ফারহানাকবীরমানাল
৩৩.(শেষের প্রথমাংশ)
সারাটা রাত উৎকণ্ঠার ভেতর কাটল। উৎকণ্ঠা এবং চাপা উদ্বেগ। ডাক্তার সাহেব আমাদের ডেকে পাঠালেন কেন? তবে কী আমার শরীরে বড় কোন সমস্যা দেখা দিয়েছে? কী হবে না হবে ভাবতে ভাবতে মাথা ধরে গেল। বাবা বললেন, “এত চিন্তার কিছু নেই। আমরা তো যাচ্ছি।”
মা আমাকে একা ছাড়েনি। সাথে এসেছে। বাবাও আছে। ডাক্তার সাহেব তার চেম্বারে দেখা করতে বলেছেন। চেম্বারে ঠিকানা টেক্সট করে দিয়েছেন। কেমন যেন ভয়ভয় করছে। বের হওয়ার আগে ফুফু কল দিয়েছিল। সে-ও নাকি আসবে।
ডাক্তারের চেম্বারে বেশ ভীড়। পঞ্চান্নজন লোকের সিরিয়াল নেওয়া আছে। সবাই আগেভাগে চলে এসেছে। বসার জায়গা নেই। ফুফু একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল। আমাদের দেখে এগিয়ে এলো। চিন্তিত গলায় বলল, “ডাক্তার কেন ডেকেছে?”
“জানি না। তেমন কিছু বলেনি।”
ফুফুর কপালে ভাজ পড়ল।
“এতো চিন্তার কিছু নেই। হয়তো তোর ওষুধপত্র বদলে দেবেন। শরীরের উপর দিয়ে যা গেল। তাতে ডাক্তারের নজরদারিতে থাকা ভালো।”
ভেবেছিলাম সবার শেষে আমাদের ডাক পড়বে৷ কিন্তু না। ডাক্তার সাহেব আমাদের ভেতরে ডেকে নিলেন। ইশারায় চেয়ার দেখিয়ে দিয়ে বললেন, “সবাই এসে ভালোই করেছেন।”
বাবা ফ্যাকাসে মুখে তাকালেন। নরম স্বরে বললেন, “খারাপ কিছু? না মানে হুট করে দেখা করতে বললেন।”
“না, খারাপ কিছু না। সাজ্জাদকে আবার চেক-আপ করতে হবে।”
“হঠাৎ চেক-আপ কেন?”
“জানেনই তো এটা পুলিশ কে’সের রিপোর্ট। সেনসেটিভ ভাবে হ্যান্ডেল করতে হচ্ছে। গত দু’দিন ধরে রিপোর্টগুলো নিয়ে স্টাডি করছিলাম। একটা ব্যাপার নজরে পড়ল। ভাবলাম আপনাদের জানানো উচিত।”
সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। মা কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল। ডাক্তার সাহেব বললেন, “সাজ্জাদকে স্লো-পয়জন দেওয়া হয়েছে সত্যি। কিন্তু সেই সাথে প্রতিষেধকও দেওয়া হয়েছে। মাত্রাটা খুব হিসাব করে ব্যালেন্স করা। বেশ ভালো পয়েন্ট।”
“আপনার কথা বুঝতে পারলাম না।”
“বুঝিয়ে বলছি। এমনভাবে দুটোকে ব্যালেন্স করা হয়েছে যে শরীরে বি’ষের কার্যকারিতা পরিলক্ষিত হবে কিন্তু মানুষ ম’র’বে না।”
ভীষণ বিস্মিত হলাম। বাকিদের চেহারা বলে দিচ্ছে তারাও বেশ বিস্মিত। ডাক্তারের কথা বুঝতে পারলেও কারণ ধরতে পারছে না। ডাক্তার সাহেব আমাদের ব্যাপারটা বুঝলেন। নরম স্বরে বললেন, “তামিম মানে আপনার ছোট ভাই, এমনভাবে বি’ষ প্রতিষেধক ব্যালেন্স করেছে যে সাজ্জাদ ম’র’বে না। তবে ধীরে ধীরে ওর শরীর খারাপ হতে শুরু করবে। দেখে মনে হবে শরীরের বি’ষের প্রভাব শুরু হয়েছে। এবং লক্ষ্যর দিকে পৌঁছাচ্ছে। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন।”
“ছোট চাচা এমন কেন করবে?”
“সে কথা জানি না। ব্যাপারটা আমার নজরে ধরা পড়েছে। পুলিশকে জানিয়েছি। ভাবলাম তোমাদেরকেও জানিয়ে রাখি। পরের হিসাব আমার না, আমার কাজ এই পর্যন্ত।”
বাবা ডাক্তার সাহেবকে ধন্যবাদ জানিয়ে চেম্বার থেকে বের হলেন। ফুফু বলল, “তামিমটা আসলে কী করতে চাইছিল?”
“ছোট চাচা কী করতে চেয়েছে, কেন করতে চেয়েছে বা করেছে। সেই কথা সে নিজেই ভালো বলতে পারবে।”
“দেখা করতে যাবি? তাহলে সবাই মিলে জিজ্ঞেস করে দেখতাম।”
বাবা ছোট চাচার সাথে দেখা করতে যেতে রাজি হলেন না। ফুফু চলে গেল। আজ তার বাড়িতে ফেরার কথা ছিল। আমাদের সাথে ডাক্তারের কাছে এলো বিধায় যেতে পারল না। কাল চলে যাবে। বুক চিড়ে দীর্ঘশ্বাস বের করে দিলাম। এই পৃথিবী কত জটিল!
দু’দিন নানাবাড়িতে থাকার পর বাবা আমাদের নিতে এলেন। নানি খুব যত্ন নিয়ে জামাইকে অ্যাপায়নের ব্যবস্থা করছেন। বাজার থেকে পাঁচ কেজি ওজনের একটা কাতলা মাছ আনা হয়েছে। গরুর গোশত এসেছে। নানি ঘরে পালা দেশি মোরগ জ’বা’ই করেছে। কাতলা মাছের মাথা দিয়ে মুড়িঘণ্ট হবে৷ মা রান্নাঘরে ভীষণ ব্যস্ত। বাবা ফ্যানের নিচে বসে আরাম করছিলেন। হঠাৎই আমাকে ডেকে পাঠালেন। নরম স্বরে বললেন, “বাসা ভাড়া করেছি। টিন শেডের ঘর। দু’টো রুম, সাথে বাথরুম আর হাত পাঁচেক বারান্দা। বারান্দায় রান্নার ব্যবস্থা করতে হবে।”
“জায়গা নিয়ে সমস্যা হবে না। মানুষ মাত্র তিনজন।”
“তা হবে না। তবে ইলেক্ট্রিসিটি নিয়ে ভীষণ ঝামেলা হয়ে যাবে। জায়গাটা একটু গ্রামের দিকে। দিনে দশ বারো ঘন্টা কারেন্ট থাকে না। টিনের ঘরে গরম বেশি।”
“মানিয়ে গুছিয়ে নিলে থাকতে অসুবিধা হবে না।”
“তা ঠিক। তোমার দাদি আমাকে ডেকেছিল।”
“গিয়েছিলেন?
“হ্যাঁ, গিয়েছিলাম। তামিমের কে’সের ব্যাপারে বলে। বলে কে’স তুলে নিতে সে তো মা’র’তে চায়নি। অন্য ব্যাপার আছে। একসাথে বসে কথাবার্তা বলে একটা ব্যবস্থা করা যাবে।”
“আপনি কী ভাবলেন? কে’স তুলে নেবেন?”
বাবা খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন। কঠিন মুখে বললেন, “না, আমি কেস তুলব না। কথা যা হওয়ার আদালতে হবে।”
আমার বাবা মানুষটা বদলে গিয়েছে। আগে-পরে কখনো বাবার এতো জেদ দেখিনি। সবসময়ই দাদির কথা শুনে চলত। হঠাৎই তার কী যেন হয়ে গেছে।
তিন দিন হলো ভাড়া বাসায় উঠেছি। বাসাটা ভালো। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন জায়গা৷ তবে খুব গরম৷ সারাদিন টিনের চালে রোদ পড়ে। ঘরের ভেতরে আগুন গরম হয়ে যায়। ফ্যান চালালেও কাজ হয় না। ফ্যানের বাতাসও কেমন গরম লাগে। তার উপর ধরতে গেলে সারাদিনই কারেন্ট থাকে না। গরমে সারা গায়ে ঘামাচি হয়েছে। মায়েরও হয়েছে। বারান্দায় রোদ পড়ে। রান্না করতে হয় সূর্য ওঠার আগে। একবেলা রান্না হয়। সকাল দুপুর। রাতে বাইরে থেকে রুটি কিনতে হয়। গরমে খাবার বেশিক্ষণ ভালো থাকে না। পঁচে যায়। বারান্দায় লাইট লাগানোর সিস্টেম নেই। থাকলে রাতের খাবার রান্না করতে অসুবিধে হতো না। তার টেনে একটা বাল্ব ঝুলিয়ে দেওয়া যায়। বাড়িওয়ালার কড়া নিষেধ। তাকে না বলে কিছু করা যাবে না। কিছু করলে ঘর থেকে নামিয়ে দেবে। আশ্চর্য লোক!
বাবা রাতের খাবারে বিরিয়ানি কিনে এনেছেন। মা থালায় বাড়ছে। মেঝেতে মাদুর বিছানো। পানির গ্লাসে মুখের সামনে তুলে রেখেছি। খাচ্ছি না। মা বলল, “পানি খাচ্ছিস না কেন?”
“খাব। একটা কথা ভাবছি।”
“কী কথা?”
“আজ বিকেলে বাড়িওয়ালার সাথে দেখা হয়েছিল। বারান্দার লাইট লাগানোর কথা বলতেই তেলে বেগুনে জ্ব’লে উঠল। তেঁতো স্বরে বলল– এত সুবিধা লাগলে পাকাঘরে ওঠো। একটা রুম ফাঁকা পড়ে আছে। এটাচ বাথরুম, কিচেন, বেলকনি। ব্যাচেলার বাসা। আমি আবার ব্যাচেলার ছেলেপুলেদের বাসা ভাড়া দিই। ঘরে সোমত্ত মেয়ে নেই। দুশ্চিন্তার কিছু নেই।”
বাবা বললেন, “এক রুমে আমাদের হবে না। দু’টো ঘর ভাড়া করাও সম্ভব না।”
“আপনি আর মা দু’জনে ওই রুমে উঠে যান।”
মা বলল, “তুই কোথায় যাবি?”
“আমি হোস্টেলে উঠব। এখান থেকে কলেজে যাতায়াত ভাড়া বেশি। ওর হিসাবে হোস্টেল পুষিয়ে আরও থাকবে।”
বাবা কিছু বললেন না। একমনে খেতে লাগলেন। মা-ও কিছু বলল না। চুপ করে রইল। তাকে খুব চিন্তিত দেখাচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত হোস্টেলে ওঠলাম। প্রথম দিকে মা বাবা দু’জনের কেউই রাজি হচ্ছিল না। টিউশনের অযুহাত দিতে রাজি হলো। মবিন স্যার সকাল ছয়টায় পড়াবেন। দশজনের ব্যাচ। এগারো নম্বর হিসাবে আমি সেই ব্যাচে ঢুকলাম। বাদশা বলল, “এতদিনে তোর পড়াশোনার দিকটা ঠিক হলো। যে খবর দিয়েছিলি আমি তো ভয়ই পেয়ে গেছিলাম।”
“সে ঠিক আছে। তোর খবর কী?”
“খবর ভালো।”
“ওমরা করতে গিয়ে কেমন কী এক্সপেরিয়েন্স করলি?”
“এক্সপেরিয়েন্স ভালো। বেশি করে জমজম কূপের পানি নিয়ে এসেছি। খেজুর এনেছি তিন পদের। পাকা, কাঁচা, আধা পাকা। তোর জন্য আলাদা করে রেখেছি। সময় করে নিয়ে আসব।”
“আচ্ছা।”
“তোর ছোট চাচার কে’সের শুনানি কবে? ডেট দিয়েছে?”
“না ডেট দেয়নি।”
“তানহার বাবার রায় শুনেছিলাম। আপিলের কথা চলছিল। তারপর কতদূর কী করল?”
“জানি না। এখনও আমাদের কিছু জানানো হয়নি। হবে হয়তো৷”
মাসখানেক এভাবেই কাটলো। আমি হোস্টেলে থাকি। বাবা মা পাকা বাসায় উঠেছে। দাদির সাথে যোগাযোগ নেই। তিনি আমাদের কল দেন না। আমরা কল দিলে কল রিসিভ করেন না। ফুফু সেদিন চেম্বার থেকে ফিরেই নিজের বাড়িতে চলে গেছে। তার সাথেও নাকি দাদি তেমন কথাবার্তা বলেন না। বাবা অবশ্য পাশের বাড়ির একজনকে বলে রেখেছে– দাদির খোঁজখবর রাখতে। তার কী হয় না হয় জানতে। শত হলেও নিজের মা। একদমই কোন খোঁজ না রাখা, পরিচয় ছেড়ে দেওয়াটা ভালো কিছু না।
হোস্টেল থেকে দুপুরের খাবার দিয়েছে। পাঙ্গাশ মাছের তরকারি। আমার ভাগে জুটেছে মাছের মাথা। হলদেটে তরকারি। ডাইরিয়া রুগীর পথ্যের মতো দেখতে। মাছের আঁশটে গন্ধ নাকে লাগছে। ভাত তরকারি ফেলে বাইরে বের হলাম। তানহার বাবার কে’সে আপিল মঞ্জুর হয়েছে। আগামীকাল শুনানি। কোর্টে যেতে হবে। বাবার মুখে শুনেছি– এবারের রায় বদলে যেতে পারে। ব্যাপারটা নিয়ে কেমন অস্বস্তি হচ্ছে। এতকিছু করেও এই লোক বেঁচে গেলে মানুষ অপরাধ করাটা একটা প্যাশান হিসাবে নেবে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে খেতে বসলাম। কলেজের সামনে সুবল মামার ভাতের হোটেল। এই হোটেলের অন্যসব তরকারি যেমনই হোক না কেন ডালটা খুব মজা। অদ্ভুত স্বাদ।
খাবার অর্ডার করেছি। ডাল, ভাত সাথে ডিম ভাজা। মাছ খেতে ইচ্ছে করছে না। পাঙ্গাশ মাছের আঁশটে গন্ধ নাকে লেগে আছে।
ভাত ডাল মেখে এক গ্রাস মুখে দিতেই রইস উদ্দীনের কথা মনে পড়ল। সে খুব ভালো রাঁধে। একবার খেলে বারবার খেতে ইচ্ছে করে।
শুনানির দিন বাদশা এসেছে। সে বেশ চিন্তিত। মুখ ভার করে আছে। আমাকে দেখে হাত নাড়লো। নরম স্বরে বলল, “কোর্টের সময় হয়নি। এত আগে রুমে ঢুকতে ইচ্ছে করে না।”
“তাহলে আর কী! এখানেই দাঁড়াই।”
খানিকক্ষণ দাঁড়াতেই আসামি পক্ষের উকিলের দেখা। ভদ্রলোক এদিক ওদিক তাকিয়ে চোরের মতো হাঁটছে। আমি বাদশার শার্ট ধরে টান দিলাম। নিচু গলায় বললাম, “এই লোক কোথায় যাচ্ছে?”
“তা জানি না। তবে ভাবসাব তেমন সুবিধার মনে হচ্ছে না। চল ফলো করি।”
লোকটা বারবার পেছনে তাকাচ্ছে। এমন করলে আমরা দু’জন ধরা পড়ে যাব। তবে ধরা পড়লাম না। ভদ্রলোক একটা গাছের আড়ালে গেল। পুলিশের পোশাক পরা এক লোকের হাতে টাকার বান্ডিল ধরিয়ে দিয়ে বলল, “যেমনটা বলেছি তেমনই করবে কিন্তু। অলরাইট?”
পুলিশের লোকটা মাথা দোলালো। পাশ ফিরে বাদশার দিকে তাকিয়ে দেখলাম। সে পুরো ব্যাপারটা ভিডিও করেছে।
“ভিডিও করেছিস?”
“হ্যাঁ করেছি। এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড করে দেব।”
“কীহ!”
“এতো বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। এসব লোকের জন্য এটাই ঠিক৷ প্রাপ্য মিটিয়ে দিতে হয়।”
ফিকফিক করে হেঁসে উঠলাম। আমার খুব মজা লাগছে।
কোর্ট বসল না। কোন একটা ঝামেলায় তারিখ পিছিয়ে গেল। বাবা বললেন, “আমার অফিস আছে। যেতে হবে। একবেলার ছুটি নিয়েছিলাম।”
বাবা চলে গেলেন। আমি বাদশার সাথে কলেজের পথে রওনা দিলাম। রিকশায় বসে আছি। হঠাৎই ফোন বেজে উঠল। অচেনা নম্বর। কল রিসিভ করতে ওপাশ থেকে এক ভদ্রমহিলা বিলাপ করে উঠলেন,
“বাবা সাজ্জাদ, তোর দাদি অনেক অসুস্থ। তোর আব্বাকে অনেকবার কল দিয়েছি। কল রিসিভ করছে না।”
আমি কিছু বলব তার আগে কল কেটে গেল। বাদশা বলল, “কোন সমস্যা হয়েছে?”
আমি বললাম, “মামা, রিকশা থামাও।”
চলবে
Share On:
TAGS: তোমার হাসিতে, ফারহানা কবীর মানাল
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
তোমার হাসিতে পর্ব ২৪
-
তোমার হাসিতে পর্ব ১৭
-
তোমার হাসিতে পর্ব ২৯
-
তোমার হাসিতে পর্ব ২৭
-
তোমার হাসিতে পর্ব ৩১
-
তখনও সন্ধ্যা নামেনি গল্পের লিংক
-
তোমার হাসিতে পর্ব ২৩
-
তোমার হাসিতে পর্ব ১৪
-
তোমার হাসিতে পর্ব ২৬
-
তোমার হাসিতে গল্পের লিংক