আমার_আলাদিন
জাবিন_ফোরকান
পর্বসংখ্যা৩
ডি জে আলাদিন। আসল নাম সাইবান আলাদিন।
প্রফেশনের ক্ষেত্রে আলাদিন টাইটেলটাই ব্যবহার করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে সাইবান। অন্য নামটা শুধুমাত্র কাছের মানুষদের জন্যই বরাদ্দ। তার অনন্য নামটার জন্য অবশ্য সবসময়েই বন্ধুমহলে খোঁটা খেয়ে এসেছে সে। এই যেমন আজ, শো এর পরপরই যখন ডাফল ব্যাগ হাতে বেরিয়ে আসলো, তখনি সামনে থেকে ডাক ছুটে এলো,
“কিরে আলাদিন তোর চেরাগ কোথায়?”
রাস্তার ধারে পার্ক করে রাখা গাড়ির বনেটের উপরে বন্ধুদের আড্ডা জমেছে। পা এলিয়ে বাংলার শেষ নবাবের ভঙ্গিতে শুয়ে আছে নীরব। তার শিষ্য আফনান নিজের বিরাট ইঁদুরে দাঁত কেলাচ্ছে। গ্রুপের তুলনামূলক ভদ্র সদস্য অনুরাগ গাড়ির দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আরও কয়েকজন ছেলে আছে, যারা মাঝে সাঝে সাথে থাকলেও ঠিক উল্লেখ করার মতন বন্ধু নয়। বিশেষ কাছের এই কয়েকজনই।
সাইবান নিজের আধভেজা চুলে আঙুল চালিয়ে গাড়িটার কাছে এসে দাঁড়াল। একেবারে অতর্কিতে সপাত করে আফনানের পিছনে চটাশ চটাশ দুটো চপাট বসিয়ে বাঁকা হেসে বলল,
“এইযে, আফনানের পিছনে ভরে রেখেছি। খুঁজে দেখবি?”
“তিন তওবা, তিন তওবা, তিন তওবা!”
আঁতকে উঠল নীরব। অপরদিকে নিজের পিছন ডলতে ডলতে আফনান আঙুল তুলে অভিযোগ জানালো,
“আমি শিওর এই ব্যাটার জেন্ডারে প্রবলেম আছে। তোরা লিখে রাখ আমার কথাটা। পুরুষের শরীরের ভেতর আসলে ও একটা ভাইয়াপু।”
দাঁতে ঠোঁট কামড়ে আফনানের উপর ঝুঁকে এলো সাইবান। ঘাড়ে চিবুক রেখে বন্ধুর চোখে চোখে তাকিয়ে হঠাৎ করে তর্জনী তুলে ছুঁয়ে দিলো সে আফনানের কপাল। সেই লম্বাটে আঙুল বয়ে নামলো ঘাড় অবধি। হিসিয়ে উঠে জিভে ঠোঁট ভিজিয়ে সাইবান গান ধরল,
“পড়েনা চোখের পলক, টুং~ কি তোমার রূপের ঝলক, হায়! দোহাই লাগে, মুখটি তোমার একটু আঁচলে ঢাকো~ আমি সেন্স হারাবো, ডেড হয়ে যাব, সেভ করতে পারবেনা কেউ!”
“কিস করে ফেলবে! এই এই, কেউ ওকে থামা ও আমাকে কিস করে ফেলবে, আহ্!”
সাইবান নিজের মুখটা আফনানের কাছাকাছি নিতেই লাল টকটকে হয়ে বান্দা লাফিয়ে সরে গেলো। ঠাস করে বারি খেল গাড়ির বডিতে। কোমর চেপে ধরে হাঁটু ভেঙে আধবসা হয়ে পড়ল সে রাস্তার মাঝেই। বৃদ্ধাঙ্গুলে নিজের ভেজা ঠোঁট মুছে নিয়ে হাসতে হাসতে নীরবের দিকে তাকালো সাইবান।
“চেরাগ লাগবে তোর? বের করব, স্যালাইন?”
“ওভাই! আমাকে ছেড়ে দে আব্বা কেঁদে বাঁচি! আমার গার্লফ্রেন্ড জানতে পারলে এবার আর ওকে কিছুতেই বিশ্বাস করাতে পারবনা আমি গে না!”
দুহাত জুড়ে হাহাকার করে উঠল নীরব। তার সুন্দর নামটা সাইবান মুখে নেয়না। নীরব শব্দের ইংরেজি অর্থ সাইলেন্ট, কিন্তু সেটা বেশি সুন্দর শব্দ বলে পছন্দ না। সাইলেন্ট কে বিকৃত করে সে বানিয়েছে ‘স্যালাইন’। এমন আজগুবি কান্ড তাদের বন্ধুমহলে একমাত্র সাইবানের দ্বারাই সম্ভব। সবথেকে সুদর্শন, সবথেকে মজাদার, সবথেকে জোকার, সবথেকে সিরিয়াস, সবথেকে রাগী, সবথেকে দয়ালু, সবথেকে আত্মার বন্ধু সবটাই সাইবান আলাদিন।
“তোদের সারাদিন এসব ফাত্রামি করা ছাড়া আর কাজ নেই ভাই?”
এতক্ষণে মুখ খুললো চুপচাপ সদস্য অনুরাগ। সাইবান ততক্ষণে নীরবকে ঠেলে গাড়ির বনেটে উঠে বসেছে। পকেট থেকে সিগারেট বের করে নীরবের কাছ থেকে লাইটার নিয়ে ধরাতে ধরাতে সে বলল,
“হ্যাঁ, অনুরাগ দাদা দরবেশ বলেছেন বালকগণ, ফাত্রামি করিও না। শুধু বলো, ফাঁআহহ! আর এগিয়ে যাও, জীবনে একটা ঠাডাপড়া আছাড় খাও।”
অট্টহাসির রোল পড়ে গেলো চারপাশে। গড়াগড়ি খেলো একেকজন। গম্ভীর অনুরাগ অবধি হাসতে বাধ্য হলো। মাথা ঝাঁকিয়ে শেষমেষ সে সাইবানকে বলল,
“তুই কোনোদিন টায়ার্ড হোস না, ব্রো?”
“না ব্রো। কারেন্টে আমার শরীরে ছিনিমিনি করে।”
“এই সব কারেন্ট হলো বিবাহ বসার পূর্ব লক্ষণ।”
বিজ্ঞের ভঙ্গিতে কথোপকথনে যোগ দিলো নীরব। সাইবান হাঁটুর উপর হাঁটু তুলে বসে সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে ধূসর ধোঁয়া ছাড়ল বায়ুতে। তারপরই খিলখিল করে হেসে উঠল,
“বিবাহ? তাও আমি? খেক!”
“ওমা এতে খেক করার কি আছে? বিয়ে শাদী করবিনা নাকি তুই? সারাজীবন কুমার থাকবি? নাকি আবার জীবনটা চেরাগের দৈত্যের সাথে কাটানোর প্ল্যান করেছিস?”
এতক্ষণে সম্বিৎ ফিরে পাওয়া আফনান বলল পাশ থেকে। সাইবান সিগারেটে পরপর কয়েকটা সুখটান দিয়ে আফনানের কাঁধে হাত জড়িয়ে কাছে টেনে বলল,
“শোন দোস্ত। এইসব বিয়ে শাদী হলো একটা স্ক্যাম, বুঝেছিস? কি সুন্দর মজায় মজায় লাইফ যাচ্ছে বল? কোনো দরকার আছে বিয়ে নামক শিকল গলায় জড়িয়ে সেটা অন্য একটা মেয়ের হাতে তুলে দেয়ার? তাছাড়া, আমি বিয়ে করব সবার পরে। তোরা যখন বাপ দাদা হয়ে যাবি, তখন আমি হব তোদের মেয়েদের সুগার ড্যাডি।”
“কি ডেঞ্জারাস মাল! এই তোর সাথে আমার আজকে থেকেই ডিভোর্স!”
আঁতকে উঠে বলল নীরব। তাতে অট্টহাসি হেসে নিজের সিগারেটে মনোযোগ দিলো সাইবান। অনুরাগ এবার হাততালি দিয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করল।
“ওকে গাইজ। রাত সাড়ে তিনটা বাজছে। কারো বাসায় যাওয়ার প্ল্যান আছে নাকি এখানেই টাল হয়ে থাকবেন? আগেভাগে বলে দিচ্ছি, আমি কিন্তু পার্সেল করে আপনাদের সবাইকে যার যার বাসার দরজায় ডেলিভারি দিয়ে আসতে পারবনা। আগে অনেকবার ধরা খেয়েছি। কেলোর কীর্তি করবেন আপনারা আর আপনাদের আব্বা আম্মার কাছে ধরা খাব আমি? উঁহু উঁহু উঁহু, অনেক হয়েছে মুরুব্বি।”
“ঐযে, দাদা কথা শুরু করেছে। দাদার কথা শুনতে হবে, ঘরে ফিরে যেতেই হবে।”
বলে গাড়ির বনেট থেকে লাফিয়ে নেমে পড়ল সাইবান। একটা সিগারেট শেষ, আরেকটা তুলে ঠোঁটে গুঁজে বাকিদের উদ্দেশ্যে হাত নাড়ল সে,
“মা জননী আমার ফোনের উপর ফোন দিয়ে মাথা নষ্ট করে দিয়েছে। তাই আমি আগে গেলাম। লাভ ইউ গাইজ, কিস ইওর গার্লফ্রেন্ডস, সালাম ইওর প্যারেন্টস অ্যান্ড শিট অন টয়লেটস নট ইন ইওর প্যান্টস। বাই!”
অনুরাগ গেলো সাইবানের পিছু পিছু, বেশ কিছুটা দূরত্ব এগিয়ে দিয়ে আসতে। বাকিরা পিছনে বসে হাসিমুখে চেয়ে রইল। এই ছেলেটার মাঝে অদ্ভুত ক্ষমতা আছে। হাসি বিলানোর ক্ষমতা। যা সবাই পারেনা।
সাইবান যখন বাড়িতে ফিরল, তখন পূব আকাশে আলো ফুটতে শুরু করেছে। কমলাভ রশ্মি ছড়িয়ে যাচ্ছে রংধনুর মতন। নিজের গাড়িটা সে গ্যারাজে পার্ক করল। ঠোঁটে তখনো সিগারেট ঝুলছে। আজকের রাতের তিন নাম্বারটা। মাঝ রাস্তায় ধরিয়েছে। সিগারেট নিয়ে ভেতরে ঢুকলে তার অভিজ্ঞ ডাক্তার জননী আর আস্ত রাখবেন না। সেই ভেবে সে গাড়িতে বসেই পুরোটা ফুঁকে শেষ করে এরপর বাইরে এলো। তার কন্ট্রোল বক্স, যন্ত্রপাতি, অন্যান্য জিনিস সব গাড়ির পিছনে আছে। সেসব পরে বের করা যাবে। আপাতত শুধু ডাফল ব্যাগটা নিয়ে বেরোলো সে, লম্বা একটা ঘুম দিতে হবে, শরীর আর চলছেনা।
হেলেদুলে শীষ বাজাতে বাজাতে বাড়ির দরজায় গিয়ে পৌঁছালো সে। রাতে দরজাটা বন্ধ থাকে। তার কাছে তাই সবসময় অতিরিক্ত চাবি থাকে। সেটা দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে সাইবান অবহেলায় ডাফল ব্যাগটি ছুঁড়ে ফেললো সোফায়। নিজের জ্যাকেট খুলে নিতে নিতে এগোলো কিচেনের দিকে। তার জন্য ফ্রিজে সবসময় কোল্ড ড্রিঙ্কস বোঝাই করে রাখা হয়। খেয়ে মাথাটা ঠান্ডা করে একেবারে সোজা বিছানায় যাবে। এমন পরিকল্পনা থেকেই কিচেনের কাছে যেতেই মৃদু শব্দ কানে এলো সাইবানের। শীষ বন্ধ হয়ে গেলো তার। কারো হেঁটে চলার আওয়াজ। সঙ্গে কাঁচের পিরিচে চামচ ঠেকানোর টুংটাং মিষ্টি ধ্বনি। তার মা সাধারণত এই সময়ে জেগে থাকেন না। কাজের মেয়েটা থাকতে পারে। তেমন একটা পরোয়া না করেই কিচেনে ঢুকলো সাইবান। সামনের অপ্রত্যাশিত দৃশ্যটি তাকে ক্ষণিকের জন্য জমিয়ে দিলো।
কিচেন কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক রমণী। হালকা গোলাপী সুতির শাড়ি জড়ানো শরীরে। চুলগুলো খানিকটা অগোছালো। শ্যামবর্ণ চেহারায় অদ্ভুত একটা মলিনতা। শরীরটা প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশিই রুগ্ন। ফিনফিনে কব্জিতে অতিরিক্ত বড় সাইজের চুড়ি দেখেই বোঝা যায়। এক হাতে কাঁথায় মোড়ানো কিছু একটা ধরা, বাচ্চা বোধ হয়। অপর হাতে কাউন্টারের উপর রাখা একটা পিরিচ থেকে ছোট ছোট করে কাটা কিছু স্ট্রবেরী কাঁটাচামচ দিয়ে তুলে খাচ্ছে সে, নিঃশব্দে। কোলের বাচ্চাটাকে আলতোভাবে দুলিয়ে যাচ্ছে শরীরের সাথে সাথে। সাইবান চেয়েই রইল, দীর্ঘক্ষণ। তার উচ্ছল চেহারায় হুট করে একটা প্রগাঢ় শীতল ছায়া ভর করল। একদম নির্বিকারভাবেই সে বলে উঠল,
“ইরাম আপু?”
চমকে গিয়ে মুখ তুলে তাকাল ইরাম। খানিকটা প্রসারিত দৃষ্টিতে দেখল সামনে দাঁড়ানো ছেলেটাকে। না চাইতেও আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করতে বাধ্য হলো। নিতান্তই কম বয়সী, আধুনিক গোছের তাগড়া যুবক। বেশভূষায় স্পষ্ট। একটা টি শার্ট আর ঢোলা কালো জিন্স পরনে, সেটার আবার হাঁটুর দিকটায় ছেঁড়া। ফ্যাশনটা চেনা ইরামের, রিপড জিন্স বলে ওটাকে। যদিও ছেঁড়া কাপড় পরার কোনো অর্থ ইরাম খুঁজে পায়না। ছেলেটার মুখটা তীক্ষ্ণ, একদম ক্লিন শেভ্ড। ত্বকের রংটাও হলদেটে ফর্সা, ঠিক চন্দন কাঠের মতন। বাংলাদেশি প্রবীণদের জন্য একদম আদর্শ চেহারা, যার জন্মের পরেই হয়ত বলা হয়েছিল ঘরে চাঁদের টুকরো এসেছে! বাড়াবাড়ি রকমের পুরুষালী সৌন্দর্য। যা একদম পছন্দ নয় ইরামের। হালকা ভেজা চুলগুলো তার কপালে ছড়িয়ে আছে। তাতে ঢাকা ভ্রু তে স্পষ্টত জ্বলজ্বল করছে একটা ধাতব রিং। আইব্রো পিয়ার্সিং। আরেকটা অপছন্দের জিনিস। অরণ্যর পরে এই একটা মানুষ, যার বাহ্যিক অবয়ব ইরামকে কেমন যেন দমবন্ধকর অনুভূতি দেয়। আগে এতটা হত না। তবে অরণ্যর সাথে সংসার করার পর জিনিসটা বেড়ে গিয়েছে। ট্রমার মতন।
নিজের অস্বস্তিগুলো চেপে ইরাম হালকা গলায় বলল,
“ভালো আছো, আলাদিন?”
সাইবানের দুহাতের মুঠো শক্ত হয়ে এলো। তাকে এই নামটায় বাড়িতে কেউ ডাকে না। কারণ ছোটবেলা থেকেই ক্ষেপানোয় হম্বিতম্বি করতো সে। তাই পরিবার আর চেনা পরিচিত সকলেই তাকে সাইবান বলেই ডাকে। পারিবারিক সদস্যদের মধ্যে একমাত্র ইরাম মেয়েটাই তাকে আলাদিন বলে ডাকে। অনেকবার মানা করেছে সে, অথচ মেয়েটি বরাবর তাকে বলে এসেছে, এই আলাদিন নামটা নাকি সুন্দর।
“হুম। আপনাকে দেখতে পাব ভাবিনি। মুন্সীবাড়িতে বেড়াতে এসেছেন?”
বলতে বলতে হেঁটে ফ্রিজের কাছে গেলো সাইবান। ভেতর থেকে একটা কোল্ড ড্রিঙ্কসের ক্যান বের করে চুমুক দিল। কৌতূহলী দৃষ্টিতে পিছনে তাকাল, যেখানে দাঁড়িয়ে আছে ইরাম, তার বুকে অতি যত্নে ঠেকিয়ে রাখা ছোট্ট বাচ্চাটার মুখ দেখা যাচ্ছেনা, অথচ হঠাৎ করেই সাইবানের দেখতে ইচ্ছা করছে।
“না। বেড়াতে আসিনি। থাকতে এসেছিলাম। থাকতে পারিনি, তাই চলে যাচ্ছিলাম। তখন খালামণির সাথে দেখা, সেই নিয়ে এসেছে তোমাদের বাসায়।”
ইরামের অতি সৎ জবাব শুনে চুমুক দেয়ার মাঝপথে কেশে উঠল সাইবান। সে আঁচ করতে পেরেছিল, ঘটনা কিছুটা এমনি হবে। ওই বাড়ির মানুষগুলোর সঙ্গে তার পরিবারের সম্পর্ক বিশেষ ভালো নয় বহু বছর যাবৎ। সাইবান স্কুলে থাকতেই ইরাম এই বাড়িতে আসা ছেড়ে দিয়েছিল। আজ এসেছে, তার মানে ঘটনা গুরুতর কিছুই। তবে এইভাবে স্বীকার করে নেবে সেটা সাইবান আন্দাজ করেনি। কয়েক মুহূর্ত সে বুঝতে পারলনা সে কীভাবে ইরামের সাথে কথা বলবে। পাঁচ বছরের বেশি হয়েছে তার ইরামের সঙ্গে কথা হয়না। বিয়েতে অবশ্য নিমন্ত্রণ পেয়েছিল, মায়ের জোরাজুরিতে গিয়েছিল এক ঘণ্টার জন্য। অন্যান্য অতিথিদের মাঝে দূর থেকে এক পলক বউ সাজে ইরামকে দেখেই চলে এসেছে। এটুকুই। বিয়ের পর তো একদমই যোগাযোগ হয়নি। সত্যি বলতে ইরামের অস্তিত্ব সে ভুলেই গিয়েছিল প্রায়। আজ দেখে একে অপরকে কেমন যেন অপরিচিত লাগছে। সে নিশ্চিত, ইরামেরও তেমনটাই লাগছে।
“থাকতে এসেছেন মানে? আর ওটা, আপনার বাচ্চা?”
তর্জনী তুলে ইযানের দিকে ইঙ্গিত করল সাইবান। ইরাম এবার সোজা হয়ে দাঁড়াল। বুকে লেপ্টে থাকা আধঘুম ইযানকে আরেকটু তুলে ভালোভাবে ধরে জানাল,
“ওর নাম ইযান।”
“ওহ। ম্যাচ করেছে আপনার সাথে। ইরাম – ইযান।”
“থ্যাংক্স।”
“থাকতে এসেছেন- এটার অর্থ বললেন না? আপনার হাসব্যান্ড কোথায়?”
“আমাদের তিন মাস আগে ডিভোর্স হয়ে গিয়েছে।”
আরেক দফায় ঝটকা খেলো সাইবান। আজ তার সাথে হচ্ছেটা কি? এই ইরাম মেয়েটা কি পণ করেই এসেছে তাকে অবাকের উপর অবাক করবে? নিজের ডিভোর্সের কথাও কেউ এত স্বাভাবিকভাবে কেমন করে বলে? এই তাহলে কারণ, মুন্সীবাড়িতে তার জায়গা না হওয়ার।
বাঁকা একটি হাসি ফুটল সাইবানের ঠোঁটে। একদম হঠাৎ করেই সে বলল,
“আপনি তাহলে ফাইনালি বুঝতে পেরেছেন অসহায়ত্বের মানে?”
ভ্রু উঁচু হলো ইরামের। সাইবানের কথার ধাঁচটা তার ভালো লাগেনি। ইযানকে কাঁথায় আড়াল করে নিয়ে সে সরাসরি তাকাল ছেলেটার দিকে,
“তুমি কি বলতে চাইছ আলাদিন? পরিষ্কার করে বলো।”
“এটাই, যে মানুষের জীবনে এমন একটা সময় আসে যখন সবকিছু থাকার পরেও মনে হয় তার কাছে কিছুই নেই। নিরেট একাকীত্বের ভয় তাকে ঠুকরে শেষ করে।”
সাইবান দুহাত মেলে খানিকটা নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল। তার ঠোঁটের হাসিটা ক্রমশ বিস্তৃত হলো। সুচারু চোখে ইরাম আর একনজর আড়ালে থাকা ইযানকে দেখে সে যুক্ত করল,
“আপনি অবশেষে একাকীত্ব টের পেয়েছেন। যাই হোক, এনজয় দ্যা নাইট। আমার ভীষন ঘুম পাচ্ছে। ভাগ্যে থাকলে পরে দেখা হবে।”
দুহাতে স্যালুট ঠুকে শীষ বাজিয়ে বেপরোয়া ভঙ্গিতে কিচেন থেকে বেরিয়ে গেল সাইবান। ইরাম নিজের জায়গায় স্থির দাঁড়িয়ে ছেলেটার চলার পথে তাকিয়ে রইল। সাইবানের শেষ কথাগুলো তার ভেতরের কোথাও একটা আঘাত করেছে। যেন ছেলেটা কোনো কারণে ইরামের উপর রেগে আছে। যার সাথে ঠিকমত কথাই হয়নি বহু বছর যাবৎ, তার অজানা ক্রোধের কারণটা ইরাম হাজার ভেবেও উন্মোচন করতে পারলনা। বেশি ভাবার সময়ও অবশ্য সে পেলনা। ইযান কেঁদে উঠতেই ছেলের দিকে মনোযোগী হতে হলো তাকে।
দুপুরবেলা:-
এমনিতে শো শেষ করে এসে সাইবান সন্ধ্যার আগে ঘুম থেকে ওঠেনা। তবে আজ দুপুর ২ টার দিকেই তার ঘুম ভেঙে গেলো। অনেক চেষ্টা করলেও পুনরায় ঘুম ফিরিয়ে আনা গেলোনা। তাই উঠে পড়ে একটা লম্বা গোসল সেরে সে নিজের রুম থেকে বের হলো। ভীষণ ক্ষুধা লেগেছে। গত প্রায় ১২ ঘণ্টা যাবৎ পেটে কিছুই পড়েনি। দ্রুতই সে ডাইনিং রুমে চলে এলো। জানে, খাবারের আয়োজন হবে আজ। না হলেও অবশ্য তার জন্য সবসময় হটপট ভর্তি থাকে। আজও ব্যতিক্রম নেই। টেবিল ভর্তি সুস্বাদু খাবারের পদে। ভাত, খিচুড়ি দুটোই আছে। কারণ সাইবানের খিচুড়ি পছন্দ। ডিমভাঁজা, মুরগীর তরকারি, খাসির কাবাব। সালাদ আর আঁচার। আরও কিছু ছোটখাট শাকসবজির পদ আছে যেসবের প্রতি মনোযোগ দেয়ার প্রয়োজনবোধ করলনা সাইবান। চেয়ার টেনে ধপাস করে বসে পড়ল সে। দ্রুতই প্লেটে পাহাড়ের মতন খিচুড়ি বেড়ে নিয়ে আমের আঁচারের দিকে হাত বাড়ালো। অপর পাশের চেয়ারে বসে ছেলের কর্মকান্ড দেখলেন ডাঃ সামিয়া মুন্সী। হাসপাতালের ইমার্জেন্সী থেকে তিনি আধ ঘণ্টা আগেই ফিরেছেন। বিকেল নাগাদ আবার চলেও যেতে হবে বিধায় পরিপাটি শাড়ি বদলাননি। চশমার আড়াল থেকে ভ্রুকুটি করে তিনি দেখলেন কীভাবে সাইবানের ভেজা চুল বেয়ে টপটপ করে পানি গড়াচ্ছে।
“কতবার বলেছি গোসলের পর ভালোমত মাথা মুছতে হয় নতুবা ঠান্ডা লাগবে?”
নিজেই উঠে গেলেন সামিয়া। রুম থেকে তোয়ালে নিয়ে এসে মায়ের কথায় পাত্তাই না দেয়া ছেলের মাথায় চাপলেন। ধীরে ধীরে সযত্নে মুছে নিতে লাগলেন, শুকিয়ে এলো চুলের পানি। সাইবান আস্ত একটা কাবাব মুখে দিয়ে এলিয়ে বসে নিজের জননীর দিকে চেয়ে বলল,
“আমি মুছে ফেললে তো আমার গর্জিয়াস মম এভাবে সুন্দর করে মুছে দিত না, বলো? একজন বিউটিফুল লেডির হাতের ছোঁয়া থেকে নিজেকে বঞ্চিত করতে চাইছিনা।”
“হাতের ছোঁয়াটা মাঝে মধ্যে তোর গালে পড়লে ভালোই হয়, বল? তাহলে যদি ফোনটা কল করার জন্য খোলা পাওয়া যায়।”
“উফ মম, তুমি বোঝো না? তুমি না ডাক্তার? এই দেখ, আমি ফোন বন্ধ করে ফেললে তোমার টেনশন হয়, সেই টেনশনে তোমার রক্ত সঞ্চালন বাড়ে। রক্ত সঞ্চালন বাড়লে শরীরের ত্বক জেল্লাদার হয়। একদম লাল লাল গ্লো মারে। আফনানকে দেখেছ না? ঐযে লাল মুরগীটা? একদম ওর মতন। তখন তোমাকে দেখতে হুরপরী সকিনা বিবির মতন লাগে। আমি ইন্ডিরেক্টলি তোমার সৌন্দর্য বাড়াতে ভূমিকা রাখছি, বুঝেছ?”
“আর টেনশনে যে কোলেস্টেরল বাড়ে, রক্তচাপ উঠে যায় তার বেলা? অর্ধেক জ্ঞান নিয়ে ঘুরিস কেন? গর্দভ!”
“হাহাহা!”
ছেলের মাথায় চাটি দিতেই খিলখিল করে হেসে উঠল সাইবান। অদূরে চেয়ারে বসে দৃশ্যটি চোখ মেলে দেখল ইরাম। কি সুন্দর একটা সহজ সম্পর্ক মা ছেলের মাঝে! একদম বন্ধুর মতন। এরকম কোনো সম্পর্ক কি সে ভবিষ্যতে ইযানের সঙ্গে গড়তে পারবে?
সামিয়া নিজের চেয়ারে ফিরে এলেন। সকলেই খাওয়া শুরু করেছে। তিনি ইরামের প্লেটের দিকে তাকালেন। কতটা অল্প পরিমাণে খাবার নিয়েছে সেটা দেখে অসন্তোষ জানালেন।
“ইরাম। কাজটা ভালো করছিস না, মামণি। তোর শরীরের তো একটা প্রয়োজন আছে, নাকি? উপরন্তু ব্রেস্টফিডিং করাস, এটুকু মাত্র খাবারে শরীর নিজের চাহিদা মেটাবে নাকি অতিরিক্ত শক্তির যোগান দেবে বলতো?”
বলতে বলতে তিনি বেশ খানিকটা পুষ্টিকর সালাদ এবং আরও কিছু কাবাব ইরামের প্লেটে তুলে দিলেন।
“বেশি বেশি প্রোটিন খেতে হবে। সঙ্গে সুষমভাবে সবকিছু। তোর চেহারায়ই বোঝা যাচ্ছে, প্রেগন্যান্সিতে অপুষ্টিতে ভুগেছিস।”
“না খালামণি, আমি ঠিক আছি। খাচ্ছি।”
আস্তে করে জবাব দিল ইরাম। সাইবান নিজের প্লেটের খিচুড়ি চামচ দিয়ে খেতে খেতে একবার আড়চোখে ইরামকে দেখলেও বিশেষ কোনো মন্তব্য করলনা। সামিয়া খাবার বেড়ে দেয়া সুগন্ধাকে বললেন,
“সুগন্ধা, আমি চলে যাওয়ার পর মনে করে কিন্তু সন্ধ্যায় ইরামকে হালকা নাস্তার সঙ্গে ফল দিবি। খানিকটা দই রাখবি সাথে, যেন পারফেক্ট ব্যালেন্স থাকে। আর করিমকে আমি বাজারে পাঠিয়েছি, এলে চেক করে দেখিস লিস্ট ধরে, কিছু ফর্মুলা মিল্ক লিখে দিয়েছি, ওগুলো এনেছে কিনা।”
“ঠিক আছে আম্মা, আপনি একটুও টেনশন নিয়েন না। আমি সব সামলাই নিব।”
কথপোকথন শুনে কান খাড়া করে ফেলল ইরাম। দ্রুত বলল,
“না না খালামণি। এতকিছু করতে হবেনা তোমাকে। ইযান ঘুমিয়েছে। ওর ঘুম ভাঙলেই আমি চলে যাব।”
“কোথায় যাবি?”
খালার প্রশ্নে থমকাল ইরাম। চোখ পিটপিট করে খানিকটা দ্বিধা নিয়ে শেষে উত্তর করল,
“ঠিকানা তো একটা হবেই, তাইনা? আমার আগের মেসটা খুব সম্ভবত এখনো খালি আছে। না থাকলেও সমস্যা নেই। রুমমেট মেয়েটা ভালো, ওর সাথে কয়েকটা দিন থাকা যাবে। তুমি চিন্তা করোনা। আমি ব্যবস্থা করে ফেলব।”
“আজীবন তো সবার জন্য ব্যবস্থাই করে এসেছিস। আর কত?”
ইরাম হাতের মুঠো শক্ত করে ফেলল। নিজের প্লেটের দিকে চেয়ে বলল,
“আর কারো কথা জানিনা, কিন্তু আমি সত্যিই কারো উপর বোঝা হতে ইচ্ছুক না, খালামণি। তুমি আমাকে তোমার বাসায় একটা রাত থাকতে দিয়েছ, এর কৃতজ্ঞতা আমি কেমন করে মেটাব জানিনা। আমায় আর ঋণী করোনা। যার আপন মানুষেরাই দায়িত্ব এড়িয়ে গিয়েছে, তার প্রতি তোমার কোনো কর্তব্য নেই।”
“হ্যাঁ। যে অসহায় মেয়েটার প্রতি সকল দায়িত্ব স্বামী, ভাই, পরিবার সবাই এড়িয়ে গিয়েছে, সেই মেয়েটার প্রতি আমার কোনো দায়িত্ববোধ নেই। কিন্ত আমার ঘরের বউয়ের জন্য আছে!”
“ইয়াক….থু!”
দাঁতের নিচে এলাচে কামড় পড়ায় ঠিক ওই মুহূর্তেই ঝটকা দিয়ে উঠল সাইবান। হাতের চামচটা তার মেঝেতে পরে ঝনঝন শব্দ তুলল। অথচ মুখের এলাচ তার মুখেই রয়ে গেল, বি*স্ফারিত দৃষ্টিতে সে তাকাল নিজের মায়ের দিকে।
“কি বললে তুমি, মম? হু?”
“মাই ফিউচার ডটার ইন ল, ইয়েস, ইউ হার্ড দ্যাট রাইট, বাডি!”
স্মিত হেসে ছেলেকে ঠিক তার স্টাইলেই জবাব দিলেন সামিয়া।
✿—চলবে—✿
Share On:
TAGS: আমার আলাদিন, জাবিন ফোরকান
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
আমার আলাদিন পর্ব ১
-
আমার আলাদিন পর্ব ১৩
-
আমার আলাদিন পর্ব ১৬
-
আমার আলাদিন গল্পের লিংক
-
আমার আলাদিন পর্ব ১০
-
আমার আলাদিন পর্ব ৮
-
আমার আলাদিন পর্ব ২০
-
আমার আলাদিন পর্ব ৪
-
আমার আলাদিন পর্ব ৭
-
আমার আলাদিন পর্ব ৯