#আসবো_ফিরে_আবারো
#পর্ব_৮১
#সুরভী_আক্তার
আজ শাফাহ্’কে হাতে ধরে রান্না শেখানোর মিশনে নেমেছে ইয়াশ । বাড়ির মতো করে বাড়ির খাবার রান্না করবে দুটোতে মিলে ।
রান্নার প্রস্তুতি নিয়ে ইয়াশ পেঁয়াজ কুঁচোচ্ছে । ওদিকে কিচেনের দরজায় দাঁড়িয়ে নাক টানছে শাফাহ্ ।
চোখ জ্বলছে তার ।
ভেতরে টিকতে না পেরে বাইরে বেরিয়েছে । ওর নাক টানার শব্দে চকিতে পিছু ফিরলো তপ্ত যুবক । অমনি শাফাহ্ কে বাইরে দেখে বাজখাঁই গলায় ঝাড়ি মারলো…..
” এইইই, তুমি বাইরে কেনো ?
তোমাকে তো চুলা জ্বালাতে বলেছি আমি । কথা কানে যায় নি ?
” চোখ জ্বলছে তো !
” শাট আপ । আমি পেঁয়াজ কাটছি, আর তোমার চোখ জ্বলছে ?
” হুম । এই দেখুন কাঁদছি ।
মেয়েটা চোখ গোল গোল করে দেখালো ।
বিপরীতে চোখ রাঙানি দিলো ইয়াশ । হাতের ছুরিটা দেখিয়ে রেগে বললো….
” নাটক করবে না । চুপচাপ এসো বলছি ।
রমনী ওষ্ঠ উল্টে কাঁচুমাচু মুখে এগোয় । ইয়াশ হাতের কাজ শেষ করে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে বুকে হাত গুটিয়ে নেয় । আদেশ করে….
” সটেপ্যান বসিয়ে চুলা জ্বালাও ।
শাফাহ্ অক্ষরে অক্ষরে আদেশ পালন করে ।
” এবারে পরিমাণ মতো অয়েল দাও । কি রান্না হবে জানো তো ?
” কি ?
” ইউর ফেভারিট ,,, চিকেন কষা ।
কিভাবে রাঁধতে হয়, আমি বলে দিচ্ছি । তেল দাও, গরম হয়ে আসলে পেঁয়াজ দেবে । ওকে ?
শাফাহ্ অবাক হয়ে বলে….
” চিকেন কষা আমার ফেভারিট, আপনি জানেন ?
” যা বলছি তাই করো । বেশি বকবক করতে বলিনি ।
চুপসে যায় মেয়েটা । মুখ কালো করে গলগলিয়ে তেল ঢালে প্যানে । তা দেখে আঁতকে ওঠে ইয়াশ….
” এই , এতোটা তেল দিচ্ছো কেনো ? ব্যস ।
এবার গরম হয়ে এলে পেঁয়াজ কুচি দিয়ে হাঁফ ফ্রাই করবে । ওকে ?
মাথা দোলায় রমনী । তেল গরম হওয়া মাত্রই পেঁয়াজ কুচি দিতে না দিতেই ছলাৎ করে উঠলো গরম তেল । শাফাহ্ ছিটকে পেছায় ।
গোটানো হাত নামিয়ে তেড়ে যায় ইয়াশ ।
” টুকটুকিইইই, এভাবে নয় । তেল ছিটকে আসবে তো । আচ্ছা তুমি পাশে দাঁড়াও, আমি করে দিচ্ছি দেখো । বাকিটা তুমি করবে ।
” একটা কাজের লোক রাখলেই তো হয় । আমি কি এখানে রান্না করতে এসেছি নাকি ?
” আমাদের দুজনের মাঝে অন্য কাউকে কি প্রয়োজন ? তুমি পারবে এসব করতে । একটু শিখে নাও শুধু । লেটস সি,,, পেঁয়াজ ভাসা হয়ে এলে এখানে একে একে সব ইনগ্রিডিয়েন্ট দিয়ে দেবে । লাইক, আদা রসুন বাটা, চিলি ফ্লেক্স, এসব মশলা যা আছে তাই, আই ডোন্ট নো কিসব বলে । এইসব কিছু দিয়ে দেবে এখানে । দেখো আমি কিভাবে করছি ! ইটস্ সো ইজি টুকটুকি,,,
ইয়াশ ধাপে ধাপে যা করছে, সব ঠান্ডা স্বরে বাতিয়ে দিচ্ছে মেয়েটাকে । শাফাহ্ দেখছে বড় বড় দৃষ্টিতে ।
ছেলে হয়েও দক্ষ হাতে খুন্তি নাড়ছে ইয়াশ । পরপর বুলি আওড়িয়ে এক্সপ্লেইন ও করছে ।
অবাক হয় শাফাহ্ । দেখে যায় নিগুড় লোচনে । ক্ষণে ক্ষণে বিস্মিত দৃষ্টিতে ইয়াশের দিকে চায় । বলে আকস্মিক….
” এইতো আপনি বেশ রান্না করতে পারেন, তাহলে এতো দিন করেননি কেনো ? বেকার বেকার বাইরের খাবার খেতে খেতে জিভ পচে গেছে আমার ।
ইয়াশ থমকালো । উত্তরে কি বলবে ভাবলো । তরকারিতে ঢাকনা বসিয়ে পিছিয়ে শাফাহ্’র মুখোমুখি দাঁড়ালো । বেশ সময় নিয়ে মুখ খুললো….
” উমমম , এতো দিন ইচ্ছে হয়নি । এখন ইচ্ছে হচ্ছে । কিছুটা সংসারে মনযোগ দেওয়ার ইচ্ছে জাগছে । সংসার ? সংসার করবে আমার সাথে ?
এক পা করে রমনীর দিকে কদম বাড়ায় ইয়াশ । বলে আবার….
” চলো সংসার শুরু করে দিই । তুমি সারাদিন বকবক করবে, আর আমি গালে হাত রেখে চুপটি করে তোমার সমস্ত বকবকানি শুনবো । ভালো হবে তাই না ? হসপিটাল থেকে ফিরে পুরোটা সময় তোমাকে দেবো ! দুজন মিলে একসাথে রান্না করবো । একসাথে খাবো । এক ঘরে থাকবো….
ইয়াশ অনেকটা এগোতেই শাফাহ্ পিছিয়ে যায় । তপ্ত যুবকের এমন ভালো আচরণে কেমন খটকা লাগে তার কাছে । কি হয়েছে এনার ? সেই কদিন থেকে কেমন পাল্টে গেছে ! ভালো ব্যাবহার ও করছে । ধমকাচ্ছে না খুব বেশি । কি হলো হঠাৎ ! সে ঢোক গিলে বুলি আওড়ায় মিনমিন করে…
” আপনার হাবভাব কেমন হঠাৎ করেই বদলে গেছে ! কি হয়েছে আপনার ?
” কিছু না । আগে যেমন ছিলাম তেমন হতে বলছো আবার ? হবো তেমন ? মারি এক থাপ্পর ?
” এই না । আপনার হাবভাব ভালো ঠেকছে না আমার কাছে । তেতো মুখে হঠাৎ ফুল চন্দন পড়েছে ?
ইয়াশ তাৎক্ষণিক ওষ্ঠপূটে দাঁত বসিয়ে ফিক করে হাসে । আরেক কদম বাড়িয়ে পেছনে হাত গুটিয়ে ঝুঁকে বলে…..
” উঁহু,,, অন্য কিছু পড়েছে । চাইছি আরেকবার পড়ুক । বারবার পড়ুক । তাই বদলে গেছি ।
অর্থ বোধগম্য হতে বেগ পেলো না বোকা রমনী । দ্রুত চোখ নামিয়ে ঢোক গিললো । চট করে ইয়াশ কে পাশ কাটিয়ে চুলোর কাছে এসে ঢাকনা সরালো ।
খুন্তি হাতে তুলে নাড়তে লাগলো । হাত কাঁপছে ঠকঠক করে । ঠিক বুঝতে পারছে, ইয়াশ তার পেছনে দাঁড়িয়েছে । এক্ষুনি অঘটন ঘটাবেন ঐ লোক । মেয়েটা খুন্তি ছেড়ে চোখ মুখ খিচে নিলো ।
পাশ কাটিয়ে সরে আসতে গেলে বাঁধা পড়লো । কেবিনেটে হাত ঠেসে ওকে আটকে দিয়ে চুলা বন্ধ করলো ইয়াশ । রমনীর বাহু টেনে তাকে নিজের দিকে ঘোরালো । মেয়েটার কোমর ঠেকেছে কেবিনেটে । হেলে পড়েছে পেছনের দিকে । ইয়াশ ওর ভীতু ভীতু খিচে নেয়া মুখাবয়ব দেখে ঠোঁটের কোণে ভিড় জমানো হাসি টুকু ঠেলে দূরে সরায় । মুখ খোলে প্রশ্নাত্মক স্বরে….
” একটু টেস্ট করে দেখি ?
শাফাহ্ কেঁপে উঠলো । চিবুক মেশালো গলায় ।
দম খিচে সিটিয়ে গেলো পুরোপুরি । মুখের উপর অনুভব করলো তপ্ত যুবকের উষ্ণ শ্বাস । সেকেন্ড কয়েক পেরোতেই ইয়াশের কন্ঠ বাজলো কানে…..
” উমমম,,, টেস্টি । বাট ঝাল । মিষ্টি নয় ।
এহেন কথায় তড়াক করে চোখ মেলে তাকালো রমনী । তার বৃহৎ চাহনির সম্মুখে তপ্ত যুবকের ক্রুর মুখাবয়ব । সে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে আওড়ালো…..
” এ্য্য্য্য্যা ?
” হ্যাঁ । চিকেন কষা টেস্টি হয়েছে । টেস্ট করে দেখো । কিন্তু ঝাল, মিষ্টি হলে ভালো লাগতো ।
” আপনি এটার কথা বলছিলেন ?
” অফকোর্স ! কেনো, তুমি কি ভাবলে ?
ফিচেল মুখে চাপা বাক্য । শাফাহ্ হাঁফ ছেড়ে ওকে ঠেলে দূরে সরালো । চোখ নামিয়ে পাশ কাটালো । মনে মনে কটূ কথা শোনালো নিজেকে । ইশশ্, কি না কি ভাবলো সে । মাথা বিগড়ে গেছে তার ।
রমনীর বুক শুকিয়ে এসেছে । সে এক গ্লাস পানি ঢেলে চুমুক বসালো গ্লাসে । সহসা হাসি চেপে বলে উঠলো ইয়াশ….
” তবে তুমি যা ভেবেছো, চাইলে সেটাও একবার টেস্ট করতেই পারি ।
অগত্যা পানি গলায় উঠলো মেয়েটার । কেশে উঠলো খুক খুক করে ।
,,,,,
একেবারে রাতের দিকে ছেলের ঘরে ঢোকেন মিনারা বেগম । সেই যে সকালে বাড়ি ফিরলেন ছেলেকে নিয়ে । বাড়ি ফেরার পরেই সায়ান ঘরে ঢুকেছে, এক পাও বেরোয় নি বাইরে । দুপুরের লাঞ্চ ও ঘরেই করেছে । কথা বলছে না । আনমনা হয়ে কেবলই টুকটাক প্রশ্নের উত্তর করছে ।
মিনারা বেগম ছেলেকে খুব বেশি প্রশ্ন করেন নি । একলা ছেড়েছিলেন । সময় দিয়েছেন । এখন রাত হতেই প্লেটে খাবার সাজিয়ে ছেলের ঘরে ঢুকলেন তিনি ।
সায়ান ঘরে নেই । বারান্দার পর্দা গলিয়ে ছেলেকে দেখতে পেয়ে দীর্ঘ হাঁফ ছাড়লেন ভদ্রমহিলা । ব্যালকনির ইজি চেয়ারে শরীর এলিয়ে বসে আছে সে । মিনারা বেগম বিছানার উপর ভাতের প্লেট রেখে সেদিকে এগোন ।
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে মোলায়েম কন্ঠে ডাকেন…..
” সায়াহ্ন !
ঝট করে নড়ে উঠলো সায়ান । তড়িঘড়ি করে সোজা হয়ে বসলো । ডান হাতের মুঠোয় একখানা সাদা রুমাল । সে চট করে সেটাকে মুঠোবন্দী করে লুকিয়ে ফেলে ।
” হ্যাঁ আম্মু ।
” খাবি না ? নিচেও নামছিস না ! ঘরে একা একা ভালো লাগছে ?
” ভীষণ ভালো লাগছে ।
” ঘরে আয় । খাবি এখন ।
” খিদে নেই আম্মু । খাবার রেখে যাও । খিদে পেলে খেয়ে নেবো ।
বুক চিরে তপ্ত শ্বাস ফেললেন ভদ্রমহিলা । সায়ান একেই বড্ড শান্ত । কথা বলে কম । এখন যেনো আরো বেশি ঝিম ধরে গেছে । মা হয়ে ছেলের চোখ মুখের দিকে তাকাতে পারছেন না তিনি । এই এক মাসে শুকিয়ে গেছে তার ছেলেটা । ছেলেকে চোখ ভরে দেখতে গেলেও হু হু করে উঠছে মাতৃ হৃদয় ।
তিনি বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারলেন না । চোখ নামিয়ে ছেলের হাত ধরে টেনে ঘরে নিয়ে আসলেন । বিছানায় বসালেন । নিজ হাতে ভাত মেখে মুখের সামনে লোকমা ধরে ভেজা গলায় বললেন…..
” রেখে গেলে খাবি না, আমি জানি ভালো করেই । খাইয়ে দিচ্ছি, চুপচাপ খেয়ে নে ।
” বললাম তো আম্মু, খিদে পায় নি আমার ।
হাত ফিরিয়ে আনলেন মিনারা বেগম । এবারে প্রকট হলো তার টলমলে দৃষ্টি । কান্না ধরে রেখে বললেন আহত গলায়…..
” নিজের সাথে সাথে আমাদেরকেও কষ্ট দিচ্ছিস তুই । কেনো বলতে পারিস ?
” আমার ব্যাবহারে কষ্ট পাচ্ছো আম্মু ? স্যরি, আর কোথাও যাবো না আমি । এখন আমার খিদে পায় নি, জোর করো না প্লিজ । আমি একটু ঘুমাবো আম্মু । তুমি যাও….
” কোত্থাও যাবো না আমি । এখানেই থাকবো । ঐ মেয়েটার জন্য ধুঁকে ধুঁকে নিজেকে শেষ দেওয়ার বন্দোবস্ত করছিস ? আর আমরা, আমরা কেউ নই তোর জীবনে ? কোনো মূল্য নেই আমাদের !
” আছে । তবে সবার মূল্য সমান হয় না । তুমি বেকার ভাবছো, আমি ঠিক আছি । শেষ করছি না নিজেকে ।
সায়ান বিছানায় শরীর কাত করে এলিয়ে দেয় । মাথা যন্ত্রণা করছে ভীষণ । আবদার করে মায়ের কাছে…..
” আম্মু, আমার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দাও প্লিজ ।
মিনারা বেগম খাবারের প্লেট রেখে হাত ধুয়ে আসলেন । ছেলের শিয়রের কাছে বসে আলতো করে হাত রাখলেন মাথায় । বুক চিরে কান্না আসছে তার । সায়ান কে এভাবে দেখে অভ্যস্ত নন তিনি । তার ছেলে এমন নয় । একটা মেয়ে তার ছেলেটাকে পুরো লন্ডভন্ড করে দিয়ে চলে গেলো । নীরবতা ভেঙে ভদ্রমহিলা দম টেনে বলেন…..
” ওকে ভুলে যা, সায়াহ্ন ।
সায়ান চোখ বন্ধ করেছিলো । সেভাবেই মুচকি হাসলো । বা চোখের কার্নিশ ভিজলো তার । বুঝতে দিলো না । দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে ভেতরটা । তবুও চমৎকার কন্ঠে উত্তর করলো….
” সম্ভব নয় আম্মু । ওকে ভুলতে গেলে শেষ হয়ে যাবে তোমার ছেলে ।
” ওর বিয়ে হয়ে গেছে ।
” জানি ।
” ও এখন অন্য কারোর । চলে গেছে তোকে ছেড়ে ।
” ও তো আমার ছিলো, আমি ওকে আমার করে রাখতে পারি নি । বড্ড দেরি করে ফেলেছি ।
ভদ্রমহিলা তাৎক্ষণিক কিছু বলতে পারলেন না । ছেলের স্বাভাবিক কন্ঠে দুমড়েমুচড়ে গুঁড়িয়ে দিলো তাকে । তিনি যথেষ্ট বুঝতে পারছেন সায়ানের ভেতরে কি চলছে । বছরের পর বছর ধরে সেই একটা মেয়েকে ঘিরে স্বপ্ন বুনে এসেছে তার ছেলে । এ সবকিছুই জানেন তিনি ।
নিজেকে ধাতস্থ করে ছেলেকে শান্তনা দিলেন….
” ও আর এমন কি ? ওর থেকে হাজার গুণ সুন্দরী মেয়েকে তোর বউ করে নিয়ে আসবো আমি ।
” পারবে না আম্মু । সুন্দর কাউকে চাইনা আমি , আমি শুধু আমার কিউটিপাই কে চাই । হয় ও, নয়তো আর কেউ নয় । সায়াহ্ন ইফতেখার আর কাউকে বসাবে না ওর জায়গায় । বাসবে না আর কাউকে ভালো ।
চমকে উঠলেন ভদ্রমহিলা ।
” কি বলছিস তুই এসব ? পাগলামো করবি না সায়াহ্ন !
” আমাকে পাগল মনে হয় তোমার ?
” মনে হচ্ছে এখন ! শাফাহ্ খুব আহামরি কেউ নয় । দুনিয়াতে আরো অনেক মেয়ে আছে । যারা ওর থেকে বেটার ! তুই আমাদের একমাত্র ছেলে,,, তোকে এভাবে দেখতে পারছি না আর । আমি এক মাসের মধ্যেই তোর বিয়ে দেবো ।
” বৃথা চেষ্টা করো না আম্মু । ওর থেকে কেউ বেটার হতে পারবে না, কারন ও বেস্ট । শাফাহ্ যদি আহামরি কেউ নাই হয়, তাহলে ওর থেকে আহামরি কাউকে চাইও না আমি ।
ছেলের জেদ দেখে ভ্রু গুটিয়ে ফেললেন মিনারা বেগম । খানিক গলা তুলে বললেন…..
” কিসের আশায় আছিস এখনো ?
” আমি আশায় নেই ।
” তাহলে ? ঐ মেয়ের কথা ভুলে যা । যে তোকে বোঝে নি, তার জন্য এতো কষ্ট পাচ্ছিস কেনো ?
” ঐ মেয়ে, ঐ মেয়ে করবে না আম্মু, শুনতে খারাপ লাগে । আর ও আমাকে বোঝেনি, কারন আমি ওকে বোঝাই নি । আমার আসার সময় হতে হতে ও ফসকে গেছে । মূল্য দেই নি সময়ের । তাই ভুল আমার, ওর নয় । দোষারোপ করবে না ওকে কেউ ।
মিনারা বেগম অভিভূত হন । বাকরুদ্ধ হয়ে যান এক মুহুর্ত । সায়ান গলা নামিয়ে বলে…..
” স্যরি আম্মু । এখন তুমি যাও প্লিজ । কথা বলতে ভালো লাগছে না আমার । আর না কিছু শুনতে ভালো লাগছে । আমি ঘুমাবো ।
” ভাগাতে চাইছিস আমায় ? নয়টা বাজে, এতো তাড়াতাড়ি ঘুমানোর অভ্যাস নেই তোর ।
” অনেক অভ্যাসই নেই, সেসব আয়ত্ত করতে হবে । ভুলতে হবে কিছু অনুধ্যায় । চিন্তা করো না আম্মু , তোমার ছেলে ঠিক আছে । সে আর ভাবে না ওসব নিয়ে । তুমি নিশ্চিন্তে থাকো । কাল থেকে অফিস জয়েন করবো ।
যাও এখন, আমি একটু ঘুমিয়ে নিই ।
মিনারা বেগম কথা বাড়ালেন না । আচলে মুখ চেপে চুপচাপ বেরিয়ে আসলেন রুম থেকে । মিনিটের মাথায় সায়ান উঠে বসে । পা চালিয়ে তড়তড়ে পায়ে উঠে গিয়ে খট করে লাগিয়ে আসে দরজা । পিঠ ফিরিয়ে মুখ গোল করে শ্বাস ফেলে । ফের গিয়ে বসে বারান্দায় । হাতে এখনো রুমাল টা আছে । সে হাত তুলে সেটাকে চোখের সামনে ধরলো । ঠোঁটের কাছে টেনে মৃদু পরশ বোলালো ।
বারান্দার শিরশিরে বাতাস টা ভালো লাগছে বেশ । অর্ধেক চাঁদ উঠেছে আসমানে । চাঁদের পাশে সাদা মেঘ ভাসছে । সায়ান ইজি চেয়ারে শরীর এলিয়ে চাঁদের পানে চায় এক দৃষ্টে । চোখ বুজতেই মনে পড়ে কিছু স্মৃতি । যা কেবলই যাতনাময় । এ যাতনা ভোলা দায় ।
সে যদি সঠিক সময়টুকু কাজে লাগাতো, তাহলে হয়তো আজ এই দিনটা দেখতে হতো না । দোষ তো ওরই ।
অপেক্ষা করে করে আজ এই ফল পেলো । যে ফল মিষ্টি নয় । কে বলে সব অপেক্ষার ফল মিষ্টি হয় ?
সায়ান রুমাল টা বুকে চেপে ধরে । চোখ খিচে নেয় । বন্ধ চোখের পাপড়ি ঠেলে তপ্ত পানি ঝরে কপোল ছুঁইয়ে ।
তীব্র যন্ত্রণায় দাঁতে দাঁত চেপে ধরে শক্ত যুবক । অপর হাতে খামচে ধরে চেয়ারের হাতল । ভেজা ভেজা ভাঙা স্বরে আওড়ায়….
” আই লাভ ইউ কিউটিপাই,,, আই রিয়েলি লাভ ইউ ।
কেনো বুঝলি না আমায় ? আমার হতে হতেও কেনো হলি না ? এতো বোকা কেনো হলি তুই ? এখন আমি বাঁচবো কি করে তোকে ছাড়া ? তোকে ঘিরে বাঁচতে চেয়েছি , আর সেই তুই কিনা আমার বাঁচার স্পৃহা টাই কেড়ে নিলি । কেনো রে জান ? আমি কি যোগ্য ছিলাম না তোর ? কমতি ছিলো আমার অপ্রকাশ্য ভালোবাসায় ? কেনো হারিয়ে দিলি আমায় ? কোথায় হারালি তুই ? ফিরবি না আমার কাছে ? হবি না আমার ? আমি অপেক্ষা করবো তোর জন্য । গোটা জীবন অপেক্ষা করবো ।
চুপ করে সে । চোখ মেলে শূন্যে চায় । চোখ বন্ধ করে রাখাও দায় । বন্ধ চোখের ডালে ভাসছে বোকা রমনীর হাসি মাখা মুখাবয়ব । দিশেহারা করে দিচ্ছে শান্ত ছেলেটাকে । অসম্ভব চেরা যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে সে ।
সায়ান পারে না সইতে । বুক ভরে শ্বাস টানে । মন জানে সে ফিরবে না , কিন্তু মানতে চায় না । সম্ভব নয়, তবুও বৃথা সম্ভাবনা খোঁজে অবুঝ মন । হৃদয় ফেটে চৌচির হয় ।
সায়ান শব্দ করে হেসে ওঠে নিজের এমন পাগলামো দেখে । সে পাগল হয়ে যাচ্ছে । পাগল ছেলেটা গুনগুন করে…
“ চারদিকে শুধু তোমার স্মৃতি আজ,
নেই শুধু তুমি কাছে !
হায় যদি একবার, যেতো গো জানানো,,,
আমার ও যে হৃদয় আছে….!
জীবনের একটি ভুল, ঝড়ালো কত ফুল !
জানিনা, ওহোহোহো – জানিনা ।
থামে একটু । চোখ ভিজে জবজবে । সে মোছে না নোনা জল । হাসে তা সমেত । কন্ঠ চিরে গায় আর দু লাইন….
“ কাঁদে একা একা প্রাণ যে আমার….
কাঁদে একা একা প্রাণ যে আমার ।
লাগে নাআআআ, ভালো আর….
লাগে নাআআআ, ভালো আর ।
ওহোহোহো…….
,,,,,,
মাঝে বেশ কদিন কেটেছে ।
গত এক তারিখে মিনির হার্টে ইন্টারভেনশন করানো হয়েছে । টানা চারদিন সে ছিলো হসপিটালে । রিলিজ দেওয়া হয়েছে আজ । আর আজই ফিরবে বাড়িতে । পাঁচ তারিখ চলে । সুইজারল্যান্ডে তখন বিকেল সাড়ে পাঁচটা । হসপিটাল থেকে বাড়িতে ফেরার প্রস্তুতি ও নেওয়া হচ্ছে । গুটিয়ে ফেলা হয়েছে সব ।
আলাদা করে মিনির টেক কেয়ারের জন্য দুজন নার্স যাচ্ছেন সাথে ।
ফেরার সময় মিনিকে স্ট্রেচারে না দিয়ে কোলে তুলে নিলো রৌদ্র । আলগোছে ওকে সামলে দোতলা থেকে নেমে হসপিটাল থেকে বেরিয়ে এগোলো গাড়ির দিকে ।
পেছনের সিটে মিনিকে নিয়ে বসে সে । ড্রাইভিং সিটে মাহির, আর তার পাশেই রিসা । সাবধানে গাড়ি স্টার্ট করা হলো ।
রৌদ্রের কোল জুড়ে দখল নিয়েছে ছোট্ট বাচ্চাটা । গত চারদিন ধরে দিনের অনেকটা সময় রৌদ্রকে কাছে পেয়েছে সে । যদিও ছিলো হাসপাতালের বেডে । তবুও তার খুশি দেখে কে ?
পাপা ভেবে রৌদ্রের বুকেই মাথা গুঁজে ডাকলো আস্তে করে….
” পাপা !
” ইয়াহ মাম্মা !
” মিনি এখন ঠিক আছে তাই না ? বাড়ি যাবে মিনি ?
” ইয়েস মাই প্রিন্সেস ! এইতো বাড়ি যাচ্ছি আমরা ।
” মিনির কি হয়েছিলো পাপা ?
” কিছু না তো । আমার মিনি একদম ঠিক আছে । এইতো কথা বলছে আমার সাথে ।
চলার পথে জানালা গলিয়ে বাইরে দৃষ্টি রেখেই আবার বললো আধো আধো স্বরে…..
” আজকে মিনি পাপার সাথে থাকবে । পাপা থাকবে মিনির সাথে !
” পাপা তো মিনির সাথেই থাকে ।
” না,,, মিনি ঘুমিয়ে গেলে পাপা পালিয়ে যায় । মিনি আজ পাপাকে জড়িয়ে ঘুমাবে ।
এবারে সামনে থেকে গলা তুললো রিসা….
” মিনি,,, এতো কথা বলছো কেনো ? চুপচাপ বসে থাকো । ডিস্টার্ব করো না রৌদ্র কে ।
অগত্যা চুপসে গেলো মিনি ।
রৌদ্র নিজেও কথা বাড়ালো না । মাথায় ঘোরপাক খাচ্ছে হাজার চিন্তা । সে কব্জিতে বাঁধা ঘড়ির দিকে তাকালো । ছয়টা বাজে । ভেতর ভেতর ছটফট লাগছে তার । কিছু একটা ভাবতে গিয়ে ক্ষণে ক্ষণে হাসছে আনমনে ।
রিসা আর মিনিকে বাড়িতে নামিয়ে সেখান থেকে বেরোতে বেরোতে পেরিয়েছে আরো ঘন্টা তিনেক । মিনিকে বুঝিয়ে ঘুম পাড়িয়ে বেরিয়েছে কোনো রকমে ।
মাহির সাথে আছে । গাড়িতে উঠে রৌদ্র শুধালো তাকে….
” মাহির, সব রেডি তো ?
” ইয়েস বস । যেভাবে বলেছেন, আপনার পছন্দ অনুযায়ী সেভাবেই করেছি সব । এখন বাড়িতে যাবো, তাইতো ?
” উঁহু !
” তাহলে ?
” সবকিছু কোথায় রেখেছো ?
” অ্যাপার্টমেন্টের বাইরে, গ্যারাজে আছে !
” এক কাজ করো, অ্যাপার্টমেন্টে যাও তুমি ।
” আর আপনি ?
” তুমি গিয়ে ইভারা কে ম্যানেজ করো । আমি ঠিক সময়ে চলে আসবো ।
মাহির খানিক অপ্রস্তুত হলো । আমতা আমতা করলো….
” আমি ? আমি কিভাবে ম্যামকে ম্যানেজ করবো ? না মানে , কি বলবো আমি তাকে ?
রৌদ্র চোখ সরু করে…..
” এভাবে ভিমড়ি খাচ্ছো কেনো ?
ইভারা এগারোটার মধ্যেই ঘুমিয়ে যায় । এটা ওর অভ্যাস । ও রুমে ঢুকবে দশটায় । যদি তার আগেও ঢোকে, তাহলে যেনো রুম থেকে বেরোতে না পারে আর । দশটার পর আমি আসবো । হাতে ঠিক দুই ঘন্টা সময় পাবো । এর মধ্যেই বাকি সব করতে হবে । ও যেনো ঘুনাক্ষরেও টের না পায় । আই ওয়ান্ট টু সারপ্রাইজ হার কমপ্লিটলি ।
মাহির স্মিথ হাসে ।
” আর এই এক ঘন্টা কোথায় থাকবেন আপনি ?
ম্যাম যদি অতিরিক্ত কিছু ভেবে নেয়, তখন ?
” তাইতো তোমাকে পাঠাচ্ছি, সামলে নিও । এ্যাজ অ্যা সিস্টার, বেশি কিছু নয় । তাকাবে না বারবার । সিসি ক্যামেরা আছে, মনে রেখো ।
রৌদ্রের কথায় হেসে ফেলে মাহির । মাথা নাড়ায় দুদিকে ।
এদিকে মেঘা রৌদ্রের পাত্তা পায়নি সেই দুপুর থেকে । মাঝে একবার ফোনে কথা হয়েছে । সকাল থেকেই মাথাটা ভার । মাহির এসে টুকটাক কথা বললেও মেঘা সেভাবে গুরুত্ব দেয়নি । রৌদ্র নাকি কাজে ফেঁসেছে । ফিরতে ফিরতে এগারোটা বাজতে পারে । মেঘা শুনেও প্রতিক্রিয়া দেখালো না খুব একটা ।
মাহির ছেলেটা মন্দ নয় । আদ্রের মতো সহজ । সুন্দর ভাবে গুছিয়ে কথা বলতে জানে ।
ওর সাথে মিনিট কয়েক কথা বলার পর ফোন বাজতেই উপরে উঠলো মেঘা । আদ্র ফোন করেছে । রমনী ফোন রিসিভ করে বিছানায় গা এলিয়ে দেয় ।
তাৎক্ষণিক ওপাশ থেকে ভেসে আসে মিষ্টি এক বাক্য…..
যা শোনা মাত্রই হকচকিয়ে যায় মেঘা । এলিয়ে দেওয়া শরীর খানা ধড়ফড়িয়ে ওঠে তার । চোখে ঘন পলক ফেলে তব্দা খেয়ে বসে রয় ।
আদ্র ডাকে এপাশ থেকে সাড়া না পেয়ে ।
” মেঘ বুড়ি ? শুনছিস তুই ?
নড়েচড়ে বসল একবিংশী । ঘড়ির দিকে তাকালো । নয়টা বেজে চৌত্রিশ মিনিট । সে বোকার মতো জানতে চাইলো…..
” ভাইয়া,,, আজ কত তারিখ ?
” পাঁচ তারিখ । আর কাল ছয় তারিখ ।
আকাশ থেকে পড়ে মেঘা । ওর তো মনেই ছিলো না । মাথা চুলকালো নির্বোধের ন্যায় । আদ্র ওপাশ থেকে বলে…..
” ভুলে গেছিস না-কি ?
কাল ছয় এপ্রিল । আমাদের এখানে রাত একটা পেরিয়েছে । তোদের ওখানে মেবি নয়টা । খুব টাফ হয়ে যাচ্ছিলো জেগে থাকা । সময় মতো উইশ করতে চেয়েছিলাম । ওদিকে বারোটা বাজতে বাজতে তুই ঘুমিয়ে পড়বি । তোর ঘুমে ডিস্টার্ব করতে চাইনি । তাই ভাবলাম একটু আগেই না হয় উইশ করে দিই । খুশি হোস নি ?
মেঘা কাষ্ট হাসলো…..
” ভাইয়া,,খুশি হবো না কেনো ? থ্যাংক ইউ সো মাচ্ । তুমি মনে রেখেছো, অথচ দেখো , আমারই মনে ছিলো না । কি ভুলো মন হয়েছে আমার ।
মুচকি হাসলো আদ্র…..
” তোর গিফট টা তুলে রাখলাম । ফিরে আসলে দেবো ।
বাই দ্যা ওয়ে, রৌদ্র কোথায় ?
মলিন হয়ে আসলো রমনীর চিকচিকে মুখাবয়ব । আকস্মিক ভার হলো বুকখানা । বললো কন্ঠ চিপে…..
” ফেরেনি এখনো । কাজ আছে ইম্পর্ট্যান্ট । ফেরার সময় হয়েছে , ফিরবে খানিক পর ।
আচ্ছা ভাইয়া, এখন রাখি হ্যাঁ ? অনেক রাত হয়েছে । ঘুমিয়ে পড়ো । থ্যাংক ইউ, এতো রাত অবধি আমার জন্য জেগে থাকার জন্য ।
মেঘা ফোন কেটে হাঁটু জড়িয়ে বসে । ছলছল করে ওঠে চোখ দুটি । ইয়াশের সাথে কথা হয় না আজ বহুদিন । এই স্পেশাল দিনটাতেও ও খোঁজ নেবে না একবারও ? ইয়াশ হয়তো ভেবেছে, যে মেঘা ওকে ভুল ভাবছে । মেঘার সাথে কথা বলার সৎ সাহস পাচ্ছে না তাই । কিন্তু মেঘা তো রেগে নেই । বরং অভিমান করে আছে ভাইয়ার উপর ।
সে এতো দিনেও একবারও বোনের খোঁজ নিলো না । আজও নেবে না ? নিষ্ক্রিয় চোখে ফোনের দিকে তাকিয়ে রয় একবিংশী । এক ফোঁটা জল কনা গড়িয়ে পড়ে বা চোখের কার্নিশ ঘেঁষে ।
পরক্ষণে যাতনা বাড়ে রৌদ্রের কথা ভেবে । ঐ লোক ও কাজের পেছনে ছুটে মেঘা কে হেলাফেলা করলো । হয়তো জানেই না এই দিনটা সম্পর্কে ।
নাক টানে রমনী । সে জেগে থাকবে না ঐ রাইনো মুখোর জন্য । জিদ করে চোখ মুছে শুয়ে পড়লো ।
মাথা যন্ত্রণায় বুজে নিলো দু’চোখ ।
সময় পেরোয় এর মধ্যেই । ঘুমের মাঝে আকস্মিক কারোর ঠান্ডা হাতের স্পর্শে চমকে যায় একবিংশী । কারোর কনকনে হাতের বিচরন ঘটে তার গ্রীবার নিকট । গ্রীবা হতে কানের পাশ অবধি । কেউ যেনো গভীর ভাবে ছোঁয়ার চেষ্টা করছে তাকে । ঘুমের খেয়ালে অবাঞ্চিত স্পর্শ বোধগম্য হতেই ঘুম ছুটিয়ে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলো মেঘা । তড়াক করে চক্ষু মেলতেই আবিষ্কার করলো অন্ধকার ঘর । কানে বাজলো খট করে দরজা খোলার শব্দ । ঝাঁপসা চোখে দেখতে পেলো, মনে হয় ছায়া মূর্তি মতো কিছু একটা সরে গেলো দরজা মারিয়ে ।
ঘুম ঘুম চোখে এসব দেখেই আঁতকে ওঠে মেঘা । সে তো লাইট অন রেখেই শুয়ে পড়েছিলো । কখন ঘুমিয়ে গেছে টের ও পায়নি । তাহলে লাইট অফ করলো কে ? কেই বা ঘরে এসেছিলো ? কে এভাবে স্পর্শ করলো ওকে ?
অবান্তর ধারনায় ধক্ করে ওঠে একবিংশী হৃদয় । শুষ্ক ঢোক গেলে । কাঁটা দেয় গায়ে । বিছানায় থেকেই হাত বাড়িয়ে বেড সাইড ল্যাম্প জ্বালায় । আলো জ্বলে ছলাৎ করে । ঘর ফাঁকা । কেউ নেই । যে ছিলো বেরিয়ে গেছে । মেঘা ঘেমে যায় ভয়ে । বিছানা থেকে পা নামিয়ে কদম বাড়িয়ে কম্পিত গলা তোলে…..
” রো… রৌদ্র !
……
” রৌদ্র, আপনি এসেছেন ? কটা বাজে ?
তড়াক করে ঘড়ির দিকে তাকালো সে । এগারোটা বেজে ছাপ্পান্ন মিনিট । একা ঘরে কেমন গা শিউরে ওঠে । রৌদ্র ফেরেনি এখনো ।
মেঘা ছ্যাঁত করে উঠলো । বাড়িতে যে ছয়জন কাজ করেন, তারা নিচতলায় থাকে । মেঘা ভাবলো না আর । ভয় থেকে বাঁচতে এলোমেলো কদমে ছুটলো ।
করিডোরে ঘুটঘুটে অন্ধকার । আর লিভিং রুমেও । বাড়ির সব আলো নেভানো । ঠাহর করে সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে একজন মেইডের নাম ধরে চেঁচিয়ে ওঠে রমনী…..
” মোহনা আন্টি…..
কেউ আছেন ? কোথায় সবাই ? অন্ধকার কেনো গোটা বাড়িতে ? আমার রৌদ্র কোথায় ? ও ফেরেনি এখনো ?
রমনীর সম্পুর্ন বাক্য শেষ হলো ।
সিঁড়ি ভেঙে নিচে নামলো সে । থমকে দাঁড়াতেই ছলাৎ করে জ্বলে উঠলো পুরো বাড়ির সব আলো । রমনী চমকে গিয়ে চোখ বুজে নিতে না নিতেই ঝড়ঝড়িয়ে পুষ্প বৃষ্টি হলো তার উপর ।
ঝুনঝুনে তালির সাথ সাথ ভেসে আসলো টেনে টেনে বলা একাধিক কন্ঠ…..
” হ্যাপি বার্থডে টু ইউ…..
হ্যাপি বার্থডে টু ইউ…..
হ্যাপি বার্থডে টু ডিয়ার ইভারা….
হ্যাপি বার্থডে টু ইউ…..
ভয়ে ডরে দুহাতে কান চেপে ধরা রমনী ছলকে ওঠে । তড়াক বেগে চায় সামনে । বাড়ির সব স্টাফ দাঁড়িয়ে আছেন হাসি মুখে । হাততালির সাথে এখনো সবাই সমস্বরে ক্ল্যাপিং করছেন । সামনে দাঁড়িয়ে মাহির । মেঘা আহম্মক বনে যায় অবিশ্বাসে ।
ঝকঝকে গোটা বাড়িতে বেলুন উড়ছে । ছড়িয়ে ছিটিয়ে মেঝেতে লুটোচ্ছে শতশত । ফুলের পাপড়িতে ঢেকে গেছে মার্বেলের মেঝে ।
ডান পাশের দেয়ালে গাঁথা ঝিকিমিকি ফয়েল বেলুন । লেখা সেথায়….
“Happy birthday Evara”
সামনে গোল টেবিলে বড় একটা কেক । আর তার পাশেই একাধিক গিফট বক্স ।
মেঘার চোয়াল ঝুলে আসে । স্থির হয়ে তাজ্জব বনে চেয়ে রয় নিগুড় লোচনে ।
বিষ্মিত হওয়ার মাঝেই কাঁধ ছাপিয়ে কানের নিকট উষ্ণ শ্বাস অনুভব করলো । সাথে ফিসফিসে বাণী……
” হ্যাপি বার্থডে সুইটহার্ট । মাই লাভ ,, মেনি মেনি হ্যাপি রিটার্নস অফ দ্যা ডে ।
মেঘা চকিতে ঘাড় ঘোরায় । পেছনে রৌদ্র । ঠোঁটে ঝুলছে হাসি । তখনো বাকরুদ্ধ সে ।
মাথা টলছে । ঘোর লাগছে সবে । গোটা বাড়ি সাজানো হয়েছে । এই একটু সময়ের মধ্যে এসব হলো কি করে ? নিশ্চয়ই অতিরিক্ত কল্পনা করছে মেঘা । সে সন্দেহ কাটাতে চোখ কচলায় । ফের তাকায় । না তো , বিভ্রম নয় । রৌদ্র মশগুল রমনীর বাহু টেনে ঝাঁকায়…..
” ইভারা !! শুভ জন্মদিন জানেমানন…..
” রৌদ্র,,, এসব…এসব আপনি ? কি এসব…?
মেয়েটার গলা জড়িয়ে যায় ।
তার নরম গালে হাত তুলে হেসে বলে রৌদ্র…
” তোমার জন্মদিনের আয়োজন । পছন্দ হয়েছে ?
” এসব কখন হলো ?
” এইতো খানিক আগে !
” আ… আপনি কি করে জানলেন, আজ আমার বার্থডে ?
শব্দ করে হাসে বেপরোয়া যুবক…..
” আমার জন্য জন্ম হয়েছে তোমার , আর তোমার জন্মের এই দিনটাকেই ভুলে যাবো আমি ? জানবো না ? হ্যাপি বার্থডে সানি ! ডু ইউ নো , হাউ স্পেশাল দিস ডে ইজ টু মি ?
মেঘা কথা বলে না । পরিবর্তন ও দেখা যায় মুখো ভঙ্গিমায় । পেছন থেকে মাহির ডাকলো…..
” বস, বারোটা বেজে গেছে । এবার কেক কাটা যাক ? ম্যাম , চলে আসুন ।
তার মেলায় রৌদ্র…..
” উমমম,, চলো ইভারা….
রৌদ্র কদম বাড়াতে গেলে মেঘা ঝটকা মেরে ছাড়িয়ে নেয় নিজেকে । কোনো কিছুতে কান না দিয়ে এক ছুট লাগায় উপরের দিকে । ভড়কায় রৌদ্র ।
” ইভারা,, হোয়াট হ্যাপেন্ড ?
মেঘা শুনলো না । এক ছুটে গিয়ে ঠাস করে দরজা লাগিয়ে দিলো । আরো বেশি চমকে যায় রৌদ্র । নিমিষেই কালো হয় সকলের মুখাবয়ব । তড়তড়ে পায়ে নিজেও ছুটে যায় রৌদ্র । দরজা ধাক্কায়…..
” সুইটহার্ট,,, কি হলো ? দরজা লাগালে কেনো ? তোমার পছন্দ হয়নি আয়োজন ? কমতি আছে কোনো কিছুতে ? আমি সময় পাইনি জান, যেটুকু সময় ছিলো তার মধ্যেই সাজিয়েছি সব । সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম তোমায় । স্যরি সুইটহার্ট । আচ্ছা আমি গিফট এনেছি তোমার জন্য । দেখবে না ? আমরা আবার তোমার পছন্দ মতো সবটা সাজাবো । যেভাবে বলবে সেভাবে । বেরিয়ে এসো মেরি জান ।
ওপাশের নীরবতা দেখে আবার ডাকে কাতর হয়ে…..
” ইভারা,, প্লিজ বেরিয়ে এসো । আচ্ছা আমি কি ভুল করেছি ? দেরিতে উইশ করেছি ? রেগে আছো আমার উপর ? সেই দুপুর থেকে ছিলাম না, এজন্য রাগ করেছো ? বাট আমি তোমাকে একেবারে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম । রাগ করে না প্লিজ ।
” জ্বালাবেন না আমায় । নয়তো সত্যি সত্যিই রেগে যাবো । যান এখান থেকে । আর হ্যাঁ , আপনার শাস্তি,, আপনি নিচে গিয়ে বসে বসে অপেক্ষা করুন । যতক্ষণ না আমি নিচে আসবো ততক্ষণ । যান এখান থেকে ।
” কিন্তু….
” কোনো কিন্তু না, আমি যেতে বলেছি আপনাকে ।
রৌদ্র কিছু বলতে গিয়েও পারলো না ।
চোখ মুখ জড়ো করে নিচে নামলো ।
প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মাথায় রিনিঝিনি শব্দ পেয়ে সিঁড়ির পানে চায় সকলে । রৌদ্রের সাথে সাথে সবাই বসে বসে ঝিমুচ্ছিলেন । রিনরিনে নুপুরের শব্দে চোখ তুললেন সিঁড়ির দিকে । অমনি হা বনে হতবাক হতে ভুললেন না ।
রমনী ধাপে ধাপে নামছে সিঁড়ি বেয়ে । পড়নে ঝিকঝিকে একখানা বেগুনি রঙের সিল্কের শাড়ি । হাঁটু ছাড়িয়ে যাওয়া দীঘল কেশরাশী ছড়িয়ে রয়েছে পিঠ জুড়ে । খানিক খুচরো চুল কপোলের দুধারে । সাজসজ্জা নেই মুখাবয়বে । কেবলই খোলা চুল আর শাড়ি । দুধে আলতা টুকটুকে গড়নে গাঢ় বেগুনি রঙের শাড়িটা যেনো উজ্জ্বলতা বাড়িয়ে তুলেছে ।
মেঘা নিচে নেমে আসলো । পা টিপে দাঁড়ালো একপাশে । সবাই চোখ গোল গোল করে দেখছে ওকেই ।
রমনী চোখ চুরিয়ে আড়চোখে রৌদ্রের দিকে তাকায় । লোকটা হা বনে তাকিয়ে আছে নিষ্পলক । একস্থির তার চাহনি । মেঘা গলা খাঁকারি দেয় । হাসি টেনে ধীরে বলে….
” এখন কেক কাটি চলুন ।
রৌদ্রের মাঝে তবুও প্রতিক্রিয়া নেই । আর না দৃষ্টিতে পলক পড়েছে । মাহির গলা ঝেড়ে রৌদ্র কে ঝাঁকায় । নড়চড়ে ওঠে লোকটা । তবুও দৃষ্টি ফেরায় না ।
শাড়িটা বড্ড চেনা । মেঘা কে কিনে দেওয়া তার প্রথম উপহার । মেঘা রেখেছিলো নিজের কাছে ?
খেয়ালের বশে উঠে যায় রৌদ্র । রমনীর মুখোমুখি হয়ে তার নোয়ানো চিবুক তর্জনী দিয়ে উঁচিয়ে ধরে । হিসহিসিয়ে বলে ঠোঁট নামিয়ে….
” ইউ লুক ড্রপ-ডেড গর্জিয়াস ! উফফফ,, মারতে চাইছো আমায় ? আয়োজন করে মারবে ?
” উহু । চলুন কেক কাটি !
স্তম্ভিত রৌদ্র কে টেনে নিয়ে যায় মেঘা । সবাইকে ডাকে একসাথে ।
সারি সারি গিফট বক্স রাখা । মেঘাকে একে একে বাকিরাও উপহার দিলেন । কেক কাটা শেষে রৌদ্রের কথানুযায়ী একে একে সবগুলো গিফট আনবক্স করা হলো মেঘার সামনে । প্রথম বক্সে বাইশটা শাড়ি । ভিন্ন ভিন্ন রঙের ভিন্ন ভিন্ন ব্রান্ডের শাড়ি । দ্বিতীয় বক্সে বাইশ জোড়া ডায়ামন্ড ক্লাস্টার ব্রেসলেট ।
তৃতীয় বক্সে বাইশ জোড়া হিল । মেঘা হতভম্ব হয় এতেই । ক্রিশ্চিয়ান লুবউটিন ব্রান্ডের শার্প লাক্সারিয়াস জুতো । কদিন আগেও এই ব্যান্ডের প্রতি ঝোঁক ছিলো মেঘার । বলেনি কাউকে ।
চতুর্থ বক্সে একেকটা শাড়ির সাথে মিলিয়ে বাইশ খানা হিজাব । আলাদা জুয়েলারি আছে পঞ্চম বক্সে । ষষ্ঠ এবং শেষ বক্সটা যেনো আকারে একটু বড় । খোলা মাত্রই হতবুদ্ধ মেঘা আরো আশ্চর্য বনলো । বিশাল বড় গোটা বক্স জুড়ে অগনীত হেয়ার ক্লিপ ।
বাকি গিফট গুলো দেখে খুব বেশি আশ্চর্য না হলেও এ বেলায় অহম্মক বনলো রমনী । এতো হেয়ার ক্লিপ কেনো ? মেয়েটা অবাক স্বরে বলে…..
” রৌদ্র ,,, এতো গুলো হেয়ার ক্লিপ দিয়ে কি করবো আমি ?
” তুমি পড়বে, আর আমি খুলবো ।
থতমত খায় মেঘা । ঘন পলক ঝাপটায় । ঢোক গিলে বলে….
” এতো গুলো গিফট এনেছেন কেনো ?
” আমার দ্বাবিংশীর জন্য বাইশের সমাহার । একবিংশ চপলতা পেরিয়ে বাইশের চৌকাঠে পা রেখেছে সে । তাই তার জন্য এই ছোট্ট উপহার সামগ্রী । পছন্দ হয়েছে , কমতি আছে ? আর কি চাই বলো ? আজ যা চাইবে, সব পাবে !
মেঘা গাল ফুলিয়ে বলে…..
” আমার কোনো গিফট চাই না । এসব ও না ।
” তাহলে কি চাই , জান ?
” আমাকে এক্ষুনি আবার বিয়ে করুন আপনি । আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই দ্বিতীয় বার ।
রৌদ্রের মসৃণ ললাটে তাৎক্ষণিক ভাঁজ পড়ে ।
” এক্ষুনি ?
” হুম ।
অপ্রস্তুত হলো বেপরোয়া যুবক । তর্জনী দিয়ে কপালের ধার চুলকে ঘড়ির দিকে তাকালো । একটা বাজে । তোয়াক্কা করলো না তবুও । দম ফেলে স্বাভাবিক হয়ে আদেশ ছুড়লো….
” ওকে ।
মাহির,,, যেভাবেই হোক এক্ষুনি আমাদের বিয়ের ব্যবস্থা করো । যাকে পারো তুলে আনো । এক্ষুনি বিয়ে করবো আমি । রাইট নাও মিনস রাইট নাও ।
” কিন্তু বস…..
” নো এক্সকিউজ ! যা বলেছি করো । রেডি করো সব ।
যা আদেশ , তাই তামিল করা হলো ।
দুটো গাড়ি ছুটিয়ে মাহির সহ বেশ কজন গার্ড রওনা দিলেন । মিনিট কয়েকের মাথায় এই মধ্য রাতেই মেরকেজ মসজিদের বাঙালি এক ইমাম কে তুলে আনা হলো তার বাড়ি হতে ।
সেই প্রথম বিয়ের সময়ও এক মৌলভী কে তুলে আনা হয়েছিলো রৌদ্রের কথায় । আর আজও তাই । তবে লোক দুটি ভিন্ন । স্থান,কাল ভিন্ন । এবারে আর জোরজবরদস্তি নেই । আছে সম্মতি, শান্তি । হাসি হাসি দুটি মুখ । আরো আছে সকলের মুখে সুপ্ত খুশি ।
পরবর্তী পর্বে দুটো ইটিশ-পিটিশ পাবেন
। রৌদ্র–মেঘা আর ইয়াশ–শাফাহ্ । আগে পৌষমাস পালন করুক ওরা । তার পর সর্বনাশ লাগায় দিমু
। পরবর্তী পর্ব কালকে দেওয়ার চেষ্টায় থাকবো । রেসপন্স করবেন, কারেন্ট নাই এমবি কিনে পোস্ট করছি । হুহহহ্ 
। 
চলবে………
#আসবো_ফিরে_আবারো
#বোনাস_পর্ব
#সুরভী_আক্তার
যে ইমাম কে তুলে আনা হয়েছে , তিনি কিছুটা অপ্রস্তুত । তোরজোর করে কিছু না বলেই ঘুম থেকে উঠিয়ে আনা হয়েছে তাকে । আলাদা করে সব বলে কয়ে বোঝাতে গিয়ে সময় নষ্ট করেনি কেউ ।
এখন তিনি এমতাবস্থায় সঙ্কিত হয়ে বসে আছেন একপাশে । হাতে কাগজ কলম । রৌদ্র আর মেঘা বসা পাশাপাশি । ইসলামী শরিয়াহ মোতাবেক ঘরোয়া ভাবে বিয়ে পড়ানো হবে কেবলই । তবে সুইজারল্যান্ডের আইন অনুযায়ী সর্বপ্রথম সিভিল রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে আইনি ভাবে বিয়ে সম্পন্ন করতে হয় । সেই রেজিস্ট্রি পেপার ব্যাতীত বিয়েকে কার্যকর ধরা হয় না । রৌদ্র আর মেঘার রেজিস্ট্রি করা আছে আগে থেকেই । এখানে আর আলাদা করে সমস্যা পোহাতে হলো না । ইমাম সাহেব কে সব বোঝানো মাত্রই তিনি নতুন করে কাগজে কলমে বিবাহ নামা লিখলেন । সাক্ষি উপস্থিত সবাই । মেঘার মাথায় লাল ওরনা টেনে দেওয়া হয়েছে কপাল পর্যন্ত ।
ইমাম সাহেব লেখার মাঝে চোখ তুলে শুধোলেন কলম থামিয়ে…..
” দেনমোহর কত লেখা হবে ?
পেছন থেকে মাহির বলে ওঠে ত্বরিতে…..
” বাইশ বাইশ মিলিয়ে বাইশ লাখ লিখুন ! আজ সব বাইশের ঘরে যাবে । ঠিক বললাম তো বস ?
মাহিরের কথা শুনে রৌদ্র কিছু বলার আগেই লিখতে উদ্যত হলেন মৌলভী লোকটা । তাৎক্ষণিক গুরুভার কন্ঠে বাঁধা দিলো রৌদ্র…..
” আমার স্ত্রীর বাইশ তম জন্মদিন আজ । সেই সাথে মিলিয়ে বাইশ কোটি লিখুন । দেনমোহর তো সামর্থ্য অনুযায়ী দিতে হয় তাই না ? বাইশ কোটি দেওয়ার সামর্থ্য আছে আমার , যা আগে ছিলো না । আমি আমার স্ত্রীকে দ্বিতীয় বার বিয়ে করছি । সামর্থ্য অনুযায়ী বাইশ কোটি দেনমোহর ধার্য করুন এই বিয়েতে ।
হাঁ বনে মুখে হাত তুললেন সকলে । থমকালেন ইমাম সাহেব । এই জীবনে বিয়ে পড়িয়েছেন কম, তবে ঠেকায় পড়ে যে কটা পড়িয়েছেন, সেসবে এতো মোহরানা ছিলো না । তিনি স্তম্ভিত হয়ে শুষ্ক ঢোক গেলেন ।
এদিকে ঘোমটার আড়াল থেকে আড়চোখে রৌদ্রের দিকে তাকায় মেঘা । রৌদ্রের কথাটা মোটেও পছন্দ করে না সে । মুখ গুটিয়ে বাম কাঁধে হাত রাখে । আঁচলে ব্রোঞ্জ লাগানো আছে । সেটা খুলে হাতে নেয় দ্বাবিংশী ।
ইমাম সাহেব হতবুদ্ধতা কাটিয়ে কাগজে কলম বসাতে গেলে এবার বাঁধা দিলো মেঘা । ঘোমটা সরিয়ে শান্ত কন্ঠে বললো…..
” বিয়ের ক্ষেত্রে যদি কাগজে দেনমোহর উল্লেখ করাটা বাধ্যতামূলক হয়েই থাকে, তাহলে আপনি বাইশ টাকা দেনমোহর উল্লেখ করুন । আর তার পাশে রুডভিক কাবির রৌদ্র কে উল্লেখ করে দিন । আলাদা করে অর্থ বুঝে দেনমোহর চাই না আমার । আমার কেবলই রৌদ্রকে চাই ।
রৌদ্র ত্বরান্বিত চোখে চাইলো । মেঘার দৃষ্টি পেপারের পানে । মুখ শুকনো । শব্দহীন হাসলো বেপরোয়া যুবক । মেঘা না তাকিয়েও সবার প্রখর দৃষ্টি অনুমান করে একটু চুপ থেকে বললো…..
” আমার দেনমোহর পরিশোধ করা আছে । প্রথম বিয়ের সময়েই আমাকে দেনমোহর পরিশোধ করে দেওয়া হয়েছে । এই বিয়েতে আলাদা করে কোটি টাকা চাইনা আমার । আমি যা বলছি তাই করুন । বাইশ টাকা লিখুন, তার পাশে রুডভিক কাবির রৌদ্রের নাম । আমি ছাড়তে চাইলেও সে যেনো আমার দেনমোহর আমাকে বুঝিয়ে দেয় । মানিয়ে নেয় যেনো আমাকে ।
রৌদ্র এবারে কপাল গুটায় । একটু কাছ ঘেঁষে শুধোয়….
” দেনমোহর পরিশোধ আছে মানে ?
মেঘা শান্ত দৃষ্টিতে তাকালো এবার । মিষ্টি করে হাসলো । হাতের দিকে দৃষ্টি ফেলে ইশারা করলো । রমনীর হাতের মুঠোয় সোনালী রঙের চিকচিকে একখানা ফ্লাওয়ার ব্রোঞ্জ । রৌদ্রের চোখ কপালে উঠলো তা দেখে । অস্ফুটে বললো….
” সুইটহার্ট,,, এটা ছিলো তোমার কাছে ?
” রেখে দিয়েছিলাম ! আর কিছু চাই না । এটা, বাইশ টাকা, আর রুডভিক কাবির রৌদ্রকে হলেই চলবে । রৌদ্র তো আছে আমার জন্য, আলাদা করে আর সম্মান সূচক অধিকার দেওয়ার প্রয়োজন নেই । আমার চাওয়ার নেই বেশি কিছু ।
” উমমম, রৌদ্র ছিলো, আছে আর থাকবে । রৌদ্র কেবলই তার রৌদ্রময়ীর হয়েই বাঁচবে । ইমাম সাহেব, আপনি বাইশ টাকা দেনমোহর ধার্য করুন । আর তার পাশে আমাকে । আমার স্ত্রী যা বলছে তাই করুন ।
ঠান্ডা বাণীতে এবারে সন্তুষ্ট হলেন সকলে ।
প্রশন্য চিত্তে দ্বিতীয় বার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলো রুডভিক কাবির রৌদ্র আর ইভারা তাসনিম মেঘা । ওদের বিয়ের সব ঝামেলা মিটতে মিটতে রাত্রি আড়াইটা বেজেছে । সবশেষে দায়িত্ব নিয়ে ইমাম সাহেব কে তার বাড়িতে রেখে আসা হয়েছে ।
রাত বেড়েছে অনেক । ভীষণ ঘুম পেলেও নিজেকে ধাতস্থ করে মেঘা সবিশেষে ঘরে যেতে পারলো দুটো পঁয়তাল্লিশ মিনিটে । তখন শান্ত পুরো বাড়ি । যে যার ঘরে পৌঁছেছেন । মেঘা একাই ঘরে ঢুকলো ।
রৌদ্র নিচে । মাহির সঙ্গে আছে । রৌদ্র ওকে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করে । তীক্ষ্ণ স্বরে বলে…..
” ডোন্ট ওয়ারি, আগামী এক মাসের মধ্যে তোমার বিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব আমার । ধেড়ে খোকা, লজ্জা করে না ? বয়স তো কম হলো না । এখনো আমার ভরসায় পড়ে আছো ! এদিকে আমি দু-দুবার বিয়ে করে নিলাম । এখন যাচ্ছি বাস….
” বস ,,, কাঁটা ঘায়ে নুনের ছিটে দেওয়া টা খুব দরকার ? আপনি রুমে যান , ম্যাম অপেক্ষা করছে ।
রৌদ্র কে সম্পুর্ন কথা শেষ দেয়নি মাহির । এই লোক ঠোঁট কাটা , তা সে জানে খুব ভালো করেই ।
উঠে দাঁড়ালো রৌদ্র । গলা ঝেড়ে কলার ঠিক করলো । ভাব সাব নিয়ে কদম এগিয়ে বললো….
” ওকে , গুড নাইট । এক মাসের মধ্যে তোমার জীবনেও এরকম গুড নাইট আসবে । এখন গিয়ে ব্যাড নাইট সেলিব্রেট করো । বাড়ি ফিরতে হবে না । থেকে যাও আজ । কাল মিনিকে নিয়ে হসপিটালে যেতে হবে চেকআপের জন্য । মনে রেখো, দুপুরে হসপিটাল থেকে ফেরার পর ইভারা কে নিয়ে ও বাড়িতে যাবো ।
” কালকেই ?
” হুম ।
রৌদ্রের ছোট্ট উত্তরে মাহির কেবলই দীর্ঘ এক দম ছাড়লো । ঘরে উঠলো রৌদ্র । মেঘা তখন আয়নার সামনে । তড়িঘড়ি করে শাড়ি পড়েছে তখন । এই প্রথম একলা শাড়ি পড়েছে । ঠিকঠাক গোছাতে পারেনি । সেফটিপিন দিয়ে আটকেছে কোনো রকমে ।
এখানে ওখানে একাধিক পিন গেঁথেছে । সেসব খুঁজে খুঁজে খুলতে হচ্ছে এখন । চোখ ও সইছে না । এতক্ষণে ঘুমে কাদা হওয়ার কথা ।
ঘরে ঢুকে শব্দ হীন দরজা লাগিয়ে মেঘার দিকে এগোয় রৌদ্র । ঠোঁটে তাঁর ঝলমলে হাসি । রমনীকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঝিমুতে দেখে হাসি চওড়া হয় কিছুটা ।
কাছে গিয়ে আলতো করে জড়িয়ে নেয় পেছন থেকে । কাঁধে থুতনি গুঁজে বলে….
” ঘুম পাচ্ছে ?
” হুম ।
” ঘুমোবে এখন ?
” হুম ।
” বিয়ের রাতে কে ঘুমায়, সুইটহার্ট ?
” আমরা ঘুমাবো ।
মেঘার ছোট্ট বাক্য । চোখ সরু । ঘুমে ভার পাপড়ি যুগল । সে প্রত্যুত্তর করে হাসার চেষ্টা করে । পিঠ ঘুরিয়ে মুখোমুখি হয় । হাসি প্রগাঢ় করে নিদারুণ কন্ঠে বলে রৌদ্রের দু কাঁধে হাত উঠিয়ে….
” থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ,,,,
এতো সুন্দর একটা সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য অনেক অনেক থ্যাংক ইউ রাইনো মুখো । আমি তো ভেবেছিলাম আপনি হয়তো জানেনই না । ইনফ্যাক্ট আমার নিজেরই মনে ছিলো না । আদ্র ভাইয়া উইশ করার পর মনে পড়েছে , যে আজ ছয় তারিখ ।
আদ্রের কথা শুনতেই অগত্যা রৌদ্রের কপালে তিন স্তর ভাঁজ পড়লো । গলা হলো তড়তড়ে…
” আদ্র উইশ করেছে মানে ?
” হুমম । ভাইয়া সেই দশটার আগে এডভান্স উইশ করে দিয়েছে । তখনই মনে পড়লো, যে আজ আমার জন্মদিন । গত পাঁচ বছরে ভাইয়াই সবার আগে উইশ করতো আমায় । রাত বারোটা হতে না হতেই সুন্দর করে সারপ্রাইজ দিতো । এবারেও ভোলেনি । কিন্তু এবারে তো কাছে নেই, তাই ফোনেই উইশ করেছে ।
মেঘা হাসি হাসি মুখে কথা গুলো শেষ করলেও রৌদ্রের মোটেও সহ্য হলো । ওর আগে আদ্র উইশ করেছে, এটা মানা যায় না । চোয়াল খিচে নিলো সে । কুঁচকে নিলো আঁখি লতা । মেঘা কে আলতো করে ঠেলে দূরে সরালো । গুরুভার কন্ঠে বললো….
” কিভাবে সারপ্রাইজ দিতো ? আমার থেকেও স্পেশাল করে ?
” এতোটা স্পেশাল করে নয়, তবে ভাইয়ার টাও স্পেশাল ছিলো আমার কাছে ।
রৌদ্রের মস্তিষ্ক চড়াও হলো নিমিষেই । গিজগিজ করে মেঘার সামনে থেকে সরে আসলো ।
” আসলেই স্পেশাল ছিলো ?
” হুম তা তো একটু ছিলোই । কারন আপনি ছিলেন না তখন । আদ্র ভাইয়াই তখন সব ছিলো আমার জীবনে ।
ফোঁস করে ওঠে বেপরোয়া যুবক । কপালের ধারের শিরা ফেঁপে ওঠে । মুখ ভার করে বলে….
” সব ছিলো ? বাহ্, খুব ভালো । আমার আগে উইশ করেছে, গত পাঁচ বছরেও এভাবে উইশ করে এসেছে, স্পেশাল তো হবেই তাই না ? তা থ্যাংকিউউউউ বলো নি তাকে, তোমার ঐ আদ্র ভাইয়া কে ?
” বলেছি তো । ভাইয়া আমার জন্য গিফট ও রেখেছে । দেশে গেলেই দিয়ে দেবে ।
” ওওওওও আচ্ছা,,, ভেরি গুড । তাহলে দেশে যাবো খুব শীঘ্রই । আদ্র ভাইয়ার থেকে গিফট নিতে হবে তো ?
” তা তো হবেই । তাড়াতাড়িই দেশে যাবো, ওকে ?
” ওক্কে মেঘ বুড়ি । রাত হয়েছে অনেক । ঘুম পাচ্ছে তো , ঘুমাও এখন ।
রৌদ্রের কথার অর্থ বুঝতে বেগ পেলো না রমনী । মেঘ বুড়ি ডাকটা শুনে হাসি পেলো বড্ড । এমনকি মুখ টিপে ফিক করে হেসেও ফেললো সে । রৌদ্র বরাবরই আদ্র কে হিংসে করে । তা সে জানে । তাই ইচ্ছে করেই খোঁচালো একটু । বেপরোয়া যুবক রাগে হিসহিসিয়ে সরে গেছে । বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে কব্জি হতে ঘড়ি খুলে ছুড়ে মারলো । ঘাড় ডলে মাথার চুল ব্যাক ব্লাশ করে পেছনের দিকে ঠেলে দিলো । মুখ গোল করে নিজেকে সামলাতে শ্বাস ফেললো লম্বা ।
এখন সে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে । মেঘা লক্ষ্য গাঢ় করে পরখ করলো ওকে । গলা ঝেড়ে বললো একটু এগিয়ে…..
” ঘুম পাচ্ছে না আর ।
” ভালো,,, তাহলে আদ্র ভাইয়াকে ফোন করে কথা বলো ।
” আপনি থাকতে আদ্র ভাইয়া কেনো ?
রৌদ্র মুখ বাঁকায় মেয়েদের মতো । কিছু বলে না । বিছানায় গা এলিয়ে দেওয়ার আগেই মেঘা এসে আলগোছে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো ওকে । সুঠাম দেহি যুবকের পিঠে মাথা এলিয়ে উদর পেঁচিয়ে বললো মিহি স্বরে…..
” রাগ করলেন ?
” আমি কে রাগ করার ? ছাড়ো, ঘুমাবো !
” বিয়ের রাতে কে ঘুমায়, রাইনো মুখো ?
রৌদ্র আড়ালে হাসে মিটিমিটি । গলা ভার রেখেই আওড়ায়….
” আমরা ঘুমাবো ! ছাড়ো ।
” উঁহু ।
” হু ।
মেঘাকে সরিয়ে দিলো সে ।
বিছানায় উঠে গা এলিয়ে চোখ বুজলো । রাগ বোঝালো উপর উপর । মেঘা ওর এমন উপেক্ষিত ব্যবহারে চোখ কুঁচকে ফেলে । কোমরে হাত ঠেসে ডাকে…
” রৌদ্র !
উত্তর করলো না বেপরোয়া যুবক । বরং উবু হয়ে শুয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলো বিপরীত দিকে ।
হাসলো মুখশ্রী আড়াল করে । মেঘার মুখখানা চুপসে আসে । আলগোছে বিছানায় উঠে রৌদ্রের কাছ ঘেঁষে তার পিঠের উপর শরীর এলিয়ে দেয় উবু হয়ে । শার্টের উপর তর্জনী দিয়ে আঁকিবুঁকি করতে করতে চট করে ঠোঁট ছোঁয়ায় চওড়া কাঁধে । জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করে বলে….
” লাভ ইউ রৌদ্র !
” থ্যাংক ইউ ।
” লাভ ইউ এর পৃষ্ঠে থ্যাংক ইউ বলে কে ?
” আমি বলি ! সরো , ঘুমাবো ।
” সরবো না ।
” ওকে, ওভাবেই থাকো !
” এইই রাইনো মুখো,, কি হয়েছে ?
” কিছুনা !
মেঘা আর সহ্য করলো না ওর নাটক । চোখ মুখ পাকিয়ে ফোঁস করে উঠে বসলো । বাজখাঁই গলায় বলল…..
” থাকুন আপনি ! আমি ঘুমোলাম ।
মেয়েটা বিলম্ব না করে উল্টো ফিরে শুয়ে পড়লো । মাঝে ফারাক দিয়ে রাখলো একটা কোলবালিশ ।
রৌদ্র পিটপিট করে চোখ খোলে । মেঘাকে দূরে দেখে ঝট করে উঠে বসে । বেশি বেশি হয়ে গেছে । জিভে কামড় বসালো সে । অধর চুবিয়ে বালিশটা সরালো মাঝ থেকে । নির্লজ্জের মতো এবার নিজে কাছ ঘেঁষলো । রমনীর উদর পেঁচিয়ে কাছে টেনে নিজের বুকে তার পিঠ মিশিয়ে নিলো । চুলের ভাঁজে নাক ডুবিয়ে বললো হাস্কি টোনে…..
” লাভ ইউ, সুইটহার্ট ।
” থ্যাংক ইউ ।
মেঘার তড়তড়ে জবান ।
” উমম,, নটি গার্ল । লাভ ইউ এর পৃষ্ঠে থ্যাংক ইউ বলে কে ?
” আমি বলি, সরুন ঘুমাবো !
” সরবো না ।
” তাহলে ওভাবেই থাকুন ।
রৌদ্র ওকে টেনে সোজা করে । বাহু বন্ধনে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে নেয় তার ছিমছাম তন্বী । গ্রীবার ভাঁজে মুখ গুজে সেথায় ছোট ছোট একাধিক পরশ আঁকতে আঁকতে এলোমেলো জবানে আওড়ায়…..
” স্যরি জান । ওভাবে থেকেই শেষ নয়, এখন বাঁধবো অন্য বাঁধনে । সিডিউস করেছো এতক্ষণ । এবার আর ছাড়ছি না ।
কুঁকড়ে গিয়ে ছটফট করলো দ্বাবিংশী । চোখ খিচে রৌদ্রের গলার নিকট নখ দাবিয়ে খামচি কেটে বললো….
” অসভ্য রাইনো মুখো, আই হেইট ইউ !
” বাট আই লাভ ইউ সভ্য মেয়ে ! তোমার ঘৃণার বিপরীতে তোমাকে এতোটা ভালোবাসি । ভেবে দেখো, তোমার ভালোবাসার বিপরীতে না জানি আরো কত ভালোবাসতাম তোমায় ।
মুখ তুললো রৌদ্র । চোখে চোখ পড়লো দুজনার । মেঘা ডান হাত উঠিয়ে যুবকের চুলের ভাঁজে আঙুল ডোবায় । মাথা তুলে কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলে…..
” কাউকে খুব বেশি ভালোবাসতে নেই, রুডভিক কাবির রৌদ্র । নজর পড়ে । শেষে ফুরিয়ে যায় ভালোবাসা, নয়তো হারিয়ে যায় ভালোবাসার মানুষ ।
রৌদ্র নিজেও ঠোঁট নামিয়ে রমনীর আঁখি লতার গোড়ে ঠোঁট ছোঁয়ায়…..
” আমার ভালোবাসা ফুরাবার নয় । আর না তুমি হারাবার ।
আই লাভ ইউ ইভারা । যতদিন বাঁচবো, সমান ভাবে আগলে ভালোবাসবো ।
,,,,,,
ক্যালিফোর্নিয়ায় সন্ধ্যা গড়িয়েছে । সাতটা বাজলো ঘড়িতে । তবে ইয়াশ ফেরেনি হসপিটাল থেকে । শাফাহ্ ফোন পেয়েছে থেকে এখন আর একলা থেকেও বোর হয় না খুব একটা । সারাদিন ফোন ঘাটে । রান্না বান্নায় হাত লাগানোর পর থেকেই ইউটিউব ঘেঁটে ঘেঁটে বিভিন্ন খাবারের রেসিপি দেখে গোটা সময় জুড়ে । টুকটাক রাঁধতেও পারে ইদানিং ।
তাও সাথে থাকে ইয়াশ ।
এখন এই সন্ধ্যা গড়িয়েছে, তবুও লোকটা ফিরছে না । কিছুটা চিন্তিত হলো চঞ্চলা রমনী । ইয়াশ সবসময় এই সময়ের আগেই ফিরে আসে । আবার অনেক সময় রাতে ইমার্জেন্সি হলে ছুটতে হয় হসপিটালে ।
আজ এখনো আসছে না কেনো,কে জানে ? ফোন হাতে নিয়ে লিভিং রুম জুড়ে পায়চারি করছে মেয়েটা । আর পারলো না স্থির থাকতে ।
হাতের ফোন চোখের সামনে ধরে কল লাগালো এবারে । ওর ফোনে ইয়াশ নিজেই তার নাম্বার সেভ করে দিয়েছিলো । নাম দিয়ে সেভ করেছিলো । পরে শাফাহ্ নাম পাল্টে নিজে মাতব্বরি করে “মেঘার ভাইয়া” নামে সেভ করেছে ওর নাম্বার ।
কল লগ হতে সেই সেভ নাম্বার টা ঘেঁটে ফোন লাগালো রমনী । প্রথম বার রিসিভ হলো না । দ্বিতীয় বার কল করলো । এবারো রিসিভ হলো না ।
হয়তো কোনো জরুরি কাজে ফেঁসেছে । মুখ মলিন করে ডিভানে বসলো শাফাহ্ । বাংলাদেশের সময় অনুযায়ী এই ভোর ভোর বাড়িতে কাউকে ফোন করে ডিস্টার্ব করার ইচ্ছে হলো না ।
হাঁটু জড়িয়ে মাথা নামালো হাঁটুর ভাঁজে ।
মিনিট কয়েকের মাথাতেই টুং টাং আওয়াজে বেজে উঠলো তার ফোন । হকচকিয়ে ফোনের দিকে তাকালো রমনী । ইয়াশ কল ব্যাক করেছে । নিমিষেই ঝিকঝিক করে উঠলো চঞ্চলা রমনীর মুখাবয়ব । তড়িঘড়ি করে কল রিসিভ করে কানে ঠেকালো । আগ বাড়িয়ে বললো না কথা । নীরবতা দেখে ইয়াশ নিজেই বলে…..
” বলো !
মেয়েটা মিনমিন করে শুধোয়…..
” কোথায় আপনি ?
” হসপিটালে !
” এখনো ?
” হুম ।
“…….
” কি হয়েছে ? ফোন করেছো কেনো ?
” আমি কই ফোন করলাম ? আপনিই তো করলেন !
” কল ব্যাক করেছি আমি । তার আগে দুবার কে ফোন করলো , শুনি ? এখন কি বলবে বলো ?
মুখ ভেংচায় শাফাহ্ । খিটখিটে হয়ে প্রশ্ন করে….
” আজ এখনো আসছেন না কেনো ?
” মিস করছো ?
” মোটেও না । ভয় লাগছে আমার । কখন আসবেন ?
” এক্ষুনি আসবো ।
ফের নিশ্চুপ হলো রমনী । পাল্টা বললো না কিছু ।
” আর কিছু বলবে ? যা বলবে বাড়ি এসে শুনছি । রাখলাম এখন ।
” শুনুন,,,
ইয়াশ ফোন কাটতে যাবে, তার আগেই ডাক পেয়ে থামলো । উত্তর করলো……
” শুনছি !
” ডিম শেষ হয়ে গেছে । বাড়িতে ফেরার সময় মনে করে দু-কেজি ডিম নিয়ে আসবেন ! ওকে ? মনে থাকবে ?
তব্দা খায় ইয়াশ । সে নামছিলো সিঁড়ি বেয়ে ।
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে সিঁড়ির পথেই থামলো । হেসে ফেললো শব্দ হীন । প্রশ্ন সূচকে বললো…..
” দু-কেজি ডিম ?
” হুম । মনে করে নিয়ে আসবেন কিন্তু ।
” আচ্ছা, এক্ষুনি নিয়ে আসছি । সংসারী বউয়ের আদেশ বলে কথা, নিয়ে আসছি ওয়েট । রাখি এখন !
ফোন কেটে দুদিকে মাথা নাড়ায় তপ্ত যুবক ।
সে বাড়ি ফিরতে ফিরতে আধা ঘন্টা পেরিয়েছে । পাসওয়ার্ড দিয়ে ডোর আনলক করে ভেতরে ঢুকলো । শাফাহ্ তখন কিচেনে । ঠুকঠাক আওয়াজ পেয়ে চটজলদি সেদিকে এগোলো ইয়াশ । ভড়কানো গলায় বলল পিছন থেকে…..
” টুকটুকি,,, এখানে একা একা কি করছো তুমি ?
” এসে গেছেন আপনি ? ডিম এনেছেন ?
আমি ভাত বসিয়ে দিয়েছি । ডিম ভেজে খেয়ে নেবো আজ । চলবে না ?
” তা চলবে । কিন্তু তুমি একা একা কিচেনে এসেছো কেনো ? ভরসা নেই তোমায়, যদি কোনো অঘটন ঘটিয়ে ফেলতে ? আজকের পর আর কিচেনে আসবে না একা একা ।
চোয়াল ঝুলে আসে রমনীর….
” সে কি ! রান্না শিখতে হবে না ?
” হবে , আমি সাথে থাকলে তবেই । একা একা মাতব্বরি করতে বলিনি তোমায় । আর এই নাও , তোমার দু কেজি ডিম । দেখো তো ঠিক আছে কিনা ?
শাফাহ্’র দিকে ডিমের একটা প্যাক এগিয়ে দিলো ইয়াশ । এই প্যাকে ত্রিশ টি ডিম আছে ।
শাফাহ্’র হাতে না দিয়ে কেবিনেটের উপর রাখলো সোজাসুজি । শাফাহ্ সব দেখে মুখ গোল করে বোকা বোকা স্বরে বলে…..
” আপনি একটা গাধা, আপনাকে দু-কেজি ডিম আনতে বলেছি আমি । এতো গুলো এনেছেন কেনো ?
তাৎক্ষণিক রেগে তাকালো ইয়াশ । বুকে হাত গুটিয়ে বললো কন্ঠ চিপে…..
” আমিই গাধা ?
” একদম !
” শাট আপ স্টুপিড । দু কেজি ডিমই এনেছি ।
” এহহ্, বললেই হলো । দু কেজিতে কয়টা ডিম থাকে আপনি জানেন ?
” শুনি, কয়টা থাকে ?
” আটটা । আর আপনি এখানে এনেছেন ত্রিশ টা । এটুকুও জানেন না ?
দাঁতে দাঁত পিষে ফোঁস করে ওঠে তপ্ত যুবক । বাম হাতে হেঁচকা এক টান মেরে চঞ্চলা রমনীকে আছড়ে ফেলে নিজের বুকের উপর । একহাতে কোমড় পেঁচিয়ে অন্য হাতে মেয়েটার নরম চোয়াল আলতো করে দাবিয়ে ধরে । দৃষ্টি নামিয়ে চোখে চোখ রেখে হিসহিসিয়ে বলে…..
” ইউ স্টুপিড টকেটিভ লেডি, আমাকে শেখাতে এসেছো ? পন্ডিত হয়েছো দেখছি ! তা বলো শুনি, ডিম কেজিতে বিক্রি হয় কবে থেকে ?
আজ গল্প দেওয়ার কোনো ইচ্ছাই ছিলো না
। দুইশত শব্দ লেখা ছিলো বাকিটুকু লিখলাম সন্ধ্যার পর । এই কম সময়ে আর কিছু লিখতে পারিনি । গোলমাল লাগছে । বাকিটুকু পরের পর্বে পাবেন । আজ এটুকুই । চটজলদি রেসপন্স পূর্ণ করবেন, ওকে ? 

চলবে………
Share On:
TAGS: আসবো ফিরে আবারো, সুরভী আক্তার
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৬৩
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৬০
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩৪(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ২৫(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩৭
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ১০( প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৮৪
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৭৬
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ১৮
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৬১