দিশেহারা (৬৬)
সানা_শেখ
“এই ডাইনির বাচ্চা, তোর কলিজা কত বড়ো? তুই আমার ফ্ল্যাটে থাকিস, আমার টাকায় খাস, আমার টাকায় পরিস, আর আমাকেই না খাইয়ে রেখেছিস সারাদিন ধরে, আবার আমার ফ্ল্যাট থেকে আমাকেই ঠেলে বের করে দিচ্ছিস এখন! তোর তো সাহস কম নারে!”
সোহা শ্রবণকে ঠেলে দরজা দিয়ে বের করে দিতে দিতে বলল,
“যা কিছু তোমার, সেসব কিছু আমার। এখন যাও, নামাজ আদায় করে এসো।”
শ্রবণের মুখের উপর দরজা লাগিয়ে দিলো সোহা। শ্রবণ হাঁ করে বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষন। এই ডাইনির বাচ্চার সাহস দিনদিন বেড়েই চলেছে। ওর ফ্ল্যাট থেকে ওকেই বের করে দিলো এভাবে! রাগে গজগজ করতে করতে লিফটের দিকে এগোল। ভাল্লাগেনা, কিচ্ছু ভাল্লাগেনা।
মাজেদা আন্টি ইফতারের সবকিছু রেডি করে দিয়ে চলে গেছেন আধা ঘণ্টা আগেই।
শ্রবণ কিছুক্ষণ আগে ফ্ল্যাটে ফিরেছে। সোহা ওকে ধরে টেনে নিয়ে ডাইনিং টেবিলের কাছে এগিয়ে এলো। শ্রবণ একটা চেয়ার টেনে ধপ করে বসে পড়ল। সোহা শ্রবণের পাশের চেয়ারটায় বসল।
ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখল আর পাঁচ মিনিট আছে।
শ্রবণ টেবিলের উপর রাখা সব খাবারের উপর নজর বোলাচ্ছে। তার মনে হচ্ছে এই সব খাবার সে একাই খেয়ে সাবার করে দেবে। এই টুকু শরবত দিয়ে তো ওরই হবে না, বরং কম পড়বে।
সোহা শ্রবণের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“দু’আ করো।”
শ্রবণ ঘাড় কাত করে তাকাল সোহার মুখের দিকে। ঘাড় সোজা করে দুই হাত তুলে ধরল সম্মুখে। শ্রবণকে এমন করতে দেখে সোহা মুচকি হাসল।
অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে মাইকে মাগরিবের আজান হলো। দুজন একসঙ্গে খেজুর খেয়ে ইফতার শুরু করল।
শ্রবণ নিজে খাওয়ার পাশাপাশি নিজ হাতে তুলে সোহাকেও খাওয়াল অনেক কিছু। সোহা নিজেও খাইয়ে দিয়েছে শ্রবণকে।
খাওয়া শেষ করে শ্রবণ টেবিলের উপর নজর বুলিয়ে বিস্ময় নিয়ে বলল,
“কী খেলাম? খাবার যেমন তেমনই তো রয়েছে, অথচ পেট ফেটে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়ে গেছে।”
“পানি আর শরবত খেয়েই তো অর্ধেক পেট ভরিয়েছো। তারাবি নামাজ আদায় করে এসে আবার খাবে, এখন যাও মাগরিবের নামাজ আদায় করে এসো।”
শ্রবণ দুদিকে মাথা নেড়ে বলল,
“আমি এখন রুমে যাব, ঠাস করে শুয়ে পড়ব, তারপর আর কিছু জানি না। ডোন্ট ডিস্টার্ব মি, ওকে? ওকে।”
শ্রবণ চেয়ার ছেড়ে উঠে বেডরুমের দিকে আগালে সোহা তার হাত টেনে ধরে দাঁড় করাল। জোর গলায় বলল,
“কোনো শোয়াশোয়ী নেই এখন, মাগরিবের নামাজ আদায় এসে শোবে, যাও মসজিদে।”
“কোত্থাও যেতে পারব না আমি। হাত ছাড়।”
“তিন ওয়াক্ত আদায় করেছো, আর দুই ওয়াক্ত আদায় করলে কী হবে? পাঁচ ওয়াক্ত পূরণ করো। যাও বাবুর আব্বু, নামাজ আদায় করে এসো।”
শ্রবণ তাকিয়ে রইল সোহার মুখের দিকে। সোহা তাড়া দিয়ে বলল,
“যাও না, নামাজ শেষ হয়ে যাবে তো।”
শ্রবণ ঘুরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। তার শরীর এখন আর চলছে না। শুতে পারলে এখন যে কত আরাম লাগত!
তারাবি নামাজ আদায় করে হেলে দুলে ফ্ল্যাটে প্রবেশ করল শ্রবণ। ভীষণ ক্লান্ত লাগছে, তারাবির নামাজ আদায় করতে গিয়ে আজ আধমরা অবস্থা। জীবনের প্রথম রোজা রেখেছে, টানা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেছে, আর তারাবির নামাজও আদায় করেছে। যত কষ্ট আর পরিশ্রমই হোক না কেন; মনের মধ্যে ভীষন শান্তি শান্তি অনুভব হচ্ছে, ভালো লাগছে। মসজিদের ফ্লোরেই ঘুমিয়ে যেতে ইচ্ছে করছিল, কি যে শান্তি লাগে মসজিদের ভেতরে! মসজিদে যেতে ইচ্ছে করে না, কিন্তু গেলে আবার বের হতে ইচ্ছে করে না। মসজিদে নামাজ আদায় করতে গিয়ে অপরিচিত অনেক মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে আজ।
বেডরুমে এসে পাঞ্জাবি পাজামা পরিবর্তন করে নিল। সোহা ওয়াশরুমে রয়েছে। শ্রবণ ফ্রেশ হবে, তাই সোহার বের হওয়ার অপেক্ষা করতে লাগল।
সোহা ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে শ্রবণকে দেখে মিষ্টি হাসল, বিনিময়ে শ্রবণ গম্ভীর হয়ে তাকিয়ে থেকে ওয়াশরুমে প্রবেশ করল।
ফ্রেশ হয়ে এসে দেখল সোহা রুমে নেই। রুম থেকে বেরিয়ে দেখল সোহা খাবার বাড়ছে প্লেটে। শ্রবণ কাছে এগিয়ে এসে এক গ্লাস পানি খেলো। রুমের দিকে পা বাড়িয়ে বলল,
“তুই খেয়ে আয়, আমি শুলাম।”
“শুলাম মানে কী? খাবে না? এই, কোথায় যাচ্ছো? দাঁড়াও, খেয়ে যাও।”
“খিদে নেই, খাব না। তুই খেয়ে আয়।”
“কটা ছোলা মুড়ি খেয়েই তোমার পেট ভরে গেছে? সারাদিন খাই খাই করে এখন না খেয়েই ঘুমাবে?”
শ্রবণ কিছু বলল না, সোজা রুমে ঢুকে গেল।
সোহা একটা প্লেটে একটি ভাজি নিল, আর একটু তরকারি নিল। এক হাতে প্লেট আরেক হাতে পানির জগ নিয়ে রুমে এলো। শ্রবণ শুয়ে পড়েছে। সোহা পানির জগ রেখে প্লেট হাতে নিয়ে শ্রবণের পাশে বসল। গায়ে ধাক্কা দিয়ে ডেকে বলল,
“ওঠো, খাও।”
শ্রবণ তাকাল, ঠান্ডা গলায় বলল,
“আমার খিদে নেই। তুই খা, তারপর ঘুমা।”
“সারাদিন না খিদে পেয়েছে খিদে পেয়েছে গান করলে, এখন খিদে কোথায় গেল? অল্প খাও, ওঠো।”
“আমার সত্যিই খিদে নেই, বিরক্ত না করে নিজে খেয়ে ঘুমা। আমার ঘুম পেয়েছে। তারাবির নামাজ পড়ার সময় সেজদা দিয়ে আর উঠতে ইচ্ছে করেনি, ইচ্ছে করছিল ওভাবেই ঘুমিয়ে পড়ি।”
“ওঠো আমি খাইয়ে দিচ্ছি, তুমি না খেয়ে ঘুমালে আমি শান্তি পাব না।”
শ্রবণ তাকিয়ে রইল সোহার মুখের দিকে। সোহা শ্রবণের গালে এক হাত রেখে বলল,
“ওঠো, আমি খাইয়ে দিব।”
শ্রবণ শোয়া থেকে উঠে বসল। সোহা ভাত মেখে শ্রবণের মুখে পুরে দিল। শ্রবণ চিবুতে চিবুতে বলল,
“তুইও খা, আমি এত খাব না।”
শ্রবণকে খাওয়াতে খাওয়াতে সোহা নিজেও খেতে লাগল। ওরো ক্লান্ত লাগছে, ঘুম পাচ্ছে, তেমন একটা খেতেও ইচ্ছে করছে না।
খাওয়া শেষ করে সোহা বাড়তি সব খাবার ঢেকে রেখে এলো। আবার ফ্রেশ হয়ে এসে লাইট অফ করে শুয়ে পড়ল শ্রবণের বুকে মুখ গুঁজে। শ্রবণ যত্নের সঙ্গে আগলে নিল, ললাটে ওষ্ঠ ছুঁইয়ে দিলো গভীরভাবে।
**********
আজ দ্বিতীয় রোজা। জোহরের নামাজ আদায় করে ফ্ল্যাটে ফিরল শ্রবণ। কচ্ছপের গতিতে রুমে এসে দেখল সোহা কুরআন শরীফ তেলাওয়াত করছে। শ্রবণ এগিয়ে এসে সোহার পাশে বসে পড়ল। শ্রবণ লাস্ট কবে কুরআন শরীফ তেলাওয়াত করেছিল ওর মনে পড়ছে না। হাই স্কুলে থাকা কালীন বোধহয় তেলাওয়াত করা হয়েছিল শেষবার। সেভেনে উঠার পর সামাদ চৌধুরী একজন হুজুরকে দিয়ে কুরআন শরীফ তেলাওয়াত আর নামাজ আদায় করা শিখিয়েছিলেন। বাকি তিন নাতি-নাতনিকেও উনিই নিজ দায়িত্বে হুজুর রেখে কুরআন শরীফ তেলাওয়াত, আর নামাজ আদায় করা শিখিয়েছেন। ছেলে আর ছেলের বউরা তো শুধু একাডেমিক পড়াশোনা করাতেই ব্যস্ত, দ্বীনের দিকে তাদের কোনো ধ্যান জ্ঞান নেই। সামাদ চৌধুরী হাজারবার বলেও ছেলে আর ছেলের বউদের দ্বীনের পথে নিয়ে আসতে পারেন না। নামাজ কালামের প্রতি কেউ ঝোঁকে না, দ্বীনের পথে এক পা আগায় না। যার যার কবরে সে সে যাবে, উনি শুধু নিজের দায়িত্ব পালন করেন।
সোহা কুরআন তেলাওয়াত শেষ করে সামনে থেকে পাশে সরিয়ে রাখল। শ্রবণের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“কী হয়েছে?”
“ভাল্লাগেনা।”
“কী করলে ভাল্লাগবে?”
“জানি না।”
সোহা মুচকি হাসল। শ্রবণের হাত ধরে টেনে এনে নিজের উঁচু পেটের উপর রেখে বলল,
“বাবু তোমাকে ডাকছে, তুমি কথা বলার পর থেকে নড়তে শুরু করেছে।”
শ্রবণ খুশি হলো সোহার কথা শুনে। পেটের উপর হাত বুলিয়ে ঝুঁকে চুমু খেলো। পেটের সঙ্গে গাল ঠেকিয়ে সুন্দর করে মিষ্টি স্বরে ডাকল,
“আব্বু, ও আব্বু।”
বাচ্চাটা আরো নড়ে উঠল মায়ের পেটের ভেতর। পেটের একদিকে কিছুটা উঁচু হয়ে উঠল। শ্রবণ ওষ্ঠের গভীর ছোঁয়া দিলো সেখানে।
সোহার উরুর উপর মাথা রেখে শুয়ে পড়ল। উঁচু পেটের উপর হাত বোলাতে বোলাতে কথা বলতে শুরু করল নিজের অনাগত সন্তানের সঙ্গে।
সোহা শ্রবণের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে পলকহীন। শ্রবণ যখন খুশি থাকে, হাসে তখন তাকে কতই না সুন্দর লাগে দেখতে! কথা বলতে বলতে একটু পর পর চুমু খাচ্ছে পেটে।
আগের শ্রবণ আর এই শ্রবণের মধ্যে কত পার্থক্য, আকাশ পাতাল ফারাক। সেই বদ রাগী, খিটখিটে মেজাজের শ্রবণ চৌধুরী হারিয়ে যাচ্ছে দিনদিন।
সোহা শ্রবণকে ভালো রাখতে চায়, আরো বেশি ভালো রাখতে চায়। আর কোনোদিন কোনো দুঃখ কষ্ট শ্রবণকে আর স্পর্শ না করুক। শ্রবণ সারা জীবন এমনই হাসি খুশি থাকুক, ভালো থাকুক, আর ওকে ভালোবাসে বাকি জীবন ভালো রাখুক।
**********
আজ তৃতীয় রোজা। শ্রবণ ব্যালকনিতে বসে বসে নিজেদের সন্তানের জন্য কাঁথা সেলাই করছে মনোযোগ দিয়ে। শুয়ে বসে কোনোভাবেই ওর সময় পার হচ্ছিল না, কোনকিছুতে মনও বসছিল না। বাইরে গিয়েও ভালো লাগছিল না তাই ফিরে এসেছে। এখন ব্যালকনিতে বসে কাঁথা সেলাই করছে আর ঝিরিঝিরি হাওয়া খাচ্ছে।
সোহা জোহরের নামাজের পর ঘুমিয়ে পড়েছে। শ্রবণ তিনটার দিকে ফ্ল্যাটে ফিরে এসেই দেখেছে সোহা ঘুমিয়ে গেছে।
ফোনের ভাইব্রেশনের শব্দে মনোযোগে বিঘ্ন ঘটে। পাশে থাকা ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখল ভিডিও কল। রিসিভ করে পুনরায় কাঁথা সেলাই করতে ব্যস্ত হলো। একে একে গ্রুপ কলে জয়েন করল ছয় বন্ধু। হাসান বলল,
“শ্রবণ, কই তুই? তোকে দেখা যাচ্ছে না কেন?”
শ্রবণ ফোনের স্ক্রিনে ঝুঁকে বলল,
“আছি এখানেই।”
“কী করছিস?”
“কাঁথা সেলাই।”
“কী?”
“কাঁথা সেলাই করি।”
“কিহ! কাঁথা সেলাই? তাও তুই করছিস?”
সিফাতের কথা শুনে শ্রবণের কপালে কয়েক ভাঁজ পড়ল। গম্ভীর গলায় বলল,
“হ্যাঁ, আমিই করছি। এভাবে রিঅ্যাক্ট করার কী হয়েছে?”
“ভাই, তুই সত্যি সত্যিই কাঁথা সেলাই করছিস?”
“হ্যাঁ।”
“দেখি।”
শ্রবণ কাঁথাটা ফোনের সামনে ধরল। রাফি বলল,
“এভাবে ভালোভাবে দেখা যাচ্ছে না, অন্যভাবে দেখা।”
শ্রবণ ফোন হাতে নিয়ে ব্যাক ক্যামেরা দিয়ে ভালোভাবে দেখল কাঁথাটা। কেউ বিশ্বাসই করছে না কাঁথা শ্রবণ সেলাই করেছে বা করছে। শ্রবণের মতো মানুষ করবে কাঁথা সেলাই এটা তাদের অসম্ভব বলেই মনে হচ্ছে। হাসান তো রীতিমতো হাঁ হয়ে তাকিয়ে আছে ফোনের স্ক্রিনে। সে নিজের চোখ-কান কোনটাকেই বিশ্বাস করতে পারছে না। সাকিব জোর দিয়ে বলল,
“এই কাঁথা তুই সেলাই করিসনি তাতে আমি শিওর।”
“আমি না করলে কে করেছে?”
“ভাবি বা অন্য কেউ।”
“এখানে তোর ভাবি আছে? আমি ফ্ল্যাটে ফিরেই দেখেছি সে ঘুমিয়ে আছে, এখন পর্যন্ত ঘুমেই রয়েছে। এটা আমিই সেলাই করেছি।”
“আমাদের সামনে কর, কীভাবে করিস আমরাও দেখি।”
শ্রবণ ফোনটা খাড়া করে রেখে বন্ধুদের দেখিয়ে দেখিয়ে সেলাই করতে লাগল। সবাই যখন দেখল শ্রবণ সত্যি সত্যিই সেলাই করছে তখন একেকজনের চেহারা দেখার মতো হয়েছে। সকলের চোখ ছানাবড়া, মুখ নিজে থেকেই হাঁ হয়ে গেছে।
সকলের চেহারা দেখে শ্রবণ হাসল। সিফাত বলল,
“বন্ধু, এসব কী? তুই মহিলা মানুষের কাজ কেন করছিস? তুই রান্না করেছিস ঠিক আছে, তাই বলে কাঁথা সেলাই!”
রাফি বলল,
“ভাইরে ভাই, শ্রবণের ইউটিউব সার্চ হিস্ট্রি দেখে হাসতে হাসতে সেদিন আমার পেট ফেটে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়ে গিয়েছিল। সাধারণত মানুষ সার্চ দেয় শিং মাছ কা’টার নিয়ম বা পদ্ধতি। আর শ্রবণ কী লিখে সার্চ দিয়েছিল, শিং মাছ কা’টার রেসিপি!”
রাফির কথা শুনে বাকি চারজন হা হা করে হেসে উঠল, সঙ্গে রাফি নিজেও।
শ্রবণ গম্ভীর গলায় বলল,
“আমি যাই লিখে সার্চ দিই না কেন, সঠিক ভিডিও-ই তো সামনে এসেছিল।”
সাকিব বলল,
“পেঁয়াজ কীভাবে কা’টবে এটাও ইউটিউব থেকে ভিডিও দেখে কে’টেছে। ধনেপাতা কতটুকু সাইজ করে কা’টবে এটাও ভিডিও দেখে কে’টেছে।”
রাফি আবার বলল,
“ভাইরে ভাই, শ্রবণের সার্চ হিস্ট্রির কথা স্মরণ হলে এখনো আমার কি যে হাসি পায়! শ্রবণ ভাই, তুই বিয়ে করে কি থেকে কি হয়ে গেলি!”
শ্রবণ আগের চেয়েও গম্ভীর হয়ে বলল,
“কী হয়েছি?”
সিফাত ফট করে বলল,
“বউ পাগল হয়ে গেছিস। বলেছিলি জীবনে বিয়ে করবি না, কিন্তু সবার আগে তুই বিয়ে করেছিস। বলেছিলি জীবনে বউকে ছুঁবি না, অথচ কিছুদিন পর তোর ছেলে আমাদের কোলে মুতবে। আগে তোকে ঠেলেঠুলে ফ্ল্যাটে পাঠানো যেত না, অথচ এখন তুই ফ্ল্যাট থেকে বের হতে চাস না, হলেও তোর মন আর আত্মা ফ্ল্যাটেই রেখে আসিস, বাইরে এসে ছটফট করতে করতে কিছুক্ষণ পরেই আবার ফ্ল্যাটে ফিরে যাস। কেন এমন করিস? কারণ ওখানে তোর বউ আছে। আর বউয়ের জন্য কেন এমন করিস? কারণ তুই এখন বউ পাগল।”
শ্রবণ কিছু না বলে কল কে’টে দিলো। ওকে বউ পাগল বলল! ও বউ পাগল? রোজা রেখেছে তাই বকা দিতে পারল না। দাঁতে দাঁত চেপে কাঁথা সেলাই করতে মনোযোগী হলো।
**********
আজ সেহরির সময় শ্রবণ ভাত রান্না করেছিল।
সোহার ঘুম ভেঙেছিল শ্রবণের ডাকে। ঘুম থেকে জেগে ফোনে সময় দেখে উতলা হয়ে উঠেছিল সোহা। ভোর চারটার উপর বেজে গেছে, রান্না করবে কখন, খাবে কখন? অ্যালার্ম কেন বাজেনি? শ্রবণ শান্ত করেছিল সোহাকে। এলোমেলো চুলগুলো ঠিক করে দিতে দিতে বলেছিল,
“এত উতলা হচ্ছিস কেন? শান্ত হ। অ্যালার্ম আমি বন্ধ করে রেখে গিয়েছিলাম। রান্না করেছি, টেবিলও সাজিয়েছি। তুই ফ্রেশ হয়ে আয়, খাব।”
সোহা বিস্মিত হয়ে কিছুক্ষন তাকিয়ে ছিল শ্রবণের মুখের দিকে।
রাতের ঘটনা স্মরণ করে মুচকি হাসল সোহা। চুল থেকে টাওয়েল খুলে মেলে দিয়ে ব্যালকনি থেকে রুমে ফিরে এলো। সাড়ে বারোটা বেজে গেছে। শ্রবণ কোথায় গেছে? ফিরছে না কেন এখনো?
শ্রবণ ফ্ল্যাটে ফিরল, একটা কাজে বেরিয়েছিল সকাল আটটায়। বেডরুমে না গিয়ে প্রথমে এলো রান্নাঘরে। ফ্রিজ খুলে একটা এক লিটার পানির বোতল বের করল। ছিপি খুলে অর্ধেকের বেশি পানি খেয়ে বোতলটা আবার ফ্রিজে রেখে বেডরুমে এলো। শ্রবণকে দেখে সোহা বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। কাছে এগিয়ে এসে বলল,
“কোথায় গিয়েছিলে?”
“একটা কাজ ছিল।”
“রোজা রেখে এই রোদের মধ্যে কীসের কাজ করতে গেছো?”
“এই সোহা!”
শ্রবণের এমন ডাক শুনে হকচকিয়ে গেল সোহা। উদ্বিগ্ন হয়ে বলল,
“কী হয়েছে?”
“সর্বনাশ হয়ে গেছে! আল্লাহ, কী করলাম!”
“আরে কী হয়েছে বলবে তো! এমন করছো কেন?”
“আমি যে রোজা রেখেছি সেটা ভুলেই গিয়েছিলাম। বাইরে থেকে এসে হাফ লিটারের বেশি পানি খেয়ে ফেলেছি।”
“মনের ভুলে?”
“হ্যাঁ। এখন কী হবে? আমার রোজা, আআআ!”
“কিচ্ছু হবে না। মনের ভুলে খেলে রোজা ভাঙে না।”
“মনের ভুলে খেলে রোজা ভাঙে না?”
“না।”
“কে বলেছে তোকে?”
“দাদা ভাই, তারপর অনেক হুজুরের কাছেও শুনেছি। আমার কথা বিশ্বাস না হলে ইউটিউবে দেখো।”
শ্রবণ প্যান্টের পকেট থেকে ফোন বের করে ইউটিউব ওপেন করল। কয়েকজন বড়ো বড়ো হুজুরের বক্তব্য শুনল। কলিজাটা ঠাণ্ডা হলো।
ফোন রেখে টাওয়েল হাতে ওয়াশরুমে প্রবেশ করল দ্রুত, নামাজের সময় হয়ে আসছে।
মাজেদা আন্টি রান্না করছেন। শ্রবণ রান্নাঘরে প্রবেশ করল। আন্টির দিকে তাকিয়ে বলল,
“আন্টি, আমি আজকে আপনাকে রান্নায় সাহায্য করব।”
মাজেদা আন্টি অবাক হয়ে তাকালেন শ্রবণের দিকে। শ্রবণ বলল,
“কী কী করতে হবে, আন্টি?”
“কিচ্ছু করতে হবে না, বাবা। তুমি গিয়ে বিশ্রাম নাও।”
“অনেক বিশ্রাম নিয়েছি। এই ডাল কী করবেন?”
“বড়া ভাজব।”
“এভাবেই?”
“না। ব্লেন্ডারে ব্লেন্ড করতে হবে আগে।”
“আচ্ছা তাহলে আমি ব্লেন্ড করে দিচ্ছি। ব্লেন্ডার কোথায়?”
“তোমাকে করতে হবে না, আমি করে নিব।”
“রোজ তো আপনিই করেন, আজ নাহয় আমিও একটু করি। বলুন ব্লেন্ডার কোথায়।”
“ওই তো ওখানে।”
শ্রবণ ব্লেন্ডার হাতে নিয়ে বলল,
“এটার লাইন কোথায় লাগাব।”
মাজেদা আন্টি হাত দিয়ে দেখিয়ে দিলেন। শ্রবণ ব্লেন্ডারের প্লাগ ইন করে ডালের বাটি হাতে নিয়ে বলল,
“ডাল ধুতে হবে?”
“হ্যাঁ।”
শ্রবণ ডালগুলো ভালোভাবে ধুয়ে নিল। ধোয়া শেষে ব্লেন্ডারে দিয়ে ব্লেন্ডার অন করতেই ভয় পেয়ে ব্লেন্ডার ছেড়ে “আআহ” বলে লাফিয়ে পিছিয়ে গেল কয়েক হাত। ওকে এভাবে ভয় পেতে আর লাফিয়ে সরে যেতে দেখে সোহা আর মাজেদা আন্টি হা হা করে হেসে উঠলেন। নিজের কাণ্ডে শ্রবণ নিজেও হাসল। ব্লেন্ডার আচমকা যেভাবে শব্দ করে উঠেছে, শ্রবণ ভয়ই পেয়ে গিয়েছিল। হাসতে হাসতে ব্লেন্ডারের কাছে এগিয়ে এসে অফ করে। সোহা আর মাজেদা আন্টি হাসতে হাসতে নিচে বসে পড়েছেন।
শ্রবণ চোখ দুটো সরু করে দুজনকে দেখে। এভাবে হাসার কী হয়েছে? ও কি জানতো নাকি ব্লেন্ডার এভাবে শব্দ করে উঠবে? এর আগে তো কেউ ওর সামনে ব্লেন্ডার অন করেনি। জীবনের প্রথম ব্লেন্ডার অন করেছে, ভয় পাওয়াটা কী অস্বাভাবিক? পুনরায় ব্লেন্ডার অন করে ডাল ব্লেন্ড করতে শুরু করল।
চলবে………..
Share On:
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দিশেহারা পর্ব ১২
-
দিশেহারা পর্ব ৫৮
-
দিশেহারা পর্ব ৪
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ১৪
-
দিশেহারা পর্ব ৫১
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ১২
-
দিশেহারা পর্ব ৪৬
-
দিশেহারা পর্ব ৫০
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ১৩
-
দিশেহারা পর্ব ৩৫