Golpo ডার্ক রোমান্স ডিজায়ার আনলিশড

ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৩৫ (শেষাংশ)


ডিজায়ার_আনলিশড

✍️ সাবিলা সাবি
পর্ব-৩৫ (শেষাংশ)

ঢাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভিআইপি টার্মিনাল থেকে যখন সবাই বের হলো, তখন দুপুরের কড়া রোদ। জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরীর ব্যক্তিগত সিকিউরিটি টিম আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল। কালো রঙের তিনটি দামী এসইউভি (SUV) সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে বাইরে। গার্ডরা ক্ষিপ্রতার সাথে মেক্সিকো থেকে আনা বিশাল লাগেজগুলো পেছনের গাড়িতে তুলে নিল। মাঝখানের স্পেশাল বুলেটপ্রুফ গাড়িটিতে জাভিয়ান, তান্বী আর লুসিয়া গিয়ে বসল।

জাভিয়ান আর তান্বী পেছনের সিটে বসেছে, আর লুসিয়া ড্রাইভারের পাশের সিটে। ঢাকা শহরের সেই চিরচেনা ধুলোবালি আর কোলাহল তান্বীর নাকে লাগতেই ওর বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল।

গাড়িটি যখন বিমানবন্দরের রাস্তা ছেড়ে বনানী পার হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এলাকা দিয়ে যাচ্ছিল, তখন তান্বীর চোখ দুটো জানলার কাঁচে আটকে গেল। কার্জন হলের সেই লাল দালান, চত্বরের পরিচিত গাছপালা—সবকিছুই মনে হলো ওকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। কত স্বপ্ন ছিল এই ক্যাম্পাসে, আর কত স্মৃতি মিশে আছে প্রতিটি ধূলিকণায়। এলিনার সাথে এই পথ দিয়েই ও কতবার হেঁটেছে!
জাভিয়ান আড়চোখে তান্বীর দিকে তাকাল একবার। সে অনুভব করতে পারছে তান্বীর হৃদস্পন্দন অনেকটা বেড়ে গেছে। এই ক্যাম্পাসই এক সময় তার জিন্নীয়ার পৃথিবী ছিল, আর আজ সে এখানে একজন পরবাসের মতো ফিরছে। জাভিয়ান কোনো কথা বলল না, শুধু ওর শক্ত চোয়ালটা আরও একটু কঠিন হয়ে এল। সে জানে, এই শহরটা তান্বীর আবেগের জায়গা, কিন্তু এই আবেগের ভাগীদার সে কাউকে হতে দেবে না।

ঠিক শাহবাগের মোড়ে আসতেই গাড়িটি এক বিশাল জ্যামে আটকে গেল। রিকশা, বাস আর সিএনজির কান ফাটানো হর্ন, আর সাথে গুমোট গরমতো আছেই। লুসিয়া মেক্সিকোর স্নিগ্ধ পরিবেশে বড় হয়েছে, এই নরকতুল্য জ্যাম আর রাস্তার ধুলোবালি দেখে সে চরম বিরক্তিতে কপালে হাত দিল।

“গড! হোয়াট ইজ দিস? এই জ্যাম কি কোনোদিন শেষ হবে?” লুসিয়া বেশ উচ্চস্বরেই বিরক্তি প্রকাশ করল। জানলার বাইরে তাকিয়ে সে দেখল নোংরা ড্রেন আর মানুষের ভিড়। “জাভি ব্রো, হাউ ডু পিপল ইভেন ব্রিদ হিয়ার? এই ধুলো আর ধোঁয়ায় তো দম আটকে আসছে। আমি ছোটবেলায় যখন ‘চৌধুরী নিকেতন’-এ এসেছিলাম, তখন তাও এত বাজে অবস্থা ছিল না!”

জাভিয়ান খুব শান্ত গলায় কিন্তু গম্ভীরভাবে বলল, “পেশেন্স লুসিয়া। এটা ঢাকা, মেক্সিকো সিটি নয়। এখানকার নিয়ম আর বাতাস আলাদা। অভ্যস্ত হওয়ার চেষ্টা কর।”

লুসিয়া বিড়বিড় করে অভিযোগ করতে লাগল। সে ভাবতেও পারেনি বাংলাদেশ এতটা অগোছালো হবে। কিন্তু তার বিরক্তির মাঝেও মনের এক কোণে ফারহানের নামটা ধুকপুক করছে। সে ভাবছে—এই জ্যামের ভেতরেই কি কোথাও ফারহান আছে? এই অগোছালো শহরটাই কি ফারহানের ঠিকানা?

তান্বী বাইরের জ্যাম দেখছিল না, সে দেখছিল রাজপথের সেই পরিচিত মানুষগুলোকে। আজ সে নিজের দেশে দাঁড়িয়েও কত পরবাসী! তার মন পড়ে আছে সেই বাড়িতে, যেখানে তার মা-বাবা হয়তো পথ চেয়ে বসে আছে। সে জানলার কাঁচটা একটু নামাতে চাইল, কিন্তু জাভিয়ান ওর হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল।

“নট নাউ জিন্নীয়া। বাইরে অনেক ডাস্ট। এসির ভেতরেই থাকো,” জাভিয়ানের কণ্ঠে সেই পরিচিত শাসনের সুর।

গাড়িটি ধীরে ধীরে জ্যাম ঠেলে এগিয়ে চলল ‘রেহেমান প্রিয়ঙ্গন’-এর দিকে। তান্বী বুঝতে পারল, এই শহরটা তার নিজের হলেও, তার চারপাশের দেয়ালগুলো এখন অনেক বেশি আলাদা।

গাড়িটি যখন পুরান ঢাকার সরু গলিগুলো পেরিয়ে ‘রেহমান প্রিয়াঙ্গন’-এর সামনে এসে থামল, তখন দুপুরের রোদে বাড়ির সামনের বাগানটা ঝিকমিক করছিল। গেটের ভেতরেই ফুলে ফুলে ভরা সেই পরিচিত উঠান, আর তার ভেতরেই সেই একতলা দালান বাড়িটি। কিন্তু তান্বী গাড়ি থেকে নামার আগেই স্তব্ধ হয়ে গেল। তার মনে পড়ে, যখন সে মেক্সিকোর উদ্দেশ্যে দেশ ছেড়েছিল, তখনও তাদের এই বাড়ির দেওয়ালে শেওলা ধরা ছিল, জানলার গ্রিলগুলোয় মরচে পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু আজ? বাড়িটি একদমই ঝকঝক করছে। নতুন রঙের প্রলেপ, সাথে বাগানটা আগের চেয়েও অনেক বেশি সাজানো। এমনকি গেটটাও নতুন করে তৈরি করা হয়েছে।

জাভিয়ান গাড়ির ভেতরেই বসে থাকল। তার চোখেমুখে এক ধরণের গভীর গাম্ভীর্যতা।সে খুব শান্ত গলায় বলল, “যাও তান্বী। ভেতরে যাও। তোমার মা বাবা তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।”

তান্বী অবাক হয়ে জাভিয়ানের দিকে তাকাল। “আপনি আসবেন না?”

জাভিয়ান মাথা নাড়ল। সে জানে, এই বাড়িতে তার প্রবেশটা সহজ হবে না। রির্কাদোর কাছ থেকে বিপুল অংকের টাকা দিয়ে জোর করে তান্বীকে বিয়ে করা, এমনকি তান্বীর বাবার পায়েও গুলি করা সবই ছিলো তখন এক কালো ইতিহাস। যদিও এরপরে আড়ালে থেকে সে তান্বীর বাবার সেই পঙ্গু পায়ের দামী সার্জারি করিয়েছে, পুরো সংসারটা নিজের টাকায় চালিয়েছে, কিন্তু সেই সত্যগুলো এখনো তান্বীর কাছে অজানা। সে এখনো জানে না যে তার বাবা এখন হুইলচেয়ার ছেড়ে কিছুটা হাঁটতে পারেন কেবল জাভিয়ানেরই জন্য।

লুসিয়া ড্রাইভারে পাশের সিটে বসে বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে বলল, “ব্রো, আমরা কি এই সরু গলিতেই বসে থাকব? এই গরমে ডাস্ট আর শব্দে আমার মাথা ধরে যাচ্ছে!”

জাভিয়ান লুসিয়াকে ইশারায় চুপ করতে বলে তান্বীর দিকে তাকাল। “আমি পরে আসছি। তুমি আগে গিয়ে ওদের সারপ্রাইজ দাও। গো নাও!”

তান্বী কাঁপতে কাঁপতে গাড়ি থেকে নামল। তার পায়ের নিচের মাটি মনে হচ্ছে আজ কথা বলছে। সে যখন গেট খুলে উঠানে পা রাখল, তার চোখে জল উপচে পড়ল। বাড়ির প্রতিটি কোণ এখন বদলে গেছে। সেই ভাঙাচোরা বাড়িটি আজ এক সুন্দর নীড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

দরজার সামনে গিয়ে তান্বী হাত তুলল কলিং বেল চাপার জন্য, কিন্তু তার হাত কাঁপছে। ভেতর থেকে তখন কারো হাঁটার শব্দ শোনা যাচ্ছে। লাঠির ঠকঠক শব্দ নয়, বরং ধীরস্থির কোনো মানুষের পদধ্বনি। তান্বী ভাবতে পারল না, তার পঙ্গু বাবা কি তবে সত্যিই হাঁটছেন?

সে যখন কলিং বেল টিপল, ভেতর থেকে এক পরিচিত নারী কণ্ঠ ভেসে এল “কে? এই দুপুরে আবার কে এল?”
তান্বীর বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল— “মা!”

তান্বী যখন কলিং বেল টিপল, ভেতর থেকে দরজা খোলার শব্দ হলো। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে দেখে তান্বীর মা স্তব্ধ হয়ে গেলেন। আর তারপরই এক আর্তনাদ মেশানো চিৎকারে তিনি তান্বীকে জড়িয়ে ধরলেন।

​”তান্বী! আমার কলিজার টুকরা! তুই ফিরেছিস মা!” মায়ের কণ্ঠের সেই কান্নায় সারা বাড়ির বাতাস ভারী হয়ে উঠল। তান্বীও ডুকরে কেঁদে উঠল। মায়ের সেই চেনা আঁচলের ঘ্রাণ, সেই মমতাময় স্পর্শ যা এতদিন পর সে মরুভূমিতে বৃষ্টির দেখার মতো পেল।

​ভেতর থেকে ভেসে এল এক ধীর পদধ্বনি। তান্বী চোখ মুছে দেখল, তার বাবা লাঠিতে ভর দিয়ে ধীরে ধীরে হেঁটে আসছেন। তান্বী বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেল। যে মানুষটি চিরতরে পঙ্গু হয়ে হুইলচেয়ারে বন্দি হয়ে গিয়েছিল, সে আজ নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে! তান্বী দৌড়ে গিয়ে বাবার পায়ে আছড়ে পড়ল।

​”বাবা! তুমি… তুমি হাঁটছ?” তান্বীর গাল বেয়ে তখন অশ্রুধারা বয়ে যাচ্ছে। বাবা তার মাথায় হাত রেখে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। “হ্যাঁ রে মা, ওপরওয়ালার রহমত আর ভালো চিকিৎসার গুণে আমি আবার দাঁড়াতে পেরেছি।”

​কান্নাভেজা এক দীর্ঘ সময় পর তান্বীর মা মুখ মুছলেন। চোখের জল মুছে তিনি উৎকণ্ঠিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “মা, তুই কি একা এসেছিস? কার সাথে এলি?”

​তান্বী থতমত খেয়ে গেল। সে ভয়ে ভয়ে মাথা নিচু করে বলল, “জাভিয়ান… জাভিয়ানও এসেছে মা। ও বাইরে গাড়িতে বসে আছে।”

​তান্বী ভেবেছিল জাভিয়ানের নাম শুনলেই হয়তো তার বাবা মা একবারে রাগে ফেটে পড়বেন। সেদিন যে মানুষটি মাফিয়ার আস্তানায় হানা দিয়ে জোর করে তার মেয়েকে নিয়ে গিয়েছিল, তার জন্যতো তাদের মনে কেবল ঘৃণা থাকার কথা। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে তার মা-বাবার চোখেমুখে কোনো রাগের চিহ্ন দেখা গেল না। বরং তারা একে অপরের দিকে তাকালেন—এক ধরণের নরম দৃষ্টি নিয়ে।

​তান্বীর বাবা মৃদু হাসলেন। তিনি জানেন, মেক্সিকোর সেরা ডাক্তার পাঠিয়ে আড়ালে থেকে কে তার পায়ের সার্জারি করিয়েছে। তিনি জানেন, প্রতি মাসে এই সংসারের খরচ আর বাড়ির এই ভোলবদল কার ইশারায় হয়েছে।

​তান্বীর মা দ্রুত আঁচল ঠিক করে বললেন, “আরে, জামাইকে বাইরে বসিয়ে রেখেছিস কেন? তাড়াতাড়ি যা, ওকে আর সাথে যারা আছে সবাইকে ভেতরে নিয়ে আয়। ওরে ও তান্বী, যা তাড়াতাড়ি যা!”

​তান্বী একদম থ বনে গেল। তার মা-বাবার এই সহজ পরিবর্তন সে কল্পনাও করতে পারেনি। সে কিছু না বুঝে বিস্ময়ভরা চোখে একবার বাবার দিকে তাকাল, তারপর খুশিতে আত্মহারা হয়ে দৌড়ে বাইরে এল।
​গাড়ির জানলা দিয়ে জাভিয়ান শান্তভাবে তাকিয়ে ছিল। তান্বী হাঁপাতে হাঁপাতে গাড়ির কাছে এসে বলল, “জাভিয়ান! চলুন, বাবা-মা আপনাদের ডাকছে! ওনারা একদম রাগ করেননি। লুচি আপা, চলুন ভেতরে চলুন!”

​জাভিয়ান এক মুহূর্তের জন্য তান্বীর হাসিমুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। তার ঠোঁটের কোণে এক তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। সে আগে জানতো, টাকা আর ক্ষমতা দিয়ে সবকিছু জয় করা যায়, কিন্তু সে এখন বুঝলো যত্ন আর দায়িত্ব দিয়ে মানুষের মন জয় করা যায়।

​লুসিয়া বিরক্তি ঝেড়ে গাড়ি থেকে নামল। এই সরু গলি আর ধুলোর মধ্যে সে বেশি ধ ধ ধ করতে পারছিল না, তবে ফারহানের বাড়ির ভেতরে ঢোকার উত্তেজনায় সে সব ভুলে গেল। জাভিয়ান খুব গম্ভীর আর রাজকীয় ভঙ্গিতে গাড়ি থেকে নেমে স্যুটের বোতামটা লাগাল। তারপর তান্বীর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে ধীর পায়ে ‘রেহমান প্রিয়াঙ্গন’-এর ভেতরে প্রবেশ করল।

জাভিয়ান যখন ‘রেহমান প্রিয়াঙ্গন’-এর ছোট গেটটা দিয়ে ভেতরে ঢুকল, তার প্রতিটি পদক্ষেপে ছিল এক রাজকীয় আভিজাত্য। দামী পারফিউমের ঘ্রাণে পুরান ঢাকার সেই ধুলোমাখা বাতাস মুহূর্তেই বদলে গেল। তার পেছনেই লুসিয়া, তার বিরক্তি এখন এক তীব্র কৌতূহলে রূপ নিয়েছে। সে ভেতরে ঢুকেই শিকারি বিড়ালের মতো চারিদিকে চোখ বোলাতে লাগল। তার হৃৎপিণ্ড ড্রাম পেটাচ্ছে – কোথায় ফারহান?

সোফায় বসার আগে লুসিয়া চট করে প্রত্যেকটা ঘরের দিকে উঁকি দিল। সামনের একটা ঘরের দরজা খোলা, কিন্তু ভেতরে প্রাণহীন নিস্তব্ধতা। বিছানা গোছানো, টেবিলের ওপর কিছু বই স্তূপ করা—কিন্ত কোনো মানুষের চিহ্ন নেই। লুসিয়ার বুকটা ধক করে উঠল। সে হতাশ হয়ে জাভিয়ানের পাশের সোফাটায় গিয়ে ধপ করে বসল।

তান্বীর মা ততক্ষণে হন্তদন্ত হয়ে রান্নাঘর থেকে শরবতের গ্লাস নিয়ে এসেছেন। “বাবা, তোমরা বোসো। এই গরমে একটু শরবত খাও। আমি এখনই নাস্তার ব্যবস্থা করছি,” তিনি জাভিয়ানের দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত মায়া আর কৃতজ্ঞতা নিয়ে বললেন।

ঠিক সেই মুহূর্তে বাড়ির সামনে কয়েকটা গাড়ির হর্ন শোনা গেল। তান্বী অবাক হয়ে দেখল, একে একে পাঁচ-ছয়জন লোক হাতে বিশাল বিশাল প্যাকেট আর ব্যাগ নিয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকছে। কারো হাতে বাজারের সেরা ইলিশ আর খাসির মাংস, কারো হাতে নামী মিষ্টির দোকানের ডজন ডজন কার্টন। কেউ আবার বড় বড় শপিং ব্যাগ নিয়ে ঢুকছে, যাতে দামী শাড়ি, পাঞ্জাবি আর ফলের ঝুড়ি ভর্তি।

মুহূর্তের মধ্যে রেহমান প্রিয়াঙ্গনের সেই শান্ত উঠানটা যএকটা ছোটখাটো উৎসবের কেন্দ্রে পরিণত হলো। তান্বী হতভম্ব হয়ে জাভিয়ানের দিকে তাকাল।

জাভিয়ান খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সোফায় হেলান দিয়ে বসল, যেন কিছুই হয়নি। সে কেবল পকেট থেকে ফোনটা বের করে একবার দেখল সবকিছু ঠিক সময়ে পৌঁছেছে।

জাভিয়ান হালকা গলায় বলল, “মা, আপনি ব্যস্ত হবেন না। আমি আসার আগেই কিছু খাবারের অর্ডার দিয়ে রেখেছিলাম। আর বাবা-মায়ের জন্য কিছু ছোটখাটো উপহার আছে। তান্বী,ওনাদেরকে প্যাকেটগুলো গুছিয়ে রাখতে সাহায্য করো।”

রান্নাঘর থেকে তান্বীর মা দ্রুতপায়ে বেরিয়ে এলেন। উঠানভর্তি এত সব দামী উপহার, মাছ-মাংস আর মিষ্টির পাহাড় দেখে তিনি যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না। তিনি কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে জাভিয়ানের সামনে এসে দাঁড়ালেন।

তান্বীর মা কাঁচুমাচু হয়ে বললেন, “বাবা, এসব তুমি কী করলে? এত কিছু আনার তো দরকার ছিল না। আমরা সামান্য ডাল-ভাত খেলেও খুশি হতাম। এই ইলিশ, খাসির মাংস আর এত এত শাড়ি-কাপড়—এগুলো তো অনেক দামী!”

তান্বীর বাবাও লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে একটু চিন্তিত মুখে সায় দিলেন। “হ্যাঁ বাবা, তুমি আমাদের বড় বড় উপহার দিয়ে ছোট কোরো না। তুমি যে আমাদের মেয়েটাকে আগলে রেখেছ, সেটাই তো বড় পাওনা।”

জাভিয়ান তখন সোফা থেকে উঠে ধীর পায়ে তান্বীর মায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার চোখে সেই চেনা কঠোরতা নেই, বরং এক অদ্ভুত বিনয়। সে খুব শান্ত আর গভীর গলায় বলল—
“আপনারা এসব নিয়ে চিন্তা করবেন না। আসলে এসব তেমন কিছুই না। আর একজন ছেলে যদি তার বাবার বাড়িতে ফেরার সময় কিছু না আনে, তবে সেটা তো ভালো দেখায় না, মা।”

‘মা’—এই একটা শব্দ জাভিয়ানের মুখে শুনে পুরো ঘরটা এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তান্বীর মা থমকে গেলেন। তিনি ভাবতেও পারেননি মেক্সিকোর সেই প্রতাপশালী ছেলেটা তাকে এত আপন করে ‘মা’ বলে ডাকবে। তার চোখের কোণে অজান্তেই জলের আভা দেখা দিল। তিনি আবেগে আপ্লুত হয়ে জাভিয়ানের মাথায় হাত রেখে বিড়বিড় করে বললেন, “বেঁচে থাকো বাবা, অনেক সুখে থাকো।”

তান্বী একপাশে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখছিল। তার ভেতরটা এক গভীর শান্তিতে ভরে উঠল। জাভিয়ান যে শুধু তার প্রেমিক বা স্বামী নয়, সে যে তার পরিবারকেও নিজের করে নিতে জানে, এটা ভেবে তার গর্ব হচ্ছিল।

লুসিয়া এসবের কোনো কিছুতেই মনোযোগ দিতে পারছিল না। সে অস্থির হয়ে উঠল। তান্বীর মার হাতটা ধরে সে ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করল, “আন্টি.. আর কেউ এই বাড়িতে নেই?”

লুসিয়ার এই সরাসরি প্রশ্নে পুরো ঘরে এক নিস্তব্ধতা নেমে এল। তান্বী আর তার মা একে অপরের দিকে তাকালেন। জাভিয়ানের চোখের কোণে এক তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফুটে উঠল, সে শান্তভাবে লুসিয়ার প্রতিক্রিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
.
.
দুপুরের খাবারের টেবিলে তখন রাজকীয় আয়োজন। জাভিয়ানের আনা সেই টাটকা ইলিশের ঝোল, খাসির রেজালা আর সুগন্ধি পোলাওয়ের ঘ্রাণে পুরো ঘর মৌ মৌ করছে। কিন্তু সেই সুস্বাদু খাবারের মাঝেও এক ভারী বিষাদ জেঁকে বসল, যখন তান্বীর মা প্রথম লোকমাটা মুখে তুলেই ডুকরে কেঁদে উঠলেন।
“এই ইলিশ মাছটা এলিনা কত পছন্দ করত! আজ আমার মেয়েটা থাকলে কত খুশি হতো রে তান্বী!”

মায়ের এই বুকফাটা আর্তনাদে তান্বীর হাতের লোকমা হাতেই রয়ে গেল। তার চোখ ফেটে জল বেরিয়ে এল। জাভিয়ান খুব শান্তভাবে খাচ্ছিল, কিন্তু এলিনার নাম শুনতেই তার হাতটা এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। সে আড়চোখে তান্বীর দিকে তাকাল, যার চোখের জল তখন ভাতের থালায় মিশছে।

পুরো ডাইনিং টেবিলে এক নিস্তব্ধতা নেমে এল। কেবল মাঝেমধ্যে তান্বীর ফুঁপিয়ে কাঁদার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। লুসিয়া এসবের কিছুই অনুভব করতে পারছিল না, তার মন তখন ছটফট করছে কেবল একজনের জন্য।
তান্বী চোখের জল মুছে ধরা গলায় হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, “মা… ফারহান ভাইয়া কি এসেছিল? ও কি তোমাদের সাথে দেখা করতে আসেনি একবারও?”

তান্বীর বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নিচু করলেন। “না রে মা, ও এই বাড়ির চৌকাঠ আর মাড়ায়নি। এলিনাকে ও আগলে রাখতে পারেনি আর এই অপরাধবোধ ওকে কুরে কুরে খাচ্ছে। তবে এলাকার লোকজন বলে, মাঝেমধ্যে গভীর রাতে নাকি একটা ছেলেকে বাড়ির গেটের সামনে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। হয়তো ওই আড়াল থেকে আমাদের দেখে আবার চলে যায়। ভেতরে আসার সাহস ওর হয় না।”

তান্বীর মা এই কথা শুনে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। আঁচলে মুখ চেপে তিনি ডুকরে কেঁদে উঠলেন। কান্নারত গলায় বললেন, “আমার ছেলেটা যে একদিনও বাড়ির খাবার ছাড়া,এই মায়ের হাতের রান্না ছাড়া থাকতে পারত না সেই ছেলেটা এখন বাইরে কোথায় কী খাচ্ছে, কে জানে! কেউ কি তাকে এক লোকমা ভাত তুলে দিচ্ছে? আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে রে তান্বী!”

জাভিয়ান এক হাত দিয়ে পানির গ্লাস ধরে তান্বীর মায়ের এই আর্তনাদ শুনছিল। সে দেখল, এই সাধারণ নারীটির চোখে তার ছেলের জন্য কী ব্যাকুলতা!

জাভিয়ান মনে মনে ভাবল, “এটাই কি তবে প্রকৃত মা? যে ছেলেটি এতো অপরাধ করেছ, অপরাধের কারনে বাড়ি ছেড়েছে, যে ছেলেটার কারনে আজ তাদের পুরো পরিবারের এই অবস্থা—অথচ তার জন্যও এই মা এত তপ্ত চোখের জল ফেলছে!”

জাভিয়ানের আজ প্রথমবার মনে হলো, এই মানুষগুলোর হয়তো অঢেল টাকা নেই, চৌধুরী সাম্রাজ্যের মতো ক্ষমতা নেই—কিন্তু সন্তানের প্রতি তাদের যে নিখাদ ভালোবাসা আর যত্ন, সেটা তার নিজের রাজকীয় বাড়িতে কোনোদিনও ছিল না।

জাভিয়ানের মনে পড়ে গেল তার নিজের বাবা-মায়ের কথা। তারা তো ব্যস্ত কেবল ক্ষমতা আর আভিজাত্য নিয়ে। সেখানে ভালোবাসা এক বিলাসবহুল মরীচিকা।
জাভিয়ানের আজ হিংসে হলো ফারহানের ওপর। সে ভাবল, “যদি ফারহানের মতো ভাগ্যটা আমার আর আমার মৃত ভাই রাহিয়ানের হতো! যদি আমাদের মা-বাবাও আমাদের এভাবে আগলে রাখত, আমাদের জন্য এমন ডুকরে কাঁদত!” ক্ষমতার শিখরে বসে থাকা মেক্সিকান পাওয়ারফুল ম্যাচটাও আজ এক মুহূর্তের জন্য নিজেকে খুব রিক্ত অনুভব করল।

লুসিয়া ব্যাকুল হয়ে তান্বীর মার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “আন্টি, তাহলে উনি কোথায় থাকেন?উনি কি তবে কোনো মেসে বা অন্য কোথাও চলে গেছে?”

লুসিয়ার এই উম্মাদনা দেখে জাভিয়ান তার গ্লাস থেকে এক ঢোক জল খেয়ে খুব শীতল গলায় বলল, “চুপ কর লুসিয়া।”

লুসিয়া আর খেতে পারল না। তার বুকটা হাহাকারে ভরে উঠল। সে ভাবল, “ফারহান, তুমি কি এতটাই দূরে চলে গেছ যে নিজের মা-বাবার সামনে আসার সাহসও পাচ্ছ না? আমি তোমাকে খুঁজে বের করবই। এই শহর যদি নরকও হয়, আমি সেই নরক খুঁড়ে তোমাকে বের করে আনব।”
.
.
রাতের আঁধার নামতেই ‘রেহমান প্রিয়াঙ্গন’-এর ছোট বাড়িটি এক নিঝুম স্তব্ধতায় ডুবে গেল। তান্বীর মা অনেক আবেগ আর মমতা নিয়ে এলিনার ঘরটি গুছিয়ে দিয়েছেন জাভিয়ান আর তান্বীর জন্য। আর ফারহানের সেই ছোট, সাদামাটা ঘরটি দেওয়া হয়েছে লুসিয়াকে।

লুসিয়া যখন ফারহানের ঘরে পা রাখল, এক মুহূর্তের জন্য সে থমকে দাঁড়াল। মেক্সিকোর সেই রাজকীয় আলিশান বেডরুমের তুলনায় এটি একেবারেই নগণ্য। ঘরের এক কোণে একটি সিঙ্গেল বিছানা,তার পাশেই পুরনো কাঠের পড়ার টেবিল আর ছোট একটি বুকশেলফ। একপাশে একটা আধুনিক কম্পিউটার আর তার সামনে রাখা একটি সাধারণ চেয়ার। ঘরে কোনো এসি নেই, সিলিং ফ্যানটা ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে ঘুরছে। আর জানলা দিয়ে আসা রাতের গুমোট হাওয়ায় মশার গুনগুনানি লুসিয়ার কানে বাজছে।

লুসিয়া ঘামছিল, কিন্তু এই মুহূর্তে তার শারীরিক অস্বস্তির চেয়েও ফারহানের অস্তিত্ব অনুভব করার তৃষ্ণা ছিল অনেক বেশি। সে ধীরে ধীরে পড়ার টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।টেবিলের ওপর রাখা ফারহানের একটি পুরনো ফ্রেম করা ছবি তার চোখে পড়ল।
সে কম্পিত হাতে ছবিটা তুলে নিল। এটি ফারহানের কলেজ জীবনের ছবি। গায়ে সাদা শার্ট, আর গলায় আইডি কার্ড ঝোলানো—ছবিতে একদম শান্ত আর মার্জিত চেহারার এক কিশোর ফারহান। লুসিয়ার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ম্লান হাসি ফুটে উঠল। সে বিড়বিড় করে বলল, “ফারহান, তুমি তখন থেকেই এতটা কিউট ছিলে? তোমার এই শান্ত চোখ দুটোই তো আমাকে পাগল করে দিয়েছিল।”

লুসিয়া ছবিটা বুকে চেপে ধরে সেই ছোট সিঙ্গেল বিছানাটিতে বসে পড়ল। বিছানার চাদরে এখনো মনে হয় ফারহানের গায়ের হালকা সুবাস লেগে আছে। বাইরের ঘুটঘুটে অন্ধকার আর মশার কামড়কেও তার এখন আর অসহ্য মনে হচ্ছে না। সে ছবির দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল—”তুমি এই ছোট ঘরটায় বসে কত স্বপ্ন দেখতে ফারহান? অথচ আজ তুমি নিজের এই ঘর ছেড়ে পথে পথে ঘুরছ? কেন আমাকে একলা ফেলে এভাবে পালিয়ে এলে? আমি ঠিকই জানি, তুমি এই শহরেরই কোথাও আছো। আমি তোমাকে খুঁজে বের করবই।”

সে বিছানায় শুয়ে ছবিটা চোখের সামনে ধরল। জানলা দিয়ে আসা চাঁদের হালকা আলো ফারহানের ছবির ওপর পড়েছে। লুসিয়া ভাবল, আজ রাতটা সে ফারহানের বালিশে মাথা রেখেই কাটাবে। ফারহান পাশে নেই ঠিকই, কিন্তু তার এই ছোট ঘরটা যেন লুসিয়াকে বলছে ফারহান ফিরবে, সে ফিরতেই হবে।

অন্যদিকে, পাশের ঘরে জাভিয়ান আর তান্বীর মাঝে এক অস্থির নীরবতা। এলিনার শূন্য ঘরে জাভিয়ানের উপস্থিতি তান্বীর মনে এক অদ্ভুত যন্ত্রণার সৃষ্টি করছে।
তান্বী বিছানায় বসে এলিনার একটা ছোট ড্রেস আঁকড়ে ধরে নিঃশব্দে কাঁদছিল। জাভিয়ান জানলার কাছে দাঁড়িয়ে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকলেও তান্বীর প্রতিটি ফোঁপানির শব্দ তার স্নায়ুতে গিয়ে আঘাত করছিল। সে এমনিতেই জ্যাম, ধুলোবালি আর এই ছোট ঘরের গুমোট গরমে বিরক্ত ছিল, তার ওপর তান্বীর এই অন্তহীন কান্না তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিল।
জাভিয়ান হঠাত ঘুরে দাঁড়াল। তার চোয়াল শক্ত, আর চোখ দুটো আগুনের মতো জ্বলছে। সে তান্বীর কাছে গিয়ে নিচু কিন্তু অত্যন্ত কঠোর গলায় ধমকে উঠল—
“স্টপ ইট, জিন্নীয়া! জাস্ট স্টপ ইট! আমি তোমাকে এখানে কান্নাকাটি করে সিন ক্রিয়েট করার জন্য নিয়ে আসিনি। তোমার এই চোখের জল তোমার বোন এলিনাকে ফিরিয়ে আনবে না। সো, বিহেভ ইয়োরসেলফ!”

জাভিয়ানের সেই হাড়হিম করা ধমকে তান্বীর কান্না গলার কাছে আটকে গেল। সে আতঙ্কে শিউরে উঠে জাভিয়ানের দিকে তাকাল। জাভিয়ান যখন রেগে যায়, তখন সে যে কতটা ভয়ানক হতে পারে, তা তান্বীর চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না।

ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের দরজায় টোকা পড়ল। বাইরে থেকে তান্বীর মায়ের কণ্ঠ শোনা গেল। তিনি খুব নিচু স্বরে ডাকলেন— “জাভিয়ান বাবা… একটু এদিকে আসবে?”

জাভিয়ান দ্রুত নিজেকে স্বাভাবিক করে নিল। সে স্যুটের কলারটা ঠিক করে দরজার দিকে এগোল। দরজা খোলার আগেই সে তান্বীর দিকে ফিরে আঙুল উঁচিয়ে নিঃশব্দে এক চরম সতর্কবার্তা দিল। তার চোখের ভাষা পরিষ্কার—এক ফোঁটা জলও যেন আর চোখে না দেখা যায়।

জাভিয়ান দরজা খুলে বাইরে পা রাখল। তান্বীর মা ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তার হাতে একটা মোমবাতি, কারণ এই এলাকায় তখন লোডশেডিং শুরু হয়েছে। তিনি একটু ইতস্তত করে জাভিয়ানকে বললেন—
“বাবা, তোমাদের তো এসিতে থাকার অভ্যাস, এই গরমে খুব কষ্ট হচ্ছে তোমাদের আমি জানি। আমি হাতপাখা নিয়ে এসেছি। আর শোনো, তোমাদের জন্য দুধ গরম করেছি। একদম দেরি করবে না, দুই মিনিটের মধ্যে টেবিলে এসো।”

জাভিয়ান একটু অবাক হলো। মেক্সিকোর প্রতাপশালী হিসেবে তাকে কেউ এভাবে সময় বেঁধে দিয়ে হুকুম করার সাহস পায় না। কিন্তু এখানে এই সাধারণ নারীটি তাকে নিজের ছেলের মতো শাসন করছেন। জাভিয়ান খুব শান্ত গলায় বলল, “ঠিক আছে মা, আমি আসছি।”

জাভিয়ান ঘরে ফিরে এল। তান্বী তখনো পাথরের মতো বসে আছে।

জাভিয়ান তান্বীকে নিয়ে যখন ড্রয়িংরুমে এল, তখন তান্বীর মা জাভিয়ানের হাতে দুধের গ্লাসটা দিয়ে তান্বীকে বললেন, “মা, তুই তোর জন্য আর একটা গ্লাস নিয়ে আয়, আমি রান্নাঘরে বাকি কাজটা সেরে নিই।”

জাভিয়ান দুধের গ্লাসটা হাতে নিয়ে তান্বীর দিকে একপলক তাকাল। তার চোখে তখন এক তীক্ষ্ণ শাসনের আভা। সে নিচু গলায় তান্বীর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল “তাড়াতাড়ি দুধ নিয়ে রুমে এসো জিন্নীয়া। একদম দেরি করবে না।”

তান্বী রান্নাঘরে গেল। অনেকদিন পর নিজের মায়ের হাতের কাজ দেখতে আর টুকটাক কথা বলতে বলতে তার কিছুটা সময় কেটে গেল। সে যখন দুধের গ্লাস নিয়ে ঘরে ফিরল, তখন জাভিয়ান বিছানায় হেলান দিয়ে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বসে আছে। তান্বী ঘরে ঢুকতেই জাভিয়ান গম্ভীর গলায় বলল—”পাঁচ মিনিট।”

তান্বী আকাশ থেকে পড়ল। সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “হোয়াট? পাঁচ মিনিট?”

জাভিয়ান বিছানা থেকে উঠে ধীর পায়ে তান্বীর দিকে এগিয়ে এল। ওর চোখের দৃষ্টিতে এক ধরণের নেশালু রাগ। সে তান্বীর খুব কাছে দাঁড়িয়ে বলল, “তোমার হাজবেন্ড তোমার ওপর প্রচণ্ড রেগে আছে জিন্নীয়া।”

তান্বী এবার আরও অবাক। সে বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে বলল, “রেগে আছেন? কিন্তু কোন কারণে?”

“কারণ তুমি রুমে আসতে পুরো পাঁচ মিনিট সময় লাগিয়েছ,” জাভিয়ান অত্যন্ত শান্ত কিন্তু ভারী গলায় উত্তর দিল।

তান্বী হেসেই ফেলল। “মাত্র পাঁচ মিনিট! তাতেই রেগে গেলেন? আমি তো ভাবলাম এতদিন পর মা-বাবাকে দেখছি, আজ রাতে ওনাদের ঘরে বসে একটু আড্ডা দিব, গল্প করব। অনেক কথা জমে আছে…”

তান্বীর কথা শেষ হওয়ার আগেই জাভিয়ান অতর্কিতে তাকে পাজাডোলা করে কোলে তুলে নিল। তান্বী চমকে উঠে জাভিয়ানের গলা জড়িয়ে ধরল। জাভিয়ান ওকে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে মিশিয়ে ধরে নিবিড় গলায় বলল “একদম নয়, জিন্নীয়া। এক সেকেন্ডের জন্যও তুমি আমার চোখের আড়াল হবে না। বাংলাদেশ হোক বা মেক্সিকো তুমি শুধু আমার হাতের নাগালেই থাকবে। কোনো আড্ডা নয়, কোনো গল্প নয়।”

জাভিয়ানের এই উম্মাদনা আর অধিকারবোধ দেখে তান্বী বুঝতে পারল, নিজের বাড়িতে এসেও সে আসলে জাভিয়ানেরই এক পরম বন্দিনী। জাভিয়ান ওকে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল আর ওর চোখের দিকে তাকিয়ে রইল এমনভাবে মনে হলো তান্বীর ভেতরের সবটুকু অস্তিত্ব শুষে নিতে চায়।

জাভিয়ান তান্বীকে বিছানায় নামিয়ে দিয়ে তার ওপর নিজের ভারী শরীরের নিয়ন্ত্রণ নিল। ফ্যানটা ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে তখন ঘুরছিলো, আর বাইরে হালকা ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক।জাভিয়ান যখন তান্বীকে কাছে টেনে নিতে শুরু করল, তখনই ঘটল এক বিপত্তি। পুরান ঢাকার সেই পুরনো আমলের কাঠের খাট। জাভিয়ানের মতো সুঠাম দেহের মানুষের নড়াচড়াতে খাটটা মনে হলো আর্তনাদ করে উঠল।ক্যাঁচ-ক্যাঁচ আর মড়মড় শব্দে পুরো নিস্তব্ধ ঘরটা কেঁপে উঠল।

তান্বী লজ্জায় আর ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেল। সে জাভিয়ানের বুক ঠেলে সরিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল, “জাভিয়ান, প্লিজ থামুন! খাটটা যেভাবে আওয়াজ করছে, পাশের ঘরে মা-বাবা সব শুনতে পাবে। ছিঃ! আমি লজ্জায় কাল ওনাদের সামনে যেতে পারব না।”

জাভিয়ান থামল না। সে এক হাত দিয়ে তান্বীর দুই হাত মাথার ওপর চেপে ধরল। তার ঠোঁটের কোণে এক দুষ্টুমিভরা হাসি। সে জানত তান্বী এই পরিস্থিতিতে কতটা অসহায় বোধ করছে। সে আরও একটু জোরালোভাবে তান্বীর দিকে ঝুঁকে আসতেই খাটটা আবার মড়মড় করে শব্দ করে উঠল।

“তোমার এই পুরনো খাট আমাদের রোমান্স সহ্য করতে পারছে না জিন্নীয়া,” জাভিয়ান তান্বীর কানে কামড় দিয়ে বলল। “কিন্তু তোমার হাজবেন্ডকে থামানোর ক্ষমতা এই ভাঙাচোরা খাটের নেই। লেট দেম হিয়ার। সবাই জানুক, তুমি কতটা আমার।”

তান্বী নিজের ওড়নাটা কামড়ে ধরল যাতে তার মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বেরিয়ে না আসে। কিন্তু খাটটা মনে হলো আজ বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। জাভিয়ান যত বেশি উম্মত্ত হচ্ছে, খাটের আওয়াজ ততই তাল মিলিয়ে বাড়ছে। তান্বীর মনে হচ্ছিল, এখনই হয়তো খাটটা ভেঙে তছনছ হয়ে যাবে।

হঠাৎ পাশের ঘর থেকে কারো কাশির শব্দ শোনা গেল। তান্বী ভয়ে কুঁকড়ে গেল। “জাভিয়ান, প্লিজ! মা হয়তো জেগে আছে।আপনি একটু শান্ত হন!”

জাভিয়ান এবার তান্বীর ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল যাতে তান্বীর সবটুকু আপত্তি ওর ভেতরেই মিলিয়ে যায়। খাটের সেই বিরামহীন ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ আর জাভিয়ানের তপ্ত নিঃশ্বাস মিলে রেহমান প্রিয়াঙ্গনের সেই ছোট ঘরে এক অদ্ভুত উন্মাদনার সৃষ্টি করল। জাভিয়ান আজ মেক্সিকোর কোনো বিজনেস ম্যান নয়, সে কেবল তার জিন্নীয়ার প্রতি এক অবাধ্য নেশায় মত্ত এক পুরুষ।

রাত তখন গভীর। জাভিয়ানের উম্মাদনা আর খাটের সেই ‘ মড়মড় শব্দ যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাল, তখনই এক বিকট শব্দে ঘরের নিস্তব্ধতা খানখান হয়ে গেল
পুরনো আমলের কাঠের খাটটা মাঝখান দিয়ে দুমড়ে ভেঙে একদম মেঝের সাথে মিশে গেল। জাভিয়ান আর তান্বী দুজনেই এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। ধুলো আর ভাঙা কাঠের মাঝে তারা তখনো একে অপরের সাথে জড়িয়ে আছে।

জাভিয়ান হতভম্ব হয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে নিজের রাগকে আর ধরে রাখতে পারল না। সে সজোরে বলে উঠল “হোয়াট দ্য ফাক! তান্বী,এটা খাট ছিল নাকি প্লাস্টিকের কিছু?”

তান্বী ততক্ষণে ভয়ে আর লজ্জায় নীল হয়ে গেছে। সে দ্রুত জাভিয়ানের কোল থেকে সরে গিয়ে নিজের পোশাক ঠিক করতে করতে অস্ফুট স্বরে বলল—
“হায় আল্লাহ! এটা কী হলো? কাল সকালে আমি বাবা-মায়ের সামনে কীভাবে মুখ দেখাব? ওনারা যদি জিজ্ঞেস করেন খাটটা কীভাবে ভাঙল, আমি কী উত্তর দেব? মেক্সিকোতে আপনার সেই আলিশান বিছানা পাওয়ার অভ্যাস, আর এখানে এসে এই গরিবের বাড়িতে সব তছনছ করে দিলেন!”

জাভিয়ান বিছানার বাকি অংশ থেকে কোনোমতে উঠে দাঁড়িয়ে বিরক্তি নিয়ে নিজের গায়ের ধুলো ঝাড়ল। তারপর বিছানার ভগ্নাবশেষের দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল “রিলাক্স জিন্নীয়া। কাল সকালেই আমি মেক্সিকো থেকে বা ঢাকার কোনো শোরুম থেকে সবচেয়ে দামী খাট আনিয়ে সেট করে দেব। ওটা আর ভাঙবে না, গ্যারান্টি দিচ্ছি।”

তান্বী প্রায় কেঁদে ফেলার মতো অবস্থায় গিয়ে বলল—
“কিন্তু এখন কী করব? রাত তো অনেক বাকি। আর বাবা, মা যদি আওয়াজ শুনে বুঝে যায় যে কী হয়েছে, তখন? আমার তো লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে!”

জাভিয়ান এবার এক পা এগিয়ে এসে তান্বীর কোমর জড়িয়ে ধরল। তার ঠোঁটে সেই চিরচেনা আধিপত্যের হাসি। সে তান্বীর কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে খুব নিচু গলায় বলল “বুঝলে বুঝুক। মেয়ের বিয়ে হয়েছে, জামাই বাড়িতে এসেছে আর এসব কি স্বাভাবিক না? বাবা-মা কি জানে না তাদের মেয়ে এখন কার অধীনে আছে? ভয় পেয়ো না, কাল সকালে আমি নিজেই সামলে নেব। এখন চলো, ফ্লোরের এই তোশকেই বাকি রাতটা পার করি।”

তান্বী আর কিছু বলতে পারল না। জাভিয়ানের এই বেপরোয়া মনোভাব তাকে একদিকে যেমন বিব্রত করছিল, অন্যদিকে তাকে এক অদ্ভুত স্বস্তিও দিচ্ছিল। ভাঙা খাটের সেই ধ্বংসস্তূপের মাঝেই জাভিয়ান আবার তান্বীকে নিজের বাহুডোরে নিয়ে নিল।

ভোর হতেই ‘রেহমান প্রিয়াঙ্গন’-এর রান্নাঘর থেকে মশলা আর চায়ের সুঘ্রাণ ভেসে আসতে শুরু করল। তান্বী সারারাত প্রায় চোখ বন্ধ করতে পারেনি। একে তো লজ্জায় তার মাথা কাটা যাচ্ছে, তার ওপর ভাঙা খাটের ওপর তোশক পেতে জাভিয়ানের বাহুবন্দি হয়ে থাকা—সব মিলিয়ে এক চরম অস্বস্তিতে রাত কেটেছে।
জাভিয়ান অবশ্য একদম নির্বিকার। সে তখনো তান্বীকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।

“তান্বী… ও তান্বী! মা ওঠ, বেলা তো অনেক হলো। জামাইকে নিয়ে নাস্তা করতে আয়।” মায়ের কণ্ঠ শুনে তান্বীর কলিজা শুকিয়ে গেল।

তান্বী ধড়ফড় করে উঠতে চাইল, কিন্তু জাভিয়ান তাকে আরও জোরে চেপে ধরল। তান্বী ফিসফিস করে বলল, “জাভিয়ান, প্লিজ ছাড়ুন! মা ডাকছে। এখনই ঘরে ঢুকে পড়বে!”

জাভিয়ান চোখ না খুলেই আলসে গলায় বলল, “আসতে দাও।”

“আপনি পাগল হয়েছেন? খাটটা দেখছেন না?” তান্বী কোনোমতে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দরজাটা একটু ফাঁক করল। কিন্তু তার মা ততক্ষণে ট্রলি হাতে দরজার সামনে তৈরি।

“এই নে মা, গরম গরম পরোটা আর ভাজি। জামাইকে এখানেই দে, ডাইনিংয়ে যাওয়ার দরকার নেই—” বলতে বলতেই তিনি ঘরে ঢুকে পড়লেন। আর ঢুকেই তার চোখ প্রায় ছানাবড়া।

মাঝখানে খাটটা একদম দুই ভাগ হয়ে মেঝের সাথে লেপ্টে আছে। চারদিকে কাঠের টুকরো ছড়ানো। জাভিয়ান তখনো মেঝের ওপর তোশকে শুয়ে এক হাত মাথায় দিয়ে খুব রাজকীয় ভঙ্গিতে তান্বীর মায়ের দিকে তাকাল।

তান্বীর মা থতমত খেয়ে বললেন, “ওমা! একি কাণ্ড! খাটটা এভাবে ভাঙল কীভাবে? এটা তো সেগুন কাঠের মজবুত খাট ছিল!”

তান্বী লজ্জায় মুখ নিচু করে মেঝের দিকে তাকিয়ে রইল। তার ইচ্ছে করছিল ওই খাটের ভাঙা অংশের নিচেই ঢুকে যেতে। সে আমতা আমতা করে বলল, “মা… আসলে কাল রাতে… মানে…”

জাভিয়ান খুব শান্তভাবে উঠে বসল। তার মুখে কোনো লজ্জার বালাই নেই, বরং এক ধরণের বিজয়ী হাসি। সে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, “মা, আসলে দোষটা খাটের নয়, মেক্সিকোর ডায়েটের। আমি একটু ভারী মানুষ তো, তাই হয়তো আপনার এই পুরনো খাট আমার ভার সহ্য করতে পারেনি। ডোন্ট ওয়ারি,দুপুরের মধ্যে নতুন খাট চলে আসবে।”

তান্বীর মা একটু অপ্রস্তুত হয়ে হাসলেন। তিনি বুঝতে পারলেন আসল ঘটনা কী, তবে সেটা চেপে গিয়ে বললেন, “আরে না না বাবা, ওসব লাগবে না। এটা পুরনো হয়েছিল তো, তাই হয়তো… যাই হোক, তোমরা আগে নাস্তাটা করে নাও। মেঝের ওপর বসে কষ্ট কোরো না।”

মা ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই তান্বী সজোরে জাভিয়ানের বুকে একটা কিল মারল। “খুশি তো এখন? সারা জীবন আমার এই লজ্জা মনে থাকবে!”

জাভিয়ান তান্বীর হাতটা ধরে টেনে নিজের কাছে নিয়ে এল। “লজ্জা কিসের জিন্নীয়া? তোমার মার তো খুশি হওয়া উচিত যে তার জামাই কতটা ইয়াং আর এনার্জেটিক!”
.
.
.
লুসিয়ার ঘুম ভাঙল কানে তালা লাগানো এক চিল্কার আর হইহুল্লোড়ে।সে জানলা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখল পাশের ছোট মাঠটায় একদল ছেলে ধুলো উড়িয়ে ফুটবল খেলছে। মেক্সিকোর নিস্তব্ধ ভোরের বদলে ঢাকার এই শোরগোল আর তপ্ত রোদ তার কাছে অসহ্য মনে হলেও, কেমন এক অদ্ভুত প্রাণচাঞ্চল্য আছে এতে।
সে ফ্রেশ হয়ে ড্রয়িংরুমে আসতেই দেখল জাভিয়ান, তান্বী আর তার বাবা-মা আয়েশ করে নাস্তা করছেন। জাভিয়ানকে দেখে মনেই হচ্ছে না সে কাল রাতে মেঝের ওপর তোশকে শুয়েছিল; সে একদম ফিটফাট হয়ে বসে পরোটা ছিঁড়ছে।

লুসিয়াকে দেখে তান্বীর মা এক গাল হেসে বললেন, “এসো মা, বসো। তোমাকে ডাকতে গিয়েছিলাম, কিন্তু তোমার ভাই বলল তুমি নাকি অনেক দেরিতে ঘুম থেকে ওঠো, তাই আর বিরক্ত করিনি। এই নাও গরম গরম পরোটা আর সবজি।”

লুসিয়া একটু ইতস্তত করে বসল। মেক্সিকোতে সে অভ্যস্ত প্যানকেক, সিরিয়াল বা ফ্রুট সালাদে। কিন্তু এখানে সামনে ধোঁয়া ওঠা পরোটা, ভাজি আর ডিম মামলেট। সে যখন প্রথম খাবারটা মুখে দিল, তার চোখ কপালে উঠল। “ওয়াও! এটা তো বেশ স্পাইসি আর টেস্টি!” জাভিয়ান আড়চোখে বোনকে দেখে একটু হাসল।

খাওয়া শেষ হতেই তান্বীর মা একটা মাটির কাপে করে গরম দুধ চা নিয়ে এলেন। চায়ের সুঘ্রাণ নাকে আসতেই লুসিয়া থমকে গেল। তার হঠাৎ মনে পড়ে গেল মেক্সিকোর সেই এটা দিনের কথা, যখন ফারহান নিজের হাতে তাকে চা বানিয়ে দিয়েছিলো। ফারহানের বানানো চা ছিল লিকার চা, যা ছিলো এরকম তেতো।
কিন্তু এই দুধ চায়ে চুমুক দিয়ে লুসিয়া অবাক হলো। ঘন দুধ আর কড়া লিকারের এই মিশ্রণটা তার জিভে এক অন্যরকম আবেশ তৈরি করল। সে মনে মনে ভাবল— “ফারহান এই চা-ই কি পছন্দ করে? মেক্সিকোতে ও কি এই স্বাদটাই খুঁজত?”

লুসিয়া রুদ্ধশ্বাসে উত্তরের অপেক্ষায় রইল। তার মনে হচ্ছে ফারহান খুব কাছেই আছে, এই ঘিঞ্জি গলিগুলোর কোনো একটাতেই সে হয়তো লুকিয়ে আছে।

চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে তান্বী হঠাতই জাভিয়ানের দিকে তাকিয়ে খুব নরম গলায় বলল, “জাভিয়ান, আমি একবার ভার্সিটিতে যেতে চাই। অনেকদিন কারো সাথে কোনো যোগাযোগ নেই। আমার বেস্ট ফ্রেন্ড স্নেহার সাথে অন্তত একবার দেখা করা দরকার। ও হয়তো আমার জন্য খুব চিন্তা করছে।”

জাভিয়ান পরোটার শেষ টুকরোটা মুখে দিয়ে টিস্যু দিয়ে হাত মুছল। তার চোখে সেই চেনা আধিপত্যের ছায়া। সে চেয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতে খুব গম্ভীর গলায় বলল, “একা যাওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। আমিও যাব তোমার সাথে।”

তান্বী একটু দমে গেল। সে ভেবেছিল বন্ধুদের সাথে হয়তো একটু প্রাণ খুলে কথা বলবে, কিন্তু জাভিয়ান সাথে থাকা মানেই এক অদৃশ্য দেয়াল।

লুসিয়া এতক্ষণ চুপচাপ সব শুনছিল। ‘ভার্সিটি’ শব্দটা শুনতেই তার কান খাড়া হয়ে গেল। সে জানে ফারহানও তো এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছিল। হয়তো সেখানেই ওর কোনো হদিস পাওয়া যেতে পারে। লুসিয়া চট করে দাঁড়িয়ে পড়ে বলল, “জাভি ব্রো, আমিও যাব! এই বাড়িতে বসে বোর হয়ে যাচ্ছি। একটু বাইরের পরিবেশটা দেখা দরকার।”

লুসিয়া মুখে আড্ডার কথা বললেও তার মনের ভেতরে তখন অন্য পরিকল্পনা। সে ভাবছে, “ভার্সিটির ক্যাম্পাসেই তো ফারহানের বন্ধুদের পাওয়া যাবে। ওদের জিজ্ঞেস করলে নিশ্চয়ই জানা যাবে ফারহান কোথায় লুকিয়ে আছে। হয়তো আজই ফারহানের সাথে আমার দেখা হয়ে যাবে!”

জাভিয়ান লুসিয়ার দিকে একবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। সে তার বোনের মনের অস্থিরতা ঠিকই টের পাচ্ছে, কিন্তু মুখে কিছু বলল না।
.
.

গাড়ি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের চেনা চত্বরে এসে থামল, জাভিয়ান তার হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত শীতল গলায় তান্বীকে বলল—
“তোমার কাছে ঠিক আধা ঘণ্টা সময় আছে জিন্নীয়া। আধা ঘণ্টা মানে ঠিক ত্রিশ মিনিট। স্নেহার সাথে কথা শেষ করে তুমি ঠিক এই জায়গায় ফিরে আসবে। এক সেকেন্ড দেরি হলে আমি নিজেই ভেতরে গিয়ে তোমাকে টেনে নিয়ে আসব, মনে থাকে যেন।”

তান্বী মাথা নিচু করে গাড়ি থেকে নামল। তার বুক কাঁপছে। অনেকদিন পর নিজের ক্যাম্পাসে পা রাখলেও জাভিয়ানের দেওয়া এই ‘টাইম লিমিট’ তাকে কুঁকড়ে দিচ্ছে।

গাড়ি থেকে তান্বীর সাথে লুসিয়াও নেমে পড়ল। জাভিয়ান কাঁচ নামিয়ে লুসিয়াকে সতর্ক করল, “লুসিয়া, বেশি দূরে যাবি না। এই শহর তোর অচেনা।”
লুসিয়া মাথা নেড়ে সায় দিলেও তার মনে তখন অন্য নেশা। তান্বী যখন দ্রুতপায়ে স্নেহার খোঁজে ডিপার্টমেন্টের দিকে এগিয়ে গেল, লুসিয়া তখন উল্টো দিকে হাঁটতে শুরু করল। তার চোখ জোড়া ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতো ভিড়ের মধ্যে শুধু একটা পরিচিত অবয়ব খুঁজছে। সে কার্জন হলের লাল ইটের দেয়ালের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দেখল একদল ছাত্র আড্ডা দিচ্ছে। লুসিয়া মনে মনে ভাবল, “ফারহান তো এখানেই পড়াশোনা করত। ওর কোনো বন্ধু কি এখানে নেই?”
সে একটু ইতস্তত করে এক জায়গায় গিয়ে দাঁড়াল। মেক্সিকান সুন্দরী লুসিয়াকে এভাবে ক্যাম্পাসে ঘুরতে দেখে অনেকেই অবাক হয়ে তাকাচ্ছে। লুসিয়া সেসবের তোয়াক্কা না করে ফোন থেকে ফারহানের একটা ছবি বের করল। সে কয়েকজনের কাছে গিয়ে ভাঙা ভাঙা বাংলায় আর ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করার চেষ্টা করল— “আপনারা কি এই ছেলেকে চেনেন? ওর নাম ফারহান।”
ছাত্ররা ছবিটি দেখে একে অপরের দিকে তাকাতে লাগল। কেউ মাথা নাড়ল, কেউ চিনতে পারল না। কিন্তু লুসিয়া দমবার পাত্রী নয়। সে ক্যাম্পাসের প্রতিটি গাছের ছায়ায়, প্রতিটি বেঞ্চে ফারহানকে কল্পনা করতে লাগল।হঠাৎ লাইব্রেরির সামনে এক লম্বা চুলওয়ালা ছেলেকে সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে লুসিয়া প্রায় দৌড়ে সেই ছেলেটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
“এক্সকিউজ মি! আপনি কি ফারহানকে চেনেন? ফারহান কি এখানে এসেছে?” লুসিয়ার গলায় তখন এক তীব্র আকুতি।

ছেলেটা অবাক হয়ে লুসিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। লুসিয়ার বুকটা তখন ধকধক করছে।
.
.

অন্যদিকে ডিপার্টমেন্টের করিডোরে একটি গাছতলায় দাঁড়িয়ে স্নেহা আর তান্বী একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিল। চারপাশের চেনা পরিবেশ আর বেস্ট ফ্রেন্ডকে পাশে পেয়ে তান্বীর ভেতরের জমানো পাথরটা যেন ঔগলতে শুরু করল।

স্নেহা তান্বীকে ছাড়িয়ে নিয়ে দুহাতে ওর মুখ ধরে বলল, “তুই কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলি বল তো? কোনো খোঁজ নেই, ফোন বন্ধ! আমরা তো ভেবেছিলাম তুই বোধহয় আর ফিরবিই না!”

তান্বী লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে মেক্সিকোর সেই ভয়ংকর দিনগুলোর কথা সংক্ষেপে বলল। কীভাবে রির্কাদোর হাত থেকে জাভিয়ান তাকে উদ্ধার করল, কীভাবে জোর করে বিয়ে হলো—সব শুনে স্নেহা তো আকাশ থেকে পড়ল।

“বলিস কী! তুই সত্যি এখন মেক্সিকোতে থাকিস? ওই ড্রাগ লর্ড আর মাফিয়াদের দেশে? আর তোর হাজবেন্ড… সে নাকি কাল তোদের বাড়িতে বাজারের বন্যা বয়ে দিয়েছে? হাজার পদের মিষ্টি, শপিং ব্যাগ—পুরো এলাকা তো তোদের গল্পে মেতে আছে!” স্নেহার আরেক ফ্রেন্ড হাসতে হাসতে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।

স্নেহার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরও দুই-তিনজন বান্ধবী তখন ফিসফিস করছিল। স্নেহা হঠাৎ চোখ টিপে তান্বীকে খোঁচা দিয়ে বলল, “শোন তান্বী, তুই কি কোনো বুড়ো সুগার ড্যাডি (Sugar Daddy) টাইপ কাউকে বিয়ে করলি নাকি? মানে, অঢেল টাকা যার কিন্তু বয়স আশি? না হলে হুট করে কোনো মেক্সিকান ছেলে তোকে কেন বিয়ে করবে?”

স্নেহার কথা শুনে বান্ধবীদের মাঝে হাসির রোল পড়ে গেল। তান্বী এবার কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে সবাইকে ঝাড়ি মেরে উঠল।

“এই একদম চুপ! তোরা আমার হাজবেন্ডকে দেখিসনি বলে এসব বলছিস। ও যদি একবার তোদের সামনে এসে দাঁড়ায় না, তোদের সবার হার্টবিট বন্ধ হয়ে যাবে। ‘সুগার ড্যাডি’ তো দূরে থাক, সে মেক্সিকোর সবচেয়ে পাওয়ারফুল ম্যান। জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরী—সে একাধারে যেমন হ্যান্ডসাম, তেমনি হট আর রিচ! মানে যাকে বলে একের ভেতর সব। হি ইজ জাস্ট পারফেক্ট!”

তান্বী বলতে বলতে নিজের অজান্তেই একটু লজ্জা পেল। সে গলার স্বর কিছুটা নামিয়ে গর্বের সাথে বলল, “উফ! তোরা যদি ওকে দেখতি, তাহলে তোরা ওর ওপর নজর দিতি। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তোদের কাউকে আমার জাভিয়ানকে দেখাব না। ও শুধু আমার!”

বান্ধবীরা যখন তান্বীকে নিয়ে আরও মজা করছিল, ঠিক তখনই করিডোরের মোড়ে একটি লম্বা ছায়া এসে পড়ল। সবাই হঠাৎ চুপ হয়ে গেল। তারা দেখল, কালো স্যুট পরা, চোখে দামী সানগ্লাস আর হাতে সেই দামী ঘড়ি পরা এক দেবতুল্য যুবক ধীর পায়ে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। তার প্রতিটি পদক্ষেপে রাজকীয় আভিজাত্য চুঁইয়ে পড়ছে।

জাভিয়ান তার হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, “৩১ মিনিট হয়েছে জিন্নীয়া। এক মিনিট বেশি হয়ে গেছে।”

পুরো ফ্রেন্ড সার্কেলটা একদম স্ট্যাচু হয়ে গেল। স্নেহা তো হাঁ করে তাকিয়ে আছে। সে মনে মনে ভাবল, “তান্বী তো ঠিকই বলেছে, এ তো জ্যান্ত কোনো গ্রিক গড!”

স্নেহা আর ওর বান্ধবীরা তখন সত্যিই পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। জাভিয়ানের ওই ‘ডার্ক অ্যান্ড হ্যান্ডসাম’ লুক আর রাজকীয় উপস্থিতি তাদের চোখের পলক ফেলতে দিচ্ছে না। তান্বী যখন দেখল ওর বান্ধবীরা একদম হ হাঁ করে গিলছে ওর স্বামীকে, তখন ওর বুকের ভেতর এক পৈশাচিক অধিকারবোধ জেগে উঠল।

তান্বী দাঁতে দাঁত চিপে বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলল, “এই! তোরা কি আমার হাজবেন্ডকে কাঁচা গিলে খাবি? একদম ওভাবে তাকিয়ে থাকবি না বলে দিচ্ছি। তোদের এই বদনজরের জন্যই আমি দেখাতে চাইনি। যা এখান থেকে!”

এরপর তান্বী জাভিয়ানের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে রণচণ্ডী মূর্তি ধারণ করল। কোমরে হাত দিয়ে সে মুখ ঝামটা দিয়ে বলল “আপনাকে কে বলেছিল গাড়ি থেকে নেমে এখানে আসতে? একদম হিরো স্টাইলে হেঁটে এলেন, আর দেখলেন তো সব মেয়েরা কেমন হা করে আপনার দিকে তাকিয়ে আছে? খুব ভালো লাগছে আপনার, তাই না? সব মেয়েরা আপনাকে দেখছে, আপনার ওপর নজর দিচ্ছে এটাই তো ছেলেরা চায়! কি দরকার ছিল এখানে আসার? আমি তো বলেছিলাম আমি আসছি!”

তান্বীর এই নন-স্টপ বকবকানি আর হিংসেভরা ঝাড়ি শুনে জাভিয়ানের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। সে বুঝল তার জিন্নীয়া এখন প্রচণ্ড জেল্যাস। আশেপাশে কয়েক শ ছাত্রছাত্রী তখন অবাক হয়ে দেখছে এই দৃশ্য।

জাভিয়ান কোনো কথা বলল না। সে জানে এই মেয়েকে মুখে বলে থামানো যাবে না। সে হুট করেই এক ঝটকায় তান্বীকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল।

“উফ! জাভিয়ান! কি করছেন? ছাড়ুন! সবাই দেখছে তো!” তান্বী হাত-পা ছুড়ে প্রতিবাদ করার চেষ্টা করল, কিন্তু জাভিয়ানের লোহার মতো শক্ত হাতের বাঁধন থেকে নড়ার ক্ষমতা তার নেই।

জাভিয়ান গম্ভীর আর ভারী গলায় শুধু বলল, “তুমি বেশি কথা বলছ জিন্নীয়া। আর আমি আগেই বলেছি, এক সেকেন্ড দেরি হলেও আমি তোমাকে টেনে নিয়ে যাব। এখন চুপ করে থাকো।”

স্নেহা আর ওর বান্ধবীরা তো দূরে থাক, পুরো ক্যাম্পাসের মানুষ স্থবির হয়ে তাকিয়ে দেখল—এক রাজপুত্রের মতো দেখতে যুবক তার সুন্দরী স্ত্রীকে কোলে তুলে নিয়ে বীরদর্পে গাড়ির দিকে হেঁটে যাচ্ছে। কারো দিকে তার ভ্রূক্ষেপ নেই।

পিছনে স্নেহা বিড়বিড় করে বলল, “ভাই রে… এটাকে বলে হাজবেন্ড! তান্বী তো দেখি লটারি জিতেছে!”

জাভিয়ান যখন তান্বীকে নিয়ে গাড়ির কাছে পৌঁছাল, তখন দেখল লুসিয়া এখনো ফেরেনি। জাভিয়ান তান্বীকে গাড়ির পেছনের সিটে প্রায় ছুড়ে ফেলার মতো করে বসিয়ে দিল আর নিজে ওর ওপর ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলল “মেয়েরা আমার দিকে তাকালে তোমার এত জ্বলে কেন? তুমি কি জানো না, এই পুরো জাভিয়ানটাই তোমার?”
.
.
.
জাভিয়ান গাড়িতে বসে ফোনটা কানে নিয়ে লুসিয়াকে যখন জিজ্ঞেস করল সে কোথায়, লুসিয়ার কণ্ঠস্বর তখন বেশ দৃঢ় শোনাল। ওপাশ থেকে লুসিয়া সরাসরি বলে দিল, “জাভি ব্রো, তোমরা চলে যাও। আমি ফারহানের ব্যাপারে একটা জরুরি ক্লু পেয়েছি, ওটা ফলো করে আমি পরে একাই ফিরব। তোমরা চিন্তা করো না।”

জাভিয়ান জানে লুসিয়া একবার জেদ ধরলে তাকে ফেরানো দায়। তাই সে আর কথা না বাড়িয়ে ফোনটা রেখে দিল। তার মাথায় তখন অন্য চিন্তা—কাল রাতের সেই লণ্ডভণ্ড কাণ্ড। তান্বীর বাবার বাড়িতে যে খাটটা তারা ভেঙেছে, সেটার একটা বিহিত করা দরকার।

গাড়ি ঘুরিয়ে জাভিয়ান ঢাকার সবচেয়ে দামী এক ফার্নিচার শোরুমের সামনে এসে থামল। তান্বী অবাক হয়ে দেখছিল শোরুমের বিশাল কাঁচের দেয়াল। জাভিয়ান তার হাত ধরে হড়হড় করে ভেতরে ঢুকে পড়ল।

শোরুমে ঢোকা মাত্রই সেলস ম্যানেজার দৌড়ে এল জাভিয়ানকে দেখে। জাভিয়ান কোনো ভূমিকা না করে সোজা বেডরুম সেকশনে গিয়ে দাঁড়াল। তান্বী তখনো কিছুটা লজ্জিত, কারণ খাট কেনার উদ্দেশ্য সে খুব ভালো করেই জানে।

জাভিয়ান একটা রাজকীয় নকশা করা সেগুন কাঠের খাটের ওপর হাত রেখে সেলস ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করল, “এটা কি মজবুত? মানে এটা কি সহজে ভাঙবে না?”

তান্বী পাশে দাঁড়িয়ে জাভিয়ানের পায়ে একটা চিমটি কাটল। সে ফিসফিস করে বলল, “জাভিয়ান! কী জিজ্ঞেস করছেন এসব? লোকটা কী ভাববে!”

জাভিয়ান ভ্রু কুঁচকে তান্বীর দিকে তাকিয়ে ম্যানেজারের দিকে ফিরে বলল, “আমি এমন কিছু চাই যেটা হবে অবিনশ্বর.. উমম… আমাদের মুভমেন্ট সহ্য করতে পারবে তো?”

ম্যানেজার কাঁচুমাচু হয়ে হাসল। “স্যার, এটা আমাদের সবচেয়ে হেভি ডিউটি খাট। মেক্সিকান ওক আর বার্মিজ টিক দিয়ে বানানো। এটার ওপর হাতি উঠলেও কিচ্ছু হবে না!”

জাভিয়ান পকেট থেকে ব্ল্যাক কার্ড বের করে টেবিলের ওপর রাখল। “ফাইন। এটা এখনই প্যাক করুন। এক ঘণ্টার মধ্যে আমার দেওয়া অ্যাড্রেসে পৌঁছে যেতে হবে। আর শোনুন সাথে দামী ম্যাট্রেসটাও যেনো থাকে।”

তান্বী অবাক হয়ে দেখছিল জাভিয়ানের কেনাকাটার স্টাইল। সে ভাবল, “বাবার বাড়ির ওই ছোট ঘরটায় কি এই বিশাল খাট আদৌ আটবে?

কিন্তু জাভিয়ান তখন খাটের ওপর বসে স্প্রিং চেক করছে, আজ রাতটা সে একদম বিফলে যেতে দিতে চায় না।
.
.
শোরুম থেকে বেরিয়ে গাড়ির দিকে যাওয়ার সময় তান্বীর নাকে এল সেই পরিচিত টক-ঝাল একটা সুবাস। রাস্তার এক কোণে বসেছে এক ফুচকাওয়ালা, আর তাকে ঘিরে একদল মানুষের ভিড়। ভার্সিটিতে বান্ধবীদের সাথে খাওয়ার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু জাভিয়ানের অ্যাকশন এর কারণে সেটা অপূর্ণ রয়ে গেছে।

তান্বী হঠাত দাঁড়িয়ে গিয়ে জাভিয়ানের হাত টেনে ধরল। “জাভিয়ান, আমি ফুচকা খাব। ওই যে দেখুন!”

জাভিয়ান ফুচকাওয়ালার ভ্যানের দিকে একবার তাকিয়ে নাক কুঁচকাল। তার চোখেমুখে চরম বিরক্তি। “ইম্পসিবল, জিন্নীয়া! এসব রাস্তার খাবার কতটা আনহাইজেনিক তুমি জানো? এই ধুলোবালি আর ওপেন সস এগুলো খেলে তোমার স্টমাক আপসেট হবে। চলো, কোনো ফাইভ স্টার রেস্টুরেন্টে গিয়ে লাঞ্চ করি।”

কিন্তু তান্বী আজ ছাড়ার পাত্রী নয়। সে জেদ ধরে দাঁড়িয়ে রইল। “ফাইভ স্টারের খাবারের চেয়ে এই ফুচকার স্বাদ অনেক বেশি। আর আমি একা খাব না, আপনাকেও আমার সাথে খেতে হবে!”

“হোয়াট? আমি রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে ফুচকা খাব?” জাভিয়ানের কণ্ঠে বিস্ময় আর আভিজাত্যের লড়াই। মেক্সিকোর বিজনেস ম্যান এই রাস্তার ফুচকা খাচ্ছে—এটা ভাবলেই ওর ইগোতে লাগছে।

তান্বী এবার মুখ ফুলিয়ে হাত ছেড়ে দিল। “ঠিক আছে, খাবেন না তো? তাহলে আমার সাথে কথাও বলবেন না। আমি এই চললাম!” তান্বী রাগ করে হনহনিয়ে হাঁটতে শুরু করল।

জাভিয়ান কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।এই মেয়েটার জেদের কাছে সে বরাবরই অসহায় পড়ে যাচ্ছে। সে দ্রুত গিয়ে তান্বীর হাত ধরল। “ওকে, ফাইন! কিন্তু শর্ত একটাই বেশি খাওয়া যাবে না।”

ফুচকাওয়ালার সামনে গিয়ে তান্বী চোখ বড় বড় করে বলল, “মামা, এক প্লেট স্পেশাল ফুচকা দিন। আর শোনেন, একদম কড়া করে বম্বে মরিচ দিবেন কিন্তু!”

জাভিয়ানের চোখ তো কপালে। “বম্বে মরিচ? তান্বী, আমি স্পাইসি খাবার একদমই সইতে পারি না, ইউ নো দ্যাট!”

তান্বী একগাল হেসে জাভিয়ানের দিকে তাকাল। “আজকে খেতেই হবে। মেক্সিকোর অত ঝাল সস যদি হজম করতে পারেন, তবে আমাদের এই বম্বে মরিচ কিছুই না। মামা, বেশি করে মরিচ দিন!”

ফুচকাওয়ালা যখন ডাবলি আর মশলা মাখানো ফুচকার ভেতর টক জল আর কুচি কুচি করা বম্বে মরিচ দিয়ে প্লেটটা এগিয়ে দিল, জাভিয়ানের কপালে তখন ঘাম জমতে শুরু করেছে। তান্বী একটা ফুচকা জাভিয়ানের মুখের সামনে ধরল। “নিন, হাঁ করুন!”

জাভিয়ান ভয়ে ভয়ে এক কামড় দিতেই মুহূর্তের মধ্যে তার কান দিয়ে ধোঁয়া বের হতে শুরু করল। বম্বে মরিচের সেই বিধ্বংসী ঝাল জাভিয়ানের সারা শরীরে কম্পন ধরিয়ে দিল। তার মুখ লাল হয়ে উঠল, চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে।
“ওয়াটার! তান্বী… গিভ মি ওয়াটার!” জাভিয়ান তখন হাঁপাচ্ছে।

তান্বী খিলখিল করে হেসে উঠল। “কেমন লাগল মিস্টার মেক্সিকান? বাংলার ঝাল সামলানো অত সহজ নয়!”

জাভিয়ান তখন ঝালে কুঁকড়ে যাচ্ছে, আর আশেপাশের মানুষ অবাক হয়ে দেখছে এক সুটেড-বুটেড বিদেশি চেহারার মানুষ ফুচকা খেয়ে প্রায় নাজেহাল।রোদের প্রখর আলো আর বম্বে মরিচের বিধ্বংসী ঝাল এই দুইয়ের আক্রমণে জাভিয়ানের অবস্থা তখন শোচনীয়। তার ধবধবে ফর্সা তক টকটকে লাল হয়ে উঠেছে, মনে হচ্ছে কেউ তার নাকে, গালে, কানে আর ঠোঁটে লাল রঙ মেখে দিয়েছে। রক্তাভ চোখ দুটো ভিজে একাকার, নাক দিয়েও পানি গড়িয়ে পড়ছে। সে টিস্যু দিয়ে বারবার মুখ মুছছে কিন্তু ঝালের সেই তীব্র দহন কিছুতেই কমছে না।

জাভিয়ান আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। সে হনহনিয়ে গিয়ে গাড়ির পেছনের সিটে ধপ করে বসল। এসির তাপমাত্রা একদম বাড়িয়ে দিয়ে ড্যাশবোর্ড থেকে পানির বোতল বের করে ঢকঢক করে প্রায় পুরোটা শেষ করে ফেলল। তার ঠোঁট দুটো ফুলে লাল হয়ে আছে, আর মুখ দিয়ে সে তখনো ‘হাঁসফাঁস’ করে বাতাস টানছে।

তান্বী ফুচকাওয়ালার বিল চুকিয়ে দ্রুত গাড়িতে এসে ঢুকল। জাভিয়ানের এই অবস্থা দেখে তার হাসি নিমেষেই মিলিয়ে গেল। সে বুঝতে পারল, মজা করতে গিয়ে সে আসলে একটু বেশিই করে ফেলেছে।
জাভিয়ানের মতো মানুষ, যে মেক্সিকোর এতোটা পাওয়ারফুল, সে এভাবে রাস্তার মাঝখানে নাজেহাল হবে এটা তান্বী ভাবেনি।

তান্বী খুব অপরাধবোধ নিয়ে জাভিয়ানের হাতটা ধরতে গেল। “জাভিয়ান… আমি আসলে বুঝতে পারিনি ঝালটা এতোটা বেশি হবে। সরি, আই অ্যাম রিয়েলি সরি।”

জাভিয়ান ঝট করে তার হাতটা সরিয়ে নিল। সে রাগে আর যন্ত্রণায় অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে রইল। তার কান দিয়ে তখনো আগুনের হল্কা বের হচ্ছে। সে একটা কথাও বলছে না, কেবল জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলছে।

তান্বী আবার একটু সাহস করে ওর কাঁধে হাত রাখল। “রাগ করবেন না প্লিজ। আমি তো শুধু আপনাকে আমাদের দেশি খাবারের স্বাদ দিতে চেয়েছিলাম। আপনি চাইলে আমি মিষ্টি কিছু কিনে আনছি?”

জাভিয়ান এবার ঘুরে তাকাল। তার লাল হয়ে যাওয়া চোখ দুটো দিয়ে আগুন ঝরছে। সে চাপা কিন্তু অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বলল—”স্বাদ দিতে চেয়েছিলে নাকি আমাকে মারতে চেয়েছিলে জিন্নীয়া? লুক অ্যাট মি! আমার মনে হচ্ছে আমার গলা আর পাকস্থলী জ্বলে ছাই হয়ে যাচ্ছে। তুমি জানো আমি এতো স্পাইসি খাবার সহ্য করতে পারি না, তাও তুমি ওই লোককে বললে বেশি করে মরিচ দিতে! জাস্ট ডোন্ট টক টু মি রাইট নাউ।”

জাভিয়ান আবার জানলার দিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। তার এই শান্ত কিন্তু কঠিন রাগ তান্বীকে ভীষণ ভয় পাইয়ে দিল। গাড়ির পেছনের সিটে তখন এসি চলছে পুরোদমে, কিন্তু ভেতরের পরিবেশটা থমথমে।

জাভিয়ানের লাল হয়ে থাকা মুখ আর গম্ভীর নীরবতা দেখে তান্বী দিশেহারা হয়ে যাচ্ছিল। সে জানে জাভিয়ানের এই ‘সাইলেন্ট ট্রিটমেন্ট’ কতটা ভয়ানক। সে অনেকক্ষণ ভাবল কী করা যায়, কীভাবে এই বরফ গলানো যায়।

হঠাৎ করেই তান্বীর মাথায় এক পাগলামি বুদ্ধি এল। সে কোনো কিছু না ভেবেই এক ঝটকায় জাভিয়ানের শার্টের কলারটা টেনে ধরল। জাভিয়ান কিছু বুঝে ওঠার আগেই তান্বী সরাসরি তার ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিল।
জাভিয়ান প্রথমে একদম পাথর হয়ে গেল। সে ভাবতেই পারেনি তার লাজুক জিন্নীয়া ভরা দুপুরে রাস্তার মাঝখানে গাড়ির ভেতরে এমন সাহসী কিছু করে বসবে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই জাভিয়ানের ভেতরের সেই দহন আর আভিজাত্যের দেয়াল ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। জাভিয়ান তার লম্বা আঙুল দিয়ে তান্বীর মাথাটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল।

চুম্বনটা মুহূর্তেই এক উন্মত্ত রূপ নিল। জাভিয়ান যেন তার ঠোঁটে লেগে থাকা সবটুকু ঝাল আর ভেতরের সমস্ত যন্ত্রণা তান্বীর মুখে উগরে দিতে চাইল। জাভিয়ানের এই ঝোড়ো পাল্টায় তান্বীর নিঃশ্বাস আটকে আসতে লাগল। তার মনে হচ্ছিল সে আগুনের এক সমুদ্রের মধ্যে পড়ে গেছে। বম্বে মরিচের সেই তেজ এখন তাদের দুজনের মাঝখানে আগুনের মতো খেলা করছে।

জাভিয়ানের সেই আগ্রাসী চুম্বনে তান্বীর নিজের মুখটাও জ্বলতে শুরু করল, কিন্তু সে সরছে না। জাভিয়ান আজ বুঝিয়ে দিচ্ছে, তাকে জ্বালানো মানে নিজেকেও জ্বালিয়ে দেওয়া। গাড়ির পেছনের জানলার কালো কাঁচের আড়ালে বাইরের পৃথিবী তখন নিঝুম, আর ভেতরে চলছে এক তীব্র দহনের খেলা।

অনেকক্ষণ পর যখন জাভিয়ান তাকে ছাড়ল, তান্বী তখন হাঁপাচ্ছে। দুজনেরই ঠোঁট এখন লাল হয়ে ফুলে উঠেছে। জাভিয়ান তান্বীর কপালের ওপর কপাল ঠেকিয়ে তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে খুব নিচু কিন্তু মাদকমাখা গলায় বলল “ঝালটা এখন কেমন লাগছে জিন্নীয়া? স্বাদটা শুধু আমি কেন একাই নেব, তুমিও একটু ভাগ করে নাও।”

তান্বী চোখ বড় বড় করে তাকাতেই জাভিয়ান আবার তার কানের কাছে ফিসফিস করল, “বম্বে মরিচের রিভেঞ্জটা কিন্তু কেবল শুরু হলো। বাকিটা রাতে রুমে উসুল করব।”

চলবে………

(অনেকদিন পর দিয়েছি তাই বড় করে দিলাম এখানে ৭ হাজার শব্দ আছে তাই আশা করি সবাই রেসপন্স করবেন আপনারা এখন রেসপন্স কমিয়ে দিয়েছেন)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply