Golpo কষ্টের গল্প পদ্মপ্রিয়া

পদ্মপ্রিয়া পর্ব ২০


#পদ্মপ্রিয়া

#পর্ব_২০

#ঈশিতা_রহমান_সানজিদা

‘একটা ছেলেকে স্বামী হিসাবে মানতে পারবে? এই ধরো আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে তোমার বিয়ে হয়ে গেল, পারবে?’

নূরের নেকাব তোলা, উস্তাজা গভীর চাহনিতে তাকিয়ে আছে। যা নূরের হৃদয় স্পর্শ করে দিচ্ছে বারবার। ভয়ে বুক ধড়ফড় করছে। বিয়ে!! সেতো বিরাট ব্যাপার, অচেনা ছেলের সাথে সারাজীবন কাটানোর চেয়ে প্রথম সাক্ষাৎ টা বেশি ভয়াবহ বলে মনে করে নূর। একটা ছেলের মন বুঝতে পারার সক্ষমতা এখনও হয়নি ওর। মেয়েটা যে জবাব দিতে পারবে না তা উস্তাজা আগেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। উস্তাজা বলেন,’তোমার এই চুপ থাকা, কারো সাথে মিশতে না পারা, সহপাঠীদের সাথে ভালো সম্পর্ক না রাখাটা কত বড় বিপদ বয়ে আনছে তোমার জীবনে জানো কি? এমন আচরণ বিয়ের পর স্বামীর সাথে করলে সেটা খারাপ দিকে চলে যাবে। নতুন পরিবেশে যাওয়ার পর যদি নিজেকে না বদলাও তাহলে সমস্যাটা তোমার হবে। স্বামীর সাথেও সহজ হতে পারবে না।’

নূর চোখ নামায়, কন্ঠে তার নমনীয়তা,’আমি বুঝতে পারছি উস্তাজা, কিন্তু আমার সময় লাগবে। এতদিন আমি ভিন্ন পরিবেশে ছিলাম। আব্বু ব্যতীত আমার জীবনে কেউ নেই। কারো আদর, ভালোবাসা পাইনি। এমনকি নিজের মাকেও সংসার করতে দেখিনি। ভাবি, মা সবসময় নিজেদের নিয়ে বেশি ব্যস্ত ছিলেন। তাই এই বিষয়ে আমার অতো জানাশোনা নেই।’

যাক অন্তত নিজের মনের ভাবটা সামনে এনেছে মেয়েটা। এতেই উস্তাজা মনে মনে খুশি হলেন। বলেন,’তুমি সব গুণের অধিকারী। তোমার বাবার কাছে শুনেছি তার ব্যবসার হাল কিভাবে ধরেছো। এটা প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু এই দিক থেকে পিছিয়ে থাকলে চলবে না।’ উস্তাজা একটু থেমে বলেন,’যদি কোন ছেলে তোমাকে বিয়ে করে নিজেকে পরিবর্তন করতে চায়, ধর্মের পথে ফিরে আসতে চায় তাহলে তার সাথে সাথে তোমার কত খানি সোয়াব হবে জানো কি? আল্লাহর পথে ফিরে আসার পুরষ্কার সম্পর্কে জানো তো?’

মাথা নেড়ে হ্যাঁ জানায় নূর। উস্তাজা এবার চমৎকার হাসলেন। মেয়েটা ভালো বুঝদার আছে। তিনি খুব বেশি কিছু বললেন না। বাকিটা নূরের হাতে ছেড়ে দিলেন।

————-

আজমাঈন বিকেলের দিকে বাড়ি থেকে বের হলো। বাড়ির পরিবেশ থমথমে। মা ভীষণ রেগে আছেন। তার বান্ধবীর মেয়েকে বিয়ে করবে না তা ঠিক আছে, কিন্তু পালানোর দরকার কি ছিলো? তাও বাপের সাথে মিলে? প্রিয় বান্ধবীর কাছে নাক কাটা গেল। গতকাল ওরা বাড়িতে ফেরার পর এক চোট ঝড় চলে গেছে। এখনও গাল ফুলিয়ে বসে আছেন তাহমিনা। আজমাঈন জানে দু’দিন পর এমনিই ঠিক হয়ে যাবে। তবুও আজ বাসায় এসে মা’কে বোঝাতে হবে। তার আগে রাশেদ সাহেবের সাথে দেখা করতে। তিনি জরুরি তলব করেছেন। কি কারণে তা বুঝতে পারছে না আজমাঈন। ডেকে নিয়ে যদি না করে দেয়? এসব উল্টাপাল্টা চিন্তা করতে করতে যাচ্ছে সে।

গতকাল রাতে বাপ বেটা ফিরেই ছক কষে ফেলেছে। আজমল শিকদার আজ ফজরের নামাজের সময় টেনে হেঁচড়ে ছেলেকে উঠিয়েছেন। আজমাঈন ও টলতে টলতে উঠেছে। আজমল শিকদার ধমকে বলেছেন,’আজ থেকে তোর ক্লাস শুরু, যতদিন পর্যন্ত নামাজ পড়া শিখবি ততদিন জামাতের সাথে নামাজ পড়বি। অবশ্য জামাতের সাথে নামাজ পড়া বেশি ভালো। চল চল, পাঞ্জাবি পর।’

আজমল শিকদার খুশি হলেন, প্রতিদিন ফজরের সময় একা একাই মসজিদে যান। এখন থেকে ছেলের তার সঙ্গী হলো। কিন্তু ওই ভোরেই বিপদ ঘটিয়ে ফেললো আজমাঈন। নামাজ পড়ে তাড়াহুড়ো করে বের হতে গিয়ে গেইটের সাথে ধাক্কা খায়। হাত দিয়ে নিজেকে সামলাতে গিয়ে তৎক্ষণাৎ কেটে গেল। সামান্য কাটেনি, সেলাই পড়েছে তিনটা। ঘা এখনও তরতাজা। এই হাতেই ড্রাইভ করছে সে। বাবার কথা উপেক্ষা করে বেড়িয়ে এসেছে। শক্ত হাতে স্টিয়ারিং ধরতে গেলে ব্যথা লাগছে খুব। সে ব্যথাকে পাত্তা না দিয়ে দুই ঘন্টা ড্রাইভ করে রাশেদ সাহেবের বাড়ির সামনে এসে থামলো।

পরনে কালো রঙের শার্ট ও প্যান্ট। গাড়ি থেকে নেমে ঘন চুলে বা হাত চালালো। গলা শুকিয়ে এসেছে এখনই, চব্বিশ ঘনটাও পার হয়নি আবারও সে এই বাড়িতে এসেছে। রাশেদ সাহেব হুটহাট কি সিদ্ধান্ত নিলেন? আজ হয় সে রিজেক্ট হবে আর নাহয় সিলেক্ট হবে। শার্ট টেনে ঠিক করতে করতে কলিং বেল বাজায় সে। কাজের লোক দরজা খুলে দিলো, রাশেদ সাহেব সোফায় বসে আছেন। ভাবে বোঝা যাচ্ছে তিনি আজমাঈনের জন্য অপেক্ষা করছেন। আজমাঈন সালাম দিয়ে বসলো। রাশেদ সাহেব জবাব দিলেন। ঘাড় ফিরিয়ে কাজের লোককে বললেন,’নূর কি এখনো রান্নাঘরে?’

নামটা কানে এসে বাজতেই চট করে তাকায় আজমাঈন। কাজের মেয়েটা মাথা নাড়ে। রাশেদ সাহেব বলেন,’ওকে বলো জুস করে দিতে।’ আজমাঈনের দিকে তাকিয়ে বলেন,’জুস খাবে নাকি চা, কফি?’

আজমাঈন ঠোঁট ছড়িয়ে হাসে,’গরম পড়েছে খুব, ঠান্ডাই হোক।’

মেয়েটা চলে যেতেই রাশেদ সাহেব আজমাঈনের দিকে তাকান। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন,’আমি অনেক ভেবেছি তোমার বিষয়ে। কিন্তু কোথাও কিছু একটা কম হয়ে যাচ্ছে।’

স্থির চোখে তাকিয়ে রইল আজমাঈন, সে কথাটা বোঝার চেষ্টা করছে। রাশেদ সাহেব এবার সব কথা ভেঙে চুরে বলেন,’দেখো আমার মেয়ে এখন বিয়ের জন্য প্রস্তুত নয়।’

আজমাঈন থমকায়, নূর তাহলে না করে দিয়েছে! ওই দিনের ঘটনার জন্য কি? কতগুলো মেইল করে সরি বললো তাও মেয়েটা এতটুকু নরম হলো না! নাকি আজমাঈনকে বিয়ে করতে চায়না। ওর ভেতরে এখন নানা দ্বন্দ্ব চলছে। কথা বলতে পারছে না। রাশেদ সাহেব ফের বলেন,’দেখো আমার মেয়েকে আমি নিজেই মানুষ করেছি, জন্মের পর থেকে ওর প্রতি ওর মা উদাসীন ছিলো, এখনও। এইযে দেখছো আমি একাই তোমার সাথে কথা বলছি। বাড়ির কেউই উপস্থিত নেই। তাহলে বোঝো আমার মেয়েকে কে কেমন চোখে দেখে? ওর একমাত্র আমি আছি আর কেউ নেই। মেয়েটা মুখচোরা স্বভাবের, অন্য কারো সাথে এতো সহজে মানিয়ে নিতে পারবে না। আমার সাথে যতটা সহজভাবে কথা বলে অন্য কোন মেয়ের সাথেও ততকা সহজ ভাবে কথা বলে না। আমি কিভাবে ওকে ঠিক করব জানি না। তবে মনে হচ্ছে ও এখন বিয়ের জন্য প্রস্তুত নয়। তাছাড়া তুমি নিজেও কি ওর এই স্বভাবের সাথে মানিয়ে নিতে পারবে? আমি নাহয় বাবা, আমার ধৈর্য আছে। কিন্তু তোমার?’

রাশেদ সাহেবের কথার ভাবে অন্য কথা লুকিয়ে আছে এবং তা কি আজমাঈন ধরে ফেললো। এসব বোঝার মতো বুদ্ধি ওর আছে। আজমাঈন অকপটে স্বীকার করলো,’আমি সবকিছু মানতে প্রস্তুত। জানি না আপনার মতো করে পারব কিনা, তবে আমার জায়গা থেকে যথাসম্ভব চেষ্টা করে যাব। হয়তো আমার থেকেও ভালো ছেলে পাবেন আপনার মেয়ের জন্য, সে আমার থেকে ভালো হবে কিনা জানি না তবে আমি আমার জায়গা থেকে চেষ্টা করব।’

কথার মাঝে কাজের মেয়েটা জুস এবং ফল, মিষ্টি নিয়ে এলো। বললো,’আর কিছু লাগলে বলবেন।’

রাশেদ সাহেব বলেন,’নূরকে রুমে যেতে বলো।’

আজমাঈন মাথা নিচু করে রাখল। হয়তো এখান দিয়েই মেয়েটা রুমে যাবে। ওর দিকে তাকানো যাবে না। আজমাঈন এসেছে একথা নূর জানে। মাথার ঘোমটা টেনে দিলো ভালো করে। হাত দুটো ওড়নার তলায় লুকিয়ে ধীরে ধীরে বেড়িয়ে এলো রান্নাঘর থেকে। স্যান্ডেলের থপথপ আওয়াজ শোনা মাত্রই মাথা নিচু করে চোখ নামায় আজমাঈন। নূরের প্রস্থান না হওয়া পর্যন্ত সে মাথা তোলে না। বিষয়টা রাশেদ সাহেবের কাছে বেশ লাগে। তিনি পদে পদে আজমাঈনের ব্যবহারে মুগ্ধ হচ্ছেন। ছেলেটা নূরের যোগ্য নয় একথা কেউই বলতে পারবে না। রাশেদ সাহেব জুসের গ্লাসটা আজমাঈনের হাতে তুলে দিলেন,’আমার মেয়ে খুব ভালো জুস বানায়। শুধু তাই নয়, লাচ্ছি বোরহানি ও ভালো বানায়। আগে আমাকে খেতে দিত এখন দেয়না এই পার্থক্য।’

আজমাঈন মৃদু হেসে গ্লাসটা হাতে নিতেই ওর ক্ষতটা চোখে পড়লো। বলেন,’তোমার হাতে কি হয়েছে?’

আজমাঈন হাত লুকানোর চেষ্টা করে,’সামান্য কেটে গিয়েছে।’

‘ব্যান্ডেজের বাইরেও যে রক্ত চলে এসেছে। দাঁড়াও আমি আবার ব্যান্ডেজ করে দেওয়ার ব্যবস্থা করছি।’

তিনি কাউকে ডাকলেন, এইড বক্স আনতে বললেন। তারপর কন্ঠস্বর খানিকটা নিচু করে বলেন,’আমার মেয়েকে তো দেখোনি, বিয়ের আগে ছেলে মেয়ে দুজন দুজনকে দেখতে হয়। তোমাকে তো নূর দেখেছে। যাওয়ার আগে নূরকে দেখে যেও।’

কথাটি কানে যাওয়া মাত্রই আজমাঈনের শ্বাস যেন আটকে এলো। সে খুশি হওয়ার কথাও ভুলে গেল। নিজেকে আজ সফল মনে হচ্ছে আজমাঈনের। জীবনে যা চেয়েছে তা সবসময় পায়নি। আজমল শিকদার কৃপণ ছিলেন সে কারণে নয়। তবুও সব সময় কি সব পাওয়া যায়? আজ সেসব না পাওয়ার বেদনা চাপা পড়ে গেল যেন। জুসের গ্লাসে চুমুক দিয়ে মনের উত্তেজনা চাপিয়ে রাখলো। রাশেদ সাহেব আজমাঈনকে ড্রয়িং রুমে বসিয়ে রেখে নূরের রুমে গেলেন।

নূর তখন রুম গুছিয়ে রাখছে। বাবাকে দেখে হেসে এগিয়ে এলো,’তুমি আসতে গেলে কেন? সিঁড়ি বেয়ে উঠতে না করেছি না? এসো বসো!’

রাশেদ সাহেব খাটের উপর বসেন। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলেন,’আমি তোর ভালো চাই একথা মানিস?’

নূর ভ্রু জোড়া কুঁচকে তাকায়,’এতে কোন সন্দেহ আছে তোমার? আজকাল তুমি অন্যরকম হয়ে যাচ্ছ আব্বু। হয়েছি কি তোমার?’

‘মেয়ের বিয়ের কথা চিন্তা করতে গেলে এমনি হয় রে মা। আচ্ছা তোকে একটা কথা বলি। সব মেয়েকেই শ্বশুর বাড়িতে যেতে হয়, যেমন তোর বোন রাহা গেছে। দেখেছিস ওরা কত সুখে আছে।’

নূর বাবার পাশে বসে। হাত ধরে বলে,’আমার বিয়ে দিতে চাইছো বিধায় এসব গল্প শোনাচ্ছ তাই না?’

মেয়ের কথায় উচ্চস্বরে হাসেন রাশেদ সাহেব। বলেন, ‘ভালো বুদ্ধি আছে তোর, কিভাবে মনের কথা ধরে ফেলিস। আচ্ছা সব কথা রাখ, আজমাঈন ছেলেটাকে মন্দ লাগছে না বল?’

একথা শুনে নূর নিরব হয়ে গেল। মুহুর্তেই মন খারাপ হয়ে গেল। রাশেদ সাহেব ফের বলেন,’আমি তোর ভালো চাই রে মা! তাই আজমাঈনের সাথেই তোর বিয়েটা দিতে চাচ্ছি। ছেলেটা তোর জন্য নিজেকে বদলে ফেলতে চাইছে।’

নূর অন্যদিকে চোখ ফেরায়,’জানি, কাল রাতেও বলেছ আমাকে।’

রাশেদ সাহেব মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেন, ‘মন খারাপ করিস না, আমি জানি আমাকে ছেড়ে যেতে তোর কষ্ট হবে। যাক ওকথা বাদ দে। ছেলেটা ড্রয়িং রুমে বসে আছে। ভাবলাম আজ এসছে যখন তোকে একবার দেখে যাক।’

বুকটা ধক করে উঠল নূরের, আবার ওই ছেলেটার সামনে যেতে হবে? সেদিনের কথা মনে পড়ে গেলো ওই ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে অনেক বেশি সময় লেগেছিল। তবে আজকের কথা ভিন্ন, এটাকে বৈধ হিসাবে ধরা যায়। মুখ দিয়ে কথা বের হলো না নূরের।

সময় গড়ালো বিশ মিনিট, আজমাঈন নূরের রুমের সামনে এসে দাঁড়ায়। দরজা হাট করে খোলা। ভেতরে চোখ ধাঁধানো লাইট জ্বলছে। দরজায় হাত রেখে ভেতরে পা রাখে এ। নূর পর্দার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। বলতে গেলে এতক্ষণ ধরে সে আজমাঈনের অপেক্ষায় ছিলো। ছেলেটা রুমে পা রাখতেই চোখ বন্ধ করে পর্দা খামচে ধরলো নূর। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। আজমাঈন মাথা নিচু করে ভেতরে আসে। রাশেদ সাহেবের কথা রাখতেই আসা, তাকে তো ওইদিনের ঘটনা বলা যাবে না। নূর অস্বস্তিতে পড়বে জানত আজমাঈন। তবুও সে এসেছে। ওর মনে হচ্ছে দাঁড়িয়ে থাকা দায়। খাটের এক কোনায় হুট করেই বসে পড়লো। ছেলেটার এমন কান্ডে চমকে উঠে নূর। এক পলক চোখ তুলে তাকিয়ে ফের চোখ নামায়।

এসির টেম্পারেচার হাই অথচ নূর ঘামছে। ঠোঁটের উপরে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে আছে। রুমে এক অস্থির নিরবতা, যা কেবল নূর টের পাচ্ছে। ওর রুমটা বেশ শৌখিন। দেওয়ালে অফ হোয়াইট রং করা, জানালায় হালকা বাদামি রঙের পর্দা। কাঠের ফার্নিচার আছে তবে অল্প, রুমটা বেশ বড়। নূর নিজের পছন্দ অনুযায়ী সাজিয়েছে। এক পাশে এ্যাশ গ্রে কালারের লো প্ল্যার্টফর্ম বেড, ক্রিম কালারের বেডশিট। তিন, চারটা বড় কুশন এবং সফট থ্রো ব্ল্যাঙ্কেট। দরজা থেকে সামান্য একটু দূরে বড় আয়নার ড্রেসিং টেবিল।পায়ের নিচে সাদা রঙের ম্যাট, রুমের এক কোণে বেইজ ভেলভেট চেয়ার। সাথে ছোট একটি টেবিল। টেবিলের উপর একটি ল্যাম্প রাখা। এছাড়াও রুমে কিছু সুগন্ধি ক্যান্ডেল দেখা যাচ্ছে।

মাত্র দুই মিনিটের মধ্যে আজমাঈন সব দেখে নিয়েছে তাও আড়চোখে। এর আগে অবশ্য একবার এসেছিল তবে এত মনোযোগ দিয়ে রুমটা দেখা হয়নি। সে আপাতত নূরের বিছানার উপর বসে আছে রুমের দরজার দিকে মুখ করে। বেডের পাশে আজমাঈনের পেছনের দিকে জানালার বড় বড় পর্দা লাগানো। তারা সুন্দর ফ্লোর ছুঁয়েছে, সেই পর্দা খিচে ধরে দাঁড়িয়ে আছে নূর। মাথা তুলছে না এবারও। যদিও আজমাঈন পেছন ফিরে ওকে দেখেনি। তবে দেখতে বাঁধা নেই আজ। তবুও কেন জানি পেছন ফিরলো না সে। উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে গেল বেইজ ভেলভেট চেয়ারের কাছে। টেবিল থেকে খাতা এবং কলম টেনে নিলো। খেয়াল করলো কলমটা রূপার তৈরি। মৃদু হাসে আজমাঈন। অতঃপর দ্রুত কিছু একটা লিখে দিয়ে বেরিয়ে যায়।

নূরের অস্বস্তির অবসান ঘটলো। সে দৌড়ে দরজা বন্ধ করে দিলো এবং ছুটলো ছোট্ট টেবিলের দিকে। চেয়ারে বসে কলমটা হাতে নিলো‌। আজমাঈন কাগজে গোটা গোটা অক্ষরে লিখেছে, “দুঃখিত আজও তোমার মুখটা ভালো করে দেখতে পারলাম না। তবে আজ অনুমতি ছিলো দেখার।”

কয়েক লাইন দূরত্বে আবার লিখেছে,

“তোমাকে দু’চোখ ভরে দেখার জন্য খোদার নিকট হতে অঙ্গীকার পত্র নিয়ে শীঘ্রই আসছি ইনশাআল্লাহ।”

জোরেশোরে ঝটকা লাগলো নূরের। মনে হলো গাঁয়ে কাটা দিয়ে উঠল। আজমাঈনের গায়ের কড়া পারফিউমের গন্ধ এখনও রুমে ভাসছে। নূর হঠাৎ কেমন অশান্ত হয়ে গেল। হঠাৎ করে এতো গরম লাগছে কেন কে জানে। হাঁসফাঁস করতে করতে সে মাথায় পেঁচানো ওড়না খুলে ফেললো। এসির টেম্পারেচার ঠিকই আছে, নূর পানির বোতল হাতে নিয়ে অনেকটা পানি পান করলো। তবুও তার অস্থিরতা কমলো না।

———-

সাইমন ভীষণ চিন্তিত। মায়ের কাছ থেকে টাকা নিয়ে অর্ধেকের বেশি লোন শোধ করেছে সে। এখনও আরো টাকা দেওয়া বাকি। তার উপর মা যে টাকা ধার করে এনেছে সে টাকা ফেরত দিতে হবে। কি করবে বুঝতে পারছে না। রাশেদ সাহেব কে একবার সম্পত্তি ভাগের কথা বলতে চেয়েছিল কিন্তু সাহস হয়ে ওঠেনি। নিজের এই ভরাডুবিতে যে কেউ পাশে থাকবে না একথা সে কখনো ভাবতেই পারেনি। চিন্তিত মুখে বসে রয়েছে সে, রাতের খাবার টাও ঠিকমতো খেতে পারেনি। অনুপমা স্বামীর এমন অবস্থা দেখে বলে,’অতো চিন্তা করো না তো, একটা না একটা ব্যবস্থা হয়েই যাবে।’

‘কি হবে আর? এতগুলো টাকা, ফেরত দিতে হবে তো।’

‘শুনলাম তোমার বোনকে নাকি ওই ছেলের সাথে বিয়ে দেবেন বাবা? এই ছেলের মধ্যে কি দেখলেন তিনি? খুব তো বলতেন ধার্মিক ছেলে ছাড়া মেয়ের বিয়ে দেবেন না। আমি একটা ছেলে আনলাম তাও পছন্দ হলো না।’

সাইমন মৃদু ধমকে বলে,’চুপ থাকো তুমি। আমি মরছি আমার জ্বালায়, সংসারের কুট কাচালিতে আমাকে টানছ কেন?’

অনুপমা মুখ বাঁকিয়ে বলে,’তাহলে কাকে শোনাব? তোমার ভালোর জন্যই তো বলছি। ওই ছেলেটার সাথে বিয়ে হলে নূর ঢাকায় চলে যাবে। ওতো দূর থেকে ও অফিসে আসতে পারবে তোমার বোন? তখন ধীরে ধীরে ওর ব্যবসা দেখাশোনার নাম করে ঢুকে পড়ো। তার পর বলবে তোমার নামে ব্যবসা দিয়ে দিতে। তাছাড়া বিয়ে হলে বাচ্চা হলে তো ব্যবসা করতে পারবে না।’

সাইমন মাথা তুলে তাকায়, কথাটা ঠিকই বলেছে অনুপমা। এই সুযোগে যদি সবকিছু হাতানো যায়। অনুপমা ফের বলে,’তার আগে তোমাকে একটু ভালো মানুষি করতে হবে। বোনকে তো পাত্তাই দিতে না। এখন দেখো সেই বোন তোমার মাথায় চড়ে বসেছে। একটু আধটু ওর সাথে কথাবার্তা বলো। যাতে তোমার প্রতি ওর মন গলে একটু।’

স্ত্রীর এই বুদ্ধিটাও মনে ধরলো সাইমনের। সে মনে মনে বেশ খুশিই হলো। নূরের সম্পর্কে ও যতটা না জানে তার থেকে বাড়ির কাজের মেয়েটা আরো ভালো জানে। তাই পরদিন সে নূরের পছন্দ অপছন্দ সব জেনে নিলো। নূর মিষ্টি জাতীয় খাবার খেতে পছন্দ করে বেশি। সে অনুযায়ী অনেক আইসক্রিম কিনে ফ্রিজ ভর্তি করলো। অনুপমাকেও নূরের কাছাকাছি থাকতে বলে দিলো, যেন নূরের সাথে কথাবার্তা বলতে পারে।

চলবে,,,

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply