Golpo romantic golpo অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা

অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৬১


অ্যাঞ্জেল অ্যাঞ্জেলিনা পর্ব ৬১

[পর্ব ৬১]

#লেখিকা_ফারহানা_নিঝুম

(🚫 দূর্বল হৃদয়ের পাঠকদের জন্য গল্পটা একদম নয়।)

(🚫কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)

রুম জুড়ে পিনপতন নীরবতা। নিস্তব্ধতার বুকে কেবল ঘড়ির কাঁটার ক্ষীণ টিকটিক শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, যেন সময় নিজেও আতঙ্কে ধীর হয়ে গেছে। আধো আলোয় ডুবে থাকা ইস্ক্রিয়াসের অবয়বটা রাইসার চোখে কোনো মানুষের নয়, বরং অন্ধকার থেকে উঠে আসা বিভীষিকার প্রতিচ্ছবি বলে মনে হচ্ছিল। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টির শীতলতা এতটাই নির্মম ছিল যে, মনে হচ্ছিল এক জ্বলন্ত আগ্নে’য়গিরির গভীরে বন্দি কোনো ধ্বংসা’ত্মক ঝড় বিস্ফো’রণের অপেক্ষায় ছটফট করছে।

রিভলবারের কালচে ধাতব ঝিলিক ঘরের অন্ধকারকে আরও গাঢ় করে তুলেছিল। ইস্ক্রিয়াসের আঙুলের ফাঁকে বন্দুকটা স্থির, অথচ ভয়ঙ্কর। তার চোখে কোনো দ্বিধা নেই, কোনো কাঁপন নেই ,সেই দৃষ্টি ছিল অগ্নি’স্ফুলিঙ্গের মতো ধা’রালো, যেন রাইসার বুক চিরে সরাসরি আ’ত্মা পর্যন্ত পৌঁছে যেতে চায়।

ধীরে ধীরে তন্দ্রা ভেঙে জেগে উঠলো রাইসা। চোখ দুটো ক্লান্ত, শরীর অবসন্ন। গত রাতের ইস্ক্রিয়াসের উন্মত্ত আচরণ তাকে ভেতর থেকে বিধ্বস্ত করে দিয়েছে। উঠে বসতেই আচমকা সামনে বসে থাকা মানুষটাকে দেখে থমকে গেল সে। ইস্ক্রিয়াস।

চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে। অন্ধকারে তার মুখের অর্ধেক ডুবে আছে ছায়ায়।

রাইসার বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দটা কানে স্পষ্ট ভেসে এলো। সেটা ভয়ের ছিল না, বিস্ময়েরও নয় বরং এক অচেনা শীতলতা ধীরে ধীরে তাকে গ্রাস করছিল।

কণ্ঠ শুকিয়ে এলো তার। তবুও কোনোভাবে বলল,

“ইস্ক্রিয়াস, তোমার হাতে রিভলবার কেন?”

ইস্ক্রিয়াসের মুখভঙ্গিতে কোনো পরিবর্তন এলো না। পাথরের মতো নিরাবেগ চোখে তাকিয়ে রইলো সে। তারপর ধীরে ধীরে পকেটে হাত ঢুকিয়ে কিছু একটা বের করলো।

একটা রিং। রিংটা রাইসার সামনে ধরতেই তার মুখের রঙ মুহূর্তেই পাল্টে গেল। কাল রাত থেকে পাগলের মতো খুঁজেও যেটা পায়নি, সেটা ইস্ক্রিয়াসের হাতে দেখে বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো তার।

ইস্ক্রিয়াস নিচু, অনুভূতিহীন কণ্ঠে বলল,

“হোয়াই? কেন করলে এমন? কিসের জন্য?”

কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ হয়ে রইলো রাইসা। তারপর ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নিজের টপস আর জিন্স তুলে গায়ে জড়িয়ে দাঁড়ালো।

ইস্ক্রিয়াস এবার গর্জে উঠলো,

“টেল মি হুয়াই ডিড ইউ ডু দিস? হুয়াই?”

রাইসা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো। তারপর নিস্পৃহ কণ্ঠে বলল,

“এটাই আমার কাজ ছিল।”

পরের মুহূর্তেই ঝড়ের বেগে উঠে দাঁড়ালো ইস্ক্রিয়াস। বিশাল হাতটা সজোরে আছড়ে পড়লো রাইসার গালে। শব্দটা পুরো ঘরে প্রতিধ্বনিত হলো।

রাইসার গলা শক্ত হাতে চেপে ধরে হিসহিসিয়ে উঠলো সে,

“কিসের কাজ? এতটা বিশ্বাস করেছি তোমাকে! এতটা ভালোবেসে নিজের সবকিছু শেয়ার করেছি! আর তুমি? এটা করলে?”

রাইসা ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে বলল,

“আমি তোমাকে ভালোবাসিনি। তোমার কাছে আসা, তোমার সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়া সবটাই ছিল আমার মিশনের অংশ।”

কিছুক্ষণ স্থির চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইলো ইস্ক্রিয়াস। সেই দৃষ্টিতে ছিল অবিশ্বাস, ক্ষোভ আর ভাঙনের নির্মম মিশেল।

তারপর নিচু স্বরে বলল,

“ইউ নো হোয়াট, রাইসা। যেদিন পেনড্রাইভটা হারিয়েছিল, সেদিনই আমার বোঝা উচিত ছিল। শিট!এত বড় ভুল করলাম আমি?”

রাইসা নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলো।

হঠাৎ ইস্ক্রিয়াস ঝুঁকে পড়ে তার ঠোঁটে নির্মমভাবে কাম’ড় বসালো। রক্তের স্বাদ ছড়িয়ে পড়তেই দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে উঠলো,

“এভাবে ঠকালে আমাকে?”

রাইসা হেসে উঠলো। সেই হাসিতে ক্লান্তি ছিল, বিদ্রুপ ছিল, আর ছিল গভীর আঘা’তের ছাপ।ধীরে ঠোঁটের র’ক্তটুকু মুছে নিল।

“ঠকিয়েছি আমি? তুমি তো কাল রাত থেকেই সব জেনে গিয়েছিলে, ইস্ক্রিয়াস। তারপরও এত নিখুঁত অভিনয় করলে!”

ইস্ক্রিয়াস কোনো উত্তর দিল না। পরমুহূর্তেই রিভলবারটা তুলে রাইসার কপালে ঠেকিয়ে দিল সে। ঠান্ডা ধাতব স্পর্শে শরীর শিউরে উঠলেও চোখ নামালো না রাইসা।

ইস্ক্রিয়াস দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

“বলো কার জন্য কাজ করছো? মিথ্যে বলার চেষ্টা করবে না। আমি জানি তোমার বস ইদ্রান না। কারণ সে নিজেও অন্য কারো হয়ে কাজ করে। টেল মি হু ইজ দ্য মাস্টারমাইন্ড?”

রাইসার কণ্ঠ দৃঢ় হয়ে উঠলো।

“আমি বেঁচে থাকতে আমার মুখ থেকে কিছু বের করতে পারবে না তুমি।”

ইস্ক্রিয়াসের চোখ রক্তবর্ণ হয়ে উঠলো।

“সেদিন পুলিশ স্টেশনের বোমা বিস্ফো’রণ সেটা তুমিই করিয়েছিলে, তাই না? ঘোড়ার উপর যে মেয়েটা ছিল সেটাও তুমি?”

রাইসা ধীরে ধীরে চোখের পাতা নামিয়ে সম্মতি জানালো।

পরক্ষণেই আবার তার গলা শক্ত হাতে চেপে ধরলো ইস্ক্রিয়াস।

“বলতে বলেছি! কে সেই মাস্টারমাইন্ড?”

রাইসা কষ্টে শ্বাস নিতে নিতে বলল,

“কখনোই না,,,

ইস্ক্রিয়াস তপ্ত নিঃশ্বাস ফেললো। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে তার।

“ঠিক আছে। মুখে না বললে অন্যভাবে বলাবো। তোমাকে বলতেই হবে, রাইসা। হু ইজ দিস মাস্টারমাইন্ড?”

🌿________________🌿

সবে সবে এহসান মঞ্জিলে সবে ফিরেছে ইদ্রান। মঞ্জিলের অট্টালিকার বিশাল সদর অতিক্রম করতেই সম্মুখে এসে দাঁড়ালো ইলহাম ন্যান্সি অ্যাঞ্জেলিনা। চারপাশের আবছায়া আলোকচ্ছটায় দু’জনের দৃষ্টি এমনভাবে পরস্পরের সঙ্গে আবদ্ধ হলো, যেন নীরবতার অন্তরালে কোনো সুপ্ত যুদ্ধের সূচনা ঘটেছে।

ন্যান্সির দৃষ্টিতে আজ এক অদ্ভুত তীক্ষ্ণতা। সেই চোখে জ্বলছিল সন্দেহের গাঢ় ছায়া, অনুসন্ধিৎসার নির্মম এবং দীর্ঘদিনের জমাটবাঁধা ক্ষো’ভের বিষাক্ত আবরণ। যেন সে ইদ্রানের বহুচর্চিত মুখোশ ছিন্নভিন্ন করে অন্তর্লীন সত্যকে টেনে বের করে আনবে।

ইদ্রান কিঞ্চিৎ ভ্রুকুঞ্চিত করলো। ঠোঁটের প্রান্তে ধীরে ধীরে প্রস্ফুটিত হলো দুর্বোধ্য এক তাচ্ছিল্যভরা হাসি।

“কিছু বলবে, ইলহাম?”

ন্যান্সি মৃদু হাসলো। তবে সে হাসি ছিল শীতল, প্রাণহীন এবং বিদ্রুপাত্মক। ধীরস্থির ভঙ্গিতে হাত তুলে ইদ্রানের ঘাড়ের নিকটস্থ ট্যাটুর দিকে ইঙ্গিত করে বলল,

“এই ট্যাটু টা আমি একজনের আঙ্গুলের আংটিতে দেখেছি। আপনি কি কিছু বলতে চাইবেন এটা নিয়ে?”

ইদ্রানের চক্ষুমণি মুহূর্তেই সংকুচিত হয়ে এলো। ধীর গতিতে হাত বাড়িয়ে নিজের ঘাড়ের ট্যাটুটিতে আঙুল বুলিয়ে নিল সে। অতঃপর মৃদুস্বরে, অথচ সুস্পষ্ট কৌতুকমিশ্রিত ভঙ্গিতে উচ্চারণ করলো,

“তোমার কি মনে হয় না ইলহাম, তুমি প্রয়োজনের তুলনায় অধিক জেনে ফেলেছো?”

ন্যান্সি নিমেষে হেসে উঠলো। দু’হাত বক্ষের উপর আড়াআড়িভাবে স্থাপন করে দৃঢ়স্বরে বলল,

“আপনি যথার্থই বলেছেন। আমি অনেকটাই জেনে ফেলেছি। তবে এখনো সমস্ত সত্য উদ্ঘাটিত হয়নি। আমি জানতে চাই আমার পালক মা বাবার হ’ত্যাকারী কে? এই আলোকচিত্রে ওই ব্যক্তির সঙ্গে আমি কেন? কে এই মিস্টার আলবার্ট? বর্তমানে তিনি কোথায় অবস্থান করছেন? এবং কেন এই ট্যাটু ধারণ ব্যক্তিরা তাকে কিডন্যাপ করেছে? সর্বোপরি এই সমগ্র অন্ধকার জালবুননের অন্তরালে প্রকৃত নিয়ন্ত্রক কে?”

তার ভেতরে জমাটবাঁধা ঘৃণা, প্রতিশোধস্পৃহা এবং অবদমিত আর্তচিৎকারের গাঢ় প্রতিধ্বনি।

ইদ্রান নিশ্চুপ। কয়েক মুহূর্তের জন্য সমগ্র হলরুম জুড়ে নেমে এলো ভয়ংকর স্তব্ধতা। যেন মঞ্জিলের প্রতিটি দেয়ালও নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করছে পরবর্তী শব্দের জন্য।

অতঃপর ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে বক্র হাসির রেখা ফুটিয়ে ইদ্রান বলল,

“এতদূর যখন নিজ প্রচেষ্টায় পৌঁছে গিয়েছো তাহলে অবশিষ্ট রহস্যও নিজেকেই উদ্ঘাটন করতে হবে।”

ন্যান্সির মুখাবয়বে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন এলো না। বরং তার দৃষ্টি আরও কঠোর, আরও শীতল হয়ে উঠলো।

“সেটাই করবো। আর যদি প্রমাণ পাই যে আপনি এবং আফরিদ এহসান এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত তাহলে মনে রাখবেন, আপনাদের পরিণতি হবে ভয়াবহ। এই ইলহাম ন্যান্সি অ্যাঞ্জেলিনার হাতেই আপনাদের মৃত্যু’র পরোয়ানা রচিত হবে।”

বাক্যগুলো যেন বিষমাখা শলাকার মতো আত্মা চিরে গিয়ে বিদ্ধ করলো ইদ্রানের অহংকারে।

মুহূর্তেই তার মুখমণ্ডল ক্রোধে বিকৃত হয়ে উঠলো। চোয়ালের পেশি শক্ত হয়ে এলো, রক্তা’ভ চোখদুটোয় জ্বলে উঠলো দমিত হিংস্রতার লেলিহান শিখা।

কিন্তু ন্যান্সি আর এক মুহূর্তও সময় অপচয় করলো না। তীব্র পদক্ষেপে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল সে। তার পদধ্বনি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল দীর্ঘ করিডোরের অতল নিস্তব্ধতায়। ইদ্রান স্থাণুবৎ দাঁড়িয়ে রইলো।

তার ধূর্ত মস্তিষ্কে তখন প্রবল গতিতে আবর্তিত হচ্ছে অশুভ পরিকল্পনার চক্র। চোখের গভীরে ভেসে উঠলো শয়তানি চিন্তার ঘন ছায়াপুঞ্জ। যেন কোনো সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের পরবর্তী চাল নিখুঁতভাবে বিন্যস্ত করছে সে।

হঠাৎ কী যেন ভেবে রুমে প্রবেশ না করে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ালো ইদ্রান। অতঃপর দীর্ঘ পদক্ষেপে মঞ্জিল ত্যাগ করলো।

🌿_____________🌿

দুপুর তখন দ্বিতীয় প্রহরের দ্বারপ্রান্তে। সমগ্র আকাশমণ্ডলী জুড়ে সঞ্চিত কৃষ্ণবর্ণ মেঘরাশি অবশেষে অশ্রুসিক্ত হয়ে ঝরে পড়েছে ধরিত্রীর বুকে। টুপটাপ শব্দে অবিরাম বর্ষিত হতে থাকা বৃষ্টিধারা যেন প্রকৃতির অন্তর্গত কোনো বিষণ্ন সিম্ফনির করুণ অনুরণন সৃষ্টি করছে।

গলিপথের বিবর্ণ প্রান্তর বৃষ্টির স্নিগ্ধ স্পর্শে আরও ধূসর, আরও বিমর্ষ হয়ে উঠেছে। বাতাসে মিশে থাকা সোঁদা মাটির গন্ধ হৃদয়ের সুপ্ততম অনুভূতিকেও আলোড়িত করে তুলছে অদৃশ্য মাদকতায়।

জানালার স্বচ্ছ কাঁচ বেয়ে বৃষ্টিবিন্দুগুলো ধীরে ধীরে গড়িয়ে পড়ছে কখনো থেমে যাচ্ছে, আবার নতুন ছন্দে নেমে আসছে নিচে। যেন প্রকৃতি নিজেই অশ্রুসজল আঙুলে লিখে চলেছে কোনো অতল বেদনার উপাখ্যান।

এহসান মঞ্জিলের প্রাচীন রাজকীয় স্থাপত্য আজ বর্ষার স্নিগ্ধ অন্ধকারে আরও রহস্যাবৃত। সুবিশাল স্তম্ভ, দীর্ঘ অলিন্দ এবং নকশাখচিত প্রাচীরের গায়ে ঝরে পড়া বৃষ্টিধারা সৃষ্টি করেছে অপার্থিব এক বিভ্রম।

বাড়িতে প্রবেশ করেই সরাসরি উপরের তলার নিজস্ব কক্ষের অভিমুখে পদক্ষেপ বাড়ালো আফরিদ। তার মুখাবয়বে আজ এক গভীর, দুর্ভেদ্য গাম্ভীর্যের আবরণ। কপালের সূক্ষ্ম ভাঁজগুলো যেন স্পষ্ট ঘোষণা দিচ্ছিল চিন্তার অন্তঃস্থলে অশান্ত ঘূর্ণাবর্তের অবিরাম সংঘাত চলছে।

কিন্তু সিঁড়ির মধ্যবর্তী অংশে পৌঁছাতেই তাকে স্থগিত করলেন মাইমুনা এহসান।

নারীর দৃষ্টি ছিল স্থির, অথচ তীক্ষ্ণ অনুসন্ধানী। কণ্ঠস্বর শান্ত, প্রায় নিঃশব্দ অথচ প্রশ্নবিদ্ধ ভারে পূর্ণ,

“তোমাকে উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে, আফরিদ। কী ঘটেছে?”

আফরিদ এক মুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকালো। সেই দৃষ্টিতে ছিল ক্লান্তির গভীরতা, আবদ্ধ অস্থিরতা এবং বহুস্তরীয় গোপনতার ভার।

অতঃপর নিত্যদিনের ন্যায় কঠোর স্বরে উচ্চারণ করলো “অ্যাঞ্জেলিনা কোথায়?”

মাইমুনা এহসান উপরের দিকে ইশারা করলেন।

“নিজের রুমে।”

আফরিদ সংক্ষিপ্ত সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়লো।

“ঠিক আছে, মম। তার সঙ্গে কিছু জরুরি আলোচনা রয়েছে।”

মাইমুনা এহসানের চোখে এবার সূক্ষ্ম সন্দেহের রেখা বিস্তৃত হলো। ধীর, অনুসন্ধানী কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন,

“কিন্তু নীলাদ্রি কোথায়?”

নীলাদ্রির নাম উচ্চারিত হতেই আফরিদের দৃষ্টি সামান্য পরিবর্তিত হলো। এক ক্ষণিক নীরবতার পর সে বলল,

“তাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে পাঠিয়েছি।। আজ সম্ভবত আসবে না।”

আর প্রশ্নের সুযোগ না দিয়ে দীর্ঘ পদক্ষেপে অগ্রসর হলো আফরিদ।

🌿_____________🌿

সদ্য শাওয়ার সমাপন করে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এসেছে ন্যান্সি। ভেজা চুলের প্রতিটি প্রান্ত থেকে টুপটাপ করে জলবিন্দু পতিত হচ্ছে, যা মেঝেতে ক্ষীণ প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করছে। ঠিক সেই মুহূর্তেই দরজা ঠেলে প্রবেশ করলো আফরিদ।

রুমের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেই সে নিঃশব্দে দরজার লক সক্রিয় করলো।

এটি ছিল এক বিশেষ সুরক্ষিত কক্ষ যেখানে প্রবেশ ও প্রস্থান কেবলমাত্র তাদের দুইজনের বায়োমেট্রিক অনুমতিতেই সম্ভব। বাইরের জগত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এক গোপন দুর্গ।

আফরিদের দৃষ্টি এক ঝলকের জন্য ন্যান্সির ভেজা অবয়ব ছুঁয়ে গেল। কিন্তু সেই দৃষ্টিতে কোনো কোমলতা ছিল না ছিল কেবল নিরাসক্ত, শীতল পর্যবেক্ষণ। অতঃপর একটা গানের সুরে শিষ বাজাতে বাজাতে

কোনো বাক্য ব্যয় না করেই সে ড্রেসিং টেবিলের সামনে অবস্থান নিল।

গানটা ছিলো এমন.

**কি নেশা ঢাইলা দিলি গেলাসে

মাইনাসে না পেলাসে

কোমড় ঘুরায় ধুংকা দিলে

পুরাই দেশি ফিল আছে…..*

এহেন শিষধ্বনিতে কপাল জুড়ে উদ্বেগের চিহ্ন ফুটে ওঠে ন্যান্সির।

পরনের স্যুট খুলে অনায়াস ভঙ্গিতে নিক্ষেপ করলো পাশের কাউচে। এরপর শার্টের প্রতিটি বোতাম একে একে উন্মোচন করতে লাগলো, যেন তার উপস্থিতিতে কোনো সামাজিক নিজেকে আড়াল করার কোনো প্রয়োজন নেই।

ন্যান্সি চুপচাপ নিজের ভেজা চুলের টাওয়েল ব্যালকনিতে নিয়ে গিয়ে মেলে দিল। বাতাসে ভেজা চুলের সোঁদা গন্ধ ছড়িয়ে পড়লো।

পুনরায় রুমে ফিরে এসে মেঝেতে পড়ে থাকা স্যুটটি তুলে ওয়াশরুমে রেখে এলো সে।

ফিরে এসে দৃষ্টি স্থির করলো আফরিদের দিকে।

ঠিক তখনই তার চোখ আটকে গেল আফরিদের উন্মুক্ত বক্ষদেশে অঙ্কিত সূর্যচিহ্নের ট্যাটুর উপর।

এক মুহূর্তেই তার অন্তর্লোক কেঁপে উঠলো। শ্বাসপ্রশ্বাস ক্ষণিকের জন্য ভারী হয়ে এলো। এই ট্যাটু টি যতবার দেখে ততবারই রাতের আবেশিত ক্ষণের কথাটি স্মরণ করিয়ে দেয়।

ন্যান্সি গম্ভীর, সংযত ,কাঁপা কণ্ঠে বলল,

“আপনার ফোন কোথায়?”

আফরিদ কোনো প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করলো না। নিঃশব্দে পকেট থেকে ফোন বের করে ন্যান্সির দিকে নিক্ষেপ করলো।

সে দ্রুত দুই হাতে তা গ্রহণ করলো। কণ্ঠে বিরক্তির আভাস,

“এভাবে ছুঁড়ে দেন কেন? ভেঙে গেলে কী হতো?”

আফরিদ ঠোঁটের কোণে সামান্য বক্রতা এনে বলল,

“নতুন কিনে নিতাম।”

ন্যান্সি তীব্র বিদ্রূপে বলল,

“অর্থবিত্ত থাকলে এমনই হয়, তাই না?”

আফরিদ আর কোনো উত্তর দিল না। নির্বিকার ভঙ্গিতে ওয়াশরুমের দিকে অগ্রসর হলো। তবে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আদেশসূচক স্বরে বলল,

“ড্রেস বের করো। আমি কী পরবো।”

এই নির্দেশে ন্যান্সির ধৈর্যের শেষ সীমা স্পর্শ করলো।

তার মুখমণ্ডল তৎক্ষণাৎ কঠোর হয়ে উঠলো। নবাব হলো কিভাবে?

তবুও কবার্ড খুলে ধূসর রঙের একটি টি-শার্ট ও কালো ট্রাউজার বের করে বিছানায় রেখে দিল। এরপর ফোন হাতে নিয়ে সোফায় বসলো ন্যান্সি।

কিন্তু পরমুহূর্তেই সমস্যার উদ্ভব ঘটলো ফোন আনলক করার কোনো উপায় তার জানা ছিল না।

বিরক্ত কণ্ঠে সে উচ্চারণ করলো,

“পাসওয়ার্ড কী?”

ওয়াশরুমের ভেতর থেকে আফরিদের কণ্ঠ ভেসে এলো,

“জানকি বাচ্চা।”

ন্যান্সির ভ্রু তৎক্ষণাৎ সংকুচিত হলো।

“উফ্! আপনি কি ঠিকভাবে বলবেন?”

পরক্ষণেই আবার গম্ভীর কণ্ঠে জবাব এলো,

“বললাম তো পাসওয়ার্ড জানকি বাচ্চা’।”

ন্যান্সি মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ। এ কেমন অদ্ভুত কোড!

তবুও সেটাই টাইপ করলো সে।

ফোন আনলক হতেই দ্রুত প্রবেশ করলো কল লগ ও কন্টাক্ট তালিকায়।

তার মস্তিষ্কে তখন একটিই কেন্দ্রবিন্দু সত্য উদ্ঘাটন।

কিন্তু পরমুহূর্তেই ফোনবুকে নিজের সেভ করা নাম্বারটি চোখে পড়তেই ন্যান্সি স্থির হয়ে গেল।

তার অধরদ্বয় অনিচ্ছায় সামান্য ফাঁক হয়ে এলো। দৃষ্টিতে বিস্ফোরিত হলো তীব্র অগ্নিশিখা রাগ, বিস্ময় এবং বিশ্বাসভঙ্গের সম্মিলিত দাহে তার সমগ্র অস্তিত্ব মুহূর্তেই প্রকম্পিত হয়ে উঠলো।

শাওয়ার শেষ করে বেরিয়ে এলো আফরিদ। ভেজা চুল থেকে টুপটাপ জল ঝরছে, যা টাওয়েলের ঘর্ষণে ছন্দহীনভাবে ছিটকে পড়ছে মেঝেতে। ধূসর টিশার্টটি গায়ে পরতে পরতে তার মুখাবয়বে নেমে এলো এক অদ্ভুত নিষ্ক্রিয়তা যেন পৃথিবীর কোনো নিয়মই তাকে স্পর্শ করতে পারে না।

ন্যান্সি ঠোঁট চেপে, তীব্র বিদ্রূপ মিশ্রিত কণ্ঠে বলে উঠলো,

“আমার নাম্বারটা আপনি কী নামে সেভ করেছেন?”

আফরিদ একবারও তার দিকে না তাকিয়ে, সম্পূর্ণ ভাবলেশহীন কণ্ঠে উত্তর দিল,

“ফা’ক মি বান্দির বাচ্চা।”

মুহূর্তেই ন্যান্সির চোখ জ্বলে উঠলো।

“এটা কী ধরনের নাম? আপনি কি সম্পূর্ণ শিষ্টাচারবোধহীন?”

আফরিদ ভ্রু উঁচিয়ে অবাকের ভান করলো, যেন তার বক্তব্যে কোনো অস্বাভাবিকতা নেই।

“পছন্দ হয়নি? ঠিক আছে এখনই বদলে দিচ্ছি।”

পরক্ষণেই সে ন্যান্সির হাত থেকে ফোনটি কেড়ে নিল। আঙুলের দ্রুততায় কন্টাক্ট নাম এডিট করে আবার ফিরিয়ে দিল।

ন্যান্সি ফোন হাতে নিয়ে মুহূর্তেই আরও বিস্ফোরিত হলো।

নতুন নামটা দেখে তার শ্বাসপ্রশ্বাস ভারী হয়ে এলো।

“এটা আবার কী? এ কোন অসভ্যতা?”

আফরিদ ঠোঁটের কোণে ঠান্ডা হাসি টেনে বলল,

“ফা’ক ইউ বান্দির বাচ্চা। একদম পারফেক্ট।”

ন্যান্সির ধৈর্যের শেষ সীমা ভেঙে গেল। মুহূর্তের উত্তাপে টাওয়েলটা সজোরে আফরিদের মুখের দিকে ছুড়ে মারলো সে।

কিন্তু আফরিদ একটুও নড়লো না। বরং ধীর, নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে প্যান্ট পরতে পরতে তার দিকে এগিয়ে এলো।

তার কণ্ঠ তখন হঠাৎই নিম্ন, ভারী এবং অস্বাভাবিকভাবে কোমল হয়ে উঠলো,

“শোন, জানকি বাচ্চা।”

এক মুহূর্ত থেমে সে আরও কাছে এলো।

“আমার শরীরটা আজ অদ্ভুতভাবে দুর্বল লাগছে। মনে হচ্ছে ভেতরে কোনো ভিটামিনের তীব্র ঘাটতি তৈরি হয়েছে।”

ন্যান্সি বিরক্তিতে চোখ সরিয়ে নিল।

“তাহলে গিয়ে ভিটামিনসমৃদ্ধ খাবার খান।”

আফরিদ হঠাৎ বিদ্যুৎগতিতে তার কব্জি ধরে টেনে নিজের দিকে নিয়ে এলো। দূরত্বটা মুহূর্তে বিলীন হয়ে গেল।

তার নিঃশ্বাস ন্যান্সির কানের খুব কাছে এসে পড়লো। ফিসফিসিয়ে বলল,

“থ্যাংক ইউ,পারমিশন দেওয়ার জন্য।”

“মানে?”

আফরিদ নিদারুণ ভঙ্গিতে দুই ভ্রু নাচিয়ে এগিয়ে এলো,

“ভিটামিন।”

ন্যান্সি কিছু বলার আগেই আফরিদ তার অধরদ্বয় গ্রাস করলো। নীরবতা আরও গভীর, আরও নিঃশ্বাসরুদ্ধকর হয়ে গেল। ঠাস করে হাতের মুঠোয় ধরা যান্ত্রিক ডিভাইস ফ্লোরে পড়ে দু টুকরো হলো!

তাতে ধ্যান নেই উগ্র পুরুষের! সে মত্ত হয়েছে ওই গোলাপী ওষ্ঠো ভাঁজে।

চলবে……….।✨

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply