মেজর_ওয়াসিফ
লেখনীতেঐশীরহমান
পর্ব_১৮
[ 🚫 কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫]
পাত্র পক্ষ আপাকে দেখতে আসছে!
সকাল সকাল ঘুম ভাঙতেই এমন একটা খবরে হালকা-পাতলা হোচট খেলো ধারা। চোখ থেকে ঘুমের ভাব পুরোপুরি সরেনি ওর। তবুও ঘুমকে তুড়িতে উড়িয়ে বিছানা হাতরে ওড়না কোনোরকম নিয়ে গায়ে জড়ালো। গতকাল মাঝরাতে লুইপা দরজা খুলতেই ধারা ঢুকে পড়েছিলো এ ঘরে। তারপর শত চেষ্টা করেও লুইপা ওকে আর বের করতে পারেনি। ধারা হুড়মুড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে একবার পুরো ঘরটা দেখলো কোথাও লুইপা নেই। ধারার অচেতন মন বলে, ‘ কোথায় গেলো তার আপা, মুনিব ভাই এতকাল পর ঘটা করে বিয়ের জন্য দেখতে আসছে এমন একটা খবরে তার আপা খুশির ঠ্যালায় কোথাও বেহুশ হয়ে পড়ে রইলো না তো, হায় সর্বনাশ’
ধারা এক প্রকার খরগোশের ন্যায় ছুটতে ছুটতে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। আচমকা ওয়াসিফের ঘরের সামনে যেতেই পুরুষালি কর্কশ শব্দে ওর দ্রুত চলা পা দুটো থেমে দাড়িয়ে পড়ে। ঘরের ভেতর থেকে ওয়াসিফ বলে ওঠে।
‘ যাস কোথায় ‘?
ধারা একটু এগিয়ে উঁকি দিলো ঘরে, দেখলো ওয়াসিফ বিছানায় আধশোয়া হয়ে আছে। ধারা কন্ঠে কৌতুহল নিয়ে জানতে চাইলো।
” আজ নাকি আপাকে দেখতে আসছে? ঘটনা কি সত্যি “?
ওয়াসিফ ও কথার সোজা উত্তর না দিয়েই জিজ্ঞেস করে।
” তাতে তোর খুশি হওয়ার কারণ কি? তোকে তো আর দেখতে আসছেনা, আর তা সম্ভব ও না”
এতক্ষণ খুশি খুশি থাকা মুখটা ধুপ করে নিভে গেলো ধারার। ঘুমের ভাব পুরোপুরি কেটেছে ওর। ও খুশি হবেনা? এই লোক বলে কি? চোখের সামনে দু’টো মানুষের লুকোচুরি করে চার বছর প্রেম দেখলো। ঐ দু’টো মানুষের মনে কত ভয়! কত সংশয় ছিলো, এই সম্পর্কের পরিণতি নিয়ে। অতঃপর আজ তাদের ইচ্ছে, বাসনা পূর্ণ হতে চলেছে। আর ধারা এসব দেখে খুশি হবে না? মুখে একটা ভেঙছি কেটে ধারা কথার কোনো জবাব না দিয়ে ওখান থেকে চলে যেতেই ওয়াসিফ ফের বলে।
” এই দাঁড়া! দাঁড়া তুই “
সঙ্গে সঙ্গে ধারা আবারও দাড়িয়ে পড়ে। দেখলো ওয়াসিফ বিছানা থেকে উঠে ওর দিকেই আসছে। ধারা স্থির হয়ে দাড়িয়ে থেকে বলে।
” কি হয়েছে বলুন”?
ওয়াসিফ দরজার দিকে এগোতে এগোতে বলে।
” ভেতরে আয়, শুনে যা”
চটজলদি ধারা বলে বসে।
” আমি কোনো পর পুরুষের ঘরে ঢুকিনা”
ওয়াসিফ অবাক ভঙ্গিতে শুধায়।
” কি”?
” শুনেন নি”?
” তোর কি মাথায় সমস্যা “?
” নাহ”
” আমি পর-পুরুষ হলে বাকিরা কি”?
” বাকিরাও পর পুরুষ “
” তাহলে আমি কি”?
” আপনি ও পর পুরুষ “
কথার এই পর্যায় এসে ওয়াসিফের মেজাজ খারাপ হয়, ও দু কদম এগিয়ে হাত বাড়াতেই ধারা দেয় ভো দৌড়। ওয়াসিফ দরজার কাছে এগিয়ে কটমট চোখে তাকিয়ে থাকে ওর দৌড়ে চলে যাওয়ার দিকে। দাঁতে দাঁত চেপে ওয়াসিফ বিড়বিড় করে বলে।
” পর পুরুষ কাকে বলে? কত প্রকার কি কি? উদাহরণ সহ বুঝাইতাম। তুই পালিয়ে গেলি কেনো ফাজিল”!
দৌড়ে ছুটে গিয়ে রান্না ঘরের পাশে দাড়িয়ে বুকে হাত চেপে জোরে জোরে দম নিয়ে হাফ ছাড়ে। বিড়বিড় করে বলে।
” আপনি আমার জন্য পর পুরুষ, পর পুরুষ, পর পুরুষ। আমি একথা বারবার বলবো। পারলে আপনি ঠ্যাকান”
বিকেল নাগাদ এবাড়ির বসার ঘরে এক প্রকার হিড়িক পড়ে গেছে। মুনিবের বাড়ি থেকে সতেরো সদস্য মিলে দেখতে এসেছে লুইপাকে। বসার ঘরে এক রত্তি জায়গা ফাঁকা নেই। বাড়ির তিন গিন্নী মেহমান আপ্যায়নে ছোটাছুটি করছে এঘর থেকে রান্না ঘর, রান্না ঘর থেকে বসার ঘর। বাড়ির দুই কর্তা বসেছে সোফায় মেহমানদের সঙ্গে।
ধারা দোতলার সিড়ির কাছে দাড়িয়ে থেকে চুপচাপ দেখছে সেসব। ও বুঝতে উঠতে পারছেনা, এতো লোক এভাবে একসঙ্গে জোট বেঁধে কিভাবে মেয়ে দেখতে আসতে পারে? এটা কি বিয়ে যে সবাই বরযাত্রী এসেছে? বাড়ি গুড়ো থেকে বুড়ো সবগুলো কে ধরে বেধে নিয়ে এসেছে কি মুনিব ভাই?
ধারা আরেকটু ভালো ভাবে উঁকি ঝুঁকি দিয়ে দেখলো আপাতত বসার ঘরে ওয়াসিফ নেই। মুনিব ভাই চুপচাপ মাথা নুইয়ে একটা সিঙ্গেল সোফাতে ভদ্র সভ্য হয়ে বসে আছে। ধারা এটাও খেয়াল করলো, প্রায় ওর বয়সী বা ওর থেকে একটু ছোট বড়ো বয়সের দুটো মেয়ে বসে আছে। যতটুকু যা ধারনা তাতে ধারা বুঝলো এই দুটো মুনিব ভাইয়ের চাচাতো বোনেরা। মেয়ে দুটোর সাজ সজ্জা ভীষণ। তাদের দেখে কেউ বলবেনা এরা আজ পাত্রী দেখতে এসেছে, বরং বলবে এরা বিয়ের দাওয়াতে এসেছে। সে যাই ই হোক তাতে ধারার বিশেষ কোনো মাথা ব্যথা নেই। যার মুখ তার সাজ, তার মেকাপ। বিষয়টা তাচ্ছিল্য করে উড়িয়ে দিয়ে ধারা সবে ওখান থেকে সরে যেতেই দেখলো ওয়াসিফ কে। ওয়াসিফ গায়ের টিশার্ট পাল্টে সাদা পাজামা পানজাবি পড়েছে। আর সেই পানজাবির হাতাটা ভাজ দিতে দিতে ভদ্রলোক এগিয়ে আসছে সিড়ির দিকে। ওয়াসিফ কে ওভাবে সেজেগুজে আসতে দেখে ভ্রু গোটালো ধারা, পরপর মনে মনে ভাবে, এই লোকের হঠাৎ কি হলো? এতো সাজগোছ কেনো এর? পরপর চোখ সরিয়ে তাকায় মুনিব ভাইয়ের দিকে। আবার তাকায় ওয়াসিফের দিকে। যে আসছে মেয়েকে ঘটা করে দেখতে তার মধ্যে সাজগোজের ছিটেফোঁটাও নেই অথচ এই লোক পুরো ফিটফাট সদরঘাট হয়ে পটের বাবু সেজে যাচ্ছে সেখানে। বিয়ে কি এর? এ কি আবার বিয়ে করবে?
ধারা শুধু চোখ ঘুরিয়ে ওয়াসিফকে দেখে, ওর সামনে দিয়ে, ওর পাশ কাটিয়ে লোকটা এই মাত্র চলে গেলো, অথচ একবার ওকে দেখলোও না। এমন ভাব যেনো এখানে ধারা বলতে কোনো মানুষ ই নেই।
ধারা জায়গা থেকে নড়লোনা আর, ও সিড়ির রেলিঙ ধরে খামি হয়ে দাড়িয়ে রইলো। ওয়াসিফ গিয়ে মেহমানদের সালাম দিয়ে মায়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের আপ্যায়নে ব্যস্ত হলো। আর ধারা সূচালো দৃষ্টি ফেলে দেখতে থাকলো যেইনা ওয়াসিফ সেখানে গিয়ে উপস্থিত হয়েছে ওমনি মেয়ে দুটোর ভঙ্গিমা যেনো কয়েকগুণ বেড়ে গেলো। একজন তো চুল ঠিক করছে অন্যজন নড়েচড়ে ফ্যাশান করে বসছে। মানে তাদের উদ্দেশ্য ওয়াসিফের নজরে পড়া। ধারা মেয়ে দুটোকে দেখে নিয়ে এবার খেয়াল করে ওয়াসিফের দিকে তাকায়, ওয়াসিফ তখন ভীষণ ব্যস্ত মেহমানদের সঙ্গে আলাপে। ধারার সূচালো দৃষ্টি আপাতত ওয়াসিফের উপর থেকে সরছেনা। ও ঐখানে দাড়িয়ে বিড়বিড় করে।
‘ আরে একবার তাকিয়ে দেখুন, আসমান থেকে দুই পরী নেমে এসেছে আপনার জন্য। একটু মনোযোগ দিননা সেদিকে, দিননা দিন। একবার একটু তাকান, আপনি ও ভাব নিন ওদের সঙ্গে, আমি কোনোরকম একটা পয়েন্ট পাই, আপনার ঘাড় চেপে তালাক নিবো’
কিন্তু! ওয়াসিফের দৃষ্টি সবার দিকে গেলেও, মেয়ে বা ঐ বাড়ির বৌগুলোর দিকে মোটেও গেলোনা। ওয়াসিফ মেহমানদের সঙ্গে আলাপ সেরে চাচার সঙ্গে একটু নিরিবিলি ওপাশে সরে গেলো জরুরি কথা বলতে।
ওয়াসিফ ঐখান থেকে চলে যেতে ধারাও আর সিড়ির কাছে দাড়িয়ে থাকেনা। ছুটে যায় ঘরে যেখানে ওর আপাকে, আপার দুই বান্ধবী সাজিয়ে গুছিয়ে দিচ্ছে।
ও চুপচাপ খাটে বসে, পা দোলাতে দোলাতে দেখতে থাকতে আপাকে। আজকে আপাকে ভারি সুন্দর লাগছে ওর চোখে। কখনো সাজগোছ না করা মেয়েটা আজ শাড়ি পড়েছে, মুখে চোখে হালকা পাতলা সেজেছে। এতেই যে কি সুন্দর লাগছে!
ধারা খুশিতে গদগদ হয়ে মোহনাকে বলে।
” মোহনা আপু, আপাকে সাজানো হয়ে গেলে একটু কানের পাশে কাজলের কালি ছুঁইয়ে দিও, যাতে নজর না লেগে যায়। আপাকে আজ ভারি মিষ্টি লাগছে”
ওর কথায় ওরা দু’জন হাসে চুপচাপ। লুইপা বোনের দিকে তাকিয়ে বলে।
” তুই ওভাবে বসে আছিস কেনো? তুই সাজবি না”?
ধারা সটান হয়ে বিছানায় হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ে, বলে।
” আমি সাজতে যাবো কোন দুঃখে আমাকে কি পাত্র পক্ষ দেখতে এসেছে নাকি? আজকের দিন শুধু মাত্র তোর আর মুনিব ভাইয়ের। তোরা সাজ, আমি এই মাত্র দেখে এলাম মুনিব ভাই একটুও সাজেনি, কেমন একটা ম্যারমেরে শার্ট পড়েই চলে এসেছে, বেচারা মনে হয় অনেক টেনশনে আছে বুঝলি আপা?”
লুইপা শুধু মুচকি হেসে নিজেকে দেখে আয়নায়, কোনো কথা বলেনা। তারপর আবার ধারাকে তাড়া দিয়ে বলে।
” তুই ও একটা শাড়ি পড়”
ধারা শোয়া থেকে উঠে বসে অবাক ভঙ্গিতে শুধায়।
” কেনো”?
লুইপার সোজাসাপ্টা জবাব।
” তুই বিবাহিত মহিলা, বাড়িতে তোর বর আছে, আজ একটু শাড়ি পরে সুন্দর করে সেজেগুজে তার সামনে দিয়ে ঘুরতে তো পারিস “
ধারা আপার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনে বললো।
” তারপর? এতে আমার বিশেষ লাভ কি হবে”?
” লাভ হবে এই, যে তুই আজকের দিনে তোর বরের চোখে সুন্দর একটা বৌ হয়ে ফুটে উঠবি”
ধারা আবার ও ঠাস করে বিছানায় শুয়ে পড়ে ভীষণ ক্লান্ত কন্ঠে বলে।
” আমি ওতো ফুটতে পারছিনা আপা, আজ বরং সবকিছু বাদ দিয়ে তুই একমাত্র ফুটে ওঠ মুনিব ভাইয়ের চোখে “
লুইপা আর কথা বলেনা, চেনে ভালো করে এই মেয়েকে। এতো বড়ো ত্যাড়া ও লাইফে আরেকটা দেখেনি এমন। লুইপা ভেবে পায়না, ভাইজান কেনো এটাকে এখনো এভাবে সহ্য করে যাচ্ছে। তার মতো মানুষ এটাকে তুলে কায়দা মতো একটা আছাড় মারলে ত্যাড়ামো চিরতরে বিদায় হয়।
চলবে
Share On:
TAGS: ঐশী রহমান, মেজর ওয়াসিফ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৯
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৪
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৬
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ১৬
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ২
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ১২[ ১ম অংশ ]
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৭
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৩
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৮
-
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ১