Golpo আমার আলাদিন কষ্টের গল্প

আমার আলাদিন পর্ব ১৫


আমার_আলাদিন

জাবিন_ফোরকান

পর্বসংখ্যা১৫

অনুরাগের বাসায় বসে প্লে স্টেশনে গেইম খেলছে সাইবান। সময়টা সন্ধ্যার পর। এই সময়েই অনুরাগ অফিস থেকে ফেরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করে এখন একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাসিস্টেন্ট প্রফেসরের পদে আছে সে। অনুরাগের মা কিছুক্ষণ আগেই সাইবানের জন্য বাটি ভর্তি নারকেলের নাড়ু আর শরবত দিয়ে গিয়েছেন। এও বলে গিয়েছেন আজ তার হাতের মাটন বিরিয়ানি না খেয়ে বাসায় না যেতে। এই ঘরে সাইবান পরিবারের সদস্যের মত, তেমনি তার ঘরে অনুরাগ।

সাইবান যতক্ষণে গেমের সাত নম্বর লেভেলটা টপকেছে, তখন তোয়ালেতে মাথা মুছতে মুছতে রুমে এলো অনুরাগ। গোসল করে এসেছে তাই খালি গা, শুধু একটা ট্রাউজার পরনে। কাঁধে তোয়ালে ছড়িয়ে সে বন্ধুর পাশে বসে দুটো নাড়ু তুলে একসাথে মুখে পুরে দিল। অপর হাতে জয়স্টিক তুলে গেমে যোগদান করল।

“তোর গা থেকে লাক্স সাবানের গন্ধ আসছে।”

সাইবান বাঁকা হেসে মন্তব্য করল। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েই অনুরাগ বলল,

“তো? লাক্স ব্যবহার করেছি তাই।”

“মেয়েদের সাবান ব্যবহার করিস এখনো, মানে স্বভাবটা আর যাবেনা।”

“সাবানেরও আবার মেয়ে ছেলে? তাছাড়া তুই আমাকে এটা বল, তুই কীভাবে জানলি লাক্স সাবানের গন্ধ কি রকম?”

তীর্যক হাসল সাইবান, চোখ টিপ দিয়ে জানাল,

“আই হ্যাভ মাই ওয়ে।”

না পারতে হেসে ফেলল অনুরাগ। স্ক্রিন থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সাইবানকে দেখল। পা ঝুলিয়ে ঝুলিয়ে নাড়ু খাচ্ছে আর মনোযোগ দিয়ে গেইম খেলছে। হঠাৎ করে দেখলে তার মুখভঙ্গি একদম বাচ্চাদের মতন মনে হয়। গায়ে গতরে হয়ত বড় হয়ে গিয়েছে ছেলেটা, তবে অন্তর থেকে সাইবান যেন আজও সেই শিশুটি রয়ে গিয়েছে। আজও তাই মনে হয় অনুরাগের। সে হঠাৎ করেই মোলায়েম গলায় বলল,

“তোকে ইদানিং খুশি খুশি দেখায়।”

“আমি তো সবসময়ই খুশি থাকি। ইদানিং কেন বলছিস?”

“আই মেন্ট জেনুইন হ্যাপিনেস।”

জয়স্টিকের উপর সাইবানের আঙুল জমে গেল। গেমের ভেতর গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় চললেও সে যেন ভুলে গিয়েছে কীভাবে খেলতে হয়। অনুরাগ সোফায় হেলান দিয়ে বসে ব্যক্ত করল,

“টু বি অনেস্ট, আমি মনে করেছিলাম এই বিয়েটা তুই মানতে পারবিনা। মানিয়ে চলতে পারবিনা। কিন্তু আজকাল তোকে দেখে মনে হয়, তুই ভালোই হ্যান্ডেল করছিস। ইউ আর হ্যাপি অ্যান্ড প্রোটেকটিভ অব ইওর ওয়াইফ।”

হাত থেকে জয়স্টিক রেখে দিল সাইবান। গেম ওভার হয়ে গিয়েছে। অনুরাগের দিকে সরাসরি ফিরে তাকালনা সে। আপনমনে শুধাল,

“সেদিন আবিরদের সাথে যা হলো, তার জন্য বলছিস?”

“উম, বলতে পারিস। তবে আমি ওভারঅল সবকিছু দেখেই বলছি। ইরাম বৌদিকে তুই যথেষ্ট সম্মান করিস।”

“এক্স্যাক্টলি! সম্মান!”

হঠাৎ করে অনুরাগের দিকে ফিরে তাকাল সাইবান। জ্বলজ্বলে চোখে ঠোঁটে অদ্ভুতুড়ে হাসি মেখে বলল,

“ইট ডায নট ম্যাটার হাউ আই ফিল, ইট নেভার ম্যাটার’ড। ইরাম আপু আমার খালার মেয়ে, ছোট থেকে ওনাকে দেখেই বড় হয়েছি। যদিও বা মাঝখানে, সে যাক। আমি এটুকু জানি উনি জীবনে অনেক কষ্ট করেছেন। বিয়ের পর কি হয়েছে সেটা জানিনা কিন্তু দুই দুইটা কুলাঙ্গার ভাইকে কীভাবে মানুষ করেছিলেন সেটা দেখেছি। আই সিম্পলি ক্যান নট মেইক হার সাফার মোর। দ্যাট’স অল।”

“দ্যাট’স অল? নো ফিলিংস অ্যাটাচড?”

অনুরাগ তীক্ষ্ণ নজর ফেলে জিজ্ঞেস করে বসল। সাইবানের চেহারায় একটা আঁধার নেমে এলো।

“ফিলিংস? আর ইউ কিডিং মি?”

একেবারে হুট করেই বেখাপ্পাভাবে হেসে উঠল সাইবান। সোফায় শরীর এলিয়ে সে হাসি নিয়েই বলল,

“কাম অন অনুরাগ, গ্রো আপ। তোর মনে হয় আমি এসব ফিলিংস টিলিংসের ধার ধারি? অনুভূতি শুধুই দুর্বলদের অলংকার। ইরাম আপুকে আমি আগে সম্মান করতাম, এখন যেহেতু উনি আমার স্ত্রী তাই একটু আগলে রাখি, এই যা।”

“একটু? একটু সাইবান?”

চোখ রীতিমত কপালে তুলে ফেলল অনুরাগ। সাইবান তাতে একেবারে বিনা কারণেই হুট করে রেগে গেল।

“তো? তোর বউ হলে তুই কি করতি? ফেলে দিতি? তোর সামনে তোর বউকে কেউ আজেবাজে কথা বললে প্রতিবাদ করতি না?”

“প্রতিবাদটা যখন এতই জোরালো হয় যে ৬ বছর ধরে টানা সহ্য করা বন্ধুদের এক ঝটকায় উগড়ে ফেলা যায়, তখন একটু সন্দেহ তো হবেই বল।”

“স্টপ ইট!”

লাফিয়ে সোফা থেকে উঠে পড়ল সাইবান। সত্যিই রেগে গেছে চেহারায় বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু অনুরাগ শান্তভাবেই চেয়ে রইল। সাইবান হাত মুঠো করে ঝাঁঝালো কন্ঠে বলল,

“আমি কি করছি না করছি আর ভবিষ্যতে কি করব তাতে কারোর কিচ্ছু যায় আসেনা। দিনশেষে উনি অন্যের স্ত্রী ছিলেন আর ওনার একটা পরপুরুষের বাচ্চা আছে। এই সত্যিটা কোনোদিন বদলাবে না।”

অনুরাগ বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ল। প্রসারিত নয়নে দেখে গেল বন্ধুকে যাকে পুরোদস্তুর ভিন্ন একজন মানুষ মনে হচ্ছে তার। সাইবান আর দাঁড়াল না, হনহন করে হেঁটে গেল রুমের বাইরে। যাওয়ার আগে পিছন ঘুরে বলল,

“আন্টিকে জানিয়ে দিস আমি আরেকদিন এসে ওনার হাতের মাটন বিরিয়ানি খাব।”

এটুকুই। চলে গেল সাইবান। অনুরাগ ঠাঁয় বসে বন্ধুর চলার পথের দিকে চেয়ে শেষমেষ একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নিজের কপাল ঘষে আপনমনে বিড়বিড় করল,

“সাধে কি তোকে বাচ্চা বলি? এখনো অবুঝই রয়ে গেলি তুই। স্টাবোর্ন বয়!”

অপরদিকে অনুরাগের বাসা থেকে বেরিয়েই নিজের হুইল শুজোড়া পায়ে গলিয়ে রাস্তা ধরে স্লাইড করে এগোতে লাগল সাইবান। অতিরিক্ত দ্রুত যাচ্ছে আজ, বাতাস কেটে বেরিয়ে যাচ্ছে তার চোখমুখের চারপাশে। অতিরিক্ত আক্রোশ ফুটল তার পদক্ষেপে। বনবন করে ঘুরছে জুতোর চাকা, লম্বা একটা পথ পাড়ি দিয়ে সটান রাস্তার ধারের একটা গাছের গুঁড়ি আঁকড়ে ধরে নিজেকে আটকাল সাইবান। ভারী নিঃশ্বাস ফেলে ঠাস করে কপাল ঠেকাল গাছের শক্ত খসখসে গুঁড়ির উপর। চোখ বুঁজে ফেলল, অস্ফুট স্বরে বলল,

“শিইইইইট!”

⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──

কিচেন কাউন্টারে জিনিসপত্র সাজিয়ে বসেছে সুগন্ধা। একটা বড় থালায় পুর তৈরি করা, অন্য পাশে ময়দার তৈরি ছোট রুটি। সেগুলোর ভেতর পুর ভরে ভাঁজ করে করে মোমো বানাচ্ছে মেয়েটি। একসাথে অনেকগুলো করে বানিয়ে ফ্রিজে রেখে দেয়, ফ্রোজেন স্ন্যাকস হিসেবে। বিশেষ কোনো কাজ না থাকায় ইরাম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাকে সাহায্য করছে। একপাশে ছোট ক্রিবে ঘুমাচ্ছে ইযান। ক্ষণে ক্ষণে ছেলেকে দেখে মুচকি হাসি নিয়ে কাজ করছে ইরাম। হাতের ময়দার রুটিতে পুর ভরে সুন্দর করে ভাঁজ করে করে মোমো বানিয়ে রাখছে আরেকটা প্লেটে। হঠাৎ করে সে বলল,

“সুগন্ধা। তোমার কলেজের পাশে একটা ইনস্টিটিউট আছে না? কম্পিউটার শেখায় যে?”

“হ্যাঁ। আছে তো। আপনি যাবেন?”

মাথা দোলালো ইরাম।

“হ্যাঁ। এরপর যেদিন কলেজে যাবে আমাকে নিয়ে যেও।”

“কম্পিউটারের কাজ শিখবেন? ভালো ভালো।”

প্রশংসা করে সুগন্ধা আরও খানিকটা পুর তৈরি করে নিয়ে এসে রাখল কাউন্টারে, ঠান্ডা হতে। অভিজ্ঞ হাতে মাখতে মাখতে বলল,

“তয় একটা সত্যি কথা বলি আপা? কিছু মনে কইরেন না।”

ইরাম ভ্রু তুলে পিছনে ফিরে তাকাল।

“তুমি আবার কবে থেকে এত বিবেচনা করা শুরু করলে? আরে মেয়ে বলো বলো, এত ভাবতে হবেনা।”

“কম্পিউটার শিখা আপনি কি করবেন? চাকরি? করার দরকার আছে?”

ইরাম থমকে গেল। সুগন্ধা বলে গেল,

“না মানে, এই বাড়ির অবস্থা তো ভালোই। সত্যি বলতে, আমি শুরুতে ভয়ই পাইসিলাম। ভাইজান মনে হয় কেলেংকারি করবে আপনার সাথে। কিন্তু, মানুষটা রংবাজ হইলেও আপনার অনেক টেইক কেয়ার করে বোঝা যায়। তাইলে দরকার কি? সব যেমন চলতেসে, অমনি চলুক।”

অস্ফুট একটি হাসি ফুটল এবার ইরামের ঠোঁটে। ঠিক প্রফুল্লতার হাসি নয়, ভিন্ন কিছু। কাজ জারি রেখে সে বলল,

“আলাদিন আর আমার বিয়ের মাত্র কিছুদিন হয়েছে, সুগন্ধা। কিছুদিনেই বুঝে গেলে ও আমার কেয়ার করে?”

“করেনা?”

আহাম্মকের মতন প্রশ্ন করে বসল সুগন্ধা। ইরাম মৃদু হেসে জানাল,

“উঁহু। আমি বলছিনা ও আমার কেয়ার করেনা। বরং করে।”

“তাইলে সমস্যা কোথায়?”

মুখ তুলে সুগন্ধার দিকে তাকাল ইরাম। রমণীর চেহারায় অভিজ্ঞ একটা ভাব ফুটে উঠতে দেখল সুগন্ধা।

“নতুন নতুন সব জিনিসই মানুষের ভালো লাগে। নতুন মোবাইল কিনলে দেখবে যত্নের শেষ থাকেনা। ছুঁতে গেলেও হাত পরিষ্কার করি, দিনে চৌদ্দ বার মোবাইলের স্ক্রিন মুছি, ব্যাককভার ব্যবহার করি, স্ক্রিন প্রটেক্টর গ্লাস আরও কত কি! তেমন নতুন বউও সব ছেলেদের কাছেই ভালো লাগে। সে বিয়ে যে কারণেই হোক না কেন, যেমনভাবেই হোক না কেন, বউ প্রত্যেক ছেলের কাছেই একটা শখের জায়গা। তার যত্ন তো হবেই।”

“যাহ্! মোবাইল আর বউ এক হইলো?”

এবার খানিক শব্দ করেই হাসল ইরাম। বেশ মিষ্টি একটা খিলখিল ধ্বনি। হাতের বানানো মোমোটা রেখে নতুন একটা হাতে নিতে নিতে সে হঠাৎ শুধিয়ে বসল,

“তোমার বয়স কত, সুগন্ধা?”

“সামনের মাসে ২১ হবে।”

“আর আমার ৩২।”

সুগন্ধা চোখ পিটপিট করল। ইরাম সরাসরি কিছু না বললেও একজন মেয়ে হিসাবে তার বুঝতে বাকি রইলনা সে কিসের কথা বলছে।

“তার মানে জড়বস্তু আর জীবন্ত বউ এক?”

সুগন্ধার প্রশ্নে ইরাম মাথা ঝাঁকাল,

“পরিণতি এক। মানুষের মনটাই এমন, সুগন্ধা। সময়ের সাথে সাথে অনুভূতি ফিকে হয়ে আসে। আজ যে তোমাকে ভালোবেসে বলছে তোমার জন্য পৃথিবী জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেবে, ঠিক পাঁচ বছর পরেই সে তোমায় দেখেও পাশ কাটিয়ে যাবে অচেনা মানুষের মতন। জগৎটাই এমন। পুরাতন জিনিসের কদর করে কয়জন?”

“আপনি একেবারে দার্শনিক লেভেলে কথা বলেন, আপা। আপনার কথা শুইনা এখন আমার পুরুষ মানুষ বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হইতেসে না।”

“বিশ্বাস কেন করবেনা? একটা সম্পর্কের ভিত্তিই বিশ্বাস। সেটা তো করতেই হবে। তবে মনে রেখো…”

মুখ তুলে সুগন্ধার মনোযোগী দৃষ্টির পানে চেয়ে ইরাম বলল,

“পুরুষ তোমাকে ভালোবাসে নতুন জামার মতন। যতদিন নতুন থাকে, প্রতিদিন পড়তে ইচ্ছা হয়। পুরাতন হয়ে গেলে সেই জামা আলমারির এক কোণায় পরে রয়। অতঃপর পা মোছার কার্পেট তার শেষ গন্তব্য হয়।”

সুগন্ধা মাথা দোলালো।

“আমি আপা, বিয়াই করবনা আর!”

মৃদু হাসল ইরাম। দুজন কিচেনে কাজ এবং গল্প করতে করতে খেয়ালই করলনা কখন সাইবান বাইরে থেকে ফিরেছে। কিচেনে এসেছিল সে ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা পানি নিতে। অথচ আর ভেতরে ঢুকলনা। নীরবে পাশ কাটিয়ে পুনরায় বেডরুমের দিকে চলে গেল।

কিছুক্ষণ পর।

ইযানকে কোলে নিয়ে বেডরুমে এলো ইরাম। ঢুকেই দেখতে পেল বিছানার উপর একটা ডাফল ব্যাগ। কোনোপ্রকার ভাঁজ করা ছাড়াই বেশ কয়েকটা শার্ট, প্যান্ট এবং গেঞ্জি অবহেলায় ঠেসে ঠেসে ভরছে সাইবান। ইরাম এগিয়ে গেল।

“কি ব্যাপার? কোথাও যাচ্ছ?”

“শো আছে।”

ঠান্ডা গলায় জবাব দিল সাইবান। ইরাম ইযানকে বিছানায় শুইয়ে একটা ঝুনঝুনি ধরিয়ে খেলতে দিয়ে সাইবানের হাত থেকে ব্যাগটা টেনে নিল। যে কাপড়গুলো দুমড়ে মুচড়ে ভরেছে, উল্টো করে সেসব বিছানায় ঢেলে এবার সুন্দর করে একেকটা ভাঁজ করে করে ভেতরে রাখতে লাগল। সাইবান ভ্রু কুঁচকে সরে দাঁড়াল।

“শো কোথায়?”

“সিলেটে। তিনদিনের আগে ফিরতে পারবনা।”

বিছানায় বসে নিজের পকেট থেকে হঠাৎ করে একটা সিগারেটের প্যাকেট বের করল সাইবান। একদম বেপরোয়াভাবেই লাইটার দিয়ে ধরিয়ে ঠোঁটে ছুঁয়েছে কি ছোঁয়নি ইরাম ঠাস করে চাপড় দিয়ে সিগারেটটা ফেলে দিল। শাসনের সুরে বলল,

“খালামণি আমাকে বলেছে। চেইন স্মোকার নাকি তুমি? সমস্যাটা কি? শিক্ষিত ছেলে মানুষ তাড়াতাড়ি মরার এত শখ কেন?”

“এখন কি আপনার জন্য আমার মরার স্বাধীনতাটুকুও বিসর্জন দিতে হবে?”

সাইবানের কথার ধাঁচটা ভালো লাগলনা ইরামের। তবে সে অতিরিক্ত কিছু বলতে পারলনা। বিছানায় খেলতে থাকা ইযান হুট করে কেশে উঠল। ইরাম দ্রুত ছেলেকে কোলে তুলে নিল।

“বাবাটা, কি হয়েছে, হুম?”

সিগারেটটা ফ্লোরে পড়লেও এখনো নেভেনি বিধায় ধোঁয়া সৃষ্টি করছে। ইরামের নাকে লাগল গন্ধটা। ইযান নিশ্চয়ই তামাকের ধোঁয়াটা সহ্য করতে পারছেনা। দ্রুত উঠে গিয়ে রুমের বারান্দার দরজাটা খুলে দিল ইরাম। মুক্ত প্রাকৃতিক বাতাস ঢুকতে লাগল ভেতরে হুঁহু করে। সাইবান দৃশ্যটা খেয়াল করে নিজের পা দিয়ে সিগারেটটা পিষে নিভিয়ে ফেলল। অতঃপর তুলে ময়লার ঝুড়িতে ফেলে দিয়ে রুমস্প্রে তুলে নিঃশব্দে স্প্রে করে দিল আশেপাশে। ইরাম ছেলেকে দোলাতে দোলাতে দৃশ্যটা দেখলেও বিশেষ কোনো মন্তব্য করলনা আর।

সাইবান নিজের ব্যাগটা ঠিকঠাক করে রাখতে রাখতে হঠাৎ একটা টি শার্ট বের করল। কালো রঙের, তাতে ডোরেমন কার্টুনের ছোট একটা চিত্র আঁকা। ইরামকে দেখিয়ে সে হঠাৎ করে বলল,

“জাস্ট ফর ইওর রিমাইন্ডার, এটা আমি ক্লাস টেনে কিনেছিলাম। এখন অনেক টাইট হয়, তবুও মাঝে মাঝে পরি ঘুমানোর সময়ে, কারণ এটা আমার ফেইবরিট টি শার্ট।”

ইরাম মাথা কাত করে তাকাল, বুঝতে পারেনি সাইবান হঠাৎ করে তাকে একটা টি শার্ট কেন দেখাচ্ছে। সাইবান তীর্যক হেসে ব্যক্ত করল,

“কিছু পুরুষ আছে, যে জামাকে একবার মনে ধরে, সেই জামা ছোট হোক, ছিঁড়া হোক কিংবা হোক পুরাতন, কখনো মায়া কাটাতে পারেনা।”

ইরামের চোখজোড়া বড় বড় হয়ে গেল। ঠোঁটজোড়া ফাঁক হলেও সে কিছু উচ্চারণ করতে পারলনা। সাইবান আর অপেক্ষাও করলনা। ব্যাগ রেখে রুম থেকে বাইরে বেরিয়ে গেল। তার জিনিসপত্র সব গাড়িতে লোড করে রাখতে হবে যেন সকালে তাড়াহুড়ো না হয়।

⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──

গভীর রাত। প্রায় আড়াইটা বেজে এসেছে। অথচ ইরামের চোখে আজ এক বিন্দু ঘুম আসছেনা। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে সে। শনশনে হাওয়া তার শরীরে ঝাঁপটা দিয়ে যাচ্ছে। রাতের নিস্তব্ধ জগৎ যেন হাত বাড়িয়ে তাকে ডাকছে আঁধারে হারিয়ে যেতে। ইযান ঘুমে আচ্ছন্ন। সাইবানও এক ঘণ্টা হলো ঘুমিয়েছে। এতদিন কাউচে ঘুমালেও আজ ইরাম একপ্রকার জোর করেই তাকে বিছানায় শুইয়েছে। ছেলে আর স্বামীর মাঝখানে অবশ্য বিরাট এক কোলবালিশের দেয়াল আছে। বিছানাটা বেশ বড় হওয়ায় সুবিধা হয়েছে। একটা ছোট বাচ্চা নিয়ে ঘুমালেও কোনো সমস্যা হয়না।

ইরাম রেলিংয়ে হেলান দিল। তার চুলগুলো খোলা। বাতাসে দোল খাচ্ছে। একটা সময় ভয় লাগত রাতের বেলায় এমন চুল খুলে ঘুরে বেড়াতে। ভূত পেত্নী ভর করে নাকি। অথচ সেই অনুভূতিগুলো আজ হারিয়ে গেছে তার মন থেকে। তার মনে হয়েছিল কখনোই আর নিজের জন্য বাঁচা হবেনা তার। অথচ বিয়েটা তার শক্ত মানসিকতার দেয়ালে বারবার আঘাত করছে। সাইবান যে আজ কিচেনের কথা শুনেছে সেটা সে নিশ্চিত। সেই কথার পরিপ্রেক্ষিতেই পরে ওই কথাটা বলেছে। ইরাম মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারছেনা কিছুতেই। সে তার আলাদিনকে বুঝে উঠতে পারছেনা। যখনই মনে হয় নিবেদনগুলো একটু হলেও সত্যি, তখনই অরণ্যর মুখটা ভেসে ওঠে তার হৃদয়ে।

ইরামের আজও মনে পড়ে তাদের বিয়ের পরের দিন সকালের কথোপকথন। ইরাম বাসর রাতের বিছানা ছেড়ে উঠতে যাচ্ছিল তৈরি হয়ে নাস্তা বানানোর জন্য, অথচ অরণ্য তার কব্জি টেনে পুনরায় নিজের বুকের উপর আগলে নিয়েছিল। ইরাম লজ্জা পেয়ে বলেছিল,

“ছাড়ুন! কি করছেন? ফ্রেশ হব, নাস্তা বানাব, অনেক কাজ।”

“উম হুম। তুমি ভাবলেও বা কীভাবে আমি আমার বউকে বিয়ের পরদিনই রান্নাঘরে ঢুকতে দেব? রান্নাঘর তো দূরের কথা, তোমার কোমল পা এই শক্ত মেঝেতে আমি স্পর্শ হতেই দেবনা।”

অরণ্য কথা রেখেছিল। টানা সাতদিন ইরাম বিছানায়, সোফায়, কাউচে, কখনো বা দোলনায় শুয়ে বসেই কাটিয়েছিল। এমনকি কোথাও যাওয়ার দরকার পড়লে বিনা কারণেই অরণ্য তাকে কোলে তুলে নিয়ে যেত, স্বামীর গলা জড়িয়ে ধরে ইরাম খিলখিল করে হাসত আর ভাবত, এই সুখ আর কখনো তার কপাল থেকে মুছবেনা। অরণ্য মুছতে দেবে না।

বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো ইরামের। চোখ বুঁজে ফেলল। সেথায় কয়েক ফোঁটা অশ্রু জমলেও জোরপূর্বক নিজেকে নিবারণ করল সে। মাথা ঝাঁকাল। নাহ্, আর অতীত ভাবার সময় নেই। জীবন তাকে একটা দ্বিতীয় সুযোগ দিয়েছে। সুযোগটা তাকে কাজে লাগাতে হবে।

একটা শব্দে ইরামের শান্তির সময় ব্যাহত হলো। রুমের ভেতর থেকে গুঞ্জনের মতো একটা আওয়াজ আসছে, ফোনের রিংটোন। ইরাম কামিজের ওড়না ঠিকঠাক করে ভেতরে এলো। নাইটস্ট্যান্ডে রাখা সাইবানের ফোন বাজছে অথচ ছেলেটার খবর নেই। বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। ঘুমের ঘোরে কোলবালিশের কাছে এসে ঘেঁষেছে একেবারে। এপাশে থাকা ইযানের ছোট্ট ডান হাতটা তার কপালের উপর পরে আছে। বাপ ছেলে কখন কিলবিল করে একে অপরের কাছে পৌঁছেছে কে জানে! সাইবান হুশে থাকলে এক্ষুণি চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করত। ভেবে ইরাম মনে মনে খানিক হেসে তারপর এগোল। নাইটস্ট্যান্ড থেকে সাইবানের ফোনটা হাতে নিতেই তার ভ্রু কুঞ্চিত হলো। কলার আইডিতে ভাসছে একটা পরিচিত নাম,

—তিতলি বেব।

ইরামের বুকে একটা খচখচ অনুভূতি হলো। আজকালকার ছেলেমেয়েরা এমনিতেই বেব শব্দটা কোনো উদ্দেশ্য ছাড়াই ব্যবহার করে এটা সে জেনেছে সামিয়ার সাথে বসে একটা বাংলা নাটক দেখে। জোর করে নিজের মন সামলে ইরাম হাত বাড়িয়ে সাইবানকে ডাকল।

“আলাদিন? আলাদিন, তোমার ফোন।”

প্রথমটায় মোড়ামুড়ি করেও উঠলনা সাইবান। শেষমেষ যখন চোখ খুলল, তখন ঝটকা দিয়ে নিজের কপাল থেকে ইযানের হাতটা সরিয়ে দিয়ে খেঁকিয়ে উঠল,

“কিরে ভাই? বাপের কপালে বদদোয়া দিচ্ছিস? শকুনের দোয়ায় গরু মরেনা তোর আম্মাজান শেখায়নি?”

ইরাম হুট করেই নিজের একটি আঙুল সাইবানের ঠোঁটে চেপে ধরল,

“হুশ! ঘুমাচ্ছে, আস্তে!”

সাইবান নিজের জায়গায় জমে গেল। ঘুম জড়ানো চোখে চেয়ে রইল ইরামের দিকে। হলদেটে মৃদু আলোয় রমণীর চেহারা তার বুকে অদ্ভুত একটা ঝড় তুলল যেন। ঠোঁটের উপর নরম আঙুলটার ছোঁয়া তাকে মাতাল করে ফেলেছে। শরীরের সবটুকু শক্তির প্রয়োজন হলো সেই আঙুলটায় একটা গাঢ় চুমু দেয়া থেকে নিজেকে নিবারণে। সাইবানের ঘোলাটে দৃষ্টি এবং ফোলা মুখখানি দেখে বিব্রত ইরাম দ্রুত নিজের হাত সরিয়ে নিল। এগিয়ে দিল ফোন,

“তোমার ফোন।”

সাইবান একটি ঢোক গিলে ফোন হাতে নিল। কলার আইডি দেখে এক সেকেন্ডে তার চেহারা বদলে গেল। ফোনটা রিসিভ করে বিছানা ছেড়ে উঠে গেল সে। সোজা বারান্দায় চলে গেল। ইরাম সেদিকে চেয়ে রইল। অতঃপর বিছানায় বসে ইযানকে ঠিকঠাক করে শুইয়ে রাখল। ক্ষণে ক্ষণে তার চোখ না চাইতেও চলে গেল বারান্দার দিকে।

দুই মিনিট বাদে ফিরে এলো সাইবান। রীতিমত রুদ্রমূর্তি হয়ে। ইরামকে কোনো জবাবদিহি না করেই ক্লোজেট থেকে জ্যাকেট বের করে গায়ে জড়ালো। চুলে আঙুল চালিয়ে ঠিকঠাক করে ওয়ালেট আর গাড়ির চাবি পকেটে ভরল। ঘড়ির দিকে তাকাল ইরাম। প্রায় তিনটা বাজছে।

“এত রাতে কোথায় যাচ্ছ?”

“কাজ আছে। কখন ফিরব জানিনা।”

এটুকুই। বিশেষ ব্যাখ্যা ছাড়াই সাইবান ভারী বুট জুতো পায়ে গলিয়ে হনহন করে ঝোড়ো গতিতে হেঁটে বেরিয়ে গেল রুমের বাইরে। ইরাম বসে থাকল বিছানায়, হতবিহ্বল হয়ে।

একটামাত্র ফোনকলের প্রয়োজন ছিল এত রাতে সাইবানকে ঘরের বাইরে টেনে নিতে।

এই বিষয়টা ছাড়া হাজার চাইতেও আর কিছু ভাবতেই পারলনা ইরাম।

⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──

শেষরাতের দিকে মাত্র দুই থেকে তিন ঘণ্টার মত সময় ইরাম ঘুমাতে পেরেছে। আটটার দিকেই উঠে ফ্রেশ হয়ে নিচে চলে এসেছে। সুগন্ধার আজ থেকে আপনি ইনকোর্স পরীক্ষা। তাই আজ সকালের নাস্তা – চা সে সামলাবে বলে রেখেছে। সামিয়া হয়ত উঠে গিয়েছেন। তার রুমের বাতি জ্বলছে, হাসপাতালের জন্য তৈরি হচ্ছেন খুব সম্ভবত। সারিকা একটু দেরিতে ওঠে। নাস্তাটা একাই করে। সকলের জন্য চুলায় চায়ের জন্য দুধ বসিয়ে ইরাম আগে থেকে প্রস্তুত করে রাখা ব্রেড, ফলমূল সব টেবিলে নিয়ে সাজিয়ে রাখল। সাইবান এখনো ফেরেনি। বারংবার না চাইতেও সে সদর দরজার দিকে তাকাচ্ছে।

চা যখন প্রায় ফুটে এসেছে তখনি ঘটনাটা ঘটল। পায়ের শব্দ শুনল ইরাম। সাইবান ফিরেছে ভেবে সে দ্রুত কিচেন থেকে বেরিয়ে এলো। অথচ মুখোমুখি হলো একদম ভিন্ন আর অপ্রত্যাশিত একটি দৃশ্যের।

সুঠাম কাঠামোর অধিকারী এক ছয় ফুট দীর্ঘদেহী বয়স্ক পুরুষ দন্ডায়মান। থমথমে পাথুরে চেহারা। মুখজুড়ে হালকা খোঁচা খোঁচা সাদা দাড়ি। চুলে রূপালীর আস্তরণ। ধূসর স্যুট প্যান্ট পরনে। বাম হাতে চকচকে সোনালী ঘড়ি, সেই হাতেই একটা লাগেজ ধরে রাখা। ভ্রুজোড়া সদা কুঞ্চিত। চেহারা দেখতে মনে হবে বিনা কারণেই জীবনের উপর বিরক্ত তিনি। ইরামের চিনতে একটু ভুল হলোনা। পুরুষটির চোখ গোটা বাড়ির উপর ঘুরে রমণীর উপর থামল। ইরাম সঙ্গে সঙ্গে নিজের ওড়না মাথায় তুলে ঘোমটা দিয়ে এগিয়ে গেল।

“আসসালামু আলাইকুম, খালু।”

বলে সে ঝুঁকে পা ধরে সালাম করতে গেল, নতুন বউ হিসাবে শ্বশুরকে প্রথমবার পায়ে সালাম করাটা ঐতিহ্য। অথচ চকচকে কালো শু পরিহিত পা জোড়া ইরাম ছোঁয়ার আগেই সরে দাঁড়াল। জমে গিয়ে মাথা তুলে তাকাল সে। উপর থেকে অতীব ভারী কন্ঠে আদেশ এলো,

“সরে দাঁড়াও। তোমার মুখটা আপাতত দেখতে চাইছিনা।”

                                  —চলবে—

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply