#শেষ_পাতায়_সূচনা [৫৩.১]
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
“পুরুষের কান্না” এ যেন অমাবস্যায় আকাশে চাঁদ খোঁজার মতোই বিরল এক দৃশ্য। আমাদের সমাজ ছেলেদের বুঝ হওয়ার আগেই তাদের কাঁধে একটা অদৃশ্য ভার চাপিয়ে দেয়। ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয়, “তুমি পুরুষ।
পুরুষ মানুষ কাঁদে না।”
তাই ধীরে ধীরে তারা শিখে যায় অনুভূতি লুকাতে, বুকভরা যন্ত্রণা চেপে রাখতে, নিঃশব্দে ভেঙে পড়েও মুখে হাসি ধরে রাখতে। সমাজ পুরুষের চোখে জল দেখতে চায় না। চায় শুধু শক্ত একটা মুখোশ, অবিচল এক কঠোরতা। যেন দুঃখ তাকে স্পর্শ করে না, যেন কষ্টে তার বুক ফেটে যায় না।
কিন্তু সত্যিটা হলো— পুরুষও মানুষ। তারও বুকের ভেতর জমে থাকে পাহাড়সম ক্লান্তি, ব্যর্থতা, কষ্ট আর না বলা হাজারো কান্না। শুধু পার্থক্য এই, অধিকাংশ পুরুষ কাঁদতে চাইলেও কাঁদতে পারে না। কারণ সমাজ তাদের শিখিয়েছে চোখের জল নাকি দুর্বলতার পরিচয়।
আর এই না কাঁদতে পারার যন্ত্রণা কতটা গভীর, তা কেবল সেই মানুষগুলোই বোঝে। যারা মাঝরাতে বালিশে মুখ গুঁজে নিঃশব্দে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, অথচ দিনের আলোয় আবারও শক্ত থাকার অভিনয় করে যায়।
মিসেস শেখের মৃত্যুর পর দেখতে দেখতে কেটে গিয়েছে তিনটা দিন। আজ বাসায় একটা মিলাদ রাখা হয়েছিল। এতিমখানা থেকে কয়েকজন বাচ্চাদের ডেকে এনে কুরআন শরীফ খতম দিয়ে তাদেরকে খাবার খাওয়ানো হয়েছে দুপুরে। এবং বিকেলে যাওয়ার সময় তাদেরকে নতুন জামা-কাপড় দেওয়া হয়েছে।
জাওয়াদ সব কাজ শেষ করে, বাবুর্চিদের পাওনা মিটিয়ে মাগরিবের নামাজ আদায় করে তারপর ঘরে আসে। বেডের উপর ঘুমন্ত অসুস্থ ছেলেকে দেখে আগে গিয়ে হাত-পা ধুয়ে আসে। তারপর তাঁকে ঘুমন্ত অবস্থাতেই বুকে তুলে নিয়ে আধশোয়া হয়ে চোখ বন্ধ করে।
তাজওয়াদ সেদিনের পর থেকে কঠিন জ্বর-ঠান্ডায় ভুগছে। ডাক্তার দেখানো হয়েছিল তাকে এত ঝামেলার মাঝেই। ডাক্তার কড়া গলায় বলে দিয়েছে, টাইম টু টাইম ঔষধ খাওয়াতে তাকে। আর কোনমতে ঠান্ডা না লাগে। ঠান্ডা লাগলেই বিষয়টা তখন আর জ্বর পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে না। নিউমোনিয়া হয়ে যেতে পারে তার। এছাড়া বাচ্চাটা অনেকটা ট্রমায় চলে গিয়েছে। ডাক্তার তাই তার সাথে সর্বক্ষণ কাউকে না কাউকে থাকতে বলেছে।
বাড়িতে বর্তমানে জাওয়াদের নানার বাড়ির সবাই রয়েছে। তার মামীরা, নানু বলতে গেলে তাজওয়াদকে কোলে কোলেই রাখে। এত সবার আদর, ভালোবাসা পেয়ে আস্তে আস্তে করে সেই বিশ্রী স্মৃতি ভুলতে শুরু করেছে।
ঠান্ডার ঔষধ খায় বলে তাজওয়াদ যখন-তখন ঘুমিয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ আগেই জাওয়াদের কাজিনদের সাথেই দুষ্টুমি করতে করতে তাদের মধ্যেই একজনের কোলে ঘুমিয়ে পড়েছে বাচ্চাটা। তারপর পূর্ণতা এসে রুমে শুয়ে দিয়েছে।
পূর্ণতা রুমে এসে দেখে জাওয়াদ ছেলেকে বুকে নিয়ে আধশোয়া হয়ে আছে। সে আর রুমে ঢুকে না। জাওয়াদের ভাজ পড়া কপাল দেখেই বুঝে যায়, তার পুরুষটির বর্তমানে কি প্রয়োজন। সে নিচে গিয়ে কিছু স্ন্যাক্স ও এক কাপ কফি বানিয়ে আনে। তারপর রুমে এসে সেগুলো সেন্টার টেবিলের উপর রেখে ধীমী গলায় জাওয়াদকে ডেকে ওঠে–
—”অ্যাঁই শুনছেন, তাজের পাপা। উঠুন নাস্তা করে কফি খান। মাথা ধরা চলে যাবে।”
পূর্ণতার ডাকে জাওয়াদ চোখ মেলে তাকায়। দু’জনের দৃষ্টির সন্ধি ঘটতেই পূর্ণতার বুকটা কেমন হুহু করে ওঠে প্রিয় পুরুষটির জন্য। জাওয়াদের চোখের সাদা অংশগুলো লাল বর্ণ ধারণ করেছে। মুখটা একটু বেশিই মলিন লাগছে। রাজ্যের সকল দুঃখ এসে ভীর জমিয়েছে জাওয়াদের চোখে।
জাওয়াদ শান্ত গলায় বলল–
—”ক্ষুধা নেই পূর্ণ। কফিটা দাও।”
পূর্ণতা জাওয়াদের চুলের ভাঁজে আঙুল গলিয়ে দিয়ে কোমল গলায় বলল–
—”দুপুরে কয়েক লোকমা খাবার খেয়ে উঠে গেলেন। সারাটা দিন দৌড়াদৌড়ি উপর ছিলেন। এমন না খেয়ে থাকলে চলবে? অসুস্থ হয়ে পড়বেন না? আপনার অসুস্থতা আমাদের জন্য কতটা কষ্টের বুঝেন আপনি? আমাদের জন্য হলেও আপনাকে স্ট্রংগ হতে হবে তাজের পাপা।”
বাবা-মায়ের কথার আওয়াজে তাজওয়াদ নড়ে-চড়ে উঠে। জাওয়াদ আস্তে করে ছেলেকে আগের জায়গা শুয়ে দিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালে, পূর্ণতাই তার হাত ধরে সোফায় এনে বসায়। তারপর নিজ হাতে খাইয়ে দেয় নাস্তাটুকু। জাওয়াদকে খাওয়াতে খাওয়াতে পূর্ণতা বলতে থাকে–
—”জানেন, আমার আম্মু মারা যাওয়ার কিছুদিন আগে থেকে প্রায়ই আমি রাগ করতাম। বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে ছিলাম তাই রাগ, জেদ ছোট থেকেই বেশি ছিল। বাবার সাথে রাগ করে লাভ হতো বটে, কিন্তু আম্মু মাঝে মধ্যে আচ্ছা মতো ধোলাই দিতো অহেতুক রাগ-জেদের কারণে। পরে অবশ্য নিজেই আমার মন ভালো করার জন্য লেগে পড়ত।
তো আমি একদিন আম্মুর সাথে রাগ করে দুপুরে নিজের হাতেই খাবার খেয়েছিলাম। দুপুরের খাবার সবসময় আমাকে আম্মু খাইয়ে দিত, আর রাতেরটা বাবা। সেদিন একা একা খেয়েছিলাম বলে এদিক-ওদিক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কয়েকটা ভাত খেয়েই রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সন্ধ্যায় ক্ষুধায় তো আমার মাথা খারাপ। আম্মু পরে আমার ফেভারিট স্ন্যাক্স বানিয়ে আমায় খাইয়ে দিতে দিতে বলেছিল, “আজ আমি আছি বলে তোমার অহেতুক রাগ সহ্য করে তোমারই পছন্দের খাবার মুখে তুলে খাওয়াচ্ছি। যেদিন আমি থাকব না, সেদিন বুঝবে মা কি জিনিস।”
সত্যিই বুঝেছিলাম। আম্মুর এক্সিডেন্ট আমায় ট্রমাটাইজ করে দিয়েছিল। তখন একমাত্র বাবা ছাড়া আর কাউকে পাশে পায়নি। কেন পাই নি জানেন? সবাই তো তখন আমায় দোষারোপ করেই কুল পাচ্ছিল না। আমার জন্য আমার আম্মু মারা গিয়েছে— এই কথাটা আজও যখন আমি মনে করি, কেমন অ্যাবনরমাল হয়ে যাই আমি। কথাটা সত্য, কিন্তু আমার মানতে কষ্ট হয়। আচ্ছা কোন সন্তান কি চাইবে, তার জন্মদায়িনী মমতাময়ী মা মারা যাক?
আসল কথা হচ্ছে, ভাগ্যের লেখন। ভাগ্যে তার মৃত্যু এমনভাবে লেখা ছিল বলে সে মারা গিয়েছেন। এই সহজ কথাটা আমরা না মেনে নিয়ে, অহেতুক অন্যদের কথায় বা আমাদের প্রবঞ্চিত মনের ধোঁকায় নিজেদেরকেই দোষারোপ করতে থাকি। ভেতরে ভেতরে গুমরে মরতে থাকি প্রতিনিয়তই।”
জাওয়াদ খাওয়া থামিয়ে পূর্ণতার দিকে সরাসরি তাকায়। তার দৃষ্টি একটু বেশিই অশান্ত। হয়ত ভাবছে, এই মেয়েটা তাকে এত বুঝে কি করে? কিভাবে তাকে এত গভীরভাবে পড়ে ফেলতে পারে সহজেই?
পূর্ণতা টিস্যু দিয়ে জাওয়াদের ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা খাবার মুছিয়ে দেয়। তারপর পানির গ্লাসটা জাওয়াদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে শান্ত গলায় বলল–
—”নিজেকে দোষারোপ করা বন্ধ করুন তাজের পাপা। আমাদের ভাগ্যে যা ছিল তা হবেই। আম্মার মৃত্যুর জন্য নিজেকে দায়ী মনে করে গুমরে কাঁদবেন না। নিজেকে হালকা করতে হয় একাকী কাঁদবেন, নাহয় সেজদায় পড়ে কাঁদবেন। একা কাঁদতে মন না চাইলে আমার কাছে এসে আমার বুকে মাথা রেখে কাঁদবে। আপনার সব সুখের ভাগীদার হতে পারলে, দুঃখের বেলায় পিছে থাকব কেনো?”
পূর্ণতার কথাগুলো শুনে জাওয়াদের ভারাক্রান্ত মনটা কেমন হালকা হয়ে যায়। পূর্ণতা জাওয়াদের হাতে কফির কাপটা ধরিয়ে দিয়ে এঁটো বাটি গুলো নিয়ে নিচে চলে যায়। নিজের দায়িত্ব গুলো পালনে সে সদা তৎপর। তারউপর যদি হয় সংসারের প্রতি নিষ্ঠাবান হওয়ার কথা, তাহলে পূর্ণতা নিজেকে বিলীন করে দিতেও কার্পণ্য করবে না।
একটা ভঙ্গুর, এলোমেলো, একাকী পরিবেশে বড় হওয়ায় পূর্ণতার ভীষণ লোভ তার নিজের একটা গোছানো, পরিপাটি আর ভালোবাসার মানুষদের নিয়ে সুন্দর সংসার হবে। এত বছর পর উপরওয়ালা তাকে সেটার সুযোগ দিয়েছেন পাকাপোক্ত ভাবে। পূর্ণতা সেটাকে শক্ত করে আঁকড়ে না ধরে পারে? উহুম! একদমই না। তার শ্বাশুড়ি মা যে নিজের জীবন বিনিময়ে পূর্ণতাকে এই সংসার ও তার স্বামী দিয়ে গিয়েছেন। পূর্ণতা এর যত্ন না নিয়ে পারে?
______________________________
রাতের খাবারের সকল নির্দেশনা পূর্ণতা নিজেই দেয়। এতগুলো মানুষের রান্না তার পক্ষে করা সম্ভব নয় বলে, এবাড়িতে থাকা কাজের খালা এবং আহমেদ বাড়ি থেকে মালতী কাকীকে ডেকে নিয়ে এসেছে পূর্ণতা। তারা তিনজন মিলে বেশ ভালোভাবেই রাতের খাবার রান্না করতে সক্ষম হয়।
কাল সকালে জাওয়াদের মামা-মামীরা চলে যাবে। তার নানুমনি থাকবেন আরো কিছুদিন। নানুমনির সাথে তার এক কাজিনও থাকবে।
খাওয়া শেষ করে যে যার রুমে চলে যায়। এবং আহনাফ সাহেব, আরিয়ান, টনি, আরওয়া ও মালতী কাকী নিজেদের বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যায়।
রাতের খাওয়ার সময় জাওয়াদ খাবার সামনে নিয়ে বসেছিল, খাচ্ছিল না দেখে তার নানুমনি নিজ হাতে জাওয়াদকে খাইয়ে দেন। তার বয়সটা অন্যের হাতে খাওয়ার না হলেও, ছেলেটা যে মায়ের শোকে ভেতরে ভেতরে একদই ভেঙে পড়েছে। জিনিয়াকেও তার বাবাই খাইয়ে দিয়েছেন।
_______________________________
মাঝরাতে ঘুমের ঘোরেই নিজের পাশে জায়গাটাতে হাত রাখে পূর্ণতা। কিন্তু কাউকে পায় না। চোখ বন্ধ রেখেই আশেপাশে হাতায়, তবে না। কেউ নেই। তৎক্ষনাৎ পূর্ণতা চোখ মেলে তাকিয়ে তার পাশের ব্যক্তিটিকে খুঁজতে থাকে। না, জাওয়াদ নেই। বেড ছেড়ে ওয়াশরুমের দিকে গিয়েও একবার দেখে নেয়। সেখানেও পায় না সে জাওয়াদকে। খানিক চিন্তিত মন নিয়ে সে বেলকনির দিকে হাঁটা দেয়।
বেলকনিতে এসেই সে নিজের কাঙ্ক্ষিত মানুষটিকে পেয়ে যায়। সাথে সাথেই তার মস্তিস্ক বুঝে যায় কেন এত রাতে জাওয়াদ এখানে দাঁড়িয়ে আছে। সে নিজেও তো এমন একটা সময় পাড় করে এসেছে। বাবা-মা ছাড়া এই দুনিয়া কতটা কঠিন, কতটা কষ্টের এটা সেই বুঝতে পারে যার বাবা-মা নেই।
আজ আবারও নিজের বাবা-মায়ের কথা মনে পড়ে যায় পূর্ণতার। তাদের কথা মনে পড়তেই, পূর্ণতার চোখের কোল ভিজে যেতে শুরু করে। একসময় দুয়েক ফোটা অশ্রু তার অনুমতি ব্যতীতই গড়িয়ে পড়তে থাকে। পূর্ণতা নিজের অশ্রু গুলো সন্তর্পণে মুছে নিয়ে এগিয়ে যায় প্রিয় পুরুষটির কাছে।
জাওয়াদের কাঁধে হাত রাখতেই সে একপ্রকার চমকে গিয়ে পূর্ণতার দিকে তাকায়। পূর্ণতাকে দেখে সে স্বাভাবিক হয়েও হয় না। তার চোখেমুখে অদ্ভুত রকমের এক অস্থিরতা। কেমন হাসফাস করছে। পূর্ণতা জাওয়াদের দুই গালে হাত রেখে কিছুটা ধরা গলায় বলল–
—”আম্মা চলে যাওয়ার পর আপনি একটুও কাঁদেন নি তাজের পাপা। একটু কাঁদুন, প্লিজ মনটা খুলে কিছুক্ষণ কাঁদুন। আপনার আম্মা, মমতাময়ী মা আর নেই। বিষয়টা আপনার জন্য কতটা কষ্টের সেটা আমার থেকে ভালো আর কেউ জানবে না। সেই কষ্ট টাকে নিজের মাঝে চেপে না রেখে বের করে দিন।
আপনার এই চেপে রাখা কষ্ট পরবর্তীতে আপনাকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে, সেটা আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না। আপনার কিছু হলে আমার কি হবে? আমাদের সন্তানের কি হবে? বাবা, জিনিয়ার কি হবে? আমাদের সবার কথা চিন্তা করে হলেও নিজেকে কাঁদিয়ে স্বাভাবিক হয়ে যান প্লিজ।”
জাওয়াদ এবার আর নিজেকে সামলাতে পারে না।বাঁধ ভাঙা কান্না এসে ভীর করে তার অক্ষিকোটরে। প্রিয় নারীকে আলিঙ্গন করে, তার সামনেই নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করে দিয়ে শব্দ করে কেঁদে দেয়। পূর্ণতা তাকে ততক্ষণ পর্যন্ত সময় ও সাথ দেয় যতক্ষণ না সে নিজ থেকে শান্ত হচ্ছে।
______________________________
মাঝরাতে ঘুম থেকে ওঠার পর জাওয়াদ-পূর্ণতা আর ঘুমায় না। তারা একসাথে তাহাজ্জুদ পড়ে নিজেদের পিতা-মাতার জন্য দোয়া করে। তারপর ফজরের নামাজ পড়ে শোয়। পূর্ণতা অবশ্য বেশিক্ষণ ঘুমায় না। মামা-মামীরা সকালে এগারোটার ট্রেনে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্য রওনা দিবে বলে সাড়ে সাতটার দিকেই উঠে যায়। নাস্তা বানিয়ে তাদের দুপুরের খাবারের জন্যও টুকটাক ব্যবস্থা করে। তারপর সাড়ে দশটার দিকে জাওয়াদকে ডেকে তুলে।
তাজওয়াদকে নয়টার দিকে উঠিয়ে ফ্রেশ করিয়ে নাস্তা খাইয়ে ঔষধ খাইয়ে দিয়েছে। বর্তমানে সে সবার কোলে কোলে গিয়ে আদর নিচ্ছে। বাচ্চাটা এত আদরের ডিব্বা যে অপরিচিতরাও তাকে কাছে টেনে আদর করে। সেখানে আঞ্জুমান নামক পা”ষা”ণী কি কষ্টটাই না দিয়েছে বাচ্চাটাকে।
জাওয়াদ নাস্তা করে তার মামা-মামীকে স্টেশনে ছেড়ে দিতে যায়। দুপুরে রান্না আগেভাগেই হয়ে যাওয়া পূর্ণতা কাজের খালাকে সবকিছু গুছিয়ে রাখতে বলে নিজে রুমে এসে পড়ে। ঘুম কম হওয়ায় তার নিজেরই এখন খারাপ লাগছে। মি.শেখ বর্তমানে বাগানে রয়েছেন। তাজওয়াদ তার পিপি’র সাথে আছে। জিনিয়া তার মন খারাপের সময়টাতে নিজের সাথে তাজওয়াদকে রাখে। তাজওয়াদের পাকা পাকা কথা তার মন ভালো করার বড় মেডিসিন নাকি।
সাড়ে এগারোটার দিকে পূর্ণতা আবারও একটু ঘুমায়। কয়েক ঘন্টা নিরিবিলি শান্তি মতো ঘুমানোর পর, হঠাৎই ঘুমের ঘোরে কেমন হাসফাস লাগতে শুরু করে তার। মনে হতে থাকে, দুইপাশ থেকে কিছু একটা তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। বাঁধন গুলো বেশ পোক্ত।
শ্বাস নিতে কিছুটা কষ্ট হওয়ায় পূর্ণতা ফট করে চোখ মেলে তাকায়। চোখ ঘুরিয়ে ডানে-বামে তাকালে দেখতে পায়, তার সুখেরা তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে ঘুমাচ্ছে। পূর্ণতার ডান পাশে গলার কাছে মাথা রেখে গায়ে হাত-পা উঠিয়ে দিয়ে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে জাওয়াদ। বাম পাশটিতে জাওয়াদের মতো করে ঘুমাচ্ছে তাজওয়াদ। বাপ-বেটাকে বর্তমানে একে অপরের কপিক্যাট লাগছে। মাঝ দিয়ে চ্যাপ্টা হয়ে যাচ্ছে বেচারি পূর্ণতা।
সে তাদের থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে দেওয়ালে ঝুলানো ঘড়িটির দিকে তাকায়। আড়াইটা বাজছে দেখে তড়িঘড়ি করে উঠতে চায় শোয়া থেকে। কিন্তু জাওয়াদ তাকে উঠতে দেয় না। আগের মতোই চেপে ধরে ঘুম ঘুম গলায় বলল–
—”ঘুমাতে গেলেও শান্তি নেই। লাফালাফি করছো কেন? দেখছো না ঘুমাচ্ছি।”
পূর্ণতা তাকে সরানোর প্রচেষ্টা জারি রেখেই বলল–
—”উঠুন আমার উপর থেকে। জোহরের নামাজ পড়বো। আপনিও উঠুন। নামাজ পড়েছেন?”
—”হু।”
—”তারপরও উঠুন। খেতে হবে। ছেলেটা খেয়েছে?”
—”হুম। ওকে খাওয়ানোর সময় আমিও খেয়ে নিয়েছি। বাবা-জিনিও খেয়েছে। শুধু তুমি বাকি আছো। নামাজ পড়ে খেয়ে নিও।”
—”আচ্ছা, ঘুমান তাহলে।”
জাওয়াদ একটু সরতেই পূর্ণতা শোয়া থেকে উঠে যায়। জাওয়াদ ছেলেকে নিজের বাহুতে টেনে নিয়ে আবারও ঘুমিয়ে পড়ে। পূর্ণতা তড়িঘড়ি করে ফ্রেশ হয়ে নামাজ আদায় করে নেয়। তারপর বিকেলের বাকিটা সময় ননদের সাথেই কাটায়। আসরের নামাজের পর জাওয়াদ রেডি হয়ে বের হতে নিলে, পূর্ণতা তাকে জিজ্ঞেস করে–
—”কোথায় যাচ্ছেন?”
—”একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজে। ডিনারের আগে চলে আসব।”
—”আচ্ছা। সাবধানে যাবেন। ফোন সাইলেন্ট করবেন না। রিং হওয়ার সাথে সাথে না ধরলে ঘু*ষি দিয়ে নাক ফাটিয়ে দিবো।”
পূর্ণতার শেষের কথায় জাওয়াদ শেষে দেয়। পূর্ণতার কাছে এসে একটু অতিরিক্ত দুষ্টুমি করে মেয়েটাকে খানিকটা নাজেহাল করে তুলে। তারপর আবারও বিদায় নিয়ে রুম ছেড়ে বেরিয়ে যায়।
পূর্ণতা তার লাজে লাল হয়ে যাওয়া গাল নিয়েই নিজেদের রুমটা গুছাতে থাকে। মিনিট পাঁচেক পর জাওয়াদ ফিরে আসে তড়িঘড়ি করে এবং বিচলিত ভঙ্গিমায় বলল–
—”রাতের ডিনারটা বাহির থেকেই নিয়ে আসব। তুমি রেডি হও জলদি।”
পূর্ণতা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে–
—”ও মাহ্! রেডি হবো কেনো?”
—”আমার সাথে যাবে, তাই রেডি হতে বলেছি।”
—”কিন্তু কোথায়?”
পূর্ণতার এই প্রশ্নটির জবাব জাওয়াদ তার কানে কানে দেয়। উত্তরটি শোনার পর পূর্ণতা ভীষণ এক্সসাইটমেন্ট নিয়ে বলল–
—”আপনি দুই মিনিট ওয়েট করে। আমি ঝড়ের বেগে যাবো রেডি হতে, আর তুফানের গতিতে ফিরব।”
কথাটা বলেই জাওয়াদের থেকে কোন উত্তর শোনার অপেক্ষা না করেই পূর্ণতা কাবার্ড থেকে নিজের স্পেশাল ড্রেস বের করে ওয়াশরুমের ছুট লাগায়। জাওয়াদ তার এত এক্সসাইটমেন্ট দেখে বাঁকা হাঁসি দিয়ে সোফায় বসে অপেক্ষা করতে থাকে নিজের প্রিয়ার।
_____________________
অন্ধকার শ্যাতশ্যাতে একটি রুম থেকে এক তরুণীর বিভৎস আর্তনাদ যে কারো আত্মা কাঁপিয়ে তুলতে সক্ষম। তার সেই আর্তনাদে কতটা কষ্ট, যন্ত্রণা, ব্যথা মিশে আছে সেটা যে শুনবে, সেই বলে দিতে পারবে। মেয়েটির এই আর্তনাদের কারণ হলো, বর্তমানে তার উপর কষ্টের স্টিমরোলার চালানো হচ্ছে।
মেয়েটিকে রাখা রুমটির অন্যপাশেই অচেতন হয়ে পড়ে রয়েছে এক বয়স্ক নারী। তারউপরও কিছুক্ষণ আগে অবর্ণনীয় অত্যা//চার চালানো হয়েছে। যার কারণে বর্তমানে সে অচেতন হয়ে রয়েছে।
মেয়েটি যন্ত্রণায় আবারও চিৎকার দিয়ে উঠতেই এবার তার মুখে ঠেসে দেওয়া হয় এক মুঠ কুচি করা নাগা মরিচ। ঝালের চোটে সে মুখের জিনিস গুলো উগড়ে দিতে চায় মেয়েটি। কিন্তু হায়! তা আর হতে দিলে তো। সাথে সাথে তার মুখ চেপে ধরে একটি শক্তিশালী হাত। ঝালে তড়পাতে তড়পাতে একসময় সেও নিজের মায়ের মতোই জ্ঞান হারিয়ে জমিনে লুটিয়ে পড়ে। অচেতন হওয়ার পূর্বে অত্যা//চারিত মেয়েটি মানে আঞ্জুমানের কানে ফিসফিস করে পূর্ণতা গুনগুন করে ওঠে–
—”Cross my heart and hope to die,
Welcome to my dark side.”
পূর্ণতার এই গুনগুনানি আঞ্জুমানের রুহ অব্দি কাঁপিয়ে তুলতে সক্ষম।
আজকের মতো শাস্তির পর্ব এখানেই স্থগিত করে মিসেস জাওয়াদ শেখ ওরফে আনাবিয়া শেখ পূর্ণতা। টানা চারটা ঘন্টা দুটো মানুষের উপর অত্যা/চার করা কি চারটি খানি কথা? বড়ই ক্লান্ত সে আজকে। নিজের হাতে আঞ্জুমানের শরীরের জায়গা জায়গা থেকে চামড়া ছাড়িয়ে লবণ মরিচের প্রলেপ লাগিয়েছে।
পূর্ণতা হ্যান্ডগ্লাভসগুলো খুলে ছুঁড়ে ফেলে অজানার উদ্দেশ্যে। তারপর তার অধীনে থাকা লোকদের নির্দেশ দিয়ে বলল–
—”বুড়িটার জ্ঞান ফেরার পর আবারও একঘন্টা বরফের ড্রামে চুবিয়ে রাখবে। এই বয়সে এসেও মায়ের এত উত্তেজনা বলেই, মেয়ের উত্তেজনাও আকাশচুম্বি। ব্যাপার না, আরেকবার বরফ ট্রিটমেন্ট দিলেই সব উত্তেজনা সারাজীবনের জন্য বিলীন হয়ে যাবে।
আর হ্যাঁ, এরা আমার স্পেশাল গেস্ট। তাই তাদের খাবারের ব্যবস্থাও স্পেশালভাবে করবে। আশা করি, পুরোটা বলার প্রয়োজন নেই।”
মনিবের নির্দেশ পেয়ে রোবটের ন্যায় গলায় লোকটি বলল–
—”ওকে ম্যাডাম।”
পূর্ণতা হেঁটে এসে দাঁড়ায় তার প্রিয় পুরুষটির সামনে। সে সামনে আসতেই জাওয়াদও চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। পকেট থেকে রুমাল বের করে সযত্নে পূর্ণতার কপালের ও গালের ঘাম গুলো মুছে দেয়। পূর্ণতা তার বক্ষে মাথা এলিয়ে দিয়ে বলল–
—”আই ফিলি টায়ার্ড তাজের পাপা।”
—”বাসায় গিয়ে হট শাওয়ার নিতে হেল্প করব। তাহলেই সব টায়ার্ডনেস দূর হয়ে যাবে।”
—”উমমম।”
জাওয়াদের বুকে মুখ ঘসে সম্মতি জানায় পূর্ণতা। জাওয়াদ তাকে দুই হাতে কোলে তুলে রুমটি থেকে বের হয়ে আসার জন্য পা চালাতে শুরু করে। বউয়ের প্রতি আজ সে একটু বেশিই সন্তুষ্ট। তার কলিজা ঠান্ডা না হওয়া অব্দি আঞ্জুমানের উপর এমন সব থেরাপি চালিয়েছে যে, প্রতিটা মিনিট আঞ্জুমান যন্ত্রণা চেঁচিয়েছে।
[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্প প্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন। ]
শব্দসংখ্যা~২৪০০
[কেমন হয়েছে আজকের পর্বটা? আঞ্জুমানকে আর কি কি শাস্তি দেওয়া যায় বলুন তো?
সবাই বেশি বেশি রেসপন্স করে ২কে+ রিয়াক্ট পূরণ করে দিয়েন।
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]
Share On:
TAGS: শেষ পাতায় সূচনা, সাদিয়া সুলতানা মনি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪৬.২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫২.৩
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩৭
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪৭.২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩৮.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৪
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫৫.২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫১.২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩৯.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫২.২