প্রেমআসবেএভাবে
ইশরাতজাহানজেরিন
পর্ব_১০
নাভিদ ফোনের ওপাশের মানুষটির সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ ধরে কথা বলছিল। কথাগুলো ঠিক কী নিয়ে তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে তার কণ্ঠে ছিল গাম্ভীর্য, যেন কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ভার বুকের ভেতর জমে আছে। কথোপকথন শেষ করে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সামনে তার বিয়ে আর বেশি দিন বাকি নেই। কিন্তু শরীরের এই অদ্ভুত অসুস্থতাকে তো আর সময় দেখে আসতে বলা যায় না। সেদিনও ঠিক তেমনই হলো। হঠাৎ করেই নাভিদ আবার অসুস্থ হয়ে পড়ল। তবে এবার আগের চেয়ে অনেকটাই বেশি। বুকের ভেতর তীব্র ব্যথা আর অস্বস্তিতে সে কিছুক্ষণের জন্য স্থির হয়ে বসে থাকল। এতদিন যেমন করে লুকিয়ে রেখেছিল, এবার আর তেমন করে পারল না। অনুজার চোখ এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হলো না। অনুজা উৎকণ্ঠিত হয়ে তার সামনে এসে দাঁড়াল। কপালে ভাঁজ পড়ে গেছে তার।
“তোমার কী হয়েছে বলবে? আমি জানি, তুমি আমার কাছ থেকে কিছু একটা লুকাচ্ছ।”
নাভিদ মৃদু হাসার চেষ্টা করল, যদিও মুখের ক্লান্তি লুকানো যাচ্ছিল না। “সত্যি বলছি, তোমার কাছ থেকে কিছু লুকাইনি আমি। একটা কাজ করো—আমার ফোন থেকে বাবাকে কল দিয়ে বলো, আমার শরীরটা ভালো লাগছে না।”
অনুজা অবাক হয়ে গেল। হঠাৎ করে বাবাকে জানানোর কথা কেন বলছে নাভিদ? সে কিছুই বুঝতে পারছে না। তবুও দেরি না করে নাভিদের বাবাকে ফোন করল।
খবর পেয়েই নাভিদের বাবা দ্রুত ড্রাইভারকে নিয়ে চলে এলেন। ছেলেকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য যেন তার ভেতরেও তাড়াহুড়ো। অনুজা অনেক অনুরোধ করার পর শেষ পর্যন্ত তাকেও সঙ্গে নেওয়া হলো।
হাসপাতালে পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি যেন আরও অস্বস্তিকর হয়ে উঠল। নাভিদকে সরাসরি ভেতরো নিয়ে যাওয়া হলো, কিন্তু তার বাবা কোনোভাবেই অনুজাকে ভেতরে ঢুকতে দিলেন না। তিনি নিজেই ভেতরে রইলেন।
হাসপাতালের করিডোরে একটা চেয়ারে বসে রইল অনুজা। চোখে-মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ। ঘড়ির কাঁটা যেন সেদিন খুব ধীরে চলছিল। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে সে একই জায়গায় বসে রইল, মনটা ভীষণ ভারী হয়ে আছে।
অবশেষে দরজা খুলে নাভিদের বাবা বাইরে এলেন। তার কণ্ঠে ছিল ক্লান্তি, তবে একটা মমতা মেশানো সুরও। “যাও মা, নাভিদ তোমার সঙ্গে দেখা করবে।”
কথাটা শোনামাত্রই অনুজা আর দেরি করল না। দ্রুত পায়ে কেবিনের ভেতরে ঢুকে গেল।
ভেতরে গিয়ে দেখল, নাভিদ বিছানায় শুয়ে আছে। পাশে দাঁড়িয়ে আছেন ডাক্তারও। অনুজা কাছে গিয়ে ধীরে ধীরে জিজ্ঞেস করল, “এখন কেমন লাগছে তোমার? ঠিক আছো?”
নাভিদ তাকাল তার দিকে, চোখে একরাশ ক্লান্তি আর মমতা। “হুম… ঠিক আছি। তুমি এতক্ষণ কেন অপেক্ষা করলে? বাসায় চলে গেলেই তো পারতে।”
অনুজা একটু অভিমান মেশানো গলায় বলল, “না, কেন যাব? আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না। তুমি অসুস্থ এই অবস্থায় তোমাকে রেখে আমি কীভাবে চলে যাই বলো?”
নাভিদের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল। “ওরে, আমার লক্ষ্মীটা…”
অনুজা তখনই নরম স্বরে বলল, “তুমি এখন বিশ্রাম নাও। এত কথা বলা তোমার জন্য ঠিক হবে না।”
এরপর সে ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি একটু আমার সঙ্গে আসবেন?”
ডাক্তার মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন।
কেবিনের বাইরে এসে তিনি বললেন, “জি, বলুন ম্যাম। কিছু জানতে চান?”
অনুজার কণ্ঠে তখন স্পষ্ট উদ্বেগ। “সত্যি করে বলবেন তো নাভিদের কী হয়েছে? দুই দিন পরপর মানুষটা এমন অসুস্থ হয়ে পড়ছে কেন?”
ডাক্তার একবার অনুজার দিকে তাকালেন, তারপর কেবিনের ভেতরে শুয়ে থাকা নাভিদের দিকে। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে ধীর গলায় বললেন, “আসলে তেমন গুরুতর কিছু হয়নি। তবে মনে হচ্ছে উনি হয়তো অনেক মানসিক চাপের মধ্যে আছেন। সেই কারণেই মাঝে মাঝে বুকের ব্যথা অনুভব করছেন।”
তারপর একটু থেমে আবার বললেন, “আপনি যদি পারেন, উনাকে একটু বেশি সময় দিন। পাশে থাকুন। এতে হয়তো মনটা ভালো হয়ে যাবে।”
অনুজা ভ্রু কুঁচকে বলল, “কিন্তু আপনি এভাবে বলছেন কেন?”
ডাক্তার হালকা হাসলেন, “ওনার ভালোর জন্যই বললাম। চিন্তা করবেন না। অনেক সময় এমনটা হয়। নাভিদকে আমি ছোটবেলা থেকেই চিনি। ওর বাবার সঙ্গে আমার অনেক দিনের সম্পর্ক। ছেলেটা রাজনীতির সঙ্গেও জড়িত, আবার ব্যবসাও সামলায়। এত দায়িত্বের চাপেই হয়তো শরীরটা একটু ভেঙে পড়েছে।”
অনুজা তবুও নিশ্চিন্ত হতে পারল না। “তবুও কেন জানি আমার ভয় লাগছে…”
ডাক্তার আশ্বাসের সুরে বললেন, “ভয়ের কিছু নেই। আপনি বরং ওর কাছে যান। এখন আপনার উপস্থিতিটাই ওর জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার।”
অনুজা ধীর পায়ে আবার কেবিনের দিকে এগিয়ে গেল কিন্তু তার বুকের ভেতর অজানা এক আশঙ্কা তখনও কাঁটার মতো বিঁধে আছে।
রাতে অবশেষে নাভিদকে হাসপাতাল থেকে বাড়ি নিয়ে আসা হলো। শরীরটা এখন কিছুটা স্থির হলেও মুখে এখনও ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। সবাই তাকে বিশ্রাম নিতে বলছে। কিন্তু অনুজার মনটা অদ্ভুতভাবে অস্থির।
নিজের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার কথা উঠতেই সে একেবারে রাজি হলো না। মনে হলো এই মুহূর্তে নাভিদকে ছেড়ে যাওয়া তার পক্ষে অসম্ভব।
নাভিদ একটু মৃদু হেসে বলল, “তুমি আমার জন্য এত চিন্তা করো না, জান। তোমার বাসায় তো সবাই তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।”
অনুজা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল, “করুক অপেক্ষা। আমি এই অবস্থায় তোমাকে রেখে কোথাও যাব না। তাড়িয়ে দিলেও তোমার বাড়ির সামনেই বসে থাকব।”
“সত্যি?”
“হুম, একদম সত্যি।”
“তাহলে গার্ডকে বলি?”
অনুজা চোখ বড় বড় করে তাকাল। “এই! সত্যিই তাড়িয়ে দেবে নাকি? আমি না তোমার বউ?” এই কথাটা শুনে নাভিদ আর নিজেকে সামলাতে পারল না। ক্লান্ত শরীর নিয়েও হালকা হেসে উঠল। সেই হাসিতে যেন অনেকদিন পর একটু উষ্ণতা ফিরে এলো। রাতে নাভিদকে ওষুধ খাইয়ে দিয়ে অনুজা যখন পাশের রুমে যেতে উঠল, ঠিক তখনই নাভিদ হঠাৎ তার হাতটা আলতো করে টেনে ধরল। অনুজা একটু অবাক হয়ে ফিরে তাকাল। “কি হলো স্যার? কিছু বলবেন?”
নাভিদ ধীর গলায় বলল, “হুম… বলার তো অনেক কথা আছে।”
“তাহলে তাড়াতাড়ি বলুন।” কিন্তু নাভিদ আর কিছু বলল না। শুধু আলতো করে অনুজাকে নিজের পাশে বসিয়ে নিল। অনুজা কৌতূহলী হয়ে তার দিকে তাকাল।
“কি হলো?”
নাভিদের মুখে তখনও কোনো শব্দ নেই। সে শুধু চুপচাপ অনুজার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে তার বুকের উপর থাকা ওড়নাটা সরাতে হাত বাড়াল।
হঠাৎ সেই স্পর্শে অনুজার শরীরটা কেঁপে উঠল। কিন্তু পরক্ষণেই সে নাভিদের হাতটা থামিয়ে দিল।
“কি করছ?”
“প্লিজ… বারণ করো না। এভাবে আর দূরে দূরে রেখো না।”
অনুজা একটু দৃঢ় গলায় বলল, “না। বিয়ের আগে কিছুই হবে না। বুঝেছ?”
নাভিদের চোখে তখনও একরকম আবেগ আর আকাঙ্ক্ষার ছাপ। কিন্তু অনুজার কথার দৃঢ়তা বুঝে সে আর কিছু বলল না। একটু পরে হেসে বলল, “যাও… আজ আর জোর করলাম না। কিন্তু দেখো, একদিন তুমি নিজেই শান্তির জন্য আমার কাছেই এসে দাঁড়াবে।”
অনুজা ঠোঁট বাঁকিয়ে মুচকি হাসল।
“আচ্ছা, দেখা যাবে।” সেই রাতটা তারা একসাথেই কাটাল। অনুজা নাভিদের বুকে মাথা রেখে অল্প সময়ের মধ্যেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। যেন ছোট্ট কোনো শিশুর মতো নিশ্চিন্ত ঘুম। কিন্তু নাভিদের চোখে ঘুম এলো না। তার চোখ-মুখে তখন এক অদ্ভুত ভাবনা খেলা করছে। অনেকক্ষণ সে চুপচাপ অনুজার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সেই শান্ত মুখটা যেন তার বুকের ভেতর আরও ভারী একটা অনুভূতি তৈরি করছিল। কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে সে উঠে বসে।
নিঃশব্দে টেবিলের কাছে গিয়ে ড্রয়ারের ভেতর থেকে একটা হলুদ রঙের পুরোনো ডায়েরি বের করল। যেটা সে খুব যত্ন করে লুকিয়ে রাখে। তারপর শুরু হলো লেখা। পাতার পর পাতা ভরে যেতে লাগল। তবুও যেন তার মনের কথাগুলো শেষ হতে চাইছে না। লিখতে লিখতে হঠাৎই তার চোখ ভিজে উঠল। অজান্তেই কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল ডায়েরির পাতায়। এটা কি তার ভালোবাসার মানুষটাকে হারানোর ভয়?
নাকি কোনো অজানা আশঙ্কা? এই প্রথম কারও জন্য নাভিদের চোখে এমন অশ্রু নেমে এলো। যদিও জীবনে একবার সে এর আগেও কেঁদেছিল।
অনেক কেঁদেছিল। সেদিন… যখন সে তার মাকে হারিয়েছিল। মাকে হারানোর সেই কষ্টটা তাকে সেদিন ভেতর থেকে ভেঙে দিয়েছিল। আর আজ, বহুদিন পর আবারও সেই একই রকম ভাঙা অনুভূতি তার বুকের ভেতর ধীরে ধীরে জমে উঠছে।
কিছুক্ষণ পর হঠাৎই অনুজার ঘুম ভেঙে গেল। যেন অজানা কোনো অস্বস্তি তাকে ঘুমের ভেতর থেকে টেনে তুলেছে। হাত বাড়িয়ে পাশে তাকাতেই সে বুঝল নাভিদ বিছানায় নেই। অবাক হয়ে উঠে বসতেই তার চোখ গিয়ে পড়ল বারান্দার দিকে। আধো অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে নাভিদ। অনুজা ধীর পায়ে উঠে বারান্দার দিকে তাকিয়ে বলল, “এত রাতে সেখানে কী করছ?”
নাভিদ ঘুরে তাকাল। “ঘুম ভেঙে গেছে বুঝি? কিন্তু আমি তো তোমাকে বিরক্ত করিনি।”
অনুজা মাথা নাড়ল। “না, তা না… আসলে একটা বাজে স্বপ্ন দেখেছিলাম।”
নাভিদ একটু কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে এল।
“কী স্বপ্ন?”
অনুজা সঙ্গে সঙ্গে মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“ইশ! রাতে স্বপ্নের কথা বলতে নেই। এটাও বুঝি জানো না?”
নাভিদ অবাক হওয়ার ভান করল।
“ওমা! তাই নাকি?” এই বলে সে অনুজার কাছে এসে দাঁড়াল। আলতো করে তার কপালে একটা চুমু দিয়ে পাশে বসে পড়ল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে নাভিদ হঠাৎ ধীরে বলল, “শোনো জান… তুমি কি আমাকে ছাড়া থাকতে পারবে?”প্রশ্নটা শুনে অনুজা একটু থমকে গেল। তারপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, “না। তোমাকে একদিন না দেখলে আমার পৃথিবীটাই শূন্য লাগে।”
নাভিদ একটু নিচু স্বরে বলল, “কিন্তু একদিন তো সবাইকেই মরতে হবে…” কথাটা শুনে অনুজার মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল। তবুও শান্ত গলায় বলল,
“জানি। তাই তো চাই, তোমার একদিন আগে যেন আমার মৃত্যু হয়। তাহলে তোমাকে হারানোর কষ্টটা আমাকে সহ্য করতে হবে না।”
নাভিদ সঙ্গে সঙ্গে বলল, “এমন কথা মুখেও আনবে না, প্লিজ…”
অনুজা হাসল। “আচ্ছা, আর বলব না। কিন্তু তুমি নিজেই তো এসব বলা শুরু করেছ।”
নাভিদ একটু লজ্জিত ভঙ্গিতে বলল, “ঠিক আছে… আমিও আর বলব না। সত্যি।”
পরদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সবকিছুই যেন স্বাভাবিক ছিল। মাঝখানে অনুজা নিজের বাড়িতেও গিয়েছিল। কিন্তু সন্ধ্যা নামার আগেই আবার নাভিদের কাছে ফিরে এলো। ঘরে ঢুকতেই সে মুচকি হেসে বলল
“চা খাবে?”
নাভিদ একটু দুষ্টু ভঙ্গিতে তাকাল। “না… তোমাকেই খাব।”
অনুজা লজ্জা পেয়ে বলল, “ইস! কী যে বলো!”
তারপর একটু সিরিয়াস হয়ে বলল, “তোমার অসুস্থতার জন্য কাজে অনেক সমস্যা হচ্ছে, তাই না?”
নাভিদ মাথা নাড়ল। “হুম… ঠিকই।”
ঠিক তখনই হঠাৎ নাভিদের ফোনে একটা কল এলো।
নাভিদ বলল, “ফোনটা টেবিলের ওপর আছে। দাঁড়াও, নিয়ে আসছি।”
অনুজা তাকে থামিয়ে দিল। “তুমি উঠো না। আমি এনে দিচ্ছি।”
ফোনটা হাতে নিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই অনুজার ভ্রু কুঁচকে গেল। “প্রিতুল?”
সে অবাক হয়ে বলল, “এই সময় হঠাৎ সে কেন ফোন করলে?”
নাভিদ তাড়াতাড়ি বলল, “দাও, আমার কাছে।”
এই বলে সে এক টানে ফোনটা নিয়ে কল রিসিভ করল।
“কিরে, কী খবর?”
ওপাশ থেকে হাসির শব্দ এলো। “তুই এখন ফোন ধরলি? ভাবা যায়?”
“হুম, যায়। বল, কী দরকার?”
“একটা খুশির খবর দিতে ফোন করেছি।”
“কী খবর?”
“আমি বিয়ে করতে যাচ্ছি।”
নাভিদ একটু অবাক হয়ে গেল। “মানে কী?” ওপাশ থেকে দীর্ঘশ্বাস ভেসে এলো।
“মানে আবার কী? একবার তো ভালোবেসে দেখেছি। কী পেলাম? শুধু কষ্ট।”
নাভিদ গম্ভীর হয়ে বলল, “তুই এভাবে বিয়ে করতে পারিস না।”
ওপাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এলো, “তোরা পারলে আমি কেন পারব না?”
তারপর সে বলল, “রুশদাকেই বিয়ে করব। বাবা-মায়েরও এটাই ইচ্ছা। আগামী মাসের ২০ তারিখে বিয়ে। তোরা দুজন অবশ্যই আসবি।” এই কথা বলেই প্রীতুল ফোনটা কেটে দিল। ফোন রেখে নাভিদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। অনুজা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কী বলল সে?”
নাভিদ ধীরে বলল, “রুশদাকে নাকি বিয়ে করবে।”
কথাটা শুনে অনুজা একটু অবাক হলেও খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, “এসবে আমাদের কী?” তবে নাভিদ এখনো ভাবনার দুনিয়ায়। গভীর ভাবনায় ডুবে।
রাতে নেহা তার বাবা-মাকে নিয়ে নাভিদকে দেখতে এলো। সবাই নিচে বসে গল্প করছিল। সেই সুযোগে নেহা চুপচাপ নাভিদের রুমে ঢুকে পড়ল। নাভিদ অবাক হয়ে তাকাল। নেহা কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে বলল, “জানো… তোমাকে ভুলে যাওয়ার অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু সব চেষ্টা বৃথা গেছে।”
নাভিদ শান্ত গলায় বলল,
“বড় হলে ভালো-মন্দ বুঝতে পারবে।”
নেহা মাথা নাড়ল। “আমি তোমার বন্ধুকেও ভালোবাসার চেষ্টা করেছি… কিন্তু তোমার মতো করে কাউকে দেখে আমার মনে প্রেম জাগে না।”
নাভিদের মুখ কঠিন হয়ে গেল। “দয়া করে এসব বলা বন্ধ করো। এত বেয়াদব কেন তুমি? একটা চড় খেলে ঠিক হয়ে যাবে।” এমন কঠিন কথা শুনে নেহা মুহূর্তেই গাল ফুলিয়ে ফেলল। আর কিছু না বলে সেখান থেকে বেরিয়ে গেল। আর মাত্র তিন দিন পর বিয়ে।
তিন দিন পরেই অনুজা আর নাভিদের সম্পর্কের সব দ্বিধা, সব অস্বস্তি মুছে যাবে। তাদের ভালোবাসা তখন পূর্ণতা পাবে বৈধতার বন্ধনে। ভাগ্য সত্যিই কত সুন্দর হলে মানুষ তার ভালোবাসার মানুষটাকে নিজের করে পায়।
–
প্রীতুল শেষ পর্যন্ত বাবা–মায়ের কথায় রাজি হয়ে বিয়েতে হ্যাঁ বলে দিয়েছে ঠিকই। কিন্তু তার মনের ভেতরটা একেবারেই শান্ত নয়। বুকের গভীরে এখনো শুধু একটি নামই ঘুরপাক খাচ্ছে—অনুজা। সে বারবার নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করে সব শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু সত্যিই কি শেষ হয়েছে? মেয়েটার মায়া কি এত সহজে কাটানো যায়? হয়তো যায় না। কারণ অনু শুধু একটা নাম নয় সে যেন এক মায়াবতী। আর মায়াবতীর মায়া থেকে মুক্ত হওয়া কোনো সহজ কাজ নয়।
এইসব ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ প্রীতুলের মনে পড়ে যায় নাভিদের কথা। সেদিন সে যখন নিজের বিয়ের কথা বলেছিল, তখন নাভিদ অদ্ভুতভাবে বারবার না করছিল। কেন? নাভিদের তো খুশি হওয়ার কথা ছিল। তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী—যে মানুষটা তার পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল সে তো চিরতরে সরে যাবে। তাহলে নাভিদ এত আপত্তি করছিল কেন?
এই প্রশ্নটা মাথার ভেতর ঘুরতেই থাকে। ঠিক তখনই দরজায় হালকা শব্দ হয়। দরজা খুলে ভেতরে ঢোকে রুশদা। রুশদাকে দেখেই প্রীতুল তাড়াতাড়ি ল্যাপটপটা বন্ধ করে দেয়। রুশদা মৃদু হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কি ব্যাপার? কাজ করছিলে?”
প্রীতুল স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, “হ্যাঁ, একটু কাজ করছি। অনেক কাজ বাকি পড়ে আছে।”
রুশদা কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে বলে, “জানো… আমি তোমাকে সত্যিই অনেক ভালোবাসি। যখন শুনেছিলাম তুমি অনুকে বিয়ে করতে চাও… তখন মনে হয়েছিল আমার ভেতরটা যেন পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।”
প্রীতুলের মুখ শক্ত হয়ে যায়। সে একটু নিচু স্বরে বলল,
“এসব আমাকে বলতে হবে না। তোমার ভেতরটা পুড়েছে ঠিক আছে। কিন্তু আমার আত্মার যে জীবন্ত মৃত্যু হয়েছে, সেটা কি জানো? দিনের শেষে তুমি তো তোমার পছন্দের মানুষকে পেয়েছ… কিন্তু আমি?”
রুশদা একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল। “এসব কথা থাক না প্লিজ। তুমি তো এখন শুধু আমার। আমার মন, আমার শরীর সবই তোমার। জানো, কাল তোমার মা বলছিলেন বিয়ের পরপরই যেন একটা বাচ্চা নিয়ে নিই। বাড়িটা খুব ফাঁকা ফাঁকা লাগে।” এই কথা বলতে বলতে রুশদার গাল লাল হয়ে গেল। “ওই কথা শুনে আমি তো ভীষণ লজ্জা পেয়েছিলাম…”
প্রীতুল কথাটা শুনে একটা মুচকি হাসি দিল। তারপর শান্ত গলায় বলল, “আমাকে এখন কাজ করতে হবে।”
কথাটা খুব সাধারণ শোনালেও এর ভেতরে স্পষ্ট একটা দূরত্ব ছিল। রুশদা বুঝতে পারল প্রীতুল তাকে এড়িয়ে যাচ্ছে। তার কথাগুলো যেন ইচ্ছে করেই উপেক্ষা করা হচ্ছে। তবুও অদ্ভুত নিয়তি… মানুষ যাকে চায়, তাকে কেন পায় না? আর যাকে পায়, তাকে কেন মন থেকে গ্রহণ করতে পারে না? রুশদা ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
রাত গভীর হতে থাকে। প্রীতুলের ফোনে একটার পর একটা কল আসতে থাকে। কিন্তু সে যেন কিছুতেই কথা বলতে চাইছে না। বিরক্ত হয়ে শেষমেশ ফোনটা এয়ারপ্লেন মোডে করে রাখল। চোখে তার অস্থিরতা।
সে ভাবতে লাগল কীভাবে সে রুশদার সঙ্গে স্বামী–স্ত্রীর মতো জীবন কাটাবে? স্ত্রীর হক মানে তো অনেক কিছু।
ভাবতেই তার ভেতরটা কেমন অস্বস্তিতে ভরে উঠল।
ছোটবেলা থেকেই সে রুশদাকে নিজের বোনের মতো দেখেছে। প্রিয়া আর রুশদাকে সে সবসময় একই চোখে দেখেছে। আজ হঠাৎ সেই রুশদাকেই… স্ত্রী?
না… ব্যাপারটা যেন তার কাছে একেবারেই স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। এইসব ভাবনার মাঝেই হঠাৎ তার ফোনে একটা ই-মেইল নোটিফিকেশন আসে। অভ্যাসবশত সে ফোনটা হাতে নিয়ে মেইলটা খুলে দেখল। কিন্তু মেইলটা পড়তেই তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে যায়। মুখে একরাশ স্তব্ধতা আর শক। কার মেইল এটা…? প্রীতুল কয়েক সেকেন্ড নিঃশ্বাস নিতেও ভুলে গেল। তারপর ধীরে ধীরে সে ফিসফিস করে বলল, “এটা… এটা কীভাবে সম্ভব?”
চলবে?
Share On:
TAGS: ইশরাত জাহান জেরিন, প্রেম আসবে এভাবে
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৬+৭
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৩৯ ( প্রথম অর্ধেক+শেষ অর্ধেক)
-
কমান্ডার তনয় জেইদি গল্পের লিংক
-
প্রেমতৃষা সারপ্রাইজ পর্ব
-
প্রেমতৃষা পর্ব ৪+৫
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ গল্পের লিংক
-
যেখানে প্রেম নিষিদ্ধ পর্ব ৪
-
প্রেমতৃষা পর্ব ২৫+২৬
-
প্রেম আসবে এভাবে পর্ব ৭
-
প্রেমতৃষা পর্ব ২৮