#আমার_আলাদিন
#জাবিন_ফোরকান
“স্যার, আসতে পারি?”
প্রথম দিনেই ক্লাসে ৫ মিনিট দেরী হয়ে যাওয়ায় কিছুটা সংকোচ নিয়ে অনুমতি চাইল ইরাম। ভেতরে স্মার্ট বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লম্বা লোকটা তাতে মুখ ঘুরিয়ে তাকাল। শ্যামলা মুখ, তীক্ষ্ণ গঠন, শান্ত চেহারা। চোখে গোল ফ্রেমের হালকা চশমা। পাতলা শরীর, তাতে ঢোলা সিল্কের নীলরঙা শার্ট এবং সাদা ফরমাল ফ্যান্ট। ইরামকে দেখে চশমাটা এক আঙুলে চোখে তুলে সে বলল,
“আমি আপনাদের ট্রেনার, ইউ ক্যান কল মি মিস্টার রুশদী। প্লীজ, কাম ইন।”
ইরাম মাথা দুলিয়ে ভেতরে ঢুকল। তার জন্য নির্দিষ্ট করা টেবিলে বসে পড়ল। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর ট্রেনিংয়ের জন্য ল্যাপটপ দেয়া আছে। সে নিজেরটা খুলল। আশেপাশে তাকাল, তার মত আরও জন বিশেক রয়েছে এখানে। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনার সোজা হয়ে দাঁড়াল। পিছনে থাকা স্মার্ট বোর্ডে আঙুল ছুঁয়ে অ্যাপ্লিকেশন সেট করতে করতে সে বলল,
“আজকে আমাদের প্রথম ক্লাস। তাই আজ আমরা সকলে সকলের সঙ্গে পরিচিত হই। আমি, কায়সান রুশদী, সি এস ই গ্র্যাজুয়েট ফ্রম খুলনা ইউভার্সিটি অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি। আশা করছি, সামনের তিন মাস আমরা একদম মিলেমিশে সুন্দরভাবে ক্যারিয়ারের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শিখব। এখন আপনাদের পালা। লেট মি সি।”
কায়সান এক এক করে প্রত্যেকের পরিচয় সম্পর্কে জানতে চাইল। সবাই উঠে দাঁড়িয়ে নিজেদের নাম, পেশা ইত্যাদি সম্পর্কে জানাল। সবশেষে এলো ইরামের পালা। সে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“ইরাম কিবরিয়া, মাস্টার্স ইন ফিজিক্স, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা আপাতত নেই। ক্যারিয়ার তৈরির জন্যই ফ্রিল্যান্সিং কোর্সে ভর্তি হয়েছি।”
“ভেরি গুড ডিসিশন। আপনাকে এত চমৎকার একটা সিদ্ধান্ত নিতে কে উৎসাহ দিল ইরাম?”
“আমার ছেলে।”
আশেপাশের সকলে ক্ষণিকের জন্য ফিরে তাকাল। এখানে বিবাহিত বেশ কয়েকজনই রয়েছে। কায়সান সামান্য মাথা কাত করে তাকাল। তারপর মুচকি হেসে বলল,
“সো সুইট। প্লীজ সিট ডাউন।”
ইরাম বসে পড়ল। কায়সান সোজা হয়ে পরনের প্যান্টের পকেটে দুহাত গুঁজে সকলের উদ্দেশ্যে বলল,
“তো স্টুডেন্টস, চলুন শুরু করা যাক। প্রথমেই ইনট্রুডাকশন। ফ্রিল্যান্সিং আসলে কি জিনিস? কেন আমাদের দেশে বর্তমানে এটার এত ডিমান্ড? কীভাবে এ আইয়ের ফলে ধীরে ধীরে এই সেক্টরও প্রভাবিত হতে শুরু করেছে। আজ আমরা সবকিছুই বিস্তারিত আলোচনা করব। তার সঙ্গে কোন কোন ওয়েবসাইট ব্যবহার করে আমরা ক্লায়েন্ট রিচ করতে পারি, কীভাবে পেমেন্ট রিসিভ করতে পারি, সবকিছুর একটা ব্যাসিক ধারণা আজকের ক্লাসের বিষয়বস্তু।”
কায়সান পড়ানো শুরু করতেই ইরাম সম্পূর্ণ ডুবে গেল ক্লাসের মাঝে। বেশ মনোযোগ দিয়ে সবকিছু শুনল, কাজ করা শিখল, কীভাবে কোন ফাংশন ব্যবহার করতে হয় তার ধারণা নিল। কায়সানের পর আরও একজন ক্লাস নিল। সব মিলিয়ে ক্লাস শেষ হতে হতে চারটার বেশি বেজে গেল। ছুটি হওয়ার সাথে সাথেই চটজলদি বাইরের দিকে হাঁটা দিল ইরাম। হাতে বেশকিছু কাগজ তার, এসব হোমওয়ার্ক, বাড়িতে গিয়ে কাজ করে পরের দিন আবার তৈরি করে এনে জমা দিতে হবে। ক্লাসের মাঝে বিশেষ খেয়াল না থাকলেও এখন ইযানের কথা মাথায় ঢুকে গিয়েছে তার। কে জানে বাচ্চাটা কেমন আছে তাকে ছাড়া! প্রায় ছুটে ছুটেই সে বাইরে চলে যাচ্ছিল ঠিক তখনি পিছন থেকে ডাকটা ভেসে এলো,
“ইরাম?”
ইরাম থমকে গেল। ঘুরে তাকাল পিছনে। ভীষণ অবাক হয়ে দেখল কায়সান রুশদী এগিয়ে আসছে তার দিকে।
“মিস্টার রুশদী?”
খানিকটা দ্বিধান্বিত কন্ঠে বলল ইরাম। কায়সান হুট করে এমনভাবে তার নাম ধরে ডেকেছে যে সে বিস্মিত হয়ে পড়েছে। তার মুখোমুখি এসে থামল কায়সান। ঠোঁটে মোলায়েম হাসি মেখে বলল,
“খুব বিরক্ত করছি?”
“জি? না না, আপনি কি কিছু বলতে চান? ক্লাসে কিছু ভুল করেছি আমি আজ?”
“আপনি আমায় এখনও চিনতে পারেননি, তাইনা?”
এই প্রশ্নের পর ইরাম নিশ্চিতভাবে আরেক দফায় অনুভব করল। কায়সানকে সে আগেও কোথাও দেখেছে। কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারলনা। বিব্রতবোধ করল সে,
“আমাদের পূর্ব পরিচয় থেকে থাকলে দুঃখিত মিস্টার রুশদী। আমি আসলেই মনে করতে পারছিনা।”
“মনে করতে পারার কথাও নয়। সিরাত স্যারের বিকাল তিনটার ব্যাচ, সাইকেল রাইড, কামরুল মামার টংয়ের আড্ডা সঙ্গে ছোট শিঙাড়ার আসর। অনেক বছর আগেকার ব্যাপার। আজ শুধু স্মৃতি হয়ে রয়ে গিয়েছে।”
ইরামের চোখজোড়া প্রসারিত হয়ে উঠল। মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে স্মরণ করতে লাগল বহু পুরাতন ধুলো জমা স্মৃতিগুলোকে। ক্লাস সিক্স কি সেভেনের কাহিনী। গণিতের প্রাইভেট পড়া হত সিরাত স্যারের কাছে, তার বিকালের ব্যাচে ১০ জন শিক্ষার্থী ছিল। কায়সান তাদের একজন। প্রায় চার পাঁচ বছর একসাথে টিউশন পড়তে পড়তে তারা সবাই যেন বন্ধুর চেয়েও বেশি কিছু হয়ে উঠেছিল। ছেলেদের সবার সাইকেল ছিল। সেই সাইকেলে মেয়েদের চাপিয়ে তারা রেস খেলত। সপ্তাহের পকেট মানি মিলিয়ে মাঝে মধ্যে এদিক সেদিক ঘুরতে যাওয়া হত। আর প্রায়ই কাউকে না কাউকে ভেঙে কামরুল মামার দোকানে চা শিঙাড়া খাওয়া তো ছিল তাদের নিত্যদিনের ব্যাপার। এতটাই দৃঢ় বন্ধন ছিল তাদের মাঝে যে স্কুলের চেয়েও প্রাইভেটের ওই দুই ঘণ্টা সময়ের জন্য ইরাম মুখিয়ে থাকত। সেই লাজুক ছেলে কায়সান, যার সাইকেলের পিছনে বসে তার নিত্য রেস করা হত, সেই কায়সানকেই ভুলে গিয়েছে বলে ইরাম খানিক লজ্জা পেল।
“সরি, আসলে আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। আপনাকে দেখে আমার মনে হয়েছিল আগেও কোথাও দেখেছি, কিন্তু ঠিক হিসাব মিলিয়ে উঠতে পারিনি। কতটা বদলে গিয়েছেন!”
চোখ পিটপিট করল ইরাম। না চাইতেও কায়সানকে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করল। লাজুক, লজ্জাবতী পাতার মতন সেকেন্ডে সেকেন্ডে নেতিয়ে যাওয়া ছেলেটি প্রায় ছয় ফুট উচ্চতার অধিকারী আজ। শরীরে কোনো মেদ নেই। পাতলা গড়ন। চশমার আড়ালে সুচারু চাহনি। নিজেকে দেখানোর ভঙ্গিমাও আত্মবিশ্বাসী। যে ছেলে স্যার পড়া জিজ্ঞেস করলে পারা সত্ত্বেও তোতলাতে থাকত, সেই ছেলেই আজ এতগুলো মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে প্রভাব নিয়ে কথা বলে যায়। অবাক তো হওয়াই উচিত।
ইরামের কথা শুনে একটুখানি হাসল কায়সান। ঝুঁকে এসে জানাল,
“ইটস টোটালি ফাইন। আপনি আমাকে মনে না রাখলেও স্মরণ করতে পেরেছেন এটাই তো সৌভাগ্য। তা বলুন। কেমন আছেন?”
অজান্তেই করিডোর ধরে ধীর পায়ে পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল ইরাম এবং কায়সান।
“আমি তো ভালোই আছি। আপনাকে দেখে কেন যেন দ্বিগুণ ভালো হয়ে গেলাম।”
“কেন কেন?”
“এইযে, আমাদের লজ্জাবতী আজ সিংহপুরুষ। আপনার পরিবর্তনের রহস্য কি?”
খিলখিল করে শব্দ তুলে হাসল কায়সান। যদিও দুজনের মাত্র মিনিটখানেক আগেই নতুন করে পরিচয়, তবুও মনে হচ্ছে যেন তারা সেই ছোটবেলার বন্ধুই রয়ে গিয়েছে আজও। কায়সান মাথা কাত করে এক নজর ইরামকে দেখে বলল,
“একই প্রশ্ন আমিও আপনাকে করতে পারি। সেই চঞ্চল আমচোর, লিচু চোর, ফিমেল মাস্তান মেয়েটা আজ এতও ভদ্র, শান্ত যে? এই পরিবর্তনের রহস্য?”
ইরাম খানিক মলিন হাসল।
“সব পরিবর্তন সুখকর নয়। সময়ের সাথে সব বদলে যায়। আমি সময়ের সাথেই তো চলি, বাইরে যেতে পারিনা।”
“ছেলের নাম কি রেখেছেন?”
কথা বলার বিষয়বস্তু দুখকর হয়ে উঠছে দেখে বিষয় পাল্টাল কায়সান। ইরাম তাতে খুশিই হলো। মৃদু হাসি নিয়ে বলল,
“ইযান।”
“ইরাম ইযান! মাশাআল্লাহ, কি চমৎকার! কত বয়স পুচকুটার? আই ক্যান অলরেডি পিকচার হিম, আ ভেরি বিউটিফুল সোল লাইক ইউ।”
“সাড়ে চার মাস।”
বাইরের দিকে চলে এসেছে ইরাম প্রায়। ঘুরে দাঁড়িয়ে সরাসরি কায়সানের দিকে তাকাল সে এবার।
“অনেক হয়েছে আমার কথা। আপনার কি খবর? আজকাল মিলিয়ন সাবস্ক্রাইবারের ইউটিউব চালানো আর কম্পিউটার কোর্স করানো ছাড়া আর কি করছেন? পরিবারের সবার কি অবস্থা? আন্টি ভালো আছেন?”
কায়সানের হাসিটায় হালকা ভাটা পড়ল। মাথা হেলিয়ে সে বলল,
“গত বছর আম্মু…”
শেষ করতে পারলনা কায়সান। ইরাম একটি ঢোক গিলল। দুঃখিত হয়ে বলল,
“ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিউন। আমি খুব সরি।”
কায়সান মাথা নাড়ল।
“ব্যাপার না। সবাইকে একদিন চলে যেতে হয়। কেউ আগে যায় কেউ বা পরে।”
ইতোমধ্যে বাইরে এসে পড়েছে তারা। অথচ কায়সান যাচ্ছে না। ইরামও কথোপকথনে নিযুক্ত। সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে কায়সান জিজ্ঞেস করল,
“আপনার কি খবর? বিয়ের পর সংসারেই বিজি হয়ে গিয়েছেন? নাচটা আজকাল করা হয়?”
ইরাম থমকে গেল। তার শরীর বরফের মতন জমে গেল বুঝি। বেশ অনেকটা সময় সে কোনো উত্তরই করতে পারলনা। ব্যাগের হাতলে আঙুল চেপে ফেলল। কায়সান তার সব প্রতিক্রিয়া খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খেয়াল করল। পরক্ষণে একটি হাত বাড়িয়ে ইরামের কাঁধে তুলে দেয়া ওড়নার একটা অংশ নিজের মুঠোয় নিয়ে এলিয়ে দিয়ে বলল,
“মানুষ মরে যায়, মৃত্যু মানুষের ধর্ম। কিন্তু স্বপ্নের কখনো মরণ হয়না। তাকে শুধু খুঁজে নিতে হয়।”
ইরাম কোনো কথা বলতে পারলনা। বিকালের মিষ্টি আলোর মাঝে দাঁড়িয়ে নিষ্পলক চেয়ে রইল কায়সানের শ্যামলা মুখপানে।
“বৌদি, আপনার ক্লাস শেষ?”
হঠাৎ করে ভেসে আসা প্রশ্নটায় ইরাম চমকে উঠল। সে এবং কায়সান উভয়ে ফিরে তাকাল। কিছু দূরে পার্ক করে রাখা গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে অনুরাগ। ঠোঁটে মৃদু হাসি। পরনে স্যুট – প্যান্ট এবং টাই। বোঝা যাচ্ছে, নিজের কাজের জায়গা থেকে এসেছে।
“অনুরাগ? তুমি?”
অনুরাগ কাছে এগিয়ে এলো। একনজর কায়সানকে দেখে শেষমেষ পুনরায় ইরামের দিকে ফিরে জানাল,
“জি। আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে এসেছি। চলুন আমার সাথে।”
ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকল ইরাম। দুপুরে আফনান দিয়ে গেল, এখন অনুরাগ নিয়ে যাচ্ছে! কি অদ্ভুত! তার পিছনে কতজন লোক লাগানো হয়েছে? আশ্চর্য্য! কায়সান ইরামকে বলল,
“ওকে। আমার পাঁচ মিনিট পরে আরেকটা ক্লাস আছে। আমি তবে যাচ্ছি ইরাম, আগামীকাল দেখা হবে।”
ইরাম মাথা দোলালো। কায়সান আর দাঁড়ালনা। লম্বা পা ফেলে হেঁটে চলে গেল। অনুরাগের সঙ্গে গাড়ির দিকে এগোতে এগোতে ইরাম জিজ্ঞেস করল,
“তোমাদের বন্ধুদের আজ কোনো কাজবাজ নেই? সবাই সবকিছু ছেড়ে হঠাৎ আমার বডিগার্ডগিরি শুরু করেছ কেন?”
ইরামকে গাড়ির ভেতর তুলে দিয়ে অনুরাগ চোখ নাচিয়ে একটা কথাই বলল,
“বসের নির্দেশ।”
“তোমাদের বসটা কি মিস্টার চেরাগ আলী ওরফে গেঞ্জি সর্দার?”
অনুরাগ ইরামের প্রশ্নের উত্তর করলনা। হাসতে হাসতে সিটে উঠে বসল।
─────────────────────────────
রাস্তার অপর পাশের গাড়িতে বসে আছে সাইবান। এই গাড়িটা তার নিজের নয়। ভাড়ায় নিয়েছে। জানালায় ৭০ পার্সেন্ট টিন্ট থাকায় বাইরে থেকে দেখা যায়না ভেতরে কে আছে। গত প্রায় আড়াই ঘণ্টা যাবৎ সে এখানেই অবস্থান করছে। ইরাম যখন ক্লাসে ঢুকল, তখনি শুধুমাত্র সে বেরিয়ে আশেপাশে ঘুরে বেড়িয়েছে। আবার চারটা বাজার আগেই ফিরে এসে গাড়ির ভেতর বসেছিল। কায়সানের সঙ্গে ইরামের বেরিয়ে আসা এবং কথোপকথনের ঘটনাটা সে অদূর থেকে স্পষ্ট দেখেছে। এখন বসে বসে দেখল, অনুরাগ ইরামকে গাড়িতে তুলে দিল। বাড়ির গাড়িটা রাস্তা দিয়ে যখন এগোতে শুরু করল, তখন সাইবানও নিজের গাড়ি নিয়ে বেশ লম্বা একটা দূরত্ব রেখে গাড়িটাকে অনুসরণ করে গেল। পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ঠোঁটে পুরল সে। তার চোখজোড়া তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। কায়সানের চেহারাটা ভাসল তার চেহারায়। অতঃপর হুট করেই গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে একটা ঘুষি বসিয়ে দিল সে।
─────────────────────────────
বাড়িতে ফিরে ফ্রেশ হয়ে বেডরুমে এলো ইরাম। সারিকা আবার নিজের চেম্বারে ফিরে গিয়েছে। সুগন্ধা ইযানকে নিয়ে এসেছে। ছোট্ট ছেলেটা বিছানায় শুয়ে একটা বেলুন দিয়ে নিজে নিজেই খেলছে। ইরাম ছেলের কাছে গেল। তাকে কোলে নিয়ে গালে চুমু দিতে দিতে বলল,
“আমার আব্বুটা! আমার কুচুপু! তোমাকে আম্মু কত মিস করেছে জানো তুমি? হুমম?”
“আই!”
ইরামের গালে গাল ঘষতে লাগল ইযান। হাসল ইরাম। ছেলের সমস্ত চেহারায় চুমুর বর্ষণ ঘটিয়ে দিতে দিতে বলে গেল,
“ফুফির সাথে লক্ষ্মী হয়ে ছিলে? একটুও দুষ্টুমি করনি তো? ফুফিকে জ্বালাওনি তো?”
“নুই!”
“না? এইতো আমার বাবাটা, আমার জাদুটা, আমার লক্ষ্মীটা। আম্মু তোমাকে কত্ত ভালোবাসে!”
ইযান মায়ের কাঁধে লেপ্টে রইল একেবারে। ইরাম ছেলেকে নিয়ে বেশ খানিক আদুরে সময় কাটাল। যেন যে সময়টায় সে কাছে ছিল না, সেই সময়টুকু পুষিয়ে নিল। তারপর ইযানকে বিছানায় রেখে উঠে দাঁড়াল সে।
“আজকে গোসু গোসু করব আমরা। গরম পানি দিয়ে। ইযান সোনা গোসু করবে, তাইনা?”
“আই…গুই!”
গোসলের কথা শুনেই ইযান লাফিয়ে উঠল। এই একটামাত্র সময় যখন সে পানির কাছাকাছি থাকতে পারে। পানি তার সবথেকে প্রিয় খেলনা। এতটাই যে গোসু শব্দটা শুনলেই এখন উত্তেজিত হয়ে পড়ে। ছেলের আচরণ দেখে মনে মনে বেশ আনন্দিত হলো ইরাম। টেবিলের কাছে সরে এসে দাঁড়াল। এখানেই ইযানের শুকনো পোশাক ভর্তি বাস্কেটটা রাখে সে। তবে আজ হতবাক হয়ে খেয়াল করল, বাস্কেটটা নির্দিষ্ট জায়গায় নেই। মাথা কাত করে এদিক সেদিক তাকাল। বারান্দায় কিংবা কোথাও ঝোলানো কোনো কাপড়ও অবশিষ্ট নেই। ব্যাপার কি? বাস্কেট গেল কোথায়? অন্য কোথাও রেখেছে বলেও তো মনে পড়ছেনা। এইতো সকালেই শুকাতে দেয়া কাপড়গুলো এনে বাস্কেটে ভাঁজ করে রাখল সে। তন্ন তন্ন করে গোটা রুম খোঁজা হয়ে গেল ইরামের। কিন্তু কোথাও সে বাস্কেট খুঁজে পেলনা। এদিকে ইযান অধৈর্য্য হয়ে উঠেছে। ছোট্ট ছোট্ট হাত পা ছুঁড়ে গুঙিয়ে যাচ্ছে, যেন জননীকে তাড়া দিচ্ছে। কিছুক্ষণ চুপচাপ ভেবেও কূলকিনারা করতে না পেরে ইরাম শেষমেষ সুগন্ধাকে ডেকে জিজ্ঞেস করার কথা ভাবল। ঠিক যে মুহূর্তে সে ডাকতে গেল, তখনি তার চোখ পড়ল উপরের দিকে।
রুমটার ইন্টেরিয়র খুবই আধুনিক। তাই দেয়ালের একদম উপরে কিছু বক্স ক্যাবিনেট দেয়া হয়েছে, ভারী এবং প্রয়োজনীয় কিছু যা বছরে একবার দুবার ব্যবহার হয় গুছিয়ে তুলে রাখার জন্য। সেই কেবিনেটগুলোর উপরে তাকের মতন ফাঁকা জায়গা। সেই তাকের উপরে ইযানের বাস্কেটটা! হতভম্ব হয়ে গেল ইরাম। ওই বাস্কেটের কি হাত পা গজিয়েছে? ওই উপরে উঠল কীভাবে? এখানে সেখানে পরে থাকলে সে মেনে নিত, কিন্তু এত উপরে আছে যে ইরাম সোফায় উঠে দাঁড়ালেও নাগাল পাবেনা! সে কি ঘুমের ঘোরে কোলা ব্যাঙের মতন লাফ দিয়ে বাস্কেট উপরে রেখেছে? অসম্ভব! এ নিশ্চয়ই অন্য কারো কাজ! যে কাজ সুগন্ধা, সামিয়া, সারিকা কেউই করবেনা। করার প্রশ্নই আসেনা। কেউই অত উঁচুতে নাগাল পাবেনা।
ঠিক এমন মুহূর্তেই রুমে ঢুকল সাইবান। ইরামের দিকে তাকালনা অব্দি। আপনমনে হেলেদুলে হাঁটতে হাঁটতে ক্লজেটের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। ড্রয়ার খুলে এমনভাবে কিছু খুঁজতে লাগল যেন এখানে থাকতে বয়েই গিয়েছে তার, বেরিয়ে যেতে পারলেই মঙ্গল। ইরাম একনজর সাইবানের দিকে তাকাল, পরক্ষণে বাস্কেটের দিকে। বুঝতে আর কিছুই বাকি রইলনা তার।
—আলাদিন! বাস্কেটটা একটু নামিয়ে দাও না!
এই একটা বাক্য শোনার আশায় একজনের কান পঁচে যাচ্ছে সেটা তার খুব ভালো করেই জানা আছে। সেদিনের ঝগড়ার পর থেকে সাইবান এখন পর্যন্ত তার সাথে একটাও কথা বলেনি নিজে থেকে। সেক্ষেত্রে ইরামকে দিয়ে কথোপকথন শুরুর এর চেয়ে ভালো কোনো পন্থা হয়না। হুট করে শয়তানি ভর করল ইরামের মাথায়। শাড়ির আঁচল টেনে কোমরে গুঁজল সে।
“গাছের ডালের খেলোয়াড় কি বুঝবে পাতার খেলোয়াড়ের কামাল?”
ইচ্ছাকৃতভাবে খানিকটা জোরেই উচ্চারণ করল ইরাম। সাইবান কান খাড়া করে স্পষ্ট শুনল। দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পিছনে তাকিয়েই হতভম্ব হয়ে গেল। ইরাম টেনে একটা চেয়ার রেখেছে তাকের নিচে। সেটার উপর আবার একটা টুল, সেই টুলের উপর দুটো শক্তপোক্ত কাঠের মোটা বক্স। তরতর করে উঠে গেল সে উপরে। একপাশের দেয়ালের থামে ভর দিয়ে ভারসাম্য রেখে অপর হাতটা তুলে ছুঁয়ে দিল বাস্কেটের ঝুলে থাকা হাতলটা। সাইবানের চোয়াল ঝুলে পড়ল। হা করে তাকিয়ে রইল সে দৃশ্যপটে। একটা হ্যাঁচকা টান মারল ইরাম। বাস্কেটটা স্লাইড করে একেবারে তার হাতের মাঝে এসে পড়ল। সেটাকে উপর থেকে মেঝেতে ছুঁড়ে রেখে বিজয়ীর ভঙ্গিতে হাত ঝাড়ল ইরাম।
“একটু চালাক না হলে দুনিয়াতে টেকা মুশকিল।”
সরাসরি সাইবানের দিকে তাকাল সে। ছেলেটার মুখ মহা বিস্মিত, আতঙ্কিত, ব্যর্থ, পরাজিত, জর্জরিত। ক্লজেটের দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে পরাজিত সৈনিকের ভঙ্গিতে শিরদাঁড়া ঝুঁকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল সাইবান। যেন কেউ ভ্যাকুয়াম ক্লিনার দিয়ে ময়লার বদলে তার সবটুকু আত্মার শক্তি শোষণ করে নিয়েছে।
“বান্দরের ঝি বান্দরনি!”
সাইবান ফিসফিস করে উচ্চারণ করলেও ইরাম স্পষ্ট শুনতে পেল। আপনমনে বিজয়ীর হাসি হাসল সে। ধীরে ধীরে সব ধাপ পেরিয়ে অবশেষে চেয়ারের উপর এসে নেমে দাঁড়াল সে। এতক্ষণ যাবৎ তরতর করে সফল হওয়ায় আত্মবিশ্বাস বেড়ে গিয়েছে তার। বিনা চিন্তায় মেঝেতে পা রাখতে গিয়ে হঠাৎ করে একটা অঘটন ঘটিয়ে ফেলল সে। হাঁটুতে ধাক্কা খেয়ে চেয়ারের উপরে বসানো টুল নড়ে ওঠায় ইরাম ভারসাম্য হারিয়ে ফেলল, সে দুলে উঠতেই চেয়ারটাও নড়ে উঠল ভয়ানকভাবে। ইরামের পা হড়কে গেল। অদূর থেকে দৃশ্যটা দেখল সাইবান। সবকিছু ফেলে তৎক্ষণাৎ বিদ্যুৎ গতিতে এগিয়ে গেল সে। এক দীর্ঘ লাফে ইযানের উপর দিয়ে বিছানা টপকে অপর পাশে পৌঁছাল সে। খেয়ালও করলনা কত মুগ্ধতা নিয়ে বড় বড় চোখে প্লেন উড়ে যাওয়ার মতন করে পিতাকে উড়ে যেতে দেখে হাততালি দিচ্ছে ইযান। ইরাম অজান্তেই চিৎকার দিয়ে উঠল,
“আহহহহ…”
“ওহ ফাক!”
সাইবানের অস্ফুট কন্ঠস্বর। ইরাম চোখ বুঁজে ফেলল। বুঝতেও পারলনা কি হচ্ছে। শুধু মনে হলো ক্ষণিকের জন্য হাওয়ায় ভাসছে তার শরীর। তারপরই পাথরের মতন শক্ত কিছু একটার সঙ্গে ধাক্কা লাগল তার। একজোড়া শক্তিশালী বাহু জড়িয়ে গেল তার শরীরজুড়ে। তারপরই মেঝেতে ধপাস করে পড়ল সে, কারো বুকের উপর। এতটা জোরে আছড়ে পড়েছে দুজন যে ধপাস করে একটা শব্দ হলো, সঙ্গে চাপা গোঙানি। ইরাম নড়চড় করে উঠল, নিজের ঠোঁটের নিচে নরম কিছু একটার অস্তিত্ব টের পেল। ঝট করে চোখজোড়া খুলে গেল তার। সঙ্গে সঙ্গে জমে গেল সে।
তার ঠিক নিচেই সাইবান। বড় বড় চোখ মেলে তাকিয়ে আছে এমনভাবে যেন বৈদ্যুতিক শক খেয়েছে। ইরাম বাকরুদ্ধ হয়ে আবিষ্কার করল, হঠাৎ নড়ে ওঠায় তার ঠোঁটজোড়া আলতোভাবে সাইবানের ঠোঁট ছুঁয়ে গিয়েছে। বুঝতে পেরে তৎক্ষণাৎ মুখ দূরে সরিয়ে নিল সে। হাঁপাতে হাঁপাতে সাইবানের মুখের দিকে চেয়ে রইল।
“স…সরি…আমি ইচ্ছা করে করিনি।”
সাইবান রোবটের মতন পরে আছে। তার চোখ নড়ছেনা, হাত পা শিথিল, মনে হয় যেন নিঃশ্বাস অবধি নিচ্ছে না! হুট করে পুতুলের মতন হাত তুলে ইরামকে নিজের উপর থেকে সরিয়ে উঠে বসল সাইবান। একটা শব্দও উচ্চারণ করলনা। নেশার ঘোরে থাকলে মানুষ যেমন করে হেলেদুলে হাঁটে, তেমনি টলতে টলতে সাইবান রুমের বাইরে চলে গেল। উঠে দাঁড়িয়ে বুক চেপে ধরে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল ইরাম। এইমাত্র কি হয়ে গেল এখানে? হৃদযন্ত্র থামছেই না তার। অস্বাভাবিকভাবে দৌড়াচ্ছে ঘোড়ার মতন করে। ঠিক সেকেন্ডের মাথায় ইরামের কানে আরেক দফায় ধপাস করে একটা শব্দ ভেসে এলো। তারপরই সুগন্ধার চিৎকার,
“আম্মা! ভাইজান সিঁড়ি দিয়া পিছলাইয়া পইড়া গেসে!”
—চলবে—
Share On:
TAGS: আমার আলাদিন, জাবিন ফোরকান
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
আমার আলাদিন পর্ব ২৩
-
আমার আলাদিন পর্ব ৪
-
আমার আলাদিন পর্ব ২৫
-
আমার আলাদিন পর্ব ১০
-
আমার আলাদিন পর্ব ১১
-
আমার আলাদিন পর্ব ১
-
আমার আলাদিন পর্ব ২২
-
আমার আলাদিন পর্ব ১২
-
আমার আলাদিন পর্ব ২১
-
আমার আলাদিন পর্ব ১৯