শেষ পাতায় সূচনা [৪৩.২]
সাদিয়াসুলতানামনি
টনি বাইক চালাতে চালাতে পাশের মিররে কিছুক্ষণ পরপর চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে। চঞ্চল, উড়নচণ্ডী, চটপটে মেয়েরা হুট করে শান্ত হয়ে গেলে, বিষয়টা একটু বেশিই চোখে লাগে। জিনিয়ার সাথে টনির যেই কয়বারই দেখা হয়েছে, জিনিয়া প্রতিবারই ছিলো এক ঝড়ের ন্যায়। নিজের তেজে টনিকে পারে না উড়িয়ে নিয়ে যেতে। আজ জিনিয়া যেমন শান্ত হয়ে রয়েছে, তেমনই তার মুখটাও চুপসে রয়েছে। কিছু খেয়ে আসেনি নাকি মেয়েটা?
টনি বাইকটা একটা ক্যাফের সামনে থামায়। তারপর জিনিয়াকে বলে–
—ভেতরে গিয়ে বসুন আমি বাইক পার্ক করে আসছি। আর হ্যাঁ, ভাগবার চেষ্টা করলে আপনার সব কীর্তির কথা আপনার ভাই আর পূর্ণতা ম্যামকে বলে দিবো। তাই সাবধান।
জিনিয়া মুখটা আরেকটু মলিন করে নিয়ে ক্যাফের ভেতরে চলে যায়। টনি বাইক পার্ক করে এসে বসে জিনিয়ার সামনে। নিজে একটা মেন্যু কার্ড দেখতে দেখতে আরেকটা জিনিয়ার দিকে এগিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করে–
—কি খাবেন দেখুন।
জিনিয়ার মন তাকে নাকচ করতে দিতে চায় । বর্তমানে তার টেনশনে কেমন হাসঁফাসঁ লাগছে, খাওয়া গলা দিয়ে নামবে না। আবার তার প্রচণ্ড ক্ষুধাও পেয়েছে। কি করবে ভেবে না পেয়ে বসে বসে উসখুস করতে থাকে কিছু না বলেই। টনি বোধহয় তার ইতস্ততা বুঝতে পেরে যায়। তাই সে নিজেই একজন ওয়েটারকে ডেকে দুটো স্যান্ডউইচ আর দু’টো কফি অর্ডার দেয়। খাবার গুলো এসে পড়ে মিনিট দশেকের মাঝেই।
টনি দু’টো স্যান্ডউইচ আর এক কাপ কফি জিনিয়ার দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বলল—
—আগে খান, তারপর আপনাকে সাইজ করা হবে আমাকে হেনস্তা করার অপরাধে।
টনির কণ্ঠে ছিল নিছক রসিকতার সুর। কিন্তু জিনিয়া তখন এতটাই টেনশনে ছিল যে সে সেই হাস্যরস ধরতে পারল না। বরং কথাগুলো তার কানে একরকম হুমকির মতোই শোনাল। সে ভীত দৃষ্টিতে টনির দিকে তাকিয়ে রইল, যেন বুঝতে চাইছে লোকটা সত্যিই মজা করছে, নাকি অন্য কিছু ভাবছে।
টনি চাপা গলায় একটু ধমক দিতেই জিনিয়া আর দেরি করল না। ধীরে ধীরে স্যান্ডউইচ তুলে খেতে শুরু করল। পেটে তখন অসম্ভব ক্ষুধা, তাই খুব বেশিক্ষণ লাগল না খাবার শেষ করতে।
টনি নিজের কফিতে চুমুক দিতে দিতে নিরবে জিনিয়াকে লক্ষ্য করছিল। ছোট গোলগাল মুখশ্রীর এই মেয়েটিকে দেখতে তার মোটেই খারাপ লাগছে না। বরং অদ্ভুত এক শান্তি লাগছে।
মেয়েটির ভীরু দৃষ্টি, খাবার চিবোতে চিবোতে অল্প নড়ে ওঠা ঠোঁট, আর কোমল গাল দু’টির দিকে পলকহীন তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার মনে এক ধরনের অচেনা অনুভূতি জেগে উঠল।
জাওয়াদ আর জিনিয়ার মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। সেটা অবশ্য স্বভাবের চেয়ে বেশি চোখে পড়ে গড়নের দিকেই। জাওয়াদ কৃষ্ণবর্ণের অধিকারী এক লম্বাটে সুপুরুষ; উচ্চতায় টনির মতোই ছয় ফুটের বেশি।
অন্যদিকে জিনিয়া যেন ঠিক তার উল্টো। মাত্র পাঁচ ফুট দুই ইঞ্চি উচ্চতার ছোটখাটো গড়নের মেয়ে। তার ভেতরটা জুড়ে আছে কোমলতা আর মিষ্টতার এক আলাদা আবেশ। তবে অদ্ভুত ব্যাপার হলো–এই শান্ত, মিষ্টি, কোমল মেয়েটির সমস্ত চঞ্চলতা, কঠোরতা আর বাচালতা যেন কেবল টনির সামনেই বেরিয়ে আসে। কেন আসে, তার উত্তর জিনিয়া নিজেও জানে না।
জিনিয়ার খাওয়া শেষ হতেই ওয়েটার এসে প্লেটগুলো নিয়ে যায়। এবার টনি টানটান হয়ে বসে। মুখে গম্ভীর্যতা টেনে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিয়ে জিনিয়াকে সুধায়–
—আমার সাথে এতদিন এমন অজ্ঞাত পরিচয়ে কথা বলার কারণটা কি বলেন তো? এখন এটা বলবেন না, প্লিজ আমায় বিরক্ত করতে এসব করেছেন। আমায় বিরক্ত করাই যদি আপনার উদ্দেশ্য হতো, তাহলে আমার কাছ থেকে ১৭টা নাম্বারে ব্লক খাওয়া, এবং অসংখ্য বার অপমানিত হওয়ার পরও আমায় কল দিতেন না। তাই আশা করছি সত্যিটাই বলবেন।
খাওয়ার পর যেন জিনিয়া সেই পূর্বের ছটফটে, চঞ্চল, ঝগড়ুটে জিনিয়া হয়ে গিয়েছে। সে তার দুই হাত টেবিলের উপর শব্দ করে রেখে কর্কশ গলায় বলে–
—শুরুতেই বলতে চাই, এই আপনি-আজ্ঞা বাদ দিন। আমি আপনার চেয়ে মিনিমাম পাঁচ কি ছয় বছরের ছোট হবো। নিজেকে ছোট বুঝাতে আমাকে আপনি আপনি করবেন না খবরদার।
আর দ্বিতীয়ত, হ্যাঁ দিতাম ফোন। তো কি হয়েছে? কি শুনতে চান আপনি আমার থেকে? আপনি কি এটা এক্সপেক্ট করছেন, আমি আপনাকে পছন্দ করি? যদি এটাই এক্সপেক্ট করে থাকেন, তাহলে ঠিকই করেছেন। পছন্দ করি আপনাকে আমি, হয়ত ভালোও বাসি। আপনি একটা পুরুষ মানুষ, আমি একটা মেয়ে মানুষ। পুরুষ মানুষকে মেয়ে মানুষ পছন্দ করবে অথবা মেয়ে মানুষকে পুরুষ মানুষ পছন্দ করবে এটাই প্রকৃতির নিয়ম।
আমিও তাই করেছি। তো কি হয়েছে? এটার পরিবর্তে আমি যদি কোন মেয়েকে পছন্দ করতাম তাহলে আপনি আমার ভাই-ভাবীকে নালিশ দিতে পারতেন, এবং সেটা যৌক্তিকও হতো। কাল রাত থেকে হু”মকির উপর রেখেছেন। ভাইকে বলবেন? ওকে বলেন। আমি ভাবীপু পটিয়ে রাখবো আগের থেকেই। ভাবীপু ভাইয়ের দিকে একবার চোখ বাঁকা করে তাকালেই ভাইও আমার সাইডে এসে পড়বে। এখন বলেন, আপনার বক্তব্য কি এই বিষয়ে? আমার অবাস্তব বয়ফ্রেন্ড থেকে বাস্তব বয়ফ্রেন্ড হবেন? নাকি ব্যবস্থা নিতে হবে এই ব্যাপারে আমার?
টনি আহাম্মক বনে যায় জিনিয়ার কথা শুনে। এটা কি হুমকি ছিলো নাকি প্রপোজ ছিলো সে বুঝতে পারলে। সেই সাথে জিনিয়ার মারমুখী ভঙ্গিমা দেখে সে থতমত খেয়ে গিয়েছে। মেয়েটাকে ভেবেছিল আরেকটু জব্দ করবে, কিন্তু উল্টো সেই তার ধমক খেয়ে চুপসে গিয়েছে।
জিনিয়া তখনও তার দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করছে নিজের প্রশ্নের উত্তর শোনার। টনি কিছুটা সময় নিয়ে নিজেকে সামলিয়ে নেয়। তারপর জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে শান্ত গলায় বলতে শুরু করে–
—দেখো, তুমি যতটা সহজ ভাবছো সবকিছু ততটা সহজ নয়। আমার সাথে কথা বলে নিশ্চয়ই জানতে পেরেছো আমার ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে। আমার মতো একা, এতিম একটা ছেলে নিয়ে এসব তুমি ভাবতে পারলে কিভাবে, আমি সেটা ভেবেই অবাক হচ্ছি। তুমি ভালো ছেলে আর ভালো একটা পরিবার ডিজার্ভ করো। আমাকে নয়।
—আজব তো! আপনি পরিবারকে টানছেন কেন? হ্যাঁ, পরিবার জরুরি বিয়ের জন্য। কিন্তু তার চেয়ে বেশি জরুরি হলো বর। বিয়ে করলে আপনাকে করবো, আদর-সোহাগও আপনাকেই করবো, বাচ্চার মা হতে গেলে আমার আপনাকে লাগবে। এখানে পরিবারের অবদান কোথায়? আর এতিম ছেলেরা কি বিয়ে করে না? আজাইরা লজিক দেন আমাকে? আপনি আমার সাথে রিলেশনে যাবেন কিনা সেটা হবে? হ্যাঁ অথবা না তে উত্তর দিবেন।
টনি জিনিয়ার এমন বেলাজ কথা শুনে আরো একবার তব্দা খেয়ে যায়। এটা মেয়ে নাকি চলতি ফিরতি এ”ট”ম বো”ম। টনি ভাবে জিনিয়ার থেকে কিছুটা সময় চেয়ে নিবে এই প্রশ্নটার উত্তর দেওয়ার জন্য। সে কনফিউজড ফিল করছে। তার মন দোদুল্যমান জীবনের এই পর্যায়ে এসে। নিঃসঙ্গতা তারও ভালো লাগে না। সেও চায় তার নিজের বলতে এমন একজন মানুষ হোক, যার টানে সে নিজের ক্লান্ত দেহ-মনকে বাসায় নিয়ে আসবে। আজকাল বাসায় আসতে তার একটুও ভালো লাগে না। এসে কি হবে? সেই তো আবার নিঃসঙ্গতা আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরবে তাকে।
—আমার কিছুটা সময় চাই এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য। আর আমার মনে হয়, তোমারও আরেকবার ভাবা উচিত। পরবর্তীতে যাতে রিগ্রেট না করো এর জন্য।
—আমার দিক দিয়ে আমি ক্লিয়ার। যেই মেয়ে পরীক্ষায় একটা এমসিকিউ দাগাতে গিয়ে তিনবার ভাবে, সে তার লাইফের এত বড় একটা সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে কতবার ভেবেছে বলে আপনার মনে হয়। প্রতিবারই মন আমাকে বলেছে, এই লম্বুই পারবে তোর জ্বালাতন সহ্য করতে।
সময় চেয়েছেন দিলাম সময়। আজ রাত বারোটার মধ্যে উত্তর চাই, তাও পজিটিভ। নাহলে কাল কি হবে আপনি শুধু দেখবেন।
আর শুনেন, আমরা বিয়েটা আমার ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষার পরপরই করে ফেলবো। পরীক্ষার মাঝে এত বিয়ের প্যারা নিতে পারবো না, রেজাল্ট খারাপ হবে তাহলে। ততদিনে আমরা দু’জন চেষ্টা করবো ভাইয়া আর ভাবীকে কাছাকাছি আনার। তাদের আবার প্যাচ-আপ করিয়ে দেওয়ার। কারণ আমি বিয়ে করে আপনার সাথে চলে গেলে, আম্মু-আব্বু একা হয়ে যাবে। ভাবীপু আর তাজওয়াদ ফিরে আসলে তাদের আর একা লাগবে না।
জিনিয়া একা একাই সব বলে দিচ্ছে আর সিদ্ধান্ত নিয়ে নিচ্ছে। টনি বোকার মতো হা হয়ে তার কথা শুনছে। কথা হচ্ছিল রিলেশনে যাওয়ার, সেখান থেকে লাফ দিয়ে একদম বিয়েতে চলে গিয়েছে এই মেয়ে। কথাবার্তা শেষ করে টনি বিল পে করে উঠে দাঁড়ায়। তার সাথে সাথে জিনিয়াও টেবিল ছেড়ে দাঁড়িয়ে আগে আগে হাঁটতে থাকে। টনি খেয়াল করে দেখে, জিনিয়া তার ভ্যানিটি ব্যাগটা টেবিলের উপর রেখেই চলে যাচ্ছে। টনি জিনিয়ার পেছন ডেকে বলে ওঠে–
—জিনিয়া, তোমার ব্যাগ ফেলে যাচ্ছো।
জিনিয়া তার ডাক শুনে পেছনে ফিরে বলে–
—আমি ভবিষ্যতে আপনার বাচ্চাদের দশমাস দশদিন আমার পেটে বহন করতে পারবো, আর আপনি সামান্য আমার ব্যাগটা নিতে পারছেন না? এই আপনি আমাকে ভালোবাসেন?
জিনিয়ার কথা শুনে টনির চোয়াল একহাত পরিমাণ ঝুলে যায়। এতক্ষণ তো যাও বিয়ে পর্যন্ত ছিল, এখন আবার বাচ্চায় চলে গিয়েছে। এই মেয়ে আজ টনিকে ক্ষণে ক্ষণে অবাক করে তুলছে নিজের কথা ও আচরণ দ্বারা। টনি আর কথা বাড়ায় না। কেন জানি তার কথা বাড়াতে ইচ্ছে করে না।সে চুপচাপ জিনিয়ার ব্যাগটা হাতে তুলে নিয়ে ক্যাফে থেকে বের হয়ে আসে। বাইকের কাছে এসে ব্যাগটা জিনিয়ার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে–
—আমি কি একবারও তোমায় বলেছি, আমি তোমাকে ভালোবাসি?
—ভালোবাসেন না সেটাও তো বলেন নি। আর কতক্ষণ ধরে আমার আজগুবি কথা সহ্য করে আসছেন। যদি আমার জন্য আপনার মনে কিছু নাই থাকত, তাহলে কখন আমায় একটা দাবাং চড় লাগিয়ে চুপ করিয়ে দিতেন। কিন্তু তাও করেন নি। এন্ড লাস্ট ওয়ান, আপনার চোখ আমায় অনেক কিছুই বলে দিচ্ছে মি.সান্ডাপান্ডা। তাই এখন আর কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ, বাইকে উঠে বাইক স্টার্ট দেন। তাজওয়াদের কাছে নিয়ে চলুন। বাচ্চাটা কাল আমায় দেখতে চাইলো, ইশশশশশ আমি যে কেন গেলাম না কাল?
শেষের কথাটা বেশ দুঃখী দুঃখী মন নিয়েই বলে জিনিয়া। টনি আর কথা না বাড়িয়ে বাইকে উঠে বাইক স্টার্ট দেয়। বেখেয়ালি জিনিয়া লক্ষ্যই করলো না, তার প্রণয় পুরুষের মুখে কি স্নিগ্ধ হাসি ফুটিয়ে তুলেছে সে।
টনি আর জিনিয়া হসপিটালে এসে দেখে জাওয়াদ অলরেডি চলে এসেছে হসপিটালে। বর্তমানে ছেলের সাথে খেলছে। পূর্ণতা কেবিনে থাকা সোফায় বসে বসে ল্যাপটপে কাজ করছে আর একটু পরপর জাওয়াদের দিকে বিরক্তিকর দৃষ্টি নিক্ষেপ করছে।
কেবিনের দরজা খোলার আওয়াজে জাওয়াদ, পূর্ণতা আর তাজওয়াদ তিনজনই সেদিকে তাকায়। টনি আর জিনিয়াকে প্রায়শই একসাথে দেখা যায় বলে সকলের মনেই সন্দেহ বীজ জন্ম নিতে শুরু করেছে। জাওয়াদ তীক্ষ্ণ চোখে বোনের দিকে তাকায় তো, পূর্ণতা টনির দিকে তাকায় চোখ ছোট ছোট করে। তাদের দু’জনকে নিজেদের দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে টনি আর জিনিয়া উভয়েই থতমত খেয়ে কিছুটা দূরত্ব নিয়ে দাঁড়ায়।
নিরবতার চাদর ছিন্ন করে প্রথমে পূর্ণতাই। সে টনিকে প্রশ্ন করে–
—এতক্ষণ কোথায় ছিলে টনি? আজ সকাল থেকে তোমার দেখা নেই যে।
টনি পূর্ণতার প্রশ্ন শুনে মনে মনেই কিছুটা ঘাবড়ে যায়। তার অবচেতন মন এখনই পূর্ণতাকে জিনিয়ার বিষয়টা বলতে চাইছে না। সে আমতা আমতা করে বলল–
—আসলে ম্যাম, একটা জরুরী কাজ এসে পড়েছিল। তাই দেরি হয়ে গেলো আসতে আজ।
পূর্ণতার মুখভঙ্গি দেখে মনে হলো না সে টনির কথা বিশ্বাস করেছে। পূর্ণতা গম্ভীর মুখ নিয়ে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে টনি দরদর করে ঘামতে থাকে।
তখনই জাওয়াদ জিনিয়াকে জিজ্ঞেস করে–
—তুই যে হসপিটালে আসবি বললি না তো সকালে।
—আসলে ভাইয়া, সকালে একটা ইম্পর্টেন্ট এক্সাম ছিলো, তাই তাড়াহুড়ো করে ভার্সিটিতে চলে গিয়েছিলাম। আর কাল নাকি তাজ আমার সাথে দেখা করতে চেয়েছিল তাই চলে আসলাম।
—তাজ দেখা করতে চেয়েছে এটা তোকে কে বললো? তাজওয়াদ তুমি পিপির সাথে দেখা করার কথা বলেছিলে?
জাওয়াদ তাজওয়াদকে প্রশ্ন করে। তাজওয়াদ তার মাথা ডানে-বামে নাড়িয়ে না-বোধক জবাব দেয়। এবার জাওয়াদ ও পূর্ণতা উভয়েই সন্দেহের দৃষ্টি রাখে জিনিয়ার উপর। তাদের এহেন দৃষ্টির মানে হলো, তাজওয়াদ তো দেখা করতে চায়নি তাহলে তুই এই খবর কোথা থেকে পেলি?
অন্যদিকে জিনিয়া তাজওয়াদের এহেন জবাব পেয়ে ঘাবড়ে যায়। সেই সাথে বুঝে যায়, টনি তাকে ধরতেই মিথ্যে কথা বলেছে। সে মনে মনে টনির পিন্ডি চটকাতে থাকে, আর উপরওয়ালার কাছে দোয়া করতে থাকে কেউ যাতে তাকে এই পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করে।
জিনিয়া ও টনিকে এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি থেকে বাঁচাতেই বোধহয় সেখানে আরিয়ানের আগমন ঘটে। আরিয়ান আসায় পূর্ণতার ভাবনা তাদের উপর থেকে সরে যায়। জাওয়াদও তার সাথে টুকটাক কথা বলতে থাকে আর পুনরায় ছেলের সাথে খেলতে থাকে। টনি পূর্ণতার সাথে কয়েকটা কথা বলে অফিসের যাওয়ার কথা বলে সেখান থেকে কেটে পড়ে। বাকি সময়টা জিনিয়া স্বাভাবিক থাকার ভান করতে থাকে। কিন্তু এই নতুন প্রেমিকযুগল ভাবতেও পারেনি যে, তাদের ইটিশপিটিশ ধরা পড়ে গিয়েছে দু’জন প্রেম বিশেষজ্ঞের চোখে।
কেটে গিয়েছে আরো দুটো দিন। আজ পূর্ণতাদের হসপিটাল থেকে বাড়ি ফেরার দিন। সেই সাতসকালেই জাওয়াদ এসে বসে আছে ছেলের কাছে। আজকের পর থেকে আবারও তাদের বাপ-ছেলের দেখা-সাক্ষাৎ কমে যাবে। তাজওয়াদ হসপিটালে থাকতে জাওয়াদ যখন-তখন এসে ছেলের সাথে দেখা করতে পারত। খেলতে পারত। ছেলের ছোট ছোট আবদার পূরণ করতে পারত। সেই সাথে অভিমানী প্রিয়তমাকে লুকিয়ে-চুরিয়ে মন ভরে দেখতে পারত। কিন্তু আজ ওরা বাসায় চলে গেলে তাদের এমন দেখা-সাক্ষাৎ আবার কবে হয় কে জানে।
তাজওয়াদের মনটাও আজ অজানা কারণে খারাপ হয়ে আছে ভালো আঙ্কেলকে ছেড়ে যাওয়ার জন্য। সে রেডি হয়ে বেডে পা ঝুলিয়ে বসে একহাত দিয়ে জাওয়াদের হাত পেঁচিয়ে বসে আছে। একটু পরপর কেমন অসহায় চাহনি নিয়ে জাওয়াদকে দেখছে। পূর্ণতার সবকিছু গোছগাছ হয়ে যেতেই সে তাজওয়াদের কাছে এসে দুইহাত মেলে দিয়ে বলে–
—আসো সোনা। বাসায় যাওয়ার সময় হয়ে গিয়েছে আমাদের।
তাজওয়াদ পূর্ণতার দিকে তাকিয়ে মলিন গলায় বলে–
—মাম্মা, তাজওয়াদেল মনতা স্যাড স্যাড, ভালো আন্তেলকে আমাদেল চাতে নিয়ে যাই বাচায়? সেও আমাদেল সাতে তাকুক।
তাজওয়াদের প্রশ্ন শুনে জাওয়াদ ও পূর্ণতা দু’জনই হকচকিয়ে যায়। সেই সাথে সীমাহীন বিস্ময় তো রয়েছেই। লাস্ট কয়েকদিনে জাওয়াদ পূর্ণতা ও তাজওয়াদের সাথে একদম ছায়া মতো লেগেছিল। আমরা বড়রাই মাঝে মধ্যে একটু আদর, যত্ন, এক্সট্রা এটেনশন পেলে সেই ব্যক্তিটির প্রতি ঝুঁকে পড়ি। সেখানে তাজওয়াদ তো ছোট একটা বাচ্চা। তাও আবার জাওয়াদের সাথে তার রক্তের সম্পর্ক। এর টান কি সহজে ভঙ্গ হয়?
তাজওয়াদের প্রশ্ন শুনে জাওয়াদও পূর্ণতার দিকে মলিন মুখ করে তাকিয়ে আছে। তাদের বাপ-ছেলের এমন দুঃখী দুঃখী মুখশ্রী দেখে পূর্ণতার নিজেকে মস্ত এক পাষাণী মনে হলো।
নীরবতা ভঙ্গ করে পূর্ণতা ছেলেকে বলে–
—আচ্ছা বলো তো তাজ, তুমি কি আমায় ছাড়া থাকতে পারবে? বা মাম্মা কি তোমায় ছাড়া থাকতে পারবো?
তাজওয়াদ মাথা ডানে-বামে নাড়িয়ে বলে–
—না। তাজ একতুও থাকতে পালবে না মাম্মাকে ছালা।
—তাহলে তোমার ভালো আঙ্কেল কিভাবে থাকবে তার মা ছাড়া? তার মাও তো নিশ্চয়ই ততটাই ভালোবাসে নিজের ছেলেকে, যতটা তাজের মা তার ছেলেকে ভালোবাসে। হয়ত তাজের মায়ের থেকেও বেশি ভালোবাসে তোমার ভালো আঙ্কেলের মা তাকে। তার মা কি পারমিশন দিবে তার ছেলেকে আমাদের সাথে যাওয়ার? দিবে না তো পারমিশন, সোনাবাচ্চা।
এর মাঝে জাওয়াদ ফট করে বলে ওঠে–
—দিবে, পারমিশন দিবে তোমাদের সাথে যাওয়ার।
পূর্ণতা তার কথা শুনে কড়া চাহনি নিয়ে তাকালে জাওয়াদের সব হাওয়া ফুস হয়ে যায়। পূর্ণতা ছেলেকে অনেক ভুজুংভাজুং বুঝিয়ে নিয়ে যায় নিজের সাথে। জাওয়াদ তাদেরকে গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দেয়। এতক্ষণ সময় তাজওয়াদ তার কোলেই ছিলো। তাজওয়াদ গাড়িতে বসার আগে জাওয়াদ মন ভরে নিজের সন্তানকে আদর করে। পূর্ণতা খেয়াল করে দেখে জাওয়াদের চোখ অশ্রুতে টইটম্বুর হয়ে গিয়েছে ছেলেকে বিদায় দিতে গিয়ে। বিষয়টা সে দেখেও না দেখার ভান করে থাকে।
জাওয়াদ তাজওয়াদকে গাড়িতে বসিয়ে দিয়ে সরে আসে। তারপর পূর্ণতা গাড়িতে উঠতে নিলে জাওয়াদ তার হাত ধরে ফেলে। হাতে টান লাগায় পূর্ণতা পেছন ফিরে তাকালে জাওয়াদ ধরে আসা গলায় বলে–
—নিজের কারণে আমার সুখদের আমি হারিয়ে ফেলেছি। জানি না, কবে তুমি আমায় মাফ করে আবার আপন করে নিবে। কবেই বা, আমরা সবাই একসাথে থাকতে পারব হ্যাপি ফ্যামিলি। আদৌও এই সুখ আমার কপালে আছে কিনা জানি না। কিন্তু একটা অনুরোধ রইবে, ফোন দিলে অন্তত ধরো। নিজে না বলো, ছেলেটার সাথে দু’টো কথা বলতে দিও। এই অপরাধবোধ আমার অস্তিত্বকে একটু একটু করে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। খুব বেশি হয়ত দেরি নেই, যেদিন পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে যাবো। ভালো থেকো। নিজেদের খেয়াল রেখো আমার সুখেরা।
কথা শেষ করে জাওয়াদ ডানে-বামে না তাকিয়েই পূর্ণতার অনেকটা কাছে এসে তার কপালে ছোট একটা স্পর্শ দেয় নিজের ওষ্ঠের। স্পর্শটা একদমই ছোট ছিল, কিন্তু এর কোমলতা, পবিত্রতা, ভালোবাসা পূর্ণতা পুরো কায়ায় ছড়িয়ে যায় বিদ্যুৎ বেগে।
জাওয়াদ পূর্ণতার থেকে সরে এসে হনহনিয়ে সেখান থেকে চলে যায় অন্যদিকে। যেতে যেতে শার্টের হাতা দিয়ে নিজের চোখের পানি মুছতে দেখে। পূর্ণতা নির্নিমেষ তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে।
[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্প প্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন ]
শব্দসংখ্যা~২৩৪৬
চলবে?
[ছোট বলে অভিযোগ করলে ম্রে বালি চাপা দিয়ে দিবো😒🔪 আর হ্যাঁ, সব্বাই ছোট করে হলেও একটা কমেন্ট করবেন কিন্তু 🥹
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]
Share On:
TAGS: শেষ পাতায় সূচনা, সাদিয়া সুলতানা মনি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৯
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩৬
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩৩
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৭
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪২.৩
-
শেষ পাতায় সূচনা গল্পের লিংক
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪১.১