#জল_তরঙ্গের_প্রেম
পর্ব সংখ্যা;৩২
#লেখনীতে_নবনীতা_চৌধুরি
তরঙ্গের বুকে মুখ লুকিয়ে আলতো হাতে তার পিঠে চাপড় কাটলো তরী। তরঙ্গ কে স্থির হবার সময় দিলো সে। ভাবলো আজ আর ছটপট করবে না সে।
ছেলেটা নিজে ছাড়লেই সরে আসবে আজ। স্বামী হয় তরঙ্গ; হালাল সম্পর্ক দুজনের। চাইলে ও বা কতক্ষণ নিজেকে আটকে রাখা যায়? অনুভূতিরা তো আর সময়-কাল মেপে ঝোপে চলে না। তারা চলে নিজস্ব নিয়মে। কিন্তু পাঁচ মিনিট পেরোলে ও তরঙ্গ ছাড়লো না তাকে। তরীকে চুপ থাকতে দেখে বাঁধন দৃঢ় হলো তার। ওভাবে থেকেই শান্ত কন্ঠে সুধালো তরী;-
–” একটু আগেই শুয়ে ছিলাম আমি। পাঁচ মিনিট হবে চোখ লেগে এসে ছিলো। আমার শোবার ধরণ ও যে আপনি এতোটা খেয়াল করেন জানতাম না। এতো ভয় পেয়ে যাবেন তাও ভাবিনি।”
–” না ভাবলে এখন থেকে ভাববেন। এই পৃথিবীতে একটা আধ পাগল তরঙ্গ আছে আপনার। আপনার কিছু হলে যে কিনা নিঃস্ব হয়ে যাবে। সন্ন্যাসী হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবে। তাই ভবিষ্যতে যা করবেন, আমার কথা ভেবেই করবেন।”
কোমল হাসলো তরী। ছোট্ট স্বরে জবাব দিলো সে।
–” আচ্ছা ভাববো।”
–” একটা চুমু খাই?”
তরী জবাব দেওয়ার আগেই তরঙ্গ ফের সুধালো;-
–” শুধু একটা! প্লিজ প্লিজ না করবেন না।”
তরীকে বুক থেকে ছাড়িয়ে, আলগোছে নিজের সামনে দাঁড় করালো তরঙ্গ। দু’হাত দিয়ে তার গাল আগলে ধরতেই আবেশে চোখ বুজে নিলো তরী। কাঁপা কাঁপা আঙুলে আঁকড়ে ধরলো নিজের ওড়নার কোণা। তরীর ওষ্ঠদ্বয় তির তির করে কেঁপে উঠলো। মৃদু হেসে মেয়েটার নাকের সঙ্গে নিজের নাক ছুঁইয়ে দিলো তরঙ্গ। পর পর, একে একে তরীর কপাল, দু’গাল আর থুতনিতে স্নেহ ভরা চুমু এঁকে দিলো তরঙ্গ। তরঙ্গের উষ্ণ স্পর্শে তরীর সমগ্র অস্তিত্ব জুড়ে বয়ে গেলো এক অপার্থিব প্রশান্তি। দীর্ঘ দিনের খরা পীড়িত মরুভূমির মতো শুষ্ক হৃদয়টায় যেন আচমকাই নেমে এলো ভালোবাসার স্নিগ্ধ বর্ষণ।
বন্ধ চোখের পাতা বেয়ে গড়িয়ে পড়লো দু’ফোঁটা অশ্রু। এ অশ্রু দুঃখের নয়; পরম প্রাপ্তির। ভালোবাসা বিহীন জীবনে সামান্য স্নেহের পরশ পেতেই। বুকের ভেতর জমে থাকা সকল কষ্ট যেন গুছিয়ে বিদায়ের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। বহুদিনের অন্ধকারের শেষে এক চিলতে আলোর দেখা পেলে যেমন প্রাণ জুড়িয়ে যায়। তরীর ও ঠিক তেমনই মনে হলো। তার ভাঙাচোরা হৃদয়ের প্রতিটি কোণে এই মূহুর্ত থেকে নতুন করে বাঁচার ফুল ফুটে উঠলো। তরীকে ছেড়ে দূরত্ব নিয়ে দাঁড়ালো তরঙ্গ।
লজ্জা আর খুশিতে চকচক করছে তরঙ্গের শুভ্র মুখশ্রী। অপার্থিব এক খুশিতে ঝলমল করছে তার অক্ষিযুগল।
–” আমি কৃপণ না বুঝলি! নিজের আপন বউকে কিসের একটা চুমু দেয় হ্যাঁ? এই কথা বাইরে প্রকাশ হলে আমার পুরুষত্বে কলঙ্কের দাগ লাগবে।”
লজ্জায় থুতনি গলায় ঠেকালো তরী। সেই অসম্ভব সুন্দর দৃশ্য মুগ্ধ চোখে বুকে হাত বেঁধে তরঙ্গ অবলোকন করলো তরঙ্গ। তাদের প্রেমময় এই মূহুর্তের সাক্ষী হলো এক জোড়া বি*ষা*ক্ত চোখ। যার বি*ষ ভরা দৃষ্টির চোবলে তরীকে চিহ্ন বিচ্ছিন্ন করতে সদা প্রস্তুত।
******
এলার্মের শব্দে ঘুম ভাঙলো তরীর। দুই চোখে হাত ঢলে এলোমেলো চুলে উঠে বসলো সে।
পাশেই আলুথালু শরীরে ছোট্ট তিন্নি ঘুমিয়ে আছে। তার ছোট্ট পা আর ডান হাতটা তরীর কোলের উপর। ঘুমের ঘোরে বোন কে জড়িয়ে ধরা তিন্নির পুরনো অভ্যাস। হাত পা ছড়িয়ে বোনের পিঠের নিচে এসে শুয়ে থাকে সে। তরী ও এতে অভ্যস্ত। বরং তিন্নির এই ধম বন্ধ করা ছোঁয়া না পেলে ঘুম আসে না তার। বিছানা থেকে নেমে বারান্দার দরজা খুলে দিলো তরী। এক চিলতে শীতল বাতাস তরীর শরীর ছুঁয়ে মন – মস্তিষ্কের গভীরে ছড়িয়ে পড়ল।
শীতের আগমনী বার্তা ইতো মধ্যেই প্রকৃতির আনাচে – কানাচে ছড়িয়ে পড়েছে। বাতাসে স্থায়ী হয়ে উঠেছে হালকা শীতের আমেজ। গাছের পাতায় পাতায় জমে উঠছে শিশিরের স্বচ্ছ বিন্দু। প্রত্যুষে দূর – দিগন্ত কুয়াশার আবরণে ঝাপসা হয়ে থাকে। চারপাশে নেমে এসেছে এক প্রশান্ত, স্নিগ্ধ নীরবতা, যা শীতের আগমনের কথাই বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়।
সামনের বাগানে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে মনে মনে কিছু একটা ভাবলো তরী। মূহুর্তেই খুশিতে তার হৃদয় ভরে উঠলো। ঠোঁটে মুচকি হাসি এঁটে কার্বাডের কাছে এসে থামলো তরী। কার্বাডের পার্ট খুলে; সব গুলো থ্রি-পিছের নীচ থেকে একটা শপিং ব্যাগ করলো সে। হাসি হাসি মুখে ব্যাগ থেকে একটা কালো শাড়ি বের করলো। শাড়িটা তরঙ্গের দেওয়া। দুই বছর আগে ছেলেটা টিউশনির টাকা জমিয়ে কিনে দিয়ে ছিলো। তরী কখনো পরেনি। শাড়িটার ভাঁজ ও ভাঙা হয়নি এখনো। শাড়ি ঘাড়ে ফেলে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়লো তরী।
******
একেবারে তৈরি হয়ে আজ নিচে নেমেছে তরী। লম্বা চুল গুলোতে সুন্দর করে বেণী করা।
শাড়ির আচঁলটা পাড় করে ব্লাউজের সাথে সেফটিপিন মেরে নিয়েছে। ড্রয়িং রুমের দেয়াল ঘড়িতে চোখ বুলালো তরী। সাড়ে ছয় টা বাজতে আর পাঁচ মিনিট দেরী আছে। বাড়ির সবাই এখনো ঘুমে। কোমরে আচঁল গুঁজে কিচেনে ঢুকে পড়লো সে। পায়েস রান্নার জন্য ফ্রিজ থেকে দুধ নামিয়ে চাউল ধুয়ে পানিতে ভিজিয়ে রাখলো। পর পর চুলা জ্বালিয়ে দুধ ফুটতে বসিয়ে দিলো। দক্ষ হাতে নাশতার পাঠ চুকিয়ে পায়েস ঠান্ডা করে ফ্রিজে তুলে রাখলো সে। চুলোর ভাঁপে তরীর চোখ মুখ লাল হয়ে উঠেছে। তার মধ্যে নতুন পাড় ভাঙা সিল্কের শাড়ি পরিধান করেছে। শরীরের কষ্টে বিশেষ পাত্তা না দিয়ে কাজ সেরে হাত ধুয়ে দাঁড়ালো তরী।
–” তোর শরীরে দেখছি বেশ তেল জমেছে রে তরী। আমার ছেলেকে বিয়ে করে সাধ মিটেনি। এখন আঁচলে বাঁধতে চাইছিস?”
নিজের পেছন থেকে চাচির কন্ঠ পেতেই স্বাভাবিক মুখে ঘুরে দাঁড়ালো তরী।
–” কি বললে চাচি?”
–” তরঙ্গ কে ডির্ভোস দে তরী। আমি তোকে বড়লোক ঘর দেখে বিয়ে দিবো।”
চাচির কথা শুনে পায়ের নিচে মাটি শূন্যে লাগলো তরীর। হাত – পা কেঁপে উঠলো তার। নিজেকে সামলাতে না পেরে ফুঁপিয়ে উঠলো তরী;
–” তরঙ্গ আমার বর চাচি। এই পৃথিবীতে ওই ছেলেটাই একমাত্র আমাকে নিঃস্বার্থ ভাবে এতো ভালোবাসে। তুমি আমার থেকে ওকে কেঁড়ে নিও না প্লিজ।”
তরীর কথায় ক্রোধে ফুঁসে উঠলেন সাহানারা। তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এসে রুটি সেঁকার গরম খু*ন্তিটা হাতে তুলে নিলেন তিনি। মুহূর্তের মধ্যেই তরীর সামনে এসে দাঁড়িয়ে শক্ত হাতে মেয়েটার বেণীর গোড়া মুঠোয় পুরলেন। তারপর কোনো রকম দ্বিধা ছাড়াই শ্যামবর্ণা তরীর ব্লাউজ বিহীন পিঠের উন্মুক্ত অংশে গরম স্টি*লের খু*ন্তি চে*পে ধরলেন।
তীব্র য*ন্ত্র*ণায় আর্ত*নাদ করে উঠল তরী। ছটফট করে চাচির হাত থেকে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগল সে। চোখ-মুখ কুঁচকে করুণ স্বরে কেঁদে উঠল মেয়েটা;-
–” আহ্! ছেড়ে দাও চাচি… আমার পিঠ পুড়ে যাচ্ছে!”
সাহানারার চোখে – মুখে দাউদাউ করে জ্বলছে রাগ। তরীর আর্তনাদ কানে পৌঁছাতেই ফিচেল হাসলেন।
–” আমার ছেলের সঙ্গে শোবার খুব শখ না? এবার দেখব কীভাবে শুইস! ভালো কথায় কিছু বুঝিস না তুই!”
তরীর চোখের বাঁধ আর ধরে রাখা গেল না। নোনা জলের ধারা গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে, পৌঁছে গেল গলার কাছে। কাঁপতে কাঁপতে মাথা নাড়ল সে।
–” আমি তরঙ্গকে আমার পাশ ঘেঁষতে দিইনি, চাচি। উপরওয়ালার দোহাই, হালাল সম্পর্কটাকে নিয়ে এমন নোংরা কথা বলো না।”
কথা গুলো বলতে বলতেই কান্নায় রুদ্ধ হয়ে এলো তরীর কণ্ঠ। অথচ তার সেই অসহায় আর্তি যেন সাহানারার ক্রোধের আগুনকে শান্তি দিচ্ছে। পরম শান্তিতে নিজের কাজে ব্যস্ত সে। মুখ জুড়ে পৈশাচিক হাসির রেশ।
( কেমন হয়েছে জানাবেন কিন্তু! আমাকে একটু প্রার্থনায় রাখবেন প্রিয়রা।)
Share On:
TAGS: জল তরঙ্গের প্রেম, নবনীতা চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ১২
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ২
-
She is my Obsession পর্ব ২৭
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ২১
-
She is my Obsession পর্ব ২৫
-
She is my Obsession পর্ব ৩০
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ২৩
-
She is my Obsession পর্ব ২৪
-
She is my Obsession পর্ব ৫
-
She is my Obsession পর্ব ৬