পদ্মপ্রিয়া
পর্ব_২
ঈশিতারহমানসানজিদা
সাইমন কালেভদ্রেও ছোট বোনটাকে কখনো ডাকে না। যেদিন ডাকে সেদিন হয় কোন ঝামেলা বাঁধে আর নাহয় গম্ভীর মুখে এমন কোন কথা বলে যা নূরের পক্ষে সহ্য করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই বাড়ির সকলে তাকে নিরবে অপমান করে। এমনভাবে কথা বলে যাতে বোঝা না যায় যে তারা নূরের উপর অত্যাচার করছে। নূর মাথায় ওড়না পেঁচিয়ে গুটিগুটি পায়ে ভাইয়ের ঘরে হাজির হয়। মাথা নিচু করে ফ্লোরে চোখ রাখে। কথা শোনার জন্য প্রস্তুত হয়। সাইমনের বন্ধুদের সামনে না আসাতে সেদিন অনেক ক্ষেপে গিয়েছিল সে। নূরকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছিল। সেদিনের কথা এখনও মনে আছে নূরের। সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে ভেবে ভয়ে এখনই কুঁকড়ে গিয়েছে সে। সাইমন বেশ শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করে,’তোমার ভাবির ভাইকে অপমান করেছো?’
নূর সবসময় চেষ্টা করে ঝটপট কথার জবাব দিতে। যাতে কেউ তার উপর রাগ করতে না পারে। নমনীয় কন্ঠে বললো,’আমি তো বাইরের কোন পুরুষদের সামনে যাই না ভাইয়া। এজন্য যাইনি, এতে ভাবি কষ্ট পেয়ে থাকলে ক্ষমা চাচ্ছি।’
অনুপমা যেন পেয়ে বসলো,’এখন ভাইকে দেখে ক্ষমা চাওয়ার নাটক সাজিয়েছ!! মন থেকে ক্ষমা চাইলে আরো আগেই চাইতে।’
‘মাফ করবেন ভাবি, আমি ভাবিনি আপনার খারাপ লাগবে।’
অনুপমা কিছু বললো না, বিড়বিড় করতে লাগলো। সাইমন গলা ঝেড়ে বললো,’তোমাকে এর আগেও বলেছি, কারো সামনে যেতে না চাইলে তোমার উপস্থিতি কাউকে জানাবে না। অনুর ভাইয়ের সামনে দিয়ে যাওয়ার খুব দরকার তো ছিল না। আসলে আমরা ভদ্র ঘরের মানুষ। তাই কাউকে মুখের উপর না করতে পারিনা, এতে তাদের অপমান করা হয়।’ বলতে বলতে দৃঢ় হলো কন্ঠস্বর,’অবশ্য তুমি তা বুঝবে কেন? জন্মের পর থেকেই আমাদের সম্মান নিচেই নামছে শুধু। কিছু বলতে গেলে বাবা তো আবার তেলেবেগুনে জ্বলে উঠবে। এরপর থেকে এমন আচরণ করবে না। দরকার পড়লে রুমে চুপচাপ বসে থাকবে। কেউ যেন না জানে তুমি বাড়িতে আছে।’
অনুপমার মেজাজ আরো বিগড়ে গেল। ভেবেছিল হয়তো নূরকে গালমন্দ করবে সাইমন। কিন্তু এমন কিছুই হলো না। বাবার ভয়ে তেমন কিছু বলেনি সাইমন। তবে এর আগে সামান্য কিছু হলেই বাড়ি মাথায় তুলতো। রাশেদ সাহেব বাড়ি ছাড়ার এক প্রকার হুমকি দেওয়ার পর শান্ত হয়েছিল সাইমন। তাই হয়তো এখন চুপচাপ কথা বললো। তবে আড়ি পেতে রেহানা সবটাই শুনলেন। পা বাড়িয়ে ভেতরে এসে বলেন,’বউয়ের কথায় বোনকে দোষারোপ করছিস কেন? তোর বউ জানে না নূর পর্দা করে, সে মাদ্রাসায় পড়ে? তারপরও এসব কথা বলে কিভাবে?’
অনুপমা দ্বিধায় পড়ে যে কি বলে সব সামলে নিবে। একটু ভেবে বলে,’আমি তেমন কিছু বলিনি মা, আমার ভাই আর আপনার ছেলে তো একই বয়সী। ওর সামনে আসলে তেমন কিছুই হতো না। অন্তত মুখ ঢেকে আসতো, সৌজন্য মূলক কথা বললেও ভালো হতো। তাই বলেছি।’
‘ও কারো সামনে যায় না এটা তো জানো, তবুও সৌজন্য মূলক সাক্ষাৎ এর কথা আসবে কেন? তুমি আমার মেয়ের বিষয়ে এত ভেবো না। তোমার মেয়েটা তো বড় হয়েছে তাই তার কথাই ভাবো এবার।’
অনুপমাও কথার হাল ধরলো,’আমার মেয়ের ভবিষ্যৎ তো আপনারাই শেষ করে দিয়েছেন মা। আপনার মেয়ের পরিচয় জানতে পারলে কোন ভালো ঘরের ছেলে ওকে বিয়ে করবে? তারা তো হাসতে হাসতে চলে যাবে।’
রেহানা এবার কথা খুঁজে পেলেন না, অনুপমা বারবার এই এক জায়গায় এসে ওনাকে থামিয়ে দেন। তখন তার কিছু বলার থাকে না আর। অনুপমা যে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তার মেয়েকে নিয়ে কথা বলবে এটা সকলের জানা। মূলত রেহানা কে অপদস্থ করাই তার প্রধান কাজ। এজন্য সব কথাতে নূরকে টানে যাতে রেহানা পরাজিত হয়। বউ শ্বাশুড়ির যুদ্ধে নূরকে বলি দেওয়া হয় প্রতিবার।
আজও তেমনি একটি ঘটনা ইচ্ছাকৃতভাবে ঘটিয়েছে। নাহলে এই সামান্য ব্যাপারে সে কথাই বলত না, আর না সাইমনের কাছে বিচার দিত। রেহানা কড়া চোখে নূরের দিকে তাকিয়ে রইলেন। সাইমন ধমকের সুরে বলে,’তোমরা থামো তো, বাড়ি ফিরলে শান্তি নেই। এই ঝগড়া ভালো লাগে না আমার।’
কথা শেষ করে রুম ত্যাগ করে সাইমন। নূর এতক্ষণ শান্ত ছিল, বললো,’রুমে চলো আম্মু!’
সঙ্গে সঙ্গে ধমকে কেঁপে উঠলো সে,’তুমি রুমে যাও, জন্মের পর তো দুদণ্ড শান্তি দাওনি। এবার রুমে গিয়ে আমাকে দয়া করে একটু শান্তি দাও তো।’
নূরের কেমন কান্না পেলো। সবাই তাকে ঘিরে ঝগড়া করে শুধু। অথচ তার বিন্দুমাত্র দোষ নেই। এমন ঘটনা জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই নূর দেখে আসছে। সহ্য করে যাচ্ছে। আগে একটু বেশি কান্নাকাটি করতো, এখন অতো কান্না পায়না। তবুও মাঝে মাঝে আপনাআপনিই চোখ থেকে পানি পড়তে শুরু করে।
সে দৌড়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। খাটের উপর বসে কিছুক্ষণ অশ্রু বিসর্জন দেওয়ার পর আলতো হাতে চোখ মুছে কোরআন শরীফ তুলে রাখলো। এতক্ষণ বিছানায় বসে কোরআন পড়ছিল। নিজেকে ধাতস্থ করে রান্নাঘরে পা বাড়ায়। আজ রাশেদ সাহেবের জন্য সর্ষে ইলিশ রান্না করবে সে। হার্টের সমস্যা থাকার জন্য অতিরিক্ত তেলযুক্ত খাবার খাওয়া বাদ দিয়েছেন রাশেদ। এজন্য মেয়ে তার জন্য টুকটাক খাবার বানায় কম তেল দিয়ে। বাড়িতে রান্না করার জন্য দুজন লোক রাখা আছে, তাদের ডিঙিয়ে ফ্রিজ থেকে মাছ বের করে লবণ মাখিয়ে রেখে দিলো। তারপর একে একে সর্ষে, মরিচ ব্লেন্ডারে ব্লেন্ড করে নিলো। চুলার আঁচ মিডিয়ামে রেখে মাছ রান্না করলো। সাথে পাতলা ডাল। রাত এগারোটা বেজে গেছে। সবাই খাওয়া দাওয়া সেরে যে যার রুমে চলে গেছে। শুধু নূর তার বাবার জন্য অপেক্ষা করছে। আজ দেরি হচ্ছে রাশেদ সাহেবের। সচরাচর এতো দেরি করেননা তিনি। তাই নূর চিন্তিত মুখে ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে অপেক্ষা করছে। ঠিক সাড়ে এগারোটায় কলিং বেল বাজলো। সাথে ছুটে গিয়ে দরজা খুলে দিল। ঠোঁট ফুলিয়ে অভিমানী গলায় বললো,’তুমি এত দেরি করে এসেছ কেন আব্বু? আমার চিন্তা হয়না বুঝি!’
মেয়ের কন্ঠস্বর শুনলেই প্রশান্তি বুকে ছেয়ে যায়। ওর হাসি মাখা মুখ দেখলে শরীরে শক্তি পান তিনি। এই যে অভিমান করেছে এখন, রাশেদ সাহেব নিজ হাতে মেয়েকে খাইয়ে দিয়ে রাগ ভাঙিয়ে তারপর ঘুমাতে যাবেন। তিনি মৃদু হেসে বলেন,’সরি রে মা, আজ কাজের একটু চাপ ছিলো এজন্য দেরি হয়ে গেছে। এমন আর কখনো হবে না।’
নূর বাবার হাত থেকে ব্যাগ নিয়ে বলে,’এমন কথা রোজ রোজ বলো তুমি, রাতে যে ওষুধ খেতে হবে তা তো ভুলে গিয়েছ। দুপুরের ওষুধ খেয়েছ?’
‘এই যাহ, একদম ভুলে গেছি। মনে ছিলো না রে মা।’ ভেতরে ঢুকে ডাইনিং টেবিলে বসেন,’বুড়ো হয়ে গেছি তো, এত কথা কি মনে থাকে বলে?’
নূরের নাকের ডগা ক্রমাগত লাল হতে লাগলো। রাগলেই মেয়েটার চেহারা অন্যরকম হয়ে যায়। মৃদু ধমকে সে বলে,’একটা কথা শুনো না আমার, দুপুরে বাড়িতেও থাকি না। আচ্ছা এবার থেকে দুপুরে খাওয়ার সময় আমি যাব তোমার অফিসে। তারপর ওষুধ খাইয়ে দিয়ে আসব।’
‘তাই করিস, তোকে দেখলে আমার শান্তি লাগে বুঝেছিস।’
‘হয়েছে হয়েছে, মুখ হাত ধুয়ে আসো আমি খাবার দিচ্ছি।’
বাধ্য ছেলের মত মেয়ের কথা মেনে নিলেন তিনি। হাত মুখ ধুয়ে এসে বাপ বেটি মিলে খেয়ে নিলেন। প্রতিদিনের মতোই মেয়ের রান্নার এক গাদা প্রশংসা করেন। তারপর সোফায় বসে কিছুক্ষণ গল্প করেন। আজকে তিনি অন্য কথা বলেন,’আমার ব্যাগটা কোথায় রেখেছিস মা, নিয়ে আয় তো।’
এনে দিলে তিনি ব্যাগ খুলে একটা ফোন বের করেন। আইফোনের নতুন মডেল। নূরের হাতে দিয়ে বললেন, ‘এটা তোর গিফট।’
নূর অবাক হলো,’এতো দামি ফোন দিয়ে আমি কি করব আব্বু, ছবি তুলি না , কোন ভিডিও দেখি না। আমার কোন কাজেই লাগে না। যেটা আছে সেটাই ভালো তো।’
রাশেদ সাহেব মেয়ের চিবুক ছুঁয়ে বলেন,’আজকের দিনে তো তুই আমার কাছে এসেছিলি। সেই খুশিতে তোকে গিফট দিলাম।’
‘জন্মদিন পালন করা হারাম জানো না?’
‘আহা, আমি পালন করলাম কোথায়? তোকে উপহার দিলাম মাত্র। এই দিনে বাবা মেয়েকে যত উপহার দিক তা হারাম হবে কেন? বাবার ভালোবাসা কি কখনো হারাম হয়?’ অতঃপর হেসে বলেন,’কেক কেটে ঘটা করে পালন করলে সেটা হারাম। আমার দেওয়া কোন কিছু হারাম নয় বুঝলি!!’
নূর হাসে, কি স্নিগ্ধ সে হাসি। দেখে পরাণ জুড়ায় রাশেদের। মেয়ের মাথায় হাত রেখে প্রাণ ভরে দোয়া করেন। অতঃপর বলেন,’তোর জন্য কিছু গাছের চারা এনেছি, বাইরে রেখে এসেছি। কাল ভোরে উঠে লাগিয়ে ফেলিস।’
এ পর্যায়ে নূর ভীষণ খুশি হয়, গাছ লাগানো তার শখ। বাড়ির ছাদ টাকে ছোটখাটো বাগান বলা যায়। নূর ব্যতীত ছাদে আর কেউই যায় না বিধায় সুবিধা হয়েছে খুব। রাত হলেও ছুটে দরজা খুলে বাইরে যায় নূর, গাছের চারা গুলো নেড়ে দেখতে থাকে। রাশেদ সাহেব চুপচাপ বসে থাকেন। দুশ্চিন্তায় কাবু হয়ে যাচ্ছেন দিনদিন। বয়স হয়েছে, তার যাওয়ারও সময় হয়েছে। তিনি চোখ বুজলে নূরকে দেখে রাখার কেউ নেই একথা বেশ বুঝেন। এই চিন্তায় চিন্তায় বুকে ব্যথা হয়। মেয়েটাকে ভালো পাত্রের হাতে তুলে দিতে পারলে নিশ্চিন্তে চোখ বুজা যাবে। সমস্যা হলো ভালো পাত্র পাওয়া কঠিন। মেয়ে তার ধার্মিক, পাত্রকেও তেমন হতে হবে। উনি চাইছেন একজন হাফেজ ছেলের সাথে মেয়ের বিয়ে দিতে। তাহলে নূরকে তার হাতে দিয়ে শান্তি পাবে। কিন্তু বাঁধা হলো অনুপমা, এখনই নূরের বিয়ে সে কিছুতেই হতে দিবে না। সাহারার বিয়ের আগে নূরকে বিয়ে দিতে গেলে ঝামেলা করবে সে। আর সাহারার বিয়ে এখনি দিবে না অনুপমা। এজন্য বেশ চিন্তায় আছেন তিনি। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নূরের বিয়ে দিতে চান। এজন্য প্রতিদিনই নানা ফন্দি ফিকির করেন তবুও কিছু ভেবে পান না। চিন্তায় চিন্তায় মস্তিষ্ক ক্ষয়ে ক্ষয়ে পড়ছে যেন।
সময় দুপুর দেড়টা, ব্ল্যাক মার্সিডিজ গাড়িটি থামলো বহুতল ভবনের সামনে দাঁড়ায়। দরজা খুলে দু’জন ভদ্রলোক বেরিয়ে এলেন। যুবক দু’জনকে ভদ্রলোক বলা চলে, একজনের গাঁয়ে ঢিলে অলিভ কালারের টিশার্ট আর ব্যাগি জিন্স। অপরজন লাইট ব্লু স্লিম ফিট ফরমাল শার্ট এবং অফ হোয়াইট কালারের ফরমাল ট্রাউজার পরেছে। সানগ্লাস খুলে হাতে নিয়ে দু’জনেই ভবনের ভেতরে ঢুকলো। দেখে বোঝা যাচ্ছে তাদের অনেক ব্যস্ততা। অতি দ্রুত তারা অফিস রুমে ঢুকতে চাইলে বাইরে বসে থাকা কর্মচারী তাদের সাবধান করে বলেন,’সরি স্যার, আপাতত ভেতরে যাবেন না। স্যারের নিষেধ আছে।’ টিশার্ট পরা ছেলেটার নাম ফয়েজ। সে জিজ্ঞেস করলো,’কেন, এর আগে তো এমন নিষেধাজ্ঞা ছিলো না।’
‘আসলে ম্যাডাম এসেছেন তো, স্যার খাবার খাচ্ছেন। তাই দয়া করে একটু অপেক্ষা করুন।’
অপর ছেলেটি কপাল কুঁচকে ফয়েজের দিকে তাকিয়ে বলে,’ইটস ওকে, এতটুকু অপেক্ষা করাই যায়।’
ওয়েটিং রুমে দু’জনে বসে ম্যাগাজিনের পাতা উল্টে পাল্টে দেখছে। একটা ছেলে এসে জুস দিয়ে গেছে, কেউ ছুঁয়েও দেখেনি এখন পর্যন্ত। পাক্কা বিশ মিনিট পর ওদের ডাক এলো অফিস রুমে যাওয়ার জন্য।
রাশেদ সাহেব একজন ইন্টেরিয়র ডিজাইনার, পাশাপাশি আলাদা ফার্নিচারের ব্যবসা আছে। ওটা সাইমন দেখে আর তিনি এই ব্যবসা সামলান। এতক্ষণ নূর ছিলো এখানে। মাদ্রাসায় এখন লাঞ্চ টাইম ছিলো। ওই সময়ে ছুটে এসে কড়া গলায় বাবাকে খেতে বলেছে। তারপর ওষুধ খাইয়ে মাত্রই বেরিয়ে গেল। এজন্য ছেলে দুটো কে বসিয়ে রেখেছেন। দুজনে ভেতরে আসতেই তিনি হাসলেন। মৃদু স্বরে বলেন,’অনেকক্ষণ বসিয়ে রাখালাম, এজন্য দুঃখিত।’
ফয়েজ সহাস্যে বলে উঠলো,’তেমন কিছু নয় দাদু! অনেক দূর থেকে এসেছি তো, এসির নিচে বসে এতক্ষণ হাওয়া খাচ্ছিলাম।’ এক গাল হেসে বলে, ‘আপনার প্রডাক্ট গুলো এত উন্নত মানের এজন্য ঢাকা থেকে ছুটে এসেছে আমার বন্ধু। আসলে আব্বুর মুখে এত সুনাম শুনেছে যে আমাকে টেনে নিয়ে এলো। এখন ওর সমস্যা গুলো সমাধান করে দিন।’
রাশেদ সাহেব ফয়েজের পাশে বসা যুবকের দিকে তাকাতেই সে মুচকি হেসে বললো,’আমি আজমাঈন শিকদার।’
রাশেদ সাহেবও সৌজন্যমূলক হাসলেন। আজমাঈন বললো,’আপনাদের ডেকোরেশনের সুনাম শুনে অন্য কোথাও যেতে মন চাইলো না, তাই ঢাকা থেকে ছুটে এলাম।’
রাশেদ সাহেব মাথা নেড়ে বলেন,’তা কেমন ডেকোরেশন চাও শুনি?’
‘আমার তেমন আইডিয়া নেই আঙ্কেল, আপনিই নাকি বাড়ি দেখে ভালো আইডিয়া দেন। আমার বাড়ির ছবি দেখাচ্ছি আপনাকে।’
পকেট থেকে ফোন বের করে কিছু ছবি দেখায় সে। রাশেদ সাহেব খুব মনযোগ দিয়ে দেখে বলেন,’বেশ সুন্দর ডিজাইন করেছ বাড়ির। তবে এসব ইউনিক ডিজাইনের বাড়ির জন্য আমি আমার মেয়ের থেকে আইডিয়া নেই। ওর ডেকোরেশন চয়েজ ফার বেটার দ্যান মি। তোমরা চাইলে আমি ট্রাই করতে পারি।’
‘কেন নয়, আপনি যেভাবে বলবেন সেভাবেই হবে।’ আজমাঈন সম্মতি দিলো।
‘তাহলে আমাকে একটু সময় দিতে হবে, তুমি ছবিগুলো আমাকে হোয়াটসঅ্যাপ করে দাও। আমি তোমাকে কয়েকটা ডিজাইন পাঠিয়ে দিব। তাছাড়া শোরুম ঘুরে দেখতে পারো, যদি কিছু পছন্দ হয়।’
আজমাঈন মাথা দোলায়,’আমার বন্ধু যখন আপনাকে ভরসা করেছে সেখানে আমি কিছুই বলব না। আপনার কাজের প্রতি আমারও ভরসা আছে।’
রাশেদ সাহেব বেশ খুশি হলেন ছেলে দুটোর কর্মকাণ্ডে। ফয়েজের বাবা বাড়ি করার পর রাশেদ সাহেব কে দিয়ে ডেকোরেশন করিয়েছিলেন, আজমাঈনের ভীষণ পছন্দ হওয়ায় ফয়েজকে জোরাজুরি করে আজ নিয়ে এসেছে। তবে এখানে এসে রাশেদ সাহেব কে বেশ ভালো লেগেছে ওর। শৌখিন মানুষ তিনি। আজমাঈন ব্যতিব্যস্ত হয়ে বললো,’আজ উঠব, কাজ আছে অনেক। এডভান্স পেমেন্ট কত করতে হবে?’
‘এখনও তো কিছু দেখলেই না, আগে আমি ডেকোরেশন বুঝিয়ে দিব এবং খরচের পরিমাণ ও বলে দিব। তুমি শুধু বাজেট বলে দিও।’
দু’জনেই মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। আজমাঈন উঠে দাঁড়িয়ে হ্যান্ডসেক করে বলে,’আজ তাহলে আসি আঙ্কেল? খুব শীঘ্রই দেখা হবে।’
দুজনের সাথে হাত মিলিয়ে সম্মতি জানায় রাশেদ সাহেব। বাইরে আসতে আসতে ফয়েজ বলে,’দেখলি, দশ মিনিটে সব ঠিক করে দিলাম।’ কিছু একটা মনে পড়তেই বললো,’ওয়েট আ মিনিট, আমি ওনাকে দাদু বললাম আর তুই আঙ্কেল বললি!! কেন কেন?’
আজমাঈন চোখে সানগ্লাস পড়ে বলে,’সো হোয়াট? জন্মের আগেই দাদু উপরে চলে গেছে। এজন্য দাদু ডাকটা মুখে আসে না। ঘুরে ফিরে আঙ্কেল বেরিয়ে আসে।’
দ্রুত পা চালিয়ে ফয়েজ বলে ওঠে,’ভাবলাম ওনার মেয়ে পটানোর ধান্দায় আছিস বুঝি।’
আজমাঈন মুখটা বিকৃত করে বলে,’ধ্যাত!! ওনার মেয়ে কি এখনও অবিবাহিত আছে? যে বয়স হয়েছে তাতে ওনার মেয়ের বাচ্চারাও আমার বয়সী হয়ে গেছে। ফালতু বকিস না।’
কথার মাঝেই গাড়ি পর্যন্ত চলে এসেছে ওরা। তবে দেখতে পেলো কেউ একজন ওদের গাড়ির নিচে উঁকি ঝুঁকি দিচ্ছে। বোঝা যাচ্ছে কিছু একটা খুঁজছে। আজমাঈন থমকে দাঁড়ায়। মেয়েটার মতিগতি বোঝার চেষ্টা করে। কিন্তু ফয়েজ লাফিয়ে উঠলো। দ্রুত এগিয়ে এসে বললো,’এই মেয়ে!! এভাবে কি দেখছো?’
এক প্রকার লাফিয়ে উঠলো নূর, সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে দেখলো দু’জন টগবগে যুবক তার পানে চেয়ে রয়েছে। কালো বোরখায় আবৃত তার দেহ খানা। চোখটাও কালো পর্দায় ঢেকে রাখা। তাকে কেউ দেখতে পারছে না এটা নিশ্চিত। কিন্তু এদের সাথে তো কথা বলাও যাবে না। ফয়েজের এমন কথাবার্তার ধরন দেখে বিরক্ত হয় আজমাঈন। অচেনা মেয়েদের সাথে এমন ব্যবহার মোটেও কাম্য নয়। সে বলে উঠলো,’তুই একটু চুপ থাক।’ নূরের দিকে তাকিয়ে বলে,’ডু ইউ নিড এনিথিং?’
কখনো এমন পরিস্থিতিতে না পড়েনি নূর। শক্ত হয়ে এলো শরীর, ভয়ে জমে গেল যেন। আঁটসাঁট হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে।
চলবে,,,,,,,,
পদ্মপ্রিয়া গল্পটি একদিন পর পর দেওয়া হবে এবং রাত আটটার পর গল্প আসবে।
Share On:
TAGS: ঈশিতা রহমান সানজিদা, পদ্মপ্রিয়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE