Golpo romantic golpo আসবো ফিরে আবারো

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৮৪


#আসবো_ফিরে_আবারো

#পর্ব_৮৪

#সুরভী_আক্তার

সন্ধ্যার দিকে বাড়ি ফেরে ইয়াশ । 

নিঃশব্দে পা চালিয়ে একেবারে ঘরে ঢোকে সে । 

হাতে বড় একটা জুলিয়েট রোজ বুকেট । ঠোঁটে এক চিলতে হাসি । সারাদিনের ক্লান্তির পরও বাড়িতে পা রাখার সাথে সাথে যেনো সব অবসন্নতা গায়েব হয়েছে । 

রুমের দরজার কাছ থেকেই শাফাহ্ কে শুয়ে থাকতে দেখলো সে ‌। গলা অবধি চাদর টেনে গুটিয়ে শুয়ে আছে মেয়েটা । কপাল জড়ো করে এগিয়ে যায় যুবক । ড্রিম লাইট জ্বালানো ঘরে । 

নিভু আলোতে বিছানার পাশে দাঁড়ানো মাত্রই ঘুমন্ত রমনীকে আবিষ্কার করে ইয়াশ ‌। ললাটের সুক্ষ্ম ভাঁজ ঠেলে শিথিল করে তৎক্ষণাৎ । 

মুখোমুখি হাঁটু ভেঙ্গে মেঝেতে বসে । ফুলের তোড়াটা একপাশে রেখে বাম হাত বাড়িয়ে দেয় রমনীর পানে । মেয়েটার মুখের উপর লুটানো অবিন্যস্ত খোলা চুল গুলো তর্জনী দিয়ে আলগোছে সরিয়ে গুজে দেয় কানের পিঠে । গালে হাত রাখতেই মেয়েটার শরীরের উষ্ণতা অনুভব করে সে । শরীর গরম । তাপমাত্রা স্বাভাবিক নয় । 

ইয়াশ হকচকিয়ে কপালে আর গলায় হাত ছোঁয়ালো তড়িঘড়ি করে । আসলেই জ্বর এসেছে খানিক । ধড়ফড়িয়ে উঠে খাটে বসলো যুবক । চাদর সরালো মেয়েটার গা থেকে । আলতো করে ঝাঁকিয়ে ডাকলো…..

” টুকটুকি ! এই মেয়ে,,, জ্বর এসেছে তোমার ! এই ওঠো,,, তাকাও আমার দিকে । 

শাফাহ্ ঘুমের মধ্যে বিব্রত হয়ে চোখ কুঁচকায় । নড়েচড়ে সোজা হয়ে শোয় । পিটপিট করে চোখ খুলতেই দেখতে পায় ইয়াশ কে । যুবক অশান্ত হয়ে ডাকে আবার…..

” উঠে বসো । মেডিসিন বের করে দিয়ে গেছিলাম তো , দুপুরে খেতে বলেছিলাম আবার । খাওনি ? 

ঘুমের ঘোরে উঠে বসে মেয়েটা । হেলান দেয় ব্যাক বোর্ডে । মাথা ধরেছে । চুল গুলো জট পাকিয়ে গুটলি বেঁধেছে বালিশের সাথে ঘষা খেয়ে । নির্বোধের ন্যায় মাথা চুলকালো সে । চোখ কচলে আড়মোড়া ভেঙে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো ইয়াশের দিকে । পরক্ষণে ওষ্ঠ উল্টে আহত করলো দৃষ্টি । 

ইয়াশ বুঝে নেয় বাকিটা । টেবিলের উপর ঔষধের পাতা গোটাটাই পড়ে আছে । এ বেলায় যুবক খানিক তপ্ত করে স্বর…..

” জ্বর এসেছে, সে খেয়াল আছে ? 

মেডিসিন দিয়ে গেছিলাম তো, খাওনি কেনো ? 

” খেয়াল ছিলো না । ঘুমোতে গিয়ে ভুলে গেছি । 

” এতো ভুলো মন কেনো তোমার ? একটু খেয়াল রাখতে পারো না নিজের ? 

” আমার কি দোষ ? জ্বর কি আমি বলে কয়ে ডেকে এনেছি, না-কি ? আপনার জন্যই তো…..

বলতে বলতে বাক্যের মাঝে মুখে কুলুপ আঁটলো মেয়েটা । জিভ ফসকেছে । ‌আড়ষ্টতায় চিবুক নামালো রমনী । 

ইয়াশ তখনো তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে আছে । এবারে দৃষ্টির কোণে দুষ্টুমি খেলে গেলো তার । অধরের কোণ কামড়ে রমনীর উদরের পাশ গলিয়ে বিছানায় হাত ঠেসে একটুখানি ঝুঁকে আসলো । বললো কুন্ঠিত ললিতার নত মুখাবয়বের পানে চেয়ে….

” ওওও, ইউ মিন আমার জন্য জ্বর এসেছে তোমার ? তাহলে তো এবার রোজ রোজ জ্বর আসবে মনে হচ্ছে ! আমার দোষে, আমার জন্য, আমার সুখের খোঁজে তোমার শরীর উষ্ণ হবে রোজ । 

শাফাহ্’র দু-কান হতে ধোঁয়া ওঠে । যুবকের হায়া হীন বাক্যে বিছানা খামচে ধরে সিটিয়ে যায় সে । রুখে নেয় শ্বাস । ইয়াশ পূণরায় বলে দৃষ্টি গাঢ় করে…..

” তুমি যে এতোটা দূর্বল, তা জানা ছিলো না । আমার ভালোবাসার মিঠে স্পর্শতেই নাজেহাল হয়ে পড়ে আছো । অথচ আমি তোমাকে এনেছিলাম টর্চার করে নাজেহাল করার জন্য । প্রণয় পরশের টাল সামলাতে গিয়ে পড়ে আছো বেঘোরে, ভেবে দেখো তো নিঠুর পরশ গুলো সইতে কি করে ? ভাগ্যিস মত পাল্টালাম । 

শাফাহ্ তাকায় না । ইয়াশ চিবুক ফিরিয়ে আনে তার । মুখখানি তুলে বলে.. 

” হোয়াট হ্যাপেন্ড টকেটিভ লেডি ? কথা বলছো না কেনো ? স্পিক আপ ! তোমার কথা শুনতে ভালো লাগে আমার । 

” স্মোক করেছেন ? 

আকস্মিক এহেন প্রশ্নে নড়েচড়ে ওঠে ইয়াশ । একটুখানি  পিছিয়ে নেয় মুখ । শুধোয় তড়িতে…..

” আসার আগে ঐ একটা জাস্ট…

স্মেল পাচ্ছো ? অসুবিধা হচ্ছে ? 

” উঁহু । কিন্তু,,, আপনি একজন হার্ট বিশেষজ্ঞ ! তবুও সিগারেট খান ? সিগারেটে হার্ট পোড়ে, জানেন না ? 

পুরোপুরি পেছালো তপ্ত যুবক । মুখের সামনে মাছি তাড়ানোর মতো করে বাতাস করলো । বেখেয়ালে জিভ খসে উত্তর বেরোলো….

” জানি তো । যার জন্য হার্ট বিশেষজ্ঞ হয়েছি , তার বিরহেই হার্ট পোড়াই এখন । পুড়ে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে ভেতর ঘর । প্রেমে পড়েছিলাম একদা, সেই প্রেমের অপূর্ণতায় হার্ট ঝলসে গেছে । সিগারেট আর কি পোড়াবে ? 

কথা শেষ করে উঠতে যাবে, তার আগেই সম্বিত ফিরলো তার । চকিতে ফিরে চাইলো চঞ্চলার মুখে । মেয়েটা শান্ত দৃষ্টিতে চেয়ে আছে । ইয়াশ তাকাতেই সব জড়তা ভুলে মিষ্টি করে হাসলো । 

ওর মলিন হাসিতে তড়িঘড়ি করে নিজেকে শুধরে নিলো যুবক….

” আ… না মানে,, সিগারেট অনেক আগে থেকেই খাই তো । অভ্যাস হয়ে গেছে ! তুমি বললে ছাড়বো !

” আমি কে আপনার ? কারোর বিরহে হার্ট পোড়ান, আবার তার কথাতেই হার্ট বিশেষজ্ঞ হিসেবে গড়ে তোলেন নিজেকে । আমি কে আপনাদের মাঝে ? 

” তুমি আমার স্ত্রী ।

” স্বামীগত অধিকার পেয়েছেন কাল, তাই স্ত্রী হয়ে গেলাম ? 

” এতো ধারালো ধারালো কথা বলছো কেনো ? তোমাকে বোকা বোকা কথাতেই মানায় । বোকা তুমি টাকে আমার ভীষণ পছন্দ । বেশি বড় হতে যেও না ।

শাফাহ্ মুখ ফিরিয়ে নিলো । কথা ঘোরালো….

” মেঘার সাথে কথা হয়েছে ? 

অগত্যা বদল আসে ইয়াশের মুখাবয়বে । করুন হয়ে চায় । সকাল থেকে না করে হলেও হাজার বার ফোন করেছে । কিন্তু একটাবারও রিসিভ হয়নি । ওপাশের কোনো খোঁজ মেলেনি । কি হয়েছে কে জানে । মেঘা হয়তো খুব বেশি অভিমান করেছে । 

ইয়াশ দীর্ঘ শ্বাস ফেলে ছোট্ট উত্তর করলো…..

” না । 

অতঃপর ফ্রেশ হয়ে আসে সে । শাফাহ্ তেমন কিছুই খায়নি, এটা বুঝতে বাকি নেই । 

কথা না বাড়িয়ে ঘর থেকে প্রস্থান করলো যুবক । মিনিট কয়েকের মাথায় কিচেন হতে কিছু একটা বানিয়ে আনলো । রমনীর পাশাপাশি কাঁধ মিলিয়ে বসে বললো…..

” স্যুপ এনেছি । জলদি খেয়ে মেডিসিন নেবে । 

গরম গরম স্যুপে ফু দিয়ে রমনীর মুখ সম্মুখে স্পুন ধরে সে । শাফাহ্ মুখ ফিরিয়ে নেয় । তিতি বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট চেহারায় । বলে খিটখিটে স্বরে…..

” খিদে নেই । 

” প্রবলেম কি স্টুপিড গার্ল ? এমন করছো কেনো ? 

” ……..

” টুকটুকি,,, আমাকে চেঞ্জ হতে বাধ্য করাবে না । আমি নরমাল হওয়ার চেষ্টা করছি যথেষ্ট ! আমাদের রিলেশন টাকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি ! আরে তুমি কেয়ার চেয়েছিলে না, করছি তো কেয়ার ! আর কি করবো ? কিভাবে যত্ন নেবো ? কোথায় কমতি আছে, ধরিয়ে তো দাও ! এমন করছো কেনো ? কথা বলো ! 

শাফাহ্ তাকায় স্বাভাবিক ভাবেই । রিক্ত চাহনি তার । মন খারাপ, সেটা স্পষ্ট ফুটেছে চেহারায় । মেয়েটা এতোটা মনমরা থাকে না কখনো । 

ইয়াশ স্যুপের বাটি সরিয়ে রাখলো । সম্পুর্ন ধ্যান ফেরালো শাফাহ্’র পানে ‌। মেয়েটাকে টেনে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দুহাতের আজলে মুখখানা আগলে ধরলো । বললো গলা নামিয়ে…..

” কি হয়েছে, জান ? 

শাফাহ্ চমকে যায় ! 

” হুহহ ? 

” বলো !

” কি বললেন আপনি ? 

” কি হয়েছে !

” তারপর কি বললেন ? 

” কি বললাম ? 

শাফাহ্ শুধোয় ব্যাকুল হয়ে…..

” আমাকে কি বলে ডাকলেন ? 

” কই, কিছু না তো ! কি হয়েছে বলো ! মন খারাপ কেনো শুনি ? বাইরে যাবে ? ঘুরতে নিয়ে যাবো ? 

শাফাহ্ আশাহত হয় । দৃষ্টি নামিয়ে নেয় ধৈর্য ফুরোতেই ‌। 

ইয়াশ বুঝতে পেরে শব্দ হীন হাসে । 

মেয়েটা নিজেই কাছে আসে এবার । আলগোছে যুবকের বুকে মাথা গুঁজে ঠাই নেয় ‌। হাসি প্রসারিত হয় ইয়াশের ঠোঁটে । অনুচ্চ মেয়েটাকে জড়িয়ে নিয়ে চমৎকার কন্ঠে শুধোয় বাক্য মিলিয়ে…..

” যার দেহের প্রতিটি ভাঁজ আজ আমার ভালোবাসায় সিক্ত, শুনি,,, তার মনের কোণে কোন স্থান রয়ে গেছে এখনো রিক্ত ? মন খারাপ কেনো তার ? তার মন ভালো করতে আমার কি করার ? 

” মাথা ধরেছে, মাথায় হাত বুলিয়ে দিন । 

” ব্যস, এটুকু ? 

” হু । 

ইয়াশ তাৎক্ষণিক আধশোয়া হলো রমনীকে বুকে নিয়েই । একহাতে কটিদেশ পেঁচিয়ে অন্যহাত চুলের ভাঁজে গুঁজে দিলো । শুধালো…..

” তারপর ? 

” আর কিছু না ! 

ইয়াশ আড়ালে ঠোঁট ছোঁয়ায় তার মাথায় । চোখ বুজে নেয় । অদ্ভুত ভাবে প্রশান্তি পায় সে । বোকার মতো কারন জানতে চায় এর….

” তোমাকে জড়িয়ে ধরলে প্রশান্তি পাই কেনো বলতো ? 

” কেনো ? 

” সেটা তো আমি জানতে চাইছি ! 

দিনে দিনে প্রশান্তির কারন হচ্ছো তুমি আমার ।

,,,,,, 

এদিকে পেরিয়েছে ষোল ঘন্টা । অনেক কিছু ঘটে গেছে । বয়ে গেছে ঝড় । মেঘার খোঁজ নেই । গোটা জুরিখ জুড়ে দ্বাবিংশীর খোঁজে তোলপাড় চলছে রাত থেকেই । কোত্থাও নেই রমনী । যেনো উধাও হয়েছে । কর্পূরের মতো মিলিয়ে গেছে হাওয়ায় । 

পুলিশ সোর্স থেকে শুরু করে রৌদ্রের লাগানো শতশত ইনফর্মার চিরুনি অভিযান চালাচ্ছে গোটা শহরে । মেঘা শহরের বাইরে যেতে পারবে না এতো সহজে । সেই অকাত নেই তার । সে শহরের ভেতরেই আছে । 

তবে তার ভুল ধারনা এবারে বাঁধ ভেঙেছে । ভুলে ভুলে নিজেকে ঢেকেছে রমনী । 

শহরের পরিস্থিতিও ভালো না । দুটো লাশ পাওয়া গেছে কাল । একটা হাইওয়েতে । সেটার মৃত্যু এক্সিডেন্টলি  । দ্বিতীয় টা একটা পুরুষের লাশ । সেটাও উদ্ধার হয়েছে পাশাপাশি কোথাও একটা থেকে । সেটা নাকি খুন । 

এতো সবের মাঝে মেঘার কোনো খোঁজ নেই । 

লাস্ট ষোলো ঘন্টায় চার বার প্যানিক অ্যাটাক এসেছে রৌদ্রের । সে নেই নিজের মাঝে । 

তার কেবলই মেঘাকে চাই । শ্বাস নিতে পারে না সে । মাহির তল্লাশি চালাচ্ছে সবে । 

রৌদ্র বাড়িতে । আধা ঘন্টা আগে ওকে রেখে গেছিলো ছেলেটা । বাইরে গিয়ে স্বস্তিতে থাকতে পারে নি । রৌদ্রের চিন্তায় ছটফট করতে করতে ফিরলো আবার । সাথে নিয়ে এলো একটা সংবাদ । 

দরজা ঠেলে ঘরে ঢোকে সে । কাল থেকেই গোটা ঘর এলোমেলো । উন্মাদের ন্যায় ভাংচুর করেছে বেপরোয়া যুবক । কিচ্ছুটি পরিষ্কার করতে দেয়নি । 

বুকের মাঝে চেপে রাখা দ্বাবিংশীর সেই বেগুনি রঙের শাড়িটা । কাল থেকেই মুঠো হতে আলগা হতে দেয় এটাকে । রাতে দ্বিতীয় বার প্যানিক অ্যাটাক আসার পর একসাথে হাই পাওয়ারের দুটো স্লিপিং পিল খেয়ে মরার মতো পড়ে ছিলো । সকালে জ্ঞান ফেরার পর মেঘাকে না পেয়ে উন্মাদনা করেছে আবার । সেই ফলেই খানিক আগে চতুর্থ বার অ্যাটাক এসেছিলো । 

এখন সে পড়ে আছে দেয়াল ঘেঁষে । দেখে যেনো মনে হয় বদ্ধ পাগল এক । ঠিক নেই চেহারার । শরীরে জড়ানো সাদা শার্টটার বাহুর নিকট ছেড়া । কাঁচের টুকরোয় বাহুর চামড়া ছিলে রক্ত গড়িয়ে জমাট বেঁধেছে । 

চুল গুলি উশকো খুশকো । 

দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো মাহির । ঢোক গিললো বার কয়েক । নিঃশব্দে পা ফেলে এগিয়ে বসলো রৌদ্রের পাশে । দেয়ালে হেলান দিয়ে চোখ বুজে আছে যুবক । 

মাহির ডাকে…..

” বস ! 

ধড়ফড়িয়ে উঠলো রৌদ্র ! চোখ চলছে না । তবুও চোখ মেলে ছটফটিয়ে বললো….

” মাহির,,, আমার ইভারা কোথায় ? পেয়েছো ওকে ? খোঁজ পেয়েছো ? 

” না বস ! খোঁজ পাইনি । তবে একটা খবর এনেছি । 

” কি ? 

” আপনি একটু শান্ত হোন আগে । 

” মাহির,, বলো কি খবর ? 

মাহির ঠোঁট ভেজায় । ঢোক গিলে সাহস জুগিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে…..

” বস,,, কাল হাইওয়েতে যার এক্সিডেন্ট টা হয়েছে । সেটা একটা মেয়ে ছিলো । 

সহসা কপাল গুটিয়ে ফেললো বেপরোয়া যুবক । নিভু নিভু চোখে চেয়ে দূর্বল মাড়ি খিচে ঝাড়ি মারলো…..

” আমি ইভারার খোঁজ চেয়েছি ! 

” যে মেয়েটার এক্সিডেন্ট হয়েছে । তার আইডেনটিটি মেলে নি এখনো ‌। চেহারা থেতলে গেছে । বোঝার উপায় নেই কে সে । তার বয়স একুশ থেকে বাইশের মধ্যে ।

রৌদ্রের মস্তিষ্ক চড়াও হয় । এই মিনিট দুয়েক আগেও একসাথে তিন’টে স্লিপিং পিল খেয়েছে নিজেকে শান্ত রাখার জন্য । সে ঘুমোতে চায়, যতক্ষণ না মেঘা ফিরে আসে ততক্ষণ । ঘুম ভাঙ্গার পর সে তার প্রেয়সীকে দেখতে চায় ‌। কাছে পেতে চায় । 

কিন্তু হলো না । ড্রাগ তিনটেও বেইমানি করলো ওর সাথে । ঘুম আসলো না । বরং মাহিরকে দেখে সব ছুটে পালিয়ে গেলো একটু আশার আলো দেখার তাগিদে । 

তবে এখন এমন অহেতুক কথা শুনে মাথা বিগড়ে যায় যুবকের । ভেতর ভেতর ভয়ে আঁতকে ওঠে । ভরা চোখ ছাপিয়ে পানি ঝড়লেও সে তেজি বাঘের মতো হিংস্র হয়ে দুহাতে কলার চেপে ধরলো মাহিরের । হিড়হিড়িয়ে টেনে কাছে এনে গর্জে উঠলো…..

” শাট আপ মাহির । উল্টো পাল্টা বকবে না । ভরসা করেছি তোমার উপর । আমার ইভারার খোঁজ পেয়েছো কি পাওনি তাই বলো ! না পেয়ে থাকলে তোমার আর প্রয়োজন নেই আমার । আমি আমার প্রাণকে খুঁজে বের করে নিতে পারবো । প্রয়োজন নেই তোমাদের মতো নিষ্কর্মাদের । 

কলার ছেড়ে মাহিরকে ধাক্কা দিয়ে এক প্রকার ছুড়ে মারে সে । ছিটকে পেছায় মাহির । গায়ে মাখে না রৌদ্রের খারাপ আচরণ । সয়ে নিয়ে স্বাভাবিক হয় । টালমাটাল পায়ে উঠে দাঁড়ায় রৌদ্র । ঘাড় ডলে । অতঃপর চেপে ধরে বুক । যেনো চিরে বেরিয়ে আসতে চাইছে হৃৎপিণ্ড । অসহনীয় যন্ত্রণা হচ্ছে তার । উঠে দাঁড়ানোর সাথে সাথে চড়কে ওঠে মাথা । ঔষধের প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় । তার উপর পূনরায় কাঁপতে শুরু করে শরীর । 

টাল হারিয়ে পড়তে গেলে তাকে ধরে নেয় মাহির । 

” বস,, আপনি ঠিক নেই । আমাদের সোর্স অনবরত তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছে । কিন্তু আমি যা বলছি, আপনি একটু শুনুন প্লিজ । যে মেয়েটার লাশ পাওয়া গেছে…..

এ বেলায় দূর্বল হাতে শক্তি জুগিয়ে মাহিরকে ঝটকা মেরে সরিয়ে হুংকার ছাড়ে গগন কাঁপিয়ে….

” এইইইই,,, জানে মেরে ফেলবো একদম । খবরদার আমার ইভারাকে নিয়ে উল্টো পাল্টা ভাববি না । ও আমার প্রাণ । আমার প্রাণের কিছু হলে আমি অক্ষত থাকতাম না এতক্ষণ । সর সামনে থেকে । আটকানোর চেষ্টা করবি না আমায় । 

মেঘার শাড়িটাকে গলায় পেঁচিয়ে নিলো সে । 

পা বাড়ালো টলতে টলতে । চোখ নিভে এসেছে । বুকে প্রচণ্ড যন্ত্রণা । একহাতে বুক চেপে ধরে বেপরোয়া যুবক ঘর ছেড়ে করিডোরে এসে দাঁড়ালো ঠিকি । তবে চলার শক্তি নেই । শরীরের কম্পন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অস্বাভাবিক ভাবে । ভেতর মোচড়াচ্ছে । সে বুঝতে পারছে, সে জ্ঞান হারাবে । এবারে তার বুকের যন্ত্রণা আগের চারবারের তুলনায় অধিক । দম ফুরিয়ে লাল হয়ে আসছে তার উজ্জ্বল শ্যামলা দেহ খানা । মস্তিষ্কের শিরা গুলি গরম হয়ে ছিঁড়ে যাচ্ছে মনে হচ্ছে । চোখ দুটিতে রক্ত এসেছে । 

মাহির রৌদ্রের পেছনে তেড়ে আসে । উপর হতে দুই কদম সিঁড়ি নেমে আসতেই সেখানেই লুটিয়ে পড়ে বেপরোয়া যুবক । গড়িয়ে বাকি আঠারো টা সিঁড়ি ভেঙ্গে ঠাস করে পড়ে যায় মেঝেতে । 

” বস । 

তীব্র চিৎকার জুড়ে ছুট্টে আসে মাহির । লাভ হয় না । ততক্ষণে রৌদ্র নিচে নেমে পড়েছে সব সিঁড়ি ভেঙে । কপাল কেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসে তার । মেঝেতে লুটিয়েই থরথরিয়ে কাঁপতে শুরু করে সর্বাঙ্গ । টান টান হয়ে আসে হাত পা । সেভাবেই কাঁপতে কাঁপতে স্থির হয় । নিভে আসে আঁখি জোড়া । 

আঁতকে ওঠে মাহির । রৌদ্রের নাক হতে গলগলিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে । মাহির দুই আঙ্গুলে ছুঁয়ে দেখে । আওড়ায় অস্ফুটে….

” ওহহহ গড ! 

,,,,,

বাংলাদেশে ভোর চারটা । 

সবাই তখন ঘুমে অচেতন । শুনশান কাবির ম্যানশন । গোটা বাড়ির লাইট অফ ‌। বাড়িটা বড্ড ফাঁকা লাগে আজকাল । রুবিনা কাবির গত রাতের ডিনারের সময়েও হাহাকার করছিলেন…

মেঘা আর রৌদ্র কে ফিরে আসতে বলা উচিত এবারে । ও‌ দুটোর সাথে আর কথাও হচ্ছে না । সেই যে ছয় তারিখ দুপুরে মেঘার সাথে কথা হলো । ওটাই শেষ , আর হলো না । মেঘার ফোনে কল দিলে রিসিভ হয় না । রৌদ্রের ফোন অফ । পাওয়া যাচ্ছে ও দুটোকে । 

তবে অবশ্য কেউ ঘুনাক্ষরেও বাজে চিন্তা করছেন না । 

এই যে এখন ঘুমোচ্ছেন শান্তিতে । পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ গুমোট । 

আদ্রের ঘরেও শব্দ নেই । কেবলই দুটো ঘুমন্ত নর নারীর ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ ভাসছে অন্ধকার গুমোট ঘরে । 

সেই শব্দের পাশাপাশি আরো একটা শব্দ যোগ হলো । ফোন ভাইব্রেড হচ্ছে বেড সাইড টেবিলের উপর । কাঁপছে তা । গভীর নিদ্রার মাঝে ফোনের এমন কম্পনে ঘুমের ঘোরেই কপাল কুঁচকে আসে আদ্রের । একটু খানি নড়ে ওঠে সে । হাত চালায় ‌। বুকের মাঝে খুঁজে পায় শ্যামলিনীকে । এতেই নিদারুণ হাসি ফোটে ওষ্ঠপূটে । ওদিকে ফোন কাঁপছে । 

ব্যাঘাত ঘটতেই বিব্রত হলো আদ্র । হাত বাড়িয়ে ফোনটা টেনে নিলো । সময় জ্ঞান নেই তার । চোখ নিভিয়ে রেখেই কোন রকমে ফোনটা রিসিভ করে চেপে ধরলো কানে । সংক্ষিপ্ত বুলি আওড়ালো ঘুম ঘুম কন্ঠে…..

” হ্যালো ! 

অতঃপর দীর্ঘক্ষণ নীরবতা । ফোনের ওপাশ থেকে কেউ কিছু বললো সময় নিয়ে । সবটা শোনা মাত্রই ঘুম ছুটে যায় আদ্রের । তড়াক করে মেলে আঁখি যুগল । নিমিষেই আতঙ্কে ধড়ফড় করে উঠে বসে শিশির কে সরিয়ে । ফোনের স্ক্রিনে তাকায় । ভিন্ন কোডে আননোন নাম্বার দেখে কেঁপে কেঁপে উচ্চারণ করে…..

” হ….হ্যালো । কে আপনি ? ক…কি বলছেন এসব ? 

ফের লম্বা নীরবতা । ওপাশ থেকে সময় নিয়ে আরো কিছু বলা হলো । অতঃপর ওপাড়ের জন ফোন কেটে দিলেন । আদ্র স্তম্ভের ন্যায় বসে রয় । কানে ঠেকানো মোবাইল ফোনটা হাত ফসকে পড়ে যায় তার । চিনচিন করে ওঠে মস্তিষ্ক । 

শিশিরের ঘুম হালকা হতেই সে নড়েচড়ে শুধালো আধো স্বরে…..

” স্যার ? কি হয়েছে ? এতো রাতে কার সাথে কথা বললেন আপনি ? 

আদ্রের জবানে রা নেই । তার সর্বাঙ্গ কেঁপে কেঁপে দুলে ওঠে । বাকরুদ্ধ হয় সে । আকস্মিক বিছানা থেকে নেমে ছুটে বেরোয় । এই মধ্য নিশীথে চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় তোলে । মুহুর্তেই জ্বলে ওঠে গোটা বাড়ির আলো । 

আদ্রের তীব্র চিৎকারে বাড়ির সবাই হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে আসলেন ঘুম ছুটিয়ে । করিডোরে হাঁটু ভেঙ্গে লুটিয়ে পড়েছে যুবক । চোখ ছাপিয়ে গাল ভিজে গেছে তার । সবাই তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে দেখলেন, শিশির আদ্রের মুখোমুখি বসে তাকে শুধিয়ে যাচ্ছে লাগাতার…..

” আদ্র স্যার, কি হলো হঠাৎ ? কে ফোন করেছিলো ? এমন করছেন কেনো আপনি ? বলুন তো ! 

আদ্রের মুখে কথা নেই । সবাই তেড়ে গেলেন । রুবিনা কাবির আঁতকে ওঠেন ছেলের এমন অবস্থা দেখে…..

” আদ্র,, কি হয়েছে বাবা ? এখানে এভাবে বসে আছিস কেনো ? আর এতো রাতে চেঁচামেচি করছিসই বা কেনো ? কি হয়েছে ? খারাপ স্বপ্ন দেখেছিস ? 

” দেখুন না মা,, হঠাৎ করেই এমন করছেন উনি । কাঁদছেন কেমন করে । কেউ ফোন করেছিলো । তারপর ধড়ফড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন । কিছু বলছেন ও না । আপনি জিজ্ঞেস করুন মা….

তোফায়েল কাবির চোখ ডলে ছেলের কাছে আসেন । এক হাঁটু মুড়ে বসে কাঁধে হাত রেখে বলেন…..

” কি হয়েছে আদ্র ? বলো আমাদের । কে ফোন করেছিলো এতো রাতে ? কি বলেছে, কি দরকার ? 

আদ্র চোখ তুলে চায় । নিভু নিভু ভেজা কাতর আঁখি তার । সে নিজেকে ধাতস্থ করে । থেমে থেমে উচ্চারণ করে ধরা গলায়…

” আব্বু….

” হ্যাঁ বাবা, বলো…

” আব্বু, রুডি….

রুবিনা কাবির ছলকে ওঠেন । 

” রৌদ্র ? কি হয়েছে রৌদ্রের ? 

” আম্মু, আম্মু মেঘ নেই । রুডি ঠিক নেই আম্মু । আমাদের যেতে হবে ওখানে । 

,,,,,, 

মাঝে আরো গোটা একটা দিন কেটেছে । 

ইমারজেন্সি ফ্লাইটে আজ জুরিখের মাটিতে পা রেখেছেন কাবির পরিবারের তিন পুরুষ । শুভ্র, আদ্র, আর তোফায়েল কাবির । 

এয়ার পোর্ট থেকে তাদের ড্রপ করে আনা হলো । ডিরেক্ট হসপিটালে নিয়ে আসা হয়েছে । তিন তলায় আইসিইউ । কেবিনের বাইরে সিকিউরিটি ইউনিফর্ম পরিহিত বেশ কজন গার্ড । নড়চড় হীন সটান দাঁড়িয়ে আছেন । 

আদ্র’দের কেও গার্ডরাই রিসিভ করতে গেছিলো । সবার কাছে এখনো এলোমেলো সব । 

কেউ কিছু বুঝতে পারছেন না । হতভম্ব হচ্ছেন বারংবার । 

কেবিনের বাইরে দাঁড়ালো সবাই । দরজার ছোট্ট গ্লাস ভেদে ভেতরে তাকায় আদ্র । বেড নজরে আসে । বেডে শুয়ে আছে সটান এক যুবক । মুখ ফেরানো রয়েছে বিধায় বোঝা গেলো না সে কে । হয়তো বুঝেও বুঝতে চাইলো না আদ্র । 

চকিতে ফিরলো হালকা ডাক পেয়ে…..

” এক্সকিউজমি ? 

মাহির কে চেনে না কেউ । আদ্র ঢোক গেলে । ঠোঁট ভিজিয়ে বলে…..

” ইউ ? 

” আমি মাহির । বসের এসিস্ট্যান্ট ! আমিই ফোন করেছিলাম ! 

তোফায়েল কাবির ছটফট করে ওঠেন….

ভেজা স্বরে বলেন থেমে থেমে….

” আমার ছেলে, রৌদ্র, ও কোথায় ? 

” বস ভেতরে । যেতে পারেন তার কাছে….

কেউ অপেক্ষা করলো না । হুড়মুড়িয়ে ভেতরে ঢুকলো তিনজনেই । বেডের সাদা চাদরের উপর জ্ঞানহীন নিথর হয়ে পড়ে আছে তাদের ঘরের বেপরোয়া ছেলেটা । 

মুখে হাই-ফ্লো অক্সিজেন মাস্ক । পড়নে নিলচে একটা ঢিলেঢালা ফতুয়া মতো কিছু । বুকের কাছটা ফাঁকা । সেথায় চিপকে রাখা তার পেঁচানো পাঁচ-ছয়েক স্টিকার মতো কিছু পাতলা ইলেক্ট্রোড । বেডের পাশে দাঁড়িয়ে থেকে মাল্টি-প্যারা মনিটরটা হার্টবিট মাপছে যুবকের । 

বাম হাতের তর্জনীতে পালস অক্সিমিটার । 

জড়বুদ্ধ হয়ে পা টিপে টিপে এগোলেন সকলে । তিন জোড়া স্তম্ভিত দৃষ্টি অক্সিজেন মাস্ক ছাপিয়ে একসাথে চেয়ে দেখলো, ওভাবে নিস্পৃহ হয়ে শুয়ে থাকা যুবকটি আর কেউ নয় , তাদেরই বেপরোয়া রুডভিক কাবির রৌদ্র । 

তোফায়েল কাবির থমকে দাঁড়ান । এগোতে পারেন না আর । দৃষ্টি তার ঝাপসা হয়ে আসে ছেলের এমন অবস্থা দেখে । 

আদ্র হাঁটু ছেড়ে বেডের পাশে বসে । ভাইকে দেখে অবিশ্বাস লাগে । ঝিমঝিম করে ওঠে মাথা । চড়াও হয়ে মাহিরের দিকে তাকায় । তেড়ে এসে গলা চিপে বলে…..

” হু দ্যা হেল আর ইউ ? আমার ভাইয়ের এই অবস্থা হলো কি করে ? 

মাহিরের বিনয়ী উত্তর….

” বলেছিলাম ফোনে । মনে করুন । ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক । গত চৌত্রিশ ঘন্টা ধরে বস ওভাবেই জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়ে আছেন । 

” বস ? কিসের বস ও আপনাদের ? কি হচ্ছে এখানে এসব ? কারা আপনারা ? 

মাহির চোখ তোলে । সাবলীল ভাবে উত্তর করে…

” বস তিনি আমাদের । জুরিখের নাম্বার ওয়ান বিজনেস ইন্ডাস্ট্রির সিইও তিনি । আপনার ভাই, জানেন না এসব ? 

একটু খোঁচা মেরে কথাটা বলে মাহির । আদ্র বুঝে পায় না কিছু । এখন এসব বোঝার ও পরিস্থিতি নয় । মেঘার কথা মনে আসতেই আঁতকে ওঠে । 

” মেঘ ? মেঘ কোথায় ? 

মাহির দৃষ্টি নত করে আবার । চোখ বুজে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করে ভার বুকে । 

” ম্যামের খোঁজ নেই । আর তার বিরহেই বসের এই অবস্থা । ছয় তারিখ সন্ধার পর থেকেই ইভারা ম্যাম নিখোঁজ । জুরিখ ছাপিয়ে গোটা সুইজারল্যান্ড জুড়ে চিরুনি তল্লাশি চালানোর পরও এখনো অবধি ম্যামের কোনো খবর মেলেনি । একটা লাশ পাওয়া গেছিলো । কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে তিনি ইভারা ম্যাম নন । দুর্ভাগ্যক্রমে ম্যামের অক্ষত বা ক্ষতবিক্ষত, কোনো খবরই পাইনি এখনও অবধি । ম্যাম আর বসের মধ্যে একটা মিস্ আন্ডারস্ট্যান্ডিং ক্রিয়েট হয়েছিলো । এটাই সবকিছুর মূলে । 

এবারে আদ্র পিছিয়ে গেলো । তীব্র যন্ত্রণা অনুভব হলো বুকে । নিমিষেই যুবকের চোখ হতে পানি গড়ালো ঝড়ঝড়িয়ে । ফুঁপিয়ে উঠলো মেঘার কথা ভাবতে গিয়ে…

“ মেঘ । কি হয়েছে ওর ? ওর কিচ্ছু হতে পারে না । কিচ্ছু না । 

মাহির গলা নামিয়ে বলে আবার….

” বসের অবস্থা ভালো না । ডক্টর বলেছেন, আটচল্লিশ থেকে বাহাত্তর ঘন্টার মধ্যে জ্ঞান না ফিরলে , হি মে গো ইনটু অ্যা কোমা । আটচল্লিশ ঘন্টার মধ্যে চৌত্রিশ ঘন্টা পেরিয়ে গেছে অলরেডি । আপনারা তার ফ্যামিলি, আপনাদের জানানো টা খুব প্রয়োজন ছিলো । তাই জানিয়েছি । 

,,,,,

বাড়িতে আজ জোহান আর সারা ব্যাতীত কেউ নেই । জোহানের মা ওর মামার বাড়িতে গেছেন একটু । রাত হয়ে গেছে । ফিরবেন না আজ আর । 

বাড়ির সব স্টাফদেরও ছুটি । রাতের রান্না বসিয়েছে সারা । জোহান কতবার বললো বাইরে থেকে অর্ডার করে খাবে, কিংবা ডিনারের জন্য দুটোতে মিলে বাইরে কোথাও বেরোবে  ! কিন্তু না, ঐ মেয়ে শুনলো না । লেগে পড়লো রান্না করতে । জোহান ও আর বাঁধা দেয় নি । তবে কিচেনে ঢুকেছে থেকে সারাকে জ্বালাতন করছে সে । বাগড়া দিচ্ছে সব কাজে । ক্ষণে ক্ষণে জড়িয়ে ধরছে, পানি ছুড়ছে গায়ে, নয়তো চুলা অফ করে দিচ্ছে, নানান ভাবে মেয়েটার কাজে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে লোকটা । 

এবারে চতুর্থ বারের মতো মুখের উপর ফোঁটা কয়েক পানি ছিটিয়ে দিতেই বিব্রত হলো সারা । কোমরে এক হাত ঠেসে খুন্তি দেখিয়ে রেগে বললো…

” এই লোক, আপনার কাজ কাম নেই ? বড্ড জ্বালাতন করছেন তখন থেকে ! রান্না করছি, দেখছেন তো নাকি ? 

কেবিনেটে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে লোকটা । রমনীর কথায় বরাবরের মতো ওষ্ঠ প্রসারিত করলো চমৎকার ভাবে । বললো সহজ কন্ঠে…..

” দেখছি তো ! আর কাজ কাম নেই কে বললো ? বউকে জ্বালাতন করাও একটা কাজ , বুঝলেন ম্যাডাম ? 

আপনি এতোটাই আদুরে, আদর করার পাশাপাশি আপনাকে জ্বালাতন করতেও ভীষণ ভালো লাগে । 

সারা না চাইতেও হেসে ওঠে । 

” রান্না শেষ করে নিই আগে ‌। তারপর জ্বালাতন করবেন, এখন না ! এখন কাজ করতে দিন ‌। 

” রান্না শেষ করে নিন আগে । রান্না শেষ হলে আদর করবো । এখন জ্বালাতন করতে দিন । 

সারা ভ্যাবাচ্যাকা খায় । হাত বাড়িয়ে দুম করে একটা আঘাত বসায় যুবকের বাহুতে ‌। ভেংচি কেটে বলে…..

” মা নেই বাড়িতে । তাই আশকারা পেয়েছেন, তাই না ? 

” না তো । আমি মাকে ভয় পাই না । বউকে পাই । কারন বউ মারে আমায় । এই এক্ষুনি মারলো । ব্যাথা পেয়েছি কিন্তু, বলবো না কাউকে । 

সারা বাম ভ্রু উঁচিয়ে লোকটার নাটকীয়তা দেখে । লোকটা বড্ড অদ্ভুত । শব্দ করে হাসে মেয়েটা । হাত বাড়িয়ে লোকটার গোছানো চুল গুলি এলোমেলো করে দেয় । ফের মনযোগ ফেরায় রান্নায় । 

ওদের দুটোর খুনসুটির মাঝে লিভিং রুম থেকে ফোনের আওয়াজ শোনা যায় । সোফার উপর সারার ফোন বাজছে শব্দ তুলে । সারা বেরোতে গেলে জোহান বাঁধা দিলো…..

” ওয়েট, আমি নিয়ে আসছি । 

সে ফোন নিয়ে আসতেই শুধোয় রমনী…..

” কে ফোন করেছে ? 

” আমার শাশুড়ি মা । 

সারা খুন্তি নাড়তে নাড়তে বললো নরম গলায়…..

” রিসিভ করে কানে ধরুন আমার ! 

তাই করলো লোকটা । ফোনটা রিসিভ করে রমনীর কানে চেপে ধরলো । মেয়েটাকে আলগোছে জড়িয়ে নিলো পেছন থেকে । কাঁধে থুতনি ঠেকিয়ে কান খাড়া করলো ফোনের দিকে । 

সারা টুকটাক কথা বলে তার মায়ের সাথে । রেহানা শিকদার কেমন ইতস্তত হয়ে কথা বলছেন । সারা তার কুন্ঠিত কন্ঠ বুঝতে পেরে শুধোয়…..

” কি হয়েছে আম্মু ? এভাবে কথা বলছো কেনো ? 

রেহানা শিকদার চুপ থাকলেন না আর । 

শ্বাস টেনে গড়গড় করে বলে দিলেন মেঘা আর রৌদ্রের বিষয়টা । মেঘার নিখোঁজের খবর শুনে স্তম্ভিত হয় রমনী । জোহান নড়েচড়ে ওঠে । ফোন রেখে সারা কে ফেরায় নিজের দিকে । 

” সারা,,, 

জড়বুদ্ধ রমনীর মস্তিষ্ক সজাগ হয় । সবটা বোধগম্য হয় তার । অমনি ছলছলে দৃষ্টি সমেত ফিকড়ে ওঠে । আতঙ্কে দুহাতে খামচে ধরে লোকটার উদরের দুপাশ । কেঁদে ওঠে ভয়ে । আওড়ায় জোহান….

” এই সারা,,, পাগল, কাঁদছেন কেনো ? 

মেঘা আপনার বান্ধবী, তাই তো ? খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না তাকে ? এই মেয়ে, তাকান আমার দিকে ! 

সারা চোখে চোখ তোলে । কেঁপে কেঁপে উচ্চারণ করে…..

” মেঘা,,, মেঘা আমার বেস্ট ফ্রেন্ড । ওকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না তিন দিন ধরে । রৌদ্র ভাইয়ার হার্ট অ্যাটাক এসেছে……

” হ্যাঁ হ্যাঁ,,, শুনেছি আমি ! ডোন্ট ক্রাই প্লিজ । কিচ্ছু হবে না আপনার ফ্রেন্ডের । খুঁজে পাওয়া যাবে তাকে । আপনি শান্ত হোন সারা । প্লিজ রিল্যাক্স…..

জোহান আলগোছে রমনী কে চেপে ধরলো বুকের সাথে । 

,,,,,,, 

গোটা কেবিন জুড়ে লন্ডভন্ড তান্ডব চালাচ্ছে বেপরোয়া যুবক । টানা ছাপ্পান্ন ঘন্টা পর সবে মাত্র জ্ঞান ফিরেছে তার । দেহে বল নেই । অসার প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ । 

তবুও উন্মাদ সে । পাগল সে । তাকে বেরোতে দেওয়া হচ্ছে না কেবিন থেকে । ডক্টর’রা আটকাতে পারেননি । একজন ডাক্তার আর একজন ওয়ার্ড বয়কে ক্রোধের বশে আঘাত করেছে রৌদ্র । ওয়ার্ড বয়ের মাথাতে গুরুত্বর চোট লেগেছে । 

এবারে গার্ডসহ আদ্র আর শুভ্র চেপে ধরেছে বেপরোয়া যুবককে । তবুও তারা রুখতে পারছে না । দূর্বল শরীরে দানবীয় শক্তি পেয়েছে যুবক । গলা চিরে আর্তনাদ করছে । ফেঁপে উঠেছে তার সর্বাঙ্গের শিরা উপশিরা । রক্ত বর্ন ধারন করেছে সর্বশরীর । 

চোখ ছাপিয়ে অঝোরে পানি ঝরছে নিয়ন্ত্রণ হীন । 

মাহির নেই আশেপাশে । রৌদ্র চাতকের ন্যায় খুঁজছে তাকে ‌। আদ্র ধরে রেখেছে ওকে । রৌদ্র ওর পানে চেয়ে গলা কাঁপিয়ে বিরতি হীন চিৎকার করে বলতে লাগলো…..

” আমাকে ছাড় আদ্র । আমি আমার ইভারার কাছে যাবো । ওকে খুঁজতে হবে । ও অপেক্ষা করছে আমার জন্য । মাহির কোথায় বল ? ও আমার ইভারা কে খুঁজে পায়নি ? তোরা, তোরা এখানে কেনো ? শুভ্র ব্রো, তোমরা কখন এসেছো ? কোথায় আমি ? কতক্ষন পেরিয়েছে, কটা বাজে ? ঘুমিয়ে ছিলাম তো আমি । ঘুম ভেঙ্গে গেছে আমার ? ইভারাকে পাওয়া যায় নি তবুও ? হ্যাঁ ? আমার ইভারা কোথায় ? আদ্র,,, প্লিজ ছাড় আমায় । আমাকে যেতে হবে ! 

আদ্র ওকে বেডে বসিয়ে কাঁধ চেপে ধরে । 

” রুডি,,, ভাই রিল্যাক্স প্লিজ । তোর কন্ডিশন ভালো না । এতো হাইপার হলে ক্ষতি হয়ে যাবে তোর । মেঘ আছে । প্লিজ তুই শান্ত হ ‌। 

রৌদ্রের মুখখানা চিকচিক করে উঠলো । ভরা চোখ সমেত হেসে উঠলো সে…..

” আছে ? কোথায় আছে আমার ইভারা ? আমি যাবো ওর কাছে । কোথায় ও ? তোরা খুঁজে পেয়েছিস ওকে ? 

আদ্র স্থির হয় । এবারে কি উত্তর করবে সে ?

জড়তা গিলে ঠোঁট ভেজায় জিভে । পেছনে তোফায়েল কাবির দাঁড়িয়ে পাথরের মতো । হতবুদ্ধ তিনি । ছেলের পাগলামো অবাক লোচনে দেখছেন । শান্তনা দেওয়ার ভাষা নেই । 

আদ্র ভাইয়ের চোখ মুছিয়ে দিয়ে বাচ্চা বোঝানোর মতো করে বলে…..

” রুডি,,, কাম ডাউন ভাই । এই দেখ, আমরা সবাই এসেছি । চেয়ে দেখ, আব্বু ও এসেছে । তুই তো অসুস্থ, না ? একটু সুস্থ হ । তারপর আমরা সবাই মিলে মেঘের কাছে যাবো ! 

” অসুস্থ,, কিসের অসুস্থ আমি ? আমি একদম ঠিক আছি ? আমার ইভারা কোথায় ? ওর কাছে এক্ষুনি যাবো আমি ! ছাড় আমায় । মাহির কোথায় ? 

আদ্র কে ঠেলে ফের উঠে দাঁড়ায় রৌদ্র । সে সব বুঝতে পারছে । সবাই বেইমানি করছে ওর সাথে । ইভারা কে পাওয়া যায় নি । সে আর থামবে না । 

ডক্টর ইশারা দেন, এই মুহূর্তে রৌদ্র কে থামানোর একটাই উপায় আছে । ওয়ার্ড বয়রা ইশারা পেতেই তেড়ে আসলেন । শক্ত হাতে রৌদ্র কে চেপে ধরলেন জন পাঁচেক । শক্তি খাটিয়ে যুবক কে টেনে হিচড়ে বেডে ঠেসে ধরা হয় । আদ্র দেখতে পারে না । ফিরিয়ে নেয় দৃষ্টি । ছটফট করে রৌদ্র । চিৎকার করে নিজেকে ছাড়াতে চায় । মস্তিষ্ক ছিঁড়ে যাচ্ছে তার । 

ওকে দমানোর জন্য ইনজেক্ট করা হবে । জোরপূর্বক খোয়ানো হবে জ্ঞান । 

তোফায়েল কাবির এসব দেখতে পারলেন না । দাঁতে দাঁত চেপে এ বেলায় হুংকার ছাড়লেন । 

” ডক্টর,,, ছাড়ুন ওকে ! 

তাৎক্ষণিক থমকে যান সকলে ‌। 

রৌদ্র নেতিয়ে পড়েছে ততক্ষণে । পাঁচ জনের বিপরীতে টেকা দায় । সে দূর্বল । এতো জোর নেই শরীরে । আর কত সইবে দেহ ? 

সবাই ছাড়লো তাকে । তবুও বেপরোয়া যুবক শুয়েই রইলো । ঘাড় কাত করে নিষ্ক্রিয় ভেজা চোখে তাকালো বাপের কন্ঠ অনুসরণ করে । আদ্রের পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন ভদ্রলোক । রৌদ্রের সাথে চোখাচোখি হয় । 

বহু বছর পর বাপের চোখে চোখ রাখে তার বেপরোয়া, ছন্নছাড়া সন্তান । যে সন্তান তার দিকে ভুলক্রমে ফিরেও চায়নি বছরের পর বছর । আজ চেয়েছে কৃতজ্ঞ হয়ে । দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলতেই সবাইকে তাজ্জব বানিয়ে ঠোঁট কামড়ে ডেকেও উঠলো বহু কষ্টে…..

” ড্যাড……

🛑 রৌদ্রের খেল খতম । এবার ইয়াশের পালা । ওয়েট মেঘার ভাইয়া, পরবর্তী পর্বে আপনার প্রশান্তি নষ্ট করতে আসছি আমি । আপনার পিরিত সহ্য হচ্ছে না 🥱। 

এই পাঠক,, আপনারা ইয়াশের পরিনতি দেখার জন্য প্রস্তুত হোন । খুব শীঘ্রই সায়ান জড়িত হবে এসবে । একটা ধামাকা আসছে । আপনারা খালি রেসপন্স করুন 👻 । 🛑

চলবে……..

সবার আগে গল্প পেতে অবশ্যই পেজটি ফলো দিয়ে রাখুন

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply