ক্যাপ্টেনভিহানআরভিদ
লেখনীতে_সাদিয়া
পর্ব_৬
ভিহানের চোখ দুটি অগ্নি টুকরোর মতো হয়ে আছে। তপ্ত ভাব ঠিকরে পড়ছে যেন। ঝলসানো ওই দৃষ্টিতেই না শারহান কে ভষ্ম করে দেয়। ক্ষিপ্ত ভঙ্গিতে সে শারহানের গলা চেঁপে ধরে আছে। একেবারে পিঁষে ফেলা ভঙ্গিতে হিসহিস করে জানালো,
“ওর দিকে চোখ তুলে তাকালে ওই চোখ উপড়ে ফেলতে আমি ভিহান ভাবি না। নিজের চোখ বাঁচিয়ে রাখ বাস্টার্ড।”
শারহান গলার ব্যথায় চোখমুখ জড়ো করে আনে। ক্লেশ কন্ঠে বলে, “ইয়ার ছাড় আমায়। ব্যথা পাচ্ছি ভীষণ।”
ভিহানের কানে কোনো কথা বুঝি ঢুকছে না। কর্ণকুহরের পাতলা পর্দায় বারবার প্রতিধ্বনি হয় শারহানের পছন্দ হয়েছে রাহা কে সেই কথাটা।
শারহান ক্ষীণ গলায় বলল আবারও, “ভিহান গলাটা ছাড়। মেরে ফেলবি নাকি?”
দাঁতে দাঁত কটমট করে ভিহান ছেড়ে দিলো। ওর ওই তীক্ষ্ণ শকুনি দৃষ্টি দিয়ে দেখে নিলো শারহান কে। একটু দূরে গিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
“ওর সুরক্ষার জন্যে মানুষ খু*ন করতেও আমার হাত কাঁপবে না।”
ভিহানের এই কথা শুনে চমকে যায় শারহান। চোখ দুটি বড়বড় করে তাকিয়ে থাকে ভিহানের দিকে। তাকে দেখতে এখন একদম স্বাভাবিক লাগছে। কি সাংঘাতিক ব্যাপারস্যাপার! মানুষ খুন করার মতো এত বড় একটা কথা বলেও সে কেমন নির্দ্বিধায় দাঁড়িয়ে আছে। যেন মানুষ খুন করা তার দুধ ভাতের ব্যাপার। ভিহান কে দেখে এবার শারহানের মনে হলো ও যেন ঠান্ডা মাথার কোনো এক খু*নী। শারহান ভয়ে ভয়ে ঢোক গিলল। গলাটা শুকিয়ে গিয়েছে তার। ভিহানের রুমে কাঁচের জগটা থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে ঢকঢক করে গিলতে লাগল। এরপর তৃপ্তির ঢোক ফেলে আতঙ্কিত নয়নে তাকালো ভিহানের দিকে।
কেমন সন্দিহানি গলায় প্রশ্ন করলো শান্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ল্যাপটপে হাত চালানো ভিহানের দিকে,
“এই ফিল্ডে কাজ করেও এমন টক্সিক তুই কবে থেকে হলি ভিহান?”
শারহানের প্রশ্নে ভিহানের হাত থেমে যায়। স্মৃতির পাতা উল্টে গমন করে সেই দিনটায় যেদিন রাহার জন্ম হয়েছে। কনকনে শীতের এক রাতে রাহা এই পৃথিবীতে এসেছে। ভিহানের বয়স তখন ৯ বছর। রাহা পৃথিবীতে আসার পর সে ভীষণ কৌতূহল আর আদরের সাথে রাহা কে দেখছিল। দুধের মতো ধবধবে তুলোর মতো তুলতুলে একটা ছোট্ট শরীর তখন ভিহানের সামনে। মোটা ছোট্ট কম্বল দিয়ে মুড়িয়ে রেখেছে। সবাই আদর করছে। ছোট্ট বাচ্চাটার গায়ের রং আর নরম আবাহ দেখা ভিহানের বড্ড লোভ হলো একবার ছুঁয়ে দেখার। সবার মতো কোলে তুলে নিয়ে জড়িয়ে ধরে আদর করার। ভিহান সেই লোভ সামলাতে পারেনি। ভেতরের উচ্ছ্বাস আর প্রবল ভালো লাগা থেকে ছোট্ট নরম মোলায়েম শরীরটাকে সেও কোলে তুলে নিয়েছিল। ভিহানের আজও মনে আছে জীবনের প্রথম এত ছোট্ট একটা বাচ্চা শরীর কে দুই হাতের আঁজলায় তুলে নেওয়ার সেই অনবদ্য অনুভূতি। সেই অনুভূতির রেশ ভিহান আজও রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনুভব করে। সেই মুহূর্তের কথা যতবার মনে পড়ে তার শরীর শিউড়ে উঠে। সেই ভালোলাগা নাম না জানা প্রথম অনুভূতির রেশ শিরশির করে তুলে তাকে। ওই ভালোলাগা ভেতরের আনন্দ সেই উচ্ছ্বাস আর উদ্দীপনা আজও ভিহান ভুলতে পারে না।
এই রাহা ছোট্ট বেলা থেকেই ভিহান কে জ্বালিয়ে আসছে। তার জীবনের সেই প্রথম দিন থেকে। যখন ভিহান খুব আগ্রহ আর আনন্দ নিয়ে রাহা কে কোলে তুলে নিয়েছিল। ভিহান অভিভূত হয়ে ফ্যালফ্যাল করে সদ্য জন্ম নেওয়া বাচ্চাটার মোলায়েম মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। ও কি দেখছিল কি ভাবছিল সে নিজেও বুঝি জানতো না। শুধু তুলতুলে শরীরটাকে আলতো করে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে রেখেছিল। তার একটু পরই রাহা ওর কোলে জীবনের প্রথম হিসু করেছিল। তা দেখে ভিহান হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল। সে কি রাগ তার। তার রাগ দেখে সবাই হেসে কুটিকুটি হয়েছিল। এতক্ষণ কোলে নেওয়ার জন্যে সে পাগল হয়েছিল তার কোলেই রাহা প্রথম হিসু করে দিয়েছে। বিষয়টা তখন নতুন মানুষ পৃথিবীতে আগমন করার আনন্দের সাথে বেশ উপভোগ করেছিল সবাই। ভিহানের স্পষ্ট মনে আছে। এই মেয়ের প্রতি তার বিরক্তির রেশ সেই প্রথম দিন থেকেই শুরু হয়েছিল।
সকালে খান বাড়ির টেবিলে সবাই এক সাথে নাস্তা করতে বসেছে। তিন গিন্নি সহ কাজের লোক কার কি লাগছে না লাগছে তা দেখা শুনা করছে। প্রতিদিন নাস্তা নিয়ে কারো কোনো অভিযোগ না থাকলেও একমাত্র বায়না করে রাহা। তবে আজ সে চুপচাপ খাবার খাচ্ছে। কিন্তু পাতে যেই ভয়েল ডিমটা পড়ল ওমনি রাহা গাল ফুলিয়ে মাকে বলল,
“আম্মু আমি ডিম খাবো না।”
জাহানারা বেগম ইশারায় ভিহান কে দেখিয়ে দিলো। রাহা তাকাতেই দেখলো ধারালো নয়নে তার দিকেই তাকিয়ে আছে রাগী লোকটা। যেন ওই নজরে তাকে ফালাফালা করে দিবে। না পারতেও রাহা মুখ গুমরা করে দৃষ্টি নত করলো। মুখে সবজি দিয়ে রুটি চিবোতে চিবোতে বিড়বিড় করছে। নিজের খাবার খেতে খেতে চোখ তুলে ভিহান সেসব দেখছে। নিশ্চিত এই মেয়ে বিড়বিড় করে তাকেই বকছে। কতবার এই মেয়ের উদ্ভট বকা আড়ালে শুনেও সে সহ্য করেছে তার হিসাবও করা যাবে না।
রাহার যতসব অদ্ভুত স্বভাব। ডিম পোচ খাবে তবে পল্টির ডিম ভয়েল খাবে না। আবার হাঁসের ডিম ভয়েল ঠিকি খায়। হাফ ভয়েল হলে তো কথাই নেই। আনন্দের সাথে আবার গপগপ করে গিলে। অথচ এই মেয়ের শরীরে খুব এলার্জী আছে। ভিহান সাফসাফ করে জানিয়ে দিয়েছে ওকে যেন প্রতিদিন হাঁসের ডিম না দেওয়া হয়। তাই ওর জন্যে বাজার থেকে দেশী মুরগির ডিম আনা হয়। এতদিন যারা ডিম দিয়ে যেতো তাদের নাকি খামার তুলে দিয়েছে। তাই বাসায় মুরগির ডিম আসছে না। এই জন্যে জাহানারা বেগম সুযোগ পেয়ে পল্টির ওই লাল ডিমই ভয়েল করে দিয়েছেন মেয়ের পাতে। আর যাই হোক তিনি জানেন ভিহানের সামনে এই মেয়ে বেশি তর্ক করবে না।
রাহা নাক তুলে বিরক্তির সাথে এক কামড় খেয়েই রেখে দিয়েছে ডিম। এই ডিমের কুসুম তার একদমই ভালো লাগে না। তাকে এমন নাক সিটকাতে দেখে ভিহান শক্ত উঁচু গলায় বলল,
“পুরোটা শেষ কর।”
রাহা নাক মুখ কুঁচকে আধো স্বরে বলল, “এই ডিম আমি খেতে পারি না।”
“পারি না সেটা আবার কি?”
“আপনি সব পারেন বলে সবাই যে সব পারবে এমন তো কোনো কথা না।”
জিদান মাঝে বলে উঠল, “পারি না এই শব্দটা বাংলা অভিধানে ছিলোই না ভাইয়া। ওটা নাকি তৈরি হয়েছে শুধু আমাদের রাহা রানীর জন্যেই।”
এ কথা শুনেই তেঁতে উঠল রাহা। গাল নাক ফুলিয়ে বলল, “ভালো হচ্ছে না কিন্তু ভাইয়া। তুমি আমায় অপমান করছো।”
“ছি ছি না না বোনু। আমি তো শুধু বলতে চাইছি পারি না শব্দটাও তোর সামনে এসে লজ্জা পায়।”
রাহা কাঁদোকাঁদো মুখ নিয়ে রায়হান খানের উদ্দেশ্যে বলল,
“দেখেছো বড় বাবা তোমার ছেলে কি বলছে আমায়? কিছু বলবে না নিজের ছেলেকে?”
“ঠিক আছে ঠিক আছে বোনু। সরি। এবার খা। আর হবে না।”
রায়হান খান ছেলেকে কড়া সুরে বলেন, “আমার এই মা টা কে এত খেপাও কেন তোমরা?”
ভিহান মনোযোগ দিয়ে খেতে খেতে বলল, “খেপে পাগলেরা ও কি পাগল? ও খেপতে যাবে কেন?”
রাহার চোখ দুটি পানিতে টুইটুবানি হয়ে আছে। নেকা সুরে বলে, “দেখেছো বড়বাবা তোমার ছেলে আমায় পাগল বলছে?”
“আব্বা? ওর সাথে কেন এভাবে কথা বলো? জানোই তো আমার রাহা মা আমাদের আহ্লাদী।”
জাহানারা বেগম বলে উঠেলন, “মেয়ে মানুষকে এতো আহ্লাদ দেওয়া ভালো না ভাইজান। পরে এসব নিয়ে ভোগান্তি হয়।”
“কোনো ভোগান্তি হবে না। এমন জায়গায় দিবোই না।”
এসব কথার মানে ভিহান যেন দাঁতে দাঁত চেঁপে হজম করছে।
রায়হান খান ছেলের উদ্দেশ্যে বলেন, “ভিহান আব্বা? কত দিন আছো বাড়ি?”
“আছি।”
খেতে খেতে জবাব দিলো ভিহান।
পাশ থেকে সাদমান খান বললেন, “হ্যাঁ সেটা কতদিনের জন্যে বাজান?”
ভিহান রুটির টুকরোটা মুখে দিয়ে শান্ত ধাঁচে বলল, “এক মাসের ছুটিতে এসেছি।”
ওর এই কথা শুনে যেন মাথায় ভাঁজ পড়ল রাহার মাথায়। আচমকা সে চেঁচিয়ে বলে উঠল,
“কীইইই?”
ওর এমন অকস্মাৎ চিৎকারে সবাই কপাল কুঁচকে তার দিকে তাকিয়ে রইল খাওয়া রেখে। রাহা তখনো বিস্ময় আতঙ্ক নিয়ে ভিহান ভাই এর দিকে কুঁচকে তাকিয়ে আছে। মানে সে বিশ্বাসই করতে পারছে না ভিহান ভাই এক মাস বাড়ি থাকবে? তাহলে তার জীবন এক মাসের আগেই শেষ হবে। তার নামে ইন্নানিল্লাহ পাঠ করতে হবে নিশ্চিত।
সবাই কে নিজের দিকে এমন অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে অনেকটা অস্বস্তি অনুভব করে রাহা। নড়চড়ে বসে সবাইকে বিষয়টা পরিষ্কার করার জন্যে আমতাআমতা করে,
“আ আসলে আমি..”
ভিহান কপালে ভাঁজ তুলে সূক্ষ্ম কন্ঠে বলল, “এমন ভাবে চেঁচিয়েছিস কেন? যেন আমি বাড়ি থাকবো বলে তোর মাথায় পাহাড় ঘষে পড়েছে।”
রাহা মনে মনে বলতে থাকে, “শুধু পাহাড় নয় বলুন পুরো পৃথিবী টাই আমার মাথার উপর আছড়ে পড়েছে।”
“বাড়ি থাকবো শুনে চেঁচালি কেন? আমি ভূত?”
“ত তা কেন হবে? আ আমি আসলে, ওই আপনি তো এতদিন বাড়ি থাকেন না তাই, তাই আরকি অবাক হয়েছি।”
ভিহান জবাব দিলো না।
কামিলি হাস্যোজ্জ্বল কন্ঠে বলে উঠল, “সত্যি ভিহান ভাই তুমি একমাস বাড়ি থাকবে?”
খেতেখেতে স্বল্প কথায় বলে,
“হু।”
রাহার ভেতর অশান্তি শুরু হলো। স্বাধীনতা হস্তক্ষেপের অশান্তি। ভিহান ভাই বাড়ি থাকলে তাকে ভয়ে ভয়ে থাকতে হয়। এটা ওটা কত কিছু করা যায় না। শান্তি মতো নিশ্বাসও নেওয়া যাওয়া না এই ভয়ে কখন না জানি লোকটা কোন কারণে তাকে ঝাড়তে আসে, ধমকাতে আসে। আরও ওই তীক্ষ্ণ ধারালো চাউনি? বুকে কাঁপুনি ধরিয়ে দেয়। বীনা অস্ত্রে খানখান করে দেওয়ার মতো। রাহা ব্যাকুল ভাবে ঢোক গিলল। লঘু কন্ঠে রাহা প্রশ্ন করলে আবারও,
“সত্যি ভিহান ভাই আপনি ত্রিশ দিনে এক মাস বাড়ি থাকবেন?”
রাহার চোখে মুখে তখন সন্দিহানি আতঙ্ক ভাব। যেন ভিহানের মুখ থেকে না শুনলে সবচেয়ে বেশি সে খুশি হয়। ভিহান বাঁকা চোখে তাকালো রাহার মুখ পানে। চিকণ কন্ঠে বলল,
“কোনো সমস্যা?”
অপ্রস্তুত রাহা আমতাআমতা করল, “স, সমস্যা হবে কেন? আপনার বাড়ি আপনি থাকবেন।” দাঁতে দাঁত চিবিয়ে লঘুর কন্ঠে আবারও বিড়বিড় করল, “আমার কেন সমস্যা হতে যাবে?”
পরক্ষণে রাগ নিয়ে বলতে থাকে মনেমনে, “আমার কোনো কিছুতে সমস্যা নেই। আমার জীবনটাই তো সমস্যার।”
“তাহলে তোর চোখ মুখ এমন লাগছে কেন? যেন বাড়িতে থাকছি শুনে খুব অখুশি হচ্ছিস। আমি কি কোনো ভাবে তোর অশান্তির কারণ?”
রাহা ঠোঁটে বোকাবোকা হাসি ঝুলিয়ে আনে। মুখে আর জবাব না দিয়ে মাথা দুই পাশে নাড়ায়।
পাশ থেকে জাহানারা বেগম বললেন, “বাবা ওর কথায় তুমি কান দিও না তো। ওর মতো পাগল ছাগল কত কিছুই বলে সারাদিন।”
রাহার চোখাচোখি হলো ভিহানের সাথে। মায়ের কথায় লজ্জায় আর তাকিয়ে থাকার সাহস হলো না। দ্রুত নামিয়ে নিলো চোখ। দুঃখের আগুনে জাহানারা বেগম আরো ঘী ঢেলে দিলেন। আর সেটা দাউদাউ করে জ্বলতে শুরু করে দিয়েছে।
ভিহান খেতে খেতে সূক্ষ্ম কন্ঠে বলল, “আমি নামক অশান্তিটাকে আস্তেধীরে হজম করতে শিখে নে।”
রাহা চোরাচোখে একবার দেখেও কিছু বলল না। মনেমনে বিড়বিড় করতে লাগল নিজের সাথে নিজেই।
রায়হান খান ছেলেকে প্রশ্ন করলেন, “তোমায় এত দিনের ছুটি দিলো?”
ভিহান সঙ্গেসঙ্গে জবাব দিলো না। খেতেখেতে অল্প শব্দে জবাব দিলো, “নিয়েছি আমি।”
“না মানে আমি বলতে চাইছি কি এমন চাকরি যে তোমায় একমাসের ছুটি দিয়ে দেয়।”
“আগেই বলেছি বাবা সরকারি চাকরি। আমি ছুটি দেয়নি, আমিই নিয়েছি।”
রায়হান খান একটু রয়েসয়ে বললেন, “বাবা সরকারি চাকরি তো কত কিছুই আছে। আমি বলতে চাইছিলাম কোন ডি..”
উনার কথা শেষ হওয়ার আগে ভিহান চেয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতে বলল, “আমি উঠছি মা। ঘরে এক কাপ কফি পাঠিও।”
এরপর আর ভিহান ওখানে দাঁড়ালো না। হনহন করে চলে গেলো। আর ওর চলে যাওয়ার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল খাবার টেবিলে বসে থাকা লোকজন।
আজ রবিবার। সবার তাড়া। বাপ চাচারা নিজেরদের কাজে যাবে। বাড়ির বাচ্চারা যাবে স্কুল কলেজে। জিদান আজ তাড়ার মাঝে আছে খুব। তাকে আগে ইট ভাটায় যেতে হবে। এরপর আড়দের অফিসের যেতে হবে। এদিকে ড্রাইভার মকবুল কিছুদিন ছুটিতে। তাই তাকে রাহা কামিলি রুশমি সামি রাফি কে নামিয়ে দিয়ে নিজের কাজে যেতে হবে।
সামি রাফি প্রায় পিঠাপিঠি বলে ওরা এই ভালো এই খারাপ। এই মিলে মাখোমাখো তো আবার ঝগড়ায় চুলাচুলি অবস্থায়। তাই ওদের নিয়ে রুশমি পিছনে বসেছে। রুশমি বড় বলে দুজন ওকে মান্যও করে খুব। এরপর কামিলি দ্রুত এসে জিদানের পাশের সিটে বসে পড়ল।
“গাড়ি স্টার্ট দাও ভাইয়া।”
কামিলির কথায় বিরক্ত মুখে জিদান পাশ ফিরে তাকায়।
“কানা হয়েছিস? নেভায় ধরেছে চোখে দেখছিস না রাহা এখনো আসেনি?”
কামিলি কপাল কুঁচকে বলল, “রাহা কিভাবে যাবে এই গাড়িতে?”
জিদান পিছন ফিরে তাকালো। সত্যি পিছনে রুশমি আর সামি রাফি বসায় আরেকজন বসতে কষ্টই হবে।
এমন সময় ভিহান কে দেখা গেলো বেসমেন্ট থেকে নিজের পছন্দের বাইক বের করতে। যেদিন বাড়ি থেকে বিদায় হলো তার আগের দিন Yamaha R15M BS7 স্পোর্ট বাইকটা কিনে এনেছিল। বাইক কিনে শুধু একবারই একটা রেস দিয়েছিলো ভিহান। আজ আবারও পছন্দের কিনে রাখা কুচকুচে কালো বাইকটা বের করছে।
রাহা সবসময় সব কিছুতে দেরি করে কিছু না কিছু কারণে। আজও কলেজ ড্রেস পরে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে লেইট করে বের হলো বাড়ি থেকে। ততক্ষণে ভিহান বাইক বেসমেন্ট থেকে বের করে নিয়েছে।
জিদান গাড়ির জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বলল, “বোনু গাড়িতে জায়গা নেই তুই ভাইয়ার বাইকে করে চলে আয়।”
জিদানের কথা শুনে থমকে গেলো রাহা। ভিহান কেও কপাল কুঁচকে জিদানের দিকে তাকাতে দেখা গেলো। রাহা চেঁচিয়ে বলল, “কি?”
জিদান ঠোঁট টিপে হেসে বলল, “ভাইয়ার সাথে বাইকে আসতে বলেছি। ফ্রি ফ্রি বিমানের স্বাদ পাবি।”
রাহা ভ্যাবলার মতো একবার জিদান ভাইয়ের দিকে তো আরেকবার ভিহানের দিকে তাকাচ্ছে। পরক্ষণে বলল, “ওই জিদান ভাই। প্লিজ না। আমি বাইকে যাবো না। আমায় গাড়িতে তুলো।”
“গাড়িতে তুলবো কি করে? আমায় মাথায়?”
“সমস্যা নেই। আমি দরকার পরলে ঝুঁলে যাবো তবুও উনার সাথে বাইকে যাবো না ভাইয়া প্লিজ।”
“হোপ। যা ওখানে। আমার দেরি হচ্ছে। পাসপোর্ট ভিসা ছাড়া প্লেইনে উঠার সুযোগ করে দিচ্ছি ভালো লাগছে না তোর তাই না?”
জিদানের কথায় রাহার মুখটা কাঁদোকাঁদো হয়ে গেলো। সে ওই খাডাস লোকের সাথে কিছুতেই যেতে চায় না। রাহার মুখ দেখে রুশমি সহ সামি রাফি মুচকি মুচকি হাসছে। তবে কামিলি দ্রুত নিজের সিট বেল্টা খুলতে খুলতে বলল,
“রাহা বোধহয় ভয় পাচ্ছে বাইকে যেতে ও গাড়িতে চলে আসুক। আমি বরং ভিহান ভাই এর সাথে বাইকে যাই।”
রাহা যেই উচ্ছ্বাস প্রকাশ করবে ওমনি রুশমি ধমকে উঠল, “কাউকে কোথাও যেতে হবে না। যে যেখানে আছে সেখানেই থাক। তুই বোস রাহা বাইকেই আসবে। ভাইয়া তুমি গাড়ি ছাড়ো।”
হাত বাড়িয়ে জিদান রাহা কে “টাটা বাই বাই” বলে গাড়ি টান দিলো। কামিলির মুখটা ভোতা দেখে জিদান বিড়বিড় করে বলল, “বালপাকনামি করবার আহে।”
জিদান কে গাড়ি স্টার্ট দিতেই রাহা চেঁচিয়ে উঠে, “ভাইয়া নিয়ে যাও আমায়। এভাবে অবলার মতো আমাকে ফেলে যেতে পারো না তুমি। ও ভাইয়া..?”
এতক্ষণ বাইকে বসে থেকে ভিহান চুপচাপ সবটা দেখছিল। এরপর সুচালো সুরে বলল, “হয়েছে? ড্রামা শেষ তোর?”
ভিহানের কথায় রাহা কপাল কুঁচকে বিরক্ত মুখে তাকায়। নিজের বিরক্ত তিক্ত মুখ লুকানোর জন্যে হাসার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। আমতাআমতা করে বলে,
“আ আপনি চলে যান। আমি, আমি না হয় বড় আব্বু কে বলবো আমাকে যেন কলেজ রেখে আসে। নয়তো রিকশা করে চলে যেতে পারবো আমি। আমার জন্যে আপনার শুধুশুধু একটুও কষ্ট করতে হবে না ভিহান ভাই।”
রাহা এবার হাসার চেষ্টা করলো। ভিহান কুঁচকানো নজরে কলেজ ড্রেস পরিহিতা রাহা কে আগাগোড়া দেখে নিলো। ঘাড় ঘুরিয়ে বিড়বিড় করে বলল, “পুরো আহ্লাদী।”
নিজেকে ধাতস্থ করে সময় না নিয়ে কড়া গলায় বলল,
“কানের নিচে দুইটা খাওয়া আগে অভিনয় ঝেড়ে উঠে আয়।”
রাহা রাগে কটমট করতে থাকে। মনে মনে গোষ্ঠী উদ্ধার করে দেয় ভিহান ভাই এর। পরক্ষণে আবার ভাবে, “দূর গোষ্ঠী নিয়ে কেন বলছি উনার গোষ্ঠীর মাঝে যে আমিও আছি। গাধির মতো নিজেকেই নিজে বকছি।”
“উঠে আয় জলধি।”
রাহার ইচ্ছে হয় ছুটে ভেতরে চলে যেতে। বিরক্তিকর! আজ তার কলেজ না গেলেই ভালো হতো। ধমকের ভয়ে আর কথা বাড়ায় না সে। ইচ্ছা না থাকার পরও তাকে পা টিপে টিপে এগিয়ে যেতে হয় ভিহান ভাই এর দিকে। উনার সাথে একরত্তিও যেতে ইচ্ছা হচ্ছে না তার। দেখা যাবে খাডাস টা মাঝরাস্তায় বাইক থামিয়ে তাকে ধমকে বলে উঠবে,
“এখুনি নেমে যা আমার বাইক থেকে।”
চলমান….
পাখিরা বেশিবেশি রেসপন্স করবেন। পোস্টটা সামনে গেলে একটা রিয়েক্ট করবেন।
Share On:
TAGS: ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ, সাদিয়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ পর্ব ৩
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ৩৯
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ২১
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ২৫
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৪
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ৫
-
ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ পর্ব ১০
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ৩৭
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ১৩
-
ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ পর্ব ৭