Golpo romantic golpo আদিল মির্জাস বিলাভড

আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৪৪


আদিল মির্জা’স বিলাভড

৪৪.

ঝুমুর আড়চোখে দেখল শান্তর নির্বিকার সাইড প্রোফাইল। চোয়ালটা কেমন শক্ত করে রেখেছে! চোখের মণিদুটোকে পাষণ্ড লাগছে। মায়াদয়া নেই ওতে। ভীষণ গুরুগম্ভীর মুখেই ড্রাইভ করছে। একটাবার পাশে ফিরে তার দিকে তাকাচ্ছে না। তাকাবেই বা কেনো? ঝুমুর তো শহরের মডার্ন মেয়েদের মতো না! হতে পারেনি মানুষটার মনের মতো সঙ্গী! তাই বোধহয় আগ্রহ ফুরিয়ে এসেছে তার ওপর থেকে। আফসোস করছে নিশ্চয়ই? ভাবছে বিয়ে করে ফেঁসে গিয়েছে! গত কদিন ধরে কেঁদেকেটে ঝুমুরের চোখে যত জল ছিলো সবই শুকিয়ে গিয়েছে। এখন শত কষ্টেও আর চোখে জল আসছে না। দুঃখে, অভিমানে শুধু বুকের ভেতরটা শুকনো মরুভূমির ন্যায় খাঁখাঁ করছে। বড্ড নিঃস্ব লাগছে। গ্রামে সে ফিরে যেতে চেয়েছে, কিন্তু পারেনি! তাকে অবহেলা করছে ঠিক, বেরুতেও দিচ্ছে না। ফ্ল্যাট থেকে বেরুনোর অনুমতিই তো নেই। আজ যখন সকাল সকাল শান্ত বাড়ি ফিরল, ঝুমুর ভেবেছিল এই বুঝি রাগটা পড়ে গিয়েছে লোকটার! অথচ না, তেমন নয়। সেইদিনের রাগ নাকমুখ জুড়ে এখনো দিব্যি আছে। উল্টো বোধহয় আরও বেড়েছে। মেজাজ আরও চটাচ্ছে তার ওপর। ঝুমুরের দিকে একবার যখন তাকাল মনে হলো এই বুঝি ওকে মাড়ির দাঁতে পিষে কামড়ে খেয়ে ফেলবে! হ্যাঁ, ঝুমুর মানছে তার ভুল হয়েছে। লাথি মারা উচিত হয়নি। তাও আবার থোতায়!! স্বামী হয়তো। কিন্তু ঝুমুর তো লাথি মারতে চায়নি। স্বপ্নেও না! হয়ে গিয়েছে! কী আর করার? এতবার মাফ চাইলতো। অনুশোচনায় প্রতিনিয়ত ধুঁকেছেতো। আর কী করতে হবে? ঝুমুরের অভিমানী র ক্তিম চোখদুটো টলমল করে উঠল। অথচ মুখ দিয়ে মিনমিনে গলায় বেরুনো কথাগুলো শুনে শান্তর নির্বিকার মুখে অমাবস্যা নামল –

‘রাস্তাঘাটে গাড়ি পার্ক করে ওসব লুচ্চামি করার মতো জীবনসঙ্গী চাইলে ওমন মেয়েই নাহয় বিয়ে করতো। যে যেমন তার তো তেমন পার্টনার খুঁজে নেয়া উচিত! আমার মতন অবলা মেয়ের জীবন নষ্ট করে কী আনন্দ পেলো? কী দোষ করেছিলাম আমি? আমিই কেনো? পোড়া কপাল আমার।’

শান্ত দাঁতে দাঁত পিষল। ইচ্ছে তো তার করছে এখুনি গাড়িটা পার্ক করে তিন ফুটের মেয়েটার কানের নিচে দু ঘা লাগাতে। কিন্তু না, তা সে করবে না। ঝুমুরকে সে ঝুমুরের চেয়েও ভালো করে চেনে, জানে। গোটা মেয়েটাকেই তো তার মুখস্থ। এমন ইচ্ছে করে বলছে। ইচ্ছে করে, জেনে বুঝে। চাচ্ছে তাকে ট্রিগার খাওয়াতে। যেন সে রিঅ্যাক্ট করে। কথাবার্তা বলে। তা তো শান্ত করবে না। আরেকটু বাজাবে। কতবড় স্পর্ধা! স্বামীর মুখে লাথি মারে! শিক্ষা তো ভালোভাবে দিয়েই ছাড়বে। কয়েকদিন বাড়ি ফেরার পরিকল্পনাই ছিলো না তার। কিন্তু গতকাল রাতে হঠাৎ করে বস জানাল ঝুমুরকে মির্জা ভবনে নিয়ে আসতে। শান্ত আর প্রশ্ন করেনি কেনো! কারণ তার ধারণা আছে, ম্যাডাম ব্যতীত আর কার জন্যে? গ্রামে তো এই দুই মেয়েলোকের বেশ ভালো ভাব হয়েছিল। ভাবিইইইই, ডেকে ডেকে মুখে ফ্যানা তুলে ফেলতো। শান্ত নাক ফুলিয়ে তাকাল। তিন ফুটের ব্যাটারি টলমলে চোখে চেয়ে আছে কোলের ওপরে রাখা নিজের হাত দুটোর ওপরে। চালাকের বংশধর একটা! লাল টুকটুকে জামদানি শাড়ির সাথে, সোনার বালা পরেছে দুহাতে। নতুন বউ সেজে শান্তর সামনে ঘুরলেই বুঝি শান্তর রাগ নিভে যাবে? গলে হবে বুঝি সে পানি্র মতো? সে কি ছোঁচা? ছোঁচা বেড়াল? এতো ঠুনকো তার রাগ? শান্ত মানছে ঠুনকো, এই মেয়ের সামনেই। মনোযোগ কোনোভাবেই রাস্তায় থাকছে না। ঘুরেফিরে, আড়ে আড়ে, বারেবারে চলে যাচ্ছে মিষ্টি দেখতে তার বউটার দিকেই। ইশ!

অপরদিকে তখনো ঝুমুর অভিমানের বুলি তোতাপাখির মতো আওড়ে গেলো –

‘মামাকে কল করে বলব আমাকে নিয়ে যেতে! তিনি তো আর জানেন না শহরে থেকে থেকে তার ছেলে নষ্ট হয়ে গেছে। রুচিও পরিবর্তন হয়ে গেছে। আমার মতো গ্রামের মেয়েকে তার মনে আর ধরে না। ধরবেই বা কীভাবে! ওমন লুচুমার্কা কাজকর্ম তো আমাকে দিয়ে হবে না।’

শান্ত বড়ো করে শ্বাস টেনে নিলো। নিশ্চিত খোদা তার পরিক্ষা নিচ্ছেন এই তিন ইঞ্চিখানেক মেয়েকে দিয়ে।

‘মম, মাম্মা…মাআআআ, ম….’

সদ্য ঘুম ভাঙা হৃদির বিড়ালের মতো মিউমিউ ধরনের ডাক খানা গলায় আটকে গেলো হঠাৎ করেই। সিঁড়িতে এসে থমকে গেলো বাচ্চার পাজোড়াও। পুতুলের মতো চোখজোড়া বড়ো করে চেয়ে থাকল একদৃষ্টিতে। গ্রাউন্ডফ্লোরে পিনপতন নীরবতা বয়ে যাচ্ছে। লিভিংরুমের সোফায় বেঘোরে ঘুমুচ্ছে আদিল, রোযা। রোযার পাতলা শরীরটা তখনো একপ্রকার পিষেই আছে আদিলের ওমন ভারী, পুরুষালি শরীরের নিচে। হৃদি আর ডাকল না। শব্দও করল না। ওভাবে চেয়ে থেকে টুকটুক করে, নিঃশব্দে সিঁড়িগুলো বেয়ে নেমে এলো। খুব কাছ থেকে কিছুক্ষণ বাবামায়ের এমন চমৎকার মোহাব্বত দেখে কী বুঝল কে জানে! হঠাৎ হাতে মুখ চেপে মুচকি হাসতে থাকল নিঃশব্দে। একপর্যায়ে কার্পেটের ওপরে পড়ে থাকা পাতলা সিঙ্গেল কম্ফোর্টারটা তুলে নিলো হাতে। ওটাকে মেলে দিতে চাইল বাবা-মায়ের ওপরে। তখুনি ভাঙল আদিলের ঘুমটা। মাথা তুলে তাকাল। নিজের কার্বন কপির দিকে দৃষ্টি যেতেই থমকাল ধূসর চোখজোড়া। হৃদি আনন্দে ভেসে যাচ্ছিল। যেই মুখ খুলবে, আদিল ঠোঁটে আঙুল ছুঁয়ে বোঝাল শব্দ করতে না। হৃদি বাবার ইশারা বুঝে নীরবে গাল ভরে হাসছে। ছটফট করছে কেমন! আদিল দুহাতে ভর দিয়ে ভীষণ সন্তর্পণে নিজেকে ওঠাল রোযার ওপর থেকে। রোযা যেন এতে স্বস্তি পেয়েছে ভীষণ! কেমন ঘুমের ঘোরে গুঙিয়ে বড়ো করে শ্বাস টেনে নিলো। আদিল দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়াল! চ্যাপ্টা বানিয়ে ফেলেছে বেচারিকে! রোযা পাশ ফিরে আরও গাঢ়ভাবে ঘুমোচ্ছে। সোফা থেকে নেমেই আদিল মেয়েকে কোলে তুলে নিলো ঝট করে। হৃদি দুহাতে ঝটপট বাবার গলা জড়িয়ে ধরেছে। মুখের দিকে তাকিয়ে হাসছে। ফিসফিস করে ডাকল –

‘ড্যাড…’

আদিল মেয়ের গালে ঠোঁট ডুবিয়ে আওড়াল, ‘হুম? বোকার মতো হাসছো কেনো?’

বলতে বলতে কদম বাড়িয়েছে দরজার দিকে। হৃদি পাখির মতো কিচিরমিচির করে গেলো বাবার কানের কাছে –

‘হাসবো না? মাম্মাম একদম ছোটো হয়ে গেছে!’

আদিল ভ্রু তুলল, ‘ছোটো?’

হৃদি কিছুক্ষণ ভেবে জ্ঞানী ব্যক্তির মতো আওড়াল, ‘মম চ্যাপ্টা হয়ে গেছে। তুমি কতো বড়ো!’

মেয়ে তার কী বুঝিয়েছে তা বুঝেও আদিলের অভিব্যক্তির আহামরি পরিবর্তন হলো না। বরাবরই তার চামড়া ভীষণ মোটা।

‘এসব আবার তোমার মমকে বলো না কেমন?’

হৃদির সরল প্রশ্ন, ‘কেনো বলব না?’

আদিল নির্বিকার মুখেই বোঝাল, ‘তোমার মম লজ্জায় ফানুশের মতো চুপসে যাবে। ডু ইউ ওয়ান্ট দ্যাট?’

হৃদি দ্রুতো বলল, ‘নো, আই ডোন্ট। বাট মম লজ্জা কেনো পাবে?’

‘তোমার মম লাজুক তাই।’

‘মম লাজুক কেনো? বিকজ তুমি লাজুক না তাই?’

মেয়ের এবড়োখেবড়ো যুক্তির সামনে আদিল বেশ স্বাভাবিক, ‘তাই…’

‘তুমি লাজুক না, তাই মম অনেক লাজুক কারণ তোমার লাজুকও মমের কাছে। তাহলে মমের কাছে দুজানার লাজুক। তাই মম ভীষণ লাজুক, রাইট?’

আদিল মেয়ের চঞ্চল মুখে চুমু বসিয়ে তার ভীষণ বুদ্ধিতে মেলানো অংকের সুরে সুর মেলাল, ‘রাইট.. মাই ব্রিলিয়ান্ট চাইল্ড।’

হৃদি খিলখিল করে হাসল বাবার প্রশংসায়। বাইরে আজ সটানদেহে দাঁড়িয়ে আছে ক্লান্ত, ধ্রুব। তারা ফিরেছে সকাল সকাল। আদিলকে দেখেই উপস্থিত সবগুলো বডিগার্ড সুর মিলিয়ে বলল –

‘গুড মর্নিং, বস!’

আদিল মাথা দোলাতেই তার কোলে থাকা হৃদি ক্লান্ত, ধ্রুব, এলেনকে দেখে কৌতূহল কণ্ঠে প্রশ্ন করল –

বডিগার্ড আংকেলস, ডিড ইউ নো মাই ড্যাড হ্যাজ নো লাজুক?’

ধ্রুব বুঝল না। একবার বসের নির্বিকার মুখের দিকে তাকিয়ে আরেকবার হৃদির মুখের দিকে তাকাল। অন্যদিকে এলেন ভীষণ স্বাভাবিক গলায় বলল –

‘ইয়েস প্রিন্সেস। অ্যান্ড উই অলসো ডোন্ট হ্যাভ লাজুক।’

ক্লান্তও মাথা দোলাল, ‘লাজুক ইজ অ্যাফরেইড অভ আস, প্রিন্সেস।’

সবার নির্বিকার চোখমুখের জবাব শুনে ধ্রুব আহাম্মক হয়ে পড়ল। বলল –

‘কী নিয়ে কথা হচ্ছে? বুঝতে পারছি না কেনো আমি?’

হৃদি বোঝাল, ‘ড্যাড লাজুক না।’

ধ্রুব অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে জোড়ালো ভাবে মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানিয়ে বলে বসল, ‘তা তো জানিইই, বস হ্যাজ নো শেইম…’

আদিল ঘাড় বাঁকিয়ে তাকাল। ভ্রু নাড়াতেই ধ্রুবের গলা শুকিয়ে এলো। আত্মা কেঁপে উঠল। দ্রুতো নিজের গালে নিজেই চড় বসাল শব্দ করে। আদিল দৃষ্টি ফিরিয়ে আদেশ ছুঁড়ে গেলো –

‘আওয়াজ নিচে। তোদের ম্যাডাম ঘুমুচ্ছে। অ্যান্ড ফর নাউ ডোন্ট ক্রস দিস থ্রেশহোল্ড।’

সবাই একসাথে আওয়াজ করে সম্মতি জানায়। আদিল মেয়েকে নিয়েপুনরায় প্রবেশ করেছে ভেতরে। পেছনে ফেলে গিয়েছে প্রায় ম রতে বসা ধ্রুবকে। বস যেতেই ও বুক ধরে হেলে পড়েছে ক্লান্তর শরীরের ওপরে।

.

গালে ঠোঁটের লাগাতার কিছু ঠোঁটের মিষ্টি স্পর্শে রোযার ঘুমটা ছুটে গেলো। চোখ মেলেই দেখল মুখের সামনে ছোটো একটা মুখ। চোখ বুজে সমানে রক্তিম ঠোঁট দুটো ছোঁয়াচ্ছে গাল জুড়ে। রোযার সদ্য ঘুম ভাঙা চোখ দুটো তখনো লালচে, ছোটো হয়ে আছে। ওভাবেই হাসল। শরীরটা টেনে বুকে মিশিয়ে ফেলল। এলোমেলো চুল বুলিয়ে আওড়াল –

‘কখন উঠেছে আমার মা? ঘুম হয়েছে ভালো ?’

‘হুম..আমি উঠেছি সেভেন থার্টিতে। নাউ ইটস ইলেভেন থার্টি… আর দ্যাখো কে এসেছে মম!’

রোযা চমকে গেলো সময় শুনে। ধড়ফড়িয়ে উঠতে চাইলে খেয়াল করল শরীরটা অবশ লাগছে! মনে হচ্ছে বড়ো একটা ট্রাক তার ওপর দিয়ে গিয়েছে। পাশে ফিরে আরও চমকাল। ঝুমুর ভীষণ ভদ্রভাবে বসে আছে। তার দিকে চেয়ে মিষ্টি করে হাসছে। রোযা আনন্দে বলে ওঠে –

‘তুমিই! কখন এলে?’

ঝুমুর কিছুটা কুণ্ঠিতবোধ করলেও এমন অজানা শহরে রোযাকে আপনই ভেবে নেয়, ‘বেশিক্ষণ হয়নি -’

রোযা আশ্চর্য না হয়ে পারে না, ‘আমাকে ডাকবে না?’

হৃদি জানাল ঝটপট, ‘ড্যাড ডাকতে নিষেধ করে গিয়েছে যে!’

রোযা হতবাক! দেখল মরিয়ম বেগম একপাশে দাঁড়িয়ে আছেন, সাথে বাড়ির আরও কাজের লোক। এতো বেলা ধরে সে এখানে পড়েপড়ে বেহুশ হয়ে ঘুমুচ্ছে আর কেউ তাকে ডাকেনি, একটা শব্দও করেনি!! আশ্চর্য! রোযা উঠে এসে ধরল ঝুমুরের হাত –

‘কেমন আছো তুমি? ব্রেকফাস্ট হয়েছে?’

বলতে বলতে রোযা তাকাল মরিয়ম বেগমের দিকে। ভদ্রমহিলা দ্রুতো মাথা দুলিয়ে বললেন, ‘ব্রেকফাস্টে অনেককিছু করেছি ম্যাডাম, সার্ভ করব টেবিলে?’

রোযা মাথা দুলিয়ে বলে, ‘করুন আন্টি।’

ঝুমুর একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারল না রোযা বলে গেলো, ‘তুমি বসো ঝুমুর। আমি চট করে ফ্রেশ হয়ে আসছি। একসাথে ব্রেকফাস্ট করব। তারপর অনেক গল্প করব।’

ঝুমুর সমানে মাথা দোলাল। উজ্জ্বল চোখে তাকাতেই হাসল রোযা। একা একা থেকে যে তারও দমবন্ধ হয়ে আসছিল। রোযা হৃদিকে নিয়ে সিঁড়ি ধরল দ্রুতো। রুমে গিয়ে নিজেও ফ্রেশ হয়ে কাপড়চোপড় পরিবর্তন করে, হৃদিকেও পরিবর্তন করাল। মেয়েকে নিচে নেমে এলো ঝটপট। বেশিক্ষণ ঝুমুরকে বসিয়ে রাখেনি। ব্রেকফাস্ট করল তিনজন মিলে। ব্রেকফাস্ট শেষ করে বসল লিভিংরুমে। মুখোমুখি বসে প্রথমেই রোযা জিজ্ঞেস করল –

‘দাদিমা কেমন আছেন?’

ঝুমুরের হাসি গাঢ় হলো মুহূর্তে। মনের অস্বস্তিটুকু পুরোপুরি চলে গেলো। কিছুটাসংকোচ কাজ করছিল এতক্ষণ –

‘দাদিমা ভালো আছে। তোমাকে কতো মিস করছে ভাবি জানো না! বারবার বলছিল তোমাদের কথা!’

মরিয়ম বেগম কফি করে আনলেন দু মাগ। হৃদির জন্য একগ্লাস উষ্ণ দুধ। ঝুমুর কফির মাগ নিয়ে চুমুক বসাল। রোযা নিজের কফিটা নিয়ে রাখল টি-টেবিলের ওপরে। প্রথমে কোলে বসা মেয়ে্র হাতে দুধের গ্লাস দিয়ে ওকে খাওয়াল দুধটুকু। ঝুমুর মুগ্ধ চোখে দেখে গেলো দৃশ্যটা। হৃদিকে দুধ খাইয়ে অবশেষে কফির মাগ হাতে তুলে নিলো রোযা –

‘বাকিরা সবাই ভালো আছে? আর সুপ্তি? ও কেমন আছে?’

‘সবাই ভালো আছে। সুপ্তি তোমায় কী ভীষণ মিস করছে জানো? গতকাল কথা হলো না? আফসোস করছিল। চাচ্ছে ঢাকা আসতে। এলে তোমার সাথে দেখা করতে চাইবে। তখন নিয়ে আসব?’

রোযা হাসল, ‘তা আবার জিজ্ঞেস করতে হয়? আলবাত আনবে! এবার তোমার কথা বলো নতুন বউ! মুখটা এমন শুকনো লাগছে কেনো, হু?’

হৃদি ইতোমধ্যে মায়ের কোল থেকে নেমে গিয়েছে। ড্রয়িংবুক নিয়ে উবুড় হয়ে শুয়েছে কারপেটের ওপরে। আঁকিবুঁকি করছে ওতে। রোযার প্রশ্নে ঝুমুরের মুখটা মলিন হয়ে এলো। তা দেখে রোযা সচেতন হয় –

‘কী হয়েছে? বলো!’

ঝুমুর কাঁদল না, তবে বলতে গিয়ে মেয়েটার চোখ দুটো র ক্তিম হয়ে গেলো। নাক টানল। রোযা হতবিহ্বল! কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। ভাষা খুঁজে পেলো না কিছু বলার। যেমন গুরু তেমনি শিষ্য! লম্পটের দলবল ভালো হবে কীভাবে? সব একই গোয়ালের গোরু। গুরুকে শায়েস্তা না করতে পারলেও শিষ্যকে বোধহয় করতে পারবে! রোযার নাকমুখ কোঁচকানো দেখে ঝুমুর সামান্য ভড়কাল –

‘কী হয়েছে ভাবি?’

‘কিছু না। তুমি কান পাতো। যা বলছি, তাই করবে..কেমন?’

ঝুমুর টলমলে চোখে মাথা দোলাল। ভীষণ গুরুত্ব দিয়ে কান পাতল। রোযা যা বলল তা শুনে উষ্ণ হলো দু গাল। মনে হচ্ছে ধোঁয়া বেরুচ্ছে কান দিয়ে। লজ্জায় মিইয়ে গিয়ে আওড়ায় মেয়েটা –

‘ভাবি, তুমি ভীষণ দুষ্টু!’

.

ঝুমুর ফিরে যাবার পরে রোযা মেয়েকে নিয়ে দোতলাতেই সারাবেলা কাটিয়েছে। একটা বই পড়ছিল তখন। সন্ধ্যার আজান পড়েনি। গোধূলির আলো প্রবেশ করছিল বারান্দা পেরিয়ে রুমের ভেতর। তখুনি মরিয়ম বেগম জানালেন নিচে তার প্রয়োজন। রোযা নিচে নেমে ভড়কে গেলো একপ্রকার। একটা পুরো টিম প্রবেশ করেছে। তাদের হাতে অনেককিছু! রোযা প্রশ্নবোধক চোখে তাকাল শান্তর দিকে। শান্ত সেই টিমকে দেখিয়ে বলল –

‘ম্যাডাম, একটা পার্টি আছে আজ রাতে। বসের সাথে আপনি যাবেন যেহেতু তাই তারা আপনায় সাহায্য করবে টু গেট রেডি।’

রোযা বিরক্ত হলো, ‘আমি পার্টিতে যাবো কে বলল?’

শান্ত দৃষ্টি নুইয়ে রেখেছে তখনো, ‘বস!’

‘আমি কোনো পার্টি-টার্টিতে যাচ্ছি না।’

রোযা পুনরায় সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে কদম বাড়াতেই, পেছন থেকে চিরচেনা সেই রুক্ষভাষী কন্ঠ শোনা গেলো যা শুনলে আশপাশ স্তব্ধ হয়। থমকায় রোযার পাজোড়াও –

‘ইউ হ্যাভ টু।’

রোযা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘুরে দাঁড়াল। তাকাল। আদিল ব্যস্ত কদমে এগিয়ে আসছে। চোখমুখ শান্ত। যেন আদেশ করা ব্যক্তিটি সে নয়! রোযার ওই স্বাভাবিক, গম্ভীরমুখ দেখে রাগ লাগল। কী অধিকারবোধ! আদিল মরিয়ম বেগমকে ইশারা করতেই ভদ্রমহিলা পুরো টিমকে গেস্টরুমে নিয়ে গেলেন।

‘তৈরি হয়ে নাও। সাতটায় বেরোব।’

আদিল সিঁড়ির দিকে কদম বাড়িয়েছিল কেবলই। রোযা কঠোরভাবে জানাল, ‘বললাম তো আমি কোথাও যাবো না।’

আদিল ফিরে এলো। দাঁড়াল রোযার সামনে। মাথাটা নোয়াল বেশ। রোযার চোখমুখে দৃষ্টি বুলিয়ে বলল –

‘মিসেস মির্জা, নিজের পরিচয় ভুলে গেলে হবে? হুমম? আদিল মির্জার স্ত্রী আপনি! এমন আরও অনেক প্রোগ্রাম আমার সাথে অ্যাটেন্ড করতে হবে। রেডি হোন, কেমন? শরীরের কোনো অংশ যেন দেখা না যায়!’

রোযা চোখ রাঙাল। কণ্ঠ আকাশ ছুঁলো প্রায়, ‘এখন আমি কি পরব তাও আপনি ডিসাইড করে দেবেন?’

আদিল তর্কে গেলো না। শুধু মুখটা রোযার কানের কাছে এনে ফিসফিস করে আওড়াল –

‘আমার সামনে যা ইচ্ছে পরুন, প্রয়োজনে কিচ্ছু না পরুন। আপত্তি নেই কোনো।’

রোযা ফুঁসছে রীতিমতো। আদিল ইতোমধ্যে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গিয়েছে নিজের সব সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে। কতবড় লম্পট! সারাদিন মাথার ভেতর শুধু বাঁদরামি! মরিয়ম বেগম আস্তে করে ডাকেন –

‘ম্যাডাম –

রোযা ফিরে তাকাল। দেখল একটা পুরো টিম তার অপেক্ষায়! দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাড়াল কদম। রুমের মধ্যে ইতোমধ্যে দুটো কালো শাড়ি বের করে রাখা হয়েছে অপশন হিসেবে। একটা বাটার সিল্কের, অন্যটা জরজেটের। টিমের প্রধান একজন বয়স্ক নারী। বয়সটা চল্লিশের উর্ধ্বে। মিষ্টি হেসে তিনি জিজ্ঞেস করেন –

‘ম্যাম, দেখুন কোনটা পছন্দ হয়?’

রোযা চেয়ারে গিয়ে বসল। অন্যমনস্ক হয়েই আওড়াল, ‘যেটা আপনার ভালো মনে হয় ওটাই।’

পুরো টিম মিলে রোযার হয়ে সবটা পছন্দ করে তাকে তৈরি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। পুরোটা সময় জুড়ে প্রজাপতির মতন হৃদি আশেপাশে ঘুরঘুর করল। মায়ের তৈরি হওয়া দেখল বেশ আগ্রহ নিয়ে। ঘড়ির কাঁটা তখন সাতটা ছুঁয়েছে। রোযা তৈরি। পুরো টিম বিদায় নিয়ে বেরিয়েছে মাত্রই। রোযা বেশ অনাগ্রহ নিয়েই এসে দাঁড়াল আয়নার সামনে। দেখল নিজেকে। মাথা থেকে পা পর্যন্ত কী আভিজাত্যে মুড়িয়ে আছে সে! কাজ করা জরজেটের কালো, ভীষণ দামি শাড়িটা ঝকঝক করছে তার ফর্সা ত্বকে। শাড়ির সাথে মিলিয়ে পরা ডায়মন্ডের সিম্পল সেটটা এতো আধুনিক আর রুচিসম্মত! চুলটা কার্ল করে কোমরে দুলছে। নাকে সাদা ছোটো পাথরের নোজপিনটা মুখে চমৎকার ভাবে ফুটে উঠেছে। হিল পরায় লম্বা লাগছে বেশ! রোযা পারফিউমটা মাখতে নিয়ে তাকাল আয়নায় ফের। একজোড়া ধূসর চোখ চেয়ে আছে। চোখজোড়া কেমন লালচে! ওই সর্বনাশী চোখে চোখ পড়তেই গলায় আটকাল শ্বাস। শব্দ করে পারফিউমটা পড়ল জমিনে। চূর্ণবিচূর্ণ হলো মুহূর্তে! রোযা কুণ্ঠিত হয়ে সরতে পারে না, না পারে ফিরে তাকাতে। আদিল চোখের পলকে কাছে এসে দাঁড়াল। ভীষণ কাছ থেকে দেখল। শ্বাসকষ্টে থাকা রোগীর মতো বারেবারে শ্বাস ফেলছে। রোযা শিউরে উঠল। মুখ ঘুরিয়ে রাখল। আদিল চুলে মুখ গুঁজে দিয়েছে।

‘সো ইরিজিস্টেবল! রাইট নাউ, আই জাস্ট ওয়ান্ট টু রুইন ইউ ইন দ্য মোস্ট টেম্পটিং ওয়ে -’

রোযা দু-হাতে আদিলের বুক ঠেলে সরাতে চাইলে আদিল নিজেই সরে আসে। বেরিয়ে আসে রুম থেকে। এখানে আর কিছুক্ষণ থাকলে অঘটন একটা ঘটে যাবে। রোযা দেয়াল ধরে দাঁড়িয়ে থাকল অনেকটা সময়। মরিয়ম বেগমের ডাকে বেরিয়ে এলো একপর্যায়ে। হৃদি দাঁড়িয়ে আছে মরিয়ম বেগমের হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ভীষণ কাতর চোখে চেয়ে বলে –

‘মম, দ্রুতো এসো।’

রোযা কাছে গিয়ে মেয়ের কপালে চুমু খেয়ে প্রতিশ্রুতি জানাল, ‘যাবো আর আসব। তুমি অপেক্ষা করবে না ওকে? দ্রুতো ঘুমোবে।’

শান্ত ডাকল, ‘ম্যাডাম -’

রোযা মেয়ের মাথা বুলিয়ে শ্বাস টেনে নিলো ভেতরে। অবশেষে কদম বাড়াল। ধূসর চোখজোড়ার দৃষ্টি যতবার চোখের পাতায় ভাসছে ততবার তার হৃৎপিণ্ড লাফাচ্ছে। দুয়ারে এসে রোযার চোখ পড়ল সামনে। আদিল দাঁড়িয়ে আছে গাড়ির সামনে। একটা সিগারেট ঠোঁটে পিষে রেখেছে। দৃষ্টি সোজা রোযাতেই ফেলেছে। রোযা স্বাভাবিক থাকল ওপরে। কাছাকাছি এসে সোজাসাপটা প্রশ্ন করল –

‘ওখানে কি আমাকে কোনো কাজের উদ্দেশ্যে নিচ্ছেন?’

আদিল সিগারেটটা ফেলে দিয়েছে। ওটা পায়ের নিচে পিষে বলে, ‘নো…’

‘কারও আদেশ আমায় মা্ন্য করতে হবে ওখানে? বা গুরুত্ব দিতে হবে?’

‘আমি ব্যতীত কারও না। আমি ব্যতীত কাউকে না।’

__________

চলবে –

® নাবিলা ইষ্ক।

[ মাই বেবিগার্লস, এক্সট্রিমলি সরিইইই। হাত মিলিয়ে অনুনয় করে সরিইই। আপনাদের আগ্রহের অংশটুকু আগামী পর্বে আসবে যেহেতু আমি এই পর্বে যোগ করতে পারিনিইইইই। নেক্সট পর্ব ইনশাআল্লাহ দিয়ে দেবো দ্রুতো। অপেক্ষা করানো জন্য এবং অপেক্ষা করার জন্য অফুরন্ত চুমুউউ। ]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply