আমার_আলাদিন
জাবিন_ফোরকান
পর্বসংখ্যা১২
আজকে ইযানকে ডাক্তার দেখানো হবে। তাই বেশ সকাল সকালই উঠে পড়েছে ইরাম। হিসাবমতে আজ তার বিয়ের দ্বিতীয় দিন। তবে বিশেষ কোনো অনুভূতি নেই তার মাঝে। গোটা চিন্তাই ছেলেকে ঘিরে। ফ্রেশ হয়ে ইযানকে খাইয়ে তৈরি করিয়ে নিজেও রেডি হয়ে নিল সে। বিয়ের উপহার হিসাবে বেশ কয়েকটি নতুন শাড়ি পেয়েছে। সেগুলো থেকেই গাঢ় বেগুনি রঙের একটা বাছাই করে পড়ল। গোসল করে নিয়েছে তাই চুলগুলো হালকা ভেজা। সেগুলোই খোলাই রাখল। অতঃপর ইযানকে কোলে তুলে সিঁড়ি বেয়ে পায়ে পায়ে নেমে এলো নিচে। নাস্তার টেবিল সাজানো। সামিয়া আর সারিকা খেতে বসেছে। সারিকার স্বামী মিসির গতকালই চলে গিয়েছে। তাদের ফ্ল্যাটের ইন্টেরিয়রের কাজ চলছে। ভাঙাচোরা ব্যাপার। তাই বউকে বেশ কিছুদিন বাপের বাড়িতেই রাখবে। সে নিজে সপ্তাহে একবার দুবার করে আসবে। তাই বলতে গেলে সারিকা একটা দীর্ঘ সময়ের জন্য এই বাড়িতেই থাকতে চলেছে। ইরামের বিশেষ কোনো মতামত নেই এই সম্পর্কে। তবে মেয়েটার সামনে তাকে সাবধান হয়ে চলতে হবে।
ইরাম সামিয়াকে সালাম দিয়ে চেয়ার টেনে বসল। সুগন্ধা তার প্লেট তৈরি করে হাত মুছে বলল,
“আপা আপনি খান। আমি রেডি হইয়া নেই।”
নিজের রুমের দিকে চলে গেল মেয়েটা। সামিয়া দ্রুত খাচ্ছেন, হাসপাতালে যাওয়ার তাড়া আছে। তবুও চোখের চশমাটা ঠিকঠাক করে তিনি শুধালেন,
“কি ব্যাপার? সাইবানকে দেখছি না যে? রেডি হয়নি এখনো? যাবেনা তোমাদের সাথে?”
“জানিনা। ঘুম থেকে উঠে রুমে দেখিনি।”
“সেকি! ওকে আমি কাল রাতে পইপই করে বলে দিলাম আজকে ডাক্তারের অ্যাপয়েনমেন্ট আছে।”
“তোমার ছেলে কি গোয়ালের গরু? সে পাগলা ঘোড়া। তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা যায়না।”
সারিকা মন্তব্য করল। কাঁটাচামচ দিয়ে দই মেশানো ফ্রুট সালাদ খাচ্ছে সে। তবে ইরাম ননদের কথাটা গায়ে মাখলনা। ইযানকে উরুর উপর বসিয়ে দোলাতে দোলাতে খানিকটা পাউরুটি ছিঁড়ে মুখে দিল, অতঃপর তাকাল সামিয়ার দিকে। নরম অথচ আত্মবিশ্বাসী গলায় বলল,
“খালামণি, আমার মনে হয় আলাদিনকে কিছুটা সময় দেয়া উচিত।”
সামিয়া ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন। ইরাম গতকাল রাতেও এক কথা বলেছে। ইযানকে ডায়পার পড়াতে গিয়ে সাইবান প্রায় বমিই করে দিচ্ছিল দেখে সে পরে আর তাকে কিছু করতে দেয়নি। সাইবানও বুঝি হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছে। সামিয়াকে চেয়ে থাকতে দেখে ইরাম ব্যক্ত করল,
“এই বিয়েটা ওর মনের খুশিতে হয়নি। উপরন্তু একটা বাচ্চা সামলানো চাট্টিখানি কথা নয়। আলাদিনের বয়স কম, ওর মাঝে এখনো দায়সারা দায়িত্বজ্ঞানহীন ভাবটা রয়ে গিয়েছে। এর জন্য ওকে দোষ দেয়া যায়না। স্বাভাবিক ওর সময় লাগবে। আমরা ওকে নিস্তার দেই, কেমন? তাছাড়া, আমার মনে হয়না আমার বিশেষ কোনো সাহায্যের প্রয়োজন আছে। আমার ছেলেকে আমি নিজেই সামলাতে জানি। আলাদিন নিজে থেকে না চাইলে ওকে ঘাঁটানোর দরকার নেই।”
“অদ্ভুত হলেও সত্য আপুর এই কথার সাথে আমি একমত। তুমি সাইয়ের উপরে অনেক বেশি চাপ দিয়ে ফেলছ, মম। বউ কি জিনিস সেটা বোঝার বয়সই যার হয়নি সে আবার বাচ্চা পালবে কীভাবে?”
সারিকা নির্দ্বিধায় নিজের মতামত জানাল। একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন সামিয়া। পরক্ষণে চশমা খুলে খানিক থম মেরে বসে রইলেন। ইরাম একটা গোটা পাউরুটি শেষ করে দ্বিতীয়টা খাচ্ছিল তখনি তিনি মুখ খুললেন,
“তোরা সবাই আমাকে নিষ্ঠুর মা ভাবছিস, তাইনা?”
সারিকার চামচ থেমে গেল, অপরদিকে ইরাম চিবানো ভুলে বসল। উভয়ে প্রসারিত নয়নে দেখল সামিয়াকে। যাকে বেশ হতাশ লাগছে।
“আমি নিজেও জানি ওর উপর আমি চাপ দিচ্ছি। ইরাম, তুই হয়ত ভাবছিস শুধু তোর ভালোর কথা ভেবেই আমি এই বিয়েতে জোরাজুরি করেছি। বিষয়টা কিন্তু এমন না। আমি স্বার্থপর। আমি নিজের ছেলের জন্যও করেছি।”
না চাইতেও সারিকা আর ইরাম একে অপরের দিকে তাকাল। উভয়েই আবার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। সামিয়া একটু সময় নিয়ে বলতে শুরু করলেন,
“সাইবান আগে এমন ছিলনা, তুই তো জানিস ইরাম। তুই তো ওকে ছোটবেলা থেকে দেখেছিস। একটা ভদ্র, মিষ্টভাষী বাচ্চা ছিল। হ্যাঁ, রাগটা ঠিকই নাকের ডগায় রাখত কিন্তু বর্তমানের মতন এত সিরিয়াস অবস্থা ছিলনা। হঠাৎ কি যেন হলো। সবকিছু বদলে গেল। আমার ব্যস্ত জীবন। বাড়িতে সময় দেয়া হয়েছে খুব কম। বলতেও পারবনা কীভাবে, কোনদিন, কেন আমার ছেলেটা একটু একটু করে অন্যরকম হয়ে গেল। আমি বলব না ও এখন খারাপ হয়ে গিয়েছে বা বিগড়ে গিয়েছে, কিন্তু লাগামছাড়া হয়ে পড়েছে। বেপরোয়া, আনসিরিয়াস। জীবন নিয়ে ওর কোনো প্ল্যানই নেই। ওকে জিজ্ঞেস করলেই শুধু বলে, আজকের জন্য বাঁচি, কালকের কথা ভেবে লাভ কি?”
চুপ করে রইল ইরাম। কেন যেন তার খারাপ লাগছে। সাইবানের ওই পরিবর্তনের সময়টা সে দেখেনি, অনুভবও করেনি। সোজা ছোটবেলা থেকে বড়বেলায় দেখেছে। কীভাবে বোঝা সম্ভব? কিন্তু সামিয়া সবটাই চোখের সামনে দেখেছেন নিজের। তাই মা হিসাবে তার চিন্তাটা স্বাভাবিক। সামিয়া ব্যাগ থেকে কাপড় বের করে নিজের চশমাটা মুছতে মুছতে বললেন,
“সাইবানের চিন্তাধারা আধুনিক লেভেলের। ওকে বুঝতেই আমি এই জেনারেশনের সাথে তাল মিলিয়ে চলা শিখেছি। অতঃপর বুঝেছি, ওদের কাছে এমন অনেক কিছুই স্বাভাবিক যা আমাদের কাছে অস্বাভাবিক। ছেলে মানুষ, কারণ অকারণে না করা যায়না। সবসময় চোখে চোখে রাখা যায়না, ধরে বেঁধে রাখাও যায়না। আমি চাইও না। একটা মানুষ মুক্ত, স্বাধীন। তাকে অন্যের অনুশাসনে আনার কোনো মানে হয়না। তাই আমি সবসময় চেয়ে এসেছি, যদিও বা আমি না পারি তবে ওর জীবনে এমন কেউ আসুক যে ওকে বাস্তবতা শেখাবে। ওকে ওর মতন করে বুঝতে পারবে, ওকে সামলে রাখতে পারবে। আমি চেয়েছি আমার ছেলেটা একটু পরিবার আসক্ত হোক। যখন তুই আমার কাছে এলি, তখন মনে হলো তোর থেকে অভিজ্ঞ মানুষ হয়না। তুই জীবনটাকে অনেক রঙে দেখেছিস। অনেক লড়াই করেছিস। তাই হ্যাঁ, এই বিয়েটা যতখানি তোর আর তোর ছেলের ভালোর জন্য দিয়েছি, ঠিক ততখানি আমার নিজের ছেলের জন্যও।”
থামলেন সামিয়া। কয়েক মুহূর্ত নিঃশব্দে বসে থাকলেন। তারপর গ্লাস থেকে বেশ অনেকটা পানি পান করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।
“তবে হ্যাঁ ইরাম, তুই ঠিকই বলেছিস। আমি হয়ত কম সময়ে বেশি আশা করে ফেলেছি। দায়িত্ব শিখতে, বুঝতে আর পালন করতে সময় লাগে। আমি আর এসব বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার চেষ্টা করব। আচ্ছা, তুই যা তাহলে। হাসপাতালে আজ আমার অনেক লম্বা ডিউটি। আমি নাহয় সময় বের করে তোর সাথে….”
“না না। দরকার নেই খালামণি। এইযে সুগন্ধা গেল রেডি হতে। ওকে নিয়ে যাব। তাছাড়া গাড়িতেই তো যাব আসব, তুমি চিন্তা করোনা।”
সামিয়া আর দ্বিমত করলেন না। ফোন এসেছে জরুরী। সেটা রিসিভ করে কানে লাগিয়ে ব্যাগ হাতে হাঁটা দিলেন বাড়ির বাইরের দিকে। সারিকাও আর বেশিক্ষণ টেবিলে থাকলনা। নিজের মায়ের কথাগুলো তাকেও ভাবুক করে তুলেছে বোধ হয়। ইরাম চেয়ারে বসে ধীরে সুস্থে নাস্তা শেষ করল। অতঃপর সুগন্ধাকে নিয়ে ঘণ্টাখানেক বাদে বেরোলো অ্যাপয়েন্টমেন্টের উদ্দেশ্যে।
─────────────────────────────
সমুদ্র থেকে ভেসে আসা নোনা বাতাস শরীরে লাগলে আলাদাই একটা অনুভূতি হয়। সুবিশাল সমুদ্রের সামনে নিজেকে তুচ্ছ লাগে। অথচ মনটা হয় ফুরফুরে। বালি দ্বীপের সমুদ্রসৈকতে বালির আস্তরণের উপর শুয়ে প্রকৃতির মায়া উপভোগ করতে বেশ লাগছে অরণ্যর। তার সঙ্গিনী এস্কোর্ট মেয়েটা চেয়ারে বসে সানস্ক্রীন মাখছে শরীরে। বিদেশিনীর পরনে সি বিচে ব্যবহৃত অতি ছোট সাইজের পোশাক। ওটাকে পোশাক না বলে অবশ্য অন্তর্বাস বলাই শ্রেয়। অরণ্য তাকিয়ে থাকল। গতকাল সারারাত একসাথে কাটানোর পরেও বিশেষ কোনো টান আসছে না। কোনো জিনিস একবার ব্যবহার করে ফেললেই আবার তার ভালো লাগেনা। অথচ একটা জিনিস আছে, যেটার প্রতি সে চরম আসক্ত এবং এই মুহূর্তে অনেকখানি রুষ্ট।
ইরাম খেলতে চাইছে তার সঙ্গে। মেয়েটার দম আছে বলতে হয়। বেশ তবে, ইরামের সঙ্গে তার মতো করেই খেলা হবে। মেয়ে মানুষ আজ হোক কাল হোক ভাঙ্গবেই। অরণ্য শুধু বসে বসে সেই ভাঙার অপেক্ষা করবে। ইরামকে তার কাছে ফিরে আসতেই হবে। অরণ্য নিজে আনবেনা। নিজের ইচ্ছায় দুই পায়ে হেঁটে হেঁটে আসবে তার দুয়ারে। এর চাইতে মধুর কোনো দৃশ্য হয়না। যে পায়ে হেঁটে আসবে, সেই পা দুটোকে সে সেদিন রাতে কাঁধের উপর উঠিয়ে নেবে। বুঝিয়ে দেবে এতদিন যাবৎ ইরাম কি মিস করে গিয়েছে।
“ওয়ানা গেট ইনটু ওয়াটার?”
অরণ্য উঠে বসে বিদেশিনীকে শুধাল। মেয়েটি মাথা নাড়ল,
“নো ওয়ে! আ’ম নট রিস্কিং মাই স্কিন।”
“স্যুট ইওরসেল্ফ।”
অরণ্য উঠে দাঁড়াল। হাফহাতা রঙিন শার্টটা খুলে রেখে উদাম শরীরে হেঁটে হেঁটে পানির কাছে গিয়ে দাঁড়াল। নোনা জল তার পা ছুঁয়ে গেল। বিরাট হেসে সে ডাইভ দিল। বেশ কিছুক্ষণ সাঁতার কাটার পর পানি থেকে মুখ তুলল সে। সমস্ত শরীর বেয়ে টপটপ করে গড়ানো পানির ফোঁটাগুলো সূর্যের আলোয় চিকচিক করতে লাগল। পেটানো শরীরের মাংসপেশীগুলো ফুলেফেঁপে উঠল তার প্রতিটা কদমের সঙ্গে। কালো চুলগুলো লেপ্টে রইল কপালে। হালকা দাড়ি গজিয়েছে কয়েকদিনে। রুক্ষ থুতনিতে হাত ঘষে সে খেয়াল করল বিচের অন্যান্য কিছু রমণী তাকেই দেখছে। কেউ বা লুকিয়ে, কেউ আবার কোনো রাখঢাক বাদেই। বাঁকা হাসি ফুটল অরণ্যর ঠোঁটে। সে জানে, ফিরে যাওয়ার পথে এদের মধ্যে অনেকেই তার সঙ্গে কথা বলতে চাইবে।
“অ্যারন! অ্যারন!”
নিজের সৌন্দর্য নিয়ে বেশিক্ষণ সুখসাগরে ভাসতে পারলনা অরণ্য। বিচে দাঁড়ানো তার বিদেশিনী এস্কোর্ট এক হাতে একটা ফোন তুলে লাফাচ্ছে। ওটা অরণ্যর ফোনই। অরণ্য নামটা বিদেশীরা উচ্চারণ করতে পারেনা বিধায় সবসময় বিকৃত করে ফেলে। অরণ্য উঠে এলো। এক হাতে চুল ঝাড়তে ঝাড়তে মেয়েটার দিকে গিয়ে নিজের ফোনটা খপ করে হাতে নিলো। দেশ থেকে কল এসেছে। চেয়ার থেকে তোয়ালে তুলে কাঁধে ছড়িয়ে সে রিসিভ করল ফোন,
“বল।”
ওপাশ থেকে কিছু একটা বলা হলো। সবকিছু শুনে ক্ষেপে যাওয়ার বদলে অরণ্যর ঠোঁটের হাসিটা আরও বিস্তৃত হলো। ধারণ করল এক অশুভ রূপ। কেউ দেখলনা সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে তার চোখজোড়া কেমন হিংস্র জন্তুর মতন জ্বলজ্বল করে উঠল। শিকারী শিকারের গন্ধ পেলে ঠিক যেমন করে, অরণ্যর মাঝেও তেমন অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে। জিভে নিজের নিচের ঠোঁটে লেহন করে নিয়ে অরণ্য বলল,
“আই সি।”
ফোনটা কান থেকে নামিয়ে স্ক্রীনের দিকে তাকাল,
“তাহলে তুমি এইভাবে আমার অ্যাটেনশন আদায় করতে চাও ডার্লিং? বেশ! তোমার পাওনা অ্যাটেনশন তোমাকে দেয়া হবে, খুব শীঘ্রই। জাস্ট ওয়েট ফর মি মাই ওয়ার্ল্ড।”
─────────────────────────────
ইযানকে চেকআপ করানো হয়েছে। ডাক্তার বেশকিছু উপদেশ দিয়েছেন। আপাতত নতুন পরিবেশ বলে ইযান মাঝে মাঝে ছটফট করছে এমনটাই বলা হয়েছে। মানিয়ে নিতে সময় লাগবে। বাকিটা রিপোর্ট এলে বোঝা যাবে।
দুপুর হয়ে গিয়েছে প্রায়। ইরাম চেম্বার থেকে বেরিয়ে করিডোর ধরে হাঁটছে, তার পাশে সুগন্ধা। ইযান প্রতিদিনকার তুলনায় একটু বেশিই শান্ত আজ। ডাক্তারের সামনেও তেমন হম্বিতম্বি করেনি। ইরামের বুকে মুখ গুঁজে পরে আছে। চেম্বারের বাইরে আরও মানুষ অপেক্ষা করছে। সকলেই ছোট ছোট শিশু। একদম বেশি ছোট কিংবা নবজাতক শিশুদের সঙ্গে মা বাবা দুজনই এসেছে। এইতো, ইরাম বের হতেই এক তরুণ দম্পতি তাদের দুই মাসের বাবুকে নিয়ে চেম্বারে ঢুকল। দৃশ্যটা মনোরম, তার সঙ্গে আবেগঘনও। একজন শিশুর দায়িত্ব উভয় পিতা মাতার। যেকোন প্রয়োজনে উভয়ের উপস্থিতি শুধুমাত্র দম্পতির বন্ধনই শক্ত করেনা বরং শিশুর জন্যও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। কারণ সে নিজের চোখে দেখে বড় হয় তার পিতা মাতার মাঝে সুসম্পর্ক আছে। সেটাই সে ভবিষ্যৎ জীবনে অনুকরণ করে। মলিন এক হাসি ফুটল ইরামের ঠোঁটে। ইযানের বাবা মানুষটা মোটেও কোনো উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত নয়। ওই লোকটাকে এখানে সে কামনাও করেনা। তার ছায়া ইযানের উপর পড়ুক সেটাও চায়না। তবে ইযান যে কোনোপ্রকার সুস্থ সম্পর্কের বন্ধন দেখা ছাড়াই বড় হতে চলেছে সেটা তার কাছে স্পষ্ট।
“আপা, গাড়িটা একটু সুপারশপের সামনে থামাইতে বইলেন। ওইখানে মাশরুম পাওয়া যায়। আজকে আমি আপনাকে মাশরুমের স্যুপ কইরা খাওয়াব। অনেক মজা।”
সুগন্ধা নিজের কথা বলে যাচ্ছে। ইরামের শুনতে ভালোই লাগছে। করিডোরের শেষ প্রান্তে পৌঁছে গিয়েছে তারা প্রায়। ঠিক এমন সময়েই সামনের দৃশ্য লক্ষ্য করে ইরামের পদক্ষেপ থেমে গেল। করিডোরের শেষে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সাইবান। একটা ওভারসাইজড হাফ হাতা টি শার্ট আর ঢোলা ট্রাউজার পরনে। চুলগুলো হালকা ভেজা ভেজা, ঘেমে গিয়েছে। কপালে ছড়িয়ে আছে। আইব্রো পিয়ার্সিংটা চিকচিক করছে। এক হাতে ফোন ধরা, কিছু একটা করছে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে। ইরাম থেমে দাঁড়াতেই মুখ তুলে তাকাল সে। তারপর ফোনটা ট্রাউজারের পকেটে ঢুকিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো।
“তুমি এখানে?”
অবাক না হয়ে পারলনা ইরাম। সাইবান মাথা কাত করে দেখল তাকে। তারপর জিজ্ঞেস করল,
“কেন? শাহরুখ খানকে আশা করছিলেন?”
“না। অনুরাগকে আশা করছিলাম। ভালো আর হ্যান্ডসাম ছেলে।”
ইরাম জানেনা হুট করে সে এমন জবাব কেন দিল। সাইবানকে দেখতে দেখতে ছেলেটার প্রভাব তার নিজের উপরেও পড়তে শুরু করেছে বোধ হয়। অনুরাগের কথা শুনে ভ্রু কুঁচকে ফেলল সাইবান। তার চোখমুখের শান্ত ভাবটা হুট করেই অশুভ হয়ে উঠল।
“শুধু অনুরাগ কেন? স্যালাইন আর ওর বাচ্চাটা কি দোষ করেছে? ওদেরও আশা করতেন। না না, শুধু ওদের কেন? পুরো পাড়া মহল্লাকে আশা করতেন। পৃথিবীর সকল মানুষকে আশা করতেন। পৃথিবীর বাইরে মঙ্গলের মঙ্গোলিয়ানদেরও আশা করতেন। এরিয়া ফিফটি ওয়ান থেকে এলিয়েনদের আশা করতেন!”
“ভাইজান থামেন থামেন। যে হারে আগাইতেসেন, নাসার আগে আপনিই মহাবিশ্বের বাইরে বাইর হইয়া যাবেন।”
সুগন্ধার দিকে কটমট করে তাকাল সাইবান,
“জরিনার আম্মা সকিনা, পটকে দিয়ে চটকে ফেলব একদম! আমি আবার নারী পুরুষ সমান অধিকারে বিশ্বাসী, পরে শাহবাগে গিয়ে গলা ছিঁড়লে লাভ হবেনা, দেখিস কিন্তু!”
পরক্ষণেই ইরামের দিকে ঘুরে দাঁড়ালো সে,
“আর আপনি! স্বামী আসবে না তো কোন খাদানের খনি আসবে আপনার কাছে শুনি?”
“ওবাবা, স্বামী? আমার আছে? বুঝতেই পারিনি।”
ইরাম মজা করল। সাইবানকে ক্ষেপতে দেখে বেশ লাগছে তার। তীর্যক এক হাসি ছুঁয়ে গেল বান্দার ঠোঁটে। আশেপাশে মানুষের উপস্থিতির কোনো পরোয়া না করেই হুট করে ঝুঁকে এলো সে। সুগন্ধার বড় বড় রসগোল্লার মতন চোখের দৃষ্টি উপেক্ষা করে ইরামের কানে কানে সে ফিসফিস করল,
“বুঝতে পারছেন না? নাকি বুঝতে চাইছেন না?”
সাইবানের একটি হাত উঠে এলো ইরামের কাঁধে। ভাঁজ করে তুলে দেয়া তার শাড়ির আঁচলটি আঙুলে ছুঁয়ে দিয়ে যুক্ত করল,
“ডোন্ট ট্রাই টু প্লে উইদ ইওর হাবি, আ’ম দ্যা কোচ অব দিস গেইম মিসেস বেগুনি।”
ধ্বক করে বুকের ভেতর একটা কাঁপুনি হলো ইরামের। ঠোঁটজোড়া অনুভবে ফাঁক হয়ে পড়ল। প্রসারিত দৃষ্টিতে দেখল সে সাইবানকে। বৃদ্ধাঙ্গুলে অধর ঘষতে ঘষতে আপাদমস্তক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ইরামকে দেখছে সে। চোখাচুখি হতেই জিভ গালে ঠেকিয়ে অদ্ভুত ভঙ্গিটা করল সে, একেবারে বাজে অভ্যাস! ভয়ানক অভ্যাস!
“গাড়িতে পায়ে হেঁটে যাবেন নাকি শাড়িতে কোলে তুলে নেব?”
ইরামের গাল দুটো হালকা লাল হয়ে উঠল। এটুকুই। সে বেশি অনুভূতি দেখালনা আর। দ্রুত এগোলো করিডোর ধরে। পিছনে নীরবে হাসতে হাসতে এলো সাইবান। তার নয়নজোড়া ঘুরপাক খেতে লাগলো সামনে হেঁটে চলা ইরামের বেগুনি শাড়ি জড়ানো অবয়বে।
ড্রাইভারের পাশে বসল সুগন্ধা। পিছনে ইরাম আর সাইবান। সুগন্ধার কথামত সুপারশপের সামনে থামা হলো। বেচারি ড্রাইভারকে সঙ্গী বানিয়ে নাচতে নাচতে পছন্দের মাশরুম কিনতে চলে গেল। গাড়ির ভেতর এখন শুধু সাইবান আর ইরাম। ইযান ইরামের কোলে নড়াচড়া করছে। আশেপাশে দেখছে কৌতূহলী দৃষ্টিতে। বাইরে গেলেই সে এমন করে। ইরাম ছেলেকে দোলাতে দোলাতে হঠাৎ জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখল রাস্তার একপাশে ভুট্টাওয়ালা বসেছে। তার মনে পড়ল, কলেজ ভার্সিটি যাওয়ার সময় এভাবেই ভুট্টা খাওয়া হত। বিকালে ভাইদের নিয়ে বেরোলে দুজনই বায়না ধরত। পুরাতন স্মৃতিগুলো তাকে নস্টালজিক করে তুলল মুহূর্তেই। সাইবান আড়চোখে দৃশ্যটা খেয়াল করেছে। দ্বিতীয় কোনো কথা না বলেই গাড়ির দরজা খুলে সে বাইরে পা রাখল।
“পোটলার দাঁত হয়নি তো কি হয়েছে? পোটলার মায়ের তো হয়েছে। তার সামনে আমার চেঙ্গিস ফেইল!”
বলেই সে হাত বাড়িয়ে দিল ইরামের দিকে,
“ভুট্টা চলবে?”
ইরাম প্রথমটায় সাইবানের বাড়িয়ে দেয়া হাতের দিকে অপলক চেয়ে রইল। পরক্ষণে হাতটা ধরল। এই নিয়ে দ্বিতীয়বার হাতটা ধরা হলো তার। সাইবান আর ইরাম দুজনই হেঁটে ভুট্টাওয়ালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
“মামা চারটা ভুট্টা।”
“চারটা কেন?”
ইরাম সাইবানকে জিজ্ঞেস করতেই ভ্রু তুলে বলল,
“বাবারে। ড্রাইভার আর সকিনা? জরিনার আম্মা সকিনা আমার পেট কেটে ভুট্টা বের করে খাবে ওকে না দিলে, ওকে চেনেননি আপনি!”
“যাহ্, মেয়েটা অতটাও খারাপ না যতটা তুমি মনে করো।”
“নতুন নতুন তো, আপনাকে শরম পেয়েছে। দুইদিন ওয়েট করুন, ওর নাগিনী রূপ এই বেরোলো বলে। সারাদিন নাগিন সিরিয়াল দেখতে থাকলে তো এমনি হবে।”
ইরাম ফিক করে হেসে ফেলল। বাড়ির মালিকের সঙ্গে সেখানে একপ্রকার আশ্রিতা প্রায় মেয়ের এমন দুষ্টু মিষ্টি সম্পর্ক তার কেন যেন ভীষণ ভালো লাগল। ভুট্টাওয়ালা ভুট্টা সেঁকে মশলা মাখিয়ে ইরামের হাতে দিল। সাইবান নিজে থেকেই এগিয়ে এসে দুহাত বাড়িয়ে দিল ইযানকে ধরার জন্য। ইরাম খানিকটা ইতস্তত করলেও শেষমেষ দিল। অবাক নয়নে খেয়াল করল সাইবান কতটা সাবধানে ধীরে ধীরে ইযানকে ধরে নিজের বুকে ঠেকাল। আজ বোধ হয় সত্যিই তার অবাক হওয়ার দিন। নিজের ভুট্টাটা সাইবান অন্য হাতে ধরতেই ইযান ছোট্ট মুখ বাড়িয়ে জিভ বের করে ফেলল চেটে দেয়ার জন্য। সাইবান সঙ্গে সঙ্গে তাকে দূরে সরিয়ে ধরল,
“ইশ! সাহস কত্তবড় পোটলার! আমার খাবারের ভাগ চায়!”
“আই…আ!”
ইযান তার হাতের কব্জি খামচে ধরতে চাইল। মুখ বেয়ে লালা গড়িয়ে পড়ল ছোট্ট বাচ্চাটার। সাইবান তাকে রীতিমত টেনে কাঁধের উপর তুলে বলল,
“আমার খাবারের ভাগ চাওয়ার আগে বল, তোর খাবারের ভাগ দিবি?”
ইরাম ভুট্টা চিবাতে চিবাতে কেশে ফেলল। সাইবানের মুখে লাগাম আর মনে লজ্জা – শরম বলতে কিছু নেই নাকি? সাইবান ইযানকে দেখিয়ে দেখিয়ে ভুট্টায় কামড় দিতে লাগল,
“উঁহু মামা, আগে দুধের দাঁত বানা, তারপর আসিস। ফোকলা কোথাকার!”
“অ্যা..! অ্যা!”
ইযান প্রায় কাঁদোকাঁদো হয়ে গেল। তাই দেখে শয়তানি হাসি হাসতে লাগল সাইবান। তবে পুরোপুরি কান্নার ভাগ্য হলোনা। রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া কয়েকজন তরুণী হঠাৎ করেই থেমে দাঁড়াল তাদের সামনে। একজন অতি উত্তেজিত মেয়ে এসে বলল,
“কি কিউট বেবি! একটু আদর করি?”
ইযানের কান্নাভাব মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। মাড়ি দেখিয়ে অদ্ভুত ভঙ্গি করে সে মেয়েগুলোর দিকে চেয়ে রইল। সাইবান বলল,
“ওই দেখেছ? মেয়ে দেখলেই মন খুশি হয়ে যায় না? আই ক্যান ফিল ব্রো, আই ক্যান টোটালি ফিল!”
মেয়েগুলো ঘিরে দাঁড়িয়ে ইযানকে আদর করে দিতে লাগল। ইরাম সতর্ক চোখেই দেখছে। তবে এটাও খেয়াল করল সাইবানও বিশেষ অসতর্ক নেই। হাসি মজার মুডে থাকলেও তার চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ইযান আর প্রতিটি মেয়ের দিকে বিশেষ খেয়াল রাখছে। ইরামের মনে ভীষণ উষ্ণতা ভর করল। একটা মেয়ে ইযানের গাল টেনে দিয়ে বলল,
“বেবি অনেক কিউট! আপনার ছোট ভাই?”
সাইবান ইযানকে নিজের বুকে ঠেকিয়ে অপ্রত্যাশিত একটি উত্তর করল,
“মাই বেবি বয়।”
—চলবে—
Share On:
TAGS: আমার আলাদিন, জাবিন ফোরকান
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
আমার আলাদিন পর্ব ৬
-
আমার আলাদিন পর্ব ৭
-
আমার আলাদিন পর্ব ১৪
-
আমার আলাদিন পর্ব ২
-
আমার আলাদিন পর্ব ১৩
-
আমার আলাদিন পর্ব ২০
-
আমার আলাদিন পর্ব ৮
-
আমার আলাদিন পর্ব ৯
-
আমার আলাদিন পর্ব ১৫
-
আমার আলাদিন পর্ব ৫