Golpo romantic golpo নূর এ সাহাবাদ

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ১৯


নূরসাহাবাদ

jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস

পর্ব – ১৯

মেহেরুন্নেসা অন্যমনষ্ক হয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে যাচ্ছিল। মাথার ভেতর কতশত চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল বলে সামনে কী আছে, সেদিকে তার খেয়ালই ছিল না। ঠিক তখনই আচমকা কারও শক্ত বুকের সঙ্গে ধাক্কা খেল সে।
চমকে উঠে মাথা তুলতেই দেখল, সামনে দাঁড়িয়ে আছে বাইজিদ।
মেহেরুন্নেসা কয়েক মুহূর্ত চোখ বড় বড় করে তার দিকে তাকিয়ে রইল। যেন হঠাৎ করেই সব চিন্তা কোথায় মিলিয়ে গেছে। তারপর ধীরে ধীরে তার ভ্রু কুঁচকে এলো, চোখ দুটো সরু হয়ে গেল। এমনভাবে তাকিয়ে রইল, যেন বুঝতেই পারছে না মানুষটা এখানে এলো কোথা থেকে।
বাইজিদ ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে তার সেই বোকার মতো চেয়ে থাকা মুখটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর আলতো করে মেহেরুন্নেসার গাল টিপে দিয়ে বলল
“কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলে?”
মেহেরুন্নেসা কিছু বলার আগেই বাইজিদ ফের তার গালে খুব হালকা করে হাত ছুঁইয়ে দিল। সেই স্পর্শে মেয়েটা আরও কিছুটা থমকে গেল।
“এভাবে অন্যমনষ্ক হয়ে হাঁটলে একদিন কার না কার সাথে ধাক্কা খেয়ে উল্টে পড়বে। সেদিন কিন্তু তোমার স্বামী গলায় দড়ি দেবে হুম”

মজা করে কথাটা বলল বাইজিদ। মেহেরুন্নেসা তখনো অন্যমনষ্ক। তার চিন্তাভাবনা পুরোপুরি সেই লোকটার ওপর। বাইজিদ সিড়ি দিয়ে নামতে নামতে বলল
“আমার একটু কাজ আছে। ফিরে এসে দেখা হচ্ছে। ততক্ষণ আমার বউটাকে দেখে রেখো কেমন।”

বাইজিদ সিড়ির বাক নামতেই মেহেরুন্নেসা পিছন থেকে ডাকলো
“এই যে, শুনুন”

বাইজিদ এর পা থামলো মেহেরুন্নেসার ডাক কানে যেতেই। চট করে পিছনে ফিরে বলল
“কি বললে? আবার বলো তো”
মেহেরুন্নেসা মাথা নিচু করে বলল
“একটা কথা জানার ছিল”

বাইজিদ উঠে আসলো কয়েক সিড়ি। হঠাৎ পিছন থেকে রক্ষীর ডাক
“ক্ষমা করবেন শাহজাদা, বিরক্ত করতে চাইনি। জমিদার বাবু অবিলম্বে আপনার সাক্ষাৎ চান”
বাইজিদ একবার মেহেরুন্নেসার দিকে তাকাতেই মেহেরুন্নেসা ইশারা করলো যেতে। বাইজিদ তারপর রক্ষীর পিছু পিছু গেলো।


সিমরানের ধীরে ধীরে জ্ঞান ফিরতেই মাথার ভেতরটা যেন ঝনঝন করে উঠলো। শরীরের প্রতিটা হাড়ে ব্যথা, মাথাটা ভারী, বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত একটা কাঁপুনি। সকালের ঘটনাটা মনে পড়তেই যেন বুকের ভেতরটা বরফ হয়ে গেল।

মেহেরুন্নেসার ভয়ংকরী চেহারা খানা। যে মেয়েটাকে এতদিন সিমরান মনে মনে তুচ্ছ করেছে, গরীব পরিবার থেকে আসা বোকাসোকা একটা মেয়ে ভেবেছে, সেই মেয়ের চোখে আজ আগুন দেখলো।
শাহজাদার ঘরের দিকে যাওয়ার সময় মেহেরুন্নেসা তার পথ আটকে দাঁড়িয়েছিল। মুখে কোনো রাগ ছিল না, বরং অদ্ভুত শান্ত একটা হাসি। কিন্তু সেই হাসির আড়ালে কী ছিল, সেটা সিমরান এখন বুঝতে পারছে। সিমরান পাত্তা দেয় নি। উল্টো ঠোঁট বাঁকিয়ে পাশ কাটিয়ে যেতে গিয়েছিল। আর ঠিক তখনই একটা ধাক্কা।
না, ধাক্কা না। যেন কেউ হিংস্র রাগে ছুড়ে ফেলেছিল তাকে।
পরের মুহূর্তেই সিঁড়ি বেয়ে গড়িয়ে পড়েছিল সে।
সিমরানের নিঃশ্বাস আটকে এলো। হাত কাঁপতে শুরু করলো। সে স্পষ্ট মনে করতে পারছে মেহেরুন্নেসার চোখদুটো। যেন গিলে খেয়ে নিতে চাইছিলো সিমরান কে।
আর সবচেয়ে বাজে বিষয় বৈঠকে বসে থাকা কেউ কিছুই দেখে নি। সবাই শুধু দেখেছে সিমরান সিঁড়ি থেকে পড়ে গেছে। কেউ খেয়ালই করে নি যে তার পড়ার ঠিক আগের মুহূর্তে সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে ছিল মেহেরুন্নেসা। এখন এ কথা কাওকে বললেও বিশ্বাস করবে না।

মারজান বেগমের মুখ রাগে থমথমে। ঘরের ভেতর পায়চারি করতে করতে হঠাৎ সিমরানের দিকে ফিরলেন তিনি।
“একটা কাজও ঠিকমতো করতে পারলি না তুই! এতদিন ধরে তোকে বললাম, বাইজিদ এর মন জয় কর মন জয় কর। বলি একটা পুরুষকে নজরে বন্দি করতে কী এমন লাগে? পারলি না তো। এখন কোথায় ওই মিসকিন এর ঘরের মেয়েকে শায়েস্তা করবি পদে পদে, আর তুই কিনা উল্টো নিজেই গিয়ে সিঁড়ি থেকে পড়ে গেলি!”

বিছানায় আধশোয়া সিমরান মুখ বিকৃত করে তাকালো। মাথার ব্যথা আর অপমান দুটো মিলিয়ে তার ধৈর্য শেষ।
“ তো আমি করতাম? আর আপনিও
তো বলেছিলেন, বিয়ের আগেই মেহেরুন্নেসাকে শেষ করে দিবেন। তাহলে আপনি পারেননি কেন?”
মারজান থমকে গেলেন।
“কি বলতে চাইছিস?”
সিমরান এবার উঠে বসলো। চোখদুটো লাল হয়ে আছে।
“আপনি সবসময় আমাকে সামনে ঠেলে দিয়েছেন। নিজে কিছু করেননি। বারবার বলেছেন, মেয়েটা এই বাড়িতে টিকবে না। আপনি শায়েস্তা করবেন। একটা ব্যাবস্থা করবেন ওর। ও এখনো এই মহলে আছে কী করে?”

মারজানের চোখে আগুন জ্বলে উঠলো।
“চুপ কর মুখপুড়ি। তোর জন্য যা যা করেছি, এখানে আমার কোনো স্বার্থ ছিল?”
সিমরান হো হো করে হেসে উঠলো
“আমি অতটাও বোকা না আম্মাজান। আপনি স্বার্থ ছাড়াই আমার উপকার করছিলেন এটাও আমায় মেনে নিতে হবে?”

মারজান হাত মুষ্টিবদ্ধ করে বলল
“এত চেষ্টা করলাম তবুও ও মরলো না কেন বলতো?”

“কারণ আমি মারতে দিই নি।”
সিমরান আর মারজান দুজনেই চমকে পিছনে তাকালো। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে সুনেহেরা। চোখ মুখ কঠোর। সুনেহেরা ধীরে ধীরে দরজার চৌকাঠ পেরিয়ে ভেতরে এলো।
মারজান বেগম কপাল কুঁচকে তাকালেন।
“তুই এখানে কি করছিস?”
সুনেহেরা উত্তর দিল না। ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে সিমরানের বিছানার সামনে দাঁড়ালো। তারপর মাথা ঘুরিয়ে তাকালো নিজের মায়ের দিকে।
“তুমি জানতে চাচ্ছিলে, এত চেষ্টা করার পরও মেহেরুন্নেসা মরলো না কেন?”
ঘরটা হঠাৎ অদ্ভুত নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
“কারণ প্রতিবার আমি তোমাকে থামিয়েছি।”
মারজানের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল এক মুহূর্তের জন্য। তারপরই গর্জে উঠলেন তিনি।
“পাগলের মতো কীসব বলছিস তুই?”
সুনেহেরা এবার হেসে উঠলো। কিন্তু সেই হাসিতে কোনো উষ্ণতা নেই।
“মনে নেই? যেদিন মেহেরুন্নেসার বিয়ের কথা পাকা করলো আব্বা। সে রাতে মেহেরুন্নেসা কে ভুল খবর জানিয়ে রাতে প্রাসাদের বাহির করতে চেয়েছিলে। সেদিন ও ওকে আমিই বাঁচিয়ে ছিলাম।
সিমরান চমকে তাকালো। মারজানের ঠোঁট কাঁপতে শুরু করলো।
“মিথ্যে!”
“মিথ্যে?”
সুনেহেরা এক পা এগিয়ে এলো।
“তাহলে সেদিন রাতে তুমি কেন রান্নাঘরের দরজা বন্ধ করে রেখেছিলেন? কেন তোমার খাস দাসী ছাড়া অন্য কাউকে রান্না ঘরে ঢুকতে দাও নি। কারন সেদিনও তুমি বিষ মিশিয়েছিলে মেহেরুন্নেসার খাবারে”
মারজান এবার চুপ। সুনেহেরা থামলো না। চোখে তখন ভয়ংকর একটা দৃষ্টি।
“এমনকি জঙ্গল থেকে সাপুড়ে দিয়ে সাপ এনে সেটাও ছেড়ে দিয়েছিলে মেহেরুন্নেসার ঘরে।”
সিমরানের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। সে ধীরে ধীরে মারজানের দিকে তাকালো। সুনেহেরা বলল

“আমি নিজেই সাপ টাকে ঝুড়িতে ভরে, ঝুড়িটা সরিয়ে ফেলেছিলাম।”
মারজান এবার কাঁপতে শুরু করেছেন। রাগে, অপমানে, না ভয়ে বোঝা যাচ্ছে না। আমতা আমতা করে বলল
“তুই, তুই কেন করেছিস এসব?”
সুনেহেরা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তার ঠোঁটে আবার সেই অদ্ভুত হাসিটা ফুটে উঠলো।
“আর একটা কথা জানেন? আজ সকালে সিঁড়ি থেকে সিমরান পড়ে গেছে, এটা দেখে আমি ভীষণ খুশি হয়েছি।”

সিমরান থরথর করে কেঁপে উঠলো।
“ও….ওটা, ওটা তো কেবল একটা দুর্ঘটনা ছিল”

মারজান আর সিমরান একসাথে তাকালো তার দিকে। সুনেহেরা ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বলল,
“নাআআআআ, মেহেরুন্নেসা ওকে ধাক্কা দিয়েছিল।”
ঘরের বাতাস যেন জমে বরফ হয়ে গেল। সিমরান শুকনো ঢোক গিলে বলল
“ওখানে কিন্তু আমার কোনো দোষ ছিল না”

সুনেহেরা হিসহিসিয়ে বলল
“অনেক দোষ করে ফেলেছো। আর করিও নাহহ। নয়তো মেহেরুন্নেসার হাতেই গর্দান যাবে”

কথাটা বলেই বড় বড় পা ফেলে কক্ষ ত্যাগ করলো সুনেহেরা। সিমরান আর মারজাম তাকিয়ে রইলো ওর চলে যাওয়ার দিকে।


দুপুরের রান্নার কাজে সহযোগীতা করতে মেহেরুন্নেসা হেঁশেলে আসলো। মূলত একা একা ঘরে বসে তার সময় কাটছিল না, তাই রত্নপ্রভার সাথে একটু হাত লাগাতে এসেছে কাজে। বাইজিদ বেড়িয়েছে কোথাও একটা। ফেরার নাম নেই। হেঁশেলে গিয়ে পেলো রত্নপ্রভা কে। মেহেরুন্নেসা গিয়ে পাচে দাঁড়াতেই দেখলো প্রভা মিটি মিটি হাসছে। মেহেরুন্নেসা কপাল কুচকে বলল
“হাসছো কেন?”

প্রভা ছুড়ি দিয়ে সবজি কাটতে কাটতে বলল
“তারপর? কেমন সোহাগ করলে আমার ভাইজান কে? তোমায় ছাড়া তো কিছু চোখেই দেখছে না দেখি”

মেহেরুন্নেসা লজ্জায় লাল হয়ে গেল রত্নপ্রভার কথায়। জবাব না দিয়ে শুধু মাথা নিচু করে রইলো। তাই দেখে প্রভা বাহু দিয়ে মৃদু ধাক্কা দিয়ে বলল
“এ্যাই মেহের, লজ্জা পাচ্ছো কেন? বলো না। আমায় তো তুমি সবই বলো। কাল যে কাহিনি টা হলো তোমাদের বিয়ের সময়। বাসর ঘরের নিয়ম কানুন যে তোমায় সব বুঝিয়ে বলবো, সময়ই পাই নি আমি যাওয়ার”

মেহেরুন্নেসা সবুজ তাজা শাক গুলো একটা একটা করে ছিড়ে ঝুড়িতে রাখছে। কৌতূহলি হয়ে জিজ্ঞেস করলো
“আপা কে পালিয়ে ছিল?”

রত্নপ্রভা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল
“মিরান, একজন নারী আসামী। ওকে ১০ বছর কারাগারে থাকার শাস্তি দেওয়া হয়েছিলো। সবে ৩ বছর চলে। এর আগে কখনো পালানোর চেষ্টা করেনি। এই প্রথম বার পালিয়েছিল”

মেহেরুন্নেসা মনোযোগ দিয়ে শুনলো প্রভার কথা
“তার অপরাধ টা কি?”

প্রভার নাক কুচকালো।
“ও ৫৬ টা খু’ন করেছে। তাও ভীষণ বাজে ভাবে। কারোই সম্পূর্ণ শরীর পাওয়া যায়নি ও যাদের খুন করেছে। এবং তারা প্রত্যেকেই পুরুষ।”

মেহেরুন্নেসার শরীর রি রি করে ওঠে খু’নের বর্ননা শুনে। বিষ্ময় নিয়ে বলল
“এর কারণ জিজ্ঞেস করা হয়নি ওকে? কেন এত গুলো হত্যা করলো? তাও চবার শুধু পুরুষদের”

প্রভার হাত থামে সবজি কাটা থেকে। আনমনে হয়ে জানালা দিয়ে তাকায়। গম্ভীর মুখে বলে
“কোনো লাভ হয় নি জিজ্ঞেস করে। ওর নাকি আরো ১৯ টা হত্যা করা বাকি। তারপর নিজেই বলবে সব আর নিজেই ধরা দেবে। আজীবন সেচ্ছায় থাকবে কারাগারে। এমনকি কারাগারে থেকেও মিরান ১১ টা খু’ন করেছে”

মেহেরুন্নেসা চমকে ওঠে
“তা কিভাবে সম্ভব?”

“সেসব বাদ দাও। তুমি তোমার কথা বলো। ভাইজান কি উপহার দিল তোমায়?”
মেহেরুন্নেসা সাবলীল ভাবে জবাব দিল
“কোনো উপহার দেয় নি তো”

প্রভা অবাক হয়ে বলল
“সে কি? বাসর রাতে স্বামী স্ত্রী কে উপহার দিবে না? না না ভাইজান কাজ টা একদম ই ঠিক করে নি। আমি আজই ধরবো তাকে”

মেহেরুন্নেসার মুখটা বিষাদে ঢেকে গেল। তারমানে বাইজিদ এর কি তার ওপর কোনো আগ্রহ নেই? উপহার টা কে মেহেরুন্নেসা বড় করে দেখছে না, কিন্তু একটা ছোট্ট জিনিস দিলেও তো মেহেরুন্নেসা কত খুশি হতো। মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে প্রভা বলল
“উপহার দেয়নি, সোহাগ করতে দিছো কেন? তোমার উচিত ছিল দূরে থাকা। তাহলেই বুঝতো হুহহ। কাছে আসতে দিছো কেন”

মেহেরুন্নেসা চোখ সরু করে বলল
“তুমি কি করে জানলে? কাছে এসেছিলো কি আসে নি”

প্রভা মেহের এর কাধ জড়িয়ে ধরে ব্যাঙ্গ করে বলল
“সক্কাল বেহানা মিয়া-বিবি দুজনে ভেজা চুলে ঘর থেকে বাহির হলো। কারও কি বোঝা বাকি থাকে?”

মেহেরুন্নেসা জানে প্রভা ভুল ভাবছে। তবুও চুপ করে রইলো। কারণ যদি এখন বলে যে এমন কিছু হয়নি, তাহলে হয়তো উল্টো জেরা করবে। কেনো হয়নি? তার চেয়ে বরং যা ভাবছে, তাই ভেবে খুশি থাকুক।

“হয়েছে, আর লজ্জা পেতে হবে না মেয়েটার। নতুন নতুন বিয়ে হলো, স্বামীকে পছন্দের কিছু রান্না করে খাওয়াও”

মেহেরুন্নেসা মাথা নিচু করেই ময়দা মাখতে শুরু করলো। ময়দা মাখতে মাখতে আবার তার মাথায় আসলো সেই ছবিটার কথা। এমন অদ্ভুত যোগসূত্র সে মেলাতে পারছে না। একদিকে সেই জহাজে বাইজিদ এর মত কাওকে দেখলো। আবার ঘরেও বাইজিদ ছিল। আবার ছবিটাও বাইজিদ এর মতই কিন্তু চোখের রং পরিবর্তন। কিন্তু প্রভা কে তো জানানো যাবে না জাহাজের বিষয় টা।


আজ দুপুরে বাইজিদ প্রাসাদে ফিরলো না। ফিরলো সন্ধ্যার আগে। মহলে ঢুকেই আগে মেহেরুন্নেসার খোঁজ করলো। আশেপাশে কোথাও না দেখে ভাবলো হয়তো কক্ষে আছে। ক্লান্ত শরীর টা টেনেটুনে নিয়ে গেল নিজের ঘরে। সারাটা দিন প্রিয়তমা কে দেখে নি। বুকটা পিপাসায় চৌচির হয়ে আছে। এখন তাকে দেখে আত্মাটা জুড়িয়ে নেবে, যেতে যেতে ভাবে বাইজিদ। মেহেরুন্নেসা ও কি সারাটা দিন তাকে এই ভাবে মনে করেছে? তার বুঝি বুক পোড়ে নি শাহজাদা কে দেখার জন্যে। মেহেরুন্নেসা কি তার অপেক্ষায় বসে আছে? কখন সে ফিরবে? তাকে ফিরতে দেখে মেহেরুন্নেসার অভিব্যাক্তি কেমন হবে? নানা ভাবনা বাইজিদ এর মনে।

কক্ষের দরজাটা ধীরে ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই বাইজিদের পা যেন থমকে গেল। পালঙ্কের ওপর মেহেরুন্নেসা এলোমেলো হয়ে ঘুমিয়ে আছে।
তার গাঢ় কালো চুল ছড়িয়ে আছে সাদা বালিশের ওপর। খোলা চুল গুলো বিছানা ছাড়িয়ে মেঝে ছুঁয়েছে। বুক ওবদি চাদর টেনে রাখা। মুহূর্তেই বাইজিদের চোখে মুখে নেমে এলো একরাশ মুগ্ধতা।
দিনভর তৃষ্ণার্ত বুকটা যেন হঠাৎ করেই একটু শান্ত হলো। এতক্ষণ যার জন্য বুকের ভেতর অস্থিরতা ছিল, সে তো এখানেই আছে। ঠিক তার সামনে। তার কক্ষে। তার নিঃশ্বাসের দূরত্বে।
বাইজিদ কিছুক্ষণ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলো।
তার দৃষ্টি ধীরে ধীরে মেহেরুন্নেসার মুখের ওপর থেমে রইল। সবকিছু এমনভাবে দেখছিল, যেন বহুদিন পর স্ত্রী কে দেখছে।

কিন্তু পরক্ষণেই তার মুখের সেই মুগ্ধতা ফিকে হয়ে গেল। একটা অদ্ভুত বিষণ্নতা বুকের ভেতর নিঃশব্দে গাঢ় হলো। প্রিয়তমা অপেক্ষা করে নি।
মেহেরুন্নেসা তার জন্য বসে ছিল না। সে ফিরবে বলে দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে নি। সে বাইজিদ কে দেখার আগ্রহে জেগে নেই, ঘুমিয়ে পড়েছে। হয়তো সারাটা দিনেও বাইজিদের কথা তার মনে পড়ে নি। এই ভাবনাটাই কেমন তীব্র কাঁটার মতো বিঁধলো বাইজিদের ভেতর। চোয়াল শক্ত হয়ে এলো তার।

তারপর গায়ের ভারী পোশাক খুলে ফেললো। সারাদিনের ধুলো, ক্লান্তি, অস্থিরতা যেন সেই পোশাকের সাথেই মেঝেতে পড়ে রইলো। শেষে শুধু কালো পায়জামা পরে দাঁড়িয়ে রইলো সে।
নিঃশব্দে আবার তাকালো মেহেরুন্নেসার দিকে।
দীর্ঘ, গাঢ় দৃষ্টিতে তাকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখলো বাইজিদ।
তার চোখে ছিল অভিমান আর এমন এক অদ্ভুত আকুলতা, যেটা সে নিজেও ভাষায় বলতে পারে না। এই মেয়েটা তাকে পাগল করে দেয়। তার এলোমেলো চুল, ঘুমন্ত মুখ, গলার কাছে আলগা হয়ে থাকা ওড়না, আঙুলের ফাঁকে মুঠো হয়ে থাকা চাদরের ভাঁজ সবকিছুতেই বাইজিদের বুকের ভেতর কেমন অসহায় একটা টান লাগে।
সে ধীরে ধীরে পালঙ্কের কাছে এগিয়ে এলো।
তারপর নিচু হয়ে মেহেরুন্নেসার মুখের খুব কাছে গিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। ঘুমটা ভাঙাতেও মায়া হচ্ছে, আবার কথা বলতোও ইচ্ছা করছে
অন্ধকার হয়ে আসা কক্ষটায় খুব নিচু স্বরে, প্রায় ফিসফিস করে বললো
“তুমি কি ক্লান্ত নূর? শুনছো? এই মেহের। একবার টি উঠবে? দুটো কথা বলতাম তোমার সাথে”

ফিসফিসে স্বরটা কানের কাছে পৌঁছাতেই মেহেরুন্নেসার চোখের পাতা কেঁপে উঠলো।
ঘুম ভাঙার ঘোরে প্রথমে কিছুই বুঝতে পারলো না সে। তারপর চোখ খুলতেই সামনে এত কাছে বাইজিদের মুখ। সেই সবুজাভ গভীর চোখদুটো ব্যাকুলতা নিয়ে চেয়ে আছে তার দিকে।

সারাদিন মেহেরুন্নেসার ভাবনায় ছিল প্রভার বলা কথাটা। বাইজিদ সামান্যটুকু উপহারও মেহেরুন্নেসা কে দেওয়ার আগ্রহ পায় নি। সারাদিন এই ভেবে বুক টা ভারি ভারি লেগেঋে তার। কিন্তু এখন তাকে এত কাছে দেখে বুকের ভেতর জমে থাকা অভিমানটা আরো তীব্র হয়ে উঠলো। এই বিয়ে তার কাছে কেবল দায়িত্ব। কেবল শাস্তি। যেন মেহেরুন্নেসা তার জীবনে কোনো কাঙ্ক্ষিত নারী নয়, কেবল ভাগ্যের চাপে পাওয়া এক মানুষ।

যতটুকু আগ্রহ দেখায়, তা কেবল কাছে আসতে। শরীর ছুঁতে। এই ভেবে মেহেরুন্নেসা চোখ নামিয়ে নিল। একটাও কথা বললো না। বাইজিদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে উল্টো পাশে শুয়ে পড়লো।
পিঠটা শক্ত করে রাখলো। যেন তার কাছে বাইজিদের উপস্থিতি, তার কণ্ঠ, তার স্পর্শ কোনোটারই কোনো মূল্য নেই।
মেহেরুন্নেসার এই আচরণে বাইজিদ স্থির হয়ে গেল। মুহূর্তের জন্য তার বুকের ভেতরটা কেমন শূন্য হয়ে উঠলো। সে কি এতটাই অপছন্দের?
মেহেরুন্নেসা কি তাকে স্বামী হিসেবে মেনে নিতে পারছে না? তার স্পর্শ, তার কাছে আসা সবকিছুই কি মেহেরুন্নেসার কাছে অস্বস্তিকর?

সারাটা দিন সে ভেবেছে, মেহেরুন্নেসা হয়তো তার জন্য অপেক্ষা করছে। তার ফিরে আসার শব্দ শুনে হয়তো ছুটে আসবে। চোখ তুলে তাকাবে। হয়তো লাজুক গলায় জিজ্ঞেস করবে, “এত দেরি কেন হলো?”

কিন্তু না। সে তো তার দিকে তাকাতেও চাইলো না।
বাইজিদ কিছুক্ষণ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর খুব ধীরে গিয়ে পালঙ্কের কিনারায় বসল।
মেহেরুন্নেসার দিকে হাত বাড়িয়েও থেমে গেল সে।
আঙুলগুলো মাঝ আকাশেই স্থির হয়ে রইলো।
যদি সে স্পর্শটাও না চায়? যদি সে আরো দূরে সরে যায়? গলা শুকিয়ে এলো বাইজিদের। হাসফাস লাগছে, যেন এক্ষুনি দম আটকে যাবে। মেহের কেনো তাকে অবহেলা করছে? কেন আপন করে নিচ্ছে না? অনেক কষ্টে নিচু স্বরে বললো
“আসলে সারাটা দিন তোমার সাথে কথা হয় নি তো। তাই ঘুম থেকে ডাকলাম। তুমি বিরক্ত হলে নাকি? বেশি ঘুম পাচ্ছে? আসলে ভেবেছিলাম ফিরে তোমার হাতে খাবো”

তার কন্ঠে অসহায়ত্ব স্পষ্ট। কত করুন শোনাচ্ছে তার আবদার গুলি। মেহেরুন্নেসা তবুও নড়লো না। কথাও বলল না। যাকে ভালোবাসে না তার কাছে এত আবদার কিসের?

গল্প আজ ১৯ পর্ব গেলো। কয়েকজন এরই মধ্যে বলছে নায়কের কোনো ভূমিকা নেই, এ আবার কেমন গল্প? পড়ে নাকি হতাশ 🙂 আচ্ছা গল্প গুছিয়ে আসতে কি সময় লাগে না? হুট করে এলোমেলো যা মনে চায় লিখলে কি বুঝবেন? আগের টা আগে না দিয়ে, পরের টা আগে করে খিচুড়ি করলে লেখার সৌন্দর্য থাকবে না। তাই ধৈর্য ধরে পড়ুন, লেখিকা এতটাও রুচিহীন নয় যে গল্পের মেইন চরিত্রের কোনো ভূমিকা রাখবে না। আর যারা ইনবক্সে লিংক হারিয়ে ফেলে নক করেন, ফলো দিয়ে রাখতে অসুবিধা হয়? ফলো দেওয়া থাকলে আপলোড দেওয়ার সাথে সাথে আপনার ফিডে পৌঁছে যাবে। কেমম হইছে বলবেন 😽🫶

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply