#আসবো_ফিরে_আবারো
#পর্ব_৮৯
#সুরভী_আক্তার
★
গোধূলি লগ্নে খোলা বারান্দায় একা একা স্থির হয়ে বসে আছে বেপরোয়া যুবক । তাহার নির্লিপ্ত দৃষ্টি দূর আসমানের পানে । হীম শীতল বাতাস বইছে ধরনীতে । পশ্চিম দিগন্ত কমলা বর্ন ধারন করেছে । মেঘ মিলিয়ে যাচ্ছে সেথায় । পাখির কিচিরমিচিরের সুরেলা শব্দ কানে পড়ছে । বেশ ভালোই লাগছে শুনতে ।
ব্যালকনিতে যুবক বসে রয়েছে পুরো নিস্তব্ধ হয়ে । ফুল স্লিভের ঢিলেঢালা একখানা টি শার্ট পড়নে । মাথায় চুলগুলো গোছানো সুন্দর ভাবে । মিহি বাতাসে ঢেউ খাচ্ছে বোধহয় । চাহনি অনুভূতি হীন নিশ্চল তার ।
আকস্মিক বাচ্চার কান্নার আওয়াজ কানে ঠেকলো । অমনি হকচকিয়ে ঘাড় ঘোরালো যুবক । নয় মাসের একটা বাচ্চাকে কোলে নিয়ে রৌদ্রের ঘরে ঢোকে আদ্র । মুখে চিন্তার ছাপ । পেছনে হন্তদন্ত শিশির । বাচ্চার কান্নার শব্দে তড়িঘড়ি করে হুইলচেয়ারের চাকা ঘোরায় রৌদ্র । বারান্দা পেরিয়ে ঘরে ঢোকার আগেই আদ্রের উপস্থিতি বারান্দায় । রৌদ্র কে দেখে ফোঁস করে শ্বাস ফেললো সে । বাচ্চা কে থামাতে না পেরে বললো অসহায় কন্ঠে….
” ভাইই দেখনা,,, #আদ্রিজা থামছে না কিছুতেই । কেঁদেই চলেছে সেই তখন থেকে । আমি পারছি না । তোর ভাইয়ের মেয়েকে সামলা তুই ।
রৌদ্রের বিচলিত মুখাবয়ব । তড়িঘড়ি করে হাত বাড়িয়ে আদ্রের কোল থেকে আদ্রিজাকে টেনে নিজের কোলে নিলো সে । মিশিয়ে নিলো বুকের সাথে । বললো না কিছু । আদ্রিজা কি বুঝলো কে জানে । রৌদ্রের কোলের ঘ্রাণ ভালো মতোই চেনে পুঁচকে ছানাটা । সেকেন্ড কয়েকের মাথায় কান্নার বেগ কমে আসলো বাচ্চাটার । ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে রৌদ্রের গলা জড়িয়ে ধরলো ছোট্ট ছোট্ট দুহাতে । গুলুমুলু বাচ্চাটা লাল হয়ে গেছে কাঁদতে কাঁদতে ।
রৌদ্র কিছুটা বিরক্ত হয়ে আদ্রের দিকে তাকায় । ওর চাহনির অর্থ বুঝে তাৎক্ষণিক হাত নাড়ায় আদ্র…..
” আমি কিছু করিনি,, ও কেনো কাঁদছিলো কে জানে ? শিশির ও থামাতে পারছিলো না । দেখ, কত দুষ্টু হয়েছে । তোর কোলে যেতে না যেতেই কেমন চুপ করে গেলো । কি আছে তোর কোলে ? বাপ মায়ের থেকে বাবাই আপন হলো ওর ?
আদ্রের কথাতে বিরক্তি গিলে খানিক হাসলো রৌদ্র ।
আদ্রিজাকে কোলে বসিয়ে কপালে চুমু খেলো । কান্না ছেড়ে এখন চুপ করে গেছে সে । রৌদ্রের কোল পেলেই হলো তার । ওটুকু বাচ্চা কি বোঝে কে জানে ? আদ্র, শিশির, সবার থেকে রৌদ্র কেই আপন মানে । রৌদ্রের কাছেই পড়ে রয় অধিক সময় ।
রৌদ্র ওর জবজবে ভেজা মুখটা দুহাতের তালুতে মুছিয়ে দিলো । ফের চুমু খেলো কপালে । আদুরে হয়ে আধো আধো বুলি আওড়ালো বাচ্চাটা…..
” বাব্বা…. বাব্বা…..
ডাকে সাড়া দিয়ে উপর নিচ মাথা নাড়ায় রৌদ্র । জবানে কথা নেই । কথা ফোটেনি বহু বছর । আজ চারটা বছর কাটছে এভাবে নিশ্চুপ থেকে । সে কথা বলে না । তার জবান থেকে শব্দ শোনা অভাবনীয় এখন ।
এর মাঝে কতকি হয়ে গেলো । এগারো মাস পর কোমা থেকে ফিরে আসার পরেও আজ তিন বছর পেরিয়েছে । মোটে চার বছরের অধিক সময় ।
এর মধ্যেই আদ্র আর শিশিরের ফুটফুটে এই বাবুটার জন্ম । আদ্রিজা নাম । সেই নামটাও রৌদ্র রেখেছে । মুখে বলে নয়, খাতায় লিখে ।
সে অচল । কোমা থেকে ফেরার পর একবার মুখ খুলেছিলো শুধু । তারপর থেকে আজ অবধি আর কথা বলেনি । নিজ পায়ে চলতেও পারে না । হুইলচেয়ার এখন তার চলার সঙ্গী । পায়ে কোনো স্প্রেইন বা ফ্র্যাকচার নেই । তবুও অবশ পা দুটো । মাসের পর মাস নিথর থাকার দরুন প্রথম প্রথম অচল ছিলো । পরে অচলই রয়ে গেছে ।
বেপরোয়া যুবক আর কখনো হাঁটার চেষ্টা করেনি । নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে এসবেই ।
ডক্টর স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, রৌদ্রের পায়ে কোনো সমস্যা নেই । সে চাইলেই হাঁটতে পারবে । কিন্তু সে চায় না । কেনো চায় না তা কেউ জানে না ।
যে আজ পর্যন্ত কথাই বলেনি কারোর সাথে, তার ভেতরকার কথা জানবে কি করে সবাই ?
এতো গুলো বছর কেটেছে, রৌদ্র স্বাভাবিক হয়নি তবুও । হাসেও না । কেবল আদ্রিজা আর রামিশা ব্যাতিত কারোর দিকে ঠিকমতো তাকায় ও না ।
এই এখন আদ্রিজাকে জড়িয়ে নিয়ে শান্ত হয়ে বসে আছে । শিশির পেছন থেকে বাচ্চা মেয়েটার কান্ড দেখে মুচকি হাসলো । এতক্ষণ কেঁদে কেটে হয়রান হচ্ছিলো । আদ্র ঠিক বুঝতে পেরেছে, সে রৌদ্রের কাছে আসতে চায় । এখন যেইনা আসলো, দেখো কেমন চুপ করে গেছে ! দুদিকে মাথা নাড়ায় শিশির । আদ্র রৌদ্রের পেছনে গিয়ে হুইলচেয়ারের হ্যান্ডেল চেপে সামনে ঠেলে নিতে নিতে বলে….
” রুডি,,, বাইরে চল । কথা আছে একটা ।
নিচ তলার একটা রুমে থাকে রৌদ্র । আদ্র ওকে লিভিং রুমে নিয়ে আসলো । সবাই উপস্থিত সেখানে । সন্ধ্যার সময় সবার জন্য চা করে নিয়ে আসলো মেহের । বললো রৌদ্রের উদ্দেশ্যে…..
” ভাইয়া, কফি দেবো তোমায় ?
না বোধক মাথা নাড়ায় যুবক ।
আদ্র রৌদ্রের থেকে আদ্রিজাকে নিতে গেলো । বাচ্চাটার এক হাত ধরতেই চিৎকার জুড়ে কেঁদে দিলো অমনি । থতমত খায় আদ্র । দ্রুত পিছিয়ে আসে…..
” আরে মা, নিচ্ছি না আমি তোমায় । বাপের থেকে বাবাইয়ের উপর দরদ বেশি । কি জ্বালা । থাকো বাবাইয়ের কাছে । আমি আর নেবোই না তোমায় ।
ঠোঁট ঠেলে মৃদু হাসে বেপরোয়া যুবক । আদ্রিজার মাথায় আলগোছে হাত বুলিয়ে দেয় ।
সোফার এককোণে তোফায়েল কাবির বসে । তিনি ছেলেকে দীর্ঘ পলকে দেখে নিলেন । এতো দিনে রৌদ্র শুকিয়েছে অনেকটা । আগের মতো সেই শক্ত খোলসটা নেই তার । সবসময় ঘরবন্দি হয়ে থাকতে থাকতে শরীর খানাও ফ্যাকাশে হয়েছে । বেশি ফর্সা দেখায় আগের তুলনায় ।
আরো কতকিছুই পরিবর্তন এসেছে তার ছেলের । ছেলেকে এভাবে দেখলেই বুক চিরে শ্বাস পড়ে তার । আদ্র বলে বসতে বসতে…..
” আব্বু,,, অনেক দিন হলো কোথাও যাওয়া হয় না । একটা ফ্যামিলি ট্যুর দিলে কেমন হয় এবার ? আগস্ট মাস চলছে । আজ পঁচিশ তারিখ । ঊনত্রিশ আগস্ট জন্মদিন আমার আর রুডির । কতদিন সেলিব্রেট করা হয় না । জন্মদিনের আগে বাইরে কোথাও যাই ? ভালো হবে না ? সবাই মিলে যাবো !
রুবিনা কাবির রৌদ্রের দিকে তাকান । ঢোক গিলে ছটফট করে বলেন….
” হ্যাঁ,,, যাবো । রৌদ্র যাবে ।
রৌদ্র কে জিজ্ঞেস কর । ও যেখানে যেতে চায়, সেখানে যাবো আমরা । কতদিন বাইরে কোথাও যাওয়া হয় না ।
শুভ্র হাতের ফোন রেখে রৌদ্রের কাছে আসলো ।
ঠোঁট কামড়ে একটু আহ্লাদ করে আদ্রিজার এক হাত ছুঁতেই বাচ্চা টা আবারো চেঁচিয়ে উঠলো । ফিক করে হাসলেন সবাই ।
শুভ্র হাসি টুকু গিলে সামনে বসে বলে…..
” রুডি,, কোথায় যাবি ভাই ? ফ্যামিলি ট্যুর দেবো একটা । সব কাজ বাদ । এবার আমরা সবাই মিলে ঘুরতে যাবো । আমিও এটাই ভাবছিলাম কদিন ধরে । তুই বল, কোথায় গেলে ভালো হয় । দেশের বাইরে কোথাও যাবি ঘুরতে ?
মুখ শুকিয়ে চোখ নামালো রৌদ্র ।
ও ইদানিং কথা বলে না । তবে ওর নীরব মুখাবয়বের ভাষা গুলো বুঝে নিতে শিখে গেছে সবাই ।
শুভ্র বুঝলো । আবার বললো….
” আচ্ছা,, তাহলে দেশের ভেতরে কোথায় যাবো ? কোথায় যাবি বল ? তোর ইচ্ছে অনুযায়িই ঘুরতে যাবো । আমরা অনেক আগে একবার পাহাড়ে যেতে চেয়েছিলাম । যাবি পাহাড়ে ?
রৌদ্রের কাছ থেকে কোনো প্রকাশভঙ্গি দেখা গেলো না । শুভ্র বললো আবার…..
” তাহলে সমুদ্রে যাই ? যাবি সেখানে ?
রৌদ্রের ভেতরটা হীম হয় । ওষ্ঠপূটে প্রতিক্রিয়া দেখা যায় । উঠে দাঁড়ায় আদ্র…..
” তাহলে কক্সবাজার ফাইনাল ।
আমি আজকেই টিকেট বুক করছি । কাল বাদ পরশু রওনা দেবো । আমাদের তেত্রিশ তম জন্মদিন টা ওখানেই সেলিব্রেট করবো । সবাই খুশি তো ?
আম্মু, মনি, মেহের, শিশির, প্যাকিং করা শুরু করে দাও । পরশু আমরা কক্সবাজার যাচ্ছি সবাই মিলে । বহুদিন বাদ সব ভুলে আনন্দ করবো ।
আমি রুডির প্যাকিং করছি গিয়ে । চল রুডি, রুমে চল ।
ফের হুইলচেয়ারের হ্যান্ডেল ঠেলে সিঁড়ির পাশের ঘরটায় ঢুকলো আদ্র । রুবিনা কাবির বুক চিরে দীর্ঘ শ্বাস ফেলেন । চোখের পানি চোখেই আটকে বলেন হতাশ হয়ে….
” আমার ছেলেটা কি আর কোনদিন সুস্থ, স্বাভাবিক হবে না ? এভাবেই থাকবে সারাজীবন ? আমার চঞ্চল, সবল ছেলেটা এমন হয়ে গেলো কেনো ? ওর মুখে মা ডাক শুনবো না আমি আর ? ওকে নিজ পায়ে হাঁটতে দেখবো না ? মা হয়ে এসব আর কতদিন সহ্য করতে হবে আমায় ? কমদিন তো কাটলো না । কবে স্বাভাবিক হবে আমার ছেলেটা ?
আঁচলে মুখ চেপে ধরলেন ভদ্রমহিলা ।
বাড়িটা এতো বছরেও এখনো স্বাভাবিক হয়নি । তবুও উপর উপর সবাই স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করেন ।
রুবিনা কাবিরের চাপা আহাজারিতে তোফায়েল কাবির উঠে দাঁড়ালেন । ধীরে ধীরে ধাপ ফেলে উঠে গেলেন ঘরে ।
প্যাকিংয়ের সময় আলমারি ঘাটতে গিয়ে একটা টাওয়েল খুঁজে পায় আদ্র । কিছু না ভেবেই সেটাকে ল্যাগেজে ঢোকাতে গেলে বিছানার পাশ থেকে ছটফট করে উঠলো রৌদ্র । হিসহিস আওয়াজ বের করতে লাগলো মুখ থেকে । আদ্র চমকায় । তড়িতে তাকায় । আদ্রিজা ঘুমিয়েছে রৌদ্রের বুকে । বেপরোয়া যুবক বসে থেকেই ছটফট করছে । ভড়কালো আদ্র, হাতের টাওয়েল টা সমেত এগিয়ে গেলো….
” রুডি,,, কি হলো ভাই ? এমন করছিস কেনো ? ঠিক আছিস তুই ?
সে তো বলবে না কিছু । এক হাতে আদ্রিজাকে ধরে রেখে অন্য হাত বাড়িয়ে ঝটকা মেরে ছিনিয়ে নিলো টাওয়েল টা । বুকে চেপে ধরলো সেটাকে । শ্বাস ফেলতে লাগলো ঘনঘন । বুঝলো না আদ্র । কপাল কুঁচকে শুধালো….
” এটা সাথে নিবি ?
মাথা ঝাঁকায় যুবক ।
” তাহলে দে । ল্যাগেজে রাখি এটাকে !
দিলো না সে । বরং বুকের মাঝে চেপে ধরলো আরো বেশি । আদ্র ওর দ্বিমত বুঝে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করলো না । ল্যাগেজ গুছিয়ে দিলো চুপচাপ । অতঃপর রৌদ্রকে বিছানায় তুলে ঘুমন্ত আদ্রিজাকে কোলে নিয়ে বেরিয়ে গেলো দরজা চাপিয়ে ।
রৌদ্র হাঁসফাঁস করে । টাওয়েল টা চেপে ধরে নাকে । উন্মাদের ন্যায় আচরন করে । ঘ্রাণ টানে বুক ভরে । সেকেন্ড কয়েকের মাথাতেই আবার শান্ত হয় সে । সাদা টাওয়েলে ঠোঁট ছুঁইয়ে মুচকি হাসে । ধীরে ধীরে ডান কাত হয়ে শোয় সেটাকে বুকে জড়িয়ে । ডান চোখের কার্নিশ ঘেঁষে পানি গড়িয়ে পড়ে আপনা আপনি ।
ঘরে এসে আদ্রিজাকে আলগোছে বিছানায় শুইয়ে দেয় আদ্র । শিশির পাশে বসেই বাচ্চার কাপড় ভাঁজ করছে । মলিন মুখে হাঁফ ছেড়ে বললো যুবক…..
” শিশির,,, আদ্রিজা কার মতো হয়েছে বলতো ?
” একদম আপনার মতো !
মেয়েটার তাৎক্ষণিক উত্তর ।
আদ্র তড়াক করে চায়…..
” কি করে ?
” আপনার মেয়ে, আপনার মতোই তো হবে । নাক উঁচু, গম্ভীর একটা বাচ্চা । যেমন বাপ, তেমন তার মেয়ে । নিজেরা যা বোঝে তাই ।
আদ্র গিয়ে শিশির কে টেনে দাঁড় করালো ।
” আমি গম্ভীর ?
” অবশ্যই ! গুরুগম্ভীর প্রফেসর আদ্রিয়ান কাবির আদ্র….
ওরফে আদ্র স্যার ।
” আমি গুরুগম্ভীর হলে তুমি কি ? আন রোমান্টিক কোথাকার । আমি মোটেও গুরুগম্ভীর নই । গুরুগম্ভীর হলে কি আর তোমার মতো আন রোমান্টিককে কবলে টেনে বাচ্চা জন্ম দিতে পারি ? ভাগ্যিস আমি রোমান্টিক । নয়তো দুজনের সংসার টা জলে যেতো ।
কারন তুমি একটা আন রোমান্টিক স্টুডেন্ট আমাইরা নূর শিশির ওরফে বেয়াদব ।
শিশির মুখ ফাঁক করে । ইনোসেন্ট ফেস বানিয়ে বলে…..
” আমি বেয়াদব ? বেয়াদব কেনো বলেন শুধু ? কি বেয়াদবি করেছি আমি আপনার সাথে ?
” করোনি ? বিয়ের রাতে আমাকে বাসর করতে দাওনি । সেটা বেয়াদবি নয় ?
থতমত খায় মেয়েটা ।
মুখে হাত রাখে । পরক্ষণে কেশে ওঠে । চোখ পাকিয়ে অপর হাতে মৃদু ধাক্কা দেয় যুবকের বুকে….
” অসভ্য ! আমি আপনার স্টুডেন্ট ছিলাম তখন । ওভাবে নাটক করে বিয়ে করতে কে বলেছিলো আপনাকে ? আর এমনিতেও,, বিয়ের আগ থেকেই আপনি আমাকে বেয়াদব বলেন ।
” তারও কারন আছে ।
” কি কারণ শুনি ?
” বিয়ের আগে আমার সাথে প্রেম করা উচিত ছিলো তোমার । প্রেম করোনি কেনো ? তাই তখন বেয়াদব বলতাম তোমায় !
আহম্মক হয় শিশির । কি আবোল তাবোল বকছে এই লোক ? অযৌক্তিক যুক্তি তার । ঠোঁট চেপে হাসছে মিটিমিটি । ওর এমন চাপা হাসি দেখে চোখ সরু করে খ্যাট খ্যাট করে বললো মেয়েটা….
” মাথা খারাপ হয়ে গেছে ? তখন টিচার ছিলেন আপনি আমার ? আর টিচার কিন্তু বাবার সমান হয় । বিয়ের আগে আপনাকে আমি বাবার চোখেই দেখতাম ।
বিশাল ঝটকা খেলো আদ্র ।
” আস্তাগফিরুল্লাহ । আমাকে বাবার চোখে দেখতে দেখতে নিজের সন্তানের বাবা ফেলেছো আমায় ? কি সাংঘাতিক তুমি । ভাগ্যিস নাটক করে বিয়েটা করেছি ।
শিশির ফিক করে হেসে ওঠে ।
আদ্র তাল মেলায় হাসিতে । মেয়েটাকে টেনে কাছে আনে । ঝুঁকে ডান গালে ঠোঁট বসিয়ে বলে হাস্কি টোনে….
” হেসো না বেয়াদব,, খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করে পুরো । আমার বাচ্চার মা হওয়ার পর আরো সাংঘাতিক লাগে তোমায় । ইশশ্,, এতো সুন্দর কেনো তুমি ? ইচ্ছে করে বুকের মাঝে চেপে ধরে সবসময় ভালোবাসি । ভালোবেসে পুরো শেষ করে দেই তোমায় !
লাজুক রমনী মাথা নামায় । পরক্ষণে চোখ তুলে চায় । চোখাচোখি হয় আদ্রের সাথে । মেয়েটা হাত উঁচিয়ে লোকটার চুলের ভাঁজে আঙ্গুল চালায় । অতঃপর শার্টের কলার গুছিয়ে দিতে দিতে বলে মিহি কন্ঠে…..
” বিয়ের অনেকদিন হলো স্যার,, মেয়ের বাবা হয়ে গেছেন অলরেডি । এবার একটু সংযত থাকুন । অসভ্য হয়ে যাচ্ছেন দিনকে দিন ।
” তোমার কাছে সভ্য ছিলাম কবে ? বিয়ের অনেক দিন হলো ভেজা বেড়াল,,, মেয়ের মা হয়ে গেছো । এবার অন্তত স্যার বলা ছাড়ো । আর একটু রোমান্টিক হও প্লিজ ।
মেয়েটা মুখ টিপে হাঁফ ছাড়ে । এই লোকের সাথে কথায় পারা যাবে না ।
★
মাঝে একদিন পেরিয়ে আজ কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে দীর্ঘ এক ঘন্টার জার্নি শেষে গন্তব্যে পৌঁছায় ওরা । ইনানি সৈকতের নিকটে সি পার্ল বিচ রিসোর্ট এন্ড স্পা নামক রিসর্টে ওঠে সবাই । আসতে আসতে দুপুর গড়িয়েছে অনেকটা । প্রায় বিকেল । সিরাত আর আহিয়ান ও এসেছে । ওদের বাচ্চাটার বয়স এখন পাঁচ বছর । রৌদ্রের জন্য মরিয়া সেও । রৌদ্র কে পেলে আর কিচ্ছু চাই না । কি পায় রৌদ্রের মাঝে কে জানে । বেপরোয়া যুবক কথাও বলে না,,, বোবা ছেলেটার মাঝে কি আছে ওরাই জানে কেবল ।
রিসোর্টে ছয়টা রুম নেওয়া হয়েছে মোটে । এসেই ফ্রেশ হয়ে নেন সবাই । অফ সিজন চলে এখন । হোটেল মোটামুটি ফাঁকা । এই সময়ে উপচেপড়া ভিড় থাকে না ।
ফ্রেশ হয়ে একসাথে লাঞ্চের জন্য বেরিয়েছে গোটা পরিবার । রৌদ্রের হুইলচেয়ার ঠেলে নিয়ে এগোচ্ছে আদ্র । ভাইয়ের কোলেই তার মেয়েটা মুখে দুই আঙ্গুল ঢুকিয়ে চুষছে । আর ছোট ছোট চোখে পিটপিট করে দেখছে এপাশ ওপাশ ।
কাশবা রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাওয়া দাওয়া হলো সবার । খাওয়ার পালা শেষ হতে হতেই বিকেল ঝিমিয়ে পড়েছে অনেকটা । সন্ধ্যা নামবে ঘন্টার মধ্যেই । আজ আর ঘোরাঘুরি হবে না । পরশু ওদের দুই ভাইয়ের জন্মদিন । চারদিনের ট্যুরে এসেছে সবাই । আজ বাদ গেলেও হাতে আরো গোটা তিনটে দিন থাকবে ।
কাল বিচে বেরোনো যাবে । এমনিতেও রিসর্টের বারান্দায় দাঁড়ালে গোটা বিচের দৃশ্য নজরবন্দি হয়ে যায় । দমকা হাওয়া লাগে শরীরে ।
লবিতে রেস্টুরেন্ট । খাওয়া শেষে যে যার ঘরে যাবে । দোতলায় দুটো, এবং তিন তলায় চারটে রুম নেওয়া হয়েছে । দোতলার দুটো আদ্র আর রৌদ্রের ।
লিফটের দিকে এগোনোর আগেই হ্যন্ড রিমে চাপ দিয়ে হুইলচেয়ার থামিয়ে দেয় রৌদ্র । আদ্র থমকায় । শুধোয় পেছন থেকে….
” রুডি,,, কি হলো ?
একটু এগিয়ে সামনেই দাঁড়িয়েছেন বাকিরা । চকিতে পেছন ফিরলেন । তোফায়েল কাবির পিছনে হটে ছেলেকে প্রশ্ন করেন…..
” রৌদ্র,,, কি হয়েছে বাবা ?
জবান ফুটিয়ে উত্তর তার থেকে পাওয়া যাবে না । ছেলের নীরব ভাষা বুঝে আবার বললেন ভদ্রলোক…..
” রুমে যাবে না এখন ?
আলগোছে না বোধক মাথা ঝাঁকায় যুবক ।
” বুঝেছি,,, বিচে যাবে ?
আজ তো আসলাম । রেস্ট করো আজ । খাওয়ার পর বিশ্রাম প্রয়োজন । কাল বেরোবো সবাই মিলে ।
যুবক অনড় । আদ্র বলে অবস্থা বুঝে…
” আচ্ছা,, আমরা বিচ থেকে ঘুরে আসছি একবার । ভাইয়া, যাবে তুমি ?
শুভ্রর উদ্দেশ্যে প্রশ্ন । অতঃপর উত্তর শুভ্রর…..
” তোরা যা । সবে খেলাম । রেস্ট করবো একটু ।
” শিশির,,, তুমি চলো । আদ্রিজা আছে । আমরা চারজন ঘুরে আসি গিয়ে ।
বাকিরা যে যার ঘরে গেলেও ওরা চারজন বেরোলো রিসর্টের বাইরে । একদম নিকটেই বিচ ।
পড়ন্ত বিকেল । জলধির কল্লোলে মুখোরিত সমুদ্র তট । হুড়হুড়ে বাতাস বইছে । ভেঙে ভেঙে শুভ্র ফেনা তুলে ঢেউ আছড়ে পড়ছে তীরের বালুচরে ।
দিবাকর তখন অর্ধ ডুবন্ত । লালচে আভা পশ্চিম দিগন্তে ক্ষয়ে ক্ষয়ে মিশে যাচ্ছে গগনে । মিঠে কমলা রংয়ের ছোপ সেপাশে । বিকেলের সোনা ঝরা রোদ ম্লান হচ্ছে আস্তে ধীরে । তট থেকে মনে হয়, যেনো বিশাল সমুদ্রের ওধারে বোধহয় ধীরে ধীরে নিমজ্জিত হচ্ছে সূর্যি । দরিয়ার জলে ঝিলমিল করছে সূর্যরশ্মি ।
সৈকতে ভিড় নেই তেমন । অফ সিজনে ভ্রমন পিপাসু কম । এই অপরাহ্নে আরো নিস্তব্ধ গোটা তট । কেবলই ঢেউ ভাঙ্গার গর্জন শোনা যাচ্ছে ।
গুটি কয়েক মানুষ নিজেদের মতো হাঁটা হাঁটি করছেন এখানে ওখানে ।
হুইলচেয়ার ঠেলে ধীর গতিতে এগোচ্ছে আদ্র । ভীষণ বাতাসের ঝাপটায় শরীর হীম হয়ে গেছে এর মধ্যেই । পাশেই শিশির । রৌদ্রের কোলে আদ্রিজা ।
চারজনই নীবর । নীরবতা ভেঙে হাঁটার মাঝে মুখ খোলে শিশির….
” আমি না এর আগে সমুদ্র দেখিনি কখনো । এই প্রথম আসলাম । থ্যাংক ইউ রৌদ্র ভাইয়া । আপনার বদৌলতে আমিও আসতে পারলাম । এডভান্স হ্যাপি বার্থডে ভাইয়া ।
আদ্র মুখ কুঁচকে আওড়ায়….
” শুধু রৌদ্র কে উইশ করছো,,, আর আমি ? আমি কি দোষ করলাম ?
আদ্রের কথায় মুচকি হাসে বেপরোয়া যুবক ।
শিশির বলে…..
” এখনো অনেক দেরি আছে । জন্ম দিনের আগে আপনাকে উইশ করলেই হলো ।
” তো জন্মদিনের আগে রুডি কে উইশ করার কি আছে ?
” করেছি তো কি হয়েছে ?
” আমাকেও করো !
শিশির দুদিকে মাথা নাড়িয়ে ফোঁস করে শ্বাস ফেললো । কথা বাড়ালো না এই লোকের সাথে । বাতাস ভীষণ এখানে । আদ্রিজার পড়নে পাতলা কাপড় । ভারী কাপড় নেই । ঠান্ডা লেগে যাবে বাচ্চাটার ।
সে বললো সামনে গিয়ে….
” ভাইয়া,, ওকে আমার কাছে দিন এখন । বাতাস ভীষণ । ঠান্ডা লাগতে পারে । আমি ওরনা দিয়ে পেঁচিয়ে নিচ্ছি ।
শিশির হাত বাড়িয়ে মেয়েকে কোলে নেয় । ছোট্ট শরীরটা পেঁচিয়ে নেয় ওরনার তলে ।
একপাশে দাঁড়ালো ওরা । একটু দূরে ডাব বিক্রি হচ্ছে । আদ্র সেদিকে নজর বুলিয়ে শুধালো ভাইকে…..
” রুডি ,,, ডাব খাবি ?
রৌদ্রও তাকালো এক ঝলক । হ্যাঁ বোধক সম্মতি দিলো ।
” আচ্ছা ওয়েট,,, এখানে থাক । আমি নিয়ে আসছি । শিশির, তুমিও থাকো এখানে ।
আদ্রের কথা শেষ হওয়া মাত্রই হাত উঁচায় রৌদ্র । ইশারা দেয় শিশির কে সাথে নেওয়ার জন্য । সে একটু একা থাকতে চায় ।
আদ্র অনুমান করলো ওর ইঙ্গিত টুকু । নীরবে শ্বাস ফেললো….
” ওকে,, তুই বস । আমরা আসছি….
রৌদ্র কে একলা রেখেই প্রস্থান করলো ওরা ।
রৌদ্রের থেকে কিছুটা দূরে ডাব ভর্তি ভ্যান । আদ্র সেখান থেকে রৌদ্রের দিকে দৃষ্টিপাত করে ।
স্থবির যুবক এক দৃষ্টিতে সমুদ্রের পানে চেয়ে আছে ।
বেলাতট হতে অনেকটা দূরে তার হুইলচেয়ার । সেথায় বসে বেপরোয়া যুবক । দৃষ্টি একস্থির অসীম সাগরে ।
ধ্যান নেই কোনো খানে । শূন্য ঘোরে মগ্ন সে । আদ্র ভাইকে দেখে বুক ফুলিয়ে শ্বাস ফেলে । বাদাম বিক্রি হচ্ছে পাশেই । শিশিরের জন্য এক ঠোঙা বাদাম কিনলো যুবক । ডাব কাটা হলেই নিয়ে আসবে ।
এদিকে রৌদ্র নিগুড় লোচনে চেয়ে আছে অদূরে । যেনো কোনো ঘোরে মগ্ন । বাতাসের ঝাপটায় ঠান্ডাও লাগছে । তবুও ধ্যানে বুদ সে । দৃষ্টিতে পলক পড়ছে বহুক্ষণ বাদ বাদ । আকস্মিক ঘোর ভাঙলো বেপরোয়া যুবকের । কানে বাজলো রিনরিনে এক স্বর । অদূর হতে ভেসে আসছে মেয়েলি কন্ঠ,, হুট করেই গলা ছেড়ে গান ধরেছে কেউ….
“ ওরা মনের গোপন চেনে না,,,
ওরা হৃদয়ের রং জানে না ।
প্রজাপতি ডানা ছুঁলো, বিবাহ বাসরে…
কেনো সারারাত জেগে, বাড়ি ফিরি ভোরে ।
ওরা মনের গোপন চেনে না,,,
ওরা হৃদয়ের রং জানে না ।
যুবক হকচকিয়ে যায় । কারোর এমন কন্ঠ কানে ভেসে আসতেই ছলকে ওঠে তার অন্তরাত্মা । তড়াক করে ঘাড় ঘোরায় সে । শান্ত, স্থির যুবক অস্থির হয়ে উঠলো নিমিষেই । এপাশ ওপাশ নজর বোলালো আকস্মিক উদগ্রীবতায় । কন্ঠের মালকিন চোখে পড়ে না । ধক্ করে ওঠে যুবক । ঠান্ডা বাতাসে ভেসে আসা এমন নারী কন্ঠে শরীর শিউরে যায় তার । ব্যস্ত হয়ে পড়ে সে । হাত পা খিচে নেয় । খুবলে ধরে হুইলচেয়ারের হাতল ।
কল্লোলে কল্লোলে একটু থেমে আবার ভেসে আসে একই স্বরে গানের বাকি লাইন….
“ তুমি চিরদিন, ভীষণ কঠিন ।
তোমার ঘর ভেসে যায়, ওরা মুখ দেখে বুঝতে পারে না.. (২)
ওরা এমন কেমন বোঝে না, ওরা আসল কারণ খোঁজে না ।
আরো বেশি ছটফট করে উঠলো যুবক । বসে থেকেই কাঁপতে লাগলো থরথর করে । ধড়ফড়িয়ে এপাশ ওপাশ তাকিয়ে কন্ঠের মালকিন কে খুঁজতে লাগলো মরিয়া হয়ে । কেউ নেই । কোথা থেকে আসছে এই গানের সুর ?
এই সুরে যুবকের মাথা চিরে যাচ্ছে বোধহয় । মগজে গিয়ে আঘাত হানছে ।
রৌদ্র ব্যাকুল হয়ে ফুটরেস্ট থেকে পা নামায় তটের বালুতে । থরথর করে কাঁপে হাঁটু । বুক ধড়ফড় করে । শ্বাস টানতে লাগে ঘনঘন । একহাতে চেপে ধরে বুক । অদ্ভুত শিথিল যন্ত্রণা হচ্ছে তার । দূর থেকে ভাইয়ের এমন অবস্থা নজরে পড়া মাত্রই হাতের দুটো ডাব ফেলে ছুট্টে আসে আদ্র । হুড়মুড়িয়ে রৌদ্রের সামনে বসে । ভাইয়ের কম্পিত দু-হাত চেপে ধরে শক্ত করে ।
” রুডি,,, কি হয়েছে ভাই ? এমন করছিস কেনো ? অসুবিধা হচ্ছে,,, শ্বাস কষ্ট হচ্ছে আবার ?
রৌদ্র উদগ্রীব । হাঁসফাঁস করে শ্বাস ফেলছে । কানে আর কোনো গান বাজছে না । বোধহয় পরিচিত কন্ঠটা হারিয়ে আকস্মিক থেমে গেছে । রৌদ্র ঘেমে গেছে এই দমকা হাওয়াতেও । চোখ লাল তার । চিকচিক করছে আঁখি কার্নিশ । আদ্র বুঝলো রৌদ্রের অবস্থা । হুটহাট এমন প্যানিক আসে রৌদ্রের ।
সে থামালো ভাইকে । মোলায়েম কন্ঠে শান্তনা দিলো….
” ভাই,,, কাম ডাউন,,, রিল্যাক্স । কিচ্ছু হয়নি । এই দেখ আমি আছি । আমরা সমুদ্রের তীরে,,, কেউ নেই এখানে । শান্ত হ ।
রৌদ্র অস্পষ্টে আওড়ায় জবান ফুটিয়ে…..
” আ…আদ্র,,,,, আ…..আমার ইভারা ! ওওওও….ঐ গান…..
আঁতকে ওঠে আদ্র । রৌদ্রের হ্যালুসিনেশন হচ্ছে আবার । হ্যালুসিনেশনের সময় ব্যাতীত ওর মুখে টু শব্দেও কথা শোনা যায় না । হ্যালুসিনেশন হতে হতেই প্যানিক অ্যাটাক আসে তার । দিকবিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে বিভ্রান্ত হয়ে যায় যুবক । ভড়কালো আদ্র । ছটফট করে দুহাতে জাপটে ধরলো ভাইকে ।
” না ভাই,, কিচ্ছু হয় নি । কেউ নেই এখানে । চোখ বন্ধ কর তুই । আমি আছি তোর সাথে । কিছু হয়নি রুডি । রিল্যাক্স প্লিজ…..
রৌদ্র চোখ খিচে নেয় । শরীরের শিরা উপশিরা ফুলে উঠেছে তার । রক্তিম হয়ে উঠেছে সর্বাঙ্গ । রক্তচাপ বেড়েছে । আকস্মিকই মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে যন্ত্রণায় ।
হাঁসফাঁস করতে করতে এক পর্যায়ে নিস্তেজ হলো যুবক । নেতিয়ে পড়লো শরীর । ঘন শ্বাস কমে আসলো । নাকের কাছে উষ্ণ ভেজা ভেজা কিছু অনুভব হলো সে ।
শিশির পেছনেই ছিলো । গলা ভিজিয়ে বললো থেমে থেমে….
” আদ্র স্যার,,,, রক্ত…..
আদ্র তড়িতে রৌদ্রকে ছাড়ে । সামনাসামনি তুলে ধরে ভাইয়ের মুখ । রৌদ্রের নাক হতে ফোঁটা কয়েক রক্তের ধারা নেমেছে । সন্ধ্যার ঝিমিয়ে যাওয়া আলোতে তা দেখে ধক্ করে ওঠে যুবক । তড়িঘড়ি করে ভাইয়ের নাক মুছিয়ে দেয় । ঢোক গিলে বলে….
” রুডি,,, রিসোর্টে যাবো এখন, হ্যাঁ ? আর থাকবো না এখানে । চল….
দূর্বল রৌদ্রকে সামলে নিয়ে হুইলচেয়ার ঠেলে উল্টো পথে ফিরলো ওরা । তবুও বাক্য ভেঙে থেমে থেমে আওড়ালো বেপরোয়া যুবক……
” ও,,, গান,,, গাইছিলো…..
শিশির শুনতে পায় । কপাল গুটায় শ্যামলিনী ।
রিসোর্টে ফিরেই দুটো ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়েছে যুবক । এই গত বছর গুলোতে এমন একটা দিন যায় নি,, যেদিন সে ঘুমের ওষুধ না খেয়ে ঘুমিয়েছে ।
স্লিপিং পিল না নিলে ঘুমোতে পারে না সে । ওকে ভালোভাবে সামলে রেখে রুমে যায় আদ্র । রৌদ্র না ঘুমানো অবধি সবাই ছিলো তার রুমে ।
শিশির আধশোয়া হয়ে আদ্রিজা কে ঘুম পাড়াচ্ছে । আদ্র ঘরে ঢুকতেই তড়িঘড়ি করে উঠে বসলো মেয়েটা । বিচলিত হয়ে বললো…..
” স্যার,,, একটা কথা ছিলো ।
বিছানার একপাশে বসে ব্যাক বোর্ডে মাথা কাত করে ঠান্ডা হয়ে বলে যুবক…..
” বলো ।
” রৌদ্র ভাইয়া তখন কি বলছিলো, শুনেছেন আপনি ?
” হ্যালুসিনেশন হয়েছিল আবার !
” না,, ভাইয়া গানের কথা বলছিলো । কেউ গান গাইছিলো তখন । শোনেননি আপনি ? ভাইয়া শুনেছে । এটা হ্যালুসিনেশন ছিলো না । আমিও গান শুনেছি ।
ঝট করে মাথা তোলে যুবক । কপালে বিস্তর ভাঁজ ফেলে বলে…..
” মানে ?
ঘুরে এসে আদ্রের কাছে বসলো মেয়েটা । উপর নিচ মাথা দোলালো । মুখখানা বিচলিত তার । ঠোঁট ভিজিয়ে বললো….
” হ্যাঁ । তখন বিচে কেউ গান গাইছিলো । শুনেছি আমি । দেখেছিও….
” কি দেখেছো ?
ছটফট প্রশ্ন । পাল্টা উত্তর তৎক্ষণাৎ….
” অতোটা গুরুত্ব দিয়ে লক্ষ্য করিনি । তবে একটা মেয়ে গান গাইছিলো, এটুকুই দেখেছি শুধু । শাড়ি পড়ে ছিলো মেবি । মাথায় আঁচল টানা ছিলো । দেখতে পাইনি সেভাবে । গাওয়ার মাঝে হুট করে কেউ একজন ডেকে নিয়ে গেছে । আমিও আর লক্ষ্য করে দেখিনি ।
আদ্র বুঝে পায় না ।
গায়ে মাখে না খুব একটা ।
” রিল্যাক্স শিশির,,, উদ্ভট ধারনা করো না তুমিও ।
” এটা উদ্ভট নয় । সত্যিই ছিলো ।
” হতে পারে । হয়তো কেউ গান গাইছিলো । তো ?
” ভাইয়া ওভাবে রিয়াক্ট করলো কেনো তাহলে ?
আদ্র শ্বাস ফেলে । মেয়েটার চিন্তিত মুখাবয়ব দেখে মৃদু হাসে । গালে হাত রেখে বলে…..
” এতো দিন রুডিকে দেখে এসেছো এই অবস্থায়,,, তবুও জিজ্ঞেস করছো এই রিয়াক্টের কারন ?
চোখ নামিয়ে নেয় শ্যামলিনী । ভেজা ভেজা স্বরে শুধোয়…..
” স্যার,,, মেঘা সত্যিই হারিয়ে গেছে ? ফিরবে না কখনো ?
আদ্রের কাছে উত্তর নেই ।
সে কেবলই দম ফেললো বুক ফুলিয়ে ।
,,,,,,
আজ আর রিসোর্ট থেকে বেরোয়নি রৌদ্র ।
সারাটা দিন ঘরেই আছে । এখন বিকেল । ওর কাছে আছেন রুবিনা কাবির । তোফায়েল কাবির ও সকাল থেকে ছেলের ঘরেই আছেন । বাকিরা টুকটাক বেরিয়েছিলো বাইরে ।
শুভ্র, মেহের সকালে না বেরোলেও দুপুরের দিকে দু’জনে বিচের দিকে বেরিয়েছে । এখন বিকেল । আদ্র আর শিশির উঠেছে ছাদে । টুকটাক সেলিব্রেশন করা হবে কাল । ছাদটা উপযুক্ত সেলিব্রেশনের জন্য ।
শুভ্র আর মেহের হোটেলে ফিরলো সাঁড়ে পাঁচটার দিকে । তবে ওরা একলা ফিরলো না । গেছিলো দুজন । ফিরে আসলো তিনজন হয়ে ।
সাথে শুভ্রর কোলে ফুটফুটে একটা বাচ্চা মেয়ে । কি ভীষণ সুন্দর । আহম্মক হয়ে বাচ্চা টাকে নিয়ে ফিরে আসলো ওরা দুটোতে । নিজেরা কি করবে না করবে, এই ভেবে সময় নষ্ট না করে সোজা একঘরে জড়ো হলো । তৌসিফ কাবিরের রুমে গেলো দু’জনে । কড়া নেড়ে ঢুকলো ঘরে ।
ভদ্রলোক তখন চোখ বুজে খাটের ব্যাক বোর্ডে হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে আছেন । তাকালেন না প্রথমেই । তার ধ্যান ভাঙলো শাহিনা কাবিরের হতচকিত স্বরে…
” শুভ্র,,, এটা কে তোদের সাথে ?
শুভ্র মেহেরের দিকে তাকায় এক পলক । অতঃপর মিনমিন করে…
” জানি না আম্মু ।
হকচকিয়ে যান তৌসিফ কাবির নিজেও । ব্যস্ত হয়ে উঠে বসেন । কাঁদো কাঁদো বাচ্চাটাকে দেখে নেন । বলেন অবাক হয়ে…..
” কার বাচ্চা এটা ? তোমাদের সাথে কেনো ?
” কার বাচ্চা তা তো জানি না আব্বু । আমরা তো ওকে বিচের কাছে পেলাম । কাঁদছিলো একা একা । হারিয়ে গেছে বোধহয় ।
” কি বলছিস টা কি ? কার না কার বাচ্চা,,, হারিয়ে গেছে মানে ? আর তোরা ওকে এভাবে নিজের সাথে তুলে আনলি কেনো ? ঝামেলায় ফেসে যাস যদি ?
বাচ্চাটা ক্ষণে ক্ষণে ফিকড়ে উঠছে । কাঁধ ছুঁই ছুঁই বেবি চুলগুলোতে দুটো ঝুটি বাঁধা । পড়নে বেবি পিংক রঙের ফ্রক । পায়ে বালু লেগে আছে । সেভাবেই ওকে কোলে নিয়েছে শুভ্র ।
অচেনা মানুষের ভিড় আর উঁচু স্বরে বাচ্চাটা চোখ ডলে আবারো ফিকড়ে উঠলো আদুরে হয়ে । শব্দ করে কেঁদে উঠলো ঠোঁট ভেঙে ।
তাৎক্ষণিক ওকে টেনে নিজের কোলে নেয় মেহের । কেমন কেঁপে ওঠে সেও । সেতো মা হতে পারে নি এখনো । মাতৃত্ব বোধে বুকটা হু হু করে উঠলো মেয়েটার । বুকের সাথে চেপে ধরলো ছোট্ট ছানা টাকে……
” কি হয়েছে মাম্মা,,,, কাঁদছো কেনো ? আমরা আছি তো । কিচ্ছু হবে না তোমার । কেউ কিছু বলবে না ।
মা,,, ধীরে কথা বলো প্লিজ । ও ভয় পাচ্ছে । দেখো না কত কিউট একটা বাচ্চা । এখনো ছোট । ঠিকমতো কথাও বলতে পারে না । বিচের দিকে কেঁদে কেঁদে ঘুরে বেড়াচ্ছিলো একা একা । হারিয়ে গেছে বোধহয় । আমরা ওকে নিয়ে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছি ওখানে । কাউকে পেলাম না । ও কিছু বলতেও পারছে না । কি করতাম বলো তো ? সাথে নিয়ে এসেছি তাই !
শাহিনা কাবিরের উদ্দেশ্যে শেষের কথা গুলো ।
ভদ্রমহিলা চুপসে যান । বাচ্চাটার কান্নার বেগ বাড়ে । ঝাই ধরে কাঁদতে শুরু করে এবারে । ভড়কে যায় মেহের ।
আদ্র আর শিশির নামছিলো ছাদ থেকে । করিডোর হতে এ ঘরে বাচ্চার কান্নার শব্দ শুনে তড়িঘড়ি করে আসলো ওরা ।
সবাই হতভম্ব । কার বাচ্চা কে জানে । কান্নাও থামছে না । লাল হয়ে গেছে কাঁদতে কাঁদতে ।
কি বুঝলেন সুইটহার্ট’স
? কেমন লাগলো
? রেসপন্স তুলে দেবেন ঝটপট । বাকিটা পরের পর্বে বুঝতে পারবেন । 
চলবে………
#আসবো_ফিরে_আবারো
#বোনাস_পর্ব
#সুরভী_আক্তার
শেষমেষ সবে মিলে দোতলায় নামলো ওরা । ঢুকলো রৌদ্রের ঘরে । সেখানে তোফায়েল কাবির, রুবিনা কাবির আগে থেকেই উপস্থিত । সিরাত,, আহিয়ান সহ একজোট হলো সবে ।
বাচ্চাটার নামও জানা হয়নি । কান্না জুড়েছে, আর থামছে না । ঘর তোলপাড় । পড়েছে শোরগোল ।
পরিবারের সবার মাঝে জানাজানি হলো । বাচ্চাটা নিখোঁজ হয়েছে সমুদ্রের তীরে ।
রৌদ্র ব্যালকনিতে বসে ছিলো নিশ্চুপ হয়ে । কান্না আর চেঁচামেচি শুনে চাকা ঘুরিয়ে সেও ঘরে আসলো ।
মেহেরের কোল থেকে শুভ্র, অতঃপর আদ্র, সিরাত, শিশির, আহিয়ান, শাহিনা কাবির, কেউই বাচ্চাটাকে থামাতে পারছে না ।
ঘরে যেনো তোলপাড় শুরু হয়েছে । রৌদ্রের কপাল গুটিয়ে আসে এসবের মধ্যে । বিষ্মিত হয়ে চেয়ে দেখে সে । বাচ্চাটার মুখ দেখা যাচ্ছে না । এখন সে শুভ্রর কোলে । কাঁধে মুখ লুকিয়ে কাঁদছে ।
তোফায়েল কাবির শুধালেন…
” কার বাচ্চা কে জানে ! কাঁদছে, থামছেও না । কি করবে এখন একে নিয়ে ? থামাও আগে ।
শুভ্র হয়রান । বাচ্চাটাও নাজেহাল । বাকিরা ব্যাকুল ।
আকস্মিক আদ্রের নজর রৌদ্রের দিকে পড়ে । অবুঝের মতো বসে আছে বেপরোয়া যুবক । চট করে মাথায় বুদ্ধি আসলো । তড়িতে বললো আদ্র….
” শুভ্র ভাইয়া,,, ওকে রুডির কাছে দাও একবার । দিয়ে দেখো,, রুডি সামলাতে পারবে । যদি চুপ করে যায়, দাও রুডির কাছে ।
চকিতে রৌদ্রের দিকে তাকান সকলে ।
শুভ্র হতচকিত হয়ে এগিয়ে আসে । রৌদ্রের প্রতিক্রিয়া নেই । ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে । বাচ্চাটার কান্নার সাথে সাথে তার বুক খানা মোচড় দিয়ে উঠছে কেমন ।
সে ব্যাকুল হয়ে পড়লো হঠাৎ । শুভ্র বাচ্চাটাকে নামিয়ে দেওয়ার আগেই হুইলচেয়ারে বসে থেকেই দুহাত বাড়িয়ে ছোট্ট ছানা টাকে কোলে টেনে নিলো যুবক । মিশিয়ে নিলো বুকের সাথে । বাচ্চাটা দম ছেড়ে কাঁদছে । লাল হয়ে গেছে গোটা শরীর । রৌদ্র ছটফট করে ওঠে । আলতো করে জড়িয়ে মেয়েটার পিঠে আলগোছে হাত বোলায় । তবুও কান্না থামছে না ।
রৌদ্র ওকে মুখোমুখি করলো এবার । ক্রন্দনরত মুখখানা দেখে ভেতর থেকে আঁতকে উঠলো বেপরোয়া যুবক । আজলে ছোট্ট মুখখানি ধরে আকস্মিকই ডাকলো অস্ফুটে….
” মা…..
তার মুখে কথা শুনে ছলকে ওঠেন উপস্থিত সবাই ।
ধড়ফড়িয়ে ওঠে রুবিনা কাবিরের মাতৃ হৃদয় । অবিশ্বাসে রৌদ্রের দিকে তাকান সকলে ।
ছোট্ট ডাকটুকু শুনে কোলের শিশুটা চোখ খোলে । ফিকড়ে ওঠে । ওষ্ঠ উল্টানো । ভিজে জবজবে মুখ । পিট পিট করে সে রৌদ্রের দিকে তাকায় । চোখাচোখি হয় তাতেই । ভেতর কাঁপে রৌদ্রের । বাচ্চাটার চোখে মুখে নোনা জল দেখে উদ্বিগ্ন লাগে । হে তড়িঘড়ি করে দুহাতের আজলে শিশুটার মুখ মুছিয়ে দেয় ।
অদ্ভুত ভাবে গাল, কপালে চুমু খেয়ে ঠান্ডা হয়ে আওড়ায় থেমে থেমে…..
” কাঁদে না মা । কষ্ট হয় তো ।
পূণরায় ছ্যাত করে ওঠেন বাড়ির সবাই ।
বাচ্চাটা কান্নার শব্দ থামালেও ফোপাচ্ছে এখনো । একই ভাবে চেয়ে রয়েছে রৌদ্রের দিকে । একটু যেনো আশ্বস্ত হলো তার বাচ্চা হৃদয় । ফিকড়ে উঠে বুলি ফুটালো রৌদ্রের উদ্দেশ্যে….
” মা….মাম্মা !!
আদ্র ঝট করে বসে । শুধোয়…..
” মাম্মার কাছে যাবে ? কোথায় তোমার মাম্মা ?
মেয়েটা ভয় পেলো । সিটিয়ে গেলো রৌদ্রের কোলে । উঁচু হয়ে গলা জড়িয়ে ধরলো । যুবক স্তব্ধ পুরো । হীম হয় তার বক্ষস্থল । অদ্ভুত রহস্যময় অনুভূতি জাগে তার ।
সে বাচ্চা টাকে জড়িয়ে নেয় । কান্না চেপে যুবকের কানের কাছে ফিসফিস করে বাচ্চাটা….
” মাম্মা দাবো আমি….
ভড়কে যায় রৌদ্র । হাঁসফাঁস করে তড়িঘড়ি করে ওকে আলগা করে বুক থেকে । পুরো মুখে হাত বোলায় । নজর বোলায় বিচলিত হয়ে ।
কেমন চেনা ঘ্রাণ, অদ্ভুত টান অনুভব হয় । সে শুষ্ক ঢোক গেলে । উদগ্রীব হয়ে ছোট্ট ছানা টার পুরো মুখ জুড়ে চুমু খায় । বলে গলা ভিজিয়ে…..
” হ্যাঁ,, যাবে তো মাই প্রিন্সেস । মাম্মা এসে যাবে তোমার কাছে । ডোন্ট ক্রাই…..
ছেলের মুখে পরপর তিন বার কথা শুনে রুবিনা কাবিরের চোখ থেকে পানি ঝরে এ পর্যায়ে ।
আদ্র, শুভ্র ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে হাসে অপ্রস্তুত । সিরাত এগিয়ে যায়,, আওড়ায় অবিশ্বাসে…..
” রৌদ্র,,, কথা বলছিস তুই ?
রৌদ্রের উত্তর নেই । সে কোলের বাচ্চা টাকে পরখ করে চোখ ভরে । গোটা মুখশ্রী দেখে নেয় । আকস্মিকই অস্থির হয়ে ওঠে সে । মুখখানি কেমন আদুরে,, বড্ড চেনা মনে হলো । মনে হলো সে আগেও দেখেছে একে !
এক পর্যায়ে নজরে পড়লো,, বাচ্চাটার নাকের ডগার ছোট্ট তিল টায় । তুলতুলে ফর্সা ত্বকে চিকচিক করে জ্বলছে ।
রৌদ্র গা দুলিয়ে হেসে উঠলো শব্দ করে…..
” আপু,,, আমার ইভারা….
রৌদ্রের হাঁসফাঁস অবস্থা দেখে বেগতিক কিছু হওয়ার আগেই আদ্র ডেকে ওঠে কথার মাঝে….
” রুডি,,,
” আদ্র,, আদ্র জানিস ? আমার ইভারার নাকের ডগাতে তিল আছে ! এই দেখ, এর নাকের ডগাতেও তিল । ঠিক এক জায়গায় । একদম আমার ইভারার মতো । লুক লাইক মাই সুইটহার্ট ।
অস্বাভাবিক ভাবে হাসে রৌদ্র । আদ্র পেছন ফিরে সবাইকে দেখে নেয় । অতঃপর ভাইয়ের কাঁধে হাত রাখে…..
” রুডি,,,, কাম ডাউন ভাই ।
যুবকের উদ্বিগ্ন অবস্থা । সে স্থির হলো না…..
” না,,, দেখনা তুই । ও আমার ইভারার মতো ।
আপু, তুমি দেখো । ওকে চেনা লাগে না ? কে ও ?
রৌদ্রের অবস্থা আরো বেশি বিচলিত হলে প্যানিক অ্যাটাক আসবে । আদ্র ঝটপট করে ভাইকে সামলায়…..
” রুডি,,, ভাই ওকে আমার বিচের কাছে পেয়েছি । শুভ্র ভাইয়া খুঁজে পেয়েছে ওকে । হারিয়ে গেছে বাচ্চাটা । ওর পরিচয় জানি না । প্লিজ হ্যালুসিনেশন করিস না । শান্ত থাক একটু । আমরা সবাই আছি এখানে ।
রৌদ্রের মুখখানা আহত হয়ে আসে ।
আদ্র পরক্ষনেই কথা ঘোরাতে বাচ্চা টাকে শুধোয় নম্রভাবে….
” তোমার নাম কি ?
বাচ্চাটা গুটিয়ে যায় । কাঁদো কাঁদো হয়ে রৌদ্রের দিকে তাকায় । সেখানে উত্তর দেয় টান দিয়ে…..
” রোশশশশ্…..
” আমার দিকে তাকিয়ে বলো । তোমার নাম রোশ ? পুরো নাম কি ?
হাত ধরতে গেলে চেঁচিয়ে উঠলো । কুঁকড়ে গেলো আরো বেশি । আদ্র ছাড়ে ওকে । ভয় পেয়ে আছে এখনো । এতক্ষণ ভয়ের চোটে কথা বলেনি । এখন বোধহয় ভয় কেটেছে একটু ।
লম্বা শ্বাস ফেলল আদ্র । না থেমে শুধালো আবার….
” মাম্মা,,, আমার দিকে তাকাও ? এই দেখো,, আমি আঙ্কেল তোমার ! আঙ্কেল কে বলো,, তুমি কোথায় থাকো ? মাম্মা পাপা আছে তোমার ? মাম্মা কোথায় ? মাম্মার কাছে আমরা নিয়ে যাবো তোমায় । আচ্ছা বলো, তোমার পাপার নাম কি ?
সে তাকালো ছোট ছোট চোখে । বুঝলো না বোধহয় ।
” পাপপা ?
” হ্যাঁ ! তোমার পাপা ? নাম কি তার ?
” রোশশ্,, পাপপা নেই ! মাম্মা আতে….
অস্পষ্ট কথাটার অর্থ ঠিকভাবে বুঝতে পারে না কেউ । মেহের এগিয়ে যায় । কোমর বাঁকিয়ে ঝুঁকে শুধোয় মোলায়েম কন্ঠে…..
” তোমার বাড়ি কোথায় জানো ? এখানে এসেছো কি করে ?
ছোট্ট বাচ্চা । বয়স হবে তিন অথবা সাড়ে তিনের মধ্যে । একেই ভয়ে জুবুথুবু । এতো প্রশ্নের মারপ্যাঁচ বোঝে নাকি ? কাউকেই চিনতে পারছে না এখানে ।
কেবলই চেয়ে রয়েছে পিটপিট করে । বলতে পারছে না কিছু । আদ্র আর মেহের কে দেখে নিয়ে তড়াক করে রৌদ্রের দিকে তাকালো । বাচ্চা সুলভে ফিক করে হেসে উঠলো এতক্ষণে । রৌদ্র সহ সবাই অবাক হয় । শুভ্র শুধোয় কাছে গিয়ে….
” হাসছো কেনো মা ? বাড়ি যাবে না ? মাম্মার কাছে যাবে না ?
বাচ্চাটার হাসি গায়েব হয় ক্ষনিকেই ।
ওষ্ঠ উল্টায় আদুরে হয়ে । রৌদ্রের টি শার্টের কলারের কাছের একাংশ টেনে ধরে । কাঁদো কাঁদো হয়ে নাক টেনে বলে….
” মাম্মার কাতে দাবো….
রোশশশশ্ হাংরি ! মাম্মা দাবো আমি ।
সে গাল ফুলিয়ে জেদ ধরলো ।
রৌদ্র অবাক লোচনে চেয়ে দেখে । কি অদ্ভুত,, এই অচেনা বাচ্চা টাকে এতো আপন লাগছে কেনো তার ? চেনা ঠেকছে কেনো মুখখানি ? বুক খানা ক্ষণে ক্ষণে কাঁপছে, আবার হীম হয়ে আসছে । এ কেমন অনুভূতি হচ্ছে হঠাৎ ?
ক্ষিদে পেয়েছে বাচ্চাটার । মেহের ওকে আলগোছে কোলে নেয় রৌদ্রের থেকে । শুভ্রর উদ্দেশ্যে বলে….
” ওর খিদে পেয়েছে । নিচে গিয়ে ওর খাবারের ব্যবস্থা করে নিয়ে এসো না একটু । আর কতক্ষন না খেয়ে থাকবে এভাবে ?
তড়িঘড়ি করে ঘর ছাড়লো শুভ্র ।
দুই কর্তা এখনো তাজ্জব । তোফায়েল কাবির বললেন আদ্রের উদ্দেশ্যে…..
” আদ্র,, ওকে যেখানে পাওয়া গেছে আহিয়ান সহ সেখানে যাও আরেকবার । ঝামেলা না বাঁধিয়ে খোঁজ করো । অনেকক্ষণ হলো । না জানি কার বাচ্চা ! তারাও চিন্তায় আছেন নিশ্চয়ই । এ তো কিছু বলতেও পারছে না । ছোট বাচ্চা, কিই বা বুঝবে ? দেখে তো ভালো ফ্যামিলির মনে হচ্ছে । নিশ্চয়ই কোনো টুরিস্টের বেবি । ঝামেলা তৈরি হতে পারে এই নিয়ে । তোমরা যাও,,, আগে খোঁজ করো গিয়ে । পরে বাকিটা ভাবা যাবে….
আদেশ মোতাবেক আদ্র আর আহিয়ান বাইরে বেরিয়ে যায় খোঁজ করার জন্য ।
বাচ্চাটা থেমেছে খানিক । মেহেরের কোলে স্বস্তি পেয়ে কাঁধে মাথা এলিয়েছে । মুখ গোল করে বাচ্চা সুলভে কিছু অস্পষ্ট শব্দ বের করছে ।
বিকেলের পর সন্ধ্যা, অতঃপর রাত্রি গড়ায় ।
এখন বাজে সাড়ে আটটা প্রায় । সবে রাতে ডিনার সেরে রুমে উঠলেন সবাই । চিন্তাতে খাবার নামেনি গলা দিয়ে । কোনো রকমে ঠুকরে ঠুকরে ঘরে উঠলেন প্রত্যেকে । তিন তলায় শুভ্রর রুমে সবার উপস্থিতি । বিছানার উপর রামিসা খেলছে রোশকে সাথে নিয়ে । সাথে আদ্রিজাও আছে । বসতে পারে বাচ্চাটা । হাতে একটা টয়েস নিয়ে রামিসা আর রোশের দিকে তাকিয়ে আছে সে ।
নিখোঁজ বাচ্চাটা তখনের পর আর কাঁদেনি । খোঁজ ও মেলেনি কোনো । আদ্র, শুভ্র,আহিয়ান, ওরা গোটা বিচ সহ আশেপাশে সবার কাছে খোঁজ করেছে । কিন্তু কোনো সংকেত পাওয়া যায় নি । এই আশেপাশে কোনো বাচ্চা হারালে এতক্ষণে তোলপাড় হওয়ার কথা । তেমন কিছুই হচ্ছে না । ওপাশ থেকে সাড়া পাওয়া না গেলে এপাশ থেকে একলা খোঁজ করে লাভ কি ?
বাচ্চাটাও কিছু বলতে পারছে না । খেলছে এখন ।
নীরব হয়ে সবাই চেয়ে রয়েছে ।
শুভ্র নীরবতা ভেঙে মুখ খুললো…..
” আব্বু,, কি করবো এখন ? তিন চার ঘন্টা হয়ে গেলো ও আমাদের কাছে আছে । খোঁজ পাচ্ছি না তো কোনো । হোটেল ম্যানেজমেন্ট কে জানাবো এবার ? যদি পরে ঝামেলা হয় ?
তপ্ত শ্বাস ফেললেন তৌসিফ কাবির ।
” নিচে যাও । রিসোর্টের প্রোপ্রাইটরকে সব জানাও । আমরা স্থানীয় নই, হ্যান্ডেল করতে পারবো না এসব । তারা নিজেদের মতো করে হ্যান্ডেল করবেন সব । পুলিশ কেস ও হতে পারে ।
মেহের কিছুটা আঁতকে ওঠে…..
” বাবা,,, রোশশ্ আমাদের কাছে থাকনা একটু ! পুলিশ কেসের কি দরকার ? খোঁজ পাচ্ছি না যখন, তখন আমরা রেখে দেই ওকে ? প্লিজ বাবা….
স্ত্রীর কথায় তার দিকে আহত চোখে তাকায় শুভ্র । মেয়েটার মুখ মলিন । আঁখি কার্নিশ ভেজা । এই কয়েক ঘন্টা রোশ ওর কাছেই ছিলো । সে স্নেহের সহিত আগলে রেখেছিলো শিশুটাকে ।
মেহেরের ভেতরের উচাটন বুঝতে পারে সবাই । সে মা হতে পারে নি । একবার মিসক্যারেজ হওয়ার পর মা হওয়ার ক্ষমতা হারিয়েছে মেয়েটা । সম্ভবনা একেবারেই নেই, তা নয় । তবে এই এতো দিনে সে আর কনসিভ করতে পারেনি । পায়নি মাতৃসুখ । এই নিয়ে তার ভেতর পোড়ে । মা হতে চায়, কিন্তু পারে না । বাচ্চাদের দেখলে আদর করতে ইচ্ছে করে । মা ডাক শুনতে ইচ্ছে করে ।
রোশ কে দেখেও ভীষণ মায়া লাগছে । ফুটফুটে একটা বাচ্চা । মায়া লাগারই কথা ।
এর মধ্যেই সবাই জড়িয়ে গেছে ওর মায়ায় । মেহের বোধহয় একটু বেশি ।
শুভ্র নীরবে শ্বাস ফেলে । বসে স্ত্রীর পাশে । বলে নরম গলায়…..
” ও অন্য কারোর বাচ্চা, মেহের ! ওর ফ্যামিলি আছে । হয়তো তারা টেনশন করছেন বাচ্চা কে হারিয়ে । বোকা বোকা কথা বলছিস কেনো ? বলতে নেই এসব । হুহহ…?
কথা শেষ করে মাথা নাড়ালো স্ত্রীর ছলছল চোখের পানে চেয়ে । পরক্ষনেই উঠে দাঁড়ালো…..
” আব্বু,,, আমরা রিসোর্টার কে জানিয়ে আসছি । যতক্ষণ না কোনো খোঁজ পাওয়া যায়,, ততক্ষণ রোশ আমাদের কাছেই থাকবে । এবার একটু চিন্তা মুক্ত হও সবাই । কালকের দিনটা সেলিব্রেট করতে হবে তো ? রুডি আর আদ্রের জন্মদিন উপলক্ষে ।
হাসার চেষ্টা করলেন প্রত্যেকে ।
রুবিনা কাবির শুরু থেকেই থ বনে আছেন । কারোর কথায় কথা মেলাচ্ছেন না তিনি ।
এক ধ্যানে তাকিয়ে আছেন বাচ্চাটার দিকে । আদ্র, শুভ্র, আহিয়ান ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই ভদ্রমহিলা তোফায়েল কাবিরের কাছাকাছি আসলেন একটু । মুখ খুললেন চাপা গলায়…..
” বাচ্চাটাকে দেখছেন আপনি ? চেনা ঠেকছে না আপনার কাছে ?
তোফায়েল কাবির ভ্রু গুটিয়ে তাকান ।
” মানে ?
” আপনি নিজেই দেখুন,,, ওর মুখের আদল টা কেমন চেনা চেনা লাগছে । মনে হচ্ছে, মেঘার মুখের ছাপ ফুটেছে ওর চেহারায় ! রৌদ্র তখন বললো না ? আমি না লক্ষ্য করলাম খুব করে,,, আসলেই চেনা লাগছে !
” উফফফ,,, তুমিও শুরু করলে ?
” শুরু করতে চাইনি । কিন্তু আপনি নিজেই দেখুন ভালো করে । পরের বাচ্চাকে এতোটা আপন লাগবে কেনো বলুন তো ?
স্ত্রীর সন্দিহান কথাতে ভদ্রলোক বুক ফুলিয়ে দম ছাড়েন । দৃষ্টি গাঢ় করেন বাচ্চাটার উপর ।
নয়টা হতে হতেই রোজ ঘুমানোর অভ্যাস রৌদ্রের । সে ইতোমধ্যে স্লিপিং পিল নিয়ে ঘুমিয়েও পড়েছে বোধহয় ।
রিসোর্টের ওনারকে সব জানানো হলো এই রাতেই ।
,,,
আজ ঊনত্রিশ আগস্ট । সকাল সাতটা বেজে পঁয়তাল্লিশ মিনিট । সবার ঘুম ছুটেছে শুভ্রর ডাকে । সাড়ে সাতটার দিকে রিসোর্টের ম্যানেজার তার কাছে এসেছিলো । আশানুরূপ খবর দিয়ে গেলো একটা । বাচ্চাটার খোঁজ মিলেছে । পরিবার কে পাওয়া গেছে তার ।
এই রিসোর্টের পাশেই বেওয়াচ বিচ হোটেল এন্ড স্পা নামক আরেকটি রিসোর্ট আছে । মেরিন ড্রাইভ ধরে হাঁটার পথে মিনিট দশেকের দূরত্ব । খবর মিলেছে সেই হোটেল
ডরমেটরির কোনো স্টাফের বাচ্চা হারিয়েছে । রাতের দিকে মিসিং কমপ্লেইন ও করা হয়েছে ওপাশ থেকে ।
কানেকশন মিলিয়ে এই বাচ্চাটাই হয়তো তাদের । তবে পুরোপুরি নিশ্চিত নয় । নিজেদের বাচ্চাকে চিহ্নিত করার জন্য আসছেন তারা । মিনিট কয়েকের মধ্যেই চলে আসবেন ।
ম্যানেজার রোশকে নিয়ে লবিতে আসতে বলে বেরিয়ে গেছেন । রাতে বাচ্চাটা শুভ্র আর মেহেরের সাথে ছিলো । ঘুম থেকে উঠেছে সেই ভোর ছয়টায় । তারপর আর ঘুমোয় নি । মেহেরের সাথে মেতে খেলায় মত্ত ছিলো এতক্ষণ ।
শুভ্র যার যার ঘরে গিয়ে সবাইকে ডেকে তুললো ।
সময় সংকুলানে ফ্রেশ হওয়া হলো না কারোরই । ঘুম ঘুম চোখেই কাবির পরিবারের সবাই রিসোর্টের নিচে নামলেন । রৌদ্র কেও নেওয়া হয়েছে সাথে । বেপরোয়া যুবক ঘুম থেকে উঠেছে সেই ভোরে । রুবিনা কাবির ছিলেন তার সাথে । জন্মদিন আজ তার ছেলেদের । ঘুম থেকে উঠতে না সবার আগে ছেলেকা শুভেচ্ছা জানিয়েছেন ভদ্রমহিলা ।
এই সকালে লবিতে ব্রেকফাস্ট করতে নেমেছেন সবাই । এদিক ওদিক গুটি কয়েক মানুষের চলাচল । রিসোর্টের সব স্টাফরাও উপস্থিত এক জায়গায় ।
রিসেপশনের কাছেই গোটা পরিবার হাজির । অপেক্ষায় তারা । তবে কেউ আসছে না এখনো । রোশ আছে শুভ্রর কোলে ।
কাল থেকে রৌদ্র আর বাচ্চাটার দিকে তাকায় নি । তাকালেই অদ্ভুত লাগে । সে নিজেকে সামলে নিয়েছে । এখন মাথা নত করে চুপচাপ হুইলচেয়ারে বসে আছে ।
সবার উদগ্রীবতার মাঝেই হুট করে রিসেপশনের দিকে ছুটে আসলো কেউ । একটা মেয়ে বোধহয় । বোরকা পড়নে তার । পেছনে আরো কয়েকজন ।
মেয়েটা জোর তালে পা চালিয়ে সোজা দৌড়ে গেলো শুভ্রর দিকে । কিছু বুঝে ওঠার আগেই যুবকের কোল থেকে রোশকে এক ঝটকায় নিজের কোলে টেনে নিলো । বাচ্চাটাকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধপ করে মেঝেতে পড়ে ডুকরে উঠলো……
” রোশ্,,,মা আমার । কোথায় চলে এসেছিলে তুমি ? ঠিক আছো মা ? কিছু হয়নি তো তোমার ? মাম্মা কে ছেড়ে কেনো চলে এসেছো মা ? কিভাবে এসেছো এতো দূর ? মাম্মা কত টেনশনে ছিলো জানো ?
মেয়েটা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কথা গুলো আওড়ালো । কান্নার তোপে গলা কাঁপছে । হাত পা শিউরে ঠান্ডা হয়ে গেছে । কাল থেকে মেয়েকে না পেয়ে অবস্থা বেহাল তার ।
এখন মেয়েকে পেতেই যেনো প্রাণ ফিরেছে ধড়ে ।
উপস্থিত সবাই হতভম্ব । মেয়েটার পড়নে কালো বোরকা । মাথায় হিজাব , নিকাবের আড়ালে মুখ । চেনা বা দেখার উপায় নেই কে সে !
কাবির পরিবারের সবাই দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করলেন । মেয়েটার ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলা কেমন পরিচিত ঠেকলো ।
রোশকে বুক থেকে আলগা করে তার মা । আশপাশে নজর নেই তার । চোখের জলে নিকাব ভিজে জবজবে । দৃষ্টি ঝাপসা । মাকে দেখে এবারে গদগদ হয়ে চেঁচিয়ে ওঠে বাচ্চাটা….
” মাম্মা……
ভরা চোখ নিয়ে নিকাবের আড়ালে মুচকি হাসে রমনী । এলোমেলো হয়ে মেয়ের পুরো মুখ জুড়ে চুমু খায় । ফের বুকে মিশিয়ে নিয়ে বলে…..
” হ্যাঁ মা,, মাম্মা আমি । মাম্মা কে ছেড়ে এসেছো কেনো তুমি ? মাম্মা কষ্ট পেয়েছে তো । সবখানে খুঁজেছে তোমায় ! মাম্মা কেঁদেছে তোমার জন্য ! কার সাথে এসেছো এখানে ? কোথায় ছিলে মা ?
আদ্রের ভ্রু গুটিয়ে আসে । এ বেলায় রমনীর কন্ঠটা পরিষ্কার শুনলো । এতেই ধক্ করে উঠলো ভেতর ।
কে এই মেয়ে ? কন্ঠ টা কার মতো লাগলো যেনো ?
মেয়েটার দৃষ্টি এখনো অবধি আশাপাশে পড়েনি । সে নিজের মেয়েকে আদর করতে ব্যস্ত । ভিড় জমেছে রিসিপশনের কাছে ।
আকস্মিক কাঁধে কারোর স্পর্শ পেলো রমনী । মেয়ের থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে ঘাড় ঘোরালো পেছনে । ভেজা ভেজা চোখের সামনে পড়লো বেপরোয়া রুডভিক কাবির রৌদ্র । নিজ থেকে চাকা ঘুরিয়ে হুইলচেয়ার ঠেলে মেয়েটার কাছে গেছে সে । মুখখানি দেখার বাসনায় কাঁধে হাত রেখেছে । দৃষ্টি অনড় তার । কপালে ভাঁজ একটুখানি ।
মেয়েটা পিছু ফিরতেই কাঁটা দিলো গোটা গায়ে ।
চোখ ব্যাতীত কিছুই দেখা যাচ্ছে না রমনীর । মেয়েটাও বোধহয় কেঁপে উঠলো । ভেজা দৃষ্টিতে ছলকে যাওয়া পরিবর্তনের দেখা মিললো ।
রৌদ্রের এহেন কান্ডে পাশ থেকে ডেকে ওঠে আদ্র…
” রুডি,, কি করছিস ?
রৌদ্রের ধ্যান জ্ঞান নেই । পলকহীন চোখে সে অতৃপ্তের ন্যায় চেয়ে রয়েছে । চোখাচোখি চলছে মেঝেতে লুটিয়ে বসে থাকা সামনের মেয়েটার সাথে ।
তার চোখ দেখে যুবকের শরীর কাঁপে । দীর্ঘক্ষণ বাদ পলক পড়ে নয়নে । সামনের রমনীও নিষ্পলক চেয়ে রয়েছে । ভীষণ অদ্ভুত আর আকুল দুজনার দৃষ্টির মিলন ।
বেপরোয়া যুবক আরেকটু ঔদ্ধত্য হলো । আভাস হীন মেয়েটার গালে হাত তুললো এবারে ।
রমনী কেঁপে ওঠে তার স্পর্শে । রৌদ্র থামে না । ঝুঁকে দুহাতে মেয়েটার আদল খানি দখল করে এবার ।
তখন নিস্তব্ধ গোটা লবি । সবাই দৃষ্টি কুঁচকে ফেলেছেন । আকস্মিক ছেলের এমন ব্যবহার দেখে এতো সব মানুষের ভিড়ে অপ্রস্তুত হন তোফায়েল কাবির । ত্রম্ভ পায়ে এগিয়ে ছেলের কাঁধে হাত রাখেন । গলা খাঁকারি দেন……
” রৌদ্র,,, এটা কি করছো বাবা ?
ছলকে বাপের দিকে দৃষ্টি তোলে রৌদ্র । ধক্ করে শ্বাস টানে । সেকেন্ডের মাথায় আবারো ছলাৎ করে চোখ নামিয়ে মেয়েটার দিকে ফিরে চায় । খাদ যুক্ত চোখ ভরে এসেছে বেপরোয়া যুবকের ।
সে রিসোর্টের উঁচু দেয়াল গুলি কাঁপিয়ে হেসে উঠলো । ভীষণ খুশিতে আত্মহারা হয়ে চেঁচিয়ে বললো হাঁসফাঁস করে…..
” ড্যাড,, ড্যাড আমার ইভারা…..
এই পর্বটা খুব সুন্দর করে গোছানোর ইচ্ছে ছিলো । কিন্তু ঠিকমতো গোছাতে পারলাম না বোধহয় । কাল থেকেই অবান্তর একটা ঝামেলা মাথা এলোমেলো করে দিচ্ছে । অনেকে জানেন সেটা । গল্প লিখতে পারিনি কাল । আজ সন্ধ্যা থেকে এটুকু লিখে শেষ করেছি । ছোট, তাই বোনাস হিসেবে দিলাম । বাকিটা পরবর্তী পর্বে পাবেন । সেটুকু আরো সুন্দর করার চেষ্টা করবো ।
এই পর্বটা কেমন লাগলো জানাবেন । আর এই পর্বে একটু বেশি রেসপন্স করুন । ওকে ? 
চলবে……….
Share On:
TAGS: আসবো ফিরে আবারো, সুরভী আক্তার
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৭৫
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ১৫(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৪৪
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৭১+৭১
-
আসবো ফিরে আবারো গল্পের লিংক
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৭০
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৭৩
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৬৯
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩৫
-
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ২৮