেছন পেছন ছুটে বেরোয় মেহের । 

শিশির দীর্ঘ শ্বাস ফেলে । শাফাহ্ বোধহয় ঘুমিয়েছে । সেই অনুমান করে আলগোছে মেয়েটাকে ভালো মতো বিছানায় শুইয়ে দেয় শ্যামলিনী । গায়ে চাদর টেনে দিয়ে সেও বেরোয় রুম থেকে । 

ঘর ফাঁকা হতেই মিনিট কয়েক বাদ চোখ খুললো শাফাহ্ । পাপড়ি আলগা হওয়া মাত্রই ঝাপসা চোখ জোড়া হতে টুপ করে পানি ঝড়লো কার্নিশ ঘেঁষে । 

চোখের সামনে ভাসলো সায়ানের বিচলিত মুখাবয়ব । সে এর আগে কখনো সেই ছেলেকে রাগতে দেখেনি । আজ শুভ্রর উপর উদ্যত হতে দেখলো । 

চোখে টইটুম্বুর পানি নিয়ে নিঃশব্দে হাসলো মেয়েটা । বিড়বিড় করলো….

” কি অদ্ভুত, তুমি এখনো আমাকে একই ভাবে ভালোবাসো সায়ান ভাইয়া ? আমার ব্যথাতে তুমিও ব্যাথা পাও ! অথচ তোমার সবচেয়ে বড় ব্যাথার কারনটাই আমি । 

দেখতো, আমার জীবনটা কেমন উল্টে গেলো । এতো এতো দ্বিধা আমার এই ছোট্ট জীবনে ! এখন কি করবো আমি ? জীবন এ কোন বাঁকে এনে দাঁড় করালো আমায় ? 

মেয়েটা নিঃশব্দে কাঁদে । কেউ দেখে না । বোঝে না তার ভেতরের উচাটন । মাথা যন্ত্রণায় ফেটে যায় । 

সন্ধ্যা গড়িয়েছে । 

জ্বর কমে এসেছে অনেকটা । 

গুটি গুটি পায়ে রৌদ্রের ঘরে গেছিলো শাফাহ্ । সেখানে অনেকক্ষণ বসে থেকে নিজের ঘরে ফিরে আসলো আবার । কেমন শীত শীত লাগছে । মেয়েটা গায়ে ভালোমতো ওরনা জড়িয়ে নেয় । ভর সন্ধ্যায় বারান্দায় গিয়ে বসে । 

কিছুক্ষণের মধ্যেই কারোর উপস্থিতি টের পেলো সে । বন্ধ চোখ খুললো না তবুও । 

চটচটে ডাক পেলো…..

” তোকে বলেছিলাম সাইন করতে,,, 

ধীরে চোখ মেলে তাকালো রমনী । শুভ্র দাঁড়িয়ে । ভাবমূর্তি গুরুগম্ভীর । আরেকবার নিজেকে শক্ত রেখে চেষ্টা করবে সে । এরপর আর না । হাল ছাড়বে । 

শাফাহ্ কিছু বললো না । 

” বোন তুই আমার । আর সায়ান আমার বেস্ট ফ্রেন্ড । তোরা দুজনে সমান আমার কাছে । আমি কারোর খারাপ চাই না নিশ্চয়ই । যে আসবে না, তার অপেক্ষা করে লাভ কি ? তার আসার হলে সে তোর খোঁজ নিতো । এতো দিনে নেয়নি । বৃথা আশায় থাকছিস কেনো বনু ? 

বনু সম্বোধনে কেঁপে উঠলো শাফাহ্ । শুভ্র এক মুহুর্তে নরম হলেও ফের শক্ত হলো….

” বনু,,, বনু নেই আমার । যে ছিলো, সে আমাকে মান্য করতো । পেপারস গুলো রেখে যাচ্ছি আবার । যদি মনে হয় ভাইয়াকে প্রয়োজন, তাহলে কথা রাখিস । 

চেয়ারের উপর কিছু পেপার্স রেখে গটগটিয়ে বেরিয়ে গেলো শুভ্র । তার কথাতে ইদানিং মিষ্টতা নেই । আঘাত করে বলা প্রত্যেক টা কথা তীরের মতো বিদ্ধ হয় রমনীর কোমল হৃদয়ে । 

সে শ্বাস ফেলে । উঠে গিয়ে আলমারি খোলে । নতুন একটা অ্যালবাম আছে । সেটা বের করে নিয়ে এসে মেয়েটা আগের জায়গায় বসে আবার । পৃষ্ঠা উল্টায় ধীরে ধীরে । এটা ওদের ভাই বোনদের ছবির সমারোহে তৈরি । রৌদ্রের ছবি খুব বেশি নেই এই অ্যালবামে । মেঘা, আদ্র, শুভ্র, আর শাফাহ্ আছে প্রত্যেকটা ছবিতে । সিরাত আর আহিয়ান ও আছে প্রায় গুলোতে । 

রৌদ্রকে কেবল পাওয়া গেছে শুভ্রর বিয়েতে তোলা ছবিতে । শাফাহ্ মেঘার ছবি গুলোতে হাত বোলায় । সব ছবিতে মেয়েটা হাসছে । অথচ এখন সে নেই । সে না হারালে হয়তো আজ পরিস্থিতি ভিন্ন থাকতো । এমন কিছুই হতো না । শাফাহ্ কান্না সংবরণ করে ঠোঁট কামড়ে । 

শুভ্রর ছবিতে দৃষ্টি আটকায় পরক্ষণে । এই ছবিটা সেদিনের, যেদিন শুভ্র বাড়িতে বিরিয়ানি নিয়ে আসলো । খাওয়ার সময় শাফাহ্’র মাথায় গাট্টা মারতে গেছিলো । ঠিক সেই সময়ই ছবিটা ক্লিক করেছে আদ্র । শাফাহ্ আনমনে ফিক করে হেসে ওঠে । 

পানি ঝড়ে চোখ থেকে । ছবিটার উপর আঙ্গুল বোলায় । কেঁদে ওঠে হেঁচকি তুলে । অভিযোগ করে…..

” তুমি এভাবে বদলে গেলে কেনো ভাইয়া ? শুনেছি, এক কালে বোনে’রা নাকি ভাইদের বোঝা হয়ে যায় ! আমি বুঝি তোমার বোঝা হয়ে গেছি, তাই না ভাইয়া ? তুমি এখন সবসময় রাগ দেখাও আমায় । একটুও ভালো করে কথা বলো না । আগে তো আমায় খুব আদর করতে ! আমার বেস্ট ভাইয়া ছিলে তুমি ! তাহলে এখন এভাবে বদলে গেলে কেনো ? শোনো,,আমার কিন্তু খুব কষ্ট হয় ভাইয়া । ভীষণ কষ্ট হয় । কাল তুমি মেরেছো আমায় ! জানো, খুব লেগেছিলো ! আমাকে কখনো কেউ মারেনি । প্রথম মেরেছিলো মেঘার ভাইয়া । কিন্তু সেই মারে আমার ততটাও ব্যাথা লাগেনি , যতটা ব্যাথা আমি তোমার আঘাতে পেয়েছি । তোমার হাত দুটো তো নরম ছিলো আমার জন্য । এতোটা শক্ত হলো কবে ? 

ভুলে গেলে, আমি তোমার টুকটুকি ? আমার জন্য রোজ চকলেট নিয়ে আসতে । আর এখন,, রোজ ধমকে ধমকে কষ্ট দাও আমায় । উশুল করে নিচ্ছো সব চকলেটের টাকা ? কেনো ভাইয়া,,, ইউ নো আই লাভ ইউ । এন্ড আই মিস ইউ । আমি আমার সেই আগের ভাইয়াকে খুব বেশি মিস করি । আমার ভাইয়া আর আগের মতো নেই । সে বদলে গেছে । 

মেয়েটা ফুঁপিয়ে থামলো । চোখ হতে পানি গড়িয়ে পড়লো ছবিটার উপর । 

এবারে রমনীর দৃষ্টি আটকায় সামনের চেয়ারে । সাদা সাদা কাগজ গুলো আছে । মেয়েটা তাচ্ছিল্য করে হাসে । সেগুলো টেনে নেয় হাতে । কাপে হাত । সে চোখ বুজে শ্বাস ফেলে দীর্ঘ । 

অপর হাতে একই জায়গা থেকে নিজের ফোনটা টেনে নেয় । কললিস্টের প্রথম নাম্বার,,,, লাস্ট আশি দিনে গুনে গুনে একহাজার সত্তর বার কল গেছে সেথায় । প্রথম প্রথম লাগাতার বারবার কল করতো শাফাহ্ । কিন্তু ইয়াশ ধরেনি । শেষে আশাহত হয়ে মেয়েটা রোজ একবার করে কল করে । আজ ও করলো । অতঃপর ফোন কানে চেপে ধরলো । কিন্তু ওপাশ হতে লোকটা রিসিভ করলো না । বরাবরের মতো রিং হতে হতেই কেটে গেলো । 

তবে আজ একবারেই দমলো না রমনী । গুনে গুনে শতবার কল‌ লাগালো । বরাবর ব্যর্থ । শেষের বার পাগলের মতো গা দুলিয়ে হাসলো মেয়েটা । 

কান থেকে ফোন নামিয়ে ডিভোর্স পেপারের একটা ছবি তুললো । অতঃপর কিছু একটা মেসেজে টাইপ করে পাঠালো কাঙ্ক্ষিত সেই নাম্বারে । 

সেন্ড হওয়া মাত্রই মুঠো ফোনটাকে দুমড়েমুচড়ে পিষ্ট করলো মুঠোর ভাঁজে । উঠে দাঁড়ালো রেলিং ঘেঁষে । বাড়ির পেছনের দিকটায় দৃষ্টি রেখে হাতের ফোনটাকে সর্বশক্তি দিয়ে ছুড়ে মারলো সেদিকে । 

আরো এক ফোঁটা পানি গড়ালো গাল বেয়ে । সে তা মুছে নিলো অবলিলায় । দম্ভভরে পা চালিয়ে পড়ার টেবিলের কাছে গেলো । বসলো চেয়ার টেনে । হাত বাড়িয়ে আঙ্গুলের ভাঁজে ধরলো । 

রমনীর হাত কাঁপছে থরথরিয়ে । কিছুতেই কলম বসছে না কাগজে । বেশ কবার হাত ফেরালো সে । কিন্তু শেষ অবধি আর থামলো না । ভুললো সব দ্বিধা দ্বন্দ্ব । দাঁতে দাঁত চেপে কলম বসালো কাগজে । যথাস্থানে স্বাক্ষর বসালো নির্দ্বিধায় । 

নামটুকু লিখেই লম্বা হাঁফ ছাড়লো মেয়েটা । 

চোখ বুজে স্মৃতিচারণ করে নিলো শেষবারের মতো । বাধ্য বোনের পরিচয় দিয়ে ভাইয়ার কথাই রাখলো সে । 

★

রাতটুকু কেটেছে কোনো মতে । 

পরদিন সকাল । আজ খুব সকালে ঘুম থেকে উঠেছে শাফাহ্ । সাড়ে আটটার পর অফিসে বেরিয়ে যাবে শুভ্র । তার আগেই নিচে নামলো মেয়েটা । 

রেডি হয়ে সবে নিচে নেমেছে শুভ্র আর আদ্র । দুটোতে বসে আছে পাশাপাশি । আদ্র বেরোবে ভার্সিটিতে । 

টেবিলে ব্রেকফাস্ট রেডি করা হচ্ছে । শাফাহ্ সবদিকে এক ঝলক করে নজর বুলিয়ে নিলো । 

ত্রম্ভ পায়ে এগিয়ে হাতের কাগজগুলো রাখলো শুভ্রর সামনে । চোখ তুলে বোনের দিকে চকিতে তাকায় শুভ্র । পরক্ষণে কাগজের দিকে । 

খানিক ছলকে ওঠে অন্তরাত্মা । শাফাহ্ নিদারুণ ভাবে কষ্ট চেপে চমৎকার হেসে বলে….

” সাইন করে দিয়েছি ভাইয়া । 

চেয়েছিলে তো আমার সাইন ? দিয়েছি, দেখে নাও । 

তড়িতে চোখ সরু করে আদ্র । টেবিলের কাছেই থমকে যান শাহিনা কাবির । তড়িঘড়ি করে পেপার গুলো উল্টে পাল্টে দেখে নেয় শুভ্র । শাফাহ্ সাক্ষর করে দিয়েছে । ভীষণ খুশি হলো সে । 

আদ্র কাগজগুলো টেনে নেয় , চেঁচিয়ে ওঠে…..

” টুকটুকি,,, কি করেছিস এটা তুই ? 

” যা দেখছো তাই । 

সাবলীল উত্তর । 

আঁতকে ওঠেন শাহিনা কাবির । বুঝতে পারেন সবটা । আদ্র ধমকে ওঠে…..

” হোয়াট ননসেন্স,,, ছেলে খেলা শুরু করে দিয়েছিস তোরা সবাই ? ডিভোর্স পেপারে সাইন করার সাহস পেলি কোথা থেকে ? ইয়াশ তোর হাসবেন্ড ! ওকে না জানিয়ে কোন সাহসে এতো বড় সিদ্ধান্ত নিলি তুই । কিছু বুঝিস এসব নিয়ে ? 

” আমি বুঝি না । ভাইয়া তো বোঝে, ভাইয়া সামলে নেবে । আমার যা করার, আমি তাই করেছি শুধু । 

সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে সবটা শুনলেন তৌসিফ কাবির । তবুও শুধোলেন রাশভারী গলায়…..

” কি হয়েছে এখানে ? 

” বাবাই,,, পাগল হয়ে গেছে তোমার ছেলে মেয়েরা । ডিভোর্স পেপারে সাইন করে দিয়েছে তোমার মেয়ে । কি হচ্ছে বাড়িতে এসব ? 

আদ্রের রুক্ষ কন্ঠ । তিতি-বিরক্তি স্পষ্ট জবানে । তৌসিফ কাবির মেয়েকে বলেন অবাক হয়ে…..

” শাফাহ্,, কি শুনছি আমি ? 

তুমি সাইন করে দিয়েছো মানে ? 

” হ্যাঁ আব্বু,,, আমি সাইন করে দিয়েছি । নিজ ইচ্ছায় । ভেবেচিন্তে তবেই । কেউ জোর করেনি আমায় ! অনেক চিন্তা ভাবনার পর এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি । 

” সিদ্ধান্ত নেওয়ার তুমি কে ? তুমি একা জড়িয়ে নেই এই সম্পর্কে ! ইয়াশ ও আছে । ও তোমার স্বামী । এতো সহজে একটা সম্পর্ক ভাঙার সিদ্ধান্ত তুমি একা নাও কি করে ? এসবে কতো জটিলতা, আইডিয়া আছে তোমার ? আর এমনিতেও তোমার একার সাইন করায় কিচ্ছু যায় আসে না । ইয়াশ চাইলে তবেই পুরোপুরি বিচ্ছেদ হবে । 

” সম্পর্ক ভাঙলেও তার কোনো যায় আসে না আব্বু । ভাইয়া ঠিক বলেছিলো,, তিনি আর আসবেন না । অনেক চেষ্টা করেছি তার সাথে কথা বলার, অনেক বার ফোন করেছি, লাভ হয়নি । আমি আর কোনো সম্ভাবনা খুঁজবো না আব্বু । আমি আমার দিক থেকে শেষ করেছি, এবার তিনি কি করবেন তা জানি না । ভাইয়া সামলে নেবে বাকিটা । আমি এখন মুক্ত । আর ভাববো না এসব । 

মেয়েটার এমন গা ছাড়া কাঠ কাঠ কথায় আদ্র তপ্ত ঝাড়ি মারে দাঁত পিষে….

” টুকটুকির বাচ্চাআআ,,,মাথা খারাপ তোর ? বোকা বোকাই থাকবি সারাজীবন ? 

শাফাহ্ চোখ তোলে নির্বিকার ভঙ্গিতে । স্নিগ্ধ হেসে বিড়বিড়ায়….

” আমার মতো বোকা আর কেউ না হোক, আদ্র ভাইয়ার বাচ্চাাাা । বোকা মেয়েদের কেউ বোঝেনা । সবটাই বোকামো ভেবে উড়িয়ে দেয় ‌ । 

বিড়বিড় থামিয়ে বললো শব্দ তুলে…..

” মাথা ঠিক আছে আমার । বললাম তো ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিয়েছি । ভাইয়া, খুশি তো তুমি ? 

শেষের প্রশ্ন টা শুভ্রর উদ্দেশ্যে । 

শুভ্র অবাক হয়ে দেখে যায় বোনকে । হাসে শুকনো । মাথা দোলায়…..

” আমি আছি তো । তুই সাইন করে দিয়েছিস,, বাকিটা আমি সামলে নেবো । 

শাফাহ্ সবাইকে উপেক্ষা করে পা বাড়ালো উপরে । ডেকে উঠলো শুভ্র…..

” এবার আরেকটা প্রস্তুতি নে । সায়ানের সাথে এনগেজমেন্ট এর প্রস্তুতি । এর মধ্যেই তোদের আংটি বদল হয়ে গেলে আর বাঁধা থাকবে না । ইয়াশ ফিরে এসেও ঝামেলা বাঁধাতে পারবে না আর । আমি পেপার্স পাঠিয়ে দেবো ওর কাছে । 

তৌসিফ কাবির রেগে যান এ বেলায়…..

” শুভ্র…..

” আব্বু,, তোমাদের মেয়ের ভালোর কথাই ভাবছি আমি । তোমরা জানো ভালো করেই, আমি সব ভেবেই এসব করছি । যা করছি, তাতে তোমাদের মেয়ে সারাজীবন সুখে থাকবে ! অন্তত ওকে পেয়ে গেলে আমার সায়ান টাও সুখে থাকবে এবার । ওকে একটু ভালো থাকতে দাও আব্বু । কথা দিয়ে কথা রাখতে পারোনি । এখন আমি যা করছি, তাতে বাঁধা দিও না । 

ভাষা খুঁজে পাননা তোফায়েল কাবির । 

শাফাহ্ সব শুনতে শুনতে ধীর পায়ে উপরে উঠে যায় । দম ছাড়ে বুক চিরে । 

বিকেল গড়িয়েছে তখন । সন্ধ্যার ঠিক আগ মুহূর্ত । 

ঘরে চুপচাপ বসে আছে শাফাহ্ । 

সেই সকালে ঘরে ঢোকার পর আর বেরোয়নি । রৌদ্রের কাছেও যায়নি আজ । খেয়েছে ঘরেই । 

এখন এই সন্ধ্যায় আনমনা মেয়েটার কাছে হাজির হলো শিশির । গলা ঝেড়ে অনুমতি নিয়ে ঘরে ঢুকলো । ওকে দেখে ঠোঁটে হাসি টানে চঞ্চলা । 

শিশির বসে কাছে গিয়ে । শাফাহ্ চকলেট খাচ্ছে । শিশির কে শুধোয়……

” খাবি ? তোর বর এনে দিয়েছিলো ! আরো আছে, দেবো ? 

না বোধক মাথা ঝাঁকায় শ্যামলিনী । আমতা আমতা করে কথা তোলে…..

” তুই এতো সহজে সবটা মেনে নিলি শাফাহ্ ? 

” এতো সহজে না তো,,, অনেক সময় নিয়ে সব বুঝে তবেই মেনেছি । আমি মাঝে মাঝে খুব বোকামি করি, বুঝলি ? এবার আর করবো না । নিজের ভালোটা বেছে নেবো । আর নিজের ভালো পাগলেও বোঝে । 

” তার মানে, ঐ ইয়াশ ভাইয়া খারাপ ছিলো ? ভালো ছিলি না তার কাছে ? 

 ” উঁহু,,, মেঘার ভাইয়া ভালো ছিলো । কিন্তু…..

” কিন্তু কি ? 

” তিনি হয়তো আর আসবেন না ! আমি কেনো থাকবো তার আশায় ? 

” উনি ভালো ছিলেন ! তোকে ভালোবাসতেন ! যদি ভালোবেসে থাকেন, তাহলে নিশ্চয়ই ফিরে আসবেন । ওনার দিকটাও ভাবতে হবে তোকে । বোকামি করিস না শাফাহ্ । এটা তোর গোটা জীবনের বিষয় । জীবনটা এলোমেলো করিস না । আচ্ছা তুই ওনার চোখে তোর প্রতি ভালোবাসা দেখিস নি কখনো ? মেয়েরা তো ছেলেদের চোখ দেখলেই বুঝতে পারে, তাদের মনে কি চলছে ! তুই বুঝিস নি ? 

শাফাহ্ মুচকি হাসলো ! উত্তরে পাল্টা শুধালো…..

” আচ্ছা শিশির,, শুধু মেয়েরাই কেনো বুঝতে পারে এটা ? ছেলেরা কেনো মেয়েদের মনের কথা চোখ দেখলে বুঝতে পারে না, বলতো ? 

শিশির চোখ সরু করে । 

একই বাক্য আওড়ায়…..

” বি সিরিয়াস শাফাহ্,,,, 

তুই অলরেডি ডিভোর্স পেপারে সাইন করে দিয়েছিস । শুভ্র ভাইয়া এখন ঐ পেপার ওনার কাছে পাঠাবেন । উনি জানতে পারলে কি হবে ভেবে দেখেছিস ? 

” ভাবতে চাই না । আমি এখন মুক্তি চাই । আমার এসব আর সহ্য হয় না শিশির । প্লিজ এই নিয়ে আর কথা বলিস না । শুনতে ভালো লাগে না । 

ওর দ্বিধা বুঝে শিশির চোখ নামালো । 

রাতের খাবারের আগেই এ বাড়িতে সায়ান এসেছে । সব পৌঁছেছে ওর কানে । সে কখনো এসব চায়নি । শুভ্র কে হাজার বার বারন করেছে । অনেক কথা কাটাকাটি, এমনকি রাগারাগিও হয়েছে শুভ্রর সাথে । সে শাফাহ্ আর ইয়াশের ডিভোর্স করাতে চায়নি । কোনো প্রকার ফোর্স দিতে চায়নি শাফাহ্’র উপর । 

কিন্তু শুভ্র হার মানে নি । শোনেনি ওর কথা । 

এখন সে জানলো , ইতোমধ্যে ডিভোর্স পেপারে সাইন করা হয়ে গেছে । সব জেনে অমনি ছুটে এসেছে । 

শাফাহ্ তখনো ঘরে । সায়ান কারোর কথায় থামলো না । সোজা উপরে উঠে কড়া নেড়ে ঘরে ঢুকলো । 

শাফাহ্ অস্বস্তি নিয়ে এক পশলা হাসে সায়ান কে দেখে ‌। বিপরীতে জোর পূর্বক হেসে সোফায় বসে যুবক । ডাকে রমনীকে….

” কিউটিপাই,,, বস আমার কাছে ! 

জড়তা গিলে মুচকি হেসে বসে রমনী । সায়ান আলগোছে ওর একহাত ধরে ! হাত কাঁপছে । সে নিজেকে ধাতস্থ করে । শুধোয়…..

” আমি তোর কাছে যা যা জানতে চাইবো ,, সত্যিই উত্তর করবি হ্যাঁ ? একদম ভয় পাবি না । বাডি তোর উপর কোনো অন্যায় হতে দেবে না । বিশ্বাস করিস তো আমায় ? 

ঘাড় কাত করে চঞ্চলা । সায়ান শুধোয় প্রথম প্রশ্ন…..

” শুভ্র তোকে কিছু বলেছে ? ধমকেছে ? মেরেছে আবার ? 

না বোধক মাথা নাড়ায় রমনী ! 

” তুই জানিস, তুই কি করেছিস ? কিসের পেপারে সাইন করেছিস ? 

রমনী এবারে হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়ায় । 

গলা কাঁপে সায়ানের । সে ঠোঁট ভিজিয়ে নেয় জিভে । 

” শাফাহ্,,,, তুই নিজ ইচ্ছেতে ইয়াশ কে ডিভোর্স দিবি ? 

কথা না বলে এবারও হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়ায় মেয়েটা । চেয়ে রয় নিষ্ক্রিয় চোখে । আপ্লুত হয়ে দেখে সায়ানকে । ছেলেটার চোখের কোণে চিকচিক করছে কিছু একটা । পরের প্রশ্ন করে যুবক…..

” ও তোকে কষ্ট দিতো ? 

” না ! 

” মেরেছে কখনো ? 

” হু । 

মিথ্যে বললো না মেয়েটা । সাবলীল সত্য জবাব তার । সায়ান চোয়াল খিচে নেয় । 

” কবার মেরেছে ? 

” হিসেব করিনি ? 

” যদি ও আসে,, ফিরে যাবি ওর কাছে ? 

” আমি সাইন করে দিয়েছি । সব চুকিয়েছি আমার তরফ থেকে ! 

” তোর সাইন করাতে সব মিটে যাবে না ‌। ও যদি জোর করে ? যদি তোকে ডিভোর্স না দেয় ? 

উত্তর নেই । সায়ান ওর দুহাত ধরলো……

” কিউটিপাই,,, 

আমি আছি তোর সাথে । শুভ্রর কথায় বাধ্য হয়ে সাইন করেছিস, তাইতো ? ডোন্ট ওয়ারি,,, আমি আছি তো ! এক কাজ কর, তুই আমাকে ইয়াশের কন্টাক্ট দে । আমি যোগাযোগ করবো ওর সাথে । 

” লাভ নেই বাডি ! আমি অনেক চেষ্টা করেছি । তারপর আশা ছেড়েছি ‌। ওনাকে আর চাইনা আমি ! আমাকে কেউ জোর করেনি । 

” শাফাহ্,,,, 

” বলো ! 

আমি জানি,, ডিভোর্স করানোর পর ভাইয়া তোমার সাথে আমার বিয়ে দিতে চায় । তুমি আমার মতো একটা ডিভোর্সি মেয়েকে বিয়ে করবে না, তাও জানি আ……

” কিউটিপাই,,, কি বলছিস এসব ? 

আঁতকে উঠে মেয়েটাকে কথার মাঝে থামিয়ে দিলো যুবক । ভেতর কাঁপলো তার । এই মেয়েটা ওকে এখনো বুঝলো না । এতো কেনো বোকা সে ? 

অক্ষিপট ভিজে আসে যুবকের । বুকে পাথর চেপে মেয়েটার হাত দুখানি শক্ত করে চেপে ধরে বলে ভেজা গলায়…..

” তুই আমার কাছে সবচেয়ে দামী, কিউটিপাই । তোর চেয়ে বড় আর কিছু নেই । প্রাণ তুই আমার । আর আমার প্রাণের উপর জবরদস্তি করবো না আমি । তোর ইচ্ছের বিরুদ্ধে কিচ্ছু হবে না । আমি জানি, তুই ইয়াশ কে ডিভোর্স দিতে চাস না ! হবে না এই ডিভোর্স । সাইন করেছিস তো কি হয়েছে ! আমি ইয়াশকে ফিরিয়ে আনবো ! ও মেঘাকে খুঁজছে, তাই তো ? 

শাফাহ্ এক মুহুর্তের জন্যও চোখ সরায়নি আজ । এখনো চোখাচোখি হচ্ছে দুজনার । মেয়েটা ঠোঁট ঠেলে হাসলো এবারে । 

” কাঁদছো কেনো বাডি ? 

সায়ান চোখ নামিয়ে নেয় তড়িতে । মাথা ঝাঁকায় । 

” কই । ওসব কিছু না । তুই আমায় ইয়াশের কন্টাক্ট দে ! 

” ছেড়ে দাও বাডি । আমি আর ফিরবো না তার কাছে । 

” পাগলামি করিস না ! 

” চিন্তা করো না,,, আমি তোমার ঘাড়ের উপরেও চাপবো না । আমাকে বিয়ে করতে হবে না তোমায় ! ভয় পাচ্ছো বাডি ? 

মেয়েটা ইচ্ছে করে সায়ানের পরীক্ষা নিচ্ছে । 

সায়ান আর পারলো না । মেয়েটার চোখ হতে ভেজা দৃষ্টি সরালো না আর । প্রকাশ করলো তার চোখের নোনা জলধারা । মন বললো…

“ যেখানে তোকে হারানোর ভয় পাই এখনো,, সেখানে তোকে নিজের করে পাওয়ার চরম সুযোগ পেয়ে ভয় পাবো আমি ? 

মুখে ফুটালো….

” তোকে পেতে ভয় নয় , ভাগ্য লাগার কথা ! আর আমার সেই ভাগ্য নেই কিউটিপাই, তাই ভয় পাচ্ছি । তোকে পাওয়ার জন্য নয়, তোকে পেয়ে হারানোর ভয় । 

নিচে লাগাতার কলিং বেল বাজাচ্ছে কেউ । রুবিনা কাবির উপরে থেকেই বিব্রত হলেন । নিথর ছেলের কাছে বসে ছিলেন তিনি । কলিং বেলের আওয়াজে কপাল কুঁচকে আসলো তার । 

নিচে কি কেউ নেই নাকি ? কিচেনে মেহের ছিলো । সেও চরম বিরক্ত হলো । এভাবে এই রাতে অসভ্যের মতো দমহীনা বেল‌ বাজাচ্ছে কে ? 

🛑 এইযে সুইটহার্টস, আপনাদের কান্না শেষের পথে । পরের পর্ব থেকে ভালো কিছু হবে মনে হয় । অপেক্ষা করুন । আর আজকে বেশি বেশি রেসপন্স করুন 😚 । 🛑

চলবে…….

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply