আদিল মির্জা’স বিলাভড
৪৫.
–
ম্যানশনের এই টপফ্লোর জুড়ে দেশের সকল ক্ষমতাধরদের আসর বসেছে। কম করে হলেও আজ এই ফ্লোর জুড়ে পঁয়তাল্লিশ জন মানুষ হবে। এখানকার পরিবেশ, ডেকোরেশন পুরোপুরি ভিন্ন বাকি দুটো ফ্লোর থেকে। যেখানে হৈহুল্লোড়, বিয়ের আমেজের স্পর্শ বয়ে যাচ্ছে। আর এই টপ ফ্লোরে থমথমে, নীরব ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে। ডেকোরেশনটাও ভীষণ নিখুঁতভাবে সাজানো হয়েছে। রাজকীয় সোফাটায় বসে আছে দেশের দুজন উচ্চবর্গের পুরুষ। একজন আইন মন্ত্রী আব্দুল। পাশেই তার রূপবতী স্ত্রী। বয়স কম, এইতো এইমাসেই তৃতীয় স্ত্রী রূপে কবুল পড়েছেন। মদের গ্লাসটা নাড়িয়ে চাড়িয়ে ভদ্রলোক দুষ্টু ইশারা ছুঁড়ে আওড়ালেন –
‘শুনলাম আদিল আসব ওর দুই নাম্বার বউ নিয়া?’
দিকপাল চ্যাটার্জি তখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নন। আদিল মির্জার মতিগতি বোঝা বড্ড মুশকিল। তবে তার মন বলছে, আসবে –
‘সম্ভবনা আছে, ফিফটি ফাইভ পার্সেন্ট। আর মন্ত্রী সাহেব, দু নাম্বার কি বলা যায়? সবার জানা, আদিল ওই বিয়েটা কখনো মানেইনি। বিয়ে করেছে ব্যবসায়িক লেনদেনের কারণে।’
আব্দুল মান্নানের পাশেই, বেশখানিকটা জায়গা নিয়ে যে ভদ্রলোক বসে আছেন তার বয়সটা চল্লিশ ছুঁয়েছে অনেক আগেই। মাথায় তেমন চুল নেই। অল্পকিছু যা আছে সাদা হওয়ার পথে। তিনি বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন আবেদীন। লাল রঙের একটা আঙুরফল মুখে পুরে ডান ভ্রু তুলে প্রশ্ন করেন –
‘ছেলেপেলেরা বলতেসে ওয় নাকি দেওয়ানা হয়ে গেছে! কঠিন প্রেমে মজছে।’
দিকপাল চ্যাটার্জি চোয়াল চুলকে একটু ভাবলেন। কী ভাবলেন কে জানে! ভেবেচিন্তে আর মুখ খুললেন না। নীরবে শুধু সিগারেটটা ঠোঁটে চেপে রাখেন। প্রত্যুত্তরে কথা বলল পুলিশ আইজিপি কাউসার আহমেদের ভাগ্নে – সিয়াম। যে ঠিক বা-দিকটাতেই বসেছিল। কোলে পাতলা গড়নার সুশ্রী নারী। তার উন্মুক্ত কাঁধটা জড়িয়ে দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়াল বিশ্রী ইঙ্গিতে –
‘আদিল মির্জার মতন কাউকে প্রেমের ফাঁদে যেই নারী ফেলল, সে কতটা লোভনীয় আমি দেখার জন্য ইকসাইটেড।’
দিকপাল চ্যাটার্জির চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। তাকালেন সিয়ামের দিকে। অসন্তুষ্ট কণ্ঠে সতর্ক করলেন –
‘ভাগ্নে, তোমারে গুরুজন হিসেবে একটা সাজেশন দিই। দ্ধিসুদ্ধি আনো নিজের ভেতর। কার সাথে লাগতে গেলে জিন্দা ফিরে আসতে পারবা তার একটা ম্যাথ করো। ও ধরলে তোমারে বাঁচানোর মতো শক্তি কারও আছে কি-না আমার এতে সন্দেহ আছে।’
পরিবেশটা শীতল হয়ে উঠল মুহূর্তে। সিয়ামের চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। রাগে ফুঁসছে রীতিমতো। সে ভুলেনি গতবারের মারধর। তা ঘা হয়ে আছে এখনো। দিকপাল চ্যাটার্জির কথাবার্তায় ওই ঘা-তে লবণের ছিঁটেফোঁটা পড়ল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করলেন আব্দুল মান্নান সাহেব। হেসে বললেন –
‘ভাগ্নে, পৃথিবীতে মাইয়ার অভাব আছে নাকি? মর তে না চাইলে এখুনি চোখ, মন সরিয়ে রাখো। আদিলের জিনিসে নজর দিও না। ছোডো মানুষ তুমি। ওরে চিনো নাই এখনো। হেব্বি ডেঞ্জারাস মাল। খাইয়া লাইব তোমারে।’
সিয়াম কিছু না বললেও তার চোখমুখের অভিব্যক্তি অনেক কিছু বলে দিচ্ছে। বোঝাই যাচ্ছে তাদের কথাবার্তা কানে তোলেনি। দীর্ঘশ্বাস ফেলেন আব্দুল মান্নান। কিছু একটা মাথায় আসতেই ভদ্রলোক হড়বড়িয়ে জিজ্ঞেস করেন –
‘শুনলাম ঋণা আসবে ঠিক কি-না দিকপাল?’
অদূরেই দাঁড়িয়ে ছিলো জয়নাল আবেদীন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছোটো ভাই। বয়সে তার চেয়ে চার বছরের ছোটো। রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠল শব্দ করে –
‘আদিল মির্জার এক্স আর নেক্সটের কি তাহলে একটা খেলা দেখব?’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাথা নাড়ালেন, ‘আদিলের ওয়াইফ আউটসাইডার। সাধারণ পরিবারের মেয়ে। আর ঋণারে চিনোস না? ওর সাথে খেলা খেলার আগেই তো আউট করে দিবে। আদিল দেখেশুনে না রাখলে ওর নতুন বউকে খেয়ে ফেলব।’
জয়নাল ফিরে তাকাল। চোখমুখ চিকচিক করছে। মনের কথাগুলো লুকিয়ে শুধু আওড়াল –
‘আমার মন বলছে, দারুণ খেলা দেখতে পাবো।’
দিকপাল চ্যাটার্জি মনে মনে গালি দিলেন বুড়ো খাটাশ গুলোকে। মজা দেখতে চাইছিস তা নিজেরা পার্টি করে দেখ গিয়ে! এখানে এসে তার মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাওয়ার মানে কী? সে তো সওদাগরদের দাওয়াতই করেননি। করেছে এই ইবলিশ গুলো! নিজের চাপা ক্রো ধ লুকিয়ে রাখলেন কোনোমতে। তখুনি তার বডিগার্ড এগিয়ে এসে কানে কিছু বলল। চটজলদি সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়া্লেন। আব্দুল মান্নান সশব্দে বলে ফেললেন –
‘আদিল আসছে নাকি?’
–
তাদের কোম্পানি তখন ব্যাংকরাপ্টের পথে। মাথার ওপরে বাবার মেডিক্যাল ঋণের বোঝা। বাবার চিকিৎসা তখনো চলমান। রোযা সবেমাত্র তেইশের তরুণী। অনার্স পড়ুয়া মেয়েটা বাবা-মায়ের বড়ো সন্তান। নির্দ্বিধায় দায়িত্ব এলো কাঁধে। পড়াশোনা একপাশে ফেলে পুরোপুরি কাজের খোঁজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। একটার পর একটা ছোটো-বড়ো সবরকমের পার্ট টাইম চাকরি সে করেছে। পরিশেষে একটাতে দীর্ঘসময় রয়ে গিয়েছিল, একটি ক্যাফের ম্যানেজার হিসেবে। দ্য রয়্যাল ক্যাফে। বেতন বেশ ভালোই ছিলো। তবে ঠিকঠাক পোষাচ্ছিল না রোযার। দিন যত চাচ্ছিল, টাকার প্রয়োজনীয়তা বাড়তে থাকল। সে সময়গুলো কতটা টানাপোড়েনের ভেতরে দিয়ে গিয়েছে তার জীবন তা আজও চোখের পাতাজোড়ায় স্পষ্ট ভাসছে। তারপর… তারপর একটা ম্যাজিক হয়। সেই ম্যাজিকের জাদুকরী স্পর্শে নতুন মোড় নিলো তার জীবন। এক অবিশ্বাস্য প্রস্তাব নিয়ে এলো একজন। একটা বাচ্চার দেখাশোনা করতে হবে তাকে। কাজ এতটুকুই! বিনিময়ে চওড়া বেতন তাকে দেয়া হবে। তখন অবশ্য আপনমনে হেসে বিড়বিড় করেছিল –
‘কতোই বা হবে?’
মনে মনে তিরস্কারও করেছিল। একটা বাচ্চা দেখভাল করলে বড়োজোর দশ থেকে বারো হাজার দেবে! কিংবা বিশই ধরে নিলো সে। ওতটুকুতে রোযার পোষাবে না যে! নিজের পুরো পরিবার তখন তার উপার্জনে কোনোরকমে চলছে। বাবার ঔষধ পাতিতেই একটা বড়ো অংকের টাকার প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু তখনই সে শোনে –
‘ফিফটি ফাইভ থাউজ্যান্ড। একটামাস আমাদের আপনার যোগ্যতাটুকু দেখান, প্রয়োজনে বাড়ানো হবে।’
ওই বাক্যে রোযার দুনিয়াটা দুলে উঠেছিল। সত্য বলতে– তখন রোযা শুধু অতবড় বেতনটাই দেখেছিল। পরিণতি ভাবেনি, ভাবতে চায়নি হয়তোবা। এতো বড়ো অংকের বেতন কেনো দেওয়া হচ্ছে, সেই কালো অধ্যায়টা পুরোপুরি অগ্রাহ্যই করে গিয়েছিল। আসলে ভাবার মতো অবস্থায় তো সে ছিলোই না। এখন এইপর্যায়ে এসে যখন আগের স্মৃতিগুলোতে বিচরণ চালায়, সব কেমন ধোঁয়াশা ধোঁয়াশা লাগে। মনে হয় দু-চোখের ওপরে কুয়াশার তীব্র প্রলেপ ছড়িয়ে রাখা হয়েছে। মনে বলছে, ওই সময়টাতেই আসা এই কাজের প্রস্তাব আর ওমন চওড়া বেতন কোনো কাকতালীয় ঘটনা না। বরঞ্চ সাজানো – গোছানো কোনো প্ল্যান ছিলো। নাকি রোযার ভুল ধারণা এটা? অতিমাত্রায় সন্দেহ জাগছে বলেই কী? জাগবে নাই বা কেনো? মানুষটার আচার-আচরণ বাধ্য করছে তাকে। এতটা দুর্বোধ্য একজন মানুষ সে!
ভাবতে ভাবতে রোযার দৃষ্টি পড়ল আদিল মির্জার শক্তপোক্ত মুখের ওপর। হিমালয়ের ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে সামনে। চওড়া কাঁধ, ঢেউখেলানো পিঠ তার চোখের সামনে। পরনে কালো থ্রিপিস স্যুট। বলিষ্ঠ শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। মাংসপেশি গুলো ফুলেফেঁপে উঠেছে। একটা সিগারেট ঠোঁটে চেপে ধরে রেখেছে যেই হাতে তা কালো গ্লাভসে আবৃত। ধূসর চোখজোড়ার দৃষ্টি তখন সামনের পুরুষটির ওপরেই। ঠোঁট নড়ছে, কিছু একটার আদেশ করছে সম্ভবত। রোযার এতটুকু জীবনে মুখোমুখি হওয়া সবচেয়ে বড়ো রহস্যের স্তুপ, ক্ষমতাধর মানুষটি এই আদিল মির্জাই। যাকে সে বুঝতে পারে না। যার অভিব্যক্তি পড়তে পারে না। তার ব্যবহার, রোযার প্রতি তার এতো পাগলামোর কোনো সূত্র সে আজও খুঁজে পাচ্ছে না।
আদিল কথা শেষ করে যখন তাকাল, চোখাচোখি হলো মুহুর্তে। ওই তীক্ষ্ণ, গভীর দৃষ্টি তার ওপরে পড়তেই রোযা দৃষ্টি সরিয়ে আনল। সামনে তাকাল। একটা ম্যানশন, সিলভার রঙের। আধুনিক ডিজাইনের। সম্ভবত শহরের শেষপ্রান্তে ওঠানো হয়েছে। এমনকি এই ম্যানশন প্রধান ফটক থেকে অনেকটা দূরে অবস্থিত। ভীষণ লম্বা একটা ড্রাইভওয়ের পথ পিষে এসে পৌঁছাতে হয়েছে। এতো এতো আলো আশেপাশে, মনে হচ্ছে সূর্য এখনো ডোবেনি। অতিথিতে গিজগিজ করছে না অবশ্য। কেমন থমথমে, নীরব বাইরের সবটা। বিশালদেহী বডিগার্ড ব্যতীত পাশাপাশি রয়েছে ভয়ংকরী দেখতে কুকুর গুলো। আদিল এগিয়ে আসছে। তার ঠোঁটের ভাঁজে থাকা সিগারেট বাম হাতের আঙুলের ভাঁজে রেখে, ডান হাতে গাড়ির ব্যাকসিটের দরজা খুলে ধরল নিজেই। বাড়িয়ে রাখল হাতটা। রোযার হাতের তুলনায় বড়সড় হাতটা কালো গ্লাভসে ঢেকে আছে। আদিল আওয়াজ নামিয়ে আওড়াল খসখসে গলায় –
‘আসো – শাড়ির আঁচল দেখে নাও। সিটের নিচে চাপা পড়েছে। ওয়াচ ইওর হেড।’
রোযা তাকাল পাশে। আঁচলটা সেঁটে আছে শক্তপোক্ত ভাবে। বেখেয়ালিতে বেরুলে, আঁচল নড়বড়ে হবার সম্ভাবনা দারুণ ছিলো। আঁচল ছোটাল চটজলদি। ডান হাতে শাড়ি সামলে, বাম হাতটা রাখল আদিলের হাতের ওপরে। পাথুরে পথে বাম পা ফেলল। কালো হিলের নিচের অংশটুকু গাঢ় লাল রঙের। গাড়ি থেকে নেমে এসে হাতটা দ্রুতো সরিয়ে আনার প্রয়োজন পড়ল না রোযার। আদিল নিজে থেকে ছেড়ে দিয়েছে। পরমুহূর্তেই ডান হাতে ভীষণ অধিকারের সাথে পেঁচিয়ে ধরল তার লতানো কোমর খানা। একটানে নিজের পাশে সংস্পর্শে রেখে হাঁটা ধরল সামনে। স্পষ্ট কণ্ঠে বলা কথাগুলো রোযার কানে বাজল অনেকটা সময় যাবত –
‘ইউ লুক লাইক ইউ আর মাইন রোজ-আ।’
রোযা ঢোক গিলল। দৃষ্টি তুলে তাকাল না। শুধু বুঝল একজোড়া দৃষ্টি আপদমস্তক তাকেই দেখে যাচ্ছে। তাদের কয়েক কদম পেছনে, দু-ধারে তালে তাল মিলিয়ে হাঁটছে শান্ত, এলেন। তাদের হাতে রাইফেল। সোনালি রঙের। রোযা আজ ক্লান্ত, ধ্রুবকেও দেখতে পেলো। হাসপাতাল থেকে ফিরেছে বোধহয়। বেশ পেছনে ওরা। ম্যানশনের ভেতরের ওপেনিং পথটুকু বিশাল চওড়া, সুদীর্ঘ— পিনপতন নীরবতায় আচ্ছন্ন। তার হিলের প্রত্যেকটা শব্দ ভেসে বেড়াচ্ছে আশেপাশে। তারা যত এগুচ্ছে এই পথ ধরে, ততই নীরবতা ক্ষুন্ন হচ্ছে। গাঢ়ভাবে শুনতে পারছে ভেতর থেকে আসা জমজমাট আলোচনার গুঞ্জন। ভীষণ মৃদু আওয়াজে বাজছে ইংরেজি গান। এযাত্রায় ভেতর থেকে হন্তদন্ত ভঙ্গিতে বেরিয়ে এলেন দিকপাল চ্যাটার্জি –
‘আরে কে এসে ধন্য করল আমায়!!’
ভদ্রলোক বলতে বলতে আড়চোখে তাকালেন আদিলের পাশে। সে নারী ফিরে তাকায়নি। সামনেই তাকিয়ে আছে। আদিলের সাথে তালে তাল মিলিয়ে হাঁটছে। চোখমুখে সৌজন্যতার হাসিটুকুও নেই। ফট করে ভদ্রলোক দৃষ্টি সরিয়ে ফেললেন পরপরই। তবে তার দুচোখের মুগ্ধতা কাটল না। তখনো মুগ্ধতাই বিরাজ করছে। তিনি অস্থির হলেন! কী ঝামেলা হয় কে জানে! আদিল হাঁটা থামাল না। হাঁটতে হাঁটতেই একপলক তাকাতেই ঘামল দিকপাল চ্যাটার্জির কপাল। দৃষ্টি সংযত রেখে গলাটা পরিষ্কার করে বেশ স্বাভাবিক ভাবে গেলেন –
‘এসেছো যেহেতু দ্রুতো ফেরার কথা আজ মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো।’
কথাটুকু বলতে বলতে দরজা পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেছেন ততক্ষণে। নিচের ফ্লোর জুড়ে বিয়ের আমেজ। গান বাজনা, নাচ সবই হচ্ছে। রোযা না তাকিয়েও উপলব্ধি করল এইমুহূর্তে সে সকলের কেন্দ্রবিন্দু। তারা অবশ্য নিচের তলাতে থামল না। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এসেছে। এই ফ্লোরের পরিবেশ যে ভিন্ন তা পা রাখতেই বোঝা গেলো। আদিল মির্জা এসেছে এই নিয়ে হট্টগোল হলো একচোট। আব্দুল মান্নান চেপে সোফার অর্ধেকটা ফাঁকা করে ফেললেন –
‘মাই বয়, এসেছো তুমি!! আসো আসো..তোমার কথাই হচ্ছিল। তুমি হচ্ছো এই পার্টির ডেজার্ট।’
আদিল সোফায় বসল না। ফাঁকা গোলাকৃত টেবিলের সামনে আসতেই শান্ত চেয়ার টেনে ধরল। রোযা বসে পড়ল চুপচাপ। কোটের বোতাম গুলো খুলে আদিলও বসল পাশের চেয়ারে, পায়ের ওপর পা তুলে। একটা হাত রোযার চেয়ারের হাতলে রাখল। শান্ত আর এলেন হিমালয়ের মতো দাঁড়িয়েছে চেয়ারের পেছনে। ওই দৃশ্যে খানিক থমথমে হলো পরিস্থিতি। পাওয়ারের এমন দাপট সহ্য করার মতন না। তবে তা আব্দুল মান্নানের সহ্য হয়ে গিয়েছে। তিনি নিজেই সোফা ছেড়ে এলেন। বসলেন আদিলের পাশে। আড়চোখে রোযার নির্বিকার মুখে চেয়ে ছোঁকছোঁক করলেন –
‘এই ছেলে, ভদ্রতা শেখোনাই এখনো। ম্যাডামের সাথে পরিচয় করিয়ে দিবা না? তা আবার আমার বলতে হবে কেনো?’
আদিল মাথাটা ঘুরিয়ে তাকাল। ধূসর চোখে কৌতুক খেলা করল –
‘ম্যাডাম? আমার স্ত্রী আপনার মা, মন্ত্রী সাহেব। মায়ের সাথে আবার কীসের পরিচয়?’
দিকপাল চ্যাটার্জি সহ অনেকেই যে উচ্চস্বরে হাসল তার আওয়াজ ভেসে বেড়াল। আব্দুল মান্নান সাহেব তেঁতে উঠলেন –
‘মা নিয়ে ফাইজলামি কইরো না আদিল। আমার মারে কবর দিসি আজ বারো বছর।’
দিকপাল চ্যাটার্জি হাসতে হাসতে এসে বসেছেন আব্দুল মান্নানের পাশে। ধীরে ধীরে পুরো টেবিল ভরতি লোক হয়ে গেলো। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীও এই টেবিলে। আলাপ জমল বেশ। রোযা চুপচাপ বসে আছে। শূন্যে চেয়ে অনুভব করছে তার পাশে বসা মানুষটা কোন পর্যায়ের পাওয়ার ধরে রেখেছে! কথার তীক্ষ্ণ ধরন, দৃষ্টির মাপ কতটা দৃঢ়! সে ভুল না হলে, ওটা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী। পাশের জন আইনমন্ত্রী! অথচ তার কী সাবলীল এখানে! পরপরই মানুষটার আরেকটি ভিন্ন দিক অনুভব করল। রোযার চেয়ারের পেছনে থাকা আদিলের হাতটা কী সাবলীল ভঙ্গিতে তার লম্বা চুল আঙুলের ভাঁজে নিয়ে খেলছে! রোযা আড়চোখে তাকাল, আদিল চেয়ে আছে সামনে, কথা বলছে –
‘হিপোক্রেসি বাদ দেন। উন্নয়নের জোয়ারে দেশ কত ভাসাচ্ছেন তা তো দেখছি মন্ত্রী সাহেব! আপনাদের উচিত জোকারের মুকুট মাথায় পড়া। দ্যাট উড স্যুট ইউ গাইজ পারফেক্টলি।’
তর্কবিতর্ক হচ্ছে বেশ। তর্কে অপরজন উত্তেজিত হলেও রোযার পাশেরজন নির্বিকার। শান্ত ভঙ্গিতে কথা শোনাচ্ছে! দিকপাল চ্যাটার্জি একটা মদের বোতল এনে রাখলেন তখুনি। ভীষণ দামি এবং পুরাতন মদ। ওটা দেখে হৈচৈ পড়ে গেলো সবার মধ্যে। দিকপাল চ্যাটার্জি আদিলের গ্লাস ভরে দিলেন। রোযারটা মদে ভরতে চাইলে আদিল বাঁধা দিলো –
‘জাস্ট আ নরমাল ড্রিংক ফর হার।’
দিকপাল চ্যাটার্জির ইশারায় ওয়েটার এলো তখুনি। হাতে ট্রে, মিনারেল ওয়াটার, নরম ড্রিংক সাজানো। ওয়েটার রোযার পাশে এসে ভালোভাবে দাঁড়াতেও পারেনি। আদিল শক্ত একটানে রোযার চেয়ার সুদ্ধই টেনে এনে ঘুচিয়েছে তাদের মধ্যকার সামান্য দুরত্বটুকুও। রোযা চমকে তাকাল। আদিলের দৃষ্টি তখন ওয়েটারের ওপরে। দৃষ্টি বেশ নির্বিকার দেখালেও মুখ দিয়ে বেরুনো কথাগুলোর ভার অনেক –
‘মেইনটেইন ইয়োর ডিসট্যান্স বয়, আদারওয়াইজ মাই গান উইল নট মিস।’
ওয়েটার থরথর করে কেঁপে উঠল। শান্ত ছেলেটাকে একঝটকায় সরিয়ে আনল পেছনে। আদিল ফিরল আলাপে। নিজেই নরলাম ড্রিংক রোযার গ্লাসে ঢেলে এগিয়ে দিলো। রোযা শান্ত হয়েছে। সাবলীলভাবেই গ্লাসটা হাতে তুলে নিলো। আদিল নিজের ড্রিংকের গ্লাস মুখে তুলতে তুলতে আওড়াল –
‘তো কী যেন বলছিলেন, মন্ত্রী সাহেব?’
দিকপাল চ্যাটার্জি সহ কমবেশ উপস্থিত সকলেই চুপ করে গিয়েছেন। রোযা তাদের এইধরণের আলাপ আর শুনতে পারছিল না। নিচ থেকে গানের আওয়াজ ভেসে আসছে। রোযা গ্লাস টেবিলে রেখে আস্তে করে বলল –
‘বসে থাকতে ভালো লাগছে না।’
আদিল ফিরে তাকাল। রোযার চোখে, মুখে দৃষ্টি বুলিয়ে আওড়াল –
‘হাঁটবে?’
‘হুম, নিচে যাওয়া যাবে?’
আদিল হাত দিয়ে পেছনে ইশারা করতেই শান্ত মাথাটা ঝোঁকাল, ‘বস…’
‘তোর ম্যাডামকে নিচে নিয়ে যা।’
রোযা উঠে দাঁড়াতেই, দিকপাল চ্যাটার্জিও উঠে দাঁড়ালেন। বললেন –
‘আমার স্ত্রী শ্রদ্ধা নিচেই। পরিচয় করিয়ে দিই। আপ্যায়ন করবে।’
রোযা ইতোমধ্যে রুম ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে। পেছনে শান্ত, ক্লান্তও এসেছে। এখান থেকে পুরো গ্রাউন্ডফ্লোর দেখা যাচ্ছে। ঝলমল করছে, অতিথিতে গিজগিজ না করলেও ভালোরকমের মানুষই আছে। দিকপাল চ্যাটার্জি আগে আগে নেমে গিয়েছেন। রোযা চারপাশটা দেখতে দেখতে ধীরেসুস্থে নামছে। যখন নিচ তলায় নেমে এলো সামনে এসে দাঁড়াল শ্রদ্ধা চ্যাটার্জি। বয়স অনুমান করা যাচ্ছে না। নিজেকে চমৎকার ভাবে ধরে রেখেছেন বোঝা যাচ্ছে। দিকপাল চ্যাটার্জি পরিচয় করিয়ে দিলেন –
‘আদিল মির্জার ওয়াইফ। আশপাশটা দেখাও তাকে। অঞ্জলির সাথে পরিচয় করিয়ে দাও।’
দিকপাল চ্যাটার্জি আড়চোখে একবার রোযাকে দেখে দ্রুতো দৃষ্টি ফিরিয়ে চলে যাচ্ছেন। শ্রদ্ধা চ্যাটার্জি হাসলেন মিষ্টি করে। এগিয়ে গিয়ে ধরলেন রোযার হাত –
‘আপনি ভীষণ সুন্দর, মিসেস মির্জা। মিস্টার মির্জা নিশ্চয়ই চোখে হারায়? স্বাভাবিক! আসুন, আমার মেয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিই। বিয়েটা ওর কিন্তু আগেই হয়ে গিয়েছে। এটা শুধু একটা গেদারিং।’
রোযা সামান্য হাসল, ‘আপনি আমার চেয়েও সুন্দর মিসেস চ্যাটার্জি। বয়স ধরা যাচ্ছে না।’
‘তাই? লাগছে নাকি সুইট সিক্সটিন?’
রোযা শব্দ করে হাসল, ‘সুইট সিক্সটিন না হলেও টুয়েন্টি তো লাগছেই।’
কথা বলতে বলতে তারা এগুচ্ছিল সামনে। হঠাৎ বন্ধ করে রাখা দরজাটা শব্দ করে খুলে গেলো। দমকা হাওয়া প্রবেশ করল। প্রবেশ করল একটা দল। সে দলে বেশ কয়েকটা বডিগার্ড, সামনে একজন লম্বাচওড়া নারী। কালো বডিকড ড্রেস পরনে। এইট ইঞ্চের একজোড়া হিল পায়ে। হেঁটে এগিয়ে আসছে তা সেই হিলের শব্দে স্পষ্ট। শান্তর অভিব্যক্তিতে দারুণ পরিবর্তন এলো। সতর্ক হলো বেশ, হলো ক্লান্তও। ঋণা সোজা এসে দাঁড়াল রোযার সামনে বেশ কিছুটা দূরত্ব রেখে। গান বন্ধ হয়ে গিয়েছে। আশেপাশে থেকে লোকজন সরে গিয়েছে। দুটো দল সামনাসামনি হয়ে আছে নির্বিকার চোখমুখে। শান্ত দ্বিধা করল একমুহূর্তে জন্য মাত্র। পরমুহূর্তেই ঝুঁকে ধীরে জানাল –
‘ঋণা সওদাগর – বসের এক্স ওয়াইফ।’
হৃদির জন্মদাত্রী! রোযার নির্বিকার চোখজোড়ার দৃষ্টি এবারে তীক্ষ্ণ হলো। ঋণার ক্রোধে লা ল হয়ে আসে চোখে তাকাল নির্দ্বিধায়! পরমুহূর্তেই ঋণা চোখের পলক দূরত্ব ঘুচিয়ে এসে চড় বসাল রোযার ডান গালে। হটাৎ আসা সেই চড়ে রোযা হেলেদুলে ওঠে। মাথাটা বেঁকে পড়ে একপাশে। চড় মেরে ঋণা হাত সরাতেও পারেনি, পারেনি শান্ত, ক্লান্ত এগিয়ে আসতে। তার পূর্বেই রোযার হাতটা ঝড়ের গতিতে গিয়ে বসে ঋণার গালে। একবার নয়, দু-দু বার…ভীষণ দ্রুতো গতিতে.. চোখের পলকে। শান্ত দাঁড়িয়ে পড়ে ফের। মুখটা হা হয়ে গিয়েছে। ক্লান্ত মুগ্ধ হয়ে আওড়ায় –
‘ড্যাম্ন!’
ঋণা হতবিহ্বল। সম্ভবত আশা করেনি পরপর দুটো চড়। রোযা চড় মে রে হাত ঝাঁকাল। নির্বিকার মুখে বলল –
‘পরিচয় তো দেয়া হলো না। দিস ইজ মিসেস মির্জা…অ্যান্ড হাউ অ্যাবাউ ইউউ?’
ঋণা এবারে তেড়ে আসার আগেই শান্ত দাঁড়াল প্রাচীর হয়ে –
‘মিসেস চৌধুরী, আমাদের বাধ্য করবেন না প্লিজ!’
ঋণা নাক সিঁটকালো, ‘এই মেয়ের জন্যে নিজের পার্সোনাল বডিগার্ড পাঠিয়ে দিয়েছে, বাহ!! সরে দাঁড়া।’
শান্ত সরল না। পেছন থেকে রোযাই বলল, ‘সরে দাঁড়ান শান্ত।’
শান্ত বেশ বাধ্য। সরে দাঁড়াল মুহূর্তে। রোযা এগিয়ে এলো দু-কদম। ঋণা রেগেমেগে আর তেড়ে গেলো না। যাকে সে গ্রামের সরল সোজা, ভেজা বিড়াল ভেবেছিলো…যাকে এক চড় মার লে থরথর করে কাঁপবে ভেবেছিল.. মেয়েটা তা নয় বুঝে শান্ত হওয়ার চেষ্টা করল। আপদমস্তক নজর বোলালো ভালো করে। সেদিন রাত হওয়াতে ভালো ভাবে দেখতে পায়নি। যত দেখছে তত রাগে কাঁপছে শরীর! এই তাহলে আদিল মির্জার পছন্দ?
‘ডু ইউ নো হু আই এম?’
রোযা ডান ভ্রু তুলল, ‘ডু ইউ থিংক আই উইল কেয়ার?’
ঋণার চোয়াল শক্ত হলো, ‘ইউ শুড। আমি আদিলের ওয়াইফ।’
রোযা মাথা বাঁকাল, ‘ওয়াজ হবে না?’
‘আমিরা ইজ মাই চাইল্ড। আমি ওর মা। লজ্জা করে না অন্যের সংসার, বাচ্চা নিয়ে গর্ববোধ করতে?’
রোযার ভেতরে কিছু একটা ভাঙল বোধহয়! আমিরার মা!! এই কথাটাই তার সহ্য হলো না। পুরো গায়ে যেন আগুন লেগে গেলো মুহূর্তে। ধড়ফড়াল হৃৎপিণ্ড! আমিরার মা শুধু সে! জন্ম দিলেই কি মা হওয়া যায়? হওয়া যায় না! রোযা নিজেকে শান্ত করতে চাইল। ভালোভাবে তাকাল ঋণার চোখে –
‘আমিরা, দ্যাট ইজ মাই চাইল্ড।’
কথাটুকু বলে স্পষ্ট দেখল, ঋণার চোখমুখে এই কথার কোনো প্রভাব পড়ল না। রোযার যা বোঝার বুঝে গেলো মুহূর্তে। এই মুহূর্তে সে শুধু তার সামনে দাঁড়ানো মানুষটাকে ছাড়খাড় করতে চাইল। চোখ নাড়িয়ে বলল –
‘অ্যান্ড দ্যাট ম্যান ইজ মাই হাজবেন্ড।’
ঋণার চোখমুখ শক্ত হলো। চোখ দিয়ে কাউকে গিলে খাওয়া গেলে সম্ভবত ঋণা তাকে খেয়ে ফেলতো। মুহুর্তে রোযার মন প্রশান্তিতে ভরে গেলো। একে কীভাবে বাজাতে হয় তার জানা হয়ে গিয়েছে। ব্যস, আর কে থামায় –
‘মাই হাজবেন্ড, ইউ ক্যান সিই – খুব পজেসিভ আমার ব্যাপারে। দৃষ্টির আড়াল হলে হাইপার হয়ে পড়ে।’
রোযা দেখল ঋণার কপালের রাগ ভেসে উঠেছে। তিরতির করে কাঁপছে মহিলার ঠোঁটজোড়া। হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ হয়ে আছে। রোযা কদম বাড়াল। শেষবারের ডোজটা দিয়ে দিলো –
‘অ্যাজ ইউ ক্যান সি মিসেস চৌধুরী – বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি ন। লাস্ট নাইট মাই হাজবেন্ড ওয়াজ সো প্যাশনেট অ্যান্ড রাফ।’
ঋণা চিৎকার করার আগেই শান্ত শুনল ব্লুটুথের ওপাশের মানুষটা সমানে হেঁচকি তুলে যাচ্ছে।
–
দিকপাল চ্যাটার্জি হতভম্ব প্রায়, ‘কী হলো? আদিল?’
আদিলের মুখের মদ ছিঁটকে পড়েছে টেবিলে। হাতের গ্লাস পড়ে ভেঙে তছনছ হয়ে পড়ে আছে। উপস্থিত সকলে বেকুব হয়ে আছে। তারচেয়েও বেকুব স্বয়ং আদিল মির্জা। কানের ব্লুটুথ থেকে ভেসে আসা কথাগুলোতে তার দুনিয়াটা হড়বড়িয়ে নড়ছে….
–
___________
চলবে –
®নাবিলা ইষ্ক।
Share On:
TAGS: আদিল মির্জা’স বিলাভড, নাবিলা ইস্ক
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৩৫
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ৩
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ১৪
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ১০
-
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৩২
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ১২
-
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৪৪
-
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৪৬
-
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৩৪
-
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৩০