ক্যাপ্টেনভিহানআরভিদ
লেখনীতে_সাদিয়া
পর্ব_৮
আশুজিয়া, নেত্রকোনা।
কেন্দুয়া উপজেলার উন্নত এক গ্রাম। যার এক পাশে যেমন দালানকোঠা, আধুনিক স্থাপনা, ব্যবসা বাণিজ্য এবং কি শহুরে পরিবেশ রয়েছে। আরেক পাশে সবুজ ধান ক্ষেতের অপার গ্রামীণ সৌন্দর্যও দৃশ্যমান। একই সাথে দুই রঙ এর সৌন্দর্যে নিজেকে সাজিয়েছে আশুজিয়া।
ভিহান ৪৫/৫০ গতিতে বাইক টানছে। এর বেশি এই গাধা মেয়েকে নিয়ে চলা সম্ভব নয়। দেখা যাবে বলদ টা সেবারের মতো আঠার মতো লেগে থাকবে তার সাথে। মাথামোটা টা বুঝে না তো কিছুই বলদের মতো এটা ওটা করে ভিহানের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙ্গতে উস্তাদি করবে। মাথামোটা স্টুপিড একটা।
চুপচাপ ভিহান বাইক টানছে। পিছনে রাহা এত দিন পর বাইকে উঠতে পারছে বলে খুশি খুশি বসে আছে। ভিহান ভাই এর সাথে বাইকে উঠতে তার বড্ড ভালো লাগে। জিদান ভাই টা জানি কেমন। এসব বাইক টাইককে তার এত আগ্রহ নেই। পারে শুধু চারচাক্কা নিয়ে ঘুরতে। যদিও বেসমেন্টে ভিহান ভাই এর পুরনো কিছু বাইক মাঝেমাঝে চালায়। এদিকে বাইক রাহা খুব পছন্দ করে। খোলামেলা আবহাওয়ায় কি সুন্দর ভাবে চলা যায়। মুক্ত বাতাসে মিশে যাওয়া যায় একেবারে। মনটা চায় পাখির মতো উড়ে যেতে ওই নীল আকাশে। কিন্তু বজ্জাৎ ভিহান ভাই টা কিছুতেই তাকে বাইকে উঠাতে চায় না। রাহা চোখ মুখ কুঁচকে ভিহান ভাই এর পিছন থেকে উনার দিকে তাকিয়ে অনবরত মুখ ভেংচায়। বজ্জাৎ খবিশ লোক।
মেইন রাস্তায় গাড়ি উঠতেই ভিহান সতর্কতার সাথে বাইক টান দিলো। পিছনে যে এক পিচ্চি বসে। চলতে চলতে হঠাৎ রাহা চেঁচিয়ে উঠল,
“ভিহান ভাই, থামুন থামুন দয়া করে থামুন। আহহা থামুন না প্লিজ।”
হঠাৎ রাহার এত হম্বিতম্বিতে তে ভিহান দ্রুত করে ব্রেক কষল। সঙ্গেসঙ্গে লাফ দিয়ে রাহা বাইক থেকে নেমে গেলো রাস্তায়। ভিহান হেলমেট খুলে কপাল কুঁচকে তাকালো রাহার দিকে। তাকে এভাবে তাকাতে দেখে রাহা আগেআগেই বলল,
“দয়া করে এভাবে রাক্ষসের মতো তাকাবেন না ভিহান ভাই।”
রাহার নুয়ে যাওয়া মুখের দিকে ভ্রুকুটি করে তাকিয়ে ভিহান দাঁতে দাঁত চাঁপল।
“কি বললি?”
“আ আমার ভয় হয় আপনার ওমন চাউনি দেখলে। কখন না গিলে ফেলেন।”
“তোকে গিলে ফেলারই দরকার ইডিয়েট। আস্তো গিলে ফেলা দরকার।”
রাহা ঢোক গিলল। মুখটা ছোট করে বলল, “সে না হয় বাড়ি গিয়ে গিলবে এখন আমায় টাকা দিন।”
রাস্তার মাঝে হাত পেতে দাঁড়ালো রাহা। ভিহান কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করলো,
“মাঝ রাস্তায় টাকা দিয়ে কি করবি?”
“ফুল কিনবো।”
ভিহান ঘাড় বাঁকিয়ে পিছন ফিরে তাকালো। দুই হাত পিছনে লাল টকটকে গোলাপ নিয়ে বসে থাকতে দেখা গেলো একজন লোককে। শক্ত অভিমুখে ভিহান সেই আবদার নাকোচ করে দিলো।
“আমার কাছে কোনো টাকা নেই।”
নাক মুখ উল্টে বলল রাহা, “এমন করেন কেন ভিহান ভাই? কোথায় আপনার কাছে টাকা নেই? আপনি না সরকারি চাকরি করেন? এতো কিপ্টে কেন আপনি? কিছু চাইলে একেবারে না করে দেন কুঞ্জসের মতো?”
“কি? শুনিনি আবার বল।”
“তো কি বলবো? সেদিনও আপনার কাছে একটা সামান্য পারফিউম চাইলাম আর আপনি মুখের উপর মানা করে দিলেন। আজ ফুল কিনের জন্যে টাকা চাইছি তাও দিচ্ছেন না।”
“তোর কি মনে হয় ওটা সামান্য পারফিউম?”
“তা নয়তো কি?”
“তোর মতো বলদ কে বিক্রি করলেও ওই পারফিউমের দাম উসুল হবে না।”
রাহার মুখটা ভোতা হয়ে গেলো। এই লোকটা সবসময় তাকে অপমান না করলে বুঝি উনার পেটের ভাত হজম হয় না। এই মুহূর্তে রাহার রাগ হলেও গোলাপ গুলির প্রতি বড্ড লোভ হচ্ছে। তাই বলল,
“ঠিক আছে মানলাম আমার কোনো মূল্য নেই। তবুও রাস্তার পথচারী ভেবে আমাকে দয়া করে কিছু টাকা দিন নয়তো গোলাপ কিনে দিন।”
“আমি এত বড়লোক নই। আর না তো দয়ালু। অপাত্রে দান করতে পারবো না।”
রাহার মুখটা রাগে অপমানে ফোলে গেলো। লাল হয়ে আসলো। ভিহান জানে এই মেয়ে রাগ করলে কান্না করলে টকটকে লাল চেরির মতো হয়ে যায়। তখন ওর মুখটা দেখলে ভিহানের বড্ড ভালো লাগে। খুব লোভ হয় একটু কামড়ে দেওয়ার। ভিহান রাহার ওই লাল মুখ দেখে ভেতরে ভেতরে হাসে।
“এমন করছেন কেন? দিন না একটা গোলাপ ফুল কিনে।”
ভিহান ঘাড় বাঁকিয়ে রাহার থেকে নজর সরিয়ে অন্য দিকে তাকায়। মনে মনে বিড়বিড় করে,
“তুই নিজেই তো সদ্য ফোটা এক ফুল। তোকে আর কি ফুল কিনে দিবো আমি?”
রাহা আবারও আহ্লাদী স্বরে বলে উঠে,
“ভিহান ভাই, কিনে দিন না একটা ফুল।”
“তুই কি আমার প্রেমিকা? তোকে আমি কেন ফুল কিনে দিতে যাবো?”
অবুঝ রাহা সেসব আমলে না দিয়ে তর্ক করার সুরে বলল, “বারে, আমি না আপনার চাচাতো বোন লাগি? আমাকে একটা ফুল কিনে দেওয়া যায় না?”
“না যায় না। ওই লাল গোলাপ কেবল প্রেমিকা আর বউ কেই দেওয়া যায়। তোর মতো কোনো গরু কে নয়।”
রাহার মুখটা এবার কাঁদোকাঁদো হয়ে এলো। ভিহান বুঝলো এই মেয়ে নির্ঘাত এবার রাস্তার মাঝে কেঁদে বসবে। পরে না পাবলিকের দোলানি খেতে হয়। ভিহান রাহার দিকে তীক্ষ্ণ এক নজর নিক্ষেপ করে এগিয়ে গেলো ফুল বিক্রেতার কাছে। রাহা তখনো বাইকের সামনে দাঁড়িয়ে। ভিহান ওর দিকে তাকিয়ে বলল,
“কয়টা লাগবে?”
“যত গুলি দিবেন আপনি।”
“পুরো ঝুড়ি তুলে দেই তোর মাথায়?”
রাহা এবার আর জবাব দিলো না। লোকটা আস্তো একটা খচ্চর। সোজা কথাও কেমন রসকষহীন ভাবে বলবে যেন জীবনেও মধুর ধারে কাছে যায় নি।
ভিহান হাতে টকটকে লাল কয়েকটা গোলাপ নিয়ে এগিয়ে এলো রাহার কাছে। রাহা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল সেদিক। ভিহান ভাই কে দারুণ দেখাচ্ছে ফুল হাতে। সে কল্পনার জগতে বসিয়ে নিলো ভিহান ভাই ফুল হাতে মাটিতে হাটু গেড়ে বসে আছে। কাউকে যেন মিষ্টি সুরে নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করছে। তার ভাবনার ছেদন ঘটিয়ে ধমকের সুরে বলে উঠল ভিাহন,
“ধর।”
হকচকিয়ে গেলো রাহা। ফ্যালফ্যাল করে তাকালো ভিহান ভাই এর দিকে। কি ভাবছিলো আর কি হলো? রাহা কে বোকার মতো তাকিয়ে থাকতে দেখে সরু গলায় ভিহান বলল আবারও,
“ধরবি? নাকি আবারও ফিরিয়ে দিয়ে আসবো?”
এমন কথা শুনে হকচকিয়ে গেলো রাহা। দ্রুত করে টকটকে টাটকা ফুল গুলি তুলে নিলো হাতে। সঙ্গেসঙ্গে মুখে ফুটে উঠল একটা মিষ্টি হাসি। ভিহান এক নজরে সে হাসির দিকে তাকিয়ে রইল। মনে মনে বলল,
“তোর এই হাসির জন্যে আমি ভিহান পুরো পৃথিবীর সঙ্গেও লড়তে রাজি, মাই বাটারফ্লাই।”
ফুলের গুচ্ছ গুলি রাহা নাকের কাছে ধরল। মাতালের মতো সুভাস টেনে নিলো। গাল গুলি গোল গোল করে হাসলো আবারও। সেই হাসি দেখে ভিহান মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে হাসল।
বারবার রাহা নাক টেনে টেনে ফুলের ঘ্রাণ নিলো। হাস্যোজ্জ্বল চোখে গোলাপের পাপড়িতে হাত বুলিয়ে বলল,
“ধন্যবাদ ভিহান ভাই। অনেক অনেক ধন্যবাদ।”
ভিহান কোনো জবাব দিলো না। রাহা গোলাপে হাত বুলাতে বুলাতে জানতে চাইল,
“আচ্ছা ভিহান ভাই এখানে সতেরো টা গোলাপ কেন?”
ভিহান বাইকে উঠতে উঠতে বলল, “তোর মতো ইডিয়েটের মাথায় ওসব ঢুকবে না। উঠে পড়।”
“বলুন না ভিহান ভাই।”
“….
“সতেরোটাই কেন গোলাপ?”
“আমার ইচ্ছে হয়েছে তাই। সময় হলে বাকি আরেকটাও পেয়ে যাবি। এবার উঠ।”
বলতে বলতে টিপটিপ করে হঠাৎ বৃষ্টি নামতে শুরু করল। বৃষ্টির ফোঁটা পেতেই রাহা লাফিয়ে হেসে উঠল। হাত বাড়িয়ে এক এক ফোঁটা তুলে নিতে লাগলো হাতের তালু তে। তা দেখেই ভিহানের চোখ মুখ শক্ত হয়ে এলো। তাকিয়ে দেখল রাহার গায়ে সাদা কলেজ ড্রেস। পুরো সাদা শুধু কোমরের বেল্টটা লাল। এই বলদ এই সাদা কাপড়ে বৃষ্টিতে ভিজবে? অসম্ভব। তার আজোও মনে আছে সেই দিনটার কথা। সেই ক্ষণের শিহরণের কথাও ভুলেনি ভিহান।
মুহূর্তে ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করল। ভিহান তাকিয়ে দেখল রাহা এক হাতে ফুল নিয়ে আরেক হাত বাড়িয়ে দিয়েছে খোলা আকাশের নিচে বৃষ্টি ছুঁয়ে দিতে। একটু একটু করে যে ভিজচ্ছে সে দিকে গাধাটার খেয়াল নেই। ভিহান বাইক থেকে নেমেই রাহার কব্জি চেঁপে ধরে হেঁচকা টান দিলো। হাত দশেক দূরে একটা ছাউনি দেখা গেলো বাসস্টপের। রাহা কে নিয়ে দৌড়ে সেখানে গিয়েই উঠল। এই অল্প সময়েই গা অনেকটা ভিজে গিয়েছে। ছাউনির নিচে আসতেই ভিহান নিজের পোশাক ঝাড়তে শুরু করল। রাহার সাড়াশব্দ না পেয়ে ঘাড় বাঁকিয়ে পিছন ফিরল। দেখল মেয়েটা ছাউনির ভেতরে থেকেও হাত বাড়িয়ে নিঃশব্দে বৃষ্টি বিলাসে মগ্ন। ভিহান বিরক্তির সাথে ওর কব্জি তে আবারও টান দিয়ে বেঞ্চ এর কাছে নিয়ে আসে। শক্ত গলায় বলে,
“ভিজে যাবি। বোস এখানে।”
মুখ গোমরা করে উত্তর করে রাহা, “ভিজবো না তো। ভেতরেই আছি। শুধু একটু বৃষ্টি ছুঁবো।”
“এভাবেই ভিজে যাবি। চুপ করে বোস এখানে।”
রাহা বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে তাকালো ভিহান ভাই এর দিকে। ভ্রু উঁচু করে ভিহান কটমট চোখ করে তাকাতেই রাহা চুপসে যায়। নাক ফুলিয়ে গিয়ে বেঞ্চে বসে। আর ভিহান রাহার থেকে দূরত্ব নিয়ে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ফোন ঘাঁটতে শুরু করে দেয়।
একটু পরই একটা লোক প্রায় ভিজে ভিজে অবস্থায় ছাউনির নিচে চলে এলো। হাতে বড় একটা ফ্লাক্স, বিস্কুট সহ নানান খাবার। বোধহয় ঘুরে ঘুরে চা বিক্রি করে। লোকটাকে আসতে দেখেই ভিহান চটজলদি করে রাহার কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ালো। লোকটা অবশ্য তাদের থেকে অনেকটা দূরে নিচেই বসল ফ্লাক্স আর জিনিসপত্র নিয়ে। ভিহান চা আছে কি না জিজ্ঞেস করলে লোকটা হেসে হ্যাঁ জানায়। এক কাপ চায়ের কথা বলে ভিহান ফোনের থেকে চোখ সরিয়ে একটাবার রাহার দিকে তাকালো। মেয়েটা গাল ফুলিয়ে দুই গালে দুই হাত চেঁপে আনমনে বৃষ্টির ফোঁটার দিকে তাকিয়ে আছে। তার ভয়েই যে বৃষ্টিতে হাত বাড়াচ্ছে না এটা তার বেশ জানা। মেয়েটা বৃষ্টির দিন চা পছন্দ করে খুব তাও তার জানা। মোদ্দা কথা এই রাহার ভালো লাগা অপছন্দ সুবিধা অসুবিধা আগাগোড়া সব ভিহানের জানা। একেবারে মুখস্থ।
“চা খাবি?”
রাহা করুণ মুখে তাকায় ভিহানের দিকে। ওদিকে বাহিরে ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে। আর রাহার এমন চোখ মুখ দেখে শক্ত ভিহানের ভেতরও কেমন নড়ে। গলা শুকিয়ে আসে। এই বেয়াদপ টা সবসময় তাকে অধৈর্য করে তুলে সে যেভাবেই হোক। শুকনো ঢোক গিলে ভিহান ঘাড় বাঁকিয়ে নেয়। এই আগুনের দিকে বেশিক্ষণ তাকালে সে ঝলসে যাবে নিশ্চিত।
“ইডিয়েটের মতো না তাকিয়ে চা খাবি কি না সেটা বল স্টুপিড।”
“চা সেটাও আবার সাধতে হয়? কে আবার এই দিনে চা না খায় ভিহান ভাই?”
শ্লথ কন্ঠে বলল রাহা।
ভিহানও শান্ত গলায় জবাব দিলো, “ঠিক তোর মতো স্টুপিড কিছু বাচ্চারা।”
কপাল কুঁচকে নিলো রাহা, “আপনি আমাকে বাচ্চা বলছেন ভিহান ভাই?”
“বাচ্চা কে তো বাচ্চাই বলবো। আগাগোড়া আস্তো একটা পিচ্চি।”
“এটা কিন্তু ঠিক না ভিহান ভাই।”
“একদম এখানে গাল ফুলাবি না। কানের গোড়ায় তাহলে একটা খাবি।”
রাহা আর কিছু বলল না। তবে ঠিকি গাল ফুলিয়ে চুপটি করে বসে রইলো। আড়চোখে সেসব দেখল ভিহান। ভালো হয়েছে এখন আর না জ্বালিয়ে চুপচাপ বসে থাকবে।
“ধর।”
“খাবো না।”
“ধরতে বললাম তো।”
“বললাম তো খাবো না।”
“আমার দিকে তাকা।”
ভিহান ভাই এর গম্ভীর শক্ত কন্ঠে রাহা সত্যিই মাথা উঁচু করে তাকালো। ওই চোখ আর তীর্যক চাউনি দেখে রাহা মনে মনে বলতে লাগল, “খবিশ খাডাস একটা। সবসময় জালেমগিরি করবে আমার সাথে।”
“মনে মনে আমায় না বকে চা টা ধর।”
একটু চমকালোই রাহা। ঢোক গিলে চা টা তুলে নিলো হাতে। চায়ের ঘ্রাণটা খুব ভালো লাগছে এই মুহূর্তে। দেখলো ভিহান ভাই তার পাশে দূরত্ব নিয়ে বসেছে।
রাহা বৃষ্টির দিকে আনমনে তাকিয়ে চা টা মুখে দিবে তার আগেই ভিহান কাপে হাত আটকে বাঁধা দিলো।
“খবরদার খাবি না।”
রাহা বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে নিয়েছে। আশ্চর্য নিজেই যেচেপড়ে চা দিলো এখন আবার বাঁধাও দিচ্ছে। রাহার মেজাজ খানিকটা তেঁতে উঠল। বিরক্তির সাথে বলল,
“কি ভিহান ভাই? আপনি নিজেই চা দিয়ে আবার নিজেই খেতে বারণ করছেন? তাহলে দিয়েছিলেন কেন?”
সেসবে ভিহান পাত্তা না দিয়ে শান্ত সূক্ষ্ম গলায় জবাব দিলো, “একটু ঠান্ডা হোক পরে খাবি। এই প্লেসে এই সময়ে তোর হা হু সহ্য করবো নাকি আমি?”
আবারও ভিহান ভাই সামনে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে চায়ে চুমুক দিলো। এদিকে রাহা তখনো সন্দিহান নজরে তাকিয়ে ভিহান ভাই এর দিকে। বিষয়টা বুঝেও ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বুক টানটান করে নিজের মতো বসে আছে ভিহান।
সেদিনও পরিবেশে এভাবে ঠান্ডা আবহাওয়া বইছিলো। তবে বৃষ্টি ছিলো না। তখন রাহার ১৪ বছর। ভিহানের আজও স্পষ্ট মনে আছে। ড্রয়িংরুমে বসে রুশমি জিদান কামিলি রাহা বসে ছিল নাস্তা নিয়ে। সবাই চা খাচ্ছিল। রাহাও এক কাপ তুলে নিয়েছিলো। প্রথম চুমুক দিয়েই মুখের চা কোলের উপর ফেলে দিলো। তা দেখেই বিরক্তিতে চোখমুখ কুঁচকে নিয়েছিলো ভিহান। এরপরই হু হা করা শুরু করে দিয়েছিল মেয়েটা। ঠোঁট গোল করে হু হা করছিলো আর অনবরত হাত নাড়ছিলো।
“জ্বলে গেলো। ভিহান ভাই আমার ঠোঁট আর জিহ্ব জ্বলে গেলো। ফু দিন তাড়াতাড়ি ফু দিন।”
রাহার রক্তাভ ঠোঁটের দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে ভিহান ফু দেওয়া ভুলে গিয়েছিলো। ওর মুখ আর এক্সপ্রেশন দেখে ওর বুক যে ধকধক করা শুরু করে ছিলো সেটা ওই বোকাটা কোনো ভাবে বুঝেনি। আর না বুঝবে কখনো।
বৃষ্টি কমার পর ভিহান রাহা কে কলেজ গেইটের সামনে পৌঁছে দিলো। তর্জনী আঙ্গুল তুলে ভয়াবহ কন্ঠে হুশিয়ারিও দিয়ে গেলো,
“বৃষ্টি থাকলে কলেজ ছুটির পর দাঁড়িয়ে থাকবি। কিন্তু এই ড্রেসে ভিজে বাড়ি ফিরবি না বলে দিলাম। জিদান এসে বাড়ি নিয়ে যাবে। আই রিপিট এগেইন, ভিজে বাড়ি ফিরবি না স্টুপিড।”
এরপরই এক টান দিয়ে ভিহান অদৃশ্য হয়ে গেলো। রাহা তখনো ভিহান ভাই এর যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইল। ভিহান ভাই টা আসলেই অন্য রকম। উনার উচ্চতা ফুলো বডি চোখ ফেরানোর মতো না। তাকালে মন চায় শুধু তাকিয়েই থাকতে। অবুঝ বেখেয়ালি রাহা মনে মনে বলে উঠল,
“ইশশ ভিহান ভাই এত সুন্দর কেন?”
দুপুর দিকে ভিহান বাড়ি ফিরলো। এখনো রুশমি এরা কেউ বাড়ি ফিরেনি। বাহিরে আজ আবার একটু একটু ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। ওই স্টুপিড টা নিশ্চয়ই এই হাল্কা বৃষ্টিতে নাচতে নাচতে বাড়ি ফিরতে চাইবে। ভিহান বাইক থেকে নেমেই জিদান কে কল দিলো।
“হ্যাঁ ভাইয়া বলো।”
“আছিস কোথায়?”
“আরদের অফিসে।”
ভিহান নিজের হাত ঘড়িতে সময় দেখে নিয়ে বলল “আধঘণ্টার মাঝে কলেজ ছুটি হবে ওকে নিয়ে বাড়ি ফিরবি।”
জিদান যেন বুঝলো তবুও রসাত্মক কন্ঠে শুধালো,
“ওকে মানে কাকে ভাইয়া?”
চতুর ভিহানও বুঝল ফাজিল টা তার সাথে মশকরা করতে চাইছে। তাই হীম গলায় জানাল, “বাসায় আয়। হাড়েহাড়ে বুঝিয়ে দিবো। শুধু মনে রাখিস এই বৃষ্টি তে ভিজে যদি বাড়ি ফিরেছে ও তবে আজকে তোর জন্যে বাড়ি হারাম করে দিবো আমি। “
“ঠিক আছে ঠিক আছে ভাইয়া। বুঝেছি আমি। কিন্তু শুধু রাহা কেই কি নিয়ে আসতে হবে ভাইয়া? আর কাউকে না? মানে রুশমি কামিলি..”
জিদানের ইনটেনশন বুঝে দাঁত কটমট করলো ভিহান, “মনে হচ্ছে কানের গোড়ায় অনেকদিন তোর কিছু পড়ে না।”
এরপর নিজেই ফোন কেটে বাড়িতে ঢুকল। হাতের ব্যাগটা এগিয়ে দিলো মায়ের কাছে। পরক্ষণে কি বুঝে নিজেই দিয়ে এলো কিচেনে।
“এ গুলি কি বাপ?”
ভিহান হনহন করে চলে যাচ্ছিলো। মায়ের কথায় জবাব দিলো, “নিজেই দেখে নাও।”
আফসানা বেগম ব্যাগ খুলে হতবাক হয়ে যান। বিস্ফোরিত কন্ঠে বলে উঠেন, “কিরে বাপ এসব কি?”
“কেন মা দেখতে পাচ্ছো না নাকি?”
“মানে তুই এতো গুলি ডিম আনলি কেন? কি বুঝে এতো গুলি দেশি মুরগির ডিম আনলি বাপ?”
“ওই স্টুপিড টা নাকি দেশি মুরগির ডিম ছাড়া খেতে চায় না।”
আফসানা বেগম হতভম্ব কন্ঠে বললেন, “তাই বলে এত গুলি? কয় হালি এখানে?”
“মাত্র পঞ্চাশ হালি।”
ভিহানের কথা শুনে চোখ বের হয়ে আসছে আফসানা বেগমের। ছেলে কি উনার পাগল হলো নাকি? এত ডিম কি মনে করে আনতে গেলো এই ছেলে? মা ছেলের কথা শুনে রাহার মা জাহানারা বেগমও এগিয়ে এলেন। তিনিও হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
বিস্ময় কাটাতে না পেরে আফসানা বেগম বললেন, “এত গুলি কেন আনলি বাপ? এখন এগুলি আমি কোথায় রাখি?”
“কেন? ফ্রিজে জায়গা নেই? নতুন আরেকটা এনে দিতে হবে?”
আফসানা বেগম এবার আরো চমকে উঠেন। চোখ কোঠার থেকে বের হয়ে আসবে। ডিম রাখার জন্যে ছেলে কি আবার ফ্রিজ আনবে? অবাকের চরম সীমায় পৌঁছে তিনি মৃদু চিৎকার করে উঠেন “কী” বলে। জাহানারা বেগম হতভম্ব হয়ে মা ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন।
এদিকে ভিহান হাত ঘড়ি খুলতে খুলতে সিঁড়ির দিকে পা বাড়িয়ে বলল, “বাড়িতে দুই তিন টা ফ্রিজ থাকার পরেও এই সামান্য ডিম গুলি রাখার যদি জায়গা না হয় তবে ডিম যেহেতু এনেছি রাখার ব্যবস্থাটাও তো আমায় করে দিতে হয়।”
চলমান….
সবাই রেসপন্স করে যাবেন। আশানুরূপ সারা পেলে পরের পর্ব দ্রুত দিয়ে দিবো ইনশাল্লাহ 😌
Share On:
TAGS: ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ, সাদিয়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ পর্ব ১৫
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ৩
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ২৩
-
ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ পর্ব ৯
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ১৫
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ৩১
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ৩৯
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ৯
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ১১
-
ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ পর্ব ৪