জলতরঙ্গেরপ্রেম
পর্ব সংখ্যা;৪২
লেখনীতেনবনীতাচৌধুরি
সকাল থেকেই তরঙ্গের চাঁদ বদনে হাসির বন্যা বইছে। কোনো মতেই তার হাসি থামছে না।
তরীকে শান্তি মতো রান্নাটুকু ও করতে দিচ্ছে না ছেলেটা। একটু পরপরই নিঃশব্দে পেছনে এসে দাঁড়িয়ে তার কানের কাছে মুখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠছে;-
–” স্পিড কমাবো, জান? কমাবো? কমাইইইই?”
কথাটা বলেই গগন বিদারী হাসিতে ফেটে পড়ছে সে। আজ ভার্সিটিতে ও যায়নি তরঙ্গ। শপিংমল থেকে ও এক দিনের ছুটি নিয়েছে। শুধু তরীকে বিরক্ত করবে বলেই যেন তার এতো প্রচেষ্টা। তরঙ্গ চুপ হতেই রান্নার জন্য সব যোগার করতে শুরু করেছে তরী। আজ ডাল, আলুর ভর্তা, আর ভাত। ফ্রিজে একটা ডিম আছে। সেটা খাওয়ার সময় পেঁয়াজ দিয়ে ভেজে নিবে ঠিক করেছে। কিচেনে দাঁড়িয়ে রান্নার জন্য পেঁয়াজ কাটছে তরী। সকাল সাড়ে এগারোটা বাজে। ভাত হয়ে গেছে তার। চোখে পেঁয়াজের ঝাঁজ ধরতেই কেঁদে ফেললো সে। চপিং বোর্ডে ছুরি রেখে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ মোছার মাঝেই ফের তরঙ্গের আগমন ঘটলো। হাতে একটা আধ খাওয়া আপেল। পরশু এক কেজি আপেল এনেছে সে। দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে আপেলে কামড় বসালো তরঙ্গ। বিরক্তি মুখে একবার তরঙ্গের দিকে তাকিয়ে হাত ধুয়ে নিলো তরী। আপেল চিবুতে চিবুতে তরঙ্গ বললো;- –” বুকে কি হয়েছে তোর?” তরঙ্গের কথায় না চাইতে ও বুকের কাছটায় কামিজের খালি অংশে হাত চলে গেলো তরীর। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে প্রশ্ন করলো সে;- –” কি হয়েছে?” –” মনে হচ্ছে কিছু কামড়েছে? কিসে কামড়াতে পারে বল তো?” তরঙ্গের ইঙ্গিত পূর্ণ কথায় বিরক্ত এবং লজ্জিত দুই হলো তরী। ইতর টা আবার শুরু করেছে। নিজের তৈরী করা দাগ গুলো এখন নিজেই চিনতে পারছে না। ঢং, তরীর খুব করে আপসোস হচ্ছে এখন! কেন যে অনুভূতির দোলাচলে পড়ে বদটাকে মাথায় ছড়িয়ে ছিলো। এখন তারই মাথায় লবণ রেখে বরই খাচ্ছে। –” কুত্তা কামড়েছে।” অবাক হওয়ার ভঙ্গিতে মুখে হাত চেপে হা করে উঠলো তরঙ্গ। –” কি বলিস? কখন? কাল রাতে নাকি! কুত্তাটার কি ত্রিশটা দাঁত ছিলো? আমার দিকে তাকা তো। এমন হ্যান্ডসাম ছিলো? দেখে বল তো?” –” কুত্তা আবার হ্যান্ডসাম ও হয়?” –” হয় তো! কুত্তা হট, হর্ণি, রোমান্টিক, সেক্সি সব হয়।” হাতের ছুরিটা নিয়ে এগিয়ে এলো তরী। রেগে তেড়ে মেড়ে তরঙ্গের র্টি-শার্টের কলার চেপে ধরলো সে। ছুরিটা ঠেকালো গলার পাশে। –” এতো অসভ্য কেন আপনি? লজ্জা শরম সব কোন সাগরে বিসর্জন দিয়েছেন শুনি?” তরীর হাতের উপর নিজের হাত রাখলো তরঙ্গ। ফিচেল হেসে, নেশাক্ত চোখে তরীর দৃষ্টিতে দৃষ্টি মেলালো সে। –” তরী নামক প্রেম সাগরে।” –” সময় থাকতে শুধরে যান মিস্টার প্যাটেল!” দুই পা এগিয়ে নিজেদের দূরত্ব কমালো তরঙ্গ। হাতের আপেলটা চপিং বোর্ডে রেখে আগলে ধরলো মেয়েটার কোমর। –” না শুধরালে কি করবে? চুমু খাবে? নাকি আরেক বার আমার ইজ্জত হনন করবি জান?” –” না হলে পটলের মতো কেঁটে রান্না করে ফেলবো!” ভ্রুকুটি করে হেসে ফেললো তরঙ্গ। তরীর রাগী থুতনিতে ছোটো করে চুমু খেলো সে। বিনিময়ে ছুরি উল্টো করে তার বুকে খোঁচা মারলো তরী।
–” তরকারি পুড়ে যাচ্ছে, ছাড়ুন।”
তরীর চিৎকারে তরঙ্গ ছেড়ে দিলো তাকে। দ্রুত পায়ে চুলোর কাছে এগিয়ে যাওয়ার আগে অলগোছে তরঙ্গের আপেলটা পেঁয়াজের উপর রেখে দিলো সে। অজ্ঞাত হাসি হাসি মুখে আপেলে কামড় বসাতেই তরঙ্গের মুখের রঙ বদলে গেলো। পেঁয়াজের তীব্র ঝাঁঝে গলা সহ মুখ জ্বলে উঠলো তার। না পারতে কষ্ট করে আপেলের টুকরোটা গিলে ভোঁতা মুখে বেসিনের দিকে চলে গেলো সে। কুলিকুচি করে চেঁচিয়ে উঠলো তরঙ্গ।
–” বেইমান বউ! স্বামীর নামে ষড়যন্ত্র করিস। জান্নাতে যাবি না।”
ছিমছাম নীরবতায় চেয়ে আছে দেওয়ান বাড়ির ড্রয়িং রুম। মাঝে মধ্যে পাতিলে খুন্তি নাড়ার শব্দ ছাড়া সব কিছুই শান্ত।
কিচেনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রান্না করছেন বুশরা। তার পাশেই মেঝেতে বসে সবজি কাটছেন সাহানারা। আজ কাজের লোকটা আসেনি। ফলস্বরূপ দুই জা কে রান্নার কাজে হাত লাগাতে হয়েছে। সাহানারার শরীর আগে থেকে কিঞ্চিত ভালোর দিকে আছে। তবে প্রতিদিন নিয়ম করে আদরের ছেলের জন্য কেঁদে তা পুরোপুরি সুস্থ হতে পারছে না। এখন আর রাতে ও ঘুমাতে পারেন না তিনি। ছেলেটা কেমন আছে? কি খাচ্ছে, টাকা – পয়সা হাতে আছে কিনা। সেসব চিন্তায় তটস্থ হয়ে প্রায় মধ্যে রাতে কেঁদে উঠেন সাহানারা। সবটা দেখে ও চুপ করে থাকেন ফারহান দেওয়ান।
সবজি কাঁটার ফাঁকে অমনোযোগী হওয়াতে আঙুলে বটি লেগে কেঁটে গেলো ওনার। ব্যথায় কুঁকিয়ে উঠলেন সাহনারা। রান্নার ফাঁকে ঘাড় বাঁকিয়ে এক পলক সাহানারার দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন বুশরা। –” নিজের ভালো পাগলে ও বোঝে। তুমি তাও না ভাবি। নিজের তো ক্ষতি করলে সাথে আমাকে ও ডোবালে। অসহ্য লাগছে তোমাকে।” বুশরার কর্কশ কণ্ঠের চিৎকারে নিজের ব্যথা ভুলে চোখ তুলে তাকালেন সাহানারা। পানিতে টইটম্বুর হয়ে উঠা চোখ জোড়া সামনে দাঁড়ানো বুশরাকে ঝাপসা দেখলো। –” কি বলতে চাইছো তুমি?” –” তরীর পিঠ পোড়াতে গেলে কেনো? মেয়েটা কি না করেনি তোমার জন্য। সারা বাড়ি এক হাতে আগলে রাখতে আর তুমি ওই মেয়েকে এতো কষ্ট দিলে?” হঠাৎ, বুশরার এহেন পরিবর্তন দেখে হতবাক সাহানারা। প্রতি মূহুর্তে তার কানে তরীর নামে বিষ বাক্যে ঢালা থেকে শুরু করে। কীভাবে মেয়েটাকে কষ্ট দেওয়া যায়। সব কিছুর ইন্ধন জোগানোতে বুশরার হাত রয়েছে। সুযোগ পেলে নানা ভাবে ফোরকান দেওয়ানের সামনে তরীকে অপরাধী প্রমাণ করেছে। সেখানে এখন ওনার একটা ভুল করা নিয়ে গত দুই সপ্তাহ ধরে নিয়মিত কথা শোনাচ্ছে বুশরা। নিজের রাগ সংবরণ না করতে পেরে আক্রোশ নিয়ে সুধালেন সাহনারা। –” এখন সব দোষ একা আমার? তোমার ছেলে যদি তার থেকে বড় একটা মেয়ের জন্য পাগল হতো। প্রতিনিয়ত সেই মেয়ের পেছনে ঘুর ঘুর করতো। নিজের পড়োশোনা ছেড়ে ভবঘুরে হতো। তুমি মা হয়ে সেসব সহ্য করতে পারতে বুশরা? আমার ভুল করাটা কি স্বাভাবিক না?” জলন্ত আগুনের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বুশরা। রাগে তার শরীর জ্বলে যাচ্ছে। ইচ্ছে করছে চুলোর আগুন সাহানারার আঁচলে ধরিয়ে দিতে। পুড়িয়ে দিতে এই বাড়ি সুদ্ধু সাহানারা, তরঙ্গ আর তিন্নিকে। তরীকে না মারলে ও চলবে। মেয়েটা তার সব কথা অকপটে মেনে নেয়। ওমন তাশের তুরুপ কে মেরে কি লাভ? ভাবনা রেখে, নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকেই বুশরা আওড়ালো। –” চরিত্র তো তোমার ছেলের খারাপ। কালো চামড়া দেখে ও নিজেকে সামলাতে পারেনি। জিভ চুক চুক করে উঠে মেয়ে মানুষ দেখলেই। নিজের ছেলেকে মানুষ করতে পারোনি। তা কি আমার দোষ?” হাতের ব্যথা আর বুশরার তীক্ষ্ম কটাক্ষে ফের মাথা ঘুরিয়ে উঠলো সাহনারার। বটি মেঝেতে নামিয়ে রেখে উঠে পড়লেন তিনি। বুকের ব্যথা বাড়ছে। তরঙ্গের জন্য বুক ফেটে যাচ্ছে। ছুটে কিচেন থেকে বেরিয়ে চলে এলেন সাহানারা। হন্তদন্ত পায়ে দোতলার দিকে ছুটে গেলেন তিনি। উদ্দেশ্যে তরীদের ঘর। পড়ার টেবিলে বসে হোমওয়ার্ক করছিলো তিন্নি। আজ স্কুলে যায়নি সে। সকাল থেকে দাঁতে ব্যথা করছিলো। আচমকা, ছুটে এসে কেউ তাকে জড়িয়ে ধরতেই ভয়ে কেঁপে উঠলো বাচ্চাটা। ভয়ে চিৎকার করবে এমন সময় চাচির অস্তিত্ব টের পেতেই হা করে চুপ করে গেলো সে। তিন্নিকে চেয়ার থেকে টেনে নিজের কোলে টেনে নিলেন সাহানারা। বাচ্চাটাকে বুকে জড়িয়ে বিছানায় বসে পড়লেন তিনি। হাহাকার ভরা আর্তনাদ করে কেঁদে উঠলেন তিনি। অনবরত তিন্নির গালে মাথায় চুমু এঁকে দিলেন তিনি।
–” আমার আম্মা। মা আমার, আমাকে ক্ষমা করে দে আম্মা। তোদের সাথে এতো অন্যায় করার জন্য আমি ক্ষমা চাইছি মা।”
চাচির আচরণে কি করবে বুঝে উঠতে পারলো পা বাচ্চাটা। ভয় পেয়ে কেঁদে দিলো তিন্নি।
–” কি হয়েছে চাচি?”
সাহানারা চুমু খাওয়া থামালেন না। আরো কয়েকটা চুমু খেয়ে। তিন্নির খোলা চুল গুলো মাথা পেছনে নিয়ে গিয়ে আলতো কণ্ঠে বললেন।
–” চাচি তোদের খুব কষ্ট দিয়েছি তাই না আম্মা? চাচিকে ঘৃণা হচ্ছে?”
চাচির কথার কোনো মানেই বুঝলো না তিন্নি। ছোটো দু’হাতে চোখ মুছে; ভয়ার্ত মনে চাচির গালে হাত রাখলো সে।
–” তুমি কাঁদছো কেন চাচি?”
তিন্নির দু’হাতে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে নিঃশব্দে কেঁদেই চলেছেন সাহানারা। অনুতাপের আনলে দগ্ধ হয়ে ওনার হৃদয় চিহ্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। কেউ ভেতরে বসে ওনার হৃদয়ে হাজারটা তীরের ফলা গেঁথে দিচ্ছে। আজ বহু দিন পর, তিন্নিকে বুকে জড়িয়ে ওনার মনে হচ্ছে সেই ছোট্ট তরঙ্গ কে বুকে আগলে নিয়েছেন তিনি। সদ্য জন্ম নেওয়া ছেলেটাকে বুকে নিয়ে যেমন মাতৃত্বের স্বাদ পেয়ে ছিলেন। তিন্নিকে ওনার নিজের সন্তানের মতোই আপন লাগছে। তরী, তিন্নি ওনার ই তো বাচ্চা। নিজেকে কিছুটা সামলে তিন্নিকে কোল থেকে নামিয়ে পাশে বসিয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
–” সোনা মা আমার। খিদে পেয়েছে তোর?”
–” হ্যাঁ,”
–” হাত – মুখ ধুয়ে আয়। ছোটো আম্মু তোর জন্য খাবার আনছি। আম্মু নিজের হাতে খাইয়ে দিবে কেমন?”
ঢোক গিললো তিন্নি। গুলুমূলু গাল জোড়া ফের মুছলো সে।
–” আচ্ছা।”
চলবে
( প্রিয় পাঠক মহল,
গল্প কেমন হয়েছে জানাবেন কিন্তু! আর রেসপন্স করছেন না কেন আপনারা?) See less
Share On:
TAGS: জল তরঙ্গের প্রেম, নবনীতা চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
She is my Obsession পর্ব ১৯
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ১৪
-
She is my Obsession পর্ব ৪
-
She is my Obsession পর্ব ১০
-
She is my Obsession পর্ব ২৯
-
She is my Obsession পর্ব ৩৩
-
She is my Obsession পর্ব ৫
-
She is my Obsession পর্ব ১৪
-
নবরূপা পর্ব ২৮
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ১৭