Golpo কষ্টের গল্প শেষ পাতায় সূচনা

শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫৫.১


#শেষ_পাতায়_সূচনা [৫৫.১]

#সাদিয়া_সুলতানা_মনি

—”আমার বাবা! আমার জুনায়েদ।”

জাফর সাহেব ভেজা গলায় কথাটি বলেই সাথে সাথে ছুটে গিয়ে টনিকে জড়িয়ে ধরে। প্রিন্সিপাল সাহেব, সামান্তা ও টনি তারা তিনজনই অবাক হয়ে যান জাফর সাহেবের কাজে।

টনি আশা করেনি জাফর সাহেব এত বছর পর তাঁকে এমনভাবে জড়িয়ে ধরবে। টনি তো সেই পাঁচ বছর আগেই নিজেকে এতিম ভাবা শুরু করে দিয়েছে। যখন কিনা, জাফর সাহেব তার চরিত্রহীন ভাতিজির সাথে তাকে বিয়ে দিতে না পেরে, তাকে ত্যাজ্য পুত্র করে টাকা-পয়সা বন্ধ করে দিয়েছিল। একটা বারও ভাবেনি, আমার মা হারা সন্তান সেই ভিনদেশের মাটিতে কিভাবে চলবে? সেই লোক আজ জাফর সাহেবের এমন জড়িয়ে ধরায় অবাক হওয়ারই কথা।

সামান্তা উদগ্রীব হয়ে তার বাবার কাছে এসে জিজ্ঞেস করতে থাকে–

—”ড্যাডি, তুমি স্যারকে জড়িয়ে ধরলে কেন? কে হয় উনি তোমার?”

জাফর সাহেব ততক্ষণে চোখের পানি ছেড়ে দিয়েছেন। সে টনিকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে চোখে পানি আর মুখে হাসি নিয়ে কিছু বলতে চায়, কিন্তু জাফর সাহেব কিছু বলার পূর্বেই টনি গম্ভীর গলায় বলল–

—”আমরা পূর্ব পরিচিত আরকি।”

তারপর খুবই সন্তর্পণে সে নিজেকে জাফর সাহেবের আলিঙ্গন থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে, প্রিন্সিপাল স্যারের দিকে তাকিয়ে বলল–

—”কল্লব স্যারের প্রক্সি ক্লাসটা আমার নেওয়ার কথা স্যার। ক্লাসের সময় হয়ে গিয়েছে। আমি কি যেতে পারি?”

—”জি অবশ্যই। আর আপনাকে অহেতুক হ্যাজেলের জন্য দুঃখিত টনি স্যার।”

—”ইট’স ওকে স্যার। এক্সকিউজ মি।”

কথাটা বলেই টনি কেবিন থেকে বের হয়ে আসে। জাফর সাহেব অবাক চোখে ছেলেকে শুধু দেখেই যান। ছেলেটা তাঁকে বাবা বলে স্বীকার করল না। একদম অপরিচিত বা স্বল্প পরিচিতের মতোই এড়িয়ে গেলো।

জাফর সাহেবের মন তাকেই উল্টো প্রশ্ন করে বসে, করবেই বা কেনো? বাবা হিসেবে তুই তোর কোন দায়িত্বটা পালন করেছিস ছেলেটার প্রতি? সেই দশ বছর বয়সে তোর দ্বিতীয় স্ত্রীর কথা শুনে, ছেলেটাকে কাছ ছাড়া করলি। আজ সে একজন প্রাপ্তবয়স্ক সুপুরুষে পরিণত হয়েছে। কিছু বছর পূর্বে তুই নিজেই তো ছেলেটার সাথে যাবতীয় সব সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলি। তাহলে আজকে কি করে আশা করছিস, টনি তোকে বাবা হিসেবে পরিচয় দিবে?

কথাগুলো মনে হতেই, জাফর সাহেবের বুকটা ভেঙে আসতে চায় কষ্টে। তার প্রথম সন্তান, তার ভালোবাসার প্রতীক আজ তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। টনির মায়ের সাথে টনির বাবার বিয়েটা পারিবারিকভাবে হলেও, জাফর সাহেব পরবর্তীতে নিজের স্ত্রীকে ভীষণ ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তাদের বিয়ের দুই বছরের মাথায় টনির জন্ম হয়েছিল। টনির মা আকস্মিকভাবেই হার্ট অ্যাটাক করে মারা যান। তারপর তিনি স্ত্রীকে হারিয়ে ও একমাত্র সন্তানের মায়ের অভাব কিভাবে পূরণ করবেন, এই ভেবে ডিপ্রেশনে চলে যায়।

তখন জাফর সাহেবের মা ও কিছু আত্মীয় তাকে বুদ্ধি দেন দ্বিতীয় বিয়ে করার। যদিও সে প্রথমে বিয়ে করতে চায় না, কিন্তু একসময় সবাই অনেক বুঝানোর পর বিয়ে করতে রাজি হয়। সে দ্বিতীয় বিয়ে করার প্রথম কয়েকমাস তারা ভালো থাকলেও, এরপর থেকে শুরু হয় রোজ টনির নামে নালিশ আসা। টনি তখন বাবার সাথে একপ্রকার কথা বলা ছেড়েই দিয়েছিল। সৎ মায়ের সংসারে প্রথম পক্ষের সন্তান যেমন থাকে, ঠিক তেমনই অবস্থা হয়েছিল টনির। জাফর সাহেব ভাবলেন, রোজ-রোজ এমন বিচার-সালিশ না বসিয়ে ছেলেটাকে একবারে বর্ডিংয়েই ভর্তি করিয়ে দেই। কয়েকমাস পর না-হয় গিয়ে নিয়ে আসব আবার।

কিন্তু সেই কয়েকমাস আজ ১৬/১৭ বছরেও হয়ে ওঠেনি। কানাডা থেকে তার বোন চলে আসার পর ছেলেটা একা হয়ে গেলেও, সে একবারও আসতে বলেনি। তখন তো তার একদমই খেয়াল ছিল না টনি নামক তার বড় সন্তানের প্রতি। কি হতো, যদি সে ছেলেটার একটু খেয়াল রাখত? পাষাণরাও তো তাদের নিজেদের সন্তানের জন্য মন একটু হলেও কাঁদে, কিন্তু তার তো একবারও কাঁদে নি বিদেশের মাটিতে ছেলেটাকে ঘরহীন করে দিতে। তাহলে কি সে পাষাণের থেকেও বেশি নিষ্ঠুর?

_____________________

—”আজ বিকেলে দেখা করতে পারবে জান? অল্পকিছু সময়ের জন্য হলেও?”

কেমন ছাড়া ছাড়া গলায় কথাটি বলে টনি জিনিয়াকে। সময়টা এখন মধ্যাহ্নের মধ্যমপ্রহর। জিনিয়ার পরীক্ষা থাকায় সে জাওয়াদদের সাথে গ্রামে যেতে পারে নি। মেয়েকে শহরে একা রেখে মি.শেখও যাননি। পরীক্ষা শেষ করে গাড়িতে করে বাসায় ফিরছিল, তখনই টনি তাকে ফোন দিয়ে কথাগুলো বলে।

টনির এমন ভঙ্গুর গলার আওয়াজ শুনে জিনিয়ার মনটা কেমন করে ওঠে। টনি খুবই শক্তপোক্ত একজন মানুষ। জিনিয়ার মনে পরে না লোকটা তার সাথে কখনো এমন ভঙ্গুর হয়ে কথা বলেছে। আজ যখন সে এতটা নরম গলায় কথা বলছে, তখন বিষয়টাও সেই লেভেলের সিরিয়াস বটে। সে কোমল গলায় বলল–

—”আপনি ডাকবেন, আর আমি জিনিয়া আপনার ডাকে সাড়া দিবো না এটা কখনোই হবে না। আমি আসব বিকেলে আপনার সাথে দেখা করতে।”

টনি বিষাদের মাঝেই অল্প করে হেঁসে ওঠে। ভাগ্য তাকে অনেক অপূর্ণতার মাঝে রাখলেও, সঙ্গিনী পছন্দের দিক দিয়ে পরিপূর্ণ করেছে। এজন্য সে উপরওয়ালার কাছে রোজ শুকরিয়া জ্ঞাপন করে।

জিনিয়া টনির থেকে বিদায় নিয়ে কলটা কেটে দেয়। এতক্ষণে সে বাসায় পৌঁছে গিয়েছে। বাসায় এসে ফ্রেশ হয়ে প্রথমেই কিছু খেয়ে নেয়। তারপর ঘণ্টা খানেকের মতো রেস্ট দিয়ে কিচেনে চলে আসে। টনির জন্য কিছু স্ন্যাক্স বানিয়ে নিয়ে যাবে। যদিও সে মোটামুটি সবকিছুই বানাতে পারে, এবং যখনই দেখা করতে যায় টুকটাক কিছু না কিছু বানিয়েই নিয়ে যায়।

কিন্তু টনির ভাষ্যমতে রান্না করতে গিয়ে হাত পুড়িয়ে ফেললে তখন সে আরো বেশি কষ্ট পাবে। এরচেয়ে ভালো সে নিজে সুস্থ থাকুক আর টনিও তাকে ঠিক দেখে স্বস্তি পাক। কিন্তু জিনিয়ার প্রেমিকা মন তো মানতে চায় না এসব ভাঙাবুঝ।

জিনিয়া বেশি করে চিংড়িমাছ দিয়ে নুডুলস রান্না করে টনির জন্য। টনির চিংড়ি মাছ পছন্দ। কিন্তু সে আবার চিংড়িমাছ খেতে পারে না কয়েক বছর ধরে। সাংঘাতিক এলার্জি রয়েছে তার চিংড়িতে।

রান্নাটা শেষ করে জিনিয়া রেডি হয়ে বাবাকে “ফ্রেন্ডদের সাথে দেখা করতে যাই” বলে বাসা থেকে বের হয়ে আসে জিনিয়া। তাদের বাসার থেকে হাঁটা পথে দশ মিনিট লাগে একটা পার্ক রয়েছে, সেখানে চলে আসে সে। জিনিয়া পার্কটিতে পৌঁছানোর কয়েক মিনিট পরপরই টনিও চলে আসে।

জিনিয়া শান্ত দৃষ্টিতে নিয়ে তার প্রিয় পুরুষটির দিকে তাকিয়ে থাকে। টনির পরনে তখন মেরুন কালারে টি-শার্ট আর নেভি ব্লু কালারের ট্রাউজার। টি-শার্টের হাতা গুলো বেশ শক্ত-পোক্ত ভাবে আঁকড়ে ধরে আছে টনির হাতের মাসেলস গুলোকে। চোখে রোদ চশমা। ব্যস! এইটুকুতেই উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের টনিকে তুখোড় হ্যান্ডসাম লাগছে।

টনি জিনিয়ার কাছে আসতে আসতে চোখ থেকে সানগ্লাসটা খুলে গলায় ঝুলিয়ে রাখে। তারপর জিনিয়ার পাশে রাখা ব্যাগের দিকে নজর পড়লে সে হালকা রাগ দেখিয়ে বলে–

—”আজও রান্না করে এনেছো? আজ না তোমার পরীক্ষা ছিলো? পরীক্ষা দিয়ে এসে আবার এত ঝামেলা করার শক্তি পাও কোথা থেকে?”

জিনিয়া টনির কথায় ঠোঁট এলিয়ে হেঁসে দেয়। টনি সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে নিয়ে প্রেয়সীর হাসিটুকু অবলোকন করে। জিনিয়া হাসলে তার মুখের বাম পাশের মাড়ির গ্যাজ দাঁত দেখা যায়। এই গ্যাজদাঁত মেয়েটার হাসিকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলে বলে মনে করে টনি।

জিনিয়া টনির হাত টেনে ধরে তাঁকে নিজের পাশে বসিয়ে দেয়। তারপর ব্যাগটা থেকে টিফিনবাক্স বের করে চামচসহ বাটিটা টনির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল–

—”এই শক্তি শুধু বিয়ের আগ পর্যন্ত থাকে জনাব। বিয়ের পর আমি কিচ্ছু করতে পারব না। সব আপনি করবেন। আমি শুধু খাবার খাবো, আপনার আদর খাবো আর ঘুমাব।”

টনি খাবারের বাটির ঢাকনা খুলে সেখান থেকে এক চামচ নুডলস জিনিয়ার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল–

—”আল্লাহ মনে হয় তোমার ভাগের লজ্জা টুকু আমায় দিয়ে দিয়েছেন, আর তোমাকে লজ্জাহীন ভাবে পাঠিয়েছেন। নাহলে তোমার কথা শুনে আমার লজ্জা লাগছে, অথচ তুমি কি সুন্দর নির্লজ্জের মতো হাসছ।”

জিনিয়া খাবার টুকু মুখে নিয়ে আবারও হেঁসে দেয়। টুকটাক খুনসুটি আর দুষ্টুমির মাঝেই তারা খাবার টুকু শেষ করে। জিনিয়া বক্সটা গুছিয়ে আবারও ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে এবার সোজা টনির দিকে মুখ করে বসে। সে মুখে টনিকে আজকের মিটআপ সম্পর্কে জিজ্ঞেস না করলেও, টনি বুঝে যায় জিনিয়ার না বলা প্রশ্নটা। তাই সে একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে নিজেঔ বলতে শুরু করে–

—”আজ বহুবছর পর আবারও তার সাথে দেখা হয়েছিল। দেখা হওয়া মাত্রই আমাকে নিজের বুকে জড়িয়ে সোজা।”

—”কার সাথে?”

অনেকটা ফিসফিসিয়েই জিজ্ঞেস করে জিনিয়া। টনি আকাশের দিকে তাকিয়ে লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে বলল–

—”আমার মায়ের স্বামী।”

জিনিয়া অবাক হয়েও হয় না টনির নিজের বাবাকে এমন সম্বোধনে। কারণ সে টনির পাস্টের বেশ কিছুই জানে। কিন্তু এত বছর পর দেখা হওয়ায় ঐ লোকটা জড়িয়ে ধরেছিল টনিকে, এটা শুনে জিনিয়া অবাক হয়। যে লোক পাঁচ বছর পূর্বে লোভের বশবর্তী হয়ে নিজের মা হারা সন্তানকে ত্যাজ্য করেছিল, সে কেন আজ দেখা হওয়ার পর জড়িয়ে ধরেছিল?

—”আমাকে তার “বাবা” তার জুনায়েদ বলে সম্বোধন করেছিল। হাহ্! কি ফানি না বিষয়টা? আমার তো তখম এত হাসি পাচ্ছিল যে, একটুর জন্য ফিক করে হেঁসে দেই নি।”

টনি হাসতে হাসতে কথাগুলো বললেও, তার চোখের কোণে জমা হওয়া বিষাদের অশ্রু ঠিকই জিনিয়ার কাছে ধরা পড়ে যায়। সেই অশ্রু যেন জিনিয়াকে চিৎকার করে বলছে, টনির অপ্রাপ্তি গুলো সম্পর্কে।

টনি একদম শুরু থেকে সবটা বলতে থাকে। জিনিয়াও খুব ভালোভাবেই নীরব শ্রোতা হয়ে সবটা শুনে। টনি কথা বলা থামাতেই জিনিয়া ফট করে বলে বসে–

—”তার মানে সামান্তা আপনার বোন। না, মানে সৎ বোন।”

—”হয়ত। ওকে প্রথম দিন দেখেই আমার কেমন কেমন একটা লেগেছিল। কারণ, ওর চেহারার সাথে আমার চেহারার মিল রয়েছে।”

তাদের মধ্যে কিছু সময়ের জন্য নীরবতা ছেয়ে যায় আবারও। টনি আর জিনিয়া কিছুটা কাছাকাছিই বসেছিল। টনি হঠাৎই নিজের মাথাটা জিনিয়ার কাঁধে এলিয়ে দেয়। জিনিয়া কিছুটা হকচকিয়ে গেলেও পরমুহূর্তেই নিজেকে সামলে নেয়।

জিনিয়ার কাঁধে মাথা রেখে টনি বেশ ক্লান্ত গলায় বলল–

— “আমি আমাদের সন্তানের বেস্ট বাবা হয়ে দেখাবো জিনু ইনশা আল্লাহ। আমাদের সন্তানের সব আবদার আমি পূরণ করবো। ওদের অনেক অনেক আদর, ভালোবাসা দিবো। যাতে ওরা পৃথিবীর সামনে বুক ফুলিয়ে বলতে পারে, আমার বাবা পৃথিবীর সবচাইতে ভালো বাবা।

আমার জীবনের অপ্রাপ্তি গুলো আমি আমার সন্তানদের দেওয়ার মাধ্যমে পরিপূর্ণ করবো। তুমি আমার পাশে থাকবে জিনিয়া একজন বিশ্বস্ত সঙ্গী হয়ে, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পিতা হওয়ার জার্নিতে? আমায় বানাবে নিজের সন্তানের পিতা?”

শেষের কথাটা টনি জিনিয়ার কাঁধ থেকে মাথা তুলে বলে। তার চোখে-মুখে একরাশ আকুলতা। টনির প্রশ্নে জিনিয়া হঠাৎ করেই লজ্জা পেতে শুরু করে। তার শুভ্র গালজোড়া লাল আভা ফুটে ওঠে। সে টনির চোখে চোখ রাখতে পারে না লজ্জায়। বেশ অনেকক্ষণ হয়ে যাওয়ার পরও জিনিয়া লজ্জার কারণে কিছু বলতে পারে না। এর ফলে টনির মনটা কিছুটা ভেঙে যায়।

দূরের মসজিদ গুলোতে মাগরিবের আজান দিচ্ছে দেখে টনি বেঞ্চ ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। তারপর জিনিয়ার উদ্দেশ্যে বলল–

—”চলো তোমায় বাসায় পৌছে দিয়ে মাগরিবের নামাজ পড়তে যাবো। আজান দিয়ে দিয়েছে। দ্রুত ওঠো।”

জিনিয়াও তার কথা মতো উঠে দাঁড়ানোর পর টনি হাঁটতে শুরু করে। টনি আগে আগে হাঁটছে আর জিনিয়া পেছন পেছন। জিনিয়া টনিকে তার আগে হাঁটতে দেখে নিজে বড় বড় পা ফেলে তার পাশে এসে সন্তর্পণে টনির ডান হাত চেপে ধরে নিজের কোমল হাত দ্বারা। এতে করে টনি থমকে দাঁড়িয়ে গিয়ে তার দিকে অবাক দৃষ্টি নিয়ে তাকালে, জিনিয়া প্রতিত্তোরে ভীষণ মিষ্টি ও মায়াময় একটা হাসি দিয়ে বলল–

—”সঙ্গী হওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছেন আবার সঙ্গীকে ছেড়ে আগে আগেই চলে যাচ্ছেন। সঙ্গী হলে হলে আগে-পিছে করে নয়, যেকোন পরিস্থিতিতে হোক না কেন সঙ্গীর সাথে হাতে হাত রেখে চলতে হয়।

সঙ্গীর ভালো সময়ে থাকার জন্য যেমন মানুষ এগিয়ে আসে, তেমনি তার ভাঙনের দিনগুলোতেও কাঁধ হয়ে দাঁড়াতে হয়। সেই কাঁধে মাথা রেখে অন্তত অশ্রুটুকু বিসর্জন দিতে যেতে পারে। কারণ সঙ্গী মানে শুধু গন্তব্য ভাগ করে নেওয়া নয়, জীবনের সমস্ত ঝড়-ঝঞ্ঝা, চড়াই-উতড়াইও একসাথে সামলে নেওয়া।”

পড়ন্ত বিকেলের সেই অম্লান আলোতে টনি শুধু তাকিয়ে শুনতেই থাকে মেয়েটির কথা। জবাব দেওয়ার কোন প্রয়োজনবোধ করে না। মাঝে-মধ্যে চুপ হয়ে যাওয়াটাও অনেক না বলা কথার উত্তর হয়ে দাঁড়ায়।

___________________________

—”মাম্মা, নেক্সট ইয়ার বার্থডেতে একটা গিফট চাই মাম্মা।”

মায়ের কোলের উপর বসে তার কোমল গালে নিজের তুলতুলে হাত দিয়ে ধরে ভীষণ মায়াময় দৃষ্টি নিয়ে কথাটি বলে তাজওয়াদ। ছেলের এমন আবদারে পূর্ণতা ভ্রু কুঁচকে তাকায়।কয়েকদিন আগে জন্মদিন গেলো, বছর ঘুরে আবারও জন্মদিন আসার আগেই ছেলে তার বার্থডে গিফট চেয়ে রাখছে। পূর্ণতা ড্রাইভ করতে থাকা জাওয়াদের দিকে একবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে দৃষ্টি পুনরায় ছেলের দিকে নিবদ্ধ করে মনে মনে বলে–

—”দিন দিন বাপের মতো ধুরন্দর হচ্ছে। ঝোপ বুঝে এমন সব কোপ মা””রে, না হ্যাঁ বলা যায় আর নাই বা না।”

—”ও মাম্মা, আমাল সোনা মাম্মা শুনো না।”

—”হ্যাঁ, শুনছি তো। তুমি বলো না আব্বাজান।”

—”নেক্সট ইয়ার বার্থডেতে আমাল একটা বেবিডল সিস্টার চাই। তুমি আমাকে প্লিজ এতা দিও।”

ছেলের আবদার শুনে পূর্ণতার চোখ কপালে উঠে যায়। অন্যদিকে ছেলের বাবা হু-হা করে হেঁসে দেয়। এতদিন ছিল “মা কা বেটা” আজ হয়েছে “বাপ কা বেটা”।

জাওয়াদের হাসি দেখে পূর্ণতা তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠে। সে বুঝে যায়, এই বাপ-ছেলে মিশনে নেমে মেয়ে-বোন আনার। কিন্তু চাইলেই কি এত সহজে পাওয়া যায় সবকিছু?

—”অন্য কিছু চাও বার্থডে গিফট হিসেবে। বেবি সিস্টার এখনই না। এমনিতেই তোমার পেছনে ছুটতে ছুটতে আমার দিন কখন শুরু হয় আর কখম শেষ হয় টের পাই না আমি। এখন আরেকটা বেবি সিস্টার আনলে ওকে সামলাবো নাকি তোমার পেছনে ছুটবো?”

বেশ সিরিয়াস মুখ করে কথাগুলো বলে পূর্ণতা। মায়ের কথা শুনে বেচারা তাজওয়াদের মুখটা চুপসে যায়। তার বেবি সিস্টার এত তাড়াতাড়ি আসবে না তাহলে? তার ফ্রেন্ড নীল তাহলে ঠিকই বলেছে। সে বেশি দুষ্টুমি করে দেখেই তার মাম্মা-পাপা নীলের বেবি সিস্টারের মতো তাকেও একটা বেবি সিস্টার এনে দিচ্ছে না।

তাজওয়াদ কাঁদো কাঁদো গলায় বলল–

—”মাম্মা, তাজ প্রমিজ কলছে সে আর ইত্তুও দুষ্টুমি কব্বে না। গুড বয়ের মতো সব খাবাল ফিনিংশ কলবে। একা একা স্টাডি কলবে। তাও তুমি আমাকে একতা বেবি সিস্টার এনে দাও। প্লিইইইইইইইজ মাম্মা, আমাল সোনা মাম্মা না তুমি।”

—”না আমি তোমার সোনা মাম্মা না। হয়েছে?”

—”বার্থেডে গিফটে তাজকে বেবি সিস্টার না দিলে তাজ অনেক মন খালাপ কলবে। কেক কাটবে না, কান্নাও কলবে। “

—”কেটো না কেক।”

মায়ের কথা শুনে তাজওয়াদ ভ্যা ভ্যা করে কেঁদে দেয়। কাঁদতে কাঁদতে চোখ-নাক লাল টমেটো বানিয়ে ফেলে। ছেলের কান্না দেখে পূর্ণতা মনে মনে বেশ বিরক্ত হয়। ছেলেটা এক নাম্বারের ধরি বাজ। কথায় মানাতে না পারলে, কান্না নামক অ”স্ত্র ব্যবহার করে পূর্ণতার না’কে হ্যা বানায়।

পূর্ণতা আঁচড় চোখে জাওয়াদের দিকে তাকালে দেখতে পায়, জাওয়াদ মিটমিট করে হাসছে। ছেলেকে যে ছেলের বাপই এমনটা করতে পরামর্শ দিয়েছে, সেটা সে বেশ ভালো মতোই বুঝতে পারে।

পূর্ণতা হ্যান্ডব্যাগ থেকে টিস্যু আর পানির বোতল বের করে। তারপর তাজওয়াদের চোখ মুছিয়ে দিয়ে পানি খাইয়ে দেয়। তারপর ছেলের মাথাটা বুকের সাথে চেপে ধরে পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল–

—”তোমার বার্থডে আসতে আরো ১০/১১ মাস বাকি আছে। এই কয়েকমাসে আমি যদি দেখি আমার তাজ দুষ্টুমি করা কমিয়ে দিয়েছে, সব ভেজিটেবল খাচ্ছে, হোমওয়ার্কগুলো গুড বয়ের মতো তাড়াতাড়ি ফিনিশ করে ফেলছে, রাতে ঘুমানোর আগে দুধ খাওয়া নিয়ে বায়না করছে না, মাম্মামের সব কথা শুনছে। তখন আমি ভেবে দেখবো তোমার জন্য বেবি সিস্টার আনা যায় কিনা। এখন নো মোর ওয়ার্ডস, ঘুমাবে চুপচাপ।”

বেবি সিস্টারের সাথে খেলা করার লোভে তাজওয়াদ মনে মনে প্রমিস করে, সে আর দুষ্টুমি করবে না। একদম গুডবয় হয়ে যাবে। তাহলেই তার মাম্মা তাকে বেবি সিস্টার এনে দিবে। তারপর সেও স্কুলে নিয়ে গিয়ে তার সব ফ্রেন্ডদের দেখাবে তার সিস্টারকে। তবে পঁচা নীলকে ধরতে দিবে না তার সিস্টার। যেমনটা নীলও দেয় না তাকে তার সিস্টার ধরতে। এসবই আজগুবি কথা ভাবতে ভাবতে তাজওয়াদ মায়ের বুকে ঘুমিয়ে যায় একসময়। তাজওয়াদকে ঘুমিয়ে যেতে দেখে পূর্ণতাও সিটে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে রাখে।

_____________________________

মে মাসের ভ্যাপসা গরমে জনজীবন যেন হাঁসফাঁস করে উঠেছে। টানা অনাবৃষ্টিতে মাঠ-ঘাটের বুক ফেটে চৌচির, চারদিক জুড়ে বিরাজ করছে খাঁ খাঁ করা শুষ্কতা। আকাশের বুকে প্রখর সূর্য যেন সমস্ত তেজ উজাড় করে পৃথিবীর বুকে আগুন ঝরিয়ে চলেছে। প্রকৃতি আজ ক্লান্ত, আর মানুষ তার দহনময় স্পর্শে দিশেহারা।

কিন্তু এই গরম আবহাওয়ার চেয়েও বেশি গরম হয়ে আছে সিলেটের রূপনগর গ্রামে অবস্থিত তিন রুমের সেমি পাকা বাড়ির বারান্দায়। কিছুক্ষণ আগেই আরিয়ানরা এসেছে আরওয়ার বাড়িতে। কথার শুরুটা আরিয়ানের বাবাই করেন। পাশ দিয়ে পূর্ণতাও বুঝায় ঠিক কি কি ভাবে আরিয়ান-আরওয়ার সম্পর্কের মাঝে আঞ্জুমান নামক ডাইনী ঢুকে পড়েছে। আরওয়ার মা, ভাই, আর ভাবী এক আকাশ সমান বিস্ময় নিয়ে সব শুনতে থাকে আর একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে থাকে। এসব কিছুই যেন তাদের কাছে নাটক-সিনেমার কাহিনি লাগছে।

সব কথা শেষ করে আহনাফ সাহেব একটা ক্লান্ত শ্বাস ত্যাগ করেন। তারপর খানিক রয়ে-সয়ে শান্ত ভঙ্গিতে আবারও বলতে শুরু করলেন–

—”আমার ছেলেটা কেমন সেটা তো আপনাদের জানাই ভাবী (আরওয়ার মা)। ছেলেটা কখনো কাউকে আঘাত তো দূরের থাক, কষ্ট দিয়ে কথা বলেছে কিনা আমার মনে পড়ে না। কিন্তু তার জন্যই ভাগ্য কি নিদারুণ কষ্ট লিখে রেখেছে। ভালোবাসলো একজনকে, কিন্তু অজান্তেই বিয়ে করতে হলো আরেকজনকে।

আরওয়া মা’কে নিয়ে বা আপনাদের পারিবারিক স্টেটাস নিয়ে আমাদের বিন্দুমাত্র মাথা ব্যথা নেই। আমি চাই আমার ছেলেটা আগের মতো হাসিখুশি থাকুক, সুখে থাকুক। যেটা সব বাবা-মাই নিজেদের সন্তানের জন্য চেয়ে থাকে। আমার একটা মাত্রই সন্তান, ও এই বয়সে এসে আমাকে ৩০০মিটার দৌড়াতে বললে আমি ওর খুশির জন্য তাই করব। সেখানে অসুস্থ শরীর নিয়ে এতদূর আসা আমার জন্য বড় কোন ব্যাপার না।

আমরা চাইছি, ওদের চার হাত এক করে দিতে। কিন্তু শুধু আমরা চাইলেই তো হবে না। মেয়ে আপনাদের তাই সিদ্ধান্তও আপনাদের।”

আহনাফ সাহেব থামতেই জাওয়াদ, পূর্ণতা, আরিয়ান উদগ্রীব হয়ে বসে থাকে আরওয়ার মা-ভাইয়ের মতামত জানার জন্য। আরওয়ার মা সহজ-সরল হলেও, বিচক্ষণ মহিলা। তিনি মনে করেন তার সন্তানদের যথেষ্ট বয়স হয়েছে নিজের জীবনের সব সিদ্ধান্ত নেওয়ার। কিন্তু তাই বলে, এক বিবাহিত পুরুষকে বিয়ে করবে তার মেয়ে, এটা ভেবেই তার মনটা কেমন কেমন করে উঠছে। আরিয়ান কেমন ছেলে সে সম্পর্কে সেও সব জানে। তাই তিনি কেমন দ্বিধাদ্বন্দে ভুগছেন।

আরওয়ার মা ছেলের দিকে তাকান, ছেলের মতামত কি তা জানতে। আরওয়ার ভাই রাসেল তার মাকে চোখ দিয়ে ইশারা করে বলে, বাকি কথা সে বলবে।

রাসেল নিজের স্ত্রীকে বলে–

—”তুমি গিয়ে দুপুরের রান্নাবান্নার আয়োজন করো গিয়ে। ওরা আজ আমাদের সাথে দুপুরে খাবার খাবে।”

তার কথা শুনে আরিয়ানরা ভাবে, তারা হয়ত রাজি বিয়ে টায়। সকলে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। কিন্তু ঠিক তখনই রাসেল বলে ওঠে–

—”আপনারা মেহমান আমাদের। আপনাদের না খাতিরদারি না করলে উপরওয়ালা যেমন অসন্তুষ্ট হবেন আমাদের উপর, তেমনই আমাদের নিজেদেরই ভীষণ খারাপ লাগবে। তাই অনুরোধ রইবে, এই গরিবের ঘরে ডাল-ভাত চারটে না খেয়ে যাবেন না।”

রাসেল থামতেই আহনাফ সাহেব হাস্যোজ্জ্বল গলায় বললেন–

—”আরে বাবা, এসব নিয়ে তুমি চিন্তা করো না। একটা সম্পর্কে যখন আমরা যাচ্ছি, তখন খাওয়াদাওয়া, আসা-যাওয়া চলতেই থাকবে।”

—”কিসের সম্পর্কের কথা বলছেন আঙ্কেল?”

—”কেন আরিয়ান আর আরওয়া মায়ের বিয়ের।”

—”কিন্তু এই বিয়েতে যে আমাদের মত নেই। আর আমার মনে হয় না, আমাদের মতের বাহিরে গিয়ে আমার বোন কিছু করবে।”

রাসেলের কথা শুনে আরিয়ানের মনটা ভেঙে কয়েক টুকরো হয়ে যায়।

[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্প প্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন।]

শব্দসংখ্যা~২৭৩০

#চলবে?

জাওয়াদ, পূর্ণতা ও তাদের ছোট ছানাকে নিয়ে লেখা আমার তৃতীয় ই-বুক “পূর্ণতার সংসার”

পড়ুন ই-বই “পূর্ণতার সংসার”

https://link.boitoi.com.bd/hMuN3

[পেইজের সব কিছুতে লাল হয়ে রয়েছে। আপনারা প্লিজ যারা গল্প পড়েন, তারা একটু কষ্ট করে হলেও ১/২টা কমেন্ট করিয়েন। আর পেইজটাকে একটু রিভিউ দিয়েন।

ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স। ]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply