#অ্যাঞ্জেল_অ্যাঞ্জেলিনা
[পর্ব ৯৪]
#লেখিকা_ফারহানা_নিঝুম
( দূর্বল হৃদয়ের পাঠকদের জন্য গল্পটা একদম নয় এবং প্রাপ্তমনস্কদের জন্য উন্মুক্ত)
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)
[দ্বিতীয় খন্ড]
হন্তদন্ত পায়ে বেসমেন্টের দিকে ছুটে এলো আফরিদ এহসান। সিঁড়ির প্রতিটি ধাপে তার ভারী বুটের শব্দ যেন মৃত্যুর পূর্বাভাস হয়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল চারপাশে। বুকের ভেতর অজানা আশ’ঙ্কা ততক্ষণে বিষাক্ত সা’পের মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে বসেছে।
দরজাটা খুলতেই মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল সে।
ঘরটা সম্পূর্ণ ফাঁকা।
না, কেউ নেই। কোথাও কোনো শব্দ নেই। শুধু বরফশীতল মেঝের উপর ফোঁটা ফোঁটা জমাট বাঁধা রক্ত ছড়িয়ে আছে নিষ্ঠুর, ভয়াবহ, হৃদয়বিদারক বাস্তবতার মতো।
আফরিদের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। যেন কেউ ভেতর থেকে হৃদপিণ্ড ছিঁড়ে মুঠোয় চেপে ধরেছে। কাঁপতে থাকা পা দুটো নিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল সে। তারপর হঠাৎ সমস্ত শক্তি নিঃশেষ হয়ে যাওয়া মানুষের মতো ধপাস করে বসে পড়ল সেই শুকিয়ে আসা র’ক্তের সামনে।
তার দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল র’ক্তগুলোর দিকে।
এটা তার আয়াশের র’ক্ত। তার ছোট্ট সন্তানের। এহসান পরিবারের র’ক্ত। তার বুকের ভেতর বেড়ে ওঠা অস্তিত্বের শেষ চিহ্ন। চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এলো আফরিদের। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল পুরো পৃথিবীটা যেন তার বুকে চেপে বসেছে।
কিছুদূরে পড়ে থাকা ছোট্ট বাক্সটার দিকে দৃষ্টি পড়তেই কাঁপা হাতে সেটা তুলে নিল সে। ভেতরে একটি পেনড্রাইভ।
কয়েক মিনিট পর ভিডিও ফুটেজ চালু হতেই আফরিদের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সমস্ত নিষ্ঠুরতা, সমস্ত অন্ধকার, সমস্ত পৈশাচিক সত্তা মুহূর্তেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। স্ক্রিনে ফুটে উঠল বিভীষিকাময় দৃশ্য। এক আ’গুন্তক নারী আর নরখাদক আলিয়াজের পাশবিক উন্মাদনা।
ছোট্ট চার মাসের আয়াশ অসহায়ভাবে কাঁদছে। তার ক্ষুদ্র হাতদুটো বাতাসে ছটফট করছে। আর আলিয়াজ নির্মম হিংস্র’তায় শিশুটার কোমল শরীর খুবলে খুবলে ছিন্নভিন্ন করছে। আফরিদ আর দেখতে পারছিল না। তবুও চোখ সরাতে পারছিল না।
প্রতিটি দৃশ্য তার বুকের ভেতর ধারালো ছু’রির মতো বিদ্ধ হচ্ছিল। আয়াশের চোখদুটো যেভাবে আত’ঙ্কে উল্টে গিয়েছিল যন্ত্র’ণায় নিস্তেজ হয়ে আসা ছোট্ট শরীরটা যেভাবে কেঁপে উঠছিল সেই দৃশ্য একজন বাবাকে জীবন্ত কবর দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
হঠাৎ পুরো বেসমেন্ট কাঁপিয়ে বিকট চিৎকার করে উঠল আফরিদ।
সেই চিৎকার কোনো মাফিয়া কিংয়ের ছিল না সেটা ছিল এক ভেঙে পড়া বাবার আর্ত’নাদ।তার কণ্ঠ ছিঁড়ে যাচ্ছিল।
“পাপা আই অ্যাম সরি! পাপা তোমাকে বাঁচাতে পারলাম না আমি! আমার চ্যাম্প তুমি তো পাপার সবচেয়ে সাহসী বেবি ছিলে! তাহলে এভাবে আমাকে ছেড়ে গেলে কীভাবে?”
সে দু’হাতে শুকিয়ে যাওয়া র’ক্তগুলো তুলে নিজের বুকে মাখতে লাগল উন্মাদের মতো। যেন সন্তানের শেষ স্পর্শটুকু নিজের শরীরে ধরে রাখতে চাইছে।
“ক্ষমা করে দিও পাপা, প্লিজ ক্ষমা করে দিও! তোমার পাপা হেরে গেছে! এই পুরো আন্ডারওয়ার্ল্ড কাঁপানো মানুষটা নিজের সন্তানকেই বাঁচাতে পারল না!”
হাউমাউ করে কেঁদে উঠল আফরিদ এহসান।
আজ সেই কুখ্যাত মনস্টার মাফিয়া কিংয়ের চোখে জল। আজ তার নিষ্ঠুর হাত দুটো কাঁপছে। আজ তার সমস্ত ক্ষমতা, সমস্ত অস্ত্র, সমস্ত প্রতাপ এক মুঠো শুকিয়ে যাওয়া র’ক্তের সামনে পরাজিত।
তার মাথায় শুধু ন্যান্সির ভাঙা মুখটা ভেসে উঠছে।
রাতের পর রাত যে নারী পুতুলগুলো বুকে জড়িয়ে।
বলে কাঁদছে সে যদি জানতে পারে তার সন্তানের শেষ পরিণতি।
আফরিদের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল।সে বুক চাপড়ে চিৎকার করে উঠল,
“তোমার মাম্মা পাগল হয়ে যাচ্ছে তোমাকে ছাড়া, চ্যাম্প! আর আমি আমি একটা ব্যর্থ বাবা! আই অ্যাম অ্যা লুজার ড্যাড! আমি পারিনি তোমাকে প্রটেক্ট করতে!”
তারপর মাথা নিচু করে র’ক্তমাখা মেঝেতেই ভেঙে পড়ল আফরিদ।
সেই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর মানুষটাও কেবল এক অসহায় বাবা যে নিজের সন্তানের র’ক্ত বুকে নিয়ে কান্না ছাড়া আর কিছুই করতে পারছে না।
আলিয়াজ নেই কোথাও! সে ওই আলিয়াজকে সে জ’বাই করবে! সাথে সেই নারীকে টুকরো টুকরো করে তবেই তার র’ক্ত দিয়ে গোসল করবে।
****************
দু’টো দিন, মাত্র আটচল্লিশ ঘণ্টা! অথচ সময় যেন নির্মম নিষ্ঠুরতায় তাদের জীবন থেকে এক একটি যুগ ছিঁড়ে নিয়ে চলে গেল। চোখের পলকে পেরিয়ে যাওয়া এই দু’দিন ন্যান্সির কাছে ছিল এক অবিরাম দমবন্ধ অন্ধকারের নাম। ঘুমের ওষুধও তার ক্লান্ত চোখে সামান্য নিস্তব্ধতা নামাতে পারেনি; উন্মাদিনীর ন্যায় ছটফট করেছে সে প্রতিটি ক্ষণে।
এই দু’দিন উন্মত্তের মতো সমগ্র দেশ চষে বেড়িয়েছে আফরিদ। সাব্বির এহসানকে খুঁজে বের করার নেশায় নিজের সমস্ত ক্ষমতা, সমস্ত প্রভাব, সমস্ত অন্ধকার সাম্রাজ্যকে কাজে লাগিয়েও ব্যর্থ হয়েছে সে। আজ মাফিয়া পরিচয়টাও যেন উপহাস ছাড়া আর কিছু নয়! ক্ষমতা, প্রতিপত্তি সবকিছু অর্থহীন হয়ে দাঁড়িয়েছে তার কাছে।
চার মাসের ক্ষুদ্র আয়াশের অস্তিত্ববাহী প্রতিটি চিহ্ন বাড়ির আনাচে-কানাচে থেকে নির্মমভাবে মুছে ফেলা হয়েছে। ছোট্ট জামা, দুধের বোতল, খেলনা, নরম কম্বল সবকিছু নিজের হাতে সরিয়ে ফেলেছে আফরিদ। ন্যান্সি কেঁদেছে, অসহায়ের মতো ভেঙে পড়ে কেঁদেছে। তবুও আফরিদ একটিও জিনিস তার সামনে রাখেনি। কোথায় সরিয়েছে, সেটুকুও জানায়নি।
ন্যান্সি এখন প্রায় মানসিক বিপর্যয়ের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা এক বিধ্বস্ত নারী। গভীর রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায় তার; তারপর আয়াশের জন্য কিনে আনা পুতুলগুলো বুকে জড়িয়ে বসে থাকে দীর্ঘক্ষণ। কাঁপা কণ্ঠে ডেকে ওঠে
“আমার বাবা, আমার আয়াশ।”
সেই দৃশ্য সহ্য করার ক্ষমতা আফরিদের নেই। বুকের ভেতর তখন দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে অপরাধবোধ আর অসহায়তার আ’গুন। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসে, বুকের ভেতরটা অসহনীয় যন্ত্রণায় অবশ হয়ে যায়। তাইতো সে সমস্ত স্মৃতি সরিয়ে দিয়েছে কারণ স্মৃতিগুলো বেঁচে থাকলে, হয়তো তারা কেউই আর বেঁচে থাকতে পারত না।
****
ঘড়ির কাঁটা অবিরাম টিকটিক শব্দে নিস্তব্ধ রাতের বুক চিরে এগিয়ে চলেছে। চারদিকের থমথমে নীরবতা যেন অদৃশ্য কোনো অশুভ সংকেত বহন করছে। হঠাৎই ধড়মড়িয়ে উঠে বসে ন্যান্সি। বুকের ভেতর কেঁপে ওঠে অকারণ এক আশঙ্কা। পাশ ফিরতেই তার নিশ্বাস আটকে যায় বিছানার অপর প্রান্ত শূন্য! আফরিদ নেই।
ঘুমজড়ানো চোখ মুহূর্তেই আতঙ্কে তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। রাত তখন দেড়টা ছুঁইছুঁই। জানালার কাঁচে চাঁদের বিবর্ণ আলো লেপ্টে আছে, যেন মৃত কারও ফ্যাকাশে মুখ। ন্যান্সি ধীরে ধীরে বিছানা ছাড়ল। ঠান্ডা মার্বেলের মেঝেতে পা রাখতেই শরীর বেয়ে শীতল স্রোত নেমে গেল।
রুমের বাইরে বেরিয়ে এলো সে। পুরো বাড়িটা অন্ধকারে নিমজ্জিত। কোথাও কোনো শব্দ নেই। শুধু দূরে প্রাচীন দেয়ালঘড়িটার একঘেয়ে টিকটিক শব্দ, যা শুনলে মনে হয় সময় নয়, কারও মৃ’ত্যুর কাউন্টডাউন চলছে। আফরিদকে খুঁজতে খুঁজতে ন্যান্সি এগিয়ে গেল স্টাডি রুমের দিকে। মাঝরাতে কাজ করলে আফরিদ সাধারণত সেখানেই থাকে। করিডোর পেরোতে পেরোতে তার মনে হচ্ছিল, কেউ যেন অদৃশ্য দৃষ্টিতে তাকে অনুসরণ করছে।
স্টাডি রুমের দরজার সামনে পৌঁছে হাত বাড়াতেই কেঁপে উঠল সে।
দরজাটা আধখোলা। ধীরে ধীরে ভেতরে উঁকি দিতেই ন্যান্সির চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল। বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন বিকট শব্দে ধাক্কা দিতে লাগল পাঁজরে।
বিশাল বুকশেলফ দুটো মাঝবরাবর সরে গিয়ে সৃষ্টি করেছে এক গোপন প্রবেশপথ!
দৃশ্যটা এতটাই অবিশ্বাস্য যে মুহূর্তের জন্য ন্যান্সির মনে হলো সে হয়তো স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু না শীতল বাতাস সত্যিটাকেই জানান দিচ্ছে। বুকশেলফের ওপাশে সরু, দীর্ঘ এক অন্ধকার পথ চলে গেছে গভীরের দিকে। সেই পথের শেষ কোথায়, তা বোঝার উপায় নেই।
ন্যান্সির গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। কাঁপা পায়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল সে। অন্ধকার সুড়ঙ্গটার ভেতর থেকে ভেসে আসছে ধাতব কোনো কিছুর ক্ষীণ প্রতিধ্বনি। যেন দূরে কোথাও কেউ ভারী কিছু টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
ঠিক তখনই টক,টক, টক কারও পায়ের শব্দ!
ন্যান্সির বুক ধড়াস করে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে সে দেয়ালের আড়ালে সরে দাঁড়াল। নিঃশ্বাস পর্যন্ত আটকে রাখল। অন্ধকার পথের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলো একটি ছায়ামূর্তি।
লম্বা দেহ পরিচিত পদচারণা। আফরিদ! ন্যান্সির শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। আফরিদের মুখে অদ্ভুত এক গাম্ভীর্য। চোখ দুটো যেন আরও নিষ্ঠুর, আরও গভীর। সে দ্রুত চারপাশে দৃষ্টি বুলিয়ে বুকশেলফ বন্ধ করে দিল।
এক সেকেন্ডও দেরি করল না ন্যান্সি। পা টিপে টিপে ছুটে গেল সিঁড়ির দিকে। মনে হচ্ছিল, আফরিদ যদি এখন তাকে দেখে ফেলে ভয়ংকর কিছু ঘটে যাবে।
এদিকে আফরিদ দীর্ঘ পদক্ষেপে এগিয়ে গেল তাদের বেডরুমের দিকে।
দরজা খুলতেই তার দৃষ্টি আটকে গেল বিছানায়।
ন্যান্সি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। আফরিদের বুক চিরে বেরিয়ে এলো দীর্ঘ, উষ্ণ নিঃশ্বাস। চোখে এক মুহূর্তের জন্য স্বস্তির ছায়া নেমে এলো। ধীরে ধীরে সে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল।
“জান বাচ্চা।”
ছোট্ট স্বরে ডেকে ওঠে আফরিদ! ন্যান্সি গাঁট হয়ে শুয়ে আছে। আফরিদ লম্বা নিঃশ্বাস টেনে ধীর গতিতে এগিয়ে গিয়ে কপালে আলতোভাবে চুমু এঁকে দিলো। আয়াশকে হারিয়ে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে এই রমণী। কারো সাথে টু শব্দটিও করেনা।
পুরোটা দিন নিজেকে কক্ষে বন্দী করে রাখে। কেউ খাইয়ে দিলে খায় নয়তো পুরোটা দিন জানালার পাশে বসে রবে।
ঘড়ির টিকটিক শব্দ আবারও ভারী হয়ে উঠল। সময় গড়াতে লাগল। প্রায় এক ঘণ্টা পর চট করে চোখ মেলে উঠে বসল ন্যান্সি। এবার তার চোখে ভয় নেই।
আছে তীব্র কৌতূহল। আর সন্দেহ। আফরিদের নিঃশ্বাস গভীর হতেই ন্যান্সি নিঃশব্দে বিছানা ছাড়ল। পা টিপে টিপে আবারও এগিয়ে গেল স্টাডি রুমের দিকে।
কিন্তু সেখানে পৌঁছাতেই তার চোখ বিস্ফোরিত হয়ে উঠল। বুকশেলফ দুটো আবার আগের মতো জোড়া লেগে আছে! যেন কখনো কিছু ঘটেইনি।
ন্যান্সি দ্রুত এগিয়ে গেল। একের পর এক বই টেনে বের করতে লাগল। হাত কাঁপছে তার। শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হয়ে উঠেছে।
“না। আমি ভুল দেখিনি আফরিদ এখানেই ছিল!”
নিজের সঙ্গেই ফিসফিস করে উঠল সে।
হঠাৎই দুটো মোটা বই সরাতেই আঙুলে ঠেকে ধাতব কিছু। একটা ছোট্ট নব।
ন্যান্সির চোখ চিকচিক করে উঠল। তড়িঘড়ি করে নবটা ঘুরিয়ে দিতেই মৃদু গর্জনের শব্দে বুকশেলফের ভেতর আরেকটি গোপন দরজা উন্মুক্ত হয়ে উঠল।
কিন্তু দরজাটির মাঝখানে জ্বলজ্বল করছে ডিজিটাল লক।
পাসওয়ার্ড প্রোটেক্টেড। ন্যান্সির কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠল।
“এখন কী করব?”
কাঁপা হাতে একের পর এক পাসওয়ার্ড দিতে লাগল সে। আফরিদের নাম। জন্মতারিখ।
প্রিয় সংখ্যা। কিছুই কাজ করল না। বিরক্তি আর আতঙ্কে নখের ডগা দাঁতে কামড়ে ধরল ন্যান্সি। মস্তিষ্কে দ্রুত ঘুরতে লাগল আফরিদ তাকে কী কী নামে ডাকত। জানকি বাচ্চা,মাতারি,বান্দি,পরাণ খ্রিস্টানের বাচ্চা।
একটার পর একটা টাইপ করেও ব্যর্থ হলো।
ঠিক যখন হাল ছেড়ে দিতে যাচ্ছিল হঠাৎ তার মাথায় এলো আরেকটি নাম। অ্যাঞ্জেলিনা। কাঁপা হাতে শব্দটা টাইপ করতেই বিপ!
দরজাটা ধীরে ধীরে দু’ভাগ হয়ে খুলে গেল।
ন্যান্সির বুকের ভেতর যেন বিস্ফোরণ ঘটল।
স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে। চোখে বিস্ময়, ভয় আর অবিশ্বাসের মিশ্র ছায়া।
“অ্যাঞ্জেলিনা!”
নামটা ফিসফিস করে উচ্চারণ করতেই শরীরের লোম খাড়া হয়ে উঠল। ভেতর থেকে ভেসে এলো বরফশীতল বাতাস।
দেয়াল জুড়ে ন্যান্সি, মিস্টার আলবার্ট এবং এক সুন্দর রমণীর ছবি! ছোট থেকে বড় বেলার অসংখ্য ছবি!
মিস্টার আলবার্ট এবং তার পুরো পরিবার। সেই ছবিটায় থাকা ছোট্ট মেয়েটি ন্যান্সি!
পায়ের নিচের জমিন সরে গেল ন্যান্সির; ছোট্ট মেয়েটার পাশে দাঁড়ানো নারীটি দেখতে হুবহু ন্যান্সির মতো! দু’জনের গাল, চাহনি হাসি প্রায়!
ধপ করে পিছিয়ে গেল ন্যান্সি! স্তব্ধ। বিস্ময়াভিভূত হয়ে স্থবির কন্যা!
“আফরিদ?”
********************
লাশের বিভীষিকাময় সমারোহ দেখে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল ন্যান্সি। ঘন অরণ্যের গহীনে, পাহাড়চূড়ায় নির্মিত সেই নির্জন রিসার্চ সেন্টার যার অস্তিত্ব সম্পর্কে এতদিন কেউ জানতো না আজ যেন মৃ’ত্যুর উপত্যকায় রূপ নিয়েছে। স্টাডি রুমের গোপন নথি ঘেঁটে এই ঠিকানাটাই খুঁজে পেয়েছিল সে। তার বিশ্বাস ছিল, এখানেই হয়তো খুঁজে পাবে মিস্টার আলবার্টকে। কিন্তু সামনে যে দৃশ্য বিস্তৃত, তা কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব নয়।
চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে র’ক্তা’ক্ত দেহ।
তাজা র’ক্তের ধাতব গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছে চারিপাশ। দেয়ালের সাদা অংশগুলো র’ঞ্জিত হয়েছে র’ক্তের ছিটেফোঁটায়। কোথাও কারও হাত ছিন্ন হয়ে পড়ে আছে, কোথাও নিথর চোখ মেলে তাকিয়ে আছে মৃ’,ত্যুগ্রস্ত মানুষ। মৃ’ত্যুর এমন নির্ম’ম উৎসব দেখে ন্যান্সির বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল।
কন্যার ঠোঁট কাঁপতে লাগল।
“এ,,,এসব?”
পরণের সফেদ রঙের গোল জামাটি ঘামে সিক্ত হয়ে শরীরের সঙ্গে লেপ্টে গেছে। পিঠ বেয়ে টপটপ করে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। আ’তঙ্কে তার নিশ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে। অশ্রু জমেছে কন্যার টলমল চোখে।
হঠাৎ তার দৃষ্টি আটকে গেল মৃ’ত গার্ডগুলোর দিকে। প্রত্যেকের ঘাড়ে খোদাই করা একই ট্যাটু ডানা মেলা ঈগল পাখি। যেন কোনো গোপন সংগঠনের ভয়ংকর প্রতীক!
ন্যান্সি নির্বাক হয়ে পড়ল। ঠিক সেই মুহূর্তে ভেতরের কোনো অন্ধকার করিডোর থেকে ভেসে এলো এক অদ্ভুত, বিকট শব্দ।
শব্দটা যেন যন্ত্রণাকাতর কারও শেষ আর্ত’,নাদ!
আতঙ্কে কেঁপে উঠল ন্যান্সি।সে দ্রুত পা চালিয়ে ছুটে গেল ভেতরের দিকে। তার জুতোর শব্দ শূন্য করিডোরে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
ন্যান্সি শাবকের ন্যায় আত’ঙ্কিত দৃষ্টিতে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করতে করতে শব্দের উৎস খুঁজতে লাগল।
হঠাৎ দূরে পড়ে থাকা একটি দেহ চোখে পড়তেই সে থমকে গেল।
একজন লোক মেঝেতে নিথর হয়ে পড়ে আছে। বুক ঝাঁঝরা হয়ে গেছে গুলিতে। লোকটিকে সে চিনতে পারল না। তবু আশার শেষটুকু আঁকড়ে ধরে ছুটে গেল তার কাছে। কিন্তু না লোকটা অনেক আগেই মৃ’ত্যুর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।
ঠিক তখনই অদূরে আরেকটি দেহ দেখতে পেয়ে জমে গেল ন্যান্সি। তার পুরো শরীর কেঁপে উঠল।
“মি… মিস্টার আলবার্ট!”
ডাকটা যেন গলা ছিঁড়ে বেরিয়ে এলো। সে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে গেল তার দিকে। মিস্টার আলবার্ট বুক চেপে ধরে পড়ে আছেন। র’ক্তের স্রোত গড়িয়ে চারপাশ লাল করে ফেলেছে। তার নিঃশ্বাস ক্ষীণ, ভাঙা, মৃ’ত্যুপথযাত্রীর মতো।
ন্যান্সি কম্পিত হাতে তাকে স্পর্শ করল।
“বা,,,বাবা! বাবা!”
মিস্টার আলবার্ট বহু কষ্টে চোখ মেললেন।
ঝাপসা দৃষ্টির সামনে ন্যান্সির মুখটা ভেসে উঠতেই তিনি যেন মুহূর্তের জন্য ফিরে গেলেন বহু বছর আগের সেই অতীতে, ছোট্ট এক কন্যা হাসতে হাসতে দৌড়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরছে। গালে এঁকে দিচ্ছে নিষ্পাপ চুম্বন। তার কণ্ঠে ভেসে আসছে শিশুসুলভ হাসি। র’ক্তা’ক্ত হাত কাঁপতে কাঁপতে ন্যান্সির গাল ছুঁলেন তিনি।
ক্লান্ত, ভাঙা কণ্ঠে ফিসফিস করে বললেন,
“ন্যান্সি? ইলহাম ন্যান্সি?”
ন্যান্সি মাথা নাড়তেই বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়ল।
“আপনার,,,, আপনার এ কী অবস্থা? কে করেছে এসব?”
মিস্টার আলবার্টের নিঃশ্বাস ক্রমশ ভারী হয়ে উঠছে।
শরীরে বিদ্ধ হওয়া পরপর দুটি গুলি ধীরে ধীরে তার সমস্ত স্নায়ু অবশ করে দিচ্ছে। প্রতিটি শ্বাস নিতে যেন পাহাড়সম কষ্ট হচ্ছে তার।
ন্যান্সি হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।
“কথা বলুন! প্লিজ কথা বলুন!”
মিস্টার আলবার্টের ঠোঁট কাঁপছে। চোখ দুটো ধীরে ধীরে উল্টে আসছে। মৃ’ত্যুর অন্ধকার তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে গভীরে।
অসংখ্য কষ্ট সয়ে তিনি ফিসফিসিয়ে বললেন,
“আমার,,, আমার মা,,
কথাগুলো শেষ হতে না হতেই তার কণ্ঠ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ন্যান্সি হুহু করে কেঁদে উঠল। মিস্টার আলবার্ট বুঝে গিয়েছিলেন এই পৃথিবীতে তার সময় শেষ হয়ে এসেছে।
পরমুহূর্তেই ন্যান্সির হাতের ওপর মাথা রেখেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন তিনি।
চলে গেলেন অনন্তের পথে নিজের স্রষ্টার নিকটে।
এক মুহূর্তের জন্য যেন থেমে গেল সমগ্র পৃথিবী।
না বাতাস বইছে, না কোনো শব্দ হচ্ছে, না সময় এগোচ্ছে। শুধু নিস্তব্ধতা। ন্যান্সি বিস্ময়াভিভূত, অবিশ্বাসে জমাট বাঁধা চোখে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর কাঁপা কণ্ঠে ডেকে উঠল,
“বাবা? ও বাবা! বাবা!”
কোনো উত্তর এলো না। মিস্টার আলবার্টের নিথর দেহ নিশ্চুপ হয়ে পড়ে রইল ন্যান্সির কোলের ওপর।
আর সেই নীরবতা যেন হাজারটা আর্তচিৎকারের চেয়েও ভয়ংকর হয়ে উঠল।
“বাবা,বাবা চোখ খুলো। আমি ন্যান্সি তোমার মেয়ে! ও বাবা চোখ খুলো প্লিজ!”
কেউ কোনো প্রকার সাড়া প্রদান করল না! ন্যান্সির হাহাকারময় ক্রন্দন চারপাশের স্বচ্ছ কাঁচঘেরা প্রাচীরে প্রতিধ্বনিত হয়ে কর্ণকুহরে প্রচণ্ড তীক্ষ্ণতায় আ’ঘাত হানছে!
ঠিক সেই মুহূর্তে আকস্মিক কারো পদচারণার শব্দে থমকে গেল কন্যাটি। তৎক্ষণাৎ ঘাড় ঘুরিয়ে পশ্চাতে তাকাতেই চক্ষুসম্মুখে সেই হুডি আবৃত পুরুষটিকে প্রত্যক্ষ করে তার হৃদ্স্পন্দনের স্বাভাবিক গতি বিপর্যস্ত হয়ে উঠল! নীলাদ্রি?
কিন্তু নীলাদ্রিকে তো সে নিজ হাতেই খু’ন করেছে! তবে সে পুনরায় এখানে কীভাবে উপস্থিত?
মুখাবয়ব ঢাকা কালো মাস্কে, নেত্রযুগল আচ্ছাদিত গগলসে, হস্তাবৃত গ্লাভসে এবং সর্বাঙ্গে কৃষ্ণবর্ণ হুডি যেন সম্পূর্ণ অস্তিত্বটাকেই অন্ধকারে নিমজ্জিত করে রেখেছে পুরুষটি! আতঙ্কে জমাট বেঁধে গেল ন্যান্সি। ক্ষীণ কম্পনে তার দৃষ্টি নেমে এলো পুরুষটির হস্তদেশে। অতঃপর পরক্ষণেই চক্ষু বিস্ফারিত হয়ে উঠল!
সেই চিরপরিচিত ঈগলখচিত আংটি! হ্যাঁ এ তো সেই আংটিই!
পুরুষটি কিয়ৎক্ষণ নীরব দৃষ্টিতে ন্যান্সির দিকে তাকিয়ে রইল। অতঃপর ধীর পায়ে পিছন ঘুরে দাঁড়াল। সময় নিয়ে একে একে গগলস খুলে নিচে নিক্ষেপ করল। তারপর মুখাবরণী মাস্কটিও টেনে খুলে মেঝেতে ফেলে দিল। পুনরায় যখন সে ন্যান্সির দিকে ফিরে দাঁড়াল ওমনি টলমল করে পিছিয়ে গেল কন্যাটি!
সেই সুপরিচিত মুখাবয়ব। সেই ভয়ংকর, মোহনীয় নীলাভ নেত্রমণি! আজ কি তবে ন্যান্সির জন্য কেবল বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে থাকার দিন?
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষটিকে সে অত্যন্ত ভালো করেই চেনে! আফরিদ এহসান!
মাফিয়া কিং আফরিদ এহসান! ন্যান্সি যেন নিঃশ্বাস গ্রহণ করতেও বিস্মৃত হয়ে গেছে। সমগ্র শরীর অবশ হয়ে এলো তার। শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রমশ ভারী ও স্ফীত হয়ে উঠছে!
হঠাৎ সামনের চেয়ার টেনে ধীর ভঙ্গিতে বসে পড়তে দেখল আফরিদকে। অথচ আজ সে এগিয়ে এসে ন্যান্সিকে আলিঙ্গনে আবদ্ধ করল না। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল না,
“কাঁদিস না, জানকি বাচ্চা। তুই কাঁদলে আমার কষ্ট হয়!”
*******
ভোরের আকাশে আজ যেন সূর্যও স্বমহিমায় উদ্ভাসিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। চারপাশে এক অদৃশ্য অস্থিরতা ছড়িয়ে রয়েছে। আফরিদের ঠিক সম্মুখে, চার-পাঁচ হাত দূরত্বে স্বচ্ছ কাঁচের মেঝেতে নিস্তব্ধ হয়ে বসে আছে ন্যান্সি। অশ্রুধারা এখন স্তব্ধ। অথচ তার শূন্য দৃষ্টি স্থির হয়ে রয়েছে সম্মুখে বসে থাকা সেই নির্মম পুরুষটির দিকে যে কি না তার স্বামী তার আয়াশের বাবা।
আফরিদও অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে কন্যাটির গোলাকৃতি নিষ্পাপ চোখের দিকে। বুকে যেন দাউদাউ করে জ্বলছে অ’গ্নিকুণ্ড। দীর্ঘ নীরবতার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে গম্ভীর স্বরে উচ্চারণ করল।
“প্রশ্ন কর। যা জানতে চাস, নির্দ্বিধায় জিজ্ঞেস কর। আমি প্রতিটি উত্তরের জন্য প্রস্তুত।”
ন্যান্সি দুর্বল ঘাড়টা সামান্য ঘুরিয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকা মিস্টার আলবার্টের দিকে একবার তাকাল। ঠিক তখনই বজ্রাঘাতের ন্যায় কর্ণকুহরে ধাক্কা খেল বাক্যটি
“উনি তোর বাবা! মিস্টার আলবার্ট!”
ন্যান্সি দীর্ঘ নিঃশ্বাস টানল। সমগ্র শরীর কম্পিত হয়ে উঠেছে। অতঃপর বহুকষ্টে কাঁপা স্বরে উচ্চারণ করল,
“শুধু,, শুধু একটা কথাই জানতে চাই। কেন করেছেন এসব? কেন?”
কিয়ৎক্ষণ নীরব রইল আফরিদ। যেন শব্দ উচ্চারণের পূর্বে প্রতিটি নিঃশ্বাসকে শাস্তি দিচ্ছে সে। অতঃপর ধীর পলকে দৃষ্টি তুলল ন্যান্সির দিকে। সেই দৃষ্টিতে অনুতাপ ছিল না, ছিল এক গভীর দহন যে দহন বহু পূর্বেই তার মানবিক সত্তাকে ভস্মীভূত করেছে।
অতঃপর অধর নাড়াল পুরুষটি।
“কারণ এই পৃথিবী আমাকে কখনো মানুষ হয়ে বাঁচতে দেয়নি, ন্যান্সি।।”
আফরিদের কণ্ঠ ক্রমশ গাঢ় হয়ে উঠল। প্রতিটি শব্দ যেন কাঁচের প্রাচীরে প্রতিধ্বনিত হয়ে পুনরায় বিদ্ধ করছে ন্যান্সির অন্তঃকরণ।
“মিস্টার আলবার্ট!”
তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটল তার ওষ্ঠে। ন্যান্সির বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। তবুও সে নির্বাক। কারণ তার সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষটিকে আজ আর চেনা যাচ্ছে না। এ যেন সেই আফরিদ নয়, যে গভীর রাতে তার কপালে ওষ্ঠ ছুঁইয়ে বলত।
“তুই থাকলে আমার পৃথিবীটা একটু কম নিষ্ঠুর লাগে।”
আফরিদ পুনরায় বলল,
“আমি যখন প্রথম কাউকে হ’ত্যা করি, তখন আমার বয়স মাত্র সতেরো বছর। জানিস, সেদিন আমার হাত কাঁপছিল না! কারণ তারও বহু আগেই আমার বিবেককে হ’ত্যা করা হয়েছিল। মানুষ হ’ত্যার পূর্বে তারা আমার অনুভূতিগুলোকে হ’ত্যা করেছিল, ন্যান্সি।”
এক পশলা নিস্তব্ধতা নেমে এলো চারপাশে। দূর আকাশে জমাট বাঁধা মেঘের ন্যায় ভারী হয়ে উঠল পরিবেশ। ন্যান্সি কাঁপা স্বরে বলল,
“তাই বলে এতগুলো জীবন ধ্বংস করে দিলে? আমাকে পর্যন্ত ব্যবহার করলে?”
প্রশ্নটা শুনে আফরিদ কিছুক্ষণ স্তব্ধ রইল। অতঃপর মৃদু হেসে মাথা নত করল। সেই হাসিতে সুখ ছিল না; ছিল আত্মঘৃণা’র বিষাক্ত ছায়া।সে ধীর স্বরে বলল,
“ব্যবহার? পুরো পৃথিবীকে প্রতারণা করেছি আমি। কিন্তু তোকে কখনো করিনি। তুই ছিলি আমার একমাত্র দুর্বলতা একমাত্র পবিত্রতা, যাকে স্পর্শ করার পূর্বে আমার র’ক্তমাখা হাত পর্যন্ত কেঁপে উঠত।”
ন্যান্সির শ্বাস ভারী হয়ে এলো। চোখের কোণে পুনরায় জমতে শুরু করল উষ্ণ অশ্রুকণা।
আফরিদ ধীরে ধীরে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। অতঃপর কাঁচের দেয়ালের ওপারে বিস্তৃত অন্ধকার শহরের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে উচ্চারণ করল,
“ওই স্পেনের ছোট্ট বাড়িটার প্রতিটি ইটের নিচে চাপা পড়ে আছে আমার চিৎকার, ন্যান্সি। আমি কখনো মুক্তি চাইনি। আমি শুধু চেয়েছিলাম প্রতিশোধ। কিন্তু প্রতিশোধের অ’গ্নিতে পুড়তে পুড়তে কখন যে নিজের ভেতরের মানুষটাকেই সমাধিস্থ করেছি তা বুঝতেই পারিনি।”
*****************
অতীত……..
টিকটিক শব্দে সময়ের অগ্রসরমান কাঁটা যখন রাত্রির বারো প্রহর স্পর্শ করল, ঠিক তখনই এক সুদর্শন পুরুষ ধীর ভঙ্গিতে দরজা ঠেলে কক্ষের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলেন।
দৃষ্টিপাত করলেন শয্যায় নিদ্রামগ্ন ক্ষুদ্র ছেলেটির দিকে। কী অপার্থিব নিষ্পাপতা ছড়িয়ে আছে তার অবয়বে! নিদ্রিত অবস্থায় যেন শিশুটিকে আরও অধিক স্বর্গীয় লাগছে।
অতঃপর মৃদু পদক্ষেপে এগিয়ে এসে বসে পড়লেন বালকটির শিয়রে। স্নেহমাখা স্পর্শে এলোমেলো চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে কানের নিকট মুখ নামিয়ে অত্যন্ত কোমল স্বরে উচ্চারণ করলেন,
“হ্যাপি বার্থডে, পাপা।”
মুহূর্তেই নিদ্রা ভেঙে জেগে উঠল ছেলেটি। বয়সই বা কত তার? মাত্র বারো! হ্যাঁ, আজই তো জীবনের দশের কৌটায় পদার্পণ করেছে সে।
নীলাভ আভাময় নেত্রযুগল মেলে পিটপিট করে সম্মুখে তাকাতেই পিতাকে দেখতে পেল। পরক্ষণেই উৎফুল্লতায় ঝাঁপিয়ে পড়ল তার বক্ষে।
মুস্তাক এহসান স্নেহপরায়ণ ভঙ্গিতে পুত্রের কপালে চুম্বন এঁকে দিয়ে গম্ভীর অথচ উষ্ণ কণ্ঠে বলে উঠলেন,
“শুভ জন্মদিন, আফরিদ! মাই চ্যাম্প!”
আফরিদের ওষ্ঠপ্রান্তে প্রশস্ত হাসির রেখা ফুটে উঠল। উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল,
“থ্যাংক ইউ, পাপা!”
ঠিক তখনই পুনরায় দরজা ঠেলে কক্ষে প্রবেশ করলেন এক রমণী। সমগ্র মুখাবয়বে অপার মাতৃত্বের স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে রয়েছে। হস্তে সুসজ্জিত জন্মদিনের কেক নিয়ে, তিনি ধীর পায়ে ভেতরে অগ্রসর হতে হতে স্নেহমাখা কণ্ঠে বললেন,
“হ্যাপি বার্থডে, সোনা!”
মায়ের হাতে কেক দেখতে পেয়ে মৃদু হেসে উঠল আফরিদ। অতঃপর মুস্তাক এহসানের দিকে তাকিয়ে কিঞ্চিৎ গাম্ভীর্য এনে বলল,
“আমি তো এখন বড় হয়ে গেছি, পাপা। এখনো কি কেউ কেক কা’টে?”
ছেলের কথা শ্রবণ করে খিলখিলিয়ে হেসে উঠলেন মাইমুনা এহসান। অপরদিকে মুস্তাক এহসান ছেলের বাহুদ্বয় আলতোভাবে আঁকড়ে ধরে দৃঢ় অথচ স্নেহসিক্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন,
“যতদিন তোমার পাপা বেঁচে আছেন, ততদিন প্রতি জন্মদিনে তুমি কেক কাটবে। তুমি যত বড়ই হয়ে যাও না কেন, আমার কাছে তুমি চিরকালই ছোট্ট আফরিদ।”
পিতার কথায় মুখাবয়বে ভীষণ বিরক্তি ও হতাশার ছাপ ফুটে উঠল আফরিদের।
ব্রিটিশ বংশের এই ক্ষুদ্র রাজপুত্র যেন সমগ্র পরিবারের প্রাণস্পন্দন! তার হাসিতে আলোকিত হয়ে ওঠে বাড়ির প্রতিটি কোণ, আর তার সামান্য মনখারাপেই নিস্তব্ধ হয়ে যায় চারপাশের সমগ্র আনন্দধারা।
চলবে…………।
(আজ থেকে অতীত শুরু, এবার আপনারা অতীত জানতে পারবেন।)
“পাপা।”
ছেলের কন্ঠস্বর শুনে সহসা ন্যান্সিকে ছেড়ে দিলো আফরিদ। আয়াশ তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। আফরিদ তার কাছে এলো।
“ইয়েস পাপা! কি ব্যাপার আমার পাপার চোখ মুখ লাল হয়ে আছে কেন?”
আয়াশ আড়চোখে এক পলক মা কে দেখে বলল।
“ক্রিকেট খেলতে চাইছি ,মাম্মা দিচ্ছে না তো!”
আফরিদ চোখ রাঙিয়ে তাকালো ন্যান্সির দিকে।
“কি ব্যাপার ম্যাডাম আপনি আমার ছেলেকে খেলতে দিচ্ছেন না কেন?”
ন্যান্সি ঠোঁট কামড়ে হাসলো। আফরিদ আয়াশকে কোলে তুলে নিল।
“চলো পাপা আমরা খেলব। পুরো একটা ক্রিকেট টিম বানাবো।”
আয়াশ চওড়া হাসলো নিজের পাপার কথায়।
আফরিদ নিচের দিকে এগুতে এগুতে ঈশান কে গলা ছেড়ে ডাকলো।
“ঈশান? ঈশান?”
ঈশান ছুটে এলো আফরিদের নিকটে। আফরিদ আয়াশের আঙ্গুল ধরে বলল।
“এখুনি সবাইকে বল বাগানে আসতে। আজকে আমার পাপা ক্রিকেট খেলতে চাইছে। সবাই খেলতে হবে।”
Share On:
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE