Golpo কষ্টের গল্প রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র

রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৪৯


রোদ্দুরেরছেঁড়ামানচিত্র

পর্ব_৪৯

নিলুফানাজমিননীলা

★★★
তৃণা আর আরিয়ান রুম থেকে বের হওয়ার জন্য পা বাড়াতেই দরজার সামনে রিনিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তারা থমকে গেল। রিনি কিছু বলার সুযোগ পাওয়ার আগেই তৃণা সৌজন্যের খাতিরে মুখে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বলল,
“আপু, ভেতরে আসো।”

​রিনি একটা শুকনো হাসি হাসতে চাইল, কিন্তু পারল না। তার চোখেমুখে অপরাধবোধ স্পষ্ট। আরিয়ান রিনিকে দেখে কোনো কথা বলল না, তার গম্ভীর মুখভঙ্গি অপরিবর্তিত রইল। সে রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় তৃণার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে সতর্ক করে দিল,
“কোনো সমস্যা হলে আমাকে ডাকবে। এই রিনা খান মেয়েটাকে আমার একদম বিশ্বাস হয় না।”

​তৃণা ভ্রু কুঁচকে ফিসফিসিয়েই প্রতিবাদ করল,
“কিসের রিনা খান? ওর নাম রিনি!”

​আরিয়ান আর কোনো তর্কে না গিয়ে গটগট করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। তৃণা তখন রিনিকে ইশারা করে বলল,
“দাঁড়িয়ে থেকো না আপু, বসো।”

​রিনি বসল না,বরং হঠাৎ এগিয়ে এসে আকস্মিকভাবে তৃণাকে জড়িয়ে ধরল। তৃণা এই অভাবনীয় আচরণে একদম হকচকিয়ে গেল। তাদের জীবনে কোনোদিন এমন মুহূর্ত আসেনি। রিনি সারাজীবন তার মা রৌশনারা বেগমের প্রশ্রয়ে বড় হয়েছে এবং তৃণার প্রতি মায়ের অন্যায়ে মৌন সায় দিয়েছে। তবে আজ রিনির শরীরের কাঁপন আর এই আলিঙ্গনে তৃণা এক অদ্ভুত স্বস্তি অনুভব করল। সে আলতো করে জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে আপু?”

​রিনি এবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে তৃণার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিল। তার গলা কান্নায় ভেঙে আসছিল,
“সরি তৃণা! আমি সত্যিই জানতাম না আমার মাম্মি আর মামা মিলে তোর সাথে এতটা নিচে নামতে পারে। জানি, তোর কাছে ক্ষমা চাওয়ার মতো মুখ আমার নেই। আসলে আমার জীবনটাই যেন ওই সমুদ্রের মতো গতিহীন হয়ে গেছে, আমি ভালো-মন্দের পার্থক্যটাই বুঝতে পারিনি এতদিন।”

​তৃণা বড় মনের পরিচয় দিয়ে রিনির কথা থামিয়ে দিল,
“বাদ দাও সেসব আপু। যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। আজ থেকে প্রায় চার বছর আগের সেই ক্ষত নিয়ে আর পড়ে থাকতে চাই না।”

​রিনি চোখ মুছে নিজেকে কিছুটা সামলে নিল। এদিকে রুমের বাইরে আরিয়ান দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে মোবাইল স্ক্রল করছিল। এমন সময় সেখানে নুসরাত এল, আর তার আঙুল ধরে আছে ছোট্ট তূর্ণা। তূর্ণা মিষ্টি করে জিজ্ঞেস করল,
“ আন্টি কোথায়?”

​আরিয়ান তূর্ণার গোলগাল গালে আঙুল দিয়ে একটু আদর করে দিয়ে বলল,
“ভেতরে আছে মামণি।”

​তূর্ণা ভেতরে যেতে চাইলে নুসরাত তাকে বাধা দিয়ে বলল,
“তূর্ণা যেও না! তোমার তৃণা আন্টি এখন তার বোনের সাথে জরুরি কথা বলছে। সেখানে যাওয়া ঠিক হবে না।”

​কিন্তু ছোট্ট তূর্ণা আজ কারো বারণ মানতে নারাজ। সে নুসরাতের হাতের বাঁধন ছাড়িয়ে এক দৌড়ে রুমের ভেতরে ঢুকে পড়ল। ঢুকেই সে তার চেনা স্বরে ডাকল,
“আন্টি!”

​তৃণা তূর্ণার কণ্ঠ শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। একই সাথে রিনিও কৌতূহলী চোখে ছোট্ট মেয়েটির দিকে তাকাল।
হঠাৎ করেই ছোট তূর্ণার সেই চঞ্চল হাসি মুখটা থমকে গেল। এক অদ্ভুত উত্তেজনায় বাচ্চাটার ছোট্ট শরীরটা কাঁপতে শুরু করল।তূর্ণা তৃণাদের দিকে দৌড়ে যেতে লাগল।
তৃণা ভাবল তূর্ণা হয়তো তার কাছেই আসছে, কিন্তু সবাইকে চমকে দিয়ে তূর্ণা দৌড়ে গিয়ে রিনিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল।
​রিনি আর তৃণা একে অপরের দিকে চরম বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইল। রিনি বরাবরই আত্মকেন্দ্রিক, নিজের স্বার্থ ছাড়া সে কোনোদিন অন্য কারো প্রতি, এমনকি বাচ্চাদের প্রতিও মমতা দেখায়নি। নুসরাত এই দৃশ্য দেখে ঘরে ঢুকল এবং সেও থমকে দাঁড়াল। তূর্ণার এমন আচরণে সেও হতবাক।

​রিনি বেশ অপ্রস্তুত বোধ করল। বাচ্চাটা তার পা জড়িয়ে ধরে ছাড়ছেই না। অবশেষে রিনি অনিচ্ছাসত্ত্বেও ফ্লোরে হাঁটু গেড়ে তূর্ণার সমান হয়ে বসল। বাচ্চাদের কীভাবে সামলাতে হয় তা রিনির জানা নেই, তবুও সে শুকনো গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে তোমার? কাঁদছো কেন?”

​সবাইকে পাথরের মতো স্তব্ধ করে দিয়ে তূর্ণা ভাঙা গলায় বলে উঠল,
“আম্মু!”

​বলেই সে আবার রিনির গলা জড়িয়ে ধরল। রিনি পুরোপুরি হতভম্ব। তৃণা আর নুসরাত যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। বাচ্চাটা পরম মমতায় রিনিকে আঁকড়ে ধরে থাকলেও রিনি তাকে একটু আদর করে জড়িয়ে ধরল না। তার পাথরের মতো নির্লিপ্ততা দেখে নুসরাতের মনে একরাশ তিক্ততা জন্ম নিল। সে একরকম জোর করেই তূর্ণাকে রিনির কাছ থেকে ছাড়িয়ে নিল।
​তূর্ণা কিন্তু নাছোড়বান্দা। সে নুসরাতের কোল থেকে বারবার রিনির দিকে হাত বাড়িয়ে চিৎকার করে বলতে লাগল,
“ওটা আমার আম্মু! আমার আম্মু!”

​নুসরাত তূর্ণাকে শান্ত করার চেষ্টা করে বলল,
“ছিঃ মামণি, ও তো তোমার আম্মু নয়। ভুল করছো তুমি।”

তূর্ণা চোখের জল মুছে জেদি গলায় বলল,
“আমি জানি! আমি আমার আম্মুর ছবি দেখেছি। ওটাই আমার আম্মু!”

​নুসরাত এই কথা শুনে বড় এক ধাক্কা খেল। তূর্ণা নির্জনের কাছের বন্ধু #মেহরাব_দেওয়ানের মেয়ে। জন্মের সময় নিজের মাকে হারিয়েছিল এই ছোট্ট মেয়েটি। মেহরাব তিনদিনের জন্য জরুরি কাজে শহরের বাইরে যাওয়ায় তূর্ণাকে নুসরাতের কাছে রেখে গিয়েছিল। নুসরাত কোনোদিন মেহরাবের মৃত স্ত্রীর ছবি দেখেনি, তাই মেহরাবের স্ত্রীর সাথে রিনির কোনো মিল আছে কি না তা সে জানে না।

রিনি তূর্ণার সেই আকুল ‘মা’ ডাককে খুব একটা গুরুত্ব দিল না। হয়তো সে ভেবেছে বাচ্চাটা ভুল করে কাউকে দেখে মা বলছে। রিনি স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে শান্ত গলায় বলল,
“আচ্ছা বোন, অনেকটা রাত হয়েছে, এবার আমি আসি।”

​তৃণা অবাক হয়ে রিনির হাত ধরে ফেলল। সে উদ্বেগের সাথে বলল,
“যাবে মানে? কোথায় যাবে এই মাঝরাতে? তুমি কি পাগল হয়েছো? ওই মামার বাড়িতে তো আর ফিরে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।”

​রিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“না রে, ওই বাড়িতে আর কোনোদিন ফিরে যাব না। তবে আমার থাকার একটা ব্যবস্থা আছে।”

​তৃণা কিছুক্ষণ চুপ থেকে আমতা আমতা করে বলল,
“আব্বুর কাছে থাকবে? আব্বু নিশ্চয়ই তোমাকে ফিরিয়ে দেবেন না।”

​রিনির গলায় এবার অপরাধবোধ আর কান্নার সুর স্পষ্ট হয়ে উঠল। সে ধরা গলায় বলল,
“না তৃণা, বাবার কাছে কোন মুখ নিয়ে হাজির হব? সারাজীবন ওনার সাথে আর তোর সাথে যা করেছি, তারপর ওনার সামনে দাঁড়ানোর সাহস আমার নেই।”

​তৃণা চিন্তিত হয়ে আবার জিজ্ঞেস করল,
“তাহলে কোথায় থাকবে তুমি একা একা?”

​রিনি একটু ম্লান হেসে জানাল,
“শহরের এক কোণে আমার নামে ছোট একটা ফ্ল্যাট আছে। ওটা আমি নিজের উপার্জনের টাকা জমিয়েই কিনেছিলাম। আপাতত ওটাই আমার ঠিকানা।”

​তৃণা বড় বোনের হাত ছাড়তে চাইছিল না। সে মায়ার সাথে বলল,
“আপু, তুমি চাইলে আমাদের এই বাড়িতেই থাকতে পারো। আরিয়ান নিশ্চয়ই কিছু বলবে না।”

​রিনি এবার ম্লান হেসে মাথা নাড়ল। সে বলল,
“না , এখানে থাকা যায় না। নিজের পাপের বোঝা নিয়ে কারো ঘাড়ে চেপে থাকা ঠিক হবে না। আমি ওই ফ্ল্যাটেই ঠিক থাকব।”

​তৃণা নাছোড়বান্দার মতো বলল,
“ঠিক আছে, তুমি তোমার ফ্ল্যাটেই থেকো। কিন্তু এখনই যাওয়ার কোনো দরকার নেই। অন্তত খেয়েদেয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে তারপর যেও। আমি তোমাকে খালি পেটে যেতে দেব না।”
​রিনি প্রথমে মানা করতে চাইলেও তৃণার জেদ আর ভালোবাসার কাছে শেষ পর্যন্ত হার মানতে বাধ্য হলো।
★★★
আদনান সোফায় আয়েশ করে বসে টিভিতে উত্তেজনাকর ক্রিকেট খেলা দেখছে। প্রতিটা চার বা ছক্কার সাথে সাথে সে খুশিতে সোফা ছেড়ে লাফিয়ে উঠছে আর চিৎকার করছে। তার ঠিক পাশের সোফাটায় নিঃশব্দে বসে আছে নৌশি। আদনানের পুরো ধ্যানজ্ঞান টিভির পর্দায় থাকলেও নৌশির নিবদ্ধ দৃষ্টি আটকে আছে আদনানের ওপর। ওর প্রতিটি পাগলামি আর ছেলেমানুষি দেখে নৌশির ঠোঁটের কোণে বারবার আনমনেই মুচকি হাসি ফুটে উঠছে।
​ঠিক সেই মুহূর্তে নৌশিকে অবাক করে দিয়ে আদনান টিভির দিকে তাকিয়ে থেকেই বলে উঠল,
“এভাবে তাকিয়ে থাকিস না নাদান! চোখ দিয়ে কি জ্যান্ত গিলে খাবি নাকি?”

​আদনানের এমন অতর্কিত মন্তব্যে নৌশি পুরোপুরি হকচকিয়ে গেল। অথচ আদনান তো এতক্ষণ এক পলকও টিভির বাইরে তাকায়নি! তবে ও বুঝল কী করে যে নৌশি ওর দিকেই তাকিয়ে ছিল? তার মানে কি আড়াল থেকে আদনানও ওকে লক্ষ্য করছিল?
​নৌশি নিজের অপ্রস্তুত ভাবটা ঢাকার জন্য গলায় জোর এনে নাক কুঁচকে বলল,
“তোর যা চেহারা! তোকে আবার দেখার কী আছে শুনি? খেয়েদেয়ে কি আমার আর কোনো কাজ নেই?”

​আদনান এবার টিভির রিমোটটা পাশে রেখে বাঁকা হেসে শার্টের কলারটা একটু ঝাকিয়ে নিল। আত্মবিশ্বাসী সুরে বলল,
“শুধু যে দেখছিলি তা কিন্তু নয়, সাথে আবার মুচকি মুচকি হাসছিলি। বল তো, এই অসময়ে মুচকি হাসা কিসের লক্ষণ?”

​নৌশি ভ্রু কুঁচকে পালটা প্রশ্ন করল,
“কিসের লক্ষণ?”

​“ঘোরতর প্রেমের লক্ষণ!” আদনানের কণ্ঠে এক চিমটি দুষ্টুমি।

​কথাটা শুনে নৌশির হৃৎপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,
“তোর মতো এই আদু ভাইয়ের প্রেমে কে পড়বে শুনি? যার শরীর থেকে চব্বিশ ঘণ্টা ছাগলের গন্ধ আসে!”

​আদনান এবার সিরিয়াস হয়ে সোজা হয়ে বসল। অপমানে ওর মুখ লাল হয়ে গেল। সে রাগে গরগর করতে করতে বলল,
“আর তোর শরীর থেকে পচা ব্যাঙের গন্ধ আসে।”

​নৌশি আর সহ্য করতে পারল না। হাতের কাছে থাকা সোফার কুশনটা সজোরে ছুঁড়ে মারল আদনানের দিকে। আদনানও দমে যাওয়ার পাত্র নয়, সেও তৎক্ষণাৎ অন্য একটা বালিশ তুলে নিয়ে নৌশিকে লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মারল।
মরিয়ম বেগম যখন এই লঙ্কাকাণ্ড দেখলেন, তিনি এক সজোরে ধমক দিলেন। মায়ের ধমক খেয়ে তাদের বালিশ ছোঁড়াছুঁড়ি থামল ঠিকই, কিন্তু আদনানের ভেতরের জেদটা যেন আরও চাড়া দিয়ে উঠল। সে দাঁতে দাঁত চেপে রিমোটটা উঁচিয়ে ধরল নৌশির দিকে,
​“মন চাচ্ছে তোর মাথায় এই রিমোটটা ছুঁড়ে মেরে মাথা ফাটিয়ে দিই, একদম ডিশের লাইনের মতো দুই টুকরো করে!”

​নৌশিও দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। সে সোফার হাতলে হাত রেখে বাঁকা হেসে জবাব দিল,
“আর আমার মন চাচ্ছে এই পুরো সেন্টার টেবিলটা তোর মাথায় ভেঙে গুঁড়িয়ে দিই।”

​আদনান হো হো করে অট্টহাসি দিয়ে উঠল। তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
“একটা চেয়ার যে মেয়ে এক হাত দিয়ে তুলতে পারে না, সেই মেয়ে কিনা এত বড় কাঠ আর কাঁচের টেবিল দিয়ে আমার মাথা ফাটাবে! স্বপ্ন দেখিস না নাদান, এত স্বপ্ন দেখা ভালো না।”

​আদনানের এই তাচ্ছিল্য আর হাসি নৌশির রাগের মাথায় যেন ঘি ঢেলে দিল। সে আর কথা না বাড়িয়ে এক ঝটকায় এগিয়ে এসে আদনানের ঘাড়ে শক্ত করে ধরে তার মাথাটা ‘ঠাস’ করে মারল নিচের টেবিলের সাথে। আকস্মিক এই ধাক্কায় আদনান হকচকিয়ে গেল, তার মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল কয়েক সেকেন্ডের জন্য।
​নৌশি এবার বিজয়ীর হাসি হেসে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“দেখলি? টেবিল না তুললেও টেবিলের সাথে তোর মাথাটা ঠুকে দিতে কিন্তু আমার গায়ে অনেক শক্তি। এরপরের বার থেকে এমন করলে সত্যি সত্যি মাথা ফাটিয়ে রক্ত বের করে দেব, আদুর বাচ্চা!”

​আদনান ব্যথায় কপাল ডলে রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠে দাঁড়াতেই নৌশি বুঝতে পারল আর এক মুহূর্ত এখানে থাকা মানেই বিপদ। সে উল্টো দিকে ঘুরে এক দৌড় লাগাল। আদনানও তার পেছনে তাড়া করতে করতে চিৎকার করে বলল,
​“নাদানের বাচ্চা! আজ তোকে হাতের মুঠোয় পেলে হয় তোর একদিন, না হয় আমার একদিন! দাঁড়া তুই, তোর ব্যাঙের মাথা আমি আজ সাইজ করছি!”
★★★
রুম থেকে বের হতে চাইল তৃণা, কিন্তু পারল না। আচমকা এক হ্যাঁচকা টানে সে আবারও রুমের ভেতরে ঢুকে গেল। পিঠটা গিয়ে ঠেকল শক্ত দেওয়ালের সাথে। আরিয়ান তার দুই বাহু শক্ত করে জাপটে ধরে দাঁড়িয়ে আছে, চোখেমুখে এক অদ্ভুত নেশা। তৃণা কিছুটা বিরক্ত হয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,
​“কী করছেন? এভাবে ধরেছেন কেন?”

​আরিয়ান ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত বাঁকা হাসিটা ফুটিয়ে তুলল। আলতো স্বরে বলল,
“কেন? ধরতে পারি না বুঝি?”

​“ছাড়ুন, লাগছে আমার,” তৃণা নিজেকে ছাড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা করল।

আরিয়ান জেদি গলায় বলল,
​“উহু, লাগছে না। তোমাকে ব্যথা দেওয়ার মতো করে আমি ধরিনি,”

​তবুও তৃণার মুখভঙ্গি দেখে আরিয়ান হাতের বাঁধনটা কিছুটা আলগা করল। তৃণার চঞ্চল দুচোখ তখন এদিক-সেদিক তাকাচ্ছে, যেন আরিয়ানের চোখের গভীরতা এড়িয়ে যেতে চায়। আরিয়ান তৃণার থুতনিটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে বলল,
“তাকাও শ্যামলিনী। আমার চোখের দিকে তাকাও।”

​তৃণা যেন কোনো এক সম্মোহনে আচ্ছন্ন হয়ে গেল। সে বাধ্য মেয়ের মতো আরিয়ানের চোখের মণির দিকে স্থির হয়ে তাকালো। আরিয়ান ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল,
“কী দেখতে পাও আমার চোখে?”

​তৃণা কিছুক্ষণ গভীর মনোযোগ দিয়ে আরিয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে গম্ভীর মুখে বলে উঠল,
“আপনার চোখের কোণায় ময়লা জমে আছে!”

​মুহূর্তেই সব রোমান্টিকতা বাতাসে মিলিয়ে গেল। আরিয়ান চরম অবাক হয়ে তৃণার হাত ছেড়ে দিয়ে পিছিয়ে এল। একরাশ অসহায়ত্ব নিয়ে বলল,
“শেষমেশ এই রোমান্টিক সময়ে তোমার চোখে ময়লাটাই ধরা পড়ল? ভালোবাসাটা দেখলে না?”

​তৃণা আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না, খিলখিল করে হেসে দিল। আরিয়ান আবারও তৃণার দিকে এগিয়ে এল। বিরক্তির ভান করে বলল,
“রোমান্টিক মুহূর্তগুলোতে ছাই ঢেলে দেওয়ার জন্য আমার বউটা সত্যিই সেরা!”

​তৃণা হাসতে হাসতেই বলল,
“এত রোমান্টিক হয়ে লাভ নেই সাহেব। আমি কিন্তু আপনাকে এখনো ক্ষমা করিনি।”

​আরিয়ান তৃণার দিকে তাকিয়ে আগের মতোই হাসল। কিন্তু পরক্ষণেই তার হাসিমাখা মুখটা গম্ভীর হয়ে উঠল। গলার স্বর ভারী করে সে বলে উঠল,

“তুমি বলো,তুমি বৃষ্টিকে ভীষণ ভয় পাও,
আকাশ ভাঙা শ্রাবণ দেখলে তোমার বুক কাঁপে।
আর আমি বলি আমি শুধু তোমাকেই ভালোবাসি,
কেবল ডরি তোমাকে হারিয়ে ফেলার হাহাকারে।
​তোমার ভয় আকাশ থেকে নামা জলরাশিকে ঘিরে,
আর আমার ভয় আমার পৃথিবীর একমাত্র পূর্ণিমাকে হারানোর ঘিরে।
কী অদ্ভুত এক বিষণ্ণ মিল আমাদের, তাই না?”

​আরিয়ানের এই গভীর কথাগুলো তৃণার হৃদয়ে গিয়ে বিঁধল। হাসিমুখটা পলকেই ম্লান হয়ে এল তার। আরিয়ানের চোখে সে আজ শুধু রাগ বা ভালোবাসা নয়, এক পাহাড়সম আকুতি দেখতে পেল।

চলবে…

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply