শেষপাতায়সূচনা [৫০.২]
সাদিয়াসুলতানামনি [পর্বটি রোমান্টিক। ভালো না লাগলে স্কিপ করবেন। ]
বুকের বাম পাশে হৃদপিণ্ড নামক বস্তুটি একটু বেশিই জোরে ধকধক করছে বলে মনে হলো পূর্ণতার। মনে হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়, যখন কিনা এমন হ্যাচকা টানের স্বীকার হতে হয় হুট করেই।
জাওয়াদ পূর্ণতাকে তখন টান নিয়ে ঘরে ঢুকিয়ে দেওয়ালের সাথে চেপে দাঁড় করিয়ে নিজের অক্ষত হাতটি রাখে পূর্ণতার কাঁধের পাশের দেওয়ালে। পূর্ণতা এমন অযাচিত কর্মকাণ্ডের সাথে নিজেকে মানিয়ে উঠতে পারেনি বলে, বুকে দুই হাত রেখে বড় বড় শ্বাস ফেলছে। মিনিট দুয়েক সময় নিয়ে নিজেকে শান্ত করার পর, পূর্ণতা তার রাগী সত্ত্বায় ফিরে যাওয়ার প্রয়াস চালায়। সে বেশ উঁচু গলায় বলে–
—”পাগল হয়ে গিয়েছেন আপনি? এমনভাবে টান মারলেন কেন? যদি পায়ের ভারসাম্য হারিয়ে আপনার উপর পড়তাম, তাহলে বুঝতে পারছেন কত বড় ব্লান্ডার হতো? ঘটের বুদ্ধি কি বাজারে বিক্রি করে দিয়েছেন? কি হলো উত্তর দিচ্ছেন না……..”
কথাটুকু সম্পূর্ণ করতে পারে না পূর্ণতা। মূলত তাকে সম্পূর্ণ করতে দেয় না জাওয়াদ। পূর্ণতার কাঁধের পাশের দেওয়ালে রাখা তার বাম হাতটি দিয়ে পূর্ণতার থুতনি চেপে ধরে মুখটা আরো খানিকটা উঁচু করে। তারপর কোনরূপ আগাম বার্তা ছাড়াই লুটেরা ভ্রমরের ন্যায় পূর্ণতার ঠোঁটের মহামূল্যবান মধু আহরণ করতে থাকে।
পূর্ণতার ঘটনার আকস্মিকতায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যায়। মস্তিষ্ক তার কার্যক্ষমতা কিছু সময়ের জন্য বন্ধ করে দিয়ে জাওয়াদকে সুবিধা করে দেয় মধু আহরণের। জাওয়াদ সেই স্বল্প সময়টুকু নষ্ট না করে পুরো সদ্ব্যবহার করে। পূর্ণতার মস্তিস্ক তার বুঝার কার্যক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে দিতে জাওয়াদ তখন একটু হলেও নিজের পিপাসা মিটিয়ে নিয়েছে।
নরম, তুলতুলে ওষ্ঠে হালকা চিনচিনে ব্যথায় পূর্ণতার হুঁশ ফিরে। সে তাৎক্ষণাত জাওয়াদের অধিপত্য থামাতে চায় নিজের ওষ্ঠের উপর থেকে। বল প্রয়োগ করে সরিয়ে দিতে চায় বারংবার শ্যামপুরুষকে। কিন্তু বিগত দিনের মতো আজও সে ব্যর্থ হলো। জাওয়াদ একপ্রকার তার শরীর দিয়ে পূর্ণতাকে ঠেসে ধরেছে, যার কারণে বেচারী খুব একটা সুবিধা করতে পারছে না নিজেকে ছাড়ানোর প্রচেষ্টায়।
যখন পূর্ণতা বুঝল হাতে কাজ হবে না, তখন সে বুদ্ধি প্রয়োগ করে। নিজের ছোট ছোট তীক্ষ্ণ দাঁত দিয়ে সজোড়ে কামড়ে ধরে জাওয়াদের পুরুষালি ঠোঁট। জাওয়াদ হকচকিয়ে গিয়ে কিছুটা সরে যেতেই পূর্ণতা নিজেকে ঝটকা দিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে জাওয়াদের থেকে বেশ কয়েক কদম দূরে সরে যায়।
এত বছর পর জাওয়াদের থেকে পাওয়া স্পর্শটি তাঁকে ক্রমেই নুইয়ে দিতে চাইছে। শিহরিত করতে চাইছে। চাইছে পূর্ণতাকে দূর্বল করে দিতে, যাতে জাওয়াদ তাকে নিজের আয়ত্তে নিয়ে তার সর্বাঙ্গে ভালোবাসার তাণ্ডব পরিচালনা করতে পারে।
এমন একটা অপ্রত্যাশিত কাণ্ড ঘটানোর পরও জাওয়াদ নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। খুব সূক্ষ্ম ভাবে খেয়াল করলে বুঝা যাবে, তার সিক্ত অধরের কোণ খানিক বেঁকিয়ে হাসছেও। পূর্ণতার রাগটা সহ্যের সীমা অতিক্রম করে ঠিক এখানেই। বোনের মাধ্যমে ডেকে নিয়ে এসে এখন লুচুগিরী শুরু করেছে এই অসুস্থ শরীরে। কি তেল ব্যাডার শরীরে!
—”এটা কি করলেন? কেন করলেন? কার পারমিশনে এমনটা করার সাহস দেখালেন?”
রাগে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে প্রশ্ন গুলো জিজ্ঞেস করে পূর্ণতা। জাওয়াদ তাকে দুই টাকার ভাউ না দিয়ে চুপচাপ হেঁটে গিয়ে বসে পড়ে বিশাল রুম টার একপাশে রাখা সোফায়। সেটায় গা এলিয়ে দিয়ে ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বলে–
—”মিষ্টি মুখ করলাম। সবাই খাবারের পর অথবা কোন সুখবর শুনে মিষ্টি মুখ করে। খেয়াল করে দেখলাম আজ পাঁচ বছর, একমাস, নয়দিন পর এত সুস্বাদু, লোভনীয় মিষ্টি খাওয়া হয় না। তাই আজ আমার ধৈর্য তার সকল বাঁধ ভেঙেই দিলো।
আর পারমিশন? কিসের পারমিশন? বউ হও তুমি আমার। তোমাকে ছুঁয়ে দেওয়ার পারমিশন শুধু তোমার থেকেই আমি চাইতাম। কিন্তু হ্যাঁ, যদি না তুমি আমায় এত নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরাতে। সো এখন আর এসব পারমিশন চাওয়া-চাওয়ির আশা রেখো না আমার থেকে।”
জাওয়াদের উত্তর শুনে পূর্ণতা বাকরূদ্ধ। এই লোক এমন বেহায়া হলো কবে থেকে? কেনোই বা হলো? পূর্ণতা খেয়াল করে তার রাগটা ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে যাচ্ছে। চেয়েও আগের সেই ভস্ম করে দেওয়া বিশ্রী রাগ দেখাতে পারছে না। আর এর জন্য সে নিজের উপরই ভীষণ বিরক্ত।
তাও সে নিজেকে কঠোর দেখাতে চায় জাওয়াদের সামনে। সে খড়খড়ে গলায় বলে–
—”আপনি আমায় মিথ্যে বলিয়ে আনিয়েছেন জিনিয়ার মাধ্যমে, তাই না?”
—”একদমই না। জিনি তোমাকে সহজে মিথ্যে বলতে পারে না। আর ও কি বলিয়ে তোমাকে এনেছে তাও আমি জানি না। বাই দ্য ওয়ে, এসেছো যখন কিছু রান্না করে খাওয়ায়। ক্ষুধা পেয়েছে ভয়ংকরভাবে।”
—”পারবো না আমি কিছু রাঁধতে। সারাদিন অফিসের কলুরবলদের মতো খেটে এখন আমি চুলা গুতাতে পারব না।”
জাওয়াদ এবার এমন একটা কথা বলে, যেটা শুনে পূর্ণতার সর্বাঙ্গে লজ্জার প্রলেপ ছড়িয়ে যায়। জাওয়াদ বখাটেদের মতো পূর্ণতার পা থেকে মাথা অব্দি নিজের বেহায়া দৃষ্টি বুলাতে বুলাতে বলেল–
—”তাহলে তুমি কাছে আসে। তোমাকে খাই। এতে আমিও খুশি, তোমারও সকল টায়ার্ডনেস দূর হয়ে যাবে। “
জাওয়াদের কথা পূর্ণতার শ্রবণ ইন্দ্রতে পৌছাতেই তার মাথা ঘুরে ওঠে। ঢোকটাও যেন গলার কাছে গিয়ে থমকে গিয়েছে এমন মাত্রাতিরিক্ত নির্লজ্জ কথাবার্তা শুনে। পূর্ণতা আজ এই জাওয়াদকে চিনতে পারছে না একটুও। কোথায় গেলো তার সেই চুপচাপ, কিছুটা লাজুক, অনেকটা ইন্ট্রোভার্ট শ্যামপুরুষটি?
এই চরম ঠোঁটকাটা, নির্লজ্জ, বেহায়া লোকটি কিছুতেই তার শ্যামপুরুষ হতে পারে না। আচ্ছা, জাওয়াদের ক্ষতে সেরে ওঠার জন্য দেওয়া ওষুধ গুলোর সাইডইফেক্ট হিসেবে জাওয়াদের মাথার তার ওলটপালট হয়ে যায় নি তো? হ্যাঁ, তাই হবে। পূর্ণতা বোকার মতো জাওয়াদের দিকে তাকিয়ে থেকে এসব কথাই ভাবছিল।
অন্যদিকে জাওয়াদ তাকে ঘোল খাওয়াতে পেরে মনে মনেই হেঁসে আধমরা হচ্ছে। পূর্ণতার মতো একটা বিচক্ষণ বিজনেসওমেনকে ঘোল খাওয়াতে পারা চারটি খানি কথা নাকি?
জাওয়াদ পূর্ণতাকে আরেকটু ভরকে দেওয়ার উদ্দেশ্যে মুখ খুলে–
—”কি হলো? কোনটা করবে? রান্না করবে নাকি তোমাকে খেতে দিবে?”
পূর্ণতা জাওয়াদের এমন বেলাগাম কথা শুনে ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠছে। মাথা ভনভন করছে তার। সে জাওয়াদের প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই দরজার দিকে হাঁটা দেয়। উদ্দেশ্য তার এখান থেকে ছেলেকে নিয়ে প্রস্থান করার।
কিন্তু বিধিবাম! দরজাটা বেশ কয়েকবার খোলার চেষ্টা করার পরও খুলে না। পূর্ণতা কনফিউজড হয়ে যায় এতে। সে জাওয়াদের দিকে ঘুরে তাকালে, জাওয়াদ তাকে চমকে দিয়ে বলে–
—”খুলবে না আমার ফিঙ্গারপ্রিন্ট ছাড়া। এই পেইন্ট হাউজটা আমি নিজের দুঃখ বিলাসের জন্য বানিয়েছিলাম। আমার অনুপস্থিতিতে যাতে কেউ এখানে ঢুকে আমার তৈরিকৃত এই ছোট দুনিয়ার গোপনীয়তা লঙ্ঘন না করতে পারে তাই কিছু অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করেছি।”
পূর্ণতা এবার সবটা বুঝে। সারাদিন অফিস করে তার এখন সত্যিই শক্তিতে কুলচ্ছে না আরো তর্ক-বিতর্ক করার। সে ধপধপ করে হেঁটে এসে একটা সিঙ্গেল সোফায় গা এলিয়ে দেয়। চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ রেস্ট নেয়। তারপর চোখ খুলে জাওয়াদের দিকে তাকালে দেখতে পায়, জাওয়াদ এক দৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। উপরন্তু জাওয়াদের চাহনি এমনই বেহায়া যে, তার শরীরে কাটা দেয় ঐ দৃষ্টির সাথে নিজের দৃষ্টি স্থাপনের পর।
পূর্ণতা ক্লান্ত গলায় বলে–
—”আগে তো এমন বেহায়া ছিলেন না? ইদানীং এত উদ্ভট আচরণ করছেন কেন? গু’লি লেগেছে আপনার কাঁধে, কিন্তু সমস্যা দেখা দিচ্ছে আপনার মাথায়। বুঝলাম না কাহিনি।”
জাওয়াদ পূর্ণতার কথা শুনে বড়সড় একটা হাসি দেয়। পূর্ণতা যেহেতু তার দিকেই তাকিয়ে ছিল, তাই সেই হাসি চক্ষুগোচর হতেই সে বুঝতে পারে, এই হাসির পেছনেও একটা বেহায়া উত্তর লুকিয়ে আছে।
জাওয়াদ জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি বজায় রেখে বলল–
—আগে তোমাকে দেখলে আমার আবেগ কন্ট্রোলে থাকত, আর বিবেক বলত, “বউ রেগে আছে জাওয়াদ। আগে রাগ ভাঙা তারপর আদর।” কিন্তু ইদানীং সেই বিবেকই আবেগকে উস্কে দিচ্ছে তোমাকে জনমানবহীন চিপায় নিয়ে গিয়ে কিছু-মিছু করার জন্য। আর আবেগ-বিবেকের প্ররোচনায় পড়ে দিনে-দুপুরে দুষ্টু কাজ করে ফেলছি তোমার সাথে। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি একদমই নির্দোষ।
পূর্ণতা মনটা চায় জাওয়াদের মাথায় বারি দিয়ে সব আবেগ-বিবেকের বারোটা বাজিয়ে দিতে। কিন্তু সব চাওয়া কি আর পূর্ণতা পায়?
পূর্ণতা কথার প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে বলে–
—”দুপুরের খাবার-ওষুধ কিছুই নাকি খাননি? জিনিয়া দরজা ধাক্কাচ্ছিল তাও খুলেন নি কেন?”
—”ঘুমিয়ে ছিলাম। দু’টো ঘুমের ওষুধ দিয়েছে আমায় ভুলে গিয়েছো? ওগুলো খেলে সারাদিন নেশাখোরদের মতো ঘুম পায়।”
পূর্ণতার এবার মনে পড়ে জাওয়াদের ওষুধের কথা। আসলেই তাকে দুটো ওষুধ দেওয়া হয়েছে, যা খেলে জাওয়াদ প্রচুর ঘুমায়। এতে অবশ্য তারই ভালো হয়। প”য়জনের কারণে তার বড় ধরণের কোন ক্ষতি না হলেও, কিছু ইন্টার্নাল সমস্যা দেখা দিয়েছে। সেজন্য ডাক্তার একগাদা ওষুধ দিয়েছে, আর কড়া গলায় বলেছে “জাওয়াদ যদি খেতেও ভুলে যায় তাহলে চলবে, কিন্তু ওষুধ না খেলে চলবে না।” কিন্তু হসপিটাল থেকে ছুটি পাওয়ার প্রথম দিনই দুপুরের ওষুধটা মিস হয়ে গেলো।
—”ওয়াশরুম কোনদিকে? ফ্রেশ হতাম একটু।”
—”সিড়ি বেয়ে উপরে গেলে দোতলার প্রথম রুমটাই আমাদের। ঐটায় গিয়ে ফ্রেশ হতে পারো।”
“আমাদের” শব্দটা পূর্ণতার কানে বারংবার ঝঙ্কার তুলতে থাকে। একদিন এই জাওয়াদই তাকে বলেছিল, সে আর পূর্ণতা মিলে আমরা হতে পারব না। অথচ সময়ের পরিক্রমায় জাওয়াদই নিজ থেকে তাকে সব কিছুতে চাইছে। সে, পূর্ণতা আর তাজওয়াদ মিলে আমরা হতে চাইছে। সময় যেমন কঠিন হয়, তেমনই সুন্দরও হয়। শুধু প্রয়োজন একটু ধৈর্য ধারণের।
পূর্ণতা জাওয়াদের কথামতো সিড়ি বেয়ে দোতলায় চলে যায়। দোতলার করিডরে দাড়িয়ে পূর্ণতা সম্পূর্ণ বাড়িটায় নজর বুলালে, বুঝতে পারে বাড়িটা বেশি একটা বড় না। রুম শুধু উপরেই রয়েছে। দুটো দরজা দেখে বুঝতে পারল রুমের সংখ্যা কতটি। নিচে ড্রয়িং, ডাইনিং ও ওপেন কিচেন মিলিয়ে বেশ ভালোই একটা লিভিং স্পেস রয়েছে। উপরে শুধু রেস্ট রুম।
পূর্ণতা প্রথম রুমটিতে প্রবেশ করলে দ্বিতীয় দফা চমকে যায়। রুমটা প্রায় সবগুলো দেওয়ালে পূর্ণতার ছবি। লোকটা এত ছবি কবে তুললো? কেনোই বা তুললো? ছবি গুলো দেখেই বুঝা যাচ্ছে, পাঁচ বছর আগে তোলা হয়েছে। কিছু ছবি রিসেন্ট সময়েরও রয়েছে।
পূর্ণতা আগের ছবিগুলো দেখ বেশ ইমোশনাল হয়ে পড়ে। সে হেটে এসে একটা ফ্রেম দেওয়াল থেকে নিজের হাতে তুলে নেয়। ছবিটায় জাওয়াদকে ঠেসে ধরে চুমু দিচ্ছে তার গালে পূর্ণতা আর জাওয়াদ মুখ বিকৃত করে রেখেছে বিরক্তিতে। ছবিটা ফোনে টাইমারে সেট করে তুলেছিল। এই ছবিটা পূর্ণতার ফোনেও ছিল। কিন্তু সেই ফোনটি পূর্ণতা কানাডা যাওয়ার আগে এয়ারপোর্টে ফেলে দিয়েছিল।
আরো কিছুক্ষণ ছবিগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে পূর্ণতা। তারপর নিজের অবাধ্য মনটাকে বাধ্যতার বেড়ি পরিয়ে ওয়াশরুমে গিয়ে চোখ-মুখে পানি দিয়ে অনেকটা সময় নিয়ে। হাত-মুখ মুছে নিচে এসে দেখে তাজওয়াদও জাওয়াদের বুকে ঘাপটি মেরে শুয়ে আছে।
তাজওয়াদের চোখ বন্ধ দেখে পূর্ণতা বুঝতে পারে, হয়ত তাজওয়াদ ঘুমের মাঝেই উঠে পড়েছিলো তারপর তাকে দেখতে না পেয়ে কান্নাকাটি শুরু করলে জিনিয়া এসে তাকে দিয়ে যায়। বাবাকে পেয়ে তাজওয়াদ আবারও ঘুমে গিয়েছে তার বুকেই।
—”কি খাবেন? স্যুপ নাকি অন্যকিছু?”
জাওয়াদ মুখ বিকৃত করে বলল–
—”হসপিটালে এই আটদিন আমার উপর তুমি আর ডাক্তার-নার্সরা যা টর্চার চালিয়েছো খাওয়া নিয়ে, আমি চেয়েও কিছু বলতে পারিনি। কিন্তু আর না। মাফও চাই, দোয়াও চাই। জিহ্বার টেস্ট মরে যাচ্ছে স্যুপ আর সেদ্ধ সবজি খেতে খেতে।
কান দিয়ে ধোয়া বের করার মতো ঝাল দিয়ে মাংস আর গরম গরম ভাত করো। ফ্রিজে সব পেয়ে যাবে তোমার প্রয়োজন অনুসারে।”
পূর্ণতা জাওয়াদের কথা শুনে ভাবতে থাকে কি রান্না করবে। এত ঝাল দিয়ে রান্না করবে না একদমই। ফ্রিজ ঘেটে আসলেই বেশ কিছু রান্নার জিনিস পেয়ে যায়। তা দিয়েই রান্না শুরু করে। অফিসের ফর্মাল শার্ট-প্যান্ট পরেই বেচারিকে হাতা-খুন্তি নাড়তে হচ্ছে। গরমে তার ফর্সা মুখশ্রী লাল হয়ে গিয়েছে। দুই ঘন্টা লাগিয়ে সে গরম ভাত, বিফ আর কাঁচা কলা দিয়ে শিং মাছ রান্না করে।
ভাত আর শিং মাঢ় রান্না আগেই হয়েও গেলেও বিফটা তখনও চুলায়। বিফ কষিয়ে পানি ঢালতে নিবে কড়াইয়ে তখনই সে জাওয়াদকে কিচেনের দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে থাকতে দেখে। নিজের কাজে এতটাই বিজি হয়ে গিয়েছিল সে যে, জাওয়াদ কতক্ষণ ধরে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেটা খেয়াল করেনি।
পূর্ণতা জাওয়াদের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে গরুর মাংসে পর্যাপ্ত ঝোল দিয়ে একটু নেড়ে ঢাকনা দিয়ে অন্যকাজ করতে থাকে। ভাতের বোল, মাছের তরকারির বোল ডাইনিংয়ে রেখে আবারও কিচেনে আসে প্লেট নিতে। কিন্তু জাওয়াদ তার এই কাজে হেল্প করে দেয়। তারপর আবারও পূর্ণতার পেছন পেছন ঘুরতে থাকে।
রান্না হতেই পূর্ণতা জাওয়াদকে খেতে দেয়। তাজওয়াদ উঠে যাওয়ায় তাকেও খাইয়ে দিতে থাকে। তাজওয়াদকে খাওয়ানোর সময় খেয়াল করে জাওয়াদ মাছ-মাংস কিছুই খেতে পারছে না। ডাক্তার তার ডান হাত প্রয়োজন ব্যতীত নড়াতে নিষেধ করেছে। এতদিন হসপিটালে মিসেস শেখ, জিনিয়া জাওয়াদকে খেতে সাহায্য করত। কিন্তু আজ তো তারা কেউ নেই।
এত লোভনীয় খাবার সামনে থেকেও না খেতে পেরে জাওয়াদ দুঃখী দুঃখী মন নিয়ে পূর্ণতার দিকে তাকিয়ে থাকে। বিষয়টা তাজওয়াদও লক্ষ্য করে। তাই সে তার নিজের মুখের খাবার টুকু গিলে পূর্ণতাকে বলে–
—”মাম্মা, পাপা তো খেতে পাচ্চে না। পাপাল হাতে তো ব্যতা। তুমি পাপাকেও আমাল মতো খাইয়ে দাও না।”
পূর্ণতা তার কথায় কোন প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে তাজওয়াদের মুখে আরেকটা লোকমা ভাত দেয়। জাওয়াদ তার নীরবতাকে অসম্মতি ভেবে টেবিল ছেড়ে উঠে যেতে নিলে, পূর্ণতা বলে–
—”চুপচাপ বসুন, তাজওয়াদকে খাইয়ে তারপর দিচ্ছি আপনাকে খাইয়ে।”
অপ্রত্যাশিত কিছু পেয়ে যাওয়ার খুশিতে জাওয়াদের মনটা বাক-বাকুম করতে থাকে। সে ভদ্রলোকের মতো চুপচাপ বসে অপেক্ষা করতে থাকে। তাজওয়াদকে খাইয়ে মুখ ধুইয়ে দিতেই সে দৌড়ে সোফায় গিয়ে বসে বসে কার্টুন দেখতে থাকে।
পূর্ণতা জাওয়াদের প্লেটে আগে মাছ তুলে নেয়। অর্ধেকটা ভাত মাছ দিয়ে খাওয়ানোর পর, মাংস নেয়। একের পর এক লোকমা দিয়ে জাওয়াদকে খাওয়ানো শেষ করে পূর্ণতা। তারওর হাত ধোয়ার জন্য উদ্যত হলে জাওয়াদ তাকে থামিয়ে দেয়।
পূর্ণতা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালে জাওয়াদ বলে–
—”আমাদের খাওয়ালে, কিন্তু তুমি তো খেলে না। আটটা বাজতে চলেছে। খেয়ে নাও।”
—”বাসায় গিয়ে খাবো। হাত ছাড়ুন।”
—”না খেলে কিন্তু আজ বাসায় যেতে দিবো না।”
—”জোর করবেন না প্লিজ, ভালো লাগছে না। বাসায় গিয়ে শাওয়ার নিয়ে তারপর খাবো।”
—”এখানেই নাও শাওয়ার।”
—”শাওয়ারের পর পরবো কি? আপনার শার্ট-প্যান্ট? আমার ড্রেস আছে এখানে?”
প্রচন্ড রাগ ও বিরক্তি নিয়ে দাঁতে দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলে পূর্ণতা। মুহূর্তেই জাওয়াদ চোখে-মুখে দুষ্টু ভাব নিয়ে বলে–
—”তুমি পরলে আমি মানা করবো নাকি? আমার যা তা সবই তো তোমার।”
আবার! আবার শুরু হলো সেই অসভ্য মার্কা কথাবার্তা। পূর্ণতা নিজের হাত জাওয়াদের থেকে ছাড়াতে মোচড়ামুচড়ি করতে থাকে। কিন্তু জাওয়াদ ছাড়ে না। উপরন্তু সে এবার কোমল গলায় অনুনয় করে বলে–
—”অল্প কিছু খাও। সেই দুপুরে লাঞ্চ করেছো, তারপর তো কিছু খাওনি। এখনও বাসায় যেতে যেতে আরো দেড়-দুই ঘন্টা লাগবে। জেদ করো না প্লিজ।”
ইদানীং পূর্ণতা জাওয়াদের কোন কথাই না রেখে পারছে না। আজব তো! তার সেই রাগী, ঘাড়ত্যাড়া সত্ত্বাটা কোথায় গেলো? এই লোকই বা এত সুন্দর করে আদর আদর নিয়ে রিকুয়েষ্ট করছে কেন? এমন করে বললে, কাউকে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব?
পূর্ণতা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জাওয়াদকে খাওয়ানো প্লেটেই অল্প একটু ভাত আর তরকারি তুলে নিয়ে খেতে থাকে। বিষয়টা দেখে জাওয়াদের মুখে একটা স্বস্তির হাসি ফুটে। জাওয়াদ আর পূর্ণতাকে বিরক্ত করে না। মুখ ধুয়ে নিয়ে নিজে নিজেই ওষুধ খেয়ে ছেলের সাথে ড্রয়িং রুমে বসে থাকে।
পূর্ণতা খেয়ে সব গুছিয়ে তাদের কাছে আসে। খাওয়ার পর সে একটু এনার্জি পেলেও, সীমাহীন ক্লান্ত লাগছে। হাত-পা দলা-মোচড়া হয়ে আসছে ক্লান্তিতে। সে তাজওয়াদকে বলে–
—”আসো বাবা, বাসায় যেতে হবে। রাত হয়ে যাচ্ছে অনেক।”
তাজওয়াদের মুখটা মুহূর্তেই কালো হয়ে যায়। সে ভেবেছিল আজ তারা বাবার সাথেই থাকবে, কিন্তু মাম্মা তাকে নিয়ে যাচ্ছে। সে মন খারাপ নিয়ে প্রশ্ন করে–
—”মাম্মা, আজ আমলা পাপাল সাথে থাকব না?”
—”না সোনা। মাম্মার কাজ আছে বাসায়। অন্য একদিন থাকব।”
তাজওয়াদ বাবার থেকে বিদায় নেওয়ার সময় জড়িয়ে ধরে তাকে। জাওয়াদ ছেলেকে আদরে আদরে ভরিয়ে দেয়। তারপর তার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে বলে–
—”খুব শীঘ্রই আমরা একসাথে থাকব আব্বু ইনশা আল্লাহ। তুমি মন স্যাড করে রেখো না, তাহলে পাপার বুকে ব্যথা হয় জান বাচ্চা। “
তাজওয়াদও জাওয়াদের মতো ফিসফিসিয়ে বলে–
—”সততি?”
—”হুম, তিন সত্যি। এবার একটু হাসো তো।”
তাজওয়াদ পাপাকে প্রাণখোলা একটা হাসি উপহার দেয়। তারপর তারা বিদায় নিয়ে চলে যায় নিজেদের বাসায়।
ছেলেকে হারিয়ে পূর্ণতা যখন পাগলপ্রায় তখনই তার ফোনে একটা অজ্ঞাত নাম্বার থেকে কল আসে। পূর্ণতা ক্ষীণকাল বিলম্ব না করে কলটা রিসিভ করলে অপরপাশ থেকে একটা ভারিক্কী গলায় প্রশ্ন করে–
—”ছেলে হারিয়ে কেমন লাগছে মিসেস জাওয়াদ শেখ?”
—”কে আপনি? কেন আমার ছেলেকে কিডন্যাপ করেছেন? কি চাই আপনার? টাকা?আমি আমার সব সম্পত্তি আপনাকে দিয়ে দিবো, তাও আমার ছেলেকে কিছু করবেন না প্লিজ।”
—”টাকা-পয়সা যা আছে আলহামদুলিল্লাহ বউ-বাচ্চাদের নিয়ে সুখের জীবনপাত করতে পারব। এবার ভিন্ন কিছু চাই।”
—”কি চাই বলুন? যা চাইবেন সব দিয়ে দিবো। তাও আমার সন্তানকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিন।”
কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলে পূর্ণতা। ফোনের অপর পাশের ব্যক্তিটি এবার নিজের হেয়ালিপনা ছেড়ে গম্ভীর গলায় বলে–
—”যদি বলি আপনাকে চাই মিসেস জাওয়াদ শেখ? সারাজীবনের জন্য। তাহলে পাবো কি?”
লোকটির কথা শুনে পূর্ণতা অবাক হয়ে যায়। সে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে–
—”আমি ম্যারিড। আমার স্বামী-সন্তান আছে।”
—”স্বামী মানেন বুঝি মি.জাওয়াদ শেখকে? মানলে আজ আমায় এই পদক্ষেপ নিতে হতো না।”
—”কে আপনি? কেন এমন করছেন? কি শত্রুতা আমার আপনার সাথে?”
—”কোন শত্রুতা তো নেই। কিন্তু আপনি তৈরি করতে চাইছেন বলেই শত্রুতামি করছি। আর কে আমি? ছেলে হারানোর শোকে কি নিজের স্বামীর কণ্ঠস্বরও ভুলে গেলেন মিসেস জাওয়াদ শেখ?”
এবার যেন পূর্ণতার মাথায় বিনা মেঘে বর্জ্যপাত হয়। পূর্ণতা সত্যিই ছেলের শোকে এতটা শোকাহত হয়ে পড়েছিল যে, তাকে কল করা ব্যক্তিটির কণ্ঠস্বরও তেমন একটা খেয়াল করে না। যদি করত তাহলে সে বহু আগেই তার সকল দুঃশ্চিন্তার অবসান ঘটত।
—”জা..ওয়াদ, আপনি তাজওয়াদকে কিডন্যাপ করেছেন?”
—”ইয়েস মাই লাভ।”
[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্প প্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন।]
শব্দসংখ্যা ~ ২৫০০
চলবে?
[ক্যাসা লাগা মেরা ঝাটকা?😁🐸 জাওয়াদকে এত ভালো ভাবার দরকার নেই, ব্যাডা বহুত খ্রাপ🥱
গত পর্বের থেকেও বড় করে দিয়েছি। সবাই বেশি বেশি রেসপন্স না করলে এখন থেকে আরো দেরি করে দিবো।🥱 এমনিতেও ২৬ তারিখ থেকে আমার পরীক্ষা। 🥲💔
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]
Share On:
TAGS: শেষ পাতায় সূচনা, সাদিয়া সুলতানা মনি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩৯.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪৩.২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩৬
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১০
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৬
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪৪.২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৮
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪৫.১