Golpo romantic golpo নূর এ সাহাবাদ

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৩০


নূরসাহাবাদ

jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস

পর্ব ৩০

সেদিন মহল যেন উৎসবের আলোয় ঝলমল করছিল। শাহজাদা বাইজিদের বিয়ে নাসিরাবাদের বড় শাহজাদি রুবায়েত ফারনাজের সাথে। সকালের পর থেকেই প্রস্তুতির ব্যস্ততা। অশ্ববাহিনী সাজানো হচ্ছে, পালঙ্ক ঝাড়পোঁছ, দাসীদের আনাগোনা, সব মিলিয়ে মহল যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছিল।

বিকেল গড়ানোর আগেই বরযাত্রী বের হলো।
রাজকীয় বেশে সজ্জিত বাইজিদ গম্ভীর, সৌম্য, দৃষ্টিতে রাজকীয় দৃঢ়তা। তার চারপাশে সশস্ত্র প্রহরী, পেছনে দীর্ঘ অশ্ববহর। ঢাক-ঢোল, শিঙ্গার শব্দে মুখর হয়ে উঠলো সাহাবাদের পথ। ধীরে ধীরে সেই শোভাযাত্রা দূরে মিলিয়ে গেল।
আর তাদের চলে যাওয়ার সাথে সাথেই মহল যেন ফাঁকা হয়ে পড়লো।
অন্দরমহলে অল্প কিছু দাসী, কয়েকজন প্রহরী। বাকিরা সবাই গেছে বিয়ের আয়োজনে। অরণ্যকে সাথে নিলো না জাবের শাহ্ নিজেই। বাইজিদ যদিও বেঁকে বসেছিলো ভাইকে ছাড়া বিয়ে করতে যাবে না। কিন্তু অরণ্য অসম্মতি জানায়। জানালো যে পেটের ব্যামো। সে কারণে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কারণ দীর্ঘদিন রত্নপ্রভা তার ধারে কাছেও ঘেঁষে না। এই সুযোগে কথা বলে নিতে পারবে মহল ফাঁকা হলে।

কিন্তু পরক্ষনেই দেখা গেল রত্নপ্রভাকে কক্ষে তালা বদ্ধ করে চাবি দিয়ে গেল বাকের শাহ্ মারজান এর কাছে। সবাই বেড়িয়ে যেতেই প্রাসাদ প্রায় ফাকা।
এই ফাঁকা সময়টারই অপেক্ষা করছিল কেউ।
মারজানের কক্ষে বসে আমিরা শেষবারের মতো নির্দেশ নিচ্ছিল। মারজান ছোট্ট এক শিশি এগিয়ে দিল তার দিকে।
“পরিমাণ বুঝে ব্যবহার করবে। বেশি হলে বিপদ, কম হলে কাজ হবে না।”
আমিরা শিশিটা হাতে নিয়ে মৃদু হেসে বললো “আপনি শুধু দেখুন।”

সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে। অরণ্য তখন একা।
মহলের এক কোণের বারান্দায় বসে চুপচাপ। হাতে অর্ধেক মিষ্টান্ন ভরা পেয়ালা। আজ সে আর বিয়ের শোভাযাত্রায় যায়নি যে জন্য, সেটাই হলো না। তার ভেতরে চলছিল অন্য এক অস্থিরতা।
ঠিক তখনই আমিরা এসে দাঁড়ালো সামনে।
“ছোট বাবু, একা একা বসে আছেন?”
অরণ্য বিরক্ত দৃষ্টিতে তাকালো।
“কিছু দরকার?”
“আপনার জন্য শরবত এনেছি।”
সে হাতে থাকা পেয়ালাটা এগিয়ে দিল। অরণ্য কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো।
“দরকার নেই।”
“আজকের দিনটা তো বিশেষ… খান না।”

তার কণ্ঠে অদ্ভুত কোমলতা। অরণ্য আর তর্ক করলো না। পেয়ালাটা হাতে নিয়ে এক চুমুক খেল। তারপর আরেক চুমুক। ধীরে ধীরে পুরোটা শেষ করলো।কিছুক্ষণ সব স্বাভাবিক। তারপর
একটা অদ্ভুত উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়তে লাগলো তার শরীরে। মাথাটা একটু ঘুরে উঠলো। চোখ ঝাপসা হতে লাগলো।
“এটা… কি…?”
সে কপাল কুঁচকালো। আমিরা এগিয়ে এলো ধীরে। তার চোখে তখন স্পষ্ট খেলা।
“কিছু না… একটু বিশ্রাম নিন।”
অরণ্য উঠে দাঁড়াতে গেল কিন্তু পা টলমল করে উঠলো। শরীর ভারী হয়ে আসছে। আর একসাথে অদ্ভুত এক উত্তেজনা কাজ করছে রক্তে। সে বুঝতে পারছে কিছু একটা ভুল হচ্ছে।
“ তুমি… কি খাইয়েছো…?”
কণ্ঠ ভারী হয়ে এসেছে। আমিরা আর লুকালো না। ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে তার খুব কাছে দাঁড়ালো।
“যা দরকার ছিল… তাই।

অরণ্য পেছনে সরে যেতে চাইল কিন্তু পারলো না। শরীর তার কথা শুনছে না। চোখের সামনে সব ঝাপসা। শুধু একটা জিনিস বুঝতে পারছে যে সে ফাদে পা দিয়ে ফেলেছে। আর সে এখন সেই ফাঁদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে।

আর দূরে কোথাও অদৃশ্যভাবে এই দৃশ্যের অপেক্ষায় আছে মারজান। অরণ্যের চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। শরীরের ভেতর অদ্ভুত এক উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে যেন নিজের ওপর নিজেরই নিয়ন্ত্রণ নেই। বুক ধড়ফড় করছে, শ্বাস ভারী হয়ে উঠছে। সে দেয়ালে হাত রেখে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করলো।
“দূরে থাকো”

কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছে। কিন্তু আমিরা থামলো না।
ধীরে ধীরে সে এগিয়ে এলো অরণ্যের দিকে
নিজেকে এমনভাবে উপস্থাপন করলো, যাতে দৃষ্টি সরানো কঠিন হয়ে ওঠে। একে একে খুলে ফেলল শরীরের বস্ত্র গুলো। তার চোখে এক ধরনের জেদ। আজ সে পিছু হটবে না। অরণ্য চোখ শক্ত করে বন্ধ করে ফেললো এক মুহূর্তের জন্য।
“এসব বন্ধ করো। আমিরা…আমি বলছি থামো”
তার কণ্ঠে অনুরোধ, আদেশ দুটোই। সে মুখ ফিরিয়ে নিল, যেন কিছুই দেখতে না পায়। কিন্তু আমিরা আরও কাছে এলো।
“কেন? আমি কি এতটাই খারাপ দেখতে?”

তার কণ্ঠে মায়া মেশানো সুর কিন্তু ভেতরে স্পষ্ট পরিকল্পনা। অরণ্য এক পা পেছনে সরে গেল। কিন্তু পা টলমল করছে। মাথা ঘুরছে… চিন্তা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। সে আবার বললো সরে যেতে, এবার কণ্ঠে কঠোরতা আনার চেষ্টা।
কিন্তু আমিরা এবার সত্যিই নাছোড়বান্দা।
সে হাত বাড়িয়ে অরণ্যের বাহু ছুঁলো।
“আপনি তো আমায় এড়িয়ে চলেন সবসময়।
আজ এড়িয়ে যাবেন কিভাবে?”

অরণ্য হঠাৎ তার হাত সরিয়ে দিল।
!ছুঁবে না আমাকে!”
কণ্ঠে এবার রাগ। কিন্তু শরীর শরীর যেন আর তার কথা শুনছে না। শ্বাস আরও ভারী হয়ে উঠছে, দৃষ্টি ঝাপসা। আমিরা বুঝতে পারছে
ওষুধ কাজ করছে। তার নিজের ইচ্ছা আর শরীরের প্রতিক্রিয়ার মধ্যে এক ভয়ংকর লড়াই শুরু হয়েছে।
আর আমিরা ধীরে ধীরে সেই লড়াইকে আরও কঠিন করে তুলছে। তার চোখে তখন একটাই লক্ষ্য অরণ্যকে ভাঙা। এই মুহূর্তে যেখানে সংযম আর প্রলোভনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে অরণ্য।
আর প্রতিটি সেকেন্ড তাকে ঠেলে দিচ্ছে
একটা গভীর ফাঁদের দিকে।

নাসিরাবাদের প্রাসাদ যেন সেদিন আলোয়, রঙে আর উৎসবের আবহে ভেসে যাচ্ছিল। দূর থেকেই দেখা যাচ্ছিল সাহাবাদের বরযাত্রীর আগমন।
সুশৃঙ্খল অশ্ববাহিনী, রাজকীয় পতাকা, ঢাকের তাল। সব মিলিয়ে যেন এক চলমান গৌরব।
প্রাসাদের ফটকের সামনে থামতেই সবার দৃষ্টি গিয়ে আটকালো এক জায়গায়
শাহজাদা বাইজিদ এর দিকে । সে নেমে এলো ধীরে, রাজকীয় ভঙ্গিতে। তার পরনে গাঢ় রঙের সূক্ষ্ম কারুকাজ করা পোশাক, কাঁধে ভারী কাজের ওড়না, কোমরে অলংকৃত তরবারি। মাথায় পাগড়ি যার শীর্ষে ঝলমল করছে রত্নখচিত আলংকার।

কিন্তু এসবের বাইরেও তার উপস্থিতিই যেন আলাদা। উচ্চদেহী, প্রশস্ত কাঁধ, সোজা পিঠ যেন জন্মগত এক রাজকীয়তা তার ভেতরেই গেঁথে আছে। মুখশ্রী তীক্ষ্ণ অথচ শান্ত।বআর সেই চোখ সবুজাভ, গভীর। যেন একবার তাকালে মানুষ আটকে যায় সেই দৃষ্টিতে। চোয়াল শক্ত, ঠোঁটে হালকা সংযত রেখা। না হাসছে, না কঠিন। কিন্তু এক অদ্ভুত আকর্ষণ ছড়িয়ে আছে তাতে।
চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা দাসী, সখিরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করতে লাগলো।

“এ যেন রূপকথার রাজপুত্র”
“ এমন রূপ কি মানুষের হতে পারে?”
কারো চোখে বিস্ময়, কারো চোখে মুগ্ধতা।
এমন সময় একজন সখি ছুটে গেল অন্তঃপুরে।
রুবায়েত ফারনাজ তখন আয়নার সামনে বসে আছে। তার চারপাশে দাসীরা ব্যস্ত, কেউ গয়না গুছাচ্ছে, কেউ ওড়না ঠিক করছে।
সখি হাপাতে হাপাতে ঢুকেই বললো—
“শাহজাদি…!”
রুবায়েত মাথা ঘুরিয়ে তাকালো।
“কি হয়েছে?”
সখি মুখে হাত চাপা দিয়ে হেসে উঠলো—
“আপনি যা ভাবছেন… তার থেকেও অনেক বেশি”
রুবায়েত ভ্রু কুঁচকালো। সখি কাছে এসে ফিসফিস করে বললো
“আপনার হবু স্বামী… এমন রূপবান… এমন দেহবল্লরী… এমন দৃষ্টি! হায়য়য়য়। আপনি তো রাজ্য জয় করার চেয়েও বেশি লাভবান হয়ে গেলেন”
সে নিজের কথাতেই যেন হারিয়ে গেল।
“আমার তো মনে হলো চোখ সরাতেই পারছি না”

রুবায়েত কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে মাথা নিচু করলো। তার গাল লাল হয়ে উঠেছে। আঙুলের ডগা দিয়ে ওড়নার প্রান্তটা মুচড়ে ধরলো।
“তাই বুঝি? সে এত সুদর্শন?”
কণ্ঠটা খুবই নিচু। সখি মুচকি হেসে বললো
“আপনি নিজেই দেখবেন কিছুক্ষণ পর”
রুবায়েত আর কিছু বললো না। কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে একটুখানি লাজুক হাসি ফুটে উঠলো।
তার বুকের ভেতর ধীরে ধীরে কাঁপন ধরছে
অজানা এক অনুভূতি এক অচেনা মানুষ।
যার সাথে আজ থেকে জড়িয়ে যাবে তার পুরো জীবন।

রাজকীয় আভায় দাঁড়িয়ে আছে বাইজিদ। যাকে দেখেই মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছে সবাই। নাসিরাবাদের প্রাসাদে তখন উৎসবের পূর্ণতা। বরণ পর্ব শেষ হতেই শুরু হলো মহাভোজের আয়োজন। বিশাল দরবারখানার একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্ত পর্যন্ত সাজানো সারি সারি পাত্র রূপার থালা, সোনালি কারুকাজ করা বাটি, সুগন্ধে ভরা নানা পদ।
কেউ পরিবেশন করছে বিরিয়ানি, কেউ কাবাব, কেউ মিষ্টান্ন।
সুগন্ধে যেন পুরো প্রাসাদ ভরে উঠলো।
বরযাত্রীর জন্য আলাদা করে সাজানো হলো বিশেষ আসন। সাহাবাদের অতিথিরা বসে পড়লো, শুরু হলো খাওয়া-দাওয়া।
চারপাশে হাসি, গল্প, প্রশংসা তো আছেই।

বাইজিদ বসে আছে শান্ত, গম্ভীর। সে প্রয়োজনমতো খাচ্ছে, কারো সাথে সৌজন্য বিনিময় করছে। কিন্তু তার চোখে সেই স্বাভাবিক উচ্ছ্বাস নেই। মনে হচ্ছে সবটাই তার কাছে নিয়ম, দায়িত্ব। অনুষ্ঠান এগোতে থাকলো।
অবশেষে এলো সেই মুহূর্ত বর আর কনেকে মুখোমুখি বসানোর। একটি নির্দিষ্ট কক্ষে আনা হলো বাইজিদকে। অন্য দিক থেকে আনা হলো রুবায়েত ফারনাজকে। দুজনকে বসানো হলো একে অপরের সামনে মাঝখানে টানানো হলো ফুলের দোপাট্টা।
চারপাশে সখিরা, দাসীরা দাঁড়িয়ে হাসি, খিলখিল, মৃদু গুঞ্জন।

বাইজিদ একবার দোপাট্টার দিকে তাকালো।
তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো সামান্য।
এত নিয়ম, এত আনুষ্ঠানিকতা তার ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছে যেন। সে দৃষ্টি সরিয়ে নিল।
কিন্তু অন্যদিকে রুবায়েতের অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
সে মাথা নিচু করে বসে আছে, কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি।নহৃদস্পন্দন যেন বেড়ে গেছে।
সামনের মানুষটা যার কথা সে এতক্ষণ শুনেছে
আজ সে তার সামনে। তার স্বামী। এই ভাবনাটাই যেন তাকে ভাসিয়ে দিচ্ছে এক অদ্ভুত আনন্দে।
সখিরা ফিসফিস করে বলছে
“দেখো, কেমন লজ্জা পেয়েছে”
“আহা, কি সুন্দর লাগছে!”
রুবায়েত আরও লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠলো।
অন্যদিকে বাইজিদ একবার চোখ তুলে তাকালো দোপাট্টার ওপারে। কিছুই স্পষ্ট দেখা যায় না।
শুধু ছায়া। সে নিঃশ্বাস ফেললো ধীরে।
এই মুহূর্তে তার কাছে এটা একটা দায়িত্ব, একটা জোট, একটা নিয়ম। কিন্তু দোপাট্টার ওপারে বসে থাকা মেয়েটার কাছে এটা তার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্নপূরণের মুহূর্ত।
কাবিনের প্রস্তুতি প্রায় শেষ। কাজি সাহেব বসে আছেন, সামনে কাগজপত্র সাজানো। চারপাশে সুশৃঙ্খল নীরবতা যেন সবাই অপেক্ষা করছে সেই মুহূর্তটার জন্য, যখন এই সম্পর্ক আনুষ্ঠানিকভাবে বাঁধা পড়বে।
ঠিক তখনই একজন প্রহরী দ্রুত পায়ে ভেতরে ঢুকলো। সে সরাসরি এগিয়ে গেল বাকের শাহ্-এর কাছে।বনিচু হয়ে কানে কানে কিছু বললো। মুহূর্তের মধ্যেই বদলে গেল বাকের শাহ্-এর মুখের ভাব। চোখ বিস্ফারিত, চোয়াল শক্ত। স্পষ্ট বোঝা গেল, খবরটা সাধারণ কিছু না।
তিনি এক পা পিছিয়ে গেলেন, যেন নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করছেন।

এই দৃশ্যটা চোখ এড়ালো না বাইজিদের। সে ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
“কি হয়েছে?”
কণ্ঠ নিচু, কিন্তু তীক্ষ্ণ। বাকের শাহ্ সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন না। চারপাশে হালকা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে
“ কি হলো?”
“হঠাৎ কি খবর এলো?”
প্রহরীটা তখনও মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে। অবশেষে বাকের শাহ্ ধীরে ধীরে বললেন
“মহল থেকে… খবর এসেছে।”
তার কণ্ঠ ভারী। বাইজিদের দৃষ্টি আরও গাঢ় হলো।
“কি খবর?”
এক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর বাকের শাহ্ কঠিন গলায় বললেন
“ অরণ্য আমিরার শ্লীলতাহানি করেছে।”

শব্দগুলো যেন বজ্রপাতের মতো আছড়ে পড়লো ঘরের ভেতর।
“নিশ্চিত?”
কণ্ঠ ঠান্ডা। বাকের শাহ্ মাথা নেড়ে বললেন
“যারা উপহার নিয়ে গিয়েছিল… তাদের মাধ্যমেই খবর এসেছে।”

বাইজিদের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো। তার মুঠি ধীরে ধীরে আঁটসাঁট হয়ে এলো। চারপাশের গুঞ্জন, হৈচৈ সবকিছু যেন তার কানে পৌঁছাচ্ছে না। কক্ষের ভেতর আনন্দ আবহ এক মুহূর্তে বদলে গেল। কাবিনের ঠিক আগে এমন এক সংবাদ। খবরটা শোনার পরও কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে বসে ছিল বাইজিদ। কক্ষের ভেতর গুঞ্জন বাড়ছে, কেউ ফিসফিস করছে, কেউ অবিশ্বাসে তাকিয়ে আছে কিন্তু সে যেন সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন। তার চোখ ধীরে ধীরে উঠলো।
সেই চোখে আর আগের শান্তভাব নেই।

হঠাৎ করেই সে উঠে দাঁড়ালো। চেয়ারটা ঘষটে উঠলো মেঝের উপর একটা তীক্ষ্ণ শব্দ। সবাই থেমে গেল।
“শাহজাদা…?”
কেউ ডাকলো। বাইজিদ একবারও কারো দিকে তাকালো না। সে সোজা দরজার দিকে এগিয়ে গেল। বাকের শাহ্ তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ালেন
“বাইজিদ! এখন নয়… কাবিনটা হয়ে যাক আগে”

কথা শেষ হওয়ার আগেই বাইজিদ থেমে গেল।
পেছন ফিরে তাকালো। তার চোখে এমন দৃষ্টি
যাতে স্পষ্ট, এই মুহূর্তে তাকে থামানো অসম্ভব।
“আমার ভাই বন্দি।”
শব্দগুলো ধীর, কিন্তু ভেতরে আগুন।
“আর আপনি চান আমি এখানে বসে কাবিন পড়ি? ওই মহিলা কে আমি চিনিব।আমার ভাইকে বাচাতে হবে”

ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা নেমে এলো। কেউ আর কথা বললো না। এই সময় নাসিরাবাদের জমিদার, শেরহাম পাটওয়ারী নিজে এগিয়ে এলেন। তার মুখে উদ্বেগ, কণ্ঠে অনুরোধ
“ শাহজাদা… বুঝার চেষ্টা করো। এমন মুহূর্তে উঠে যাওয়া… আমাদের জন্য অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।”
তিনি আরও কাছে এসে বললেন
“মেয়ের ইজ্জত… এই বিয়ে”

তার কণ্ঠ কেঁপে উঠলো। কিন্তু বাইজিদ একটুও নরম হলো না।
ইজ্জত?
এক মুহূর্ত থামলো বাইজিদ।
“আমি ফিরে আসবো।”
শব্দগুলো স্পষ্ট, দৃঢ়। তারপর আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ালো না। বাইরে বেরিয়ে গেল দ্রুত পায়ে।
পেছনে ছুটে আসছে প্রহরীরা
“ ঘোড়া প্রস্তুত করো!”

কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই প্রাসাদের উঠোনে চঞ্চলতা ছড়িয়ে পড়লো। বাইজিদ নিজে ঘোড়ায় উঠে বসল। লাগাম শক্ত করে ধরলো। এক ঝটকায় ঘোড়া ছুটে গেল। ধুলো উড়লো, শব্দ মিলিয়ে গেল দূরে। আর প্রাসাদের ভেতর নেমে এলো এক ভয়ংকর নীরবতা। কাবিন থেমে গেছে। অতিথিরা একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে কারো চোখে বিস্ময়, কারো চোখে শঙ্কা। শেরহাম পাটওয়ারী স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে। তার মুখ ফ্যাকাশে।
চারপাশে ফিসফাস শুরু হলো
“ বিয়ে ভেঙে গেল…?
“ এ তো বড় অপমান…”
অন্তঃপুরে বসে থাকা রুবায়েতন সব শুনে নিঃশব্দে বসে রইল । তার হাতে ধরা ওড়নার প্রান্ত কাঁপছে। চোখে জল টলমল করছে কিন্তু সে কাঁদছে না। শুধু মাথা নিচু করে বসে আছে।
আজ যে স্বপ্নটা নিয়ে সে বসেছিল সেটা এক মুহূর্তে ভেঙে গেল।

রাতের আঁধারে ঘোড়া ছুটিয়ে যাচ্ছে বাইজিদ।
তার ভেতরে একটাই আগুন সত্যটা জানার।
আর অরণ্যকে নিজ চোখে দেখার। নাসিরাবাদের প্রাসাদে আনন্দের রেশটা মিলিয়ে যেতে খুব বেশি সময় লাগলো না। যেখানে কিছুক্ষণ আগেও ছিল হাসি, সুর, আয়োজন সেখানেই এখন ছড়িয়ে পড়েছে অস্বস্তি, চাপা ভয় আর অপমানের ভার।
শাহজাদী রুবায়েত খবরটা শোনার পর এক মুহূর্তও দাঁড়ায়নি।

চুপচাপ উঠে সোজা নিজের কক্ষে চলে গেছে।
পেছন থেকে সখিরা ডেকেছে, দাসীরা কেঁদে উঠেছে কিন্তু সে কারো কথা শোনেনি।
দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। দাসীরা কাঁপা হাতে বারবার দরজায় কড়া নাড়ছে
“শাহজাদী… দরজা খুলুন…”
“একবার কথা বলুন”
ভেতর থেকে কোনো উত্তর নেই।
শুধু প্রথম দিকে শোনা যাচ্ছিল চাপা কান্নার শব্দ
যা ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে এলো।
তারপর একেবারে নিস্তব্ধতা। এই নিস্তব্ধতাই যেন আরও ভয়ংকর। কিছুক্ষণ পর ছোট শাহজাদী চন্দ্রপ্রভা দৌড়ে এলো। তার মুখ ফ্যাকাশে, চোখ ভয়ে বড় হয়ে আছে। সে সরাসরি গিয়ে দাঁড়ালো তার পিতা, শেরহাম পাটোয়ারীর সামনে।
“আব্বা”
তার কণ্ঠ কাঁপছে।
“আপা… দরজা খুলছে না”
শেরহাম ঘুরে তাকালেন।
“কি বলছো?”
চন্দ্রপ্রভা গিলে গিলে বললো
“আর… আর কোনো শব্দও আসছে না ভেতর থেকে”

এক মুহূর্তের জন্য জমে গেল সবকিছু।
শেরহামের মুখের রং বদলে গেল। তিনি দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেলেন রুবায়েতের কক্ষের দিকে।
দরজার সামনে গিয়ে নিজে ধাক্কা দিতে লাগলেন
“রুবায়েত! দরজা খোলো!”
কোনো সাড়া নেই। আরও জোরে ডাকলো
“রুবায়েত!”
তার কণ্ঠে এবার স্পষ্ট ভয়। চারপাশে লোকজন জড়ো হয়ে গেছে। দাসীরা কাঁদছে, কেউ কেউ ফিসফিস করছে
“যদি কিছু করে বসে…!”

এই কথা শুনেই শেরহামের রক্ত যেন মাথায় উঠে গেল। তিনি ঘুরে দাঁড়ালেন। সোজা গিয়ে দাঁড়ালেন বাকের শাহ্-এর সামনে। তার চোখ লাল, কণ্ঠ কাঁপছে রাগে
আমার মেয়ের যদি কিছু হয়। আমি আপনাদের ছেড়ে কথা বলবো না, জমিদার”

বাকের শাহ্ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তার মুখ গম্ভীর, চোখ কঠিন।বপরিস্থিতি যে ভয়ংকর দিকে যাচ্ছে। তা তিনি বুঝতে পারছেন। একদিকে নিজের মহলের কেলেঙ্কারি অন্যদিকে অন্য রাজ্যের শাহজাদীর ইজ্জতের প্রশ্ন। দুই দিকেই আগুন। আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে একটা ভেঙে যাওয়া বিয়ে।

রাত গভীর হতে হতে সাহাবাদের মহলে ফিরে এলো বাইজিদ। ঘোড়ার ক্ষিপ্র গতিতে পথ পেরিয়ে তার চোখে তখন শুধু একটাই প্রশ্ন কি হয়েছে এখানে? মহলের ফটক পেরোতেই অস্বাভাবিক নীরবতা তাকে আঘাত করলো। কোথাও কোনো স্বাভাবিক চলাচল নেই। প্রহরীরা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে কারো চোখে চোখ রাখতে পারছে না।
বাইজিদের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো।
“অরণ্য কোথায়?”
কঠিন গলায় প্রশ্ন করলো সে। কেউ সোজা উত্তর দিল না। শুধু একজন কাঁপা গলায় বললো
“ আগে ভিতরে আসুন, শাহজাদা”

বাইজিদের চোখ সরু হয়ে এলো। সে দ্রুত পায়ে ভেতরে ঢুকলো। একটি নির্দিষ্ট কক্ষের সামনে এসে থামলো। দরজাটা আধখোলা।
ভেতর থেকে ভারী, স্তব্ধ এক বাতাস বেরিয়ে আসছে। ধীরে ধীরে দরজাটা ঠেলে খুললো সে।
আর তারপর তার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল।

মেঝেতে শুয়ে আছে আমিরা, নিষ্প্রাণ। মুখ ফ্যাকাশে, চোখ বন্ধ। গায়ের পোশাক এলোমেলো আর শরীরজুড়ে ছড়িয়ে আছে লড়াইয়ের চিহ্ন, আঘাতের রেখা। ওপড়ে একটা সাদা চাদর দিয়ে ঢাকা। কি বিভৎস ভাবে খু’ন করা হয়েছে তাকে।

ঘরটা নিস্তব্ধ। এমন নিস্তব্ধতা যা চিৎকার করে বলে দেয়, এখানে কিছু ভয়ংকর ঘটেছে।
বাইজিদের শ্বাস ভারী হয়ে উঠলো। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। তার চোখে অবিশ্বাস, ক্রোধ
আর কোথাও এক জমাট অন্ধকার।
“কে… করেছে এটা?”

কণ্ঠ নিচু, কিন্তু ভয়ংকর ঠান্ডা।
পেছন থেকে কারো কাঁপা গলা ভেসে এলো
“শাহজাদা অরণ্য”

“অ্যাইইইইইইই”

কথাটা কর্ণগোচর হতেই হুংকার দিল বাইজিদ।
“কোথায় অরণ্য?”
“তাকে বন্দি করা হয়েছে”

বাইজিদ আরো ক্ষেপে গেল
“কার হুকুমে তাকে বন্দি করা হয়েছে?”

মিরান শ্বাস নিলো। মেহেরুন্নেসার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। কাপা কাপা গলায় বলল
“সে সত্যিই মেরেছিলো আমিরা কে?”

মিরান এর চোখ চিকচিক করে উঠলো
“নাহহ, সে আমিরা কে ছুঁয়েও দেখেনি। নিজের জিদ পূরণ করতে মারজান সেদিন নিজের খাস কর্মচারীদের দ্বারা ধ’র্ষণ করিয়েছিলো আমিরা কে। বিভৎস ভাবে করা সেই হত্যার দায় চাপানো হয় অরণ্যের ওপর”

“পুরো মহল এমনকি রাজ্যবাসীও সেদিন বিচারের দাবিতে প্রাসাদের সামনে ভীর করেছিলো। শাহজাদা বলে যেন ছেড়ে না দেিয়া হয়। শাহজাদা বাইজিদ সেদিন নির্দোষ প্রমাণ করতে পারেনি তার ভাইকে। সে রাতেই কারাগারে পাঠানো হয় অরণ্যকে। তারপর জমে ওঠে আরো ভয়ংকর খেলা রত্নপ্রভা কে নিয়ে”

পরবর্তী পর্ব পেতে পেইজে ফলো দিয়ে রাখো। যাতে গল্পটা হারিয়ে না যায়।
কেমন হয়েছে বলিও। আর অবশ্যই ৩k পূরণ করে দিও।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply