Golpo romantic golpo আসবো ফিরে আবারো

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৭৮


#আসবো_ফিরে_আবারো

#পর্ব_৭৮

#সুরভী_আক্তার

আজ ভার্সিটি থেকে ফেরার পর থেকেই শিশির বারবার কেমন তীক্ষ্ণ চোখে তাকাচ্ছে আদ্রের দিকে । মুখ ভোঁতা করে রেখেছে । ফেরার পথে গাড়িতে টু শব্দও করে নি । 

বাড়িতে ফিরেই শাওয়ার নিয়ে বেরোলো আদ্র । টেবিলে বসে নিজের ক্লাস টেস্টের পেপার গুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে শ্যামলিনী । 

কদিন আগের ক্লাস টেস্টের রেসাল্ট দেওয়া হয়েছে আজ । রেসাল্ট হাতে পাওয়ার পর থেকেই সে কেমন তব্দা খেয়ে গেছে । 

আদ্র ওয়াশ রুম থেকে বেরিয়ে মাথার ভেজা চুল গুলো মুছতে মুছতে শ্যামলিনী কে উদ্দেশ্য করে গলা বাড়ায়….

” কি হলো ? তখন থেকে ওভাবে বসে আছো কেনো ? 

মেয়েটা নড়েচড়ে ওঠে । 

মুখ খানা জড়ো করে উঠে দাঁড়িয়ে আদ্রের সামনে যায় ‌। হাতের পেপার টা বাড়িয়ে দিয়ে গুরুভার কন্ঠে শুধোয়…

” টেস্টে কত মার্ক দিয়েছেন আপনি আমায় ? 

” কেনো ? টুয়েন্টি আউট অফ টুয়েন্টি…

লোকটার ভাবেলাশ হীন গা ছাড়া জবাবে রমনী ঝেড়ে বললো…..

” প্রফেসর হয়ে চিটিং করলেন ? পেপার মিলিয়ে দেখলাম, আমার এতো মার্ক পাওয়ার কথাই নয় ‌। সেদিন ক্লাসের এক্সাম ভালো হয়নি আমার । পড়তেই পারিনি । যা মাথায় ছিলো লিখে দিয়েছি । ফুল মার্কস পাওয়ার প্রশ্নই আসে না । ফুল মার্কস পাই কি করে আমি..? 

আদ্র সম্পুর্ন দৃষ্টিতে তাকায় । হাসে ওষ্ঠ পিষে । আধো ভেজা শরীরে টি শার্ট জড়িয়ে নেয় । অতঃপর এক পা এক পা করে এগিয়ে রমনীর মুখোমুখি দাঁড়ায় । খানিক ঝুঁকে ক্রুর দৃষ্টিতে মেয়েটাকে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করে,, অতঃপর মিটিমিটি কন্ঠ তুলে গলা ঝাড়ে……

” উঁহুম উঁহুম….

” কিসের উঁহুম উঁহুম ? স্বজনপ্রীতি করছেন ? ফুল মার্কস কেনো দিয়েছেন আমায় ? 

” তুমি আমাকে ভালোবাসতে দিয়েছো,, তাই ? বলেছিলাম না, ভালোবাসতে দিলে টেস্টে ফুল মার্কস দেবো । কথা রেখেছি আমি আমার । 

শিশিরের কান গরম হয়ে আসলো । রক্তিম হয়ে উঠলো লালিত মুখাবয়ব । লোকটার ফিচেল মুখখানা দেখে ফোঁস করে উঠলো পরক্ষণেই……

” অসভ্য,, চিটিং করেছেন ? প্রফেসর হওয়ার সুযোগ নিচ্ছেন ? 

” উঁহু,, তোমাকে সুযোগ দিচ্ছি, বেয়াদব ! প্রফেসর আদ্রিয়ান কাবির আদ্রের বউ হওয়ার সুবিধা পাচ্ছো তুমি ।

” এটা অন্যায় । আমি আমার জ্ঞান আর পরিশ্রম দিয়ে যা পাবো তাই । এক্সট্রা সুযোগ সুবিধা চাই না আমার । বাকি স্টুডেন্ট রা কি ভাববে এতে ? 

” কিছুই ভাববে না । কারন সবাই জানে তুমি বরাবর টপার গার্ল । এবারও টপ করেছো । কেউ ভাববে না অতিরিক্ত । 

” অতো ভাবতেও হবে না । আমার এক্সাম খারাপ হয়েছে সেদিন । সেই অনুযায়ী আমার যত মার্কস পাওয়ার কথা, তত দিন এখন । মার্কস কমিয়ে দিন বলছি । 

জেদ ধরলো শিশির । হাতের পেপার টা আরো বাড়িয়ে দিলো আদ্রের দিকে । সে এই অন্যায় মানবে না ।

আদ্র ওর সিরিয়াস মুখাবয়ব দেখে ঠোঁট কামড়ে আরেকটু ঝুঁকে বলে…

” আবারো ভালোবাসতে দাও, মার্কস কমিয়ে দেবো । 

” কিইই ? 

তড়তড়ে মেজাজে ঝাঁজিয়ে উঠলো মেয়েটা । 

আদ্র গলা খাঁকারি দেয় । পিছিয়ে যায় এক কদম । পেছনে হাত গুটিয়ে টান টান হয়ে দাঁড়িয়ে বলে….

” প্রফেসর আদ্রিয়ান কাবির আদ্র স্বার্থ ব্যাতীত কিছু করে না । ফুল মার্কস দেওয়ার পেছনে যেমন স্বার্থ ছিলো, তেমনি মার্কস কমাতে গেলেও স্বার্থ খুঁজবো । যদি সৎ হয়ে থাকো, তাহলে আমার অফারে রাজি হয়ে যাও । এই সুযোগ বারবার আসে না । তুমিও খুশি আর আমিও । 

মেয়েটা আহম্মক বনে যায় । মাথা ঘোরে তার । মুখ ফাঁক করে তাকিয়ে রয় আদ্রের দিকে । আদ্র দৃষ্টি অপর দিকে থাকলেও বাঁকা দৃষ্টি আছে এদিকে । 

শিশিরের মুখাবয়ব দেখে সে আর নিজেকে সংবরণ করতে পারলো না । ঠোঁট ভেঙে হো হো করে হেসে ফেললো । 

তাৎক্ষণিক ধাম করে ওর বাহুতে একটা আঘাত বসালো শিশির । চিবিয়ে বললো…..

” আপনি কি জানেন,, আপনি একটা নির্লজ্জ প্রফেসর ? 

” তুমি কি জানো, তোমাকে দেখলেই আমার নির্লজ্জ হতে ইচ্ছে করে । 

” ইয়া আল্লাহ,,,, এ কার পাল্লায় পড়লাম আমি ? 

” ইয়া আল্লাহ,, এ কার পাল্লায় পড়লাম আমি ? 

” নকল করছেন কেনো ? 

” করছি না তো ! তুমি একটা আন রোমান্টিক বেয়াদব । এতো সুন্দর হাসবেন্ড পেয়েছো, অথচ পাত্তাই দাও না । চেয়ে চেয়ে নির্লজ্জের মতো ভালোবাসা আদায় করতে হয় । 

শিশির ফিক করে হাসে…..

” দেখেছেন, নিজেই স্বীকার করলেন, আপনি একটা নির্লজ্জ । 

” দেখাবো নির্লজ্জতা ? 

” খবরদার না । 

আদ্র শুনলে তবেই তো । সে তেড়ে এসে শক্ত করে চেপে ধরলো শিশির কে । পেঁচিয়ে নিলো লতানো কোমর । মেয়েটা ছটফট করে উঠলো । 

লোকটা সদ্য শাওয়ার নিয়ে বেরিয়েছে । শরীর ঠান্ডা । তার হীম শরীরের সংস্পর্শে এসে কেঁপে ওঠে রমনী । 

আদ্র আগাম বার্তাহীন শক্ত একটা গাঢ় চুম্বন আঁকে রমনীর ঠোঁটের কোণে । অতঃপর সরে আসে । 

পরিত্রাণ পেতেই ওর বুকে বেশ কয়েক আঘাত বসায় শিশির । অতঃপর সেথায় মাথা গুঁজে মুখ লুকিয়ে নেয় । শ্বাস ফেলে দীর্ঘ । আদ্র ও তাই । লম্বা শ্বাস ফেলে চোখ বুজে নিতেই হীম শীতল কন্ঠে ডাকে শিশির…..

” স্যার ? 

” প্লিজ শিশির, কল মি আদ্র ! 

” উমমম পারবো না । একটা কথা বলি শুনুন । আমাদের ক্লাসের ফারিন মেয়েটাকে চেনেন ? 

আদ্র কপাল গুটায়…..

” কোন ফারিন ? 

” আমাদের ক্লাসেরই । সুন্দর মতো ফর্সা একটা মেয়ে । বেশি বকবক করতো ক্লাসে । লাল চুলের মেয়েটা । মনে নেই ? 

ভাবলো আদ্র । খুব করে মনে করার চেষ্টা করলো । কিঞ্চিত মনে পড়তেই বললো…..

” হু , চিনতে পেরেছি । কিন্তু ওর কথা বলছো কেনো ? 

মাথা তুললো শিশির । ভনীতা হীন সোজাসাপ্টা বললো চোখে চোখ রেখে…..

” ও আর ক্লাসে আসে না । অনেক দিন ধরে দেখি না ওকে । 

” তো ? 

” ও আসে না কেনো জানেন ? 

” কেনো ? 

” কারন ও আপনাকে পছন্দ করতো ! যবে থেকে শুনেছে , আপনার আর আমার বিয়ে হয়ে গেছে, সেই তবে থেকে আর আসে না । বসন্ত উৎসবের পর থেকেই । 

” সো হোয়াট ? 

” নরমালি নিচ্ছেন ব্যাপার টা ? আপনার প্রতি ওর অনুভূতি ছিলো । নিশ্চয়ই সবটা জানার পর চূর্ণ হয়েছে সব । কষ্ট পেয়েছে । তাই হয়তো আসে না । 

আদ্র বেশি গায়ে মাখলো না । দায়সারা ভাবে বললো….

” সব অনুভূতির পরমতা থাকতে নেই । 

হয়তো অন্য কোনো কারনে আসে না । তুমি ওকে নিয়ে ভাবছো কেনো ? 

” কারন আমি না চাইতেও আপনাকে পেয়ে গেছি । কিন্তু ও….

মেয়েটা পুরো বাক্য শেষ করতে পারে না । তার আগেই ওর ঠোঁটের ভাঁজে আঙ্গুল চেপে থামিয়ে দেয় আদ্র । বলে….

” তুমি তখন চাওনি আমায় , কিন্তু আমি চেয়েছিলাম তোমায় । আর চেয়েছি বলেই পেয়েছি, নিয়েছি নিজের করে । 

” নিয়ে লাভ কি হলো ? ঐ মেয়েটা সুন্দর ছিলো, স্ট্যাটাস ছিলো ওদের, আপনার সাথে অনেক বেশি মানাতো ওকে ! 

আদ্র বিব্রত হলো শিশিরের কথায় । চোখ রাঙিয়েও ঠান্ডা হয়ে বললো…..

” বেয়াদব,,, আমার সাথে শুধু তোমাকে মানায় বুঝলে ? আর কারোর সাথে নয় । আমি শুধুই তোমার জন্য সৃষ্টি হয়েছি, আর তুমি আমার জন্য । অন্য কাউকে টানছো কেনো আমাদের মাঝে ? 

” টানছি না তো ! মাঝে মাঝে আমি খুব করে ভাবি জানেন,,, এই দেখুন আমাদের গায়ের রংয়ে কতটা তফাৎ । আপনি কতো সুন্দর । যে কেউ মুগ্ধ হবে । আর আমি, বস্তিতে অনটনে বড় হয়েছি । মানায় না আমাকে আপনার সাথে । খুব সুন্দর নই আমি । আপনার জন্য পারফেক্ট নই । 

শিশিরের ভেজা ভেজা স্বর । আদ্র চোয়াল শক্ত করলো । ছাড়লো ওকে । টেনে নিয়ে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড় করালো । অতঃপর রমনীকে কঠিন ভাবে জড়িয়ে নিলো পেছন থেকে । কাঁধে থুতনি ঠেকিয়ে আয়নার পানে তাকালো । সেখানেই দৃষ্টি বিনিময় হলো দুজনার । আদ্র নরম আবেশে চুমু আঁকলো তার মসৃন কাঁধে । বললো ফিসফিসিয়ে….

” চেয়ে দেখো,, তোমাকেই মানায় আমার সাথে । ইশশ্, কি সুন্দর তুমি প্রিয়দর্শিনী । যাকে এক ঝলক দেখে, যার সংস্পর্শে আমি সুখ পাই, সেইতো আমার সুখপাখি । সেই পারফেক্ট আমার জন্য । নীলপদ্ম তুমি আমার । ভুলেও কখনো ক্ষুণ্ণ করবে না নিজেকে । ওকে,, গট ইট ? 

শিশিরের চোখ ছলছল করে ওঠে । মুচকি হাসে তা সমেত । মাথা ঝাঁকায় । আদ্র তার কানের লতিতে আদর ছুঁইয়ে ঈষৎ হাসে । বিড়বিড়ায়…..

” লাভ ইউ ভেজা বেড়াল । 

,,,,,,,

বাজে দুপুর দুটো । 

কনফারেন্স রুমে ইজি চেয়ারে শরীর এলিয়ে এক দৃষ্টে সামনের ডেস্কের ল্যাপটপের পানে চেয়ে আছে রৌদ্র । চোখে মুখে ভরা হাসির ছাপ । পায়ে পা তুলে আয়েশে বসেছে । চোখ বোলাচ্ছে ল্যাপটপের স্ক্রিনে । অ্যাপার্টমেন্টে ঘটে যাওয়া খানিক আগের সিসি টিভি ফুটেজ নজরে পড়েছে তার । যে ফুটেজে স্পষ্ট ভেসে উঠেছে,,, বাড়ির ছয়জন মেইড সমেত উল্লাসে মেতেছে একবিংশী । তাদের মতোই হাউসকিপিং ইউনিফর্ম পড়ে কিচেনে সাহায্য করতে গেছিলো ‌‌। কিন্তু তারা মেঘা কে কিচ্ছুটি করতে দেননি । আর তারপর থেকেই শুরু হলো রমনীর দুষ্টুমি । 

তাদের কাজও ভেস্তে দিয়েছে সে । সবাইকে নিয়ে জুড়ে বসেছে নাচানাচি । লাউড স্পিকারে গান চালিয়ে নাচিয়ে ছাড়ছে সবাইকে । 

আর এদিকে ল্যাপটপ ওপেন করা মাত্রই সেই দৃশ্য চোখে পড়েছে রৌদ্রের । অমনি থমকে গেছে সে । প্রখর হয়েছে দৃষ্টি । আপনা আপনি হাসি ফুটেছে ওষ্ঠপূটে । সেভাবেই বেশ কতক্ষন ল্যাপটপের স্ক্রিনে তাকিয়ে রইলো সে । অথচ সে এখন কনফারেন্স রুমে বসে,, সেই খেয়াল নেই । লম্বাটে মিটিং টেবিলে বসে চুপটি করে রৌদ্রের মিটমিটে হাসি হাসি মুখাবয়ব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পরখ করছেন উপস্থিত বাকিরা । নতুন প্রজেক্টের সাইনিং ছিলো আজ । ল্যাপটপে কিছু ডকুমেন্ট ফাইল ওপেন করতে গিয়ে সেইযে বেপরোয়া যুবক খেই হারালো , বুঁদ হয়ে আছে পুরো । আর ধ্যানে ফেরার নাম নেই । বাকিরা তব্দা বনে চেয়ে আছেন । আশরাফ তালুকদার ও আছেন সবার মাঝে,, তিনি নিচু স্বরে ডাকলেন রৌদ্র কে….

” রৌদ্র । 

যুবকের কানে পৌঁছালো না সেই ডাক । 

মাহির ছিলো বাইরে । হাতে ফাইল সমেত ভেতরে ঢুকে থমথমে পরিস্থিতি দেখে রৌদ্রের দিকে এগোলো । নিজেও ল্যাপটপের দিকে তাকানো মাত্রই আলতো হেসে মাথা নাড়ালো দুদিকে । নিচু স্বরে ঘোরে মশগুল লোকটাকে ডাকলো,,,,

” বস ,, আপনি এখন বোর্ড রুমে আছেন । 

চকিতে নড়েচড়ে ওঠে রৌদ্র । সম্বিত ফিরতেই আশপাশের অ্যাসোসিয়েট দের দিকে তাকনো মাত্রই সবার দৃষ্টির মুখে পড়ে অপ্রস্তুত হয়ে যায় । দ্রুত সোজা হয়ে বসে । গলা ঝেড়ে নিজেকে স্বাভাবিক করে বলে……

” উপসস্ সরি । লেটস গেট স্টার্টেড । 

মিটিং চলাকালীন আধা ঘন্টার মাথায় বোর্ড রুমের দরজা ঠাস করে খুলে ভেতরে ঢুকলো কেউ । পেছনে গার্ড বাঁধা দিয়েও থামানো গেলো না তাকে । হুড়হুড়িয়ে ভেতরে ঢুকলো একবিংশী রমনী । 

গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার মাঝপথে বাঁধা পাওয়া মাত্রই একসাথে দরজার দিকে তাকালেন উপস্থিত সকলে । রৌদ্র কিছুটা বিরক্তি নিয়ে তাকালেও পরমুহূর্তে শিথিল হয়ে এলো মেঘাকে দেখে । 

মুখাবয়বের অভিব্যক্তির বদল আসলো কিঞ্চিত । মেঘা এখানে আসলো কি করে ? তাও হঠাৎ, এভাবে ? 

অগত্যা উঠে দাঁড়ায় যুবক । ভেতরে এতো সব অজ্ঞাত অনাকাঙ্ক্ষিত মানুষজন দেখে দরজার কাছেই থমকেছে মেঘা । থ বনে গেছে সেখানেই । পা চললো না আর । 

প্রগাঢ় নয়নে একে একে প্রত্যেককে দেখে শেষে রৌদ্রের পানে দৃষ্টি থামলো । সে ভেবেছিলো রৌদ্র কেবিনে একা । নতুবা ভিন্ন সন্দেহের বীজ ছিলো মনে । তাইতো বাঁধা উপেক্ষা করে এভাবে হুমড়ি খেয়ে ভেতরে আসলো । কিন্তু না, তার ধারনা ভুল । 

এতো সব বিদেশি বিড়াল চোখা দৃষ্টির সামনে রমনী অপ্রস্তুত হয়ে চোখ নামায় । গুটিসুটি মেরে নত হয়ে দাঁড়ায় । কেউ কিছু বলার আগেই তেড়ে যায় রৌদ্র……

” সুইটহার্ট ! হোয়াট হ্যাপেন্ড জান ? তুমি এখানে কেনো ? 

সুইটহার্ট সম্বোধন টা যেনো বাজ ফেললো সবার মাঝে । আশরাফ তালুকদার মৃদু হেসে চোখ নামালেও বাকিরা চোখ বড় বড় করে চাইলেন । তবে রৌদ্রের পরোয়া নেই । সে সোজা রমনীর মুখোমুখি হয়ে তার মুখ আজলে নেয় বিচলিত হয়ে । ব্যাতিব্যস্ত হয়ে পড়ে……

” ইভারা,, কি হয়েছে ? এনি প্রবলেম ? তুমি এখানে আসলে কি করে ? একটু আগেও তো বাড়িতে ছিলে ! 

মেঘা পিটপিট করে চোখ তোলে…..

” আপনার ড্রাইভার নিয়ে এসেছে ! 

” কিন্তু কেনো সানি ? ঠিক আছো ? 

মেঘা কিছু বললো না । রৌদ্রের ঘাড় ছাপিয়ে পেছনের সবাইকে দেখে ফের দৃষ্টি নত করলো । রৌদ্র বুঝলো ওর বেগতিক অস্বস্তিকর অবস্থা ‌। বোঝা অবিরাম রমনীকে নিজের সুঠাম দেহের আবডাল করলো সে । আলতো ঘাড় ঘুরিয়ে বললো,,,,

” এভরিওন,,, আই উইল বি ব্যাক ইন টু মিনিটস । 

মাহির, তুমি দু মিনিট সামলে নাও একটু । আমি আসছি । 

মেঘাকে সাথে সবার দৃষ্টি থেকে বাঁচিয়ে দশ তলায় নিজের কেবিনে আসে রৌদ্র । কনফারেন্স রুম গ্রাউন্ড ফ্লোরে । 

কেবিনের দরজা চাপিয়ে সোজাসুজি রমনীর দিকে তাকালো যুবক…..

” ইভারা,,

” স্যরি,, ডিস্টার্ব করলাম ! 

” উঁহু, হইনি ডিস্টার্ব । ইম্পর্ট্যান্ট মিটিং ছিলো, কিন্তু তোমার থেকে নয় । এবার বলো, তুমি এখানে আসলে কি করে ? বাড়ি থেকে বেরিয়েছো কি করে তুমি ? 

” আমাকে আটকায় কার সাধ্যি ? মিস করছিলাম আপনাকে । লাস্ট দশ মিনিটে কতবার ফোন করেছি দেখেছেন ? আর এমনিতেও আমি আপনার অফিসের পথ চিনে গেছি । একলা আসতেও পারতাম । কিন্তু গার্ড আর ড্রাইভার ছাড়ছিলো না । তাই ওদের সাথে এসেছি । 

” মিটিংয়ে ছিলাম , ফোন অফ ছিলো । তাই বলে এভাবে হুট হাট আসবে তুমি ? 

” হুট হাট আসতে পারি না ? অসুবিধা হয়ে যাবে বুঝি ? আচ্ছা আমি চলে যাচ্ছি তাহলে…..

” এই ইডিয়ট । নাটক শিখেছো খুব, তাই না ? যদি পথেঘাটে কোনো কিছু হয়ে যেতো ? 

” হয়নি তো ! এই দেখুন,আমি পুরোপুরি ঠিক আছি । 

মুচকি হাসলো রৌদ্র । ঠোঁট নামিয়ে ছোট্ট পরশ আঁকলো রমনীর ললাটে । ডান চোয়ালে আলতোভাবে হাত রেখে বলল…..

” ওকে সানি । তুমি একটু বসো এখানে । আমি পাঁচ মিনিটে মিটিং শেষ করে আবার আসছি । ওকে ? এখানেই থাকবে । বেরোবে না কোথাও । ফিরে এসে লাঞ্চে যাবো একসাথে ! 

একবিংশীর সায় পেতেই রৌদ্র বেরিয়ে এসেছে ওকে তার কেবিনে রেখে । 

এই নিয়ে চার বার রৌদ্রের অফিসে আসলো মেঘা । ইদানিং রোজ রোজ আসে । সবটা এখন প্রায় নখদর্পণে । রৌদ্রের বড় ইজি চেয়ারটায় সে বসলো গিয়ে । এদিকে ফের নিচে নেমে মিটিংয়ে জয়েন হয়েছে রৌদ্র । সে ব্যাতীত সব অসম্পূর্ণ । কিছুই হবে না । রৌদ্র আসা মাত্রই আশরাফ তালুকদার কেমন চোখ সরু করে তাকালেন । তিনি মেঘাকে সামনাসামনি দেখলেন আজই প্রথম । 

তার দৃষ্টি বুঝে রৌদ্র তার দিকে তাকায়, ধীরে বলে…..

” স্যরি আঙ্কেল । 

মৃদু হেসে চোখের ইশারায় শান্তনা দিলেন ভদ্রলোক । 

ফেলে রাখা আলোচনা শুরু হবে সবে । রৌদ্র মুখ খুলতে যাবে,, তার আগেই কেমন থরথরিয়ে কেঁপে উঠলো পুরো বহু তলা বিল্ডিং । গ্রাউন্ড ফ্লোরেই মাত্রাতিরিক্ত কম্পন টের পেলো সবাই । প্রথম সেকেন্ডে স্বাভাবিক কম্পন অনুভূত হলেও পরক্ষনেই মস্তিষ্ক সজাগ হতে সময় লাগলো না কারোরই । 

মাথার উপরের পাঁচ পাখার সিলিং ফ্যানটা পেন্ডুলামের মতো ডানে বামে দুলছে । দেয়াল ঘড়িটা বিকট শব্দ তুলে মেঝেতে আছড়ে পড়ে চূর্ণ হলো ঝনঝন করে । কেবিনের ডান পাশের দেয়াল ঘেঁষে দাঁড় করানো ফাইলের বিরাট শেলফটাও মুহুর্তেই এঁকেবেঁকে দুলে উঠে ঠাস করে পড়লো মেঝেতে । কেউ অটল পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না । পায়ের তলার শক্ত মেঝে যেনো ঢেউ খেলছে । অনেকেই টাল হারিয়ে ছিটকে পড়লেন মেঝেতে । কেউবা নিজেদের সামলে ছুটলো বাইরে । 

যেনো আকস্মিকই উল্টে গেলো ধরিত্রী ।

কানে বাজলো চারদিকের তীব্র চেঁচামেচি । নিমিষেই এলোমেলো কদমে দিকবিদিক ছুটতে লাগলেন সকলে । 

কম্পন বাড়ে,, পুরো বিল্ডিং কাঁপে । কনফারেন্স রুমের চেয়ার টেবিল উল্টে এলোমেলো হয়ে যায় সব ‌। 

মাহির টালমাটাল পা সামলে কন্ঠ চিরে আওড়ায় ভড়কানো গলায়……

” বসস্,,, ভুমিকম্প । 

রৌদ্র তখনো হিতাহিত জ্ঞান শূন্য মস্তিষ্কে থম মেরে দাঁড়িয়ে আছে । মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো তার । তীব্র আতঙ্কে কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমলো । সে আওড়ালো…..

” ইভারা….

মেঘা সেই দশ তলায় । সে মেঘাকে সেখানে একা রেখে এসেছে । কেঁপে ওঠে যুবকের অন্তরাত্মা । শুকিয়ে আসে ভেতরটা । ধড়ফড় করে ওঠে সে । ভাবে না এক মুহুর্ত । সব ফেলে উদ্যমী হয়ে ছোটে ! ছুটতে গিয়ে কম্পনের তীব্রতায় ছিটকে পড়ে দেয়ালের গায়ে । উঠে দাঁড়ায় আবার । 

মাহির আশরাফ তালুকদার কে সামলে দিশেহারা রৌদ্র কে ডাকে…..

” বস ! কোথায় যাচ্ছেন ? ইটস অ্যান আর্থকোয়েক ! উই নিড টু গো আউটসাইড রাইট নাও, প্লিজ ।

রৌদ্রের কানে পৌঁছালো । সে কেবলই কেঁপে কেঁপে গলা তুললো…..

” মাহির,, আমার প্রাণ ভোমরা কে উপরে রেখে এসেছি আমি । তুমি বাকিদের সামলাও….

আর বলতে পারলো না কিছু । বুকে তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করলো সে ‌। গলা ধরে এসেছে । লিফট এখনো সাত তলায় । নামছে নিচে । প্রাণভয়ে এলোমেলো হয়ে উপরের সবাই নামছেন, কেউ কেউ সিঁড়ি বেয়ে । 

রৌদ্র থামলো না, দমলো না লিফটের অপেক্ষায় । সিঁড়ির পথে ছুটলো সে…..

সিঁড়ি ভেঙে ওঠা প্রতিটা কদম তার নিকট একেকটা যুগের সমান মনে হয় । সে পারে না সইতে । 

প্রায় চল্লিশ সেকেন্ডের একটি ভুমিকম্প । তার মাত্রা জানা নেই । সব লন্ডভন্ড করে দিয়ে দমে যায় । চেঁচামেচি, আশপাশের ভবন ধসে পড়ার বিকট শব্দ থেমে যায় ক্ষণিকেই । যে যার অবস্থানে থমকায় । কেউ কেউ ভবনের বাইরে বেরিয়েছে । সিঁড়ি বেয়ে নামার পথে সবটা থেমে আসতেই হাঁফ ছেড়েছেন অনেকে । 

তবে দমে নি বেপরোয়া যুবক । সেই গ্রাউন্ড ফ্লোর থেকে বিরতি হীন হাঁসফাঁস করে উঠেছে দশ তলায় । সিঁড়ির পথে আটকে যাওয়া প্রত্যেকে অবাক লোচনে চেয়ে দেখেছে বিচলিত যুবককে । 

রৌদ্র থামে নি । ছুটে ছুটে একটানা উঠেছে দশম ফ্লোরে । চারপাশ এলোমেলো । যেনো চলেছে ধ্বংসযজ্ঞ । 

এপাশ ওপাশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আসবাব । 

রৌদ্রের পা চলে না আর । কেবিনের দরজার কাছে হুমড়ি খেয়ে ভেঙে পড়ে ধপাস করে । কাঁপে সর্বাঙ্গ । 

আঁখি কোটর ভরাট । সেথা হতে উপচে পানি গড়ালো । সে হাঁসফাঁস করে মাথা তুললো । বুক ভারী হয়ে এসেছে । টানার চেষ্টা করলো দম । ঝাঁপসা চোখ মেলে উচ্চারণ করলো মুখ ফুটিয়ে…..

” জানে মাননন !

মুখেই মিলিয়ে যায় তার ডাক ‌।

লাল হয়ে উঠেছে যুবকের উজ্জ্বল শ্যামলা মুখাবয়ব । চোখের শিরা উপশিরা রক্ত বর্ন । হা করে শ্বাস টানছে । তবুও নিজের চিন্তা বিন্দুমাত্র নেই । সবটুকু ধ্যান ধারণা অস্তিত্ব জুড়ে কেবলই মেঘাকে অক্ষত দেখার তীব্র আকুলতা । সে নড়তে গেলেও শরীর গুঁড়িয়ে আসে । থরথর করে কাঁপে হাত পা । 

কেবিনের কোনো কিছুই স্বাভাবিক নেই । এপাশ ওপাশ এলোমেলো হয়ে গেছে সব । প্লাস্টার খসে পড়েছে দেয়াল হতে । চেয়ার টেবিল কাত হয়ে পড়ে আছে । 

রৌদ্র সেসবের ধার ধারলো না । গোটা রুমে নজর বোলালো । মেঘার অস্তিত্ব নেই কোথাও । সে আকস্মিকই কেমন বাচ্চাদের ন্যায় কেঁদে উঠলো । ডাকলো গলা চিরে…..

” ইভারা ! আ’ম হেয়ার সুইটহার্ট ! আর ইউ ওকে ? কোথায় তুমি ? ইভারা ! 

সাঁড়া শব্দ নেই । রৌদ্র উঠে দাঁড়ায় । পা কাঁপে । দাঁড়াতে পারে না ঠিক ভাবে । সে কোনো রকমে ভেতরে ঢুকলো । খুঁজলো গোটা কেবিন । মেঘাকে না পেয়ে বেরোলো আবার । সিঁড়ি ভেঙে নামতে নামতে বারবার ডাকলো হাঁক ছেড়ে……

” ইভারা ! 

দশ তলা থেকে নয় তলা, অতঃপর আট তলা, এভাবে সবখানে খোঁজা শেষ । 

অফিসের অনেক কর্মী অক্ষত আছেন এখনো । তারা নিচে নামার ফুরসৎ পান নি । রৌদ্র সবার মাঝে মেঘাকে খুঁজলো । সম্মুখিন হলো শত প্রশ্নের । নিজেদের বসকে অমন টালমাটাল অবস্থায় দেখে ভড়কেছেন সকলে । 

রৌদ্র পঞ্চম তলায় নেমে আসে । মেঘাকে খুঁজে না পেয়ে পাগলপ্রায় সে । ঘেমে নেয়ে একাকার । পড়নের ব্লেজার খুলে ছুড়ে মেরেছে কোথাও । চোখ মুখ জুড়ে বিভৎস আতঙ্ক তার । মেঘা যে নিচে নামতে পারে, সেই ক্ষুদ্র চিন্তা টুকুও তার এলোমেলো মস্তিষ্কে আসে নি একটাবারও । সে পাঁচ তলায় নেমে গোটা ফ্লোরে খোঁজে । পায় না । 

ধড়ফড় করে সিঁড়ির দিকে ফিরতেই থমকে যায় ধ্যান জ্ঞান খোয়ানো বেপরোয়া যুবক । করিডোরের মাথায় মেঘা দাঁড়িয়ে ‌। তার পেছনে মাহির সহ অফিসের বাকি স্টাফরা আছেন । 

চোখ মুখ জবজবে ভেজা রমনীর ।

ওকে অক্ষত অবস্থায় দেখা মাত্রই থমকে গেলো যুবক । পলক ফেলে তাকালো আবার ‌। দৃষ্টি ঝাপসা । সেই ঝাপসা দৃষ্টিতে আস্ত একবিংশীর ছিমছাম তন্বী দেখে এতক্ষণে বুক চিরে শ্বাস পড়ে তার । 

দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না । ধপ করে হাঁটু ভেঙ্গে পড়ে যায় মেঝেতে । সবাইকে অবাক করে দিয়ে শব্দ করে কেঁদে ওঠে । এদিকে টুপটাপ পানি ঝড়ে রমনীর চোখ বেয়েও । এক ছুটে রৌদ্রের কাছে যায় সে । হুড়মুড়িয়ে সামনে বসে । লোকটার ভেজা মুখ আগলে ধরে ছোট ছোট দুহাতে……

ফিকড়ে বলে…..

” রো….রৌদ্র ! ঠ….ঠিক আছেন আপনি ? কিছু হয়নি তো আপনার ? কোথায় গেছিলেন আপনি , হ্যাঁ ? যদি কিছু হয়ে যেতো ? 

রমনীকে আর কিছু বলার সুযোগ দিলো না যুবক । নিস্তেজ হাঁটুতে ভর করে আকস্মিক দুহাতে জাপটে ধরলো ওকে । 

বুক কাঁপছে এখনো । সে এলোমেলো হয়ে যায় । কাউকে তোয়াক্কা করে না । ছাড়ে মেঘাকে । হাতের আজলে রমনীর নির্ভেজাল মুখখানা আগলে ধরে পুরো মুখ জুড়ে ভেজা চুমুতে ভরিয়ে দেয় । শুষে নেয় ভেজা চোখের কার্নিশ । শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আবার । 

পরক্ষনেই ছাড়ে ‌। ধড়ফড় লাগে । মনে হয় ছাড়লেই মিলিয়ে যাবে মেঘা । কেটে যাবে ঘোর । 

রৌদ্র ব্যাকুল হয়ে ওঠে । কি করবে বুঝতে পারে না । ভেতর থেকে কাঁপছে সে । পাগলের ন্যায় শব্দ করে কাঁদছে অঝোরে । সে আবারো মেয়েটার পুরো মুখে ছোট ছোট শতাধিক পরশ এঁকে ভরিয়ে দেয় । কাঁদে ফুঁপিয়ে ! 

তাজ্জব রমনীর কপালে কপাল ঠেকিয়ে ক্রন্দনরত স্বরে বলে…..

” জাননন,,, কোথায় ছিলি তুই ? আমি সবখানে খুঁজেছি । মরে যাচ্ছিলাম তোকে না পেয়ে । কেনো এভাবে মারিস আমায় ? ঠিক আছিস হ্যাঁ ? কিছু হয়নি তো ? 

মেঘা পাথর বনেছে রৌদ্রের এমন অভাবনীয় কান্না দেখে । পেছনের সব অফিস স্টাফেরা নিস্তব্ধ হয়ে অবিশ্বাস্য নিষ্পলক নয়নে চেয়ে দেখছেন একটা মেয়েকে ঘিরে তাদের বসের উদগ্রীবতা । যে রুডভিক কাবির রৌদ্র গত পাঁচ বছর ধরে সবার সামনে নিজেকে গুরুভার হিসেবে পেশ করে এসেছে , সেই রুডভিক কাবির রৌদ্রই আজ শক্ত আবরন ছাড়িয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে সবার সামনে । তাও কিনা একটা মেয়ের জন্য ! সেই মেয়েকে হারানোর ভয়ে । 

মেঘা মূর্ত বনে যায় । 

ভূমিকম্পের আভাস পেতেই সবার আগে লিফটে করে নিচে নেমেছে সে । হন্নে হয়ে খুঁজেছে রৌদ্র কে । মাহির যেইনা বললো রৌদ্র উপরে উঠেছে , সেইনা সব ভুলে রমনীও ছুটেছে উপরে । আটকাতে পারেনি ওকে কেউ । 

আর উপরে ওঠা মাত্রই রৌদ্রের এমন ছটফটে অবস্থা নাড়িয়ে তুলেছে তার অন্তঃস্থল । 

” রৌদ্র,,আমি ঠিক আছি তো । কিছু হয়নি আমার । এই দেখুন । রিল্যাক্স,,, আমি ঠিক আছি ‌। কিন্তু আপনি ঠিক নেই একটুও । তাকান আমার দিকে । 

রৌদ্র ভেজা চোখ খুললো ‌। 

” আ’ম সরি জাননন,,, তোমাকে একলা রেখে আসা উচিত হয়নি আমার । যদি তোমার কিছু হয়ে যেতো , মরে যেতাম আমি । 

” কিচ্ছু হয়নি আমার । আমিও তো অনেক আগেই নিচে নেমে গেছিলাম । আপনি কেনো উঠতে গেলেন উপরে ? 

” তোমার জন্য…..

একটুখানি বাক্য খসলো তার কন্ঠ চিরে ‌। অতঃপর সে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো মেঘাকে ‌। কাঁধে মুখ গুজে চুম্বন আঁকলো ‌। মেঘা নিজেকে সামলায় । আত্মারাম খাঁচাছাড়া হচ্ছিলো তারও ‌। সে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো । 

” সবাই দেখছে, ছাড়ুন । 

” দেখুক । ছাড়তে পারবো না । 

এভরিওয়ান, গেট আউট অফ হিয়্যার । 

শেষের আদেশে দৃষ্টি নামালেন সকলে । একে একে পুরো ফ্লোর ফাঁকা হলো । বেরিয়ে আসলেন সবাই । 

রৌদ্র ওকে ছাড়ে না । বরং নিবিড় ভাবে মিশিয়ে নেয় বুকের মাঝে ‌ । তার হাত পা অচল হয়ে গেছে । সিঁড়ি বেয়ে দশতলা ওঠা, আবার পাঁচ তলা নীচে নেমে আসা,,, সব মিলিয়ে নিস্তেজ প্রায় । 

পা দুখানি নিস্পন্দ হয়ে গেছে যেনো । সে পা নাড়াতে পারে না । তবুও ছাড়ে না মেঘাকে । 

,,,,,, 

উইকেন্ডে কাল ছুটি আছে ইয়াশের । বাড়িতেই থাকবে । ধকল কাটিয়ে হসপিটালে থেকে ফিরে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়েছে আজ ।

এদিকে টানা পাঁচ দিন পর আজ অনেকটা ফুরফুরে দেখাচ্ছে শাফাহ্ কে । এই গত পাঁচ দিন যেনো দমবন্ধ লেগেছে । ঘরবন্দি ছিলো প্রায় । কথা কম বলেছে । মুড সুইং হয়েছে হাজার বার । তবে আজ কদিনের মাথায় অনেক টা সুস্থ সে । 

বাজে রাত্রি সাড়ে এগারোটা । বোকা রমনী এখনো ঘুমোয়নি । বারবার তাকাচ্ছে দেয়াল ঘড়ির দিকে । এগারোটা বেজে চল্লিশ মিনিট । মেয়েটা বসে থাকতে পারছে না । অনেকক্ষণ ধরে হন্তদন্ত হয়ে পায়চারি করছে পুরো ঘর জুড়ে । এ ঘরে সে একা ঘুমোয় । পাশের ঘরে ইয়াশ । আজ অবধি সেই ঘরের ভেতরে ঢুকতে পারে নি শাফাহ্ । ওখানে কি আছে, তা সম্বন্ধে ইয়ত্তা নেই । 

আরো পাঁচ মিনিট পেরোতেই ছটফট করে উঠলো মেয়েটা । ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা । ধড়ফড় করে ঘর থেকে বেরোলো । লিভিং রুমের লাইট অন করে এগোলো কিচেনের দিকে । এই কদিন শাফাহ্’র জন্য বাক্স ভরে ভরে চকলেট, পেস্ট্রি এনে ফ্রিজ লোড করে ফেলেছে ইয়াশ । মেয়েটার পছন্দ ওসব । সারাদিন এসবই খায় । 

নরমালে কিছু পেস্ট্রি কেক ছিলো । শাফাহ্ বের করলো সেগুলো । বেশ কয়েকটা সাজিয়ে নিলো কাঁচের ট্রেতে । অতঃপর কেবিনেট থেকে বের করলো আরো কিছু । ট্রে খানা এক হাতে তুলে অন্য হাতের মুঠোয় বাড়তি জিনিস দুটো চেপে ধরে বুক ফুলিয়ে শ্বাস ফেললো । 

ভয়ে ভয়ে কদম এগোলো ইয়াশের সেই বদ্ধ রুমের দিকে । বুক কাঁপছে দুরু দুরু । যদি ঘুমে ব্যাঘাত ঘটার পর লোকটা ধমকায়, তাহলে কি হবে ? 

মেয়েটা ধমকের পরোয়া করলো না । দরজা লাগানো । সে বাইরে থামলো । হাঁটু কাঁপছে, অধর চোবালো জিভে । গলা ভিজিয়ে ডাকলো…..

” শু…শুনছেন ? মেঘার ভাইয়া ! 

অতীব ক্ষীণ তার আওয়াজ । গলা চিরে বেরোতে চায় না । কাঁপে ভীত রমনীর কন্ঠনালি । সে বারংবার ঠোঁট ভেজায় । এক হাতে কাঁচের ট্রে টা শক্ত করে চেপে ধরে অন্য হাতে আলতো করে ধাক্কা দেয় দরজায় । 

খুব বেশি চাপ প্রয়োগ করতে হলো না । দরজা বোধহয় ভেজানো ছিলো । হালকা ধাক্কা পেতেই ধীরে ধীরে খুলে গেলো । অমনি শিউরে উঠলো রমনী । ভেতরে হলদে আলো জ্বলছে । 

এই প্রথম ভেতরকার দৃশ্য নজরে ভাসলো । হাওয়া লাগলো গায়ে । ধক্ করে ঢোক গিললো মেয়েটা । জমাট বাঁধলো ললিতাঙ্গ । 

হলদেটে আলোয় ভেতরটা বোঝা যাচ্ছে না পরিষ্কার ভাবে । সাহস জুগিয়ে রমনী ভেতরে পা বাড়ায় । ঠাহরে অনুভুত হয়,, ডান পাশে বেডের উপর বেঢাল হয়ে পড়ে আছে তপ্ত যুবক । 

দরজার পাশে সুইচ বোর্ড হাতড়ে সুইচ টিপলো শাফাহ্ । তবে আলো জ্বললো না এ ঘরে । বোধহয় এই ড্রিম লাইট ব্যাতীত আর কোনো লাইট নেই । 

মেয়েটা সামনে এগোয় নিশানা করে । পুরো ঘরের কোথায় কি আছে বোঝা দায় । চোখ জোড়া হলদে হয়ে আসছে ।বেড সাইড টেবিলের উপর হাতের ট্রে রেখে আলগোছে বিছানার পাশে বসে শাফাহ্ । ধীরে ডাকে…..

” এই যে, মেঘার ভাইয়া ! শুনছে……

রমনীর কন্ঠ চিরে পুরো বাক্য শেষ হলো না । তার আগেই আকস্মিক হামলার শিকার হলো সে । ঘুমন্ত যুবক আচমকাই চড়াও হয়ে উঠলো । বাঘের থাবার ন্যায় এক ঝটকায় রমনীকে হেঁচকা টানে ছিটকে ফেললো বিছানায় । বিছানার সাথে ঠেসে খুবলে ধরলো দুহাত । ভড়কে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো রমনী……

” আআআআআ । 

অগত্যা শক্ত হাতে ওর মুখ চেপে ধরলো ইয়াশ । 

চলবে…………

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply