আমার_আলাদিন
জাবিন_ফোরকান
পর্বসংখ্যা৪
“অনুরাগের বাচ্চা! তুই উগান্ডায় থাকিস কি অ্যামাজনে! এক্ষুণি আমার বাসায় আসবি তুই, ঠিক এই মুহূর্তে! ঘড়ি ধরে শুধু বিশটা মিনিট দেখব আমি। এসে আমার মমকে বোঝা, মহিলা পাগল হয়ে গিয়েছে। তিরিশ বছর ধরে মানুষ কাটাকাটি করতে করতে ব্রেইনের মাদারবোর্ড ফেটে গিয়েছে। এই মহিলাকে তুই বোঝা! অনুরাগ!”
সাইবানের রুমটা দুই তলায়। অথচ সেখান থেকে নিচতলা অবধি তার চিৎকার চেঁচামেচির আওয়াজ স্পষ্ট ভেসে আসছে। ছেলের দারুণ হম্বিতম্বিতে বেপাত্তা সামিয়া সোফায় বসে পা ঝুলিয়ে ঝুলিয়ে আয়েশ করে পায়েস খাচ্ছেন। মধ্যখানে বিপাকে পড়ে যাওয়া ইরাম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কান্ডকারখানা দেখছে। মা ছেলের মাঝে এ কেমন দ্বৈরথ? হাসা উচিত নাকি দুঃখ করা উচিত বোঝা মুশকিল। কাজের মেয়ে সুগন্ধা অবশ্য একদম স্বাভাবিক। গুণগুণ করতে করতে খাবারের টেবিল গুছিয়ে নিচ্ছে। যেন আশেপাশে যা হচ্ছে তা এখানকার নিত্যদিনের ঘটনা। এমন সময় ওই মেয়ের ঠোঁটে গান আসে কীভাবে? এই বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষই একেকটা নমুনা।
“প্লীজ আয়, এক্ষণ আয়। কিসের বিজনেস মিটিং তোর শালা! দেখিস অনুরাগ, তুই যদি আজকে না আসিস তোর ফটো পোস্টারে ছাপিয়ে আমি সারা শহরের দেয়ালে সেঁটে দিয়ে আসব, নিচে বড় বড় করে লিখব এই ইভটিজারের থেকে সাবধান! দেখিস তুই!”
নিজের রুম থেকে বেরিয়ে বোধ হয় সাইবান ছাদের দিকে চলে গিয়েছে। ঠাস ঠুস শব্দ আসলেও এবার আর তার কথা স্পষ্ট শোনা যাচ্ছেনা। সামিয়া ধীরেসুস্থে পায়েস শেষ করেছেন ততক্ষণে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। হাসপাতালে যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে। ঠিক তখনি নিজেকে আর রুখতে পারলনা ইরাম। সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
“খালামণি? কিছু মনে করো না, তুমি গুরুজন। তবুও বলতে বাধ্য হচ্ছি, তুমি অযৌক্তিক কথা বলছ। এমনটা সম্ভব নয়।”
“কেমনটা সম্ভব নয়? সাইবানকে বিয়ে করাটা? কেন সম্ভব না?”
সামিয়ার স্বাভাবিক এবং সুচারু দৃষ্টিতে ইরাম খানিকটা অস্বস্তিবোধ করল। তারপরও বলল,
“জি। প্রথমত, তোমার মাথায় এমন একটা পরিকল্পনা কীভাবে আসলো সেটাই চিন্তার বিষয়। উপরন্তু, আমারও একটা মতামত বলে বিষয় আছে। আলাদিন আর আমি… খুবই বেমানান।”
“বয়সে তোর ছোট বলে বলছিস? নাকি পুরুষ সম্পর্কে ট্রমা হয়ে গিয়েছে বলে?”
ইরাম এক মুহূর্ত চুপ থাকল। তারপর জানালো,
“বিষয়টা এমন না। আলাদিনকে আমি ছোটবেলা থেকে দেখেছি। ঈদে কোরবানে আর কিছু না হোক টুক করে আমাদের বাড়িতে সালামি নিতে চলে যেত। হাতে দুই টাকা ধরিয়ে দিলেও এমনভাবে খুশি হত যেন ওর হাতে আমি চাঁদ তুলে দিয়েছি। এমন একটা স্মৃতি মাথায় গেঁথে আমি কীভাবে ওকে বিয়ে করতে পারি? ওকে আমি ভাইয়ের নজরে দেখে এসেছি। এর বেশি কিছু কোনোদিন ভাবিনি। তবে স্বামী হিসাবে কীভাবে ভাবতে পারি?”
“এখনও ভাইয়ের মতন দেখিস?”
চটজলদি উত্তর করতে চাইলো ইরাম। অথচ কিছুতেই মুখ থেকে “হ্যাঁ” উত্তরটা বের করতে পারলনা। কারণটা খুবই স্বাভাবিক। এত বছর পর নতুন করে দেখা মানুষটা তার পুরাতন আলাদিন নয়। ইরামের স্মৃতিতে সেই আলাদিন আজও ছোটটি। মায়া মায়া মুখ, মুখের দুপাশে খোঁচা খোঁচা সুঁচালো দুটি দাঁত। কথায় কথায় স্মিত হাসত, বয়সের তুলনায় বেশিই বোঝদার ছিল। এই আলাদিনের সঙ্গে সেই আলাদিনের কোনো মিল নেই। প্রাপ্তবয়ষ্ক সাইবানকে অনেকখানি অপরিচিত লেগেছে ইরামের। তাই অসত্য জবাব সে নিজের খালামণিকে দিতে পারলনা।
“জানিনা।”
ইরামের উত্তর শুনে সামিয়া মুচকি হাসলেন। বললেন,
“আমাকে যখন গুরুজন মানিস, তখন এটাও মাথায় রাখ আমি যা করছি ঠান্ডা মাথায় জেনেবুঝে এবং ভেবেচিন্তে করছি। সবার ভালোটাই ভাবছি, খারাপটা না। রইলো বাকি সাইবান? ওকে দেখতে হয়ত ঘাড়ত্যাড়া বাঁদরের মতন লাগে, তবে মনটা অবুঝ না। সময় দিয়ে বুঝিয়ে বললে ঠিক বুঝে যাবে।”
একটু থেমে তিনি আবার যুক্ত করলেন,
“তবে কাউকেই আমি জোরাজুরি করবনা। বিয়ে শাদীর ব্যাপার একেবারে অমতে হওয়াটা খারাপ ব্যাপার। তাই বলছি, তুই তোর পরিস্থিতি ভেবে দেখ। আজকের দিনটা সময় নে, ভালোমত চিন্তা কর। প্লীজ যুক্তি দিয়ে ভাবিস, আবেগ দিয়ে না। তোর মতন বোঝদার মেয়ে দুইটা হয়না। তুই নিজের আর ইযানের ভবিষ্যৎ ভেবে সিদ্ধান্ত নিস, এটাই আমার কামনা। এরপরও যদি মনে হয় তুই থাকবিনা, চলে যাবি, আমি আর তোকে আটকাবনা। আমি হাসপাতালে যাচ্ছি, আসতে রাত হবে। আর ঘরটা মাঝে মধ্যে ভূমিকম্পের মতন কেঁপে উঠতে পারে, মনে হবে কেউ বুঝি বুলডোজার চালাচ্ছে। ওটা সাইবানই, ভয় পাস না। ইযানকে দেখে রাখিস।”
নিজের কথা শেষ করে সামিয়া গটগট করে হেঁটে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে গেলেন, গাড়ি গেটের কাছে অপেক্ষা করছে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে। ইরাম নিজের জায়গায় থ হয়ে থাকল। মা নাকি ছেলে? কাকে বেশি আজব বলবে বুঝতে পারলনা সে।
সারাটা বিকাল ইরাম কাটাল ইযানের সঙ্গে রুমবন্দী হয়ে। সামিয়া যা বলেছিলেন তাই হয়েছে। ক্ষণে ক্ষণে বাইরে থেকে হম্বিতম্বির শব্দ ভেসে আসতে লাগল। মাঝে আবার দুটো বাইকও এসে হাজির হয়েছে। খুব সম্ভবত সাইবানের বন্ধুদের কেউ। তাদের কথাবার্তা অবশ্য সে শোনেনি, শোনার কিংবা জানার ইচ্ছাও নেই। এর চাইতেও গুরুতর একটা কাজ বাকি তার। সিদ্ধান্ত নেয়া!
সত্যি বলতে জীবনে বিয়ে করার সকল সাধ মিটে গিয়েছে ইরামের। কোনো পুরুষকে তার বিশ্বাস হয়না। বিশেষ করে যদি সেই পুরুষটি দেখতে শুনতে বেশি সুদর্শন হয়। পুরুষমানুষ সুন্দর হবে, তার তাদের মাঝে কোনো ঘাঁপলা থাকবেনা এমনটা অসম্ভব। তবে ইরামের ভাবনা এখন আর তার নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তার সমস্ত চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু হলো ইযান। ছেলেকে বুকে নিয়ে দোলাতে দোলাতে ইরাম ভাবলো, এই নিষ্পাপ বাচ্চাটাকে একটা চমৎকার এবং আরামদায়ক ভবিষ্যত দেয়ার ক্ষমতা কি তার আছে? এই ৩২ বছরের জীবনটায় সে অর্ধেক জগৎ দেখে ফেলেছে। জীবিকার তাগিদে এমন কোনো কাজ নেই যা সে করেনি। আর কত? সে কাজ জারি রাখত, যদি তাতে ইযানের ভবিষ্যৎ ভালো হওয়ার নিশ্চয়তা থাকত। কিন্তু এই তিনটা মাস একা কাটাতে গিয়ে সে বুঝেছে, সিঙ্গেল মাদারদের জীবন কেমন হতে পারে। যদি হাতে টাকা না থাকে, তাহলে তো কথাই নেই! সরকারি সম্পত্তি মনে করে সকলে। নারী এবং পুরুষ মহান সৃষ্টিকর্তা এমনি এমনি সৃষ্টি করেননি। তারা একে অপরের পরিপূরক। না একজন নারী কোনোদিন চলতে পারবে একজন পুরুষ ছাড়া, না একজন পুরুষ চলতে পারবে একজন নারী ছাড়া। সমাজের এই অবস্থা শুধুমাত্র এই নারী পুরুষদের অতিরিক্ত লোভ এবং মানসিক বিকৃতির কারণে। আর কিছুনা।
যদি ইরাম সাইবানকে বিয়ে করে, তাহলে সমাজ বিরাট আঙুল তুলবে। তবে, তার ইযান হয়ত একটু ভালো থাকবে। একটা সুস্থ, সুন্দর, স্বাভাবিক পরিবার পাবে। উম…স্বাভাবিক হয়ত না, একটু পাগলাটে পরিবার। তবে দিনশেষে ইরাম বিনা চিন্তায় ইযানের মুখে খাবার তুলে দিতে পারবে, পরের দিন খাবার পাবে কিনা সেই চিন্তা করতে হবেনা। আর্থিক এবং সামাজিক নিরাপত্তা, যা এখন খুব করে দরকার ইরামের। তার নিজের ট্রমা, নিজের জীবনের সকল না পাওয়াদের হিসাবের কোনো দরকার নেই এখানে।
সামিয়া বাড়িতে ফিরে এলেন সন্ধ্যার পর। কাজ একটু দ্রুতই শেষ করেছেন তিনি। নাহলে ফিরতে রাত হয় তার। তবে বাড়ির পরিস্থিতি বিবেচনা করে চলে এসেছেন। ইরাম তখন টেবিলে বসেছে। সুগন্ধা তাকে নাস্তা দিয়েছে। স্যান্ডউইচ, কফি, আর সামিয়ার নির্দেশমত ফল। ইযানকে দুলিয়ে যাচ্ছে সে, মাত্রই দুধ খাইয়েছে, এখন ছেলেটা তার আবার ঘুমাবে। ঘুমে ঢুলুঢুলু করছে চোখ। ইরাম মৃদু হেসে গুণগুণ করে যাচ্ছে,
“আয় আয় চাঁদ মামা টিপ দিয়ে যা~চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা~ আমার কুচুপু সোনাটা!”
ইযানের মুখটা অসংখ্য চুমুতে ভরিয়ে দিলো ইরাম, বিনিময়ে ছেলে তার ছোট্ট দুখানা হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরল তার গাল। দৃশ্যটি অদূর থেকে নিষ্পলক নয়নে দেখলেন সামিয়া, তার বুকটা ভীষণ উষ্ণতার জোয়ারে টইটুম্বুর হলো।
হঠাৎ মৃদু পায়ের শব্দে ইরাম এবং সামিয়া দুজনই মুখ ঘুরিয়ে তাকালেন। দুই তলার সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো সাইবান। পরনে একটা হাফ হাতা কালো টি শার্ট আর ঢোলা ট্রাউজার। হাফ হাতা হওয়ায় তার শক্ত গড়নের ফোলা বাহু চোখে পড়ছে স্পষ্টত। টি শার্টের কাপড় বুকের উপর চেপে বসেছে, ভাগ ভাগ করা পেশীর গঠন চোখে পড়ছে বেশ। খুব সম্ভবত শরীরচর্চা জাতীয় কোনো কাজ করছিল তাই এমন রূপ। ইরামের দিকে এক দফাও দৃষ্টি না ফেলে সে সোজাসুজি তাকাল সামিয়ার দিকে।
“হেই ব্রো।”
সাইবানের কন্ঠস্বরটা অতিরিক্ত শান্ত শোনালো। যেটা তার চরিত্রের সঙ্গে বেমানান। চোখ পিটপিট করল ইরাম। এই ছেলে এভাবে কাকে সম্বোধন করল? হতবাক হয়ে গেল সে যখন নিজের অ্যাপ্রোন খুলে চেয়ারে ঝুলিয়ে রাখতে রাখতে সামিয়া উত্তর করলেন,
“বল ব্রো।”
“রুমে চলো, তোমার সাথে প্রাইভেট কথা আছে আমার।”
“ওকে। চল।”
সামিয়া সাইবানের পিছু পিছু নিচতলার একটা রুমের ভেতর আড়াল হয়ে গেলেন। দরজাটা ঠাস করে লেগে গেলো। ইরাম স্তব্ধ হয়ে বসে চেয়েই রইল।
──────────────────────────
সামিয়া পরনের শাড়ির কুঁচিটা খানিক ঢিলেঢালা করে বিছানায় বসলেন। সাইবান অযথাই শব্দ করে দরজাটা বন্ধ করে সেটায় ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়েছে। বুকে দুবাহু ভাঁজ করে রেখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে জননীকে দেখছে।
“বল কি বলবি। আমার টায়ার্ড লাগছে। গোসল সেরে একটা লম্বা ঘুম দিতে হবে।”
সাইবানের ভ্রুজোড়ায় তীব্র কুঞ্চন সৃষ্টি হলো। বাম ভ্রুতে থাকা পিয়ার্সিং হালকা হলুদাভ আলোয় জ্বলজ্বল করে উঠল।
“হোয়াটস গোয়িং ইনসাইড ইওর প্রিটি লিটল হেড?”
“হোয়াট ডু ইউ থিংক মাই বয়?”
এবার সত্যিই বিরক্তবোধ করল সাইবান। হেলান ছেড়ে ভেতরে এগিয়ে গেল সে।
“মম। প্লীজ। ডোন্ট প্লে উইদ মি। আমি আর ছোট বাচ্চা না। কয়েক মাস আগেই পঁচিশতম জন্মদিন পালন করেছি।”
“ওহ। অনেক বড় হয়ে গেছিস।”
“এতটাও বড় হইনি যে আমাকে বিয়ে দিতে উঠেপড়ে লাগতে হবে তোমার।”
“উঠেপড়ে লাগলাম কোথায়? আমি স্রেফ আমার বাড়ির বউ হিসাবে কাকে পছন্দ করেছি সেটা জানিয়েছি। এতে তুই এত লম্ফঝম্ফ করছিস কেন?”
“কেন করছি তুমি জানো না? আমি আজ অবধি তোমার একটাও কথা ফেলিনি! তুমি জানো!”
“তবে এটা ফেলে দে। মানা করেছি নাকি?”
নিজের কপালে আঙুল ঘষে রাগ নিয়ন্ত্রণ করল সাইবান। মেজাজ গরম হয়ে যাচ্ছে তার। পান থেকে চুন খসলেই সে গরম তাওয়ার মতন ছ্যাঁৎ করে উঠে! সেখানে সে এতক্ষণ যাবৎ নিজেকে শান্ত রেখেছে এই বেশি।
“বাড়ির বউ, মাই ফুট! একটা ৩২ বছরের ডিভোর্সী মহিলা সঙ্গে একটা পরপুরুষের বাচ্চা! খুব ভালো চয়েয তোমার, মম!”
“সাইবান আলাদিন!”
সামিয়ার শীতলতম কন্ঠস্বর ভেসে আসতেই সাইবান না চাইতেও সামান্য কেঁপে উঠল। জননীর এই কন্ঠটা তার বহু অচেনা। কালে ভদ্রে কখনো শোনা যায়। তার সম্পূর্ণ নাম নিয়ে ডাকার অর্থ সামিয়া আর মজার মুহূর্তে নেই, তিনি বাস্তবতায় আছেন।
“মানুষকে মানুষ হিসাবে সম্মান দিতে না জানলে তাকে নিয়ে কথা বলা বাদ দে। বড় শুধু গায়ে গতরেই হয়েছিস, চরিত্রে না!”
কথাটা ভীষণ গায়ে লাগলো সাইবানের। হাতের মুঠো শক্ত করে ফেলল সে। একটা পর মেয়ে, যার এর আগে কোনো হদিস অবধি ছিলনা, হঠাৎ করে উদয় হয়েছে তার জন্য আজ সে নিজের মায়ের কাছে এইভাবে কথা শুনছে বিষয়টা মানতে নারাজ তার অন্তর। সামিয়া নিজের বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। ছেলের মুখোমুখি হয়ে বললেন,
“আমি কেন ইরামকে এই বাড়ির বউ বানাতে চাচ্ছি জানতে চাস তো? বেশ তবে, শোন। বাপ মারা যাওয়ার পর থেকে ইরাম একা হাতে দুই ভাইকে মানুষ করেছে। নিজের পাগল মা, দুইটা ভাইয়ের পড়াশোনা, তাদের খরচ, পরিবারের খরচ সব একা হাতে টেনেছে ওই একটা মেয়ে। পরিবারের বড় মেয়ে কিনা! কত কষ্ট করে নিজের পরিবারকে টেনে মানুষ করেছে সেটা তোর আমার নিজের চোখে দেখা। সামান্য সাহায্যটুকু কোনোদিন নেয়নি, শুধু ঈদের সময়ে উৎসবের নামে কিছু কাপড়চোপড় দিতে পারতাম ভাগনে ভাগনিদের। এরপর তো সেটাও বন্ধ হয়ে গেল। আমরাও খোঁজ নেয়া ছেড়ে দিয়েছিলাম। তুই দেখেছিস কি অবস্থার মধ্য দিয়ে গিয়েছে মেয়েটা? বিয়ে হলো, বাচ্চা হলো, স্বামীর ঘরটা অবধি শান্তিতে করতে পারলনা। যখন সব হারিয়ে শুধু একটা যক্ষের ধনকে নিয়ে ভাইয়ের বাড়িতে আসলো, তখন ভাইটাও তাকে রাখলনা। এমনি কুলাঙ্গার ভাই, যে মাতৃতুল্য বোন পেলেপুষে বড় করেছে, চাকরি দিয়েছে তাকে তাড়িয়ে দিতে দুইবার চিন্তা করলনা। একবারও ভেবে দেখেছিস মেয়েটার জীবনে কত কষ্ট?”
সাইবান নিঃশব্দে শুনল। কোনো কাহিনী তার অজানা নয়, শুধু শেষের অংশটুকু ছাড়া। মুখে রাগের ভাবটা কমে এলেও পুরোপুরি দমলোনা সে।
“ঠিক আছে, মম। তোমার কথা আমি বুঝতে পারছি। আমিও পাষাণ না, ওকে? তোমার চ্যারিটি করার ইচ্ছা হয়েছে, করো না! মানা করেছে কে? ইরাম আপুকে ঘরে রাখবে? রাখো। ওনার বাচ্চাকে পালবে? পালো। আমার কন্ট্রিবিউশন চাইলে আমি প্রতি মাসে সেটাও করব। কিন্তু সোজা বিয়ে পর্যন্ত টেনে নেয়ার মানে কি?”
সামিয়াকে এবার বেশ অসন্তুষ্ট মনে হলো।
“চ্যারিটি? কন্ট্রিবিউশন? কবে এত অধঃপতন হলো তোর? ছোটবেলায় এত ইরাম আপু ইরাম আপু করতিস, জানিস না তার আত্মমর্যাদা কোথায়? তোর মনে হয় আমরা চ্যারিটি করতে চাইলেই সে হাত পেতে নেবে? মধ্যবিত্তকে আর কিছু আল্লাহ দিক বা না দিক, আত্মসম্মানটুকু দেয় ভরে ভরে। হাত পাতার মতন অবস্থায়ও তারা হাত মুঠ করে ঠোঁট কামড়ে লড়ে যায়।”
ভিন্নদিকে তাকিয়ে আগের তুলনায় কিছুটা শান্ত গলায় তিনি যুক্ত করলেন,
“তাছাড়া আমার বাসায় একটা প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে আছে। আরেকজন প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে, উপরন্তু ডিভোর্সী খালাতো বোনকে দিনের পর দিন বাড়িতে জায়গা দিলেও সমাজের সমস্যা হয়ে যাবে। খাওয়া পড়া তারা দিক বা না দিক, সালিশটা ঠিকই বসাবে।”
“৩২ বছরের মেয়ের সাথে ২৫ বছরের একটা ছেলেকে বিয়ে দিলে সমাজ সালিশ বসাবে না বলছ?”
“অবশ্যই বসাবে। আরও বড় সালিশ বসাবে। কিন্তু তখন অন্তত আমি গলা চড়িয়ে আমার ঘরের বউয়ের সম্মান বাঁচাতে লড়তে পারব। শুধুমাত্র ভাগনির জন্য এতকিছু করার সুযোগ নেই। বুঝেছিস?”
“বুঝলাম।”
হঠাৎ করে উল্টো ঘুরে দরজার মাঝে ধড়াম করে একটা শক্তিশালী ঘুষি বসিয়ে দিলো সাইবান। প্রবলভাবে কেঁপে উঠল চারপাশ, ভয়ানক একটা শব্দ হলো।
“এটাই বুঝলাম যে বাড়ির একমাত্র ছেলে সবসময় আদরের দুলাল হয়না, মাঝে মাঝে বলীর পাঠাও হয়!”
ভাঙচুরের শব্দ আরম্ভ হলো তৎক্ষণাৎ। সাইবানের হাতের ধাক্কায় শো পিস, দেয়ালের ফটোফ্রেম সব আছড়ে পড়তে লাগল মেঝেতে।
“আমি পারবনা ওনাকে বিয়ে করতে!”
“গলা নিচে। একদম চিৎকার চেঁচামেচি করবিনা। পরিস্থিতির জটিলতা বোঝার চেষ্টা কর।”
ছেলেকে সামলাতে চাইলেন সামিয়া। কিন্তু পারলেন না। তার ছেলে সাক্ষাৎ ঝড়, ঝড়কে কাবু করাটা মুশকিল।
“আমি কোনোদিন ইরাম আপুকে বিয়ে করবো না! কোনোদিন না!”
“আমার কথাটা একবার…”
“না, না, না, এবং না! নো, নেভার! নেভার এভার ইন মাই লাইফ আই উইল ম্যারি আ সিনিয়র উইম্যান!”
না পারতে সামিয়া এবার পাল্টা চেঁচিয়ে উঠলেন,
“ফাইন! করবিনা বিয়ে? করিস না! রাখিস না আমার কথাটা। আমার কিচ্ছু যায় আসেনা। আমি নিজেরটা আর ইরামেরটা বুঝে নেব, ঠিক আছে? শুধু এরপর আর কোনোদিন আমার মুখ থেকে তোর কাছে কোনো চাওয়া উচ্চারিত হবেনা, এটুকু জেনে রাখিস!”
সাইবান হঠাৎ করেই জমে গেল। ঝট করে পিছনে ফিরে তাকাল। বহু বছর বাদে সেদিন রাতে প্রথমবারের মতন ছেলের তেজী দৃষ্টির মাঝে অসহায়ত্ব দেখলেন সামিয়া।
──────────────────────────
সারা রাত ঘুম হয়নি ইরামের। ছটফট করেছে সে। দরজার বাইরে থেকে যে চিৎকার চেঁচামেচি সে শুনেছে, এরপর যেভাবে সাইবানকে ঝড়ের বেগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে দেখেছে তাতে শান্তি মেলা ভার। তার জন্য মা ছেলের মাঝে একটা অঘোষিত যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে বিষয়টা খুব খারাপ লেগেছে তার। আজকেই চলে যাবে সে। তাতে যা হওয়ার দেখা যাবে।
ইযান বরাবরের মতই ঘুমাচ্ছে। ভোররাতের দিকে খাইয়ে তাকে শুইয়েছে ইরাম। ছেলে ঘুমে থাকতেই সে নিজের লাগেজ টেনে ছোট্ট একটা ব্যাগ বের করল। উপুড় করে ঢেলে দিল সমস্তটা। দুটো পুরাতন বিশ টাকার নোট, সঙ্গে একটা রুপার আংটি পাওয়া গেল। এই আংটিটা তার অতি শখের। বাবার গড়িয়ে দেয়া শেষ স্মৃতি, শেষ সম্বল। মৃত্যুর আগ অবধি বস্তুটাকে হাতছাড়া করতে চায়নি সে। কিন্তু ইযানের ঘুমন্ত ছোট্ট মুখটা নজরে আসতেই সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হলোনা তার। পুরাতন বাটন ফোনটা তুলে কল করল। ওপাশ থেকে রিসিভ হতেই বলল,
“হ্যাঁ, আমি। আমাকে শুধু দুটো দিন থাকতে দেবে? কথা দিচ্ছি, কোনো সমস্যা করবনা। শুধু ইযানকে ডাক্তার দেখাব আর নতুন মেস দেখে উঠে পড়ব। জরুরী দরকার, প্লীজ যদি একটু ব্যবস্থা করা যায়? হ্যাঁ….ওহ! থ্যাংক্স! সত্যি! অনেক কৃতজ্ঞ থাকলাম। আমি দুপুরের আগেই চলে আসব। ওকে, রাখছি।”
ফোনটা কেটে একটি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল ইরাম। আগামী দুই তিন দিনের জোগাড় হয়েছে। এবার শুধু খালামণিকে বলে কোনো ভালো শিশু বিশেষজ্ঞের সন্ধান নিয়ে ফিরে যাবে। ইযানকে পাতলা কম্বল টেনে ঢেকে কপালে একটা চুমু দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে এলো ইরাম। সামিয়ার রুমটা নিচতলায়, কিন্তু একদম অপর পাশে। ডাইনিং রুম ঘুরে যেতে হবে।
ডাইনিং রুমের ভেতরে পা রাখতেই ইরাম থমকাতে বাধ্য হলো। কারণ, টেবিলে বসে আছে সাইবান স্বয়ং! ফিরল কখন? রাগ শেষ? মুখ দেখে তো মনে হচ্ছেনা। টেবিলে বড়সড় একটা আর্ট পেপার ছড়িয়ে মার্কার দিয়ে খচখচ করে কিছু লিখছে ছেলেটা। অত্যন্ত মনোযোগী দৃষ্টি। হাতছাড়া ট্যাংক টপ আর জিন্স পরনে। শার্ট ছিল, যেটা ছুঁড়ে ফেলে রেখেছে সোফার উপর। ইরাম না পারতে খানিকটা কৌতূহলী হয়ে কাছে সরে উঁকি দিলো। একটা পোস্টার বানিয়েছে সাইবান। তাতে গোটা গোটা অক্ষরে লিখা:
॥ প্রফেশনাল হাসব্যান্ড! প্রফেশনাল হাসব্যান্ড!
আপনি কি অসহায়? একাকীত্বের ভার বইতে পারছেন না? চান একজন নির্ভরযোগ্য বড়লোক সঙ্গী? যে শুধু আপনাকে কেন? আপনার বাচ্চা গাচ্চা দাদি নানী চোদ্দ গুষ্টি পেলেপুষে দেবে? তবে হে রমণী, এই বিজ্ঞপ্তি আপনারই জন্য। আপনার বয়স যত বড়ই হোক না কেন, তার চাইতেও বড় হতে হবে আপনার মন। যেন সেখানে আমার জায়গা হলেও কু মতলবের জায়গা না হয়। আপনাদের সেবায় আছি আমি। প্রফেশনাল হাসব্যান্ড, সাইবান আলাদিন। বুকিং করতে আজই যোগাযোগ করুন এই নাম্বারে।
প্রফেশনাল হাসব্যান্ড
০১*॥
“এই! এই!”
প্রথমবারের মতন সদা শান্ত ইরামও আঁতকে না উঠে পারলনা। এই ছেলের মাথা আসলেই নষ্ট। পুরোপুরি নষ্ট। সাইবান মার্কারের ক্যাপ ঠোঁটে গুঁজে রেখে তার দিকে তাকাল, পরক্ষণে বাঁকা হেসে লাফিয়ে টেবিল থেকে নেমে পড়ল। হেলেদুলে পোস্টার নিয়ে বাড়ির বাইরে চলে গেল। ইরাম না পারতে ছুটে গেল তার পিছু পিছু।
বাড়ির বাইরে গেটের কাছের দেয়ালে আঠা দিয়ে সুন্দর করে পোস্টারটা লাগাচ্ছে সাইবান। দারোয়ান একপাশে দাঁড়িয়ে হা করে ঘরের ছেলের কাহিনী দেখছে। ইরাম হাঁপাতে হাঁপাতে পৌঁছাল।
“আলাদিন! তোমার মাথা…খারাপ হয়ে গিয়েছে?”
“না তো। আমার মাথা একদম চকাচক আছে। নতুন বিজনেস আইডিয়া পেয়েছি। যদি আমাকে ব্যবহৃত হতেই হয়, তবে ভালোমতোই হই। কি বলেন, আপু?”
ইরাম আর সইতে পারলনা। এগিয়ে গিয়ে খপ করে সাইবানের একটা হাত পাকড়াও করল। অপর হাতে সদ্য বসানো পোস্টারটা দেয়াল থেকে ছিঁড়ে উঠিয়ে ছুঁড়ে ফেলল রাস্তায়। ক্রুব্ধ দৃষ্টিতে দেখল সাইবানকে, যে এই মুহূর্তে বেশ খানিকটা বিস্ময় নিয়ে তার হাতে ধরা নিজের হাতটার দিকে চেয়ে আছে।
“একটা ৩২ বছরের ডিভোর্সী মহিলা সঙ্গে একটা পরপুরুষের বাচ্চা নিয়ে খুব সমস্যায় পড়ে গিয়েছ, তাইনা? সরি! আই অ্যাম সরি! চলে যাচ্ছি, শান্তিতে থেকো তুমি। তবুও, জাস্ট স্টপ দিস ননসেন্স, উইল ইউ?”
ইরামের দৃঢ় কন্ঠস্বরে সাইবানের চেহারায় অদ্ভুতুড়ে একটা অভিব্যক্তি ফুটে উঠল। পাল্টা বাঁকা হেসে দৃপ্ত গলায় সে বলল,
“কোথায় চলে যাবেন? লম্পট স্বামীর কাছে? ওয়েল, নট হ্যাপেনিং এনিমোর। হঠাৎ করেই আমার অন্যের হক মেরে দেয়ার ভীষণ রকম ক্রেভিংস উঠেছে। তা সে হকটা হোক আপনার এক্স হাসব্যান্ডের….”
──চলবে──
[ লাগবে নাকি প্রফেশনাল হাসব্যান্ড?🫦 ]
Share On:
TAGS: আমার আলাদিন, জাবিন ফোরকান
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
আমার আলাদিন পর্ব ২০
-
আমার আলাদিন পর্ব ১৩
-
আমার আলাদিন পর্ব ১৬
-
আমার আলাদিন পর্ব ৫
-
আমার আলাদিন পর্ব ১২
-
আমার আলাদিন পর্ব ৭
-
আমার আলাদিন পর্ব ৬
-
আমার আলাদিন পর্ব ১৫
-
আমার আলাদিন গল্পের লিংক
-
আমার আলাদিন পর্ব ১৪