কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৩০
লামিয়ারহমানমেঘলা
[ 🚫কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ ]
সিকদার নিবাস, চট্টগ্রাম।
দুপুরের রোদ তখন ধীরে ধীরে নরম হয়ে এসেছে, অথচ দিনের ক্লান্তি যেন এখনো দেয়ালজুড়ে জমে আছে। জরুরি কাজের তাগিদে সকাল থেকে বাইরে কাটিয়ে কায়ান অবশেষে ফিরেছে ঘরে, ঠিক লাঞ্চ টাইমে। শরীরের প্রতিটি পেশি যেন অবসন্ন, খাদ্যের চেয়ে এই মুহূর্তে তার অধিক প্রয়োজন নিঃশব্দ বিশ্রাম।
হাতে ঝুলিয়ে রাখা কোটটি অসাবধান ভঙ্গিতে লিভিং রুমের সোফার উপর ফেলে দিয়ে কায়ান নিজেকেও সেখানেই এলিয়ে দেয়। চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট, নির্ঘুম এক দীর্ঘ রাতের পর পরিশ্রমে অবসন্ন দেহ যেন ধীরে ধীরে নিজেকে নিস্তেজ করে দিতে চাইছে।
হঠাৎই মাথার উপর মায়াময় এক স্পর্শ অনুভব করে সে। বিস্ময়ে চোখ খুলে তাকাতেই দেখে,বানু মির্জা দাঁড়িয়ে আছেন তার পেছনে। কায়ান ধীরে মাথা তুলে বসে, আর বানু মির্জা এসে বসেন তার পাশে।
নরম কণ্ঠে প্রশ্ন ভেসে আসে,
“খুব ক্লান্ত?”
কায়ান মৃদু হাসে। মায়ের হাত দু’টি নিজের হাতে নিয়ে আলতো করে চুমু খায়। সময়ের ছোঁয়ায় বানু মির্জার হাতে বয়সের ভাঁজ স্পষ্ট, যে হাত একসময় ছিল টানটান যৌবনে ভরা, আজ তা স্নিগ্ধ ক্লান্তির ছাপ বহন করে।
“খানিকটা, আম্মা”
কায়ানের কণ্ঠে ক্লান্তির সাথে মিশে থাকে এক অদ্ভুত প্রশান্তি।
বানু মির্জা আবারও ছেলের মাথায় স্নেহভরা হাত বুলিয়ে দেন।
“খানিকটা না, অনেকটাই, তোকে দেখলেই বোঝা যায়। মায়ের কাছ থেকে কিছুই কি লুকাতে পারবি, কায়ান?”
এই আন্তরিক মুহূর্তের মাঝেই হঠাৎ করে সেখানে এসে উপস্থিত হয় শিমুল। হাতে ফোন, বারবার চেষ্টা করছে কাউকে কল দিতে, কিন্তু সফল হচ্ছে না। তার চোখেমুখে স্পষ্ট উৎকণ্ঠা।
বানু মির্জা দৃষ্টি ফেরান তার দিকে,
“কি হয়েছে শিমুল?”
শিমুল এসে বসে তাদের পাশে, কণ্ঠে দুশ্চিন্তার ছায়া
“আম্মা, বেগম অনেকক্ষণ ধরে মাকে কল দিচ্ছি, কিন্তু কোনোভাবেই লাগছে না। সেরিনের ফোনটাও নষ্ট, খুব ভয় লাগছে আমার।”
এক মুহূর্ত নীরব থেকে বানু মির্জা বলেন,
“এটা সত্যিই চিন্তার বিষয়। আশেপাশে যদি কেউ থাকে, তাকে ফোন করে খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করো।”
শিমুল মাথা নাড়ে,
“হ্যাঁ, সেটাই করি।”
ঘরের ভেতর তখন এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসে যেখানে ক্লান্তি, স্নেহ আর অজানা দুশ্চিন্তা একসাথে মিশে গিয়ে পরিবেশটাকে ভারী করে তোলে।
শিমুল কল করে কাকলি বেগমের ফোনে।
দুই রিং হতে ওপাশ থেকে কাকলি বেগম ফোন তুলে নেয়,
“হ্যালো শিমুল।”
কাকলি বেগমের কন্ঠ শুনে শান্ত হলো শিমুলের মনটা। ফোনটূ তখন স্পিকারে দেওয়া,
“কাকি কোথায় তুমি?”
“আমি তোদের বাসা থেকে এলাম মাত্র।”
শিমুল ভাবে এটা সাধারণ বিষয়।
“আম্মা কই? ফোন দি ধরেনা৷’
” সেরিন।”
কাকলি বেগম চুপ হয়ে গেলেন। বলতে গিয়েও বললেন না চুপ থাকলেন খানিক্ষন। চাইলেও শিমুলকে কিছু বলতে পারছেন না। কারণ আসার সময় নূরবানু সিকদার হাত ধরে বারণ করে দিয়েছে। যাতে এ বিষয়ে শিমুলের কানে কিছু না যায়। তার মতে ও বাড়িতে এসব জানাজানি হলে মেয়েটার সংসার ভেঙে যাবে।
যা হয়েছে সেটা তারা নিজেদের ভেতর সামলে নিবে।
শিমুল কাকলি বেগমকে চুপ দেখে ফের জিজ্ঞেস করে,
“সেরিন কি কাকি? অসুস্থ নাকি দেখতে গেছিলে?’
কাকলি বেগম কথা ঘুরিয়ে দিলেন,
” না সেরিন কিছুনা। সেরিন ডাকছিলো তাই গেছিলাম। সব ঠিক আছে। তোর মা ব্যস্ত তাই হয়ত ফোন ধরে নাই।’
“ও আচ্ছা। ঠিক আছে তা তোমার বাসার সবাই ভালো?”
“হ্যাঁ ভালো আছে। আসবি নাকি এদিকে?”
“যাওয়ারত ইচ্ছে করে জেনরান ছুটি পায় না। দেখি কি করি।”
“আচ্ছা আসিস জামাইরে নিয়ে৷”
“আচ্ছা।”
কল কেটে দেয় শিমুল। কথা বলে বেশ হালকা লাগছে নাহলে চিন্তায় যেন অস্থির হয়ে ছিলো সে।
ওদিকে কায়ানের সম্পূর্ণ ধ্যান জ্ঞান দিয়ে শিমুলের কথা গুলো শুমছিলো। কাকলি বেগমের কন্ঠে সে উৎকন্ঠ বুঝতে পারলো।
তার কিছু ভালো লাগছে না।
কায়ান সেখানে না দাঁড়িয়ে কোট খানা হাতে নিয়ে উপরে রুমে চলে যায়৷
কাল রাতেই সেরিনের সাথে দেখা হয়েছে বলে মনের ভেতর অদ্ভুত এক শান্তি আছে তার। মনকে বুঝ দিচ্ছে কিছুই হয়নি। কাল রাতেইত মেয়েটা ঠিক ছিলো। এসব বুঝ দিতে গিয়েও বার বার মনে হচ্ছিলো এগুলো যেন মিথ্যা আশা দিচ্ছে কায়ান নিজেকে। তবুও কেন মতে নিজের ক্লান্ত শরীরটাকে টেনে নিজের রুমে চলে যায় সে।
ব্যস্ত হয়ে সাওয়ার নিয়ে বিছনায় শরীর এলিয়ে দেয়। কাল রাতের চাঁদের আলোতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠা সেরিনের হাসি মুখ খানা ভেসে আসে চোখের সামনে। মৃদু হেসে ফেলে কায়ান।
ফিসফিসিয়ে বলে,
“আই লাভ ইউ সেরিন। খুব দ্রুতই আমি তোমাকে নিয়ে আসব আমার বাড়িতে জান।”
কায়াম চলে গেলো নিজের রুমে কিন্তু বানু মির্জা তাকিয়ে রইলো ছেলের দিকে, ছেলের চোখে মুখে চিন্তাটা যে জটিল বিষয়ে এটা তিনি বুঝতে পেরেছেন ভালোই।
হিমেল সম্পূর্ণ ইনফর্ম বের করতে করতে বিকাল হয়ে গিয়েছে।
সে শাহারিয়ারের আসল উদ্দেশ্য ভালো বুঝতে পারছে না৷ ছেলেটার চরিত্র খুবই জটিল রহস্যে ঘেরা।
এসব করতে করতে হিমেলের কাছে একটা ফোন কল আসে। কুমিল্লাতে সে একজন ডিটেকটিভ হায়ার করে দিয়ে এসেছিলো।
সেই কল করেছে, হিমেল কলটা রিসিভ করে ফোনটা কানে ধরে,
“হ্যালো।”
“স্যার আসসালামু আলাইকুম।”
“ওয়ালাইকুম সালাম, বলো। “
“স্যার এদিকে ভীষণ অদ্ভুত এক ঘটনা ঘটেছে।”
“কি ঘটনা?”
“কেউ সেরিন ম্যাডামের সাথে কায়ান স্যারের ছবি তুলে সেটাকে পোস্টার হিসাবে সম্পূর্ণ গ্রামের অলিতে গলিতে ছড়িয়ে দিয়েছে। আজ সকালে নাকি মাতব্বর গেছিলো সেরিন ম্যাডাম দের বাড়িতে। আমার মনে হয় পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর। সাধারণত এমন কিছু হলে মেয়েদের মার খেতে হয়। আমার ধারণা ম্যাম মার খেয়েছে। আজ সারা দিন উনি বাড়ি থেকেও বার হয়নি।
গ্রামের মানুষ খুবই বাজে শব্দ ব্যাবহার করছে ম্যামের জন্য। “
হিমেল কিছুক্ষণ চুপ থাকলো।
“এই ছবি তুলেছে কে?’
” এটা কোন সিক্রেট স্পাই হবে। ক্যাপ্টেন শাহারিয়ারের কাজ হলে বুঝতে পারতাম।”
“থার্ড পার্টিটা আবার কে।”
“আমার সময় লাগবে কিন্তু কে বা কার থেকে ছবিটা এসেছে এটা বের করা এত সহজ হবেনা৷”
“ওকে তুমি কাজে লেগে পড়ো এই খবর দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।”
“জি স্যার৷”
ডিটেকটিভ কল কাটতে হিমেল কায়ানের নাম্বারে কল করে।
কিন্তু পরপর রিং হয়েই চলেছে কায়ান ফোন তুলেনা।
ক্লান্ত কায়ান রুমে গিয়ে সাওয়ার নিয়ে ঘুমিয়ে গিয়েছে ফোন সাইলেন্ট করে।
তাই তার ফোন যে সমানে বেজেই চলেছে এটা টের পাচ্ছে না সে।
হিমেল বিরক্ত হয়ে যায়। এদিকে তার হাতে কাজ বেশি সে চাইলেও বের হতে পারছে না এখান থেকে।
কুমিল্লা,
দিনটি যেন শুরু থেকেই বেদনার এক দীর্ঘ ছায়া টেনে এনেছিল এই বাড়ির উপর। সকাল থেকে সময় গড়িয়ে বিকেল, তবু সেই ভারী অন্ধকার কাটেনি। নূরবানু সিকদারের ঘরে আজ উনুন জ্বলেনি, ধোঁয়া ওঠেনি চুলা থেকে, রান্নার গন্ধে ভরেনি বাতাস। ফলে সারা দিন কেউ মুখে এক কণা আহারও তোলেনি। ঘরজুড়ে নেমে এসেছে এক নিঃশব্দ দুর্দশা, যেন অভাব নয়, অভিমান আর অনুশোচনার ভারে নুয়ে পড়েছে প্রতিটি দেয়াল।
সকালের নির্মম আঘাতে সেরিনের শরীর ভেঙে পড়েছে সম্পূর্ণ। বিছানার উপর নিথর পড়ে আছে সে, উঠে বসার শক্তিটুকুও যেন আর অবশিষ্ট নেই। শরীরের প্রতিটি অঙ্গ ব্যথায় জর্জরিত, যেন ভিতর থেকে কেউ তাকে ছিঁড়ে ফেলছে ধীরে ধীরে। না কোনো ঔষধ, না একবিন্দু খাদ্য, শূন্য পেটে কেবল যন্ত্রণাই জমে উঠছে স্তরে স্তরে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ব্যথা আরও তীব্র হয়ে উঠছে, আর তার সাথে জ্বর এসে দগ্ধ করছে চোখ-মুখ, শরীর জ্বলে উঠছে নিঃশব্দ আগুনে। চাইলেও আর নিজেকে নাড়াতে পারছে না সে, অসহায়, নিস্তব্ধ, নিঃশেষ।
ঘরের সামনে বিস্তীর্ণ বারান্দায় বসে আছেন নূরবানু সিকদার। মাথা নিচু, দু’হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরেছেন নিজের কপাল। দৃষ্টি তার সামনের উঠোনে, অথচ চোখ যেন কিছুই দেখছে না, বা হয়তো এমন কিছু দেখছে, যা ভাষায় ধরা যায় না। তার চোখে জমে থাকা বেদনা, অপরাধবোধ আর নিঃশব্দ কান্না স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সকাল থেকে যে হাত আঘাত করেছে, সেই হাতই এখন কাঁপছে অনুশোচনায়। যে কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে রাগ আর তিরস্কার, সেই কণ্ঠই এখন স্তব্ধ হয়ে আছে গভীর অনুতাপে। সন্তানকে আঘাত দিয়ে কোনো মা কি সত্যিই ভালো থাকতে পারে?
নীরবতা ভর করেছে চারপাশে, কিন্তু সেই নীরবতার ভেতরেই যেন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে এক অদৃশ্য কান্না, যা কেউ শুনতে পাচ্ছে না, তবু সবাই অনুভব করছে।
নূরবানু সিকদার সেরিনের কথা ভাবছিলেনই এমন সময় সামনের কাঠের গেট খানা খুলে উঠানের ভেতর প্রবেশ করে কিছু লোক।
অগত্যা নূরবানু সিকদার দ্রুতই মাথায় কাপড় টেনে নিলেন।
পরপর তিন চারজন পুরুষ মানুষ সেরিনদের বাড়িতে প্রবেশ করে হেঁটে এগোলো ঘরের দিকে।
চলবে?
Share On:
TAGS: কিস অফ বিট্রেয়াল, লামিয়া রহমান মেঘলা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
জেন্টাল মনস্টার পর্ব ৫৯
-
কিস অফ বিট্রেয়াল গল্পের লিংক
-
জেন্টাল মনস্টার পর্ব ৫৭
-
জেন্টাল মন্সটার পর্ব ১৯
-
কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৩
-
কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ২৩
-
কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৫
-
কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ১১
-
জেন্টাল মন্সটার পর্ব ৯
-
জেন্টাল মনস্টার পর্ব ৪৭