#পদ্মপ্রিয়া
#ঈশিতা_রহমান_সানজিদা
লাইব্রেরীর শেলফে থাকা বই গুলোতে ধুলো জমেছে। হয়তো কিছু কিছু বই ইঁদুরে কেটেছে। বয়স থাকতে নিজ হাতে সব পরিষ্কার করতেন রাশেদ সাহেব। সাথে সঙ্গ দিত নূর, বাবা মেয়ে মিলে হাসি ঠাট্টায় মজে উঠতেন। একটা টুলের উপর দাঁড়িয়ে বইগুলো নামিয়ে নূরের হাতে দিতেন, তারপর দু’জন মিলে ন্যাকড়া দিয়ে মুছে রোদে দিতেন।
আজকের পর থেকে হয়তো বাবা মেয়ের সম্পর্কে স্মৃতির ধুলো জমবে। ক’দিন ই এভাবে থাকবে মেয়েটা? একদিন না একদিন তো ঠিকই চলে যাবে। তখন রাশেদ সাহেব এই ধুলো জমানো লাইব্রেরী আর সামান্য কিছু স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকবেন। তাছাড়া তার আয়ু আর ক’দিন ই বা আছে। আল্লাহ চাইলে এখুনি তার কাছে নিয়ে যেতে পারেন। তবে এখন আর আফসোস নেই তার। মেয়ের একটা ব্যবস্থা তো হয়েছে। রাশেদ সাহেবের আজ পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে গেল। নূরের বয়স তখন দুই বছর, হাঁটা শিখেছে আরো আগে। কোমল গলায় বললো আব্বু বলতে শিখেছে মেয়েটা। সেদিন রাতে সবাই ঘুমাচ্ছিল। হঠাৎ করেই রাশেদ সাহেবের ঘুম ভেঙ্গে যায়, ডিম লাইটের মৃদু আলোতে মেয়ের মুখটা স্পষ্ট দেখতে পান তিনি। ঘুম ভেঙ্গেছে নূরের, এক গাল হাসি মুখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। বাবা চোখ মেলতেই সেকি হাসি। কোলে নিতেই খিলখিল করে হেসেছিল।
সময়টা মনে পড়তেই হেঁসে উঠেন রাশেদ সাহেব। তবে চোখ থেকে চশমা খুলে চোখ মুছেন। চুপচাপ স্মৃতিচারণ করেন, মাঝে মাঝে চোখে পানি চলে এলে দ্রুত মুছে নেন। টেবিলের ড্রয়ার থেকে নূরের ছোটবেলার ছবিটা বের করে দেখেন। বলেন,’অনেক সুখি হ মা! তোর বাবা তো খুব বেশি সুখ দিতে পারেনি। মা ভাইয়ের ভালোবাসা তো কপালে জুটলো না। এবার যদি আল্লাহ তোর দিকে মুখ তুলে তাকায়। আমি সবসময় দোয়া করি তুই ভালো থাক।’
‘আব্বু!!’ ডাক শুনে দ্রুত চোখ মুছে চশমা পরেন। তাকিয়ে দেখেন রাহা দাঁড়িয়ে। পরনে সুতি শাড়ি, বাবার মতো তারও চশমা চোখে। সে দ্রুত এগিয়ে এসে রাশেদ সাহেব কে ধরলেন। বলে,’সরি আব্বু, আমার আসতে দেরি হয়ে গেল। আমি সত্যি সরি।’
বড় মেয়ের সামনে নিজেকে ভঙ্গুর দেখাতে পারলেও ছোট মেয়ের সামনে তা পারেন না রাশেদ সাহেব। তিনি যথাসম্ভব স্থির হয়ে বসে রইলেন। রাহা বললো,’আমার শ্বাশুড়ি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। হসপিটালে ভর্তি আছেন, আম্মু কে বলেছি। তোমাকে বলেনি?’
‘বলেছে।’ ক্ষীণ স্বর। রাহা কেমন আঁতকে উঠলো। শ্বাশুড়ি কে হসপিটালে ফেলে এসছে সে। ছেলে দুটো আসলেও স্বামী আসতে পারেনি। ওকে জোর করে পাঠিয়েছে। নিজের বোনের এমন সময়ে পাশে না থাকলে চলে। রাহা বললো,’তোমার শরীর খারাপ হচ্ছে, রুমে চলো।’
রাশেদ সাহেব হাত উঁচিয়ে থামিয়ে বলেন,’আমি ঠিক আছি রে মা। আজান দিয়েছে, নামাজ পড়ব তো।’
‘রুমে পড়ে নিও, আগে রুমে যাবে তো।’
মেয়ের সাথে পারলেন না রাশেদ সাহেব। তার একটু একটু শরীর খারাপ লাগছে। ওষুধ টা খেলেই ঠিক হয়ে যাবে। রাহা তাই করলো। সে নূরের সাথে দেখা করতে পারলো না। সবে মাগরিবের আজান পড়েছে, ওরা নাকি একসাথে নামাজ পড়বে। অনুপমাই বলেছে। রাহা আসা মাত্রই বলেছে,’নিকাহ পড়ানো শেষ, এখন নূরের কাছে যেও না বুঝলে। ওরা দুজনে ভেতরে আছে, শোকরানা নামাজ পড়ে আসুক তারপর কথা বলো।’
ভাবির এই মিষ্টি মিষ্টি কথা মোটেও পছন্দ হলো না রাহার। হঠাৎ কথায় এত মধু এলো কোথা থেকে! সে অতো পাত্তা না দিয়ে রাশেদ সাহেব কে সময় দিলো।
——————
আজমাঈন হাতঘড়ি খুলছে, ফাঁকে ফাঁকে আয়নায় চোখ বুলাচ্ছে। পেছনে পর্দার সাথে মিশে থাকা নারীকে দেখাই যেন তার প্রধান কাজ। তবে নারীর চিবুক যে বুকে মিশেছে। কীভাবে স্পষ্ট মুখটা দেখবে? এবার ও কি হতাশ হয়ে ফিরে যাবে আজমাঈন? তবে এতে ভাবান্তর হলো না ছেলেটার। বছরের তিনশত পঁয়ষট্টি দিন তো আর এমন হবে না। দরকার পড়লে সে রোজ আসবে, একটুখানি দেখার জন্য। কোন একদিন হয়তো মেয়েটা মুখ তুলে তাকাবে, চোখে চোখ রাখবে, ভেতরের সংশয় কাটবে। ঘড়িটা ড্রেসিং টেবিলের সামনে রেখে ঘাড় ফিরিয়ে তাকালো। এদিক ওদিক তাকিয়ে ওয়াশ রুম খুঁজলো। দরজা দেখামাত্র ধীরে পায়ে ঢুকে বন্ধ করে দিলো। নূর যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো, সে কি এখন দরজা খুলে বেরিয়ে যাবে? নাহ!! ব্যাপার টা খারাপ দেখায়। সবাই কি ভাববে! তাছাড়া নামাজের সময় হয়ে গেছে। আজমাঈন নিশ্চয়ই এখুনি নামাজ পড়বে। তাই দ্রুত লাগেজ খুলে জায়নামাজ দুটো বের করলো। হাঁটু গেড়ে বসে পশ্চিম মুখী করে বিছিয়ে দিলো। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে নামাজ পড়বে! এই মুখ কোথায় লুকাবে সে? ওড়না টেনে আরো নামিয়ে আনলো।
আজমাঈন দরজা খুলে বের হতেই বসা থেকে দ্রুত উঠে দাঁড়ালো নূর। পেছনে সরতে সরতে খাটের সাথে ধাক্কা খেয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আজমাঈন মেয়েটার এমন বেখেয়ালি মন দেখে না হেঁসে পারলো না। বলে উঠলো,’পাশাপাশি জায়নামাজ রাখতে হয় না। তোমার টা একটু পেছনে থাকবে।’ আরেকটু এগিয়ে এসে বলে,’ওযু করে এসো, অপেক্ষা করছি।’
কথোপকথনের সময় এক মুহুর্তের জন্য চোখ তুলে তাকায়নি। এই যে নূর মাথা নিচু করে চলে গেল সেটাও দেখেনি আজমাঈন। তবে ওর ভালো লাগছে। আজ সবকিছুর প্রতি অধিকার বোধ কাজ করছে ভেতর থেকে। কোন প্রকার ভয় হচ্ছে না, ভাবতেই পরাণ জুড়িয়ে যাচ্ছে। উবু হয়ে নূরের জায়নামাজ টেনে খানিকটা পেছনে নেয়। এইবার ঠিক আছে।
পুরুষ মানুষ আর কিছু জানুক বা না জানুক, বিয়ের নিয়ম কানুন সবই জানে। এক্ষেত্রে সে ধার্মিক হোক বা না হোক। আজমাঈন ও তার ব্যতিক্রম নয়।
নূর তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছে হিজাব পরে নিলো। আজমাঈন তখন জায়নামাজে দাঁড়িয়ে সবকিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। জড়তা নিয়েই আজমাঈনের পেছনে দাঁড়িয়ে পড়লো সে। কিন্তু কে জানতো আচমকা ছেলেটা মুখ ফিরিয়ে তাকাবে। এমন কাজের জন্য প্রস্তুত ছিলো না নূর। সে নিজেও তাকায়। এমন সাক্ষাৎ কজনের ভাগ্যে জোটে? চোখ চোখ পড়তেই মেয়েটা ফের মেঝেতে দৃষ্টি দিলো। আজমাঈন মৃদু হেসে বললো,’আমার একটা ইচ্ছে পূরণ করবে প্লিজ?’ কথার জবাব না আসায় সে নিজ থেকেই বলে,’আজ এই ঘরে থাকতে আসিনি। তোমার ঘোমটা দেওয়া লাল ওড়না টা জায়নামাজের উপর বিছিয়ে দিবে? নামাজ আদায় করে চলে যাব।’
কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেল নূর, এই ছেলের গলার স্বর এমন কেন? এমন আদুরে স্বরে কিছু চাইলে কেউই না করতে পারবে না। নূর ওড়না এনে আজমাঈনের জায়নামাজের উপর বিছিয়ে দিয়ে নিজের জায়গায় এসে দাঁড়ায়।
এই প্রথম এত অস্বস্তি নিয়ে নামাজে দাঁড়িয়েছে নূর। বিছানার উপর থেকে রিমোট নিয়ে এসির টেম্পারেচার সর্বনিম্নতে দিলো। নামাজ পড়ে সে এক মুহুর্ত দেরি করবে না। সোজা আব্বুর কাছে গিয়ে বসে থাকবে। কি একটা অবস্থা!!
তবে নামাজ শেষ করে নূরের কোথাও যেতে হলো না। আজমাঈন নিজেই বেরিয়ে গেল। ড্রয়িং রুমে বাকিরা এসে বসেছে। তারাও মাত্র মসজিদ থেকে এলো। ফয়েজ সোফার এক কোণে বসে আছে। বড়দের মাঝে সে যেন এক বাচ্চা। বেচারা কে সঙ্গ দিলো আজমাঈন। পাশে বসে নিচু স্বরে বলে,’আমার বাপের খবর কি রে?’
ফয়েজ যথাসম্ভব নিচু গলায় বলে,’তোর বাপের মনের খবর কেউই জানে না। এখন তো ভালোই ঠেকছে, কখন আবার বোম ব্লাস্ট করে কে জানে। আমি এখনও কিছু বলিনি।’
বড়দের সামনে দু’জনে তেমন কথা বলতে পারে না। রাশেদ সাহেবও এসে বসেছেন। তারা দিন দুনিয়া, রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে কথাবার্তা বলছেন। আজমল শিকদার তখনই কথা তুললেন,’বলছি কি ভাই সাহেব, রাত বেশি হওয়ার আগেই রওনা দিতে হবে আমাদের। মেয়ে আর মেয়ের মা বাড়িতে একা আছে। সব নিয়মকানুন তো শেষ। এখন আমাদের উঠতে হবে।’
আজমাঈন, ফয়েজ দু’জন দু’জনের দিকে তাকায়। বোঝার চেষ্টা করে যে এরপর ঠিক কি বলবেন আজমল শিকদার।
রাশেদ সাহেব বলেন,’তা ঠিক, কিন্তু রাতের খাওয়া দাওয়া না করে কোথাও যেতে দিচ্ছি না তো। আর সবাই কেন যাবেন? আজ আজমাঈন থাকবে না?’
আজমাঈনের অবস্থা খারাপ হয়ে গেল। এই বাপটা এবার কি বলে বসে!! ওকে না জ্বালালে তো পেটের ভাত হজম হবে না। আজমল শিকদার বলেন,’সে নাহয় থাকলো। আমাদের যেতে হবে যে।’
‘সবাইকে নিয়ে আসলে খুব বেশি খুশি হতাম। আজ তো গেল, আমি এরপর সবাইকে নিয়ে আসবেন।’
আজমল শিকদার মাথা নাড়েন। ফয়েজ আজমাঈনের কানে কানে বলে,’তোর ইচ্ছে পূরণ হয়ে গেছে, এখন ঝাকানাকা ড্যান্স দে তোর খোঁড়া পা নিয়ে।’
আজমাঈন পাঞ্জাবীর কলার ঠিক করে বলে,’নো ব্রাদার, ইটস্ হারাম।’
ফয়েজ দাঁত বের করে হাসে,’সম্পর্ক তো চেঞ্জ, সম্পর্কে বড় হই তোর।’
‘আসসালামুয়ালাইকুম আঙ্কেল, দোয়া করবেন দাম্পত্য জীবনে যেন স্ত্রী কে নিয়ে সুখি হই।’
অতপর দু’জনেই মুখে হাসি চেপে রাখে। বড়দের সামনে মোটেও হাসাহাসি করা যাবে না।
রাহা নূরের রুমে এসেছে, এতক্ষণ বাদে মেয়েটার মুখে হাসি ফুটলো। সালাম দিয়ে বোনকে জড়িয়ে ধরে বললো,’তোমাকে মিস করছিলাম, আর তুমিই সবার পরে এলে।’
রাহা বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় পরম যত্নে। পর মুহূর্তেই খেয়াল করে নূর কাঁদছে। একা একা সব কিছু সামলাতে গিয়ে বড্ড হাঁপিয়ে উঠেছে নূর। বোনকে দেখে একটু শান্তি পেলো। রাহা ওর চোখ মুছে দিয়ে বলে,’এভাবে কাঁদতে নেই, আব্বু দেখলে কষ্ট পাবে। এখানে চুপ করে বস। তোকে কিছু বলার আছে।’
বাধ্য মেয়ের মতো বসে নূর। রাহা বলে,’তোর আমার বয়সের পার্থক্য কত জানিস?’ রাহা মৃদু হাসে,’ঊনিশ বছর, ভাইয়ার হয়তো চব্বিশ কিংবা পঁচিশ হবে। ঠিক মনে নেই। আমার বিয়ের পর তোর জন্ম হয়েছিল কিনা তাই তোকে কোলে পিঠে করে মানুষ করতে পারিনি। কিন্তু দেখ, আমার চেয়ে শতগুণ ভালোভাবে তোকে আব্বু বড় করেছে।’
নূর ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। রাহা ফের বলতে শুরু করে,’আমি জানি এই সবকিছুর সাথে মানিয়ে নিতে তোর সময় লাগবে। একা একা বেড়ে ওঠা তুই মানুষের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে গেলে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হবি। আব্বু যা করেন ভেবে চিন্তে করেন। আমাকে দেখ, তোর ভাইয়া কখনো আমাকে সুখের অভাবে রাখেনি। সুখ মানে কি জানিস? একে অপরের পাশে থাকা, দুঃখ গুলো ভাগ করে নেওয়া। মনের ভেতর কথা চেপে না রাখা। তুই তো কাউকে মনের কথা শেয়ার করিস না। তোকে এত কথা বলছি কেন বলতো?’ বোনের বোকা বোকা চাহনিতে রাহা সব বুঝে নেয়,’আজ থেকে নতুন জীবনে পদার্পণ করলি, কিছুই তো বুঝিস না। মনে হয়না ভাবি তোকে ভালো মন্দ কিছু বোঝাবেন। তাই আমিই দায়িত্ব নিলাম।’
দরজার দিকে উঁকি দিয়ে বললো,’আমার ছেলে দুটো গেল কোথায়? আসার পর থেকে দেখাই যাচ্ছে না।’
সাহারা নাস্তার প্লেট হাতে নিয়ে আসতে আসতে বলে, ‘অনুভবের সাথে চিপকে রয়েছে। সবাইকে ধরে বেঁধে নিয়ে ঊনো খেলছে।’
‘কি আর করবে, বাসায় তো পড়াশোনা ব্যতীত কিছুই করতে পারে না। তোর ফুপা যে কড়া, ছেলে দুটো সবসময় ভয়ে তটস্থ থাকে।’
সাহারার পিছু পিছু আইশা এসে দাঁড়ায়। রাহা জিজ্ঞেস করে,’কে ও?’
‘জান্নাতের ননদ, তোমার ছোট্ট বেয়াইন।’
রাহা মুচকি হেসে বলে,’এসো এসো বসো, আমি তো কাউকেই চিনি না। আগে সবার সাথে পরিচিত হতে হবে।’
‘রাতের খাবারের সময় সবার সাথে দেখা হবে।’
এশার নামাজের আগেই সবাই চলে গেল। যদিও আইশা থাকতে চেয়েছিল, কিন্তু আজমল শিকদার ঘাড় ধরে নিয়ে গেছেন। বুড়োদের সাথে ওর যেতে ভালো লাগছিল না। বড় মামা অতিরিক্ত প্যান প্যান করে। তবুও যেতে হলো, বড় বোন এসেছে। সে যেন একা একা বোরিং না হয় এজন্য। ফয়েজ এবং আজমাঈন রয়ে গেছে। দুই বন্ধু একসাথে মসজিদ থেকে নামাজ পড়ে এলো। রাশেদ সাহেব রুমেই নামাজ পড়েছেন। ছোট মেয়ে নামাজ শেষ করেই বাবার কাছে এসে হাজির। নূর খেয়াল করলো বাবা ভালো নেই, একদিনে মুখটা কেমন চুপসে গেছে। কষ্ট লাগলেও নিজেকে শক্ত করে ধরে রেখে বলে,’একি হাল করেছ মুখের? আজ নিশ্চয়ই ওষুধ খাওনি।’
রাহা পানির জগ নিয়ে আসতে আসতে বলে,’আজ তুই যা, সবসময়ই তো আব্বুর সাথে সাথে থাকিস। আমি এসেছি, যে কদিন থাকব আমিই সব দেখাশোনা করব। নাহলে আমার ভাগে কম পড়ে যাবে না?’
‘তুমি কমই পাবে, আমিই বেশি নেব। আমি ছোট তাই আমার ভাগের পাল্লা বেশি ভারি।’
‘আচ্ছা!! মাপামাপি পরে হবে। এখন খেতে চল। তোর জন্য আজমাঈন বসে আছে।’
নূরের কথা বন্ধ করার জন্য এই বাক্যটি যথেষ্ট ছিল। রাশেদ সাহেব বলেন,’বাকি সবার খাওয়া কি শেষ?’
‘হ্যাঁ। ভাইয়া, সাহারা, ফয়েজ সহ সবাই খেয়ে নিয়েছে। তুমি আর নূর বাদ আছো। তোমাদের জন্য ছেলেটা বসে আছে। আম্মুও বসে আছে।’
রাশেদ সাহেব হন্তদন্ত হয়ে উঠলেন,’আগে বলবি না? আমি আরো কতক্ষন ধরে শুয়ে আছি।’
রাশেদ সাহেব দুই মেয়েকে নিয়ে খাবার টেবিলে আসেন। নূর তার হাতটা ঝাপটে ধরে আছে। তাতে কোন লাভ হলো না, তাকে আজমাঈনের পাশেই বসতে হলো। খাওয়ার পর্ব চলাকালীন আজমাঈন এবং রাশেদ সাহেব ব্যতীত কেউই কথা বললো না। রেহানা বেগম চুপচাপ আছেন, তিনি চাচ্ছেন সবকিছু ভালোয় ভালোয় মিটে যাক। স্বামী কে এখন কিছু বলে রাগানো ঠিক হবে না। কেননা ছেলে তার দিনরাত পায়ের কাছে এসে বসে থাকে। বাবাকে যদি একটু মানানো যায়। রেহানা ছেলেকে ধৈর্য ধরতে বলেছেন। সময় আসুক তারপর দেখা যাবে।
ওদের খাওয়ার ফাকে নূরের রুমে কিছু ফুল দিয়ে সাজিয়েছে সাহারা। বিছানায় কিছু গোলাপের পাপড়ি ছড়িয়ে দিয়েছে, কিছু গোলাপ ফ্লাওয়ার ভ্যাসে রাখা এবং সুগন্ধি ক্যান্ডেল গুলো জ্বালিয়ে দিয়ে চলে এসছে। খুব অল্প সময়ের মধ্যে সবটা সেরে দরজা আটকে দিয়ে গেছে।
তবে খাওয়ার পর রাশেদ সাহেবের সাথে কিছুক্ষণ গল্প গুজব করেছে আজমাঈন। বোনের অবস্থার কথা চিন্তা করে আজমাঈনের সাথে রাহা গেল রুম পর্যন্ত। ইশারায় নূরকে আশ্বস্ত করলো। আজমাঈনের সাথে কথাবার্তা বলেছে রাহা। তার ভালো লেগেছে ছেলেটাকে। কথার ধরন গোছালো, সুন্দর। সহজেই মানুষের মন জয় করে নিতে পারে। নূরকে মানাতে বেশি সময় লাগবে না। রাহা আজমাঈন কে জিজ্ঞেস করলো,’তোমার পোশাক আনা হয়েছে? রাতে তো পাঞ্জাবি পরে ঘুমাবে না নিশ্চয়ই?’
আজমাঈন বললো,’সমস্যা নেই আমি ফয়েজের থেকে নিয়ে নিচ্ছি। একদিনের ব্যাপারই তো।’
‘আমি এনে দিচ্ছি।’
পাঞ্জাবি পরে গরম লাগছিল খুব, যাক এখন ভালোই হলো। সাদা টিশার্টের সাথে এ্যাশ কালারের ট্রাউজার। পরার পর শান্তি লাগলো। এতো গরমের ভেতরেও নূর ওড়না দুপ্যাচ দিয়েছে মাথায়। গরম লাগে না নাকি? আজমাঈন খাটের সাথে হেলান দিয়ে বসলো। রুম স্প্রে করা হয়েছে বোধহয়, সুগন্ধি এসে নাকে সুরসুরি দিচ্ছে। ছড়ানো ছিটানো পাপড়ি গুলো দেখে মৃদু হেসে ফোনটা হাতে নিলো। রাত সাড়ে এগারোটা বাজে, কিভাবে কথা শুরু করবে বুঝতে পারছে না। ভেবেচিন্তে ফোনে ম্যাসেজ করলো। নিজের রুমটা কেমন অগোছালো হয়ে গিয়েছে বিধায় নূর একটু গুছিয়ে রাখছে। আজমাঈন ওয়াশ রুম থেকে চেঞ্জ করে এসছে, টের পেয়েও সে এদিকে ফিরেনি। ফোনে ভাইব্রেশন করে উঠলো কয়েকবার। হাতে নিয়ে দেখলো খাটের উপর বসে থাকা ব্যক্তির ম্যাসেজ।
‘প্যারাসিটামল দেওয়া যাবে? আমার ওষুধ গুলো ফেলে এসেছি।’
নূরের মনে পড়ে গেল গতকালের ঘটনা, আইশার ম্যাসেজ দেখেছিল সে। দেখতে দেরি হয়ে গিয়েছিল অনেক। তারপর আইশার সাথে আর কথা হয়নি। নূর ফোন রেখে আজমাঈনের ওষুধ গুলো বের করলো। যাওয়ার আগে আইশা দিয়ে গেছে। পানির বোতলটা এনে এগিয়ে দিতেই ফোন ছেড়ে চোখ তুলে তাকায় আজমাঈন। ওষুধ গুলো দেখে জিজ্ঞেস করে,’কোথা থেকে এলো?’
‘আইশা দিয়ে গেছে।’ আজমাঈনের মন ঠান্ডা হয়ে গেল তৎক্ষণাৎ। অবশেষে মেয়েটার মুখ ফুটে কথা বের হলো। পানির বোতলটা নিয়ে বললো,’পাশে বসবে প্লিজ! কেউ পাশে না বসলে আমি ওষুধ খেতে পারি না। গলায় আটকে যায়।’
ভারি আশ্চর্য হলো নূর, এ কেমন কথা? পাশে না বসলে গলায় ওষুধ আটকে যায়! ওর আব্বুকে তো এমন কথা বলতে শোনেনি। তিনি তো আজমাঈনের চেয়ে আরো বেশি ওষুধ খায়। সবার অভ্যাস তো এক নয়। নূর পাশে বসলো ঠিক, তবে দূরত্ব বজায় রেখে। ওষুধ গিলে বোতল টা পাশে রেখে আজমাঈন বলে, ‘তুমি কি এখনই ঘুমিয়ে পড়বে?’
নূর মাথা নেড়ে না বোঝায়। অন্যান্য দিন এই সময় পর্যন্ত সে ডিজাইনের কাজ করে তারপর ঘুমাতে যায়। আজ কিভাবে ঘুমানোর কথা বলবে। অবশ্য ওর ভাবনায় যা আসে আজমাঈন তা বুঝে নেয়। আজমাঈন বললো,’তাহলে কি করা যায়? তুমি তো আমার সাথে গল্প করবে না। আর আমি চুপ থাকতে পারি না। কি করা যায় তুমিই বলো।’
নূর কিছু বলে না, কি বলবে ভেবে পায়না। কি বলা যায়? ও যখন একা থাকত তখন ট্যালি কাউন্টার হাতে নিয়ে এক মনে দোয়া পড়তো। আজ এই দিনে স্বামী স্ত্রী মিলে তো দোয়া পড়ে না, তাদের কিছু কথাবার্তা থাকে। এই বিষয়ে অজ্ঞ নূর। ওষুধ গুলো কোনরকমে হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াতেই থমকে গেল।
ওড়নার কোণা টেনে ধরেছে আজমাঈন।
চলবে,,,,
Share On:
TAGS: ঈশিতা রহমান সানজিদা, পদ্মপ্রিয়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১৫
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ২০
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১৭
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ২৩
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ২৫
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১৮
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৪
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১৪
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৫