সাদিয়াসুলতানামনি
সকাল নয়টার দিকে একজন নার্স এসে সকলকে জানাল জাওয়াদের ঘুম ভেঙেছে। ডাক্তার তাকে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে তার পরিবারের লোকদের জানায়, সকলে পাঁচ মিনিট করে তার সাথে দেখা করতে পারবে। মাত্রই জাওয়াদ ডেঞ্জার জোন থেকে বেড়িয়েছে তাই তার দ্রুত সুস্থতার জন্য তাকে বেশি বেশি রেস্ট নিতে হবে।
শুরুতেই জাওয়াদের মা যান ছেলের সাথে দেখা করতে। ছেলেকে চোখের দেখা দেখেই চলে আসেন। এরপর পর্যায়ক্রমে যান তার বাবা মি.শেখ এবং জিনিয়া। জিনিয়া ভাইয়ের সাথে দেখা করে বেরিয়ে পূর্ণতার সম্মুখে এসে দাঁড়ায়। পূর্ণতা বুকের মধ্যেও তখন জাওয়াদকে দেখার জন্য তোলপাড় চলছে, কিন্তু উপরে উপরে সে একদমই শান্ত। বহু কষ্ট করেও সে কেন জানি নিজের আবেগ প্রকাশ করতে পারছে না। পূর্ণতা নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করে, আচ্ছা আমি কি অনুভূতি শূন্য মানুষ হয়ে গেলাম?
—ভাবীপু..?
জিনিয়ার গলার আওয়াজে পূর্নতা মাথা তুলে তাকালে জিনিয়া বলে–
—ভেতরে যাও..ভাইয়া তোমার জন্য অপেক্ষা করে রয়েছে।
পূর্ণতা কেমন শিশুসুলভ ভাবে মাথা নাড়ায়। তারপর আস্তে করে উঠে ছোট ছোট কদম ফেলে কেবিনের ভেতরে প্রবেশ করে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রুমটিতে প্রবেশ করতেই তার নজরে পড়ে, তার অতি প্রিয় পুরুষটি পিঠে বেশ বড়সড় একটা ব্যান্ডেজ লাগিয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। সুস্বাস্থ্যের অধিকারী পূর্ণতার পুরুষটির শরীর এই দেড় দিনেই ভেঙে গিয়েছে অনেকটা। উপুড় হয়ে শোয়ার কারণে চেহারার একপাশ দেখা যাচ্ছিল জাওয়াদের, সেটুকু অবলম্বন করেই পূর্ণতার হৃদপীড়া হু-হু করে বাড়তে থাকে।
পূর্ণতা নিঃশব্দ পায়ে হেঁটে গিয়ে বসে পড়ে জাওয়াদের বেডের পাশের টুল টায়। শব্দ করতে না চেয়েও, নিস্তব্ধতা মোড়া রুমটায় টুল টানার হালকা শব্দটিও বেশ জোরালো শোনা যায়। জাওয়াদ কারো উপস্থিতি বুঝতে পেরে তার দূর্বল চোখজোড়া মেলে। প্রিয় নারীটিকে সম্মুখে সুস্থ-সবল ও ভঙ্গুর অবস্থা দেখতে পেয়ে জাওয়াদ নিজেই বেশ সুস্থতা অনুভব করে।
পূর্ণতা খাড়া নাকটা পাকা টমেটোর ন্যায় লাল হয়ে আছে। চোখের মনির চারপাশের সাদা অংশও কিছুটা লাল। ফর্সা মুখশ্রী বড়ই মলিন হয়ে রয়েছে। এসবই যে জাওয়াদকে নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার ফলাফল এটা সে বেশ ভালো করেই বুঝতে পারছে।
জাওয়াদ ক্ষীণ গলায় তার ব্যক্তিগত নারীটিকে সুধায়–
—কেমন আছো?
—আলহামদুলিল্লাহ বেশ ভালোই আছি। নেয়ে-খেয়ে নাচতে নাচতে আসলাম আপনাকে দেখতে।
পূর্ণতা তেজ দেখিয়ে কথা বলতে চায়। কিন্তু তার কণ্ঠস্বরও আজ তার সাথে বেইমানি করে। তার কথাগুলো শুনে যে কেউ অনুমান করতে পারবে, পূর্ণতার কণ্ঠস্বর ভেজা। চোখের কোণেও নোনাপানির আবির্ভাব ঘটছে। যখন-তখন ঝুমঝুমিয়ে তার কপোল ভিজিয়ে নেমে যেতে পারে সেই মূল্যবান পানি।
জাওয়াদ পূর্ণতার কথা শুনে ঠোঁট বেঁকিয়ে হেঁসে ওঠে। তার গু”লিটা ডান কাঁধেই লেগেছিলো। তবু সে পূর্ণতাকে স্পর্শ করার জন্য নিজের ডান হাতটিই বাড়িয়ে দেয়। দূর্বল গলায় আবদার করে–
—হাতটি ধরবে পূর্ণ? তোমার স্পর্শ পেতে ভীষণ মন চাইছে।
পূর্ণতা নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে জাওয়াদের বাড়িয়ে দেওয়া হাতের দিকে তাকায়। তার মন খুব করে চাইছে সকল অভিমান কিছুক্ষণের জন্য ভুলে গিয়ে জাওয়াদের হাতখানা ধরতে। তাকে ভরসা দিতে, সে তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যাবে। কিন্তু মস্তিষ্ক বাঁধ সাধে এবারও। পূর্ণতাকে খুব করে শাসায় অতীতের মতো ভুল না করতে। মন ও মস্তিষ্কের যুদ্ধে পূর্ণতা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। জাওয়াদের হাত ধরবে কি ধরবে না এই ভেবে।
কয়েক মিনিট পেরিয়ে যাওয়ার পরও যখন পূর্ণতা জাওয়াদের বাড়িয়ে রাখা হাতখানা নিজের হাত রাখে না, তখন জাওয়াদ একবুক কষ্ট নিয়ে নিজের বাড়িয়ে রাখা হাতটা আস্তে আস্তে গুটিয়ে নিতে থাকে। কিন্তু তখনই জাওয়াদকে অবাক করে দিয়ে তার বাড়িয়ে রাখা হাতের উপর পূর্ণতা তার হাত রেখে মৃদু বল প্রয়োগ করে চেপে ধরে। এর পরপরই বলে ওঠে–
—আজ এই চরিত্রহীনার হাত ধরতে ঘৃণা করছে না? জানেনই তো, চাঁদের কলঙ্ক ও নারীর উপরে উঠা অপবাদ চিরস্থায়ী হয়।
—আমার ব্যক্তিগত চাঁদ তো তুমিই, আর সেই চাঁদের কলঙ্ক হোলাম আমি।
পূর্ণতার দেহের ভেতরে এক ঝঙ্কার বয়ে যায়। জাওয়াদের হাতের মুঠোয় থাকা তার হাতটি ঈষৎ কেঁপে ওঠে, যা খোদ জাওয়াদও টের পায়। সে ব্যথাযুক্ত হাতটি নাড়িয়ে পূর্ণতার হাতটি নিজের গালের উপর রাখে। কিন্তু তার হাতের উপর থেকে নিজের হাত সরায় না। পূর্ণতার হাতটি দিয়ে নিজেই নিজের গালে আস্তে আস্তে স্লাইড করতে থাকে।
শীতল, কোমল, ভালোবাসায় পরিপূর্ণ হাতটির স্পর্শে ভালোলাগায় জাওয়াদের চোখ মুদে আসে।
—ব্রেকফাস্টে কি তুলো খেয়ে এসেছিলে? এত নরম কেন তোমার হাত?
জাওয়াদের হেয়ালিপনায় পূর্ণতা তেমন একটা কান দেয় না। বরং সে চিন্তিত হয়ে পড়ে, জাওয়াদকে বারংবার নিজের ব্যথাযুক্ত হাতটি নাড়াতে দেখে পূর্ণতা ভেতরে ভেতরে বিচলিত হয়ে পড়ে। কিছুটা চিন্তা তার মুখশ্রীতে ভেসে ওঠে। নিজের চিন্তা দমিয়ে রাখতে না পেরে পূর্ণতা বলে–
—ব্যথা ওয়ালা হাতটা এত নাড়াচ্ছেন কেন? ছাড়ুন এসব পাগলামি আর চুপচাপ শুয়ে থাকুন। আমি বাহিরে আছি।
জাওয়াদ আজ যেন পণ করেছে মেয়েটার কোন কথাই কানে তুলবে না। আজ কেন আগামীতেও তুলবে না। মৃত্যুর দাড় থেকে ফিরে যেহেতু এসেছে এবার তার সংসার চাই-ই চাই। পূর্ণতাকে চাই সেই সংসারে। তাজওয়াদকে চাই সেই সংসারটাকে পরিপূর্ণতা দানের জন্য।
জাওয়াদ চোখ বন্ধ রেখেই বলল–
—সবসময় গান গাইতে থাকো, ভালোবাসো না আমাকে আর হ্যানত্যান কতকিছু। তাহলে আমার জন্য কেঁদে কেটে নিজের চোখ-মুখের এমন বেহাল অবস্থা করেছো কেন?
পূর্ণতা ধরা পড়তে চায় না জাওয়াদের কাছে, আর নাই বা নিজের গোপনীয়তা প্রকাশ করতে চায়। তাই সে চোখ-মুখ খিঁচে শক্ত গলায় বলার প্রয়াস করে–
—কে বলেছে আমি আপনার জন্য কেঁদেছি? ঠান্ডা লেগেছে আমার, তাই এমন দেখাচ্ছে।
—আমায় ছুঁয়ে মিথ্যে বলবে? মাত্রই কিন্তু জমের দুয়ার থেকে ঘুরে এসেছি।
জাওয়াদের কথার পৃষ্ঠায় বলার মতো কিছু পায় না পূর্ণতা। ইতিমধ্যে তার গোপনীয়তা প্রকাশ হতে শুরু করে দিয়েছে। নাকের পাটা ফুলতে থাকে একটু একটু করে, ঠোঁটেও আগের চাইতে দাঁতের বেশি বল প্রয়োগ করে। কিন্তু আসল বেইমানি করে বসে তার চোখ। চোখের কার্ণিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়তে থাকে অশ্রু। পূর্ণতা তা লুকানোর জন্য অন্যদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে নিয়ে নিজের অপর হাত দিয়ে চোখ মুছে নেয়। কিন্তু লাভের লাভ কিছুই হচ্ছে না। সেই আবারও প্রায় সাথে সাথেই কপোল ভিজে যাচ্ছে।
—হ্যাঁ কেঁদেছিলাম আপনার জন্য। আমাকে বাঁচাতে গিয়ে একজন মানুষ মৃত্যু পথযাত্রী তার জন্য কান্না করাটাই তো স্বাভাবিক।
নিজের হয়ে মিথ্যে সাফাই গায় পূর্ণতা। জাওয়াদ পুনরায় হেঁসে ওঠে। সেই সাথে আবারও প্রশ্ন করে–
—শুধুই একজন মানুষের জন্য এমনভাবে কাঁদা যায়? নাকি মানুষটি স্পেশাল কেউ হলেই তার সুস্থতার জন্য এত অশ্রু ব্যয় হয় নামাজে বিছানায়?
—আমার ছেলের বাবার জন্য কেঁদেছি। ছেলেটা মাত্র কয়দিন হলো বাবার সানিধ্য পেয়েছে। কাল আপনার সাথে কথা বলতে না পেরে রাতে মন খারাপ করে দেরিতে ঘুমিয়েছে।
ছেলের মন খারাপের কথা শুনে জাওয়াদের মনটাও কিঞ্চিত ভার হয়ে যায়। কিন্তু নিজেকে এ বলে সান্ত্বনা দেয়, সুস্থ হলে সব কিছু ঠিক করে দিবে সে।
—আর? শুধুই ছেলের বাবার জন্য এত কাঁদা লাগবে? আমি গেলে আরেকজনকে নিয়ে আসতে ওর বাবা হিসেবে। ছেলে আমার এখন অনেক ছোট, ঠিকই কয়েকদিন পর আমায় ভুলে যেতো।
পূর্ণতা এবার আর আত্মনিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। মৃদু শব্দ করে কেঁদে ওঠে। তার কান্নার শব্দ পেয়ে জাওয়াদের হাসি আরেকটু বিস্তৃত হয়। পূর্ণতা কাঁদতে কাঁদতেই বলে–
—কি শুনতে চাইছেন আপনি? আপনাকে ভালোবেসে চিন্তিত হয়ে কেঁদেছি? কেন বলবো, আমি আপনাকে ভালোবাসি? আমি এটা বলি, আর আপনি আবারও আমায় কাঁদান। না আমি এমনকিছু বলবো, আর নাই বা পাঁচ বছর আগের মতো আপনাকে আমায় কাঁদানোর সুযোগ করে দিব। কাঁদতে কাঁদতে আমি ক্লান্ত জাওয়াদ। এখন নিজের ছায়াকে আমার সঙ্গী মনে হয় না, কান্নাই যেন আমার চিরসঙ্গী হয়ে গিয়েছে।
জাওয়াদ ধীরে ধীরে নিজের গালের উপর রাখা পূর্ণতার হাতটি নিজের ওষ্ঠের কাছে এনে ঠোঁট চেপে ধরে হাতের পিঠে। ঠোঁটের অবস্থান একই জায়গাতে রেখে ক্ষীণ গলায় বলে–
—থাক আর কিছু বলতে হবে না। না বলেই অনেক কিছু বলে ফেলেছো আর আমিও শুনে ফেলেছি। একদিনে এত কিছু সইতে পারব না। আজকে না বলা কথাগুলো আরেকদিন শুনবো।
পূর্ণতা কাঁদতে থাকে। সেই কান্নার কোন শব্দ পাওয়া যায় না আর। দু’জনই দু’জনার মতো ব্যস্ত হয়ে থাকে। একজন কাঁদতে, আরেকজন অনুভব করতে। তাদের ব্যস্ততায় ব্যাঘাত ঘটাতেই বোধহয় আগমন ঘটে একজন নার্সের। পাঁচ মিনিটের বেশি অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পরও পূর্ণতা বের হচ্ছিল না বলে তিনি আসেন। এসেই কর্কশ গলায় বলেন–
—আপনাকে তো বলা হয়েছিল পাঁচ মিনিট থাকতে পারবেন, তাও এতক্ষণ ধরে আছেন কেন? বাহিরে যান, আর পেশেন্টকে রেস্ট নিতে দেন।
নার্সের রূঢ়ভাবে বলা কথাগুলো শুনে জাওয়াদ চোখ মেলে তাকায়। দূর্বলতার দরুন তার আবারও তন্দ্রা ভাব চলে এসেছিল, কিন্তু নার্সটির খ্যাকখ্যাক শুনে ভেঙে যায় তা।
জাওয়াদ নার্সটির দিকে কঠোর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে শান্ত গলায় বলে–
—ট্রিট মাই ওয়াইফ উইথ রেসপেক্ট। আদারওয়াইজ, আই উইল রিপোর্ট দিস টু দ্য অথরিটিজ, অ্যান্ড ইউ মে ফেস সিরিয়াস কনসিকোয়েন্সেস। বি কেয়ারফুল হাউ ইউ স্পিক টু হার।
হসপিটাল অথরিটিকে বিচার দেওয়ার কথা শুনে নার্সটি ভয় পেয়ে যায়। সে এবার গলায় কোমলতা এনে বলে–
—স্যার আপনার এখন বেশি বেশি রেস্টের প্রয়োজন। ম্যাম থাকলে আপনার রেস্ট হবে না। তাই বলেছিলাম আরকি….
—বলার ধরণেও একটা নিয়ম থাকে। আপনি রীতিমতো ওকে আদেশ করছেন। আমার বউকে আমিই কঠোর গলায় কথা বলতে দুই বার ভাবি, সেখানে আপনি সামান্য নার্স হয়ে এমন সাহস দেখান কি করে?
জাওয়াদের কাঠকাঠ কথা শুনে নার্সটি ঘাবড়ে যায়। পূর্ণতাও জাওয়াদকে উত্তেজিত হয়ে যেতে দেখে বিচলিত হয়ে যায়। সে নিজের হাতটাকে জাওয়াদের গাল থেকে সরিয়ে আনতে চায়, কিন্তু জাওয়াদ ছাড়ে না তার হাত। ছাড় না পেয়ে পূর্ণতা বলে–
—উনি ঠিকই বলেছেন। আপনার রেস্ট নেওয়া প্রয়োজন। আমি থাকলে আপনি শুধু কথাই বলে যাবেন। আমি বাহিরে যাচ্ছে। আপনি রেস্ট করুন।
জাওয়াদ তার কথা শুনে তীক্ষ্ণ নজর নিয়ে তাকায় পূর্ণতার দিকে। বউটা বড্ড বেশি বুঝে সবসময়। কিন্তু তার বেলাতেই অবুঝ। সে শক্ত গলায় বলে–
—রেস্টই নিচ্ছি আমি। চোখ খুলে তোমায় না পেলে, উঠে হাঁটা দিতাম তোমার কাছে যাওয়ার জন্য। তাই বলছি চুপচাপ আমার সঙ্গ দাও।
একটু থেকে নার্সটির দিকে তাকিয়ে বলে–
—আপনি যেতে পারেন এখন। আমার ওয়াইফ আছে আমার সেবা করার জন্য। সামনে থেকে আমার কোন কাজে আপনি হাত দিবেন না, ছেলে কোন নার্স থাকলে তাকে পাঠাবেন। বাকিটা আমার বউ সামলে নিবে।
কত বড় একটা বিপদ কাটিয়ে উঠেছে একদিনও হয়নি, সেই লোক কেমন তেজ দেখাচ্ছে। জাওয়াদের কথা শুনে পূর্ণতা ও নার্স উভয়েরই চোখ কপালে উঠে যায়। নার্সটি মনে মনেই বিরবিরায়–
—কি বউ পাগল লোক রে বাবা!
জাওয়াদের দূর্বল গলার ধমকি কোনমতে অগ্রাহ্য করার জো নেই। নার্সটি দ্রুত কদম চালিয়ে জাওয়াদের কেবিন থেকে বের হয়ে আসে। সে চলে যাওয়ার পর জাওয়াদ আবারও চোখ বন্ধ করে নিতে নিতে বলে–
—মাথায় হাত বুলিয়ে দাও তো পূর্ণ, চিনচিনিয়ে ব্যথা করছে। ঘুমাবো একটু।
মিথ্যে বলার জন্য জাওয়াদ মনে মনে কয়েকবার তওবা করে। আসলে সে পূর্ণতার স্পর্শ দীর্ঘসময় পর্যন্ত পাওয়ার জন্য। এদিকে জাওয়াদের মাথা ব্যথা করছে শুনে পূর্ণতা আর দ্বিরুক্তি করে না। চুপচাপ তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। জাওয়াদ গভীর ঘুমে তলিয়ে যাওয়ার আগে বিরবির করে বলে–
—ঘুম থেকে উঠে সর্বপ্রথম তোমাকেই দেখতে চাই পূর্ণ। প্লিজ চলে যেও না।
—যাচ্ছি না আমি। আপনি নিশ্চিন্তে ঘুমান।
পূর্ণতার থেকে নিশ্চয়তা পেয়ে জাওয়াদ স্বস্তি নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
পরবর্তীতে তার ঘুম ভাঙে দুপুর বারোটায়। চোখ খুলে সত্যি সত্যিই সে সর্বপ্রথম পূর্ণতাকেই দেখে। পূর্ণতার কোলে বসে তার বুকে মাথা ঠেকিয়ে রাখা তাজওয়াদকে দেখে জাওয়াদ আরেকটু বেশি খুশি হয়ে যায়। পূর্ণতার একটা হাতের আঙুল তখনও জাওয়াদের চুলের ভাজে আস্তেধীরে নড়াচড়া করছে।
ঘুম থেকে উঠে তাজওয়াদ অনেকক্ষণ মা’কে দেখতে না পেয়ে কান্নাকাটি করছিলো, বিধায় জিনিয়া তাকেও পূর্ণতার কাছে নিয়ে এসেছিল। জাওয়াদের কেবিনে এসে তাজওয়াদ পাপার পিঠে ইয়া বড় ব্যাণ্ডেজ দেখে আতঙ্কে কাঁদার প্রস্তুতি নিলে পূর্ণতা তাঁকে বুঝিয়ে বলে, তার পাপা ঠিক আছে। শুধু একটু অসুস্থ। এরপর তাজওয়াদও মায়ের কোলে বসে অপেক্ষা করতে থাকে কখন তার পাপা ঘুম থেকে উঠবে। এমনিতেই কাল সারাদিন পাপার সাথে কথা বলতে না পেরে তার মনটা এমনিতেই খারাপ ছিল, এরমধ্যে আজ শুনছে তার পাপা নাকি আবার অসুস্থ। এত মন খারাপের খবর ছোট্ট বাচ্চাটা নিতে পারছে না আর।
—তাজ….
দূর্বল গলায় ডেকে ওঠে জাওয়াদ। তার ডাকে পূর্ণতা ও তাজওয়াদ দু’জনই জাওয়াদের দিকে তাকায়। পাপাকে চোখ মেলে তাকাতে দেখে ছোট তাজ কি বুঝলো কে জানে, কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চোখ সরিয়ে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে কেঁদে দেয়। তাঁকে কাঁদতে দেখে জাওয়াদ-পূর্ণতা দু’জনই বিচলিত হয়ে পড়ে। জাওয়াদ শোয়া থেকে উঠতে চায় হুড়মুড়িয়ে কিন্তু পিঠের সৃষ্ট ক্ষতের ব্যথায় শরীর সায় দেয় না তার। ব্যথায় আর্তনাদ করে আবারও ধপ করে শুয়ে পড়ে। জাওয়াদকে এমনটা করতে দেখে পূর্ণতা ঘাবড়ে গিয়ে ডাক্তারকে ডাকতে থাকে।
একজন নার্স তার ডাক শুনে ডাক্তারকে ডেকে নিয়ে আসে। ডাক্তার চেক-আপ করে দেখে তেমন কিছু একটা হয়নি, শুধু জাওয়াদ হুট করে উঠে বসার প্রচেষ্টা করার জন্য ব্যথা উঠেছে। ডাক্তার ক্ষত জায়গা ড্রেসিং করিয়ে দেয়, ততক্ষণে পূর্ণতা ছেলেকে কোলে নিয়ে হেঁটে হেঁটে বিভিন্ন কায়দায় তার কান্না থামায়। তারপর জিজ্ঞেস করে–
—কি হয়েছে সোনা? হঠাৎই কেঁদে উঠলে কেন?
তাজওয়াদ তার লাল টমেটোর মতো নাকটা আরেকবার টেনে নিয়ে বলে–
—পাপাকে এমুন দেখতে ভালো লাগছে না তাজেল। কসতু হচ্ছে।
পূর্ণতা একটা লম্বা শ্বাস ত্যাগ করে। তার নিজেরই তো কষ্টে বুকটা চৌচির হয়ে যাচ্ছে, ছোট বাচ্চাটাকে আর কি সান্ত্বনা দিবে? তাও সে বলে–
—তোমার পাপা ঠিক হয়ে যাবে সোনা। এক্সিডেন্টের উপর কি আর আমাদের হাত থাকে বলো? আল্লাহ চেয়েছেন তাই হয়েছে। তুমি আল্লাহর কাছে পাপার সুস্থতার জন্য বেশি বেশি প্রে করো, তাহলে আল্লাহ তোমার পাপাকে জলদি জলদি সুস্থ করে দিবেন।
—সত্যি মাম্মা?
—হুম সোনা।
হালকা হেঁসে পূর্ণতা উত্তর দেয়। তাজওয়াদ জানে তার মাম্মা কখনো মিথ্যে কথা বলে না। তাই সে তখনই তার দুই হাত মোনাজাতের মতো করে ধরে কাঁদো কাঁদো গলায় বলে–
—আল্লাহ আমাল পাপাকে আপনি সুচতো কলে দিন। তাজ আল দুট্টুমি কলবে না। মাম্মা আল পাপাল চব কতা শুনবে।
আদো আদো গলায় করা প্রার্থনা শুনে জাওয়াদের চোখ ভিজে উঠে। সন্তান আর বাবার বন্ধন কতটা ভালোবাসাময় হয়ে থাকে সেটা আজ সে আরো একবার অনুধাবন করল। এতে একদিকে তার হৃদয় যেমন খুশিতে নেচে উঠে, সেই সাথে অপরাধবোধে মন তিক্ত হয়ে যায়।
হসপিটালে জাওয়াদরা অবস্থান করে মোট আটদিন। নবম দিনে জাওয়াদকে হসপিটাল থেকে নবম দিনে। সেদিন হসপিটাল থেকে বাসায় যাওয়ার সময় না ছিল পূর্ণতা, আর নাই বা তাজওয়াদ। তাজওয়াদের গত কয়েক মাসে পরপর অনেকগুলো বন্ধ পড়েছে স্কুলে, পূর্ণতারও তাই হয়েছে অফিসে। তাই আজ দু’জনই নিজেদের কাজের উদ্দেশ্যে গিয়েছে। পূর্ণতা মূলত ইচ্ছে করেই আজ তাজওয়াদকে স্কুলে পাঠিয়েছে। নাহলে জাওয়াদ যখন বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হতো, তখন তাজওয়াদও তার সাথে যাওয়ার জন্য জেদ ধরত। যেটা জাওয়াদ চাইলেও, পূর্ণতা চাইছে না।
এতদিন তাদের দু’জনই হসপিটালে ছিল। জাওয়াদ বলা চলে জোর করেই পূর্ণতাকে তার সাথে থাকতে বাধ্য করেছে। পূর্ণতা যেখানে থাকবে, সেখানে তো তাজওয়াদও থাকবে জানা কথা। শুধু রাতটুকু বাসায় কাটিয়ে সাত-সকালেই মা-ছেলে উপস্থিত হতো জাওয়াদকে সঙ্গ দিতে। এটার অবশ্য একটা ভালো দিক প্রকাশিত হয়েছে, সেটা হলো, পূর্ণতা এখন আর আগের মতো ত্যাড়াব্যাকা করে কথা বলে না জাওয়াদের সাথে। তার যথেষ্ট কেয়ার করে। বলা চলে অনেকটাই পাঁচ বছর আগের মতো।
—ভাবীপু, তুমি একবার আমাদের বাসায় আসতে পারবে? ভাইয়া এসেই তার পেইন্ট হাউজে চলে গিয়েছে। আমাদের কাউকে ঢুকতে দিচ্ছে না ভেতরে। এদিকে আজ দুপুরের ঔষধ গুলোও নেয়নি। এত ডাকছি তাও সাড়াশব্দ করছে না। আমাদের ভয় করছে ভীষণ।
পূর্ণতা মাত্রই একটা মিটিং শেষ করে এসে বসেছিল, তখনই জিনিয়া ফোন করে এই কথাগুলো বলে। জিনিয়ার থেকে এসব শুনে পূর্ণতা ঘাবড়ে যায়। লোকটা লাস্ট দু’দিন ধরে ঘ্যানঘ্যান করছিল, হসপিটাল থেকে তার সাথে তাঁদের দু’জনকেও বাড়িতে যাওয়ার জন্য। কিন্তু পূর্ণতা এক বাক্যে মানা করে দিয়েছিল। গতকাল তো জাওয়াদ কিছুটা রাগারাগিও করেছিল। তবুও সে রাজি হয়নি। সে তড়িঘড়ি করে ঘুমন্ত ছেলেকে রেস্ট রুম থেকে নিয়েই রওনা হয় জাওয়াদদের বাসার উদ্দেশ্যে।
জিনিয়ার পাঠানো ঠিকানাতে পূর্ণতাদের গাড়ি এসে পৌঁছাতেই, পূর্ণতা বিস্ময়ে মুক হয়ে যায়। আলিশান এক বাড়ি দেখে পূর্ণতা ভাবনায় পড়ে যায়, তারা কি সঠিক ঠিকানায় এসেছে কিনা। তাই সে জিনিয়াকে কল দিয়ে জানায় তারা এসে পড়েছে।
সে আরো একবার অবাক হয়ে যায়, যখন জিনিয়াকে এই বাড়ি থেকে বের হতে দেখে। জিনিয়া চঞ্চল পায়ে হেঁটে এসে ঘুমন্ত তাজওয়াদকে নিজের কোলে তুলে নিয়ে বলে–
—ভাবীপু আসো।
পূর্ণতা চুপচাপ তার পেছন পেছন যেতে থাকে। মেইন গেইট দিয়ে প্রবেশ করার পর জিনিয়া তাকে ডুপ্লেক্স বাড়ির দিকে না নিয়ে গিয়ে বাগানের মাঝ দিয়ে হেঁটে একটা কাঠের তৈরি ছোট্ট বাড়ির সামনে থামে। নিজে আগে না গিয়ে সেখানে দাঁড়িয়েই বলে–
—তুমি যাও ভাবীপু, দেখো ভাইয়া দরজা খুলে নাকি। আমি এখানেই আছি।
পূর্ণতা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়। তারপর কিছুটা দ্বিধা নিয়েই সামনের দিকে পা বাড়ায়। দরজার সামনে এসে হাত নিয়েই দুটো টোকা দিতেই দরজার খুলে গিয়ে একটা হাত বেরিয়ে এসে তাকে টেনে ভেতরে নিয়ে গিয়ে আবারও টাস করে লাগিয়ে দেয় দরজা।
[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্প প্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন। ]
শব্দসংখ্যা~২৪২৮
চলবে?
[তাজের কিডন্যাপিংয়ের বিষয়টা আগামী পর্বে জানতে পারবেন ইনশা আল্লাহ।
আজ যে বলবেন ছোট হয়েছে, তাকে😒🔪
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]
Share On:
TAGS: শেষ পাতায় সূচনা, সাদিয়া সুলতানা মনি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩৯.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩৩
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩৯.২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩৮.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৯
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৪
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪৫.২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৬
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৪