Golpo ডার্ক রোমান্স ডিজায়ার আনলিশড

ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৩৬


ডিজায়ার_আনলিশড পর্ব-৩৬

✍️ সাবিলা সাবি
পর্ব-৩৬
.
.
.
বিকেলের সূর্যটা তখন চারুকলার লাল ইটের দেয়ালগুলোতে এক ধরনের ম্লান আভা ছড়াচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অংশটা সবসময়ই একটু শান্ত, একটু অন্যরকম। চারুকলার পেছনের সেই ছোট ক্যাফেটেরিয়াতে বসেছিল লুসিয়া। তার সামনে এক কাপ কফি, যা অনেকক্ষণ আগেই ঠাণ্ডা হয়ে বরফ হয়ে গেছে। লুসিয়ার সমস্ত মনোযোগ ছিল তার ফোনের স্ক্রিনে, কিন্তু তার কান ছিল চিতার মতো সজাগ। ওই লম্বা চুলওয়ালা ছেলেটি, যে ফারহানের পুরনো বন্ধু বলে দাবি করেছিল, সে বলেছিল—ফারহান নাকি এখনো মাঝে মাঝে এখানে আসে। বিষণ্ণতা কাটানোর জন্য এটা নাকি তার পুরনো অভ্যেস।

লুসিয়া ফোন স্ক্রল করছিল, কিন্তু তার মনের ভেতরে এক ধরনের অস্থিরতা কাজ করছিল। হঠাৎ ক্যাফেটেরিয়ার দরজায় একটা গটগট শব্দ হলো। দুজন ব্যক্তি ভেতরে ঢুকে ঠিক লুসিয়ার সামনের টেবিলটাতে বসল। লুসিয়া দ্রুত মাথা নিচু করে নিল। মেক্সিকান চেহারার এই সুন্দরী মেয়েটিকে বাংলাদেশের এই সাধারণ আড্ডার জায়গায় সহজেই চেনা সম্ভব, তাই সে নিজেকে আড়াল করে রাখল। লোক দুটি নিচু স্বরে কথা বলছিল। লুসিয়া প্রথমে পাত্তা দেয়নি, কিন্তু একজনের গলার স্বর শুনে তার মেরুদণ্ড দিয়ে এক শীতল স্রোত বয়ে গেল। এই টান, এই গভীরতা সে কি তবে ভুল শুনছে? নাকি তার অবচেতন মন কেবল তাকে বিভ্রান্ত করছে?

প্রায় বিশ মিনিট পর লোক দুটি চেয়ার টেনে উঠে দাঁড়াল। তারা যখন ক্যাফে থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে পশ্চিমের জানলা দিয়ে আসা পড়ন্ত রোদের এক ঝলক একজনের মুখে এসে পড়ল। লুসিয়া এক মুহূর্তের জন্য পাথরের মতো জমে গেল। ওই চোখের তীক্ষ্ণতা, আর চিবুকের গঠন আর সেই চেনা হাঁটার ভঙ্গি—যা সে মেক্সিকোতে অনেকবার বার দেখেছে।

“ফারহান!” লুসিয়া অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করে উঠল।
তার মস্তিষ্কের সমস্ত নিউরনএকসাথে সক্রিয় হয়ে উঠল। সে আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না।

টেবিলের ওপর কফির কাপ আর নিজের পার্স ব্যাগ ফেলে রেখে সে দ্রুত লোক দুটির পিছু নিল। তারা ক্যাফে থেকে বেরিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতরের সরু গলিগুলো দিয়ে দ্রুত হাঁটছিল। লুসিয়া নিজেকে গাছ আর দেয়ালের আড়ালে লুকিয়ে অনুসরণ করতে লাগল। একবার মনে হলো ফারহান বোধহয় টের পেয়েছে কেউ তাকে দেখছে, কারণ সে বারবার পেছনে তাকাচ্ছিল। কিন্তু লুসিয়া তার মেক্সিকান এক মাস্টার
এর কাছে শেখা ‘শ্যাডোয়িং’ বিদ্যা কাজে লাগিয়ে নিজেকে আড়াল করে রাখল।

হঠাৎ করেই তারা মেইন রাস্তা ছেড়ে দিয়ে এক পুরনো, পরিত্যক্ত বিশাল বিল্ডিংয়ের জরাজীর্ণ গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল। বিল্ডিংটার দেয়াল থেকে পলেস্তারা খসে পড়ছে, জানলাগুলো লতাপাতায় ঢেকে গেছে। মেক্সিকোর ড্রাগ কার্টেলের আস্তানার চেয়েও ভুতুড়ে মনে হচ্ছিল এই জায়গাটা। কিন্তু ফারহানকে পাওয়ার নেশা লুসিয়ার সমস্ত ভয়কে ধুলোয় মিশিয়ে দিল।

বিল্ডিংয়ের ভেতরে পা রাখতেই এক ভ্যাপসা গন্ধ আর অন্ধকার লুসিয়াকে গ্রাস করল। করিডোর দিয়ে এগোতে এগোতে সে দেখল সামনে তিনটি গলি তিন দিকে চলে গেছে। লোকগুলোকে আর কোথাও দেখা যাচ্ছে না। লুসিয়া মাঝখানের গলিটা বেছে নিল। কিন্তু কিছুক্ষণ পর সে বুঝতে পারল, সে এক ভয়াবহ গোলকধাঁধায় পড়ে গেছে। চারদিকে ভাঙা দেয়াল আর জমাট অন্ধকার। সে যে পথ দিয়ে এসেছিল, সেই পথটাও এখন আর খুঁজে পাচ্ছে না।

“ফারহান! আর ইউ হিয়ার? ফারহান!” লুসিয়া চিৎকার করে ডাকল। কিন্তু কেবল নিজের গলার প্রতিধ্বনি ছাড়া আর কিছুই ফিরে এল না।

সে পকেট থেকে ফোন বের করল জাভিয়ানকে কল করার জন্য।কিন্তু স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে তার আত্মা শুকিয়ে গেল। “নো সিগন্যাল!” এই বিশাল কংক্রিটের দালানের নিচে নেটওয়ার্কের নামনিশানা নেই। লুসিয়া কাঁপতে কাঁপতে পেছনের দিকে সরতে যেতে লাগলো, ঠিক তখনই সে অনুভব করল তার ঠিক পেছনে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। তার ঘাড়ের কাছে কারো তপ্ত নিঃশ্বাস পড়ছে। লুসিয়া ভয়ে চোখ বন্ধ করে চিৎকার করতে যাবে, তখনই এক জোড়া শক্ত হাত বজ্রমুষ্টির মতো তার মুখ চেপে ধরল।

লুসিয়া আতঙ্কে চোখ বন্ধ করে ফেলেছিল, তার মনে হচ্ছিল আজই তার শেষ দিন। কিন্তু হঠাৎ কানে এল সেই গভীর, মাদকমাখা কণ্ঠস্বর—”তুমি এখানে কী করছ লুসিয়া? পাগল হয়ে গেছ?”

ফারহান তার মুখ থেকে হাত সরিয়ে নিতেই লুসিয়া ঘুরে দাঁড়াল। ঘুটঘুটে অন্ধকারেও ফারহানের সেই তীক্ষ্ণ চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। ফারহান অত্যন্ত বিস্মিত আবার কিছুটা বিরক্ত গলায় ফিসফিস করে বলল—
“লুসিয়া! মেক্সিকো ছেড়ে এই বাংলাদেশে তুমি কী করছ? আর আমাকে এভাবে ফলোই বা করছিলে কেন? তুমি কি জানো এটা কতটা বিপজ্জনক জায়গা?”

লুসিয়া তখন হাঁপাচ্ছে, তার চোখের কোণে জল জমেছে। সে রাগে আর অভিমানে ফারহানের বুকে একটা ধাক্কা দিয়ে বলল—”বিপজ্জনক? আমার চেয়ে বেশি সেটা আর কে জানে ফারহান! তুমি মেক্সিকোতে আমাকে ওভাবে একা ফেলে পালিয়ে এলে কেন? তুমি কি ভেবেছিলে আমি তোমাকে খুঁজে পাব না? আমি এখানে জাভি ব্রো আর তান্বীর সাথে এসেছি। আমি তোমাকে খুঁজতে পুরো ঢাকা শহর চষে ফেলছি!”

ফারহান চারপাশটা একবার দেখে নিল, তার চেহারায় এক ধরণের অস্থিরতা। সে বলল—”জাভিয়ানও এখানে? ওহ গড! লুসিয়া, তোমাদের এখানে আসা একদম ঠিক হয়নি। আমার জীবন এখন আর আগের মতো নেই। আমি এক গভীর জালে জড়িয়ে গেছি। তোমাদের সাথে আমার দেখা হওয়া মানে তোমাদের জীবনকেও ঝুঁকিতে ফেলা। প্লিজ, এখনই এখান থেকে চলে যাও।”

লুসিয়া ফারহানের শার্টের কলার শক্ত করে চেপে ধরল। “একদম না! আমি তোমাকে ছাড়া কোথাও যাচ্ছি না। তুমি কেন পালাচ্ছ ফারহান? কার ভয়ে? আমার জাভি ব্রো আছে তো সে থাকতে কিসের ভয়?”

ফারহান এক ম্লান হাসি হাসল। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না, ছিল কেবল হাহাকার। “জাভিয়ান মেক্সিকোর পাওয়ারফুল কেউ হতে পারে, কিন্তু এটা বাংলাদেশ লুসিয়া। এখানে অদৃশ্য শত্রুরা অনেক বেশি শক্তিশালী। শোনো, ওই যে দূরে একটা আলো দেখছ? ওদিক দিয়ে বের হলে তুমি মেইন রাস্তায় পৌঁছে যাবে। যাও!”

ঠিক তখনই দালানের নিচতলা থেকে ভারী বুটের শব্দ আর টর্চের আলো দেখা গেল। ফারহানের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে লুসিয়াকে দেয়ালের আড়ালে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বলল, “একদম শব্দ করবে না লুসিয়া। চুপচাপ থাকো!”

লুসিয়ার কান্না তখন থামছেই না। সে ফারহানের হাত ধরে বারবার আকুতি করছিল, “আমি শুধু তোমার জন্য এখানে এসেছি ফারহান! প্লিজ, আমাকে এভাবে তাড়িয়ে দিও না। আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব না।”

ফারহানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য মায়া কাজ করলেও সে নিজেকে সামলে নিল। সে অত্যন্ত কঠোর গলায় বলল—”ভালোবাসা? এই বিপদসংকুল জায়গায় ভালোবাসার কোনো দাম নেই লুসিয়া। তুমি যাবে না তো? ঠিক আছে, তাহলে এই পরিত্যক্ত দালানেই পড়ে থাকো। আমি চললাম।”
ফারহান আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। সে দ্রুত সেখান থেকে সরে গেলো আর হঠাৎ একটি স্টার্ট দেওয়া বাইকের পেছনে লাফিয়ে উঠল। বাইক চালক দ্রুত গতিতে ধুলো উড়িয়ে চোখের পলকে অদৃশ্য হয়ে গেল। লুসিয়া চিৎকার করে “ফারহান! ফারহান!” বলে ডাকতে ডাকতে দালানের বাইরে আসার চেষ্টা করল, কিন্তু অন্ধকার আর ভাঙা ইটের গোলকধাঁধায় সে আবার পথ হারিয়ে ফেলল।

মেইন রাস্তায় পৌঁছানোর ঠিক কয়েক গজ আগেই হঠাৎ ঝোপের আড়াল থেকে তিন-চারজন লোক বেরিয়ে এল। লুসিয়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই একজন তার নাকে ক্লোরোফর্ম ভেজা রুমাল চেপে ধরল। কয়েক সেকেন্ডের ছটফটানি আরতারপর লুসিয়ার শরীরটা নিস্তেজ হয়ে এল।

তারা লুসিয়াকে পাঁজাকোলা করে সেই পরিত্যক্ত বিল্ডিংয়ের একদম ওপর তলায় নিয়ে গেল। সেখানে একটি ভাঙা ঘরে আধো-অন্ধকারে চেয়ারে বসে একজন লোক সিগারেট টানছিল। তার সামনে লুসিয়াকে মেঝের ওপর ফেলে দেওয়া হলো। কিডন্যাপারদের একজন বলল—”বস, এই মেয়েটাকে দেখুন। ফারহানের সাথে একেই কথা বলতে দেখেছি। আমাদের মনে হচ্ছে ও ফারহানের কোনো নতুন ডিলার বা বিদেশি পার্টনার।”

সেই রহস্যময় ‘বস’ চেয়ার থেকে উঠে ধীর পায়ে লুসিয়ার অচেতন মুখের সামনে এসে দাঁড়াল। তার হাতে থাকা টর্চের আলো লুসিয়ার ফর্সা মেক্সিকান চেহারার ওপর পড়ল। সে ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে গম্ভীর গলায় বলল—”এটাকে তো বাংলাদেশের মেয়ে মনে হচ্ছে না। এই চেহারার আদল তো ল্যাটিন আমেরিকান! ফারহান কি তবে মেক্সিকোর কোনো বড় মাফিয়ার সাথে হাত মেলাল? মেয়েটাকে বেঁধে রাখ। জ্ঞান ফিরলে ওর মুখ থেকে বের করতে হবে ও কার লোক। যদি ও ডিলার হয়, তবে ফারহান একে বাঁচাতে অবশ্যই ফিরে আসবে।”
.
.
.
অন্যদিকে বাড়ির সামনে বিশাল লরি থেকে যখন দামী সেগুন কাঠের সেই রাজকীয় খাটটা নামানো হচ্ছিল, পাড়ার উৎসুক মানুষের ভিড় জমে গেল। চার-পাঁচজন মজবুর লোক হিমশিম খাচ্ছিল খাটের একেকটা অংশ ভেতরে নিতে। জাভিয়ান শোরুম থেকে সবথেকে মজবুত আর দামী খাটটাই পছন্দ করেছে—যার কারুকাজ দেখে তান্বীর বাবা-মা তো বটেই, এমনকি পাশের বাড়ির লোকজনও উঁকি মারছে।

ভেতরে তখন এলাহি কাণ্ড। খাটের একেকটা পাল্লা সেট করতে গিয়ে মিস্ত্রিরা ঘামছে। জাভিয়ান নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তদারকি করছে। সে একবার ড্রিল মেশিন ধরছে, একবার স্ক্রু ড্রাইভার—যেন এই খাটটা তার কাছে কেবল আসবাব নয়, একটা বিশেষ প্রজেক্ট।

তান্বী একপাশে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে জাভিয়ানকে দেখছিল। মেক্সিকোর সেই ভয়ংকর মানুষটা, যার এক ইশারায় মানুষের প্রাণ যায়, সে এখন একটা সাধারণ গেঞ্জি পরে ঘাম মুছে খাটের জয়েন্টগুলো চেক করছে। তান্বীর মা বারবার বলছেন, “বাবা জাভিয়ান, তুমি সরো, ওরা করুক। তোমার গায়ে ধুলো লাগছে।”

জাভিয়ান হেসে বলল, “না মা, এটা একদম ঠিকঠাক হওয়া চাই। একটু নড়বড়ে থাকলে চলবে না।” তার কথার ভেতরে যে নিগূঢ় রহস্য ছিল, সেটা শুনে তান্বী লজ্জা পেয়ে রান্নাঘরের দিকে পালাল।

খাটের কাজ যখন প্রায় শেষ পর্যায়ে, জাভিয়ানের হঠাত লুসিয়ার কথা মনে পড়ল। সে হাত মুছে পকেট থেকে ফোনটা বের করল। লুসিয়া অনেকক্ষণ ধরে বাইরে, এই অচেনা শহরে তার একা থাকাটা ঠিক নয়। জাভিয়ান লুসিয়ার নাম্বারে ডায়াল করল।
“দ্যা নাম্বার ইউ আর কলিং ইজ কারেন্টলি আনরিচেবল…”

জাভিয়ান ভ্রু কুঁচকাল। সে আবার চেষ্টা করল, কিন্তু ফলাফল একই। নেটওয়ার্ক একদম নেই। জাভিয়ান ভাবল, হয়তো কোনো শপিং মলে আছে যেখানে সিগন্যাল পাওয়া যাচ্ছে না। সে জিপিএস ট্র্যাকারটা একবার চেক করার চেষ্টা করল, কিন্তু সেখানেও দেখাচ্ছে ‘লাস্ট লোকেশন আপডেট ২০ মিনিট এগো’।
জাভিয়ানের ভেতরে খচখচানি শুরু হলো। সে জানে লুসিয়া ফারহানকে খুঁজে পেতে কতটা মরিয়া। কিন্তু এই মুহূর্তে খাট সেট করা আর বাড়ির মানুষের এই খুশির আমেজ ছেড়ে সে হুট করে বেরিয়ে যেতে পারছিল না। মিস্ত্রিরা তখন গদিটা খাটের ওপর বিছিয়ে দিচ্ছে।
তান্বীর বাবা লাঠিতে ভর দিয়ে এসে বললেন, “চমৎকার হয়েছে খাটটা। তোমাদের ঘরে এটা বেশ মানাবে। লুসিয়া মা কই? ওকে ডাকো, নাস্তা তৈরিতো।”

জাভিয়ান ম্লান হাসল, কিন্তু তার এক হাত পকেটের ফোনের ওপর শক্ত হয়ে আছে। সে মনে মনে ভাবল, “লুসিয়া, তুই যদি ফারহানের পাল্লায় পড়ে কোনো ঝামেলায় জড়াস, তবে আজ ফারহানের রক্ষা নেই।”

এদিকে সেই পরিত্যক্ত বিল্ডিংয়ের চারতলায়, ধুলোবালি মাখা মেঝের ওপর লুসিয়ার জ্ঞান ফিরতে শুরু করেছে। তার হাত-পা শক্ত করে দড়ি দিয়ে বাঁধা। সামনের সেই রহস্যময় ‘বস’ তখনো সিগারেট ফুঁকছে। লুসিয়া চোখ মেলতেই লোকটা তার সামনে এসে বসল।
“শুনেছি মেক্সিকান মেয়েরা খুব সাহসী হয়। দেখি তো তোমার সাহস কতটুকু। ফারহান কি তোমাকে এখানে কোনো ডিলের জন্য পাঠিয়েছে? নাকি তুমি ওর সেই পুরোনো প্রেমিকা?”

লুসিয়া ঘৃণায় লোকটার মুখে থুতু ছিটাল। লোকটা রেগে গিয়ে তার চুলে মুঠি করে ধরল।

পুরনো ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মধ্যবর্তী সেই জরাজীর্ণ পরিত্যক্ত বিল্ডিংটি এখন আর কেবল ইট-পাথরের স্তূপ নেই, এটি এখন এক জীবন্ত নরক হয়ে গেছে। চারতলার সেই স্যাঁতসেঁতে ঘরটায় ধুলোবালি আর পচা গন্ধের মাঝে লুসিয়া মেঝের ওপর পড়ে আছে। তার হাত-পা শক্ত দড়ি দিয়ে বাঁধা, কবজি কেটে রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে।

সেই রহস্যময় ‘বস’, যার নাম কাল্লু, সে লুসিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে পৈশাচিক আনন্দ পাচ্ছিল। লুসিয়া যখন ঘৃণায় তার মুখে থুতু ছিটাল, কাল্লুর ভেতরের পশুটা জেগে উঠল। সে হিংস্রভাবে লুসিয়ার সোনালি চুলগুলো মুঠি করে ধরল। লুসিয়া যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠল, কিন্তু তার চোখে তখনো আগুনের ফুলকি।

“হারামজাদি! বিদেশি মেম হয়ে আমার মুখে থুতু দিস? ফারহান তোকে কোন সাহসে পাঠিয়েছে এখানে?” কাল্লু গর্জাতে গর্জাতে লুসিয়ার গালে সজোরে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিল।

লুসিয়ার মাথাটা ঘুরে গেল। তার ফর্সা গালে কালশিটে পড়ে গেল মুহূর্তেই। ঠোঁটের কোণ ফেটে রক্ত বের হতে লাগল। কাল্লু থামল না, সে আবার তার চুল ধরে হেঁচকা টান দিল। “বল! ফারহান কোথায়? ও কার সাথে ডিল করছে?” সে আবার লুসিয়াকে থাপ্পড় মারতে উদ্যত হলো।

ঠিক সেই মুহূর্তে পুরো বিল্ডিংটা এক বিশাল ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল। নিচতলার সেই লোহার গেটটা কেউ যেন কোনো মারণাস্ত্র দিয়ে দুমড়ে-মুচড়ে ভেতরে ঢুকে পড়েছে।

কাল্লু আর তার সাঙ্গোপাঙ্গরা চমকে গেল। তারা জানালার দিকে দৌড়ে গেল দেখার জন্য কে এসেছে। কিন্তু তারা কিছু দেখার আগেই সিঁড়িঘরের দিক থেকে এক নারকীয় চিৎকার ভেসে এল। একের পর এক হাড় ভাঙার শব্দ আর মানুষের গোঙানি কানে আসছে।
সে আসছে। সে কোনো সাধারণ মানুষ নয়, সে এক ধ্বংসলীলা— মেইলস্ট্রোম। মেক্সিকোর আন্ডারওয়ার্ল্ডের সবচেয়ে বড় মাফিয়া কিং, যার এক ইশারায় দেশ কাঁপত। মেইলস্ট্রোম নিজেই এখানে উপস্থিত হয়েছে তার প্রাণের বোন লুসিয়াকে বাঁচাতে। সে জানে জাভিয়ান আর তান্বী বাংলাদেশে এসেছে, আর এই পাগলামিই তাকে টেনে এনেছে এই ধুলোবালির শহরে।

মেইলস্ট্রোম যখন ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল, তখন তার সারা শরীর রক্তে ভেজা। তার হাতে কোনো বন্দুক নেই, আছে দুই হাতে দুটো ধারালো মেক্সিকান ‘ম্যাচেট’। তার চোখে কোনো আবেগ নেই, আছে কেবল এক হিমশীতল শূন্যতা।

কাল্লুর একজন লোক পিস্তল তাক করতেই মেইলস্ট্রোম চিতার চেয়েও দ্রুত গতিতে এগিয়ে গেল। এক নিমিষেই সেই লোকটার হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মেঝেতে আছাড় খেল। পরের সেকেন্ডে সেই ম্যাচেট ঢুকে গেল লোকটার গলায়। কোনো শব্দ করার সুযোগও সে পেল না।

কাল্লু ভয়ে পিছিয়ে গিয়ে লুসিয়ার গলায় একটা ছুরি ধরল। “খবরদার! আর এক পা এগোলে এই মেমের গলা কেটে ফেলব!”

মেইলস্ট্রোম এক মুহূর্তের জন্য থামল। তার ঠোঁটের কোণে এক পিশাচের হাসি ফুটে উঠল। সে খুব ধীর লয়ে ভাঙা বাংলায় বলল, “তুই ওর চুলে হাত দিয়েছিস। তুই ওকে থাপ্পড় মেরেছিস। তুই জানিস না ও কার বোন? আমি মেইলস্ট্রোম, আর তুই আজ তোর নিজের কবর খুঁড়েছিস।”

মেইলস্ট্রোম বিদ্যুৎ গতিতে তার হাতের একটা ম্যাচেট ছুড়ে মারল। সেটা কাল্লুর হাতের ছুরিটাকে উড়িয়ে নিয়ে দেয়ালে গেঁথে দিল। কাল্লু কিছু বুঝে ওঠার আগেই মেইলস্ট্রোম তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।

সে প্রথমে কাল্লুর সেই হাতটা ধরল যেটা দিয়ে সে লুসিয়ার চুল টেনেছিল। মেইলস্ট্রোম কোনো দ্বিধা ছাড়াই সেই হাতের প্রতিটি আঙুল একটা একটা করে মটকে দিল। কাল্লুর গগনবিদারী চিৎকারে পুরো বিল্ডিংটা থরথর করে কাঁপছিল। কিন্তু মেইলস্ট্রোমের মনে মায়া বলে কিছু নেই। সে এরপর কাল্লুর দুই হাঁটুর ওপর ম্যাচেট দিয়ে আঘাত করল, যাতে সে কোনোদিন দাঁড়াতে না পারে।

লুসিয়া চোখ বড় বড় করে দেখছিল এই নৃশংসতা। সে জানে তার মেইলস্ট্রোম কতটা ভয়ংকর, কিন্তু আজ তার এই রূপ দেখে লুসিয়া নিজেও কেঁপে উঠল। কাল্লুর অবস্থা তখন মৃতপ্রায়। মেইলস্ট্রোম শেষ আঘাতটা করতে যাচ্ছিল কাল্লুর মাথায়, ঠিক তখনই দরজায় আরেকজনের ছায়া দেখা গেল।

ফারহান বাইক থেকে নেমে দৌড়ে ওপরে এসেছিল লুসিয়াকে উদ্ধার করতে। সে খবর পেয়েছিলো লুসিয়া বিপদে আছে, তাকে বাঁচাতে হবে। কিন্তু ঘরে ঢুকেই সে যা দেখল, তাতে তার পায়ের নিচের মাটি সরে গেল।
সারা ঘরে চার-পাঁচটা মানুষের বিকৃত লাশ পড়ে আছে। দেয়ালগুলো রক্তে মাখা। আর ঘরের মাঝখানে লুসিয়া বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে, যার সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক দীর্ঘদেহী পুরুষ—মেইলস্ট্রোম। মেইলস্ট্রোমের হাতের ম্যাচেট থেকে টপটপ করে রক্ত পড়ছে।
ফারহান স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে দেখল লুসিয়ার গাল লাল হয়ে ফুলে আছে, ঠোঁটে রক্ত। কিন্তু তার চেয়েও ভয়ানক ছিল মেইলস্ট্রোমের সেই চাহনি।

মেইলস্ট্রোম ফারহানের দিকে ঘুরে তাকাল। ফারহান এই প্রথম জানতে পারল—মেইলস্ট্রো ম আসলে লুসিয়ার আপন ভাই!

ফারহান লুসিয়ার দিকে এগোতে চাইল, কিন্তু লুসিয়া তার দিকে এক অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকাল। লুসিয়ার চোখে তখন কেবলই অভিমান আর ঘৃণা। ফারহান তাকে বিপদে ফেলে চলে গিয়েছিল, তাকে গুরুত্ব দেয়নি—এই আঘাত লুসিয়া নিতে পারছে না।

লুসিয়া মেইলস্ট্রোমের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল, “ভাইয়া, আমাকে এখান থেকে নিয়ে চলো। আমি আর এক মুহূর্তও এই মানুষটার ছায়া মাড়াতে চাই না।”

মেইলস্ট্রোম নিচু হয়ে লুসিয়ার বাঁধন খুলে দিল। সে লুসিয়াকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিয়ে ফারহানের পাশ দিয়ে হেঁটে বেরিয়ে যাওয়ার সময় খুব শীতল গলায় বলল—”ফারহান রেহমান, লুসিয়া তোকে ভালোবেসেছিল বলে তুই বেঁচে আছিস। কিন্তু আমার বোনের আজ যে বিপদ আমি দেখলাম, তার জন্য এই পুরো শহরকে মাসুল দিতে হতে পারে। আমার বোনের কাছ থেকে এবার দূরে থাক।”

লুসিয়া ফারহানের দিকে একবারও ফিরে তাকাল না। সে ফারহানকে পুরোপুরি এড়িয়ে চলে গেল। ফারহান সেই রক্তমাখা ঘরের মাঝখানে একা দাঁড়িয়ে রইল। সে বুঝতে পারল, লুসিয়াকে সে চিরতরের জন্য হারিয়েছে। আর তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক নতুন কোনো আতঙ্ক—মেক্সিকোর কিং মেইলস্ট্রোম।

ফারহান সেই পরিত্যক্ত বিল্ডিংয়ের জানালায় দাঁড়িয়ে দেখল মেইলস্ট্রোম লুসিয়াকে নিয়ে তার কালো গাড়ির কাফেলায় উঠে যাচ্ছে।

পরিত্যক্ত বিল্ডিংয়ের সেই বিভীষিকা পেছনে ফেলে মেইলস্ট্রোমের কালো কাফেলা তখন ঢাকার রাজপথ চিরে দ্রুতগতিতে ছুটছে। গাড়ির পেছনের সিটে লুসিয়া আধশোয়া হয়ে আছে, তার মাথা মেইলস্ট্রোমের কাঁধে। মেইলস্ট্রোম তার এক হাত দিয়ে লুসিয়ার রক্তাক্ত কবজিটা চেপে ধরে আছে। তার চোখে তখনো সেই খুনি আভা, কিন্তু বোনের জন্য সেখানে মিশে আছে এক গভীর মমতা।

মেইলস্ট্রোম সরাসরি কোনো হাসপাতালে গেল না, কারণ সেখানে পুলিশের ঝামেলা হতে পারে। সে তার নিজস্ব নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বনানীর এক গোপন ব্যক্তিগত ক্লিনিকে লুসিয়াকে নিয়ে গেল। সেখানে অভিজ্ঞ ডাক্তার দ্রুত লুসিয়ার ক্ষতগুলো ড্রেসিং করে দিলেন। লুসিয়ার গালে কালশিটে পড়া দাগটায় যখন বরফ দেওয়া হচ্ছিল, সে যন্ত্রণায় চোখ বন্ধ করে ফেলল। তার মনে বারবার ফারহানের সেই নির্দয়ভাবে চলে যাওয়ার দৃশ্যটা ভেসে উঠছিল।

ঘণ্টাখানেক পর লুসিয়া কিছুটা সুস্থ বোধ করলে মেইলস্ট্রোম তাকে ক্লিনিক থেকে বের করে আনল। কিন্তু সে নিজে তান্বীদের বাড়ির সামনে যাওয়ার ঝুঁকি নিল না। সে জানে, জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরী অত্যন্ত চতুর। জাভিয়ান যদি একবার টের পায় যে মেক্সিকোর মাফিয়া কিং মেইলস্ট্রোম বাংলাদেশে পা রেখেছে, তবে এই শহরে দুই দানবের লড়াই শুরু হয়ে যাবে—যা এখন তার জন্য কিছুটা বিপদ ডেকে আনতে পারে।

মেইলস্ট্রোম লুসিয়াকে একটি সাধারণ ক্যাবে নয়, বরং তার এক বিশ্বস্ত লোকের সাধারণ মানের একটি সেডান গাড়িতে উঠিয়ে দিল। সে নিজে অন্য একটি এসইউভিতে উঠে জানলা দিয়ে লুসিয়ার দিকে তাকাল।
মেইলস্ট্রোম গম্ভীর আর সতর্ক গলায় বলল, “লুসিয়া, তুমি এখন তান্বীর বাসায় যাবে। কিন্তু মনে রাখবে, জাভিয়ান যেন কোনোভাবেই জানতে না পারে যে আমি বাংলাদেশে আছি। যদি ও জিজ্ঞেস করে কে তোমাকে বাঁচিয়েছে, বলবে ফারহানের কোনো লোক তোমাকে সাহায্য করেছে। আমার কথা একবারও উচ্চারণ করবে না।”

লুসিয়া ক্লান্ত চোখে ভাইয়ের দিকে তাকাল। সে জানে মেইলস্ট্রোম কেন নিজেকে আড়ালে রাখতে চাইছে। সে কেবল মাথা নেড়ে সায় দিল।

গাড়িটি যখন ‘রেহমান প্রিয়াঙ্গন’-এর গলির মুখে এসে থামল, তখন রাত হয়েছে হবে মাত্র। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় দেখা গেল বাড়ির সামনে এখনো জাভিয়ানের কয়েকটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। লুসিয়া গাড়ি থেকে নেমে টলমল পায়ে গেটের দিকে এগিয়ে গেল।

ভেতরে তখনো জাভিয়ান আর তান্বী লুসিয়ার জন্য অস্থির হয়ে অপেক্ষা করছিল। জাভিয়ান কেবল কল করার জন্য ফোনটা হাতে নিয়েছে, ঠিক তখনই কলিং বেল বেজে উঠল। দরজা খুলতেই জাভিয়ান দেখল লুসিয়া দাঁড়িয়ে আছে—চুল উস্কখুস্ক, গালে থাপ্পড়ের দাগ আর হাতে ব্যান্ডেজ।

জাভিয়ান এক লাফে লুসিয়ার সামনে গিয়ে ওকে ধরে ফেলল। “লুসিয়া! তোর এই অবস্থা কে করেছে? কোথায় ছিলি তুই?”

তান্বী চিৎকার করে উঠল, “লুচি আপু! আপনার এই দশা কেন?কোথায় গিয়েছিলেন আপনি?”

লুসিয়া আজকের ঘটনা মনে করেই শিউরে উঠল। তার দুচোখ বেয়ে আবার জল গড়িয়ে পড়ল। সে জাভিয়ানের দিকে তাকিয়ে মেইলস্ট্রোমের শেখানো কথাটাই বলল, “ফারহান… ফারহান আমাকে বিপদে ফেলে চলে গিয়েছিল জাভি ব্রো। কিছু লোক আমাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ওরই পরিচিত এক লোক আমাকে বাঁচিয়ে এই পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে। আমি আর ওর নাম শুনতে চাই না।”

জাভিয়ানের হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল না সেই ‘পরিচিত লোক’ আসলে কে, কিন্তু ফারহানের ওপর তার ঘৃণা এখন চরমে পৌঁছে গেছে।

জাভিয়ান যখন লুসিয়ার রক্তাক্ত ঠোঁট আর ফুলে থাকা গালটা দেখল, তার মস্তিষ্কের প্রতিটি শিরা যেন আগুনের হল্কায় ফেটে পড়তে চাইল। লুসিয়ার কথাগুলো— “ফারহান আমাকে বিপদে ফেলে চলে গিয়েছিল জাভি ব্রো”— জাভিয়ানের কানে উত্তপ্ত সিসার মতো বিঁধল। মেক্সিকোর অন্ধকার জগতের সম্রাট, যার নাম শুনলে যমরাজও পথ ছাড়ে, সেই জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরীর বোনকে এই শহরের নগণ্য কিছু লোক হাত দিয়েছে? আর ফারহান তাকে একা ফেলে পালিয়েছে?

জাভিয়ানের হাতের সেই লোড করা রিভলবারের ধাতব শব্দটা যখন পুরো ঘরে প্রতিধ্বনিত হলো, তান্বীর বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তের জন্য বন্ধ হয়ে গেল। সে জানে জাভিয়ান যখন এই রূপে থাকে, তখন সে কোনো আইন মানে না, কোনো দয়া চেনে না। আর আজ তার লক্ষ্য অন্য কেউ নয়—তান্বীর নিজের বড় ভাই, ফারহান।

জাভিয়ান যখন গর্জাতে গর্জাতে দরজার দিকে পা বাড়াল, তান্বী আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। সে ছোঁ মেরে জাভিয়ানের সেই শক্ত হাতটা আঁকড়ে ধরল। তার নখগুলো জাভিয়ানের চামড়ায় বসে যাচ্ছিল, কিন্তু সে ছাড়ল না।

“জাভিয়ান! থামুন! আপনি কোথায় যাচ্ছেন?” তান্বীর গলার স্বর কান্নায় ভেঙে পড়ল।

জাভিয়ান এক ঝটকায় তাকে সরিয়ে দিতে চাইল, তার চোখে তখন খুনের নেশা। “সরো জিন্নীয়া! ওই কাপুরুষ ফারহান আমার বোনকে মৃত্যুর মুখে ফেলে পালিয়েছে। ও জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরীর বোনকে অপমান করেছে। আজ ওর লাশ এই শহরের রাস্তায় পড়ে থাকবে!”

তান্বী হঠাত করে স্তম্ভিত হয়ে গেল। সে কিছুই বুঝতে পারছে না। লুসিয়ার সাথে তার ভাই ফারহানের কী সম্পর্ক? তারা একে অপরকে জানেই বা কবে? আর ফারহান কেনই বা লুসিয়াকে বিপদে ফেলবে?

তান্বী দুই হাতে জাভিয়ানের কলার টেনে ধরল। তার চোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়ছে, কিন্তু দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত জেদ। “আপনি কী বলছেন জাভিয়ান? ফারহান ভাইয়া লুচি আপার সাথে কী করেছে? তারা কোথায় ছিল? আমি তো কিছুই জানি না!” তান্বী চিৎকার করে উঠল।

জাভিয়ান এক পৈশাচিক হাসি হাসল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। “তুমি জানো না জিন্নীয়া? তোমার ওই ভাই মেক্সিকোতে থাকতে আমার বোনের মাথা ‍খেয়েছে। লুসিয়া পাগলের মতো ফারহানকে ভালোবেসেছে। কিন্তু তোমার ভাই আমার বোনের সাথে কী করল? আমার বোনের পিছে যেখানে শত শত রাজপুত্রের মতো ছেলের লাইন লেগে থাকে, সেখানে সেই ফারহান কিনা আমার বোনকে অবহেলা করল? অবহেলা তো পরের কথা, আজ সে লুসিয়াকে অপহরণকারীদের হাতে ফেলে দিয়ে পালিয়েছে!

তান্বী তখন কান্নারত কন্ঠে বলে উঠলো “এখন কি আপনি নিজের হাতে আপনার স্ত্রীর ভাইকে খুন করবেন? আপনি কি চান আমার বাবার বাড়িতে আজ শোকের মাতম উঠুক?”

জাভিয়ান থমকে গেল। ‘ভাই’ শব্দটা তার কানে যেন তপ্ত সিসার মতো বিঁধল। সে দাঁতে দাঁত চেপে তান্বীর দিকে তাকাল। “ভাই? যে ভাই অন্য আরেকজনের বোনকে বাঁচাতে পারে না, যে ভাই কাপুরুষের মতো পালায়—সে আমার চোখে কারো ভাই নয়! ও একটা আবর্জনা, আর আবর্জনা পরিষ্কার করাই আমার কাজ!”

তান্বী এবার জাভিয়ানের বুকের ওপর মাথা ঠেকিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। “আমি জানি ভাইয়া ভুল করেছে, যদি ও সত্যি এমন কিছু করে থাকে তবে সেটা অন্যায়। কিন্তু ও আমার ভাই জাভিয়ান! আমার মা-বাবার একমাত্র ছেলে। আপনি যদি আজ ওর রক্ত ঝরান, তবে আমার সাথে আপনার সম্পর্কের সব সুতো ছিঁড়ে যাবে। আপনি কি পারবেন আমার চোখে সারাজীবন সেই খুনের দাগ নিয়ে তাকাতে?”

জাভিয়ানের শরীরের প্রতিটি পেশি তখন তীরের মতো ধনুকের ছিলার টানে টানটান হয়ে আছে। সে রাগে কাঁপছে। একপাশে তার বোনের অপমানিত মুখ, আর অন্যপাশে তার ভালোবাসার মানুষের বুকফাটা আর্তনাদ। জাভিয়ান হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে দেয়ালে সজোরে একটা ঘুষি মারল। দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ল, জাভিয়ানের হাতের গাঁট ফেটে রক্ত বের হতে লাগল, কিন্তু সে সেদিকে তাকাচ্ছিল না। সে তার রিভলবারটা কোমরে গুঁজে দিয়ে তান্বীর দিকে এক পৈশাচিক শান্ত দৃষ্টিতে তাকাল। তার কণ্ঠস্বর তখন বরফের মতো শীতল—”শুধুমাত্র তোমার ভাই বলে আজ ও বেঁচে গেল জিন্নীয়া। শুধু তোমার চোখের জলের দাম দিতে গিয়ে আমি আজ পিছিয়ে আসছি। কিন্তু মনে রেখো, জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরী কোনোদিন তার ঋণ ভোলেন না। ফারহানকে আজ না হোক কাল—আমার সামনে আসতেই হবে। আর সেদিন যদি ও নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে না পারে, তবে তোমার ভালোবাসা ওকেও বাঁচাতে পারবে না।”

লুসিয়া সোফায় বসে নিঃশব্দে কাঁদছিল। সে দেখল কীভাবে তান্বী নিজের ভাইকে বাঁচাতে তার স্বামীর সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়াল। কিন্তু লুসিয়ার মনে তখন কেবলই এক বিষাক্ত অভিমান— ফারহান, তুমি কি সত্যিই আমাকে ওভাবে ফেলে চলে গেলে? নাকি এর পেছনে অন্য কোনো গল্প আছে?

তান্বীর মা ঘরে ঢুকেই থমকে দাঁড়ালেন। তিনি দেখলেন জাভিয়ানের হাতের গাঁট দিয়ে রক্ত পড়ছে, মেঝেতে পলেস্তারা খসে পড়েছে, আর সোফায় বসে লুসিয়া যন্ত্রণায় আর অভিমানে ডুকরে কাঁদছে। তান্বীর চোখে তখনো জল।

“কী হয়েছে এখানে? জাভিয়ান বাবা, তোমার হাতে রক্ত কেন? তান্বী, তুই কাঁদছিস কেন? আর লুসিয়াই বা কাঁদছে কেনো ?” তান্বীর মা আতঙ্কিত গলায় একের পর এক প্রশ্ন করতে লাগলেন।

তান্বীর বাবা লাঠিতে ভর দিয়ে দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে জাভিয়ানের দিকে তাকালেন। তিনি জাভিয়ানের ভেতরের সেই দাউদাউ করা আগুনটা টের পাচ্ছিলেন। জাভিয়ান তখনো রাগে ফুঁসছে, তার চোখ-মুখ লাল। ফারহানের নামটা তার জিহ্বার ডগায় চলে আসছিল, কিন্তু তান্বী দ্রুত জাভিয়ানের সামনে গিয়ে তার রক্তমাখা হাতটা চেপে ধরল। সে জানে, এই মুহূর্তে ফারহানের কথা বললে তার বাবা-মা সহ্য করতে পারবেন না।

তান্বী নিজের চোখের জল মুছে কোনোমতে গলা পরিষ্কার করে বলল, “মা, কিছু হয়নি। আসলে… আসলে লুচি আপা একা শহর দেখতে বেরিয়েছিল। পথে কিছু ছিনতাইকারী ওনার ব্যাগ ছিনতাই করতে গিয়ে ওনাকে ধাক্কা দিয়েছে, তাই উনি চোট পেয়েছেন।
জাভিয়ান সেটা শুনেই খুব রেগে গিয়েছিল, তাই উনি রাগে দেয়ালে ঘুষি মেরেছেন।”

জাভিয়ান প্রথমে কিছু বলতে চাইছিল না, তার শরীর তখনো অপমানের জ্বালায় কাঁপছে। কিন্তু তান্বীর বাবার সেই জিজ্ঞাসু আর মায়াবী দৃষ্টি দেখে সে নিজেকে কিছুটা শান্ত করল। সে এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে তান্বীর মায়ের দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল—
“সরি মা, আমি আসলে লুসিয়ার এই অবস্থা দেখে মাথা ঠিক রাখতে পারিনি। আপনারা ভয় পাবেন না। ও এখন ঠিক আছে।”

তান্বীর মা দ্রুত লুসিয়ার কাছে গিয়ে বসলেন। “আহা রে! বিদেশি মেয়েটা আমাদের দেশে এসে বিপদে পড়ল!এসো মা, আমার কাছে এসো।” তিনি অত্যন্ত মমতা দিয়ে লুসিয়ার মাথায় হাত রাখলেন। লুসিয়া তান্বীর মায়ের এই অকপট ভালোবাসা দেখে আরও ডুকরে কেঁদে উঠল। তার মনে পড়ল, এই মা-ই তো ফারহানের মা!

তান্বীর বাবা জাভিয়ানের কাঁধে হাত রাখলেন। “শান্ত হও বাবা। ছিনতাইকারীরা তো এমনই হয়। তান্বী, যাও জাভিয়ানের হাতে ব্যান্ডেজ করে দাও। আর লুসিয়াকে ওর ঘরে নিয়ে বিশ্রাম নিতে বলো।”

জাভিয়ান আর তান্বী মিলে কোনোমতে পরিস্থিতি সামাল দিয়ে তাদের পাশের ঘরে পাঠিয়ে দিল। জাভিয়ান যখন নিজের ঘরে ঢুকল, তার নীরবতা যেন আগের চেয়েও বেশি ভয়ানক হয়ে উঠল। সে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল, তার দৃষ্টি বাইরের অন্ধকারের দিকে।

তান্বী ফার্স্ট এইড বক্স নিয়ে জাভিয়ানের পেছনে এসে দাঁড়াল। সে খুব আলতো করে জাভিয়ানের রক্তাক্ত হাতটা ধরল। জাভিয়ান হাতটা সরিয়ে নিতে চাইল না, কিন্তু তার চোয়াল তখনো শক্ত।

তান্বী ফিসফিস করে বলল, “ধন্যবাদ বাবা-মায়ের সামনে সত্যিটা না বলার জন্য। আমি জানি আপনি কতটা রেগে আছেন।”
.
.
.

রাত তখন প্রায় আড়াইটা। পুরো বাড়ি নিঝুম হয়ে আছে। তান্বী আর জাভিয়ান পাশের ঘরে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। লুসিয়া ফারহানের ঘরেই ঘুমাচ্ছে। জানালার বাইরে মাঠের দিক থেকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। লুসিয়ার দুচোখে ঘুম নেই, কেবল অপমানের দহন আর বুকফাটা অভিমান।

ঠিক সেই মুহূর্তে বালিশের পাশে রাখা লুসিয়ার ফোনটা কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে একটা অপরিচিত নম্বর ভেসে উঠছে। লুসিয়া দ্বিধাভরে ফোনটা কানে নিতেই ওপাশ থেকে সেই পরিচিত গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
“ডানপাশের জানালাটা খোলো।”

লুসিয়া স্তব্ধ হয়ে গেল। কণ্ঠটা ফারহানের! যে ফারহান তাকে ব্লক করে দিয়েছিল, যে তাকে বিপদে ফেলে চলে গিয়েছিল—সে আজ এই গভীর রাতে ফোন করেছে? লুসিয়া রাগে আর ঘেন্নায় দাঁতে দাঁত চেপে ফোনটা কেটে দিল। তার মনে হলো ফারহান তাকে নিয়ে তামাশা করছে।

কয়েক সেকেন্ড পরেই আবার কল এল। লুসিয়া ধরল না। কিন্তু ঠিক তখনই মাঠের ধারের জানালার কাচে মৃদু ‘টুক টুক’ শব্দ হলো। লুসিয়া ভয়ে কুঁকড়ে গেল। যদি জাভিয়ান জেগে যায়? যদি জাভিয়ান জানতে পারে ফারহান এখানে এসেছে, তবে আজ আর রক্ষা নেই। জাভিয়ান তক্ষুনি ফারহানকে মেরে ফেলবে। সেই ভয়ে লুসিয়া কাঁপতে কাঁপতে উঠে গিয়ে জানালার পর্দাটা সরিয়ে দিলো। তখন দেখল অন্ধকারের মাঝে ফারহান দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে কালো হুডি, মুখটা ছায়ায় ঢাকা। লুসিয়া জানালার পাল্লাটা সামান্য ফাঁক করতেই
ফারহান নিচু গলায় বলল—”বাইরে আসো। তোমার সাথে আমার কথা আছে।”

লুসিয়া ফিসফিস করে রাগী গলায় বলল, “তুমি এখানে কেন এসেছ? চলে যাও ফারহান! জাভি ব্রো জানলে তোমাকে জ্যান্ত রাখবেনা। আর আমি বাইরে আসতে পারব না,তোমাদের মেইন গেটে তালা লাগানো।”

ফারহান কোনো কথা না বলে পকেট থেকে একটা চকচকে চাবি বের করল। জানালার ফাঁক দিয়ে সেটা লুসিয়ার হাতের কাছে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ” আমি তোমার কোনো ভাইকেই ভয় পাইনা। এটা ধরো গেইটের এক্সট্রা চাবি। আমি জানতাম গেট বন্ধ থাকবে। ঠিক পাঁচ মিনিটের মধ্যে বাইরে আসো। আমি মাঠের ওই পুরনো গাছটার নিচে অপেক্ষা করছি। না আসলে আমি সোজা ভেতরে ঢুকে পড়ব, তখন জাভিয়ান জানলে আমার দায় নেই।”

লুসিয়া চাবিটা হাতে নিয়ে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ফারহান তাকে এভাবে হুকুম দিচ্ছে? কিন্তু তার ভেতরের অভিমানী মনটা একবারের জন্য হলেও জানতে চাইল—কেন ফারহান তাকে ফেলে গিয়েছিল?
.
.

গভীর রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে লুসিয়া সন্তর্পণে বিছানা ছাড়ল। সারা শরীর ব্যথায় করছে, কিন্তু মনের ভেতরের ছটফটানি তাকে বসিয়ে রাখতে দিল না। ফারহানের ঘরে কোনো ওড়না নেই, আর তার নিজের লাগেজ রাখা অন্য রুমে, যেখানে জাভিয়ান আর তান্বী ঘুমাচ্ছে। সে রুমে যাওয়ার সাহস তার নেই। লুসিয়ার পরনে ছিল কেবল একটা পাতলা টি-শার্ট, যার নিচে সে ইনার পরেনি।এমন পরিস্থিতির কথা ভেবে সে আলমারি খুলে ফারহানের একটা চেক শার্ট বের করে নিল। টি-শার্টের ওপর দিয়েই বড়সড় শার্টটা গায়ে জড়িয়ে সে পা টিপে টিপে দরজার দিকে এগুলো।

ফারহানের দেওয়া চাবিটা দিয়ে খুব সাবধানে মেইন গেট খুলল সে। লোহার গেটের সামান্য শব্দও এই নিস্তব্ধ রাতে কামানের গোলার মতো শোনাল। লুসিয়া বুক দুরুদুরু অবস্থায় পা বাড়াল মাঠের দিকে। চারপাশটা ঘুটঘুটে অন্ধকার, কেবল দূর থেকে দু-একটা কুকুরের ডাক ভেসে আসছে।

মাঠের মাঝখানে পৌঁছাতেই অন্ধকারের ভেতর থেকে লম্বা একটা অবয়ব এগিয়ে এল। ফারহান। তার মুখটা হুডিতে ঢাকা থাকলেও লুসিয়া তার চেনা পারফিউমের ঘ্রাণ পেল। ফারহান কাছে এসেই প্রথমে লুসিয়ার ব্যান্ডেজ করা হাতটার দিকে তাকাল, তারপর খুব নিচু আর অপরাধবোধে ভরা গলায় বলল—”আই অ্যাম রিয়েলি সরি লুসিয়া। আমি ভাবিনি বিষয়টা এতটা গড়াবে। আমি ভেবেছিলাম আমি চলে যাওয়ার পর তুমিও অভিমানে ওখান থেকে চলে যাবে। কিন্তু তুমি যে এতটা বড় বিপদে পড়বে, সেটা আমি কল্পনাও করতে পারিনি। তুমি বিপদে পড়েছো জানার পরেই আমি আবার ওখানে ফিরে গিয়েছিলাম, কিন্তু গিয়ে দেখি সব শেষ। আর আজ এটা জেনে আমি সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছি যে—মেইলস্ট্রোম তোমার আপন ভাই!”

লুসিয়া ম্লান হাসল, সেই হাসিটা ছিলো বিষাদ মাখা। সে ফারহানের শার্টের হাতাটা একটু টেনে নিয়ে শীতল গলায় বলল—”এসব থাক ফারহান। যা ঘটার ঘটে গেছে, আর যা বলার তাও হয়ে গেছে। এখন কি আমি যেতে পারি? আমাদের মাঝে আর নতুন করে বলার কিছু নেই।”

ফারহান একটু থমকে দাঁড়াল। সে লুসিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, “কিন্তু তুমি বাংলাদেশে কেন এসেছ? তুমি তো এই দেশটা পছন্দ করতে না।”

লুসিয়া এবার সরাসরি ফারহানের চোখের দিকে তাকাল। তার চোখের কোণে নোনা জল চিকচিক করে উঠল। সে ধরা গলায় বলল—”তোমাকে আর বলে কী হবে ফারহান? যে মানুষটা মনের ভাষা বোঝে না, তাকে কথা দিয়ে বোঝানোর সাধ্য আমার নেই। ভালোবাসার টানে মানুষ সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে আসে, আর তুমি আমায় জিজ্ঞেস করছ কেন এসেছি?”

ফারহান এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে গেল। তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে অস্ফুট স্বরে বলল, “তার মানে… তুমি কেবল আমার জন্যই এসেছ?”

লুসিয়া কোনো উত্তর দিল না, সে মুখ ফিরিয়ে নিল। ফারহান তখন হঠাৎ খেয়াল করল লুসিয়ার পরনের শার্টটার দিকে। সে একটু অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল—
“তুমি কি জামাকাপড় আনোনি সাথে? আমার শার্ট কেন পরেছ?”

লুসিয়া বিরক্ত হয়ে নিজের গায়ের বড় শার্টটার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমার ব্যাগ অন্য রুমে, যেখানে জাভি ব্রো ঘুমাচ্ছে। আমি চাইনি কেউ আমাকে বের হতে দেখুক। আর তোমার ঘরে এটাই ছিল। এখন কি শার্টটা খুলে দিয়ে যাব?”

ফারহান ম্লান হাসল। সে এগিয়ে এসে লুসিয়ার শার্টের কলারটা একটু ঠিক করে দিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল, “না, থাক। তোমাকে আমার শার্টে খুব একটা খারাপ লাগছে না। বরং এই প্রথম তোমাকে আমার খুব কাছের কেউ মনে হচ্ছে।”

লুসিয়া স্তব্ধ হয়ে গেল। ফারহানের এই ছোট একটা কথা যেন তার সব অভিমান এক নিমিষেই ধুয়ে ফেলতে চাইল।

লুসিয়া তখন একরাশ দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নিচু করল। ফারহানের দেওয়া সেই ঢিলেঢালা শার্টের হাতাটা আঙুলে জড়াতে জড়াতে ধরা গলায় বলল, “অনেক কথা হলো। এবার আমি যাই, বাই।”

লুসিয়া পা বাড়াতে চাইল বাড়ির দিকে, কিন্তু ফারহান তাকে যেতে দিল না। মুহূর্তের মধ্যে ফারহান লুসিয়ার হাতটা শক্ত করে টেনে ধরল। টানের তীব্রতায় লুসিয়া ছিটকে এসে ফারহানের বুকের ওপর আছড়ে পড়ল। ফারহানের এক হাত লুসিয়ার কোমরে, আর অন্য হাতটা ধীরে ধীরে উঠে এল লুসিয়ার ফর্সা গালে।
আবছা অন্ধকারেও সেই কালশিটে দাগটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। ফারহান তার পকেট থেকে ফোন বের করে ফ্ল্যাশলাইটটা অন করল। আলোর তীব্রতায় লুসিয়া চোখ কুঁচকে ফেলল। ফারহান খুব কাছ থেকে দেখল সেই দাগটা—যেখানে ওই জানোয়ারটা সজোরে থাপ্পড় মেরেছিল। ঠোঁটের কোণে জমাট বাঁধা রক্ত আর গালের ফোলা অংশটা দেখে ফারহানের চোখের মণি স্থির হয়ে গেল।

হঠাৎ করেই ফারহান সব নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল। সে ফোনের আলোটা নিভিয়ে দিয়ে লুসিয়ার মুখটা দুহাতে আগলে ধরল আর অত্যন্ত নিবিড়ভাবে লুসিয়ার সেই আহত গালে ঠোঁট ছোঁয়াল। এক গভীর, তীব্র চুমু।

লুসিয়া স্তব্ধ হয়ে গেল। তার শরীরের প্রতিটি শিরায় বিদ্যুৎ বয়ে গেল। এতক্ষণের জমে থাকা সব রাগ, সব অভিমান আর ঘৃণা সেই এক মুহূর্তের স্পর্শে মোমের মতো গলে জল হয়ে গেল।

লুসিয়া আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে ফারহানের শার্ট খামচে ধরে হু হু করে কেঁদে উঠল। তার কান্নার শব্দ রাতের নিস্তব্ধতাকে চিরে দিচ্ছিল। ফারহান এক পর্যায়ে লুসিয়াকে নিজের বুকের ভেতর শক্ত করে টেনে নিল। তার চিবুক লুসিয়ার মাথায় ঠেকিয়ে খুব ক্লান্ত স্বরে বলল—”বোকা মেয়ে! কেন আমার পিছু পিছু ঘোরো বলো তো? কেন আমায় ভুলে যাচ্ছ না? কেন নিজের জীবনটাকে এভাবে বিপন্ন করছ?”

লুসিয়া ফারহানের বুক থেকে মাথা তুলে ঝাপসা চোখে তার দিকে তাকাল। তার স্বরে তখন একরাশ হাহাকার, “তুমি কি আমাকে একটুও মনে করো না ফারহান? আমি কি তোমার কাছে এতটাই মূল্যহীন?”

ফারহান এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকাল। তারপর লুসিয়ার চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে বলল—”ভালোবাসি তোমাকে আমি। আর ভালোবাসি বলেই তোমাকে দূরে সরিয়ে রাখি লুসিয়া। আমার জীবনটা সহজ নয়। আমি এক এমন চোরাবালিতে আটকে গেছি যেখান থেকে বের হওয়ার কোনো পথ নেই। হয়তো মৃত্যু ছাড়া আমি এই জীবন থেকে মুক্তি পাব না। আর সেই কারণেই আমি নিজের বাবা-মায়ের কাছ থেকে দূরে থাকি, বোনের কাছ থেকে দূরে থাকি… আর তোমার কাছ থেকেও।”

ফারহান একটু থামল, তার গলাটা ধরে এল। সে আবার বলল, “তোমাকে আমি আমার কাছে রাখতে পারব না লুসিয়া। আমার বড্ড ইচ্ছে করে জানো? তোমাকে প্রাণভরে ভালোবেসে নিজের কাছে আগলে রাখতে, কিন্তু আমি পারছি না। আমার ছায়া মাড়ালে তোমার জীবনে কেবল বিপদই আসবে। আজকের ঘটনা কি তার প্রমাণ নয়?”

মাঠের ধারের সেই প্রাচীন গাছটার নিচে সময়টা থমকে দাঁড়িয়েছে। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর দূর থেকে আসা বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যাচ্ছে না। লুসিয়া ফারহানের বুকের ওপর মাথা রেখে কিছুক্ষণ নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ফারহানের শরীরের উষ্ণতা আর সেই শার্টের ঘ্রাণ তাকে এক অদ্ভুত ঘোরলাগা জগতে নিয়ে গেছে।

ফারহানের মুখে “ভালোবাসি” শব্দটা শোনার পর লুসিয়ার ভেতরের সমস্ত দ্বিধা, ভয় আর অভিমান এক নিমিষেই কর্পূরের মতো উবে গেল। সে ধীরে ধীরে ফারহানের বুক থেকে মাথা তুলল। তার চোখে তখনো জল চিকচিক করছে, কিন্তু দৃষ্টিতে এক অটল পাহাড়সম দৃঢ়তা।

লুসিয়া ফারহানের শার্টের কলারটা আরও শক্ত করে খামচে ধরল, যেন ছেড়ে দিলেই ফারহান আবার কুয়াশার মতো মিলিয়ে যাবে। সে কাঁপাকাঁপা কিন্তু পরিষ্কার গলায় বলল—”আমি এত কিছু জানি না ফারহান! গত কয়েকটা মাস আমি নরকের আগুনের মধ্য দিয়ে গিয়েছি। আমি মেক্সিকোতে বসে হাজার বার চেষ্টা করেছি তোমাকে ভুলে যেতে, মুভ অন করতে। ভেবেছিলাম হয়তো তুমি আমাকে কখনো ভালোবাসোইনি। কিন্তু আজ… এখন তোমার নিজের মুখ থেকে ওই একটা কথা শোনার পর আমার ফেরার আর কোনো পথ নেই।”

লুসিয়া এক মুহূর্ত থামল, তার শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হচ্ছে। সে সরাসরি ফারহানের চোখের মণির দিকে তাকিয়ে বলল—”তুমি ছাড়া আমার আর কোনো গন্তব্য নেই। তুমি বিপদকে ভয় পাও? তুমি মৃত্যুকে ভয় পাও? আমি পাই না! আমি তোমাকে চাই, যেকোনো মূল্যে। তোমার জীবন যদি নরক হয়, আমি সেই নরকেই তোমার হাত ধরে পুড়তে রাজি আছি। সেটা যতই বিপজ্জনক হোক, আমি তোমার কাছেই থাকতে চাই। আমাকে আর দূরে ঠেলে দিও না ফারহান, প্লিজ!”

ফারহান স্তব্ধ হয়ে গেল। লুসিয়ার এই আত্মত্যাগের রূপ সে আগে কখনো দেখেনি। মেক্সিকোর সেই চঞ্চল, অতিরিক্ত আধুনিক আর আদুরে মেয়েটি আজ যেন এক রণক্লান্ত যোদ্ধার মতো তার ভালোবাসা দাবি করছে। ফারহান চাইছিল তাকে আবার বোঝাতে, তাকে রক্ষা করতে—কিন্তু লুসিয়ার চোখের সেই তৃষ্ণা দেখে তার সব যুক্তি হেরে গেল।

ফারহান দুহাতে লুসিয়ার মুখটা আবার আগলে ধরল। তার কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল, “তুমি জানো না কী করছ লুসিয়া। আমার সাথে থাকা মানে প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়া। তোমার ভাইয়েরা কোনোদিন আমার সাথে থাকতে দেবে না।

লুসিয়া ম্লান হাসল। “ভাইয়ারা আমাকে ভালোবাসে ফারহান, কিন্তু আমার জীবনটা আমার। আমি আজ থেকে আর কারো কথা শুনব না। আমি শুধু তোমার হয়ে থাকতে চাই।”

ফারহান গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিচু স্বরে বলল, “ঠিক আছে লুসিয়া, অনেক রাত হয়েছে। এবার রুমে যাও। কেউ জেগে গেলে আর রক্ষা থাকবে না।”

লুসিয়া ফারহানের বুকের শার্টটা খামচে ধরল, তার যাওয়ার একদমই ইচ্ছে নেই। সে অভিমানী গলায় ফিসফিস করে বলল, “আরেকটু থাকি না ফারহান? সেই কবে আমাকে একা ফেলে মেক্সিকো থেকে চলে এসেছিলে! আমার প্রতিটা দিন যেন বছরের মতো কেটেছে। আসলে ওপরওয়ালা যা করেন ভালোর জন্যই করেন। আজ যদি আমি ওই বিপদে না পড়তাম, তবে তুমি কোনোদিন নিজে থেকে আমার কাছে আসতে না।”

লুসিয়ার এই কথা শুনে ফারহানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য সেই পৈশাচিক ভয়ের ছায়া খেলে গেল—যদি লুসিয়ার আজ বড় কোনো ক্ষতি হয়ে যেত! ফারহান ঝট করে নিজের তর্জনী লুসিয়ার ঠোঁটের ওপর চেপে ধরল।

“চুপ! একদম এসব বলবে না। কী বলছ এসব? বিপদে পড়েছ বলে দেখা হয়েছে? তুমি কি জানো আমার বুকটা কেমন করছিল যখন শুনলাম তোমাকে ওই জানোয়ারগুলো তুলে নিয়ে গেছে? যদি আজ বড়সড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যেত, আমি নিজেকে কোনোদিন ক্ষমা করতে পারতাম না লুসিয়া। কোনোদিন না!” ফারহানের কণ্ঠে ফুটে উঠল এক তীব্র অপরাধবোধ আর ভালোবাসা।

লুসিয়া এক পলক ফারহানের আগুনের মতো জ্বলজ্বলে চোখের দিকে তাকাল। সে আলতো করে ফারহানের আঙুলটা নিজের ঠোঁট থেকে সরিয়ে নিল। তারপর কোনো কথা না বলে, হুট করেই ফারহানের ঠোঁটে একটা আলতো, পালকের মতো নরম চুমু খেয়ে বসল।

ফারহান স্তব্ধ হয়ে গেল। তার শরীরের প্রতিটি কোষ এক মুহূর্তের জন্য অবশ হয়ে গেল। সে লুসিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে একটু হাসল, সেই হাসিতে ছিল প্রশ্রয় আর এক নেশা। সে ফিসফিস করে বলল—
“এভাবে কেউ চুমু খায়? এটা তো স্রেফ একটু ছোঁয়া।”

লুসিয়া তার ঘাড় বাঁকিয়ে চঞ্চল চোখে তাকাল। তার ডাগর চোখে তখন দুষ্টুমি আর প্রেম খেলা করছে। সে চ্যালেঞ্জ করার ভঙ্গিতে বলল, “তাহলে কীভাবে খায়? তুমিই শেখাও না!”

ফারহানের ধৈর্যের বাঁধ এবার ভেঙে গেল। সে লুসিয়ার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের দেহের সাথে একদম মিশিয়ে নিল। লুসিয়ার পিঠ গিয়ে ঠেকল সেই পুরনো গাছের খসখসে বাকলে। ফারহান আর এক মুহূর্ত দেরি করল না; সে লুসিয়ার ঠোঁটে ঠোঁট মিলিয়ে দিল। এক গভীর, তীব্র আর তৃষ্ণার্ত চুম্বন—যাতে মিশে ছিল মাসের পর মাস ধরে জমে থাকা বিরহ, হাহাকার আর না পাওয়া ভালোবাসার সবটুকু তৃষ্ণা।

লুসিয়ার দুচোখ বুজে এল। তার সমস্ত জগত তখন কেবল ফারহানের স্পর্শে সীমাবদ্ধ। সে বুঝতে পারল, এই মানুষটার ছায়া মাড়ালে যদি মৃত্যুও আসে, তবে সে সেই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে রাজি।

গাছটার নিচে ঘন হয়ে আসা অন্ধকারে ফারহান আর লুসিয়া এক অন্য জগতে হারিয়ে গিয়েছিল। ফারহানের সেই গভীর চুম্বনের রেশ লুসিয়ার সারা শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ জাগিয়ে তুলেছে। তার দীর্ঘদিনের তৃষ্ণা, অভিমান আর না পাওয়ার যন্ত্রণাগুলো আগ্নেয়গিরির লাভার মতো বেরিয়ে আসতে চাইল।

লুসিয়া হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফারহানের শার্টের কলারটা আরও শক্ত করে খামচে ধরল। সে নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিল না। সে মুখ নামিয়ে ফারহানের গলার ওপর সজোরে একটা পাগলাটে চুমু খেল। তার তপ্ত নিঃশ্বাস আর ঠোঁটের স্পর্শ ফারহানের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এক আদিম উন্মাদনা ছড়িয়ে দিচ্ছিল।

কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই ফারহান সম্বিত ফিরে পেল। সে সজোরে লুসিয়ার দুই কাঁধ ধরে তাকে নিজের থেকে কিছুটা দূরে সরিয়ে দিল। তার বুক তখন কামারের হাপরের মতো ওঠানামা করছে, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম।

লুসিয়া অপ্রস্তুত হয়ে ঝাপসা চোখে তাকাল। তার স্বরে একরাশ তৃষ্ণা, “কী হলো ফারহান? থামলে কেন?”

ফারহান চারপাশটা একবার তীক্ষ্ণ নজরে দেখে নিল। দূরে ল্যাম্পপোস্টের ম্লান আলোয় গলির মোড়টা আবছা দেখা যাচ্ছে। সে লুসিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর আর সতর্ক গলায় ফিসফিস করে বলল—”লুসিয়া, কন্ট্রোল ইয়োরসেলফ! এটা মেক্সিকোর কোনো নির্জন সৈকত বা কানকুনের কোনো রিসোর্ট নয়। এটা পুরান ঢাকার গলি। এখানে দেয়ালেরও কান আছে।”

লুসিয়া একটু থমকে গেল। ফারহানের কথায় রূঢ় বাস্তবতা মিশে আছে। ফারহান আবার বলল, “এখানে পর্দা প্রথা আর সামাজিক শাসনের এক অদৃশ্য দেয়াল আছে লুসিয়া। কেউ যদি আমাদের এই অবস্থায় দেখে ফেলে, তবে কাল সকালেই তোমার ভাই আর আমার বাবার সম্মান ধুলোয় মিশে যাবে।”

লুসিয়া এবার মাথা নিচু করল। তার পরনে ফারহানের সেই ঢিলেঢালা শার্ট, যা বাতাসের ঝাপটায় উড়ছে। সে বুঝতে পারল ফারহান কেবল তাকে নয়, এই পুরো পরিস্থিতির ভয়াবহতা থেকে তাদের দুজনকে বাঁচাতে চাইছে।

ফারহান লুসিয়ার কপালে হাত রেখে খুব আলতো করে তার চুলগুলো ঠিক করে দিল। “এখন যাও। এই চাবিটা নিয়ে চুপিচুপি ভেতরে ঢুকে পড়ো। গেটটা একদম শব্দ না করে লাগাবে। আর শোনো… শার্টটা আলমারিতে লুকিয়ে রেখো, কাল সকালে যেন কেউ না দেখে।”

লুসিয়া ম্লান হেসে চাবিটা হাতে নিল। সে যাওয়ার আগে একবার ফারহানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি কাল আবার তোমার জন্য অপেক্ষা করব।”

ফারহান কোনো কথা না বলে কেবল ইশারায় তাকে যেতে বলল। লুসিয়া পা টিপে টিপে গেটের দিকে এগিয়ে গেল। ফারহান অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সেই ছায়াটার দিকে। সে জানে, এই আগুনের খেলা কতক্ষণ সে চালিয়ে যেতে পারবে তা অনিশ্চিত।

চলবে…….

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply