Golpo কাজরী

কাজরী পর্ব ৩৮


কাজরী পর্ব ৩৮

সাবিকুননাহারনিপা

রাতের বেলা বাড়িটা যেমন নিরিবিলি, অদ্ভুত মনে হয়েছিল দিনের বেলা তেমন মনে হয় নি। প্রচুর আলো বাতাস আছে। বিশুদ্ধ বাতাসে মন, প্রাণ জুড়িয়ে যায়। কাজরী দোতালার বেলকনী থেকে আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো। ইশান ঘুমিয়ে আছে এখনো। আগে থেকে প্রিপারেশন নিয়ে না এসেও কাজরী কাবার্ডে নিজের প্রয়োজনীয় সবকিছু খুঁজে পেল। ইশান যত্ন করতে জানে, তারচেয়েও সুন্দর ব্যাপার হলো ইশান ওকে খুব ভালো করে খেয়াল করেছে। কখন কী করে, সব ছোট ছোট ব্যাপারগুলো মনে রেখেছে।

বেডসাইডের ছোট্ট টেবিলটায় কাজরীর ফোন টা রাখা। মেসেজ এর শব্দটা কানে আসলো। ইশানের ঘুম পাতলা হয়ে এসেছিল তবুও আলস্য কাটেনি। শব্দটা কানে খট করে লাগলো। ইশান বেখেয়ালে ফোনটা হাতে নিলো৷ স্ক্রিনে নিশানের নাম দেখাচ্ছে। অন্যের টেক্সট দেখা অভদ্রতা হলেও ইশান এই অপ্রিয় কাজটি করলো। নিশান জানতে চেয়েছে কাজরী আজ ফিরবে কী না!

টেক্সট দেখে ইশানের ভ্রু কুঞ্চিত হলো। মায়ের সব কথা আমলে না নিলেও নিশানের টেক্সট ব্যাপারটা ও’কে ভাবালো। জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা পাবার পর নিশান বাজেভাবে ভেঙে পড়েছিল। বদ্ধ উন্মাদ এর মতো আচরণ করেছিল কিছুদিন। পুরোনো রেষারেষি, প্রতিযোগিতা ভুলে ইশান ওর পাশে থেকেছে। ভালো ট্রিটমেন্ট করার ব্যবস্থা করেছে এমনকি ওর লাইফের অধ্যায় টি সবার সামনেও আনতে চায় নি। কিন্তু নিশান নিজেই ছেলেমানুষী করে সত্যিটা জানিয়েছে। কিছু নিউজ পোর্টাল, মিডিয়ায় সেসব নিয়ে আলোচনা শুরু হলেও ইশানকে সেসব বন্ধ করতে হয়েছে। এখন ওর মাথায় অন্যকিছু চলছে সম্ভবত। কাজরীকে ব্যবহার করে নিজের উদ্দেশ্য হাসিল করার চেষ্টা চালাচ্ছে। ইশানকে সতর্ক হতে হবে, চোখ কান খোলা রাখতে হবে। আহত বাঘ জখমের কারণে হিংস্র না হতে পারলেও নিজের শক্তি জমিয়ে রাখে বড়সড় আক্রমন এর জন্য।

“গুড মর্নিং? “

কাজরীর গলা পেয়ে ও ফোনটা রেখে দিলো টেবিলে।

“নিশান তোমাকে টেক্সট করেছে। আজ ফিরবে কী না জানতে চাইলো? কিছু দরকার আছে? “

কাজরী ফোন হাতে নিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলল,

“ও কাল কিছু একটা বলতে চেয়েছিল। আমি সময়ের অভাবে শুনতে পারি নি। “

“কী বিষয়ে?”

“জানিনা। বলেছিল একটা বিষয় নিয়ে আলাপ করবে। জরুরী কিছু নয় বলে আমি শুনিনি। তোমার সঙ্গে আসার তাড়া ছিলো। “

“আচ্ছা।”

ইশানকে গম্ভীর দেখালো। ভাইয়ে ভাইয়ে মতোবিরোধ দ্বন্দ তো কাজরীর অজানা নয়। তবুও নিশানের খারাপ সময়ে ইশান মানবিক হতে ভুল করে নি। ইদানীং দুই ভাই মুখোমুখি হলে ল*ড়াই ম্যুডে থাকে না। হালকা কথাবার্তা বলে। কাজরীর সঙ্গে নিশানের একটা ভালো বন্ডিং তৈরি হয়েছিল। কাজরী ও’কে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছে, কাউন্সিলিং করেছে। সেসব নিয়ে ইশান কখনো কিছু বলে নি। আজ টেক্সট দেখে গম্ভীর হবার কারণ টা ঠিক বোধগম্য হলো না। কাজরী ইশানের পাশে বসে প্রশ্ন করলো,

“কোনো সমস্যা? তোমাকে আপসেট দেখাচ্ছে। নিশানের টেক্সটের কারণে নয় তো?”

“হ্যাঁ। নিশানের মাথায় কিছু চলছে। বড়সড় কোনো প্ল্যান। ও সত্তর লাখ টাকা চেয়েছে মায়ের কাছে। ঠিক চাওয়া নয়, থ্রে*ট করেছে। এই মুহুর্তে ওর এতো টাকা কেন প্রয়োজন! “

“কী করবে এতো টাকা দিয়ে? “

“কারণ বলে নি। টাকাটা কয়েকদিনের মধ্যে দিতে বলেছে। “

“তোমার কী মনে হচ্ছে? “

“আইডিয়া নেই। “

ইশান উঠে গেল ফ্রেশ হতে। কাজরী ফোনটা হাতে নিয়ে বসে আছে। নিশানকে ঠিক ও বুঝে উঠতে পারছে না। ইশান বেরিয়ে এসে কাজরীকে বলল,

“তোমার শাশুড়ী কিন্তু তোমাকে নিয়ে খুব ভাবেন। তিনি বললেন তোমাকে যেন চোখে, চোখে রাখি। নিশানের সঙ্গে তোমার সখ্যতা নাকি চোখে পড়ার মতন। “

কাজরীর কান গরম হয়ে উঠলো। কী লজ্জার কথা! রাগী গলায় প্রশ্ন করলো,

“হোয়াট ডু ইউ মিন?”

ইশান স্বাভাবিক গলায় বলল,

“নাথিং। তোমার শাশুড়ী ভাবছেন, আমি না। “


কেরানিগঞ্জের জিনজিরা বাজার হতে মাইল তিনেক দূরে কোপা মোসাদ্দেক এর বাড়ি। বাড়ি না বলে সেটাকে প্রাসাদ বলা যায়। চারতলা বাড়িটা আধুনিক স্টাইলে তৈরী করা। বাড়ির চারপাশে উঁচু করে গেট বাঁধানো। নিশান বাড়ি দেখে যতটা অবাক হলো তারচেয়ে বেশী অবাক হলো কোপা মোসাদ্দেক কে সামনাসামনি দেখে। নাম শুনে, ফোনকলে কথা বলে ভেবেছিল কালো কুচকুচে বয়স্ক এক লোক। সামনাসামনি দেখলো সজ্জন সুপুরুষ। পরিপাটি পোশাক, গায়ে আতরের কড়া গন্ধ, চোখে সোনালী ফ্রেমের চশমা।

“ভাইয়া আসতে কোনো মুসিবত হয় নাই তো?”

ফোনকলে ভদ্রলোক গমগমে আওয়াজে কথা বললেও এখন বলছে মিহি স্বরে।

“না। আপনার টাকা ক্যাশে আছে। “

“আরে ভাইয়া টাকার কথা পড়ে বলবেন। আগে মেহমানদারী করতে দেন। এতো কষ্ট করে আসছেন গরীবের বাসায়। “

নিশান বিরক্ত হলেও প্রকাশ করলো না।

কোপা মোসাদ্দেক নামেই তার পরিচয় লুকিয়ে আছে। জিনজিরায় কাঠপট্টিতে আবুল বাশার নামের এক ব্যবসায়ীকে উনি ফজরের সময় কুপিয়ে বুড়িগঙ্গায় ফেলে দিয়েছিলেন। কয়েক বছর জেল খেটে বেরিয়ে এরপর সেটাকে পেশা হিসেবে নিলো। বিশাল অংকের টাকা নিয়ে উনি মানুষ কু*পিয়ে মারে। তারপর গা ঢাকা দিয়ে এসে কিছুদিন জেল খেটে বেরিয়ে আসেন।

কোপা মোসাদ্দেক বেশ খাতির যত্ন করলো নিশানকে। খাওয়া দাওয়ার বিশাল আয়োজন। নিশান অনিচ্ছাসত্ত্বেও আতিথেয়তা গ্রহণ করলো। টাকাগুলো গুনে নেবার সময় কোপা মোসাদ্দেক বলল,

“ভাইয়া দেরি করলেন খুব। মাইন্ড করিনাই আমি। তবে এসব কাজে টাকা দেরিতে দেয়া আমি পছন্দ করি না। আপনার হিসাব আলাদা, আপনারে খুব পছন্দ হইছে। “

“আপনি ভালো করে গুনে নেন, টাকা ঠিক আছে কী না?”

“আরে ভাইয়া কী বলেন। আপনার সঙ্গে আমার এতো হিসাব, নিকাশ কিসের। গরীবের বাসায় এক বেলা খাওয়া দাওয়া করলেন খুব খুশি হইছি। “

নিশান চলে আসার সময় মোসাদ্দেক আবারও প্রশ্ন করলো,

“ভাইয়া একটা কথা বলি, মাইন্ড করবেন না। আপনার বিয়াশাদীর খবর পাইলাম না। আপনার ভাই বিয়ে করে ফালাইলো। ঘটনা কী….

“আপনার টাকা বুঝে পেয়েছেন, এরপর আর প্রশ্ন থাকতে পারে না। তাই না?”

“আরে ভাইয়া রাগ কেন করেন? এই ভাই আপনার সাথে আছে, কোনো সমস্যা হইলে কল করে স্মরণ করবেন। আপনার উপর মায়া হয়ে গেছে। আপনার কাজ করতে পারলে খুশি হবো। “

নিশান অতিদ্রুত বেরিয়ে আসে। কেরানীগঞ্জ পেরিয়ে শহরে গাড়ি ঢোকার পর নিশ্চিত হয়। মায়ের সঙ্গে তর্কযুদ্ধের পর পর ই তিনি টাকাটা ট্রান্সফার করলেন। নিশান আর কোনো প্রশ্ন করে নি, তবে মা যে ও’কে সন্দেহের চোখে দেখছেন সেই ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে গেল। আরও সতর্ক থাকতে হবে এই ব্যাপারে। কিছুতেই ওর এই গোপন অভিসার সম্পর্কে কাউকে কিছু বলা যাবে না।


ইশান ও কাজরী দুদিন পর বাড়ি ফিরলো। ইশান বাড়ি ফিরে মায়ের সঙ্গে কথা বলল নিশানের ব্যাপারে। শিরিন নিজেও নিশানকে নিয়ে খুব চিন্তিত। ইশান হঠাৎ ই কথা প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করলো,

“আখতারউজ্জামানের সঙ্গে কী তোমার কোনো পূর্ব শত্রুতা আছে? “

শিরিন ধাক্কা খেলেন কিন্তু সেটা প্রকাশ করলেন না। বললেন,

“না। ওনার সঙ্গে আমার কিসের দ্বন্দ থাকবে। উনি চৌধুরীদের পারিবারিক বন্ধু ছিলেন। তোমার চাচ্চুর খুব ক্লোজ ছিলেন। ঘটনাচক্রে একটু মনোমালিন্য হয়েছিল। পরে তো সব ঠিক হয়ে গেল। তারপর এমন ঠিক হলো যে, উনি এখন আমাদের পরম আত্মীয় হয়ে গেলেন। “

“ভনিতা না করে সরাসরি প্রকাশ করলেই পারো। উনি পরম আত্মীয় হলেও কাজরীর বাবা যে নন এটা তো তোমার অজানা নয় তাই না?”

শিরিন একটু সময় নিয়ে বলেন,

“হ্যাঁ। লুকোচুরির কিছু তো নেই এখন। আমি আন্দাজ করেছিলাম। কাজরীকে সামনাসামনি দেখে নিশ্চিত হয়েছি। “

“তাহলে ওনার কাছে তো কৃতজ্ঞ থাকার কথা তাই না? উনি কাজরীর টেক কেয়ার করেছেন, নিজের মেয়ের পরিচয়ে বড় করেছেন। “

“এই বিষয় নিয়ে আমার সঙ্গে আলোচনা করে তো লাভ নেই। এটা তোমার বাবার বিষয়। তিনি যেহেতু নেই….

“বাবার অবর্তমানে তার ক্ষমতা, টাকা সবকিছুর যথাযথ ব্যবহার যেহেতু করছ তার ইচ্ছেকে সম্মান জানিয়ে আখতারউজ্জামান কেও সম্মান জানাবে। তুমি তোমার স্বামী ওয়াজেদ চৌধুরীকে পছন্দ করো না, তাকে অসম্মান না করলেও খুব যে সম্মান করো তাও তো না তাই না?”

“ইশান এক্সাক্টলি কী বলতে চাইছ?”

ইশান শান্ত ও শীতল গলায় বলল,

“রাজশাহীর তরফদার পরিবারে আল্পনার বিয়ের জন্য তুমি এতো মাথাব্যথা কেন দেখাচ্ছ? আল্পনা তোমার কী ক্ষতি করেছে। “

শিরিন দমে গেলেন। ইশানকে তিনি এই ব্যাপারে কৈফিয়ত দিতে চাইছেন না। তার মাথায় আজও ইশানের রিসিপশনের দিনের ঘটনা ঘুরে বেড়ায়। আখতারউজ্জামান আর কাজরী তাকে অপরাধীর কাঠগড়ায় তুলেছিলেন। এতো এতো ঘটনা পর পর ঘটে গেল যে ওই বিষয় নিয়ে আর কেউ কিছু বলল ই না। মিস্টার চৌধুরীকে শিরিন বলেছিলেন, তিনি বিষয় টা হালকা করে নিয়েছিলেন। অথচ কতো মানুষের সামনে তিনি অপমানিত হয়েছিলেন।

শিরিন আর কথা বাড়ালেন না। ছেলের সামনে নিজের কুকীর্তি ধরা পড়ে যাওয়ায় ভারী লজ্জা পেলেন। তবে লজ্জিত ও হতভম্ব হওয়া আরও যে বাকী আছে সেটা সেই সময় আন্দাজ না করতে পারলেও সন্ধ্যেবেলা টের পেলেন।


কাজরী অসময়ে শাওয়ার নেয়ায় অসুস্থ বোধ করলো। সকাল থেকে মন ভালো লাগছিলো না। দুটো দিন ভালো, মন্দ মিলিয়ে ভালো গেছে। সময় যে কখন কোথা থেকে কেটে গেছে টের পায় নি। একটু মান, অভিমানও গেছে দুজনের। তবে পরবর্তী সময়টুকু ভালো কেটেছে।

কাজরী ঘন্টাখানেক এর ন্যাপ নিতে। এলার্ম সেট করে রাখা আছে, নির্ধারিত সময়ে ঘুম ভেঙে যাবে। ওর এই ঘুমের সময়টা ছিলো অন্য একজনের জন্য ভ*য়ংকর বিপজ্জনক সময়।


আখতারউজ্জামান বিকেলে বেরিয়েছিলেন বাসা থেকে। যাবার আগে আল্পনার সঙ্গে কথা বলে গেলেন। মেয়েটা কয়েকদিন ধরে খুব অস্থির হয়ে ছটফট করছিল। তিনি ঠিক করেছেন ও’কে নিয়ে দেশের বাইরে যাবেন। আত্মীয়দের সঙ্গে আল্পনা সহজ হতে পারে না, নাহলে কোথাও পাঠিয়ে দিতেন।

গাড়িতে কিছুদূর যাবার পর আখতারউজ্জামান খেয়াল করলেন যে তার চাবিগোছা আনতে ভুলে গেছেন। দুই গোছা চাবির একটা সঙ্গে আছে। ব্যক্তিগত সঙ্গী রাকিব কে বললেন,

“রাকিব গাড়ি ঘুরিয়ে বাসার দিকে চল। চাবি ফেলে এসেছি। “

তখন অর্ধেকের মতো এসে গেছেন প্রায়। রাকিব বুঝতে পারলো চাবি গুরুত্বপূর্ণ বলেই তিনি গাড়ি ঘুরিয়ে নিতে বলেছেন। রাকিব বলল,

“আপনি চলে যান। আমি এখানে নেমে যাই। চাবি নিয়ে বাইকে করে ফিরব। “

আখতারউজ্জামান রাজি হলেন। রাকিব নেমে গেল। ড্রাইভার ছাড়া গাড়িতে আরও একটি ছেলে আছে। ওর নাম লিমন। নিরাপত্তার জন্য সবসময় এই দুজন সঙ্গে থাকে। রাকিব নেমে যাওয়ায় তেমন চিন্তিত হলেন না। আর ঘন্টাখানেক পর সুবর্ননগর এলাকা শুরু হবে। তখন তো তিনি নিশ্চিন্ত। কিন্তু বি*পদ নেমে আসে কিছুক্ষনের মধ্যেই। বিকেলের আলো নিভে যাচ্ছে এমন সময়ে গাড়িটা থেমে যায়। কেউ জোর করে থামায় নি। ড্রাইভার গাড়ি থামিয়ে অপেক্ষা করছে। আখতারউজ্জামান জিজ্ঞেস করলেন,

“কী ব্যাপার? কোনো সমস্যা? “

ড্রাইভার আমতা আমতা করে জানালো গাড়ি স্টার্ট নিচ্ছে না। আখতারউজ্জামান বিপদের আশঙ্কা করলেন। রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা। অল্প কিছু চায়ের দোকান ছাড়া তেমন কিছু দেখা যাচ্ছে না। লিমনকে বললেন,

“দেখ তো লিমন কী সমস্যা। “

লিমন হাই তুলে বলল,

“দেখতেছি। “

ছেলেটা বেরিয়ে রাস্তা ক্রস করে ধানখেতের দিকে নেমে গেল। আখতারউজ্জামান স্পষ্ট বুঝতে পারলেন তার বিপদ আসন্ন।

চলবে……

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply