তোমার হাসিতে পর্ব ৩২
ফারহানাকবীরমানাল
৩২.
কোর্টের কাজ শেষ। এক শুনানিতে রায় দিয়ে দেবে এতটা আশা করতে পারিনি। তবে এই কেস এখানে শেষ হবে না। আপিলের আবেদন হবে। সেখানে তারিখ পড়বে। বিচারের রায় কার্যকর হতে কয়েক বছরও লাগতে পারে। বিচার ব্যবস্থা এমনই। নামে দহরমমহরম হলেও কাজে তেমন নেই। ক্লান্তির নিঃশ্বাস ফেলে কোর্টরুম থেকে বেরিয়ে এলাম। দুপুর হয়ে গিয়েছে। রোদে ঝাঁ ঝাঁ করছে চারদিক। ফুফু আমার হাতে ধরে একপাশে টেনে নিয়ে গেল। গলার স্বর অনেকখানি নিচু করে বলল, “তোর মা আসেনি?”
“না, মায়ের কোন কাজ নেই। শুধু শুধু আসবে কেন?”
“তা ঠিক। আমারও আসতে ইচ্ছে করছিল না। তিমুটার জন্য আসতে হলো।”
“আচ্ছা।”
“তা তোরা কোথায় থাকবি? বাড়িতে যাবি না?”
“কোথায় থাকব জানি না। এখনও কিছু ঠিক করা হয়নি। তবে ওই বাড়ি ফেরার ইচ্ছে নেই।”
“ইচ্ছে নেই! ইচ্ছে থাকবে না কেন? বাড়ি তো মার না। আব্বার বাড়ি। শরিয়ত মতো তিন ভাইবোনের ভাগ আছে।”
“তা আছে। এই ব্যাপারটা আব্বা দেখবে। আমি কিছু বলতে চাই না।”
“মা তোদের কথা জিজ্ঞেস করছিল।”
“ফুফু, আমি এসব কথা জানতে চাই না। এসব জেনে আমার কোন লাভ নেই। ছোট চাচাকে অপছন্দ করি এমনটা না। তবে সে কখনো আমায় পছন্দ করতে পারেনি। তানহাকে এক ছেলের সাথে দেখেছিলাম– এ কথা বাড়িতে বলায় সে আমার জন্ম তুলে কুৎসিত একটা প্রশ্ন করেছে। আমাকে মা’র’তে চেয়েছে। এরপরও তার প্রতি যদি কোন অনুভূতি বাঁচে তা শুধু ঘৃণা। এর বাইরে কিছুই নেই।”
“সে কথা আমি বুঝতে পারি।”
“বুঝতে পারলে ভালো। আর কিছু?”
“না, আর কিছু না।”
ফুফু আমার দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে তিমুর দিকে তাকালো। উঁচু গলায় বলল, “তিমু তোর বড় মামা কোথায়?”
তিমু ভ্রু কুঁচকে মাথা দোলালো। সে জানে না। ফুফু বাবাকে খুঁজতে চলে গেল। তার বাবার সাথে কথা আছে। আমি সহজ ভঙ্গিতে এদিক ওদিক তাকাতে লাগলাম। তিমু বলল, “বাদশা ভাই আসলো না কেন?”
“বাদশার মামার শরীর খারাপ। তাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গিয়েছে।”
“উঁহু! সে-ও তো এই কেসের সাক্ষী ছিল। আসেনি দেখে ভীষণ অবাক হয়েছি।”
“ভালো।”
“সাজ্জাদ ভাই, তুমি কী কিছু ভাবছ?”
“না, আমি কিছু ভাবছি না।”
“আমরা কাল বাড়ি ফিরে যাচ্ছি। ছোট মামার বিয়েতে হবে। খুব মজা করব– এই আশায় এসেছিলাম। কিন্তু সে-সবের কিছুই হলো না। উল্টো ছোট মামা এখন জে’লের ভেতরে।”
আমি কিছু বললাম না। তিমু একটু থামল। খানিকক্ষণ চুপ থেকে বলল, “মানুষের জীবন গল্পের মতো হয় না, তাই না সাজ্জাদ ভাই?”
“এ কথা কেন জিজ্ঞেস করছিস?”
“এমনিতেই! এই তোমার কথাই ধরো। সেই বড় মামানিকে গহনা বানানো দিয়ে শুরু হয়েছিল। সেই গল্প কোথায় এসে ঠেকলো! আমি যদি গল্পটা লিখতাম। কাহিনীটা আরও একটু সুন্দর করে সাজাতাম।”
বাবাকে পাওয়া যাচ্ছে না। কল দিয়েছিলাম রিসিভ করেনি। ফুফুকে কল দিলে সে বলল, “তোর আব্বা চা খেতে এক দোকানে ঢুকেছে। এখনও সেখানে বসে আছে। চা খাওয়া শেষ হলে আমরা একটা কফিশপে বসব। অনেক কথা আছে।”
ফুফু কী বলবে সেই ব্যাপারে আমার কোন ধারণা নেই। জিজ্ঞেস করতেও ইচ্ছে করল না। তিমু খানিকক্ষণ চুপ করেছিল। আবারও কথা বলা শুরু করল,
“সাজ্জাদ ভাই, আমি তোমার গল্পটা লিখলে কীভাবে লিখতাম জানো?”
“না জানি না।”
“শুনতে চাও। তুমি শুনতে চাইলে আমি বলতে পারি। খুব গুছিয়ে বলব। বিরক্ত হবে না।”
“বললে বল। তোর ইচ্ছে।”
“তুমি আঠারো উনিশদিন ধান কাটতে, টুকটাক কাজকর্ম করতে। টাকা জোগাড় হতো। বড় মামানিকে গহনা বানিয়ে দিতে। তানহার ছোট মামার সাথে বিয়ে হতো। সে বিয়ের দিন বড় মামানির হাতের আংটিটা পছন্দ করে ফেলত। এরপর নানি আপু ছোট মামানিকে ওই আংটি দেওয়ার জন্য বড় মামানিকে বলত। জোরজবরদস্তি শুরু করত। তুমি বড় মামানিকে প্রটেক্ট করতে। ভালো বলেছি না?”
“হ্যাঁ, ভালো বলেছিস।”
“সংসার ভেঙে যাওয়া খুব খারাপ, সাজ্জাদ ভাই। নানি আপুর অবস্থাও খারাপ হয়ে যাবে। তিনি এখন একটা ঘোরের মধ্যে আছেন। আমরা চলে গেলে তার ঘোর কে’টে যাবে। তারপর বসে বসে কাঁদবে।”
“আমাকে কী করতে বলছিস?”
“কিছু করতে বলছি না। তবে তুমি অনুমতি দিলে একটা অনুরোধ করব।”
“কী অনুরোধ?”
“ছোট মামার সাথে দেখা করতে যাব। মাকে বলেছি। সে আমাকে নিয়ে যাবে না। উল্টো নানান কথা শুনিয়ে দিয়েছে।”
“আমি পারব না তিমু।”
“একটু পারলে খুব বেশি ক্ষতি হয়ে যাবে না। কোর্ট থেকে জে’ল বেশি দূরের পথ না। আমি একাই চিনে চলে যেতে পারতাম। তবে যেতে পারব না। মা আমাকে যেতে দিবে না।”
“তিমু!”
“কিছু বলবে সাজ্জাদ ভাই?”
“তোর কথার ধরন অন্যরকম লাগছে। কী হয়েছে?”
তিমু মুখ ঘুরিয়ে চোখের পানি মুছল। তরল গলায় বলল, “একটা গল্প পড়ছি। কথার ধরন ওই গল্পের এক চরিত্রের মতো হয়ে যাচ্ছে।”
“নায়িকার চরিত্র?”
“নাহ! আমি নিজেকে নায়িকা মনে করি না। প্রতিটা গল্পে হাতে গোনা এক দু’জন অবহেলিত চরিত্র থাকে। তারা গোটা গল্পের সম্পূর্ণ আবেগের উনপঞ্চাশ শতাংশ নিজেদের ভেতরে ধরে রাখে। তবে শেষ পর্যন্ত কেউ তাদের মনে রাখে না।”
“যদি আমার এই গল্পের এমন চরিত্রের কথা বলতে বলি। কাদের কথা বলবি?”
“জায়েদা, বাদশা ভাই এবং রইস উদ্দীন।”
“আর কেউ নেই?”
“নাহ! আমার আর কাউকে মনে ধরে না।”
“ভালো। চল। জেলখানার দিকে যাই। সাক্ষাৎকারীদের লাইন লম্বা হতে পারে।”
যেমন আশা করেছিলাম তেমন হলো না। হাতে গোনা দুই একজন কয়েদিদের সাথে দেখা করতে এসেছে। ভিড়ভাট্টা নেই। তিমু বলল, “তুমি কী যাবে?”
“না, আমি যাব না।”
“চলো। এসো, আমার সাথে এসো। আমার মন বলছে তোমার ছোট মামার সাথে দেখা করা দরকার।”
দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিমু সাথে গেলাম। ছোট চাচা আমায় দেখে বিস্মিত হলো না। সরল চোখে তাকিয়ে রইল। এই ক’দিনে ছোট চাচার চেহারা ভেঙে গেছে। চোখের নিচে কালচে দাগ পড়ে গেছে। বোধহয় খেতে পারছে না। তিমু ছোট চাচাকে দেখে হাসল। কোমল গলায় বলল, “ছোট মামা, নিজের কাজের জন্য তোমার কোন আফসোস হচ্ছে না?”
ছোট চাচা ছোট একটা নিঃশ্বাস গোপন করল। তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, “আমার অবস্থা দেখে মজা নিতে এসেছিস?”
“নাহ! তেমন কিছু না। এমনি তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করল, তাই এসেছি।”
“দেখা শেষ হলে চলে যেতে পারিস।”
“দেখা শেষ হয়নি। আরও একটু দেখতে চাই। কখনো তোমাকে এত হিংস্র মনে করিনি। অথচ তুমি নিজের ভাইপোকে মে’রে ফেলতে চেয়েছিলে।”
“সব দেখা সবসময় সত্যি হয় না তিমু। এমনও হতে পারে যে আমরা যা দেখছি সেটা সত্যি নয়। বরং আমরা যেটা দেখছি না সেটাই সত্যি।”
“এ কথার মানে কী?”
“মানে কিছু না। চলে যা তিমু। তোরা আমার সাথে দেখা করতে আসবি না। ব্যাপারটা আমি পছন্দ করব না।”
তিমু কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে এলো। আমি বললাম, “কাঁদছিস কেন?”
“আমার কষ্ট হচ্ছে, তাই কাঁদছি।”
“লোকজন দেখবে তিমু।”
“লোকে দেখে দেখুক। মজা নিতে হলে মজা নিক। আচ্ছা, ছোট মামার কেসের তারিখ কবে পড়বে?”
“জানি না। এখনও কোন সিদ্ধান্ত হয়নি।”
“আচ্ছা, সিদ্ধান্ত হলে আমাকে জানবে। আমি ওইদিন আসব। কোর্টে দাঁড়িয়ে ছোট মামার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেব। আমি চাই ছোট মামার ফাঁ’সি হোক। তানহার বাবার মতো সে-ও নিজের কর্মফল ভোগ করুক।”
“আমি মা’রা যাইনি তিমু। শুধু হ’ত্যা চেষ্টা করা হয়েছে। সফল হয়নি। এক্ষেত্রে শা’স্তি হিসাবে মৃ’ত্যুদন্ড হয় না।”
“কখনোই কী হয় না?”
“হয়। যদি অপরাধী আগে থেকেই গুরুতর অন্যায় করে। ছোট চাচার তেমন কোন অপরাধ নেই৷”
“তাহলে? কী শাস্তি হবে ছোট মামার?”
“সর্বোচ্চ শা’স্তি যাবজ্জীবন কা’রা’দ’ণ্ড অথবা দশ বছর পর্যন্ত সশ্রম কা’রা’দ’ণ্ড এবং জরিমানা হতে পারে।”
তিমু ছোট্ট করে ওহ বলল। ফুফু কল দিচ্ছে। তিমুকে নিয়ে যেতে বলছে। বাবার সাথে তার কথা শেষ। তিনি বাড়িতে ফিরবেন না। নানাবাড়িতেও যাবেন না। অফিসে থাকবেন। অফিস কতৃপক্ষ নতুন বিল্ডিং ভাড়া নিয়েছে। সেখানে কাজ করছে। কাজের জিনিসপত্র দেখভাল করতে দুই চার লোক থাকবে। অফিসের কর্মচারী হিসাবে বাবা থাকবেন। কাজ শেষ হতে প্রায় এক সপ্তাহ লাগবে। এর মধ্যে নতুন বাসা দেখে ফেলবে। তারপর মাকে নিয়ে আসবে। মাঝারি ধরনের বাসা পাওয়া গেলে আমিও তাদের সাথে থাকতে পারব। নয়তো আমাকে হোস্টেলে পাঠিয়ে দেবে।
বাবার সিদ্ধান্তে বিস্মিত না হয়ে পারলাম না। তবে তাকে কিছু বললাম না। চুপ করে রইলাম।
নানাবাড়িতে যাব। সেই যে কাজের কিছু টাকা এখনো আমার কাছে আছে। বাজার করে নিয়ে যাব কি-না ভাবছি। বাড়িতে দু’দিন বাজার করেছিলাম। নানিদের কিছুই দেওয়া হয়নি। মা খুব গর্ব করে সবাইকে আমার কথা বলেছে। নানি খুব হেসেছে। আমার জন্য দোয়া করেছে।
কী কিনব ঠিক করে উঠতে পারছিলাম না। হঠাৎই মনে পড়ল– নানি গতরাতে ইলিশ মাছের কথা বলছিল। এ বছর নাকি তেমন ভালো ইলিশ খাওয়া হয়নি। কেজিতে চার পাঁচটা হয় এমন সাইজের কয়েকটা কিনে এসেছিল। সে মাছে প্রচুর কাঁটা। খাওয়া যায় না।
ভাবনা চিন্তা করে মাছ বাজারে চলে গেলাম। লোকজন নেই। দুপুরের সময়, সবাই নিজের কাছে ব্যস্ত। দোকানিও বসে বসে ঝিমচ্ছিল। আমাকে দেখে মুখ তুলল চাইল। মাছের দাম আকাশ ছোঁয়া। তবুও একটা কিনলাম। এক কেজি সাড়ে চারশো গ্রাম। উফফ! জাতীয় মাছ খেতে গিয়ে পকেটের অবস্থা নাজেহাল। একটা মাছ কিনতেই পকেট ফাঁকা হয়ে গেল।
মাছ দেখে নানি ভীষণ খুশি। দৌড়ে এসে মাছটা আমার হাত থেকে নিলো। ঝলমলে গলায় বলল, “তেলওয়ালা ইলিশ। পদ্মার মনে হচ্ছে।”
“পদ্মার মাছ নাকি গঙ্গার মাছ জানি না। তবে আমাকে ইলিশ ভাপা বানিয়ে খাওয়াতে হবে।”
“তা হবে। কত বড় মাছ। বেশ অনেক পদ হয়ে যাবে।”
সন্ধ্যা মিলিয়ে যাওয়ার পরপরই খেতে বসে গেলাম। রান্নার গন্ধে খিদে কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বাবা আসেননি। নানি তার জন্য চার পিস মাছ ফ্রিজে রেখে দিয়েছে। কয়েক গ্রাস মুখে দিতেই ফোন বেজে উঠল। অচেনা নম্বর। ভাতের থালা সরিয়ে রেখে কল রিসিভ করলাম। কল রিসিভ করে সালাম দিলাম। ওপাশ থেকে থমথমে গম্ভীর গলায় শোনা গেল। মাঝবয়েসী এক ভদ্রলোক। তিনি নিজেকে আমার ডাক্তার পরিচয় দিলেন। গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, “আমি কী সাজ্জাদের সাথে কথা বলছি?”
“জ্বি, বলছেন।”
“তোমাদের সাথে আমার কিছু কথা আছে।”
“জ্বি বলুন।”
“অনেক কথা। ফোনে বলা যাবে না। আগামীকাল আমার সাথে দেখা করবে। সাথে তোমার বাবাকেও নিয়ে আসবে। আমি তাকেও কল দিয়েছিলাম। তিনি কল রিসিভ করেননি।”
“জরুরি কিছু বলবেন?”
“হ্যাঁ, ভীষণ জরুরি। আগামীকাল সকালেই আমার সাথে দেখা করবে।”
“আচ্ছা করব।”
কল কে’টে গেল। হাত ধুয়ে খেতে বসলাম। খিদে ম’রে গেছে। আগের মতো করে খেতে ইচ্ছে করছে না।
চলবে
Share On:
TAGS: তোমার হাসিতে, ফারহানা কবীর মানাল
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
তোমার হাসিতে পর্ব ৯
-
তোমার হাসিতে পর্ব ২৮
-
তখনও সন্ধ্যা নামেনি পর্ব ১
-
তোমার হাসিতে পর্ব ১৫
-
তোমার হাসিতে পর্ব ২৫
-
তোমার হাসিতে পর্ব ২৭
-
তোমার হাসিতে সূচনা পর্ব
-
তোমার হাসিতে পর্ব ২
-
তোমার হাসিতে পর্ব ৩১
-
তোমার হাসিতে পর্ব ৮