#শেষ_পাতায়_সূচনা [৬২.১]
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
—আদ আহিলেল নিউ বেবি সিস্টারকে নিয়ে এসেচিল স্কুলে। আমি আহিলেল বেবি সিস্টারকে একতু আদল কলতে গেলে নীল আহিলকে বলে, আমি দুত্তু বাত্তা। তাই তো আমাল মাম্মা-পাপা আমায় বোনু এনে দিততে না। আহিল এই কতা শুনে আমাকে আল আদল কলতে দেয় না ওল বেবি সিস্টারকে।
নীলেল কতা শুনে আহিল আমাকে আদুল কলতে দেয়নি ওর সিস্টারকে। আত্তা মাম্মা, তাজ কি বেশি দুত্তু বাত্তা? তাই তুমি আমায় বেবি সিস্টার এনে দিততো না?
মায়ের বুকে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কথাগুলো বলে তাজওয়াদ। পূর্ণতার মনটাও খারাপ হয়ে যায় ছেলের কথা শুনে। তারা তো ট্রাই করছে তাজের বোনু আনার, এখন উপরওয়ালা না দিলে তাদেরই বা কি করার আছে?
পূর্ণতা ছেলের মাথায় কতগুলো চুমু দেয়। সে জানে ছেলের মন কীভাবে ভালো করতে হয়। বেশ কিছুক্ষণ আদরে আদরে ভরিয়ে রাখে সে তাজওয়াদকে। মায়ের আদর খেয়ে তাজওয়াদের কান্নাও থেমে যায়। তখন পূর্ণতা আস্তে ধীরে বলে–
—আমার তাজ কত ভালো বাচ্চা সেটা তার মাম্মা ছাড়া আর ভালো কে জানবে, হুউ? তুমি কি জানো তাজ, যখন মায়েরা তার বাবুদের ভালো বলে, তখন আল্লাহও তাদের উপর খুশি হয়। খুশি হয়ে তাদেরকে অনেক কিছু দেয়।
—কি দেয় মাম্মা?
—তারা যা সবচেয়ে বেশি চায় তা দেয়। তবে একটু ধীরে সুস্থে দেয়। আল্লাহ পাক দেখতে চান, বাবুটা কি তার মায়ের সব কথা শুনে নাকি আবারও দুষ্টুমি করা শুরু করে দিয়েছে। আমার তাজওয়াদ তো এখন কত ভালো বাচ্চা হয়ে গিয়েছে। মায়ের সব কথা শুনে। তাই আল্লাহ পাক খুব শীঘ্রই তোমার জন্য বেবি সিস্টার পাঠাবে।
—সত্যি মাম্মা? কবে পাঠাবে বেবি সিস্টার?
এই রে! বাচ্চাদের এই এক ঝামেলা। প্রশ্নের পিঠে প্রশ্ন থাকবেই তাদের। কিন্তু সব প্রশ্নের কি উত্তর হয়? পূর্ণতা এখন এই প্রশ্নের জবাবে কি বলবে বুঝে উঠতে পারে না। তাঁকে এই বিপদের মুখ থেকে বাঁচাতে উপরওয়ালা সাহায্য করেন। তাদের কথার মাঝেই ফোন দেয় জাওয়াদ।
পূর্ণতা ফোনটা হাতে তুলে নিয়ে দেখে জাওয়াদ ভিডিও কল দিয়েছে। সে কলটা রিসিভ করতে করতে তাজওয়াদকে বলে –
—তাজওয়াদের পাপা কল দিয়েছে, সে কি কথা বলবে?
—হ্যাঁ, হ্যাঁ বলবে।
কলটা রিসিভ করতেই পূর্ণতার চোখের সামনে ভেসে ওঠে তার শ্যামসুন্দর পুরুষের ক্লান্ত মুখশ্রী। লোকটার গলায় টাওয়াল ঝুলানো, এলোমেলো চুলগুলো থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে তখনও। পূর্ণতা শক্ত গলায় বলে–
—তাজের পাপা, চুল মুছুন ভালো করে। পানি পড়ে টি-শার্ট ভিজিয়ে দিচ্ছে, ঠান্ডা লেগে যাবে তো।
—তুমি একটু মুছিয়ে দাও না তাজের মাম্মা। আ’ম ঠু মাচ টায়ার্ড সোনা।
ক্লান্ত গলায় বলে কথাটি বলে জাওয়াদ। পূর্ণতার বুকটা খচখচ করে ওঠে তার কথা শুনে। দেশে থাকতে জাওয়াদকে বলতেও হতো না, পূর্ণতা নিজেই এসে মুছিয়ে দিতো ভেজা মাথা। কিন্তু আজ যে চাইলেও পারবে না। তারা যে একে অপরের থেকে হাজারও মাইল দূরে।
—পাপা, ও পাপা।
যান্ত্রিক ফোনের স্ক্রিনে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল পূর্ণতা-জাওয়াদ একে অপরের দিকে। নিজেদের সারাদিনের চোখের তৃষ্ণা মিটিয়ে নিচ্ছিল তারা। তবে তাদের সে কাজে বাঁধ সাধে তাদেরই গুনধর পুত্র। পাপার থেকে এটেনশন না পেয়ে বাচ্চাটা জোরে জোরে ডাকতে থাকে।
—বলো কলিজা, শুনছি পাপা।
—তুমি কেমন আতো পাপা? তুমি কবে আতবে?
—আলহামদুলিল্লাহ একটু একটু ভালো আছি। আমার কলিজা আর হার্ট কেমন আছে?
—বালো আতে। তুমি ইত্তু ইত্তু ভালো আতো কেন পাপা?
—কারণ আমার কলিজা আর হার্ট কতদূরে, তাই।
—ওহ্হ।
একটু থেমে তাজওয়াদ আবারও সুধায়–
—ও পাপা, বললে না তো কবে আতবে তুমি? তাজ পাপাকে ভীচওওওণ মিস কলছে।
—পাপা অলসো মিস তাজওয়াদ এন্ড হার মাম্মা। কাজ শেষ হলেই ছুটে ছুটে চলে আসবে তার জান বাচ্চার কাছে।
কথা বলতে বলতেই জাওয়াদ খেতে বসে। পূর্ণতা তাদের বাবা-ছেলেকে সময় দেয় আর নিজের চোখের তৃষ্ণা মেটাতে থাকবে চুপ থেকে। খাবারের অদ্ভুত স্বাদ আর ক্লান্তির জন্য জাওয়াদ বেশি একটা খেতে পারে না, অল্প কিছু খেয়েই হাত ধুয়ে উঠে যায়। তাকে এমনটা করতে দেখে পূর্ণতা ভ্রু কুঁচকে বলে–
—এইটুকু খাবার খেয়ে উঠে গেলেন কেন? সারাদিন এত খাটাখাটুনি করে এতটুকু খাবার খেলে হবে?
—তোমার হাতের রান্না খাওয়ার বাজে অভ্যাস হয়ে গিয়েছে সোনা। এরা কি সব মিষ্টি মিষ্টি বানিয়ে রেখে, খাবারে না আছে ঝাল, নাই আছে তেল।
—তাই বলে এত অল্প খেলে চলবে? অসুস্থ হয়ে পড়লে কিন্তু আপনার খবর নিয়ে ছাড়ব আমি বলে রাখলাম।
পূর্ণতার হুমকি শুনে হেঁসে দেয় জাওয়াদ। রুমের লাইট নিভিয়ে দিয়ে বেডে এসে শুয়ে পড়ে। বেডে শুতেই ঘুমের কারণে তার চোখ বুঁজে আসতে চায়, কিন্তু তাও জাওয়াদ কল কাটছে না দেখে পূর্ণতা ধমক দিয়ে বলল–
—অ্যাই কল কাটুন। ঘুমে চোখ বুজে আসছে তাও কল কাটছে না। ঘুমান, কত রাত হলো খেয়াল আছে আপনার।
—হুম আছে। কিন্তু কথা বলতে মন চাচ্ছে তোমাদের সাথে আরো। ঘুমালেই তো সেই সকালে গিয়ে চোখ খুলবে, তারপর সেই আবারও কর্মব্যস্ততা। সারাটা দিন তো আর কথা বলার ফুরসত টুকুও পাবো না। আরেকটু কথা বলি না….
কথার মাঝেই ঘুমে জাওয়াদ ঢলে পড়ে। পূর্ণতা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কলটা কেটে দেয়। তারপর তাজওয়াদকে নিয়ে ফ্রেশ হয়ে নেয়। দুপুরের খাবারের সময় পূর্ণতা মাছের কোন তরকারিই খেতে পারে না। তার কাছে কেমন আঁশটে গন্ধ লাগে তরকারিটা। গন্ধটা তার জানে এতটাই প্রকট লাগে যে, তাজওয়াদকে যখন মাছের তরকারি দিয়ে ভাত খাওয়াচ্ছিল, তখনই তার পেটের নাড়িভুড়ি কেমন মোচড় দিয়ে দিয়ে উঠছিল। সে কোনমতে চিকেন দিয়ে কয়েক লোকমা ভাত খেয়ে উঠে যায়।
খাওয়াদাওয়া শেষে সে তাজওয়াদকে নিয়ে শুয়ে পড়ে। তাজওয়াদ ঘুমিয়ে পড়তেই পূর্ণতা আস্তে করে বেড থেকে নেমে গিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। আয়নায় একধ্যানে তাকিয়ে থাকে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে।
এক সন্তানের মা হওয়ার কারণে নিজের শরীরের ছোট্ট ছোট্ট পরিবর্তনগুলো পূর্ণতার অচেনা নয়। বরং শরীরের প্রতিটি নীরব সংকেত যেন সে খুব সহজেই পড়ে ফেলতে পারে। এই অনুভূতিগুলো তার কাছে নতুন নয়—নতুন শুধু এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আরেকটি ছোট্ট প্রাণের অস্তিত্ব।
তাজওয়াদের সময়টা মনে পড়তেই বুকের ভেতর কেমন একটা শূন্যতা আর মায়া একসঙ্গে জেগে ওঠে।
সেই সময়ের মর্নিং সিকনেস, বমি, খাবারের প্রতি তীব্র অরুচি—সবকিছুই ছিল ভয়াবহ। দিনের পর দিন কিছু খেতে না পারা, সামান্য খাবার মুখে তুললেই বমি হয়ে যাওয়া, দুর্বলতায় শরীর ভেঙে পড়া—সবকিছুর সঙ্গে আবার লড়তে হয়েছিল নিজের ভেতরের অস্থিরতার সঙ্গেও। তার মানসিক অসুস্থতার সেই কঠিন সময়টার কথা তো আলাদা করে বলাই বাহুল্য।
এমনকি কানাডার ডাক্তারও একসময় তার স্বাস্থ্যের কথা ভেবে গর্ভপাত করিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, এই সন্তানকে পৃথিবীতে আনতে গেলে পূর্ণতার নিজের জীবনও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যেতে পারে।
কিন্তু বহুকাঙ্ক্ষিত সুখ যখন তার দুয়ারে এসে দাঁড়িয়েছিল, তখন কি আর নিজের হাতে সেই সুখকে মুছে ফেলা যায়? অবশ্যই না। পূর্ণতা পারেনি।
ভয় পেয়েছিল, কেঁদেছিল, অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করেছিল—তবুও নিজের গর্ভের ছোট্ট প্রাণটাকে পৃথিবীর আলো দেখানোর সিদ্ধান্ত থেকে একচুলও সরেনি। বলতে গেলে, নিজের জীবনটাকেই বাজি রেখে তাজওয়াদকে পৃথিবীতে এনেছিল সে।
ডেলিভারির সময়ও প্রাণনাশের আশঙ্কা ছিল প্রবল। অন্যান্য নারীদের ক্ষেত্রে তার চারপাশের মানুষ একটি সন্তান জন্মের অপেক্ষা করে, অথচ পূর্ণতা জানত—ওই দরজা পেরিয়ে সে আদৌ আবার ফিরে আসবে কি না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবুও সে গিয়েছিল।
কারণ তার কাছে মাতৃত্ব শুধু শরীরের ভেতর একটি সন্তান ধারণ করা ছিল না। মাতৃত্ব ছিল নিজের অস্তিত্বের এক টুকরোকে পৃথিবীর আলো দেখার সুযোগ করে দেওয়া। নিজের জীবন দিয়েও যে ভালোবাসাকে বাঁচিয়ে রাখা যায়, তাজওয়াদ ছিল তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
আর শেষ পর্যন্ত—সব ভয়, সব কান্না, সব যন্ত্রণা, সব অনিশ্চয়তাকে পেছনে ফেলে তার বুকে এসেছিল এক ফুটফুটে ছোট্ট প্রাণ। তাজওয়াদ। তার কলিজা।
যে শুধু তার সন্তান হয়ে আসেনি; পূর্ণতার ভাঙাচোরা নারীজীবনের প্রতিটি অসম্পূর্ণতাকে যেন নিঃশব্দে পূর্ণ করে দিয়েছিল।
আজও সেই স্মৃতি মনে পড়লে পূর্ণতার বুকটা কেমন করে ওঠে। এতটা পথ পেরিয়ে এসেও সে ভুলতে পারে না—কীভাবে মৃত্যুর দুয়ার অবধি ঘুরে এসে সে তার সন্তানকে পেয়েছিল।
আর তাই নিজের শরীরে নতুন করে ফুটে ওঠা এই লক্ষণগুলোকে ভয় পাওয়ার বদলে আজ তার চোখে অদ্ভুত এক মায়া জমে। হয়তো আবারও কেউ আসছে।
তার আরেকটি বহুল প্রতীক্ষিত ভালোবাসা। হয়তো এবারও তাকে কিছুটা কষ্ট পেতে হবে, আবারও ভয় আসবে, আবারও শরীর-মন ক্লান্ত হয়ে পড়বে।তবুও পূর্ণতার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে।
কারণ সে জানে, মাতৃত্বের কাছে পৃথিবীর সব কষ্টই যেন শেষ পর্যন্ত খুব ছোট হয়ে যায়।
দীর্ঘ কয়েকদিন ধরেই পূর্ণতার খাওয়ায় ভীষণ অরুচি দেখা দিয়েছে। মর্নিং সিকনেস, ভমেটিং না হলেও, কিচ্ছু খেতে পারছে না সে। জাওয়াদ দেশে থাকা অবস্থায় তাকে বেশ কয়েকবার ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে চেয়েছে, কিন্তু পূর্ণতা দ্যা গ্রেট ঘাড়ত্যাড়া যায় নি। কিন্তু আজ তার নিজেরই মনে হচ্ছে, ডাক্তারের কাছে অতিশীঘ্রই যাওয়া উচিত। তার মন বলছে, সে আবারও দীর্ঘ নয়মাসের বেদনাময় সুখের খবর পেতে চলেছে।
কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই পূর্ণতা তার ডান হাতটি ধীরে ধীরে এনে রাখে নিজের পেটের ওপর। আয়নার প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে এক অপার্থিব মায়ামাখা হাসি। হাতের তালু দিয়ে পেটটা খুব আলতো করে ছুঁয়ে, যেন ভেতরে থাকা ছোট্ট প্রাণটাকে আদর করছে, ফিসফিসিয়ে বলে—
—তাজওয়াদের বোনু, আপনি কি সত্যিই মায়ের অস্তিত্বের মাঝে চলে এসছেন, হুম?
সে একটু থেমে মৃদু হেসে আবার বলে,
—জানেন আম্মাজান , আপনার ভাইয়ু কতটা পাগল হয়ে রয়েছে আপনাকে আদর করার জন্য। ভাইয়াকে বেশি অপেক্ষা করিও না মা, তাড়াতাড়ি আমাদের মাঝে চলে আসো তো।
পূর্ণতা আবারও রেডি হতে থাকে অফিসের জন্য। তিনটার দিকে জিনিয়া চলে আসবে ভার্সিটি থেকে। তাজওয়াদের ঘুম ভাঙলে সে হয় তার দাদুর কাছে, নাহয় পিপির কাছে চলে যায়। তাই পূর্ণতা নিশ্চিন্ত মনে অফিসে চলে যায়।
সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফেরার পথে পূর্ণতা ডাক্তার দেখিয়ে আসে। সেই সাথে পরিচিত কিছু টেস্টও করে আসে, যেগুলোর রিপোর্ট থেকে জানা যাবে আসলেই কি তাজওয়াদের বোনু আসতে চলেছে নাকি।
সন্ধ্যায় তাজ আর জিনিয়া একসাথেই পড়তে বসেছে। পড়ার সময় তাজ এখন আর একটুও দুষ্টমি করে না। গুডবয়ের মতো আগে সব পড়া শেষ করে, তারপর অন্যকাজে হাত দেয়। তাই জিনিয়া তাকে নিজের সাথে নিয়েই পড়তে বসে। এতে করে পূর্ণতার একটা কাজে অন্তত সাহায্য করা হয়।
তারা যখন মনোযোগ দিয়ে পড়ছিল, তখনই জিনিয়ার ফোনটা বেজে ওঠে সশব্দে। জিনিয়া ফোনটা হাতে তুলে নিলে দেখতে পায়, টনি ফোন করেছে। ভিডিও কল। সে কলটা রিসিভ করার আগে নিজের এলোমেলো চুলগুলো একটু গুছিয়ে নিয়ে মাথায় কাপড় দিয়ে নেয়, তারপর কলটা রিসিভ করে প্রথমেই মুচকি হাসি দিয়ে সুন্দর করে একটা সালাম দেয়। জিনিয়ার হাসি দেখেই টনির মন আরেকবার উষ্টা খেয়ে পড়ে তার প্রেমে। মেয়েটার বয়স বিশের কোঠা পাড় করলেও, দেখতে ষোলো-সতেরো বয়সের রমণী লাগে।
—কি হলো? ফোন করে কোন দুনিয়ায় হারিয়ে গেলেন?
জিনিয়ার কথায় টনির ঘোর কাটে। সেও হাসি হাসি মুখে বলে–
—ভালোবাসার জগতে হারাতে চাই তোমাকে নিয়ে, কিন্তু তখনই মনে পড়ে আমি বর্তমানে লুলা।
টনির কথা শুনে জিনিয়ার রাগ হয় ভীষণ। লোকটা বড্ড বেশি বাজে বকে। সে নাক ফুলিয়ে মেজাজ দেখিয়ে বলে–
—সামনে পেলে না লুলা বলা ছুটিয়ে দিবো একদম। লুলা কি হ্যাঁ? এক্সিডেন্টের কারণে সাময়িক ভাবে হাঁটতে পারছেন না, আপনার পা তো ভালো হওয়ার পথে। আজাইরা কথা বলে আমাকে রাগিয়ে না দিলে আপনার চলে না?
—না। কারণ তোমাকে রাগানোও আমার প্রিয় কাজগুলোর একটি।
—আচ্ছা? তাই বুঝি? একবার বউ হয়ে যাই, তারপর নাকে দড়ি দিয়ে যদি না ঘুরিয়েছি, তাহলে আমিও শেখ পরিবারের মেয়ে না।
টনি জিনিয়ার কথা শুনে একটা হতাশামিশ্রিত শ্বাস ত্যাগ করে বলল–
—সেটা তো এখনই যথেষ্ট করছো। বিয়ের পর মনে হয় না তোমার জ্বালায় বেশিদিন সুস্থ থাকব মানসিকভাবে। পাবনার টিকিট এখনই কেটে রাখি, কি বলো?
—জুনায়েএএএএদ, আপনাকে আমি কাঁচা খেয়ে ফেলবো কিন্তু আরেকটা বাজে কথা বললে।
জিনিয়াকে আবারও রেগে যেতে দেখে টনি ফোনের ক্যামেরা অফ করে কিছুক্ষণ বিছানায় গড়াগড়ি খেতে খেতে হাসে। মেয়েটা একটুতেই রেগে টমেটো হয়ে যায়, আবার একটু আহ্লাদেই গলে যায় হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো।
টনি তখনও হাসছিল ফোনটা পাশে রেখেই, হুট করেই কেউ একজন তার রুমে ঢুকে যায় পারমিশন ব্যতীতই। ঢুকেই ন্যাকা স্বরে বলে–
—কেমন আছো টনি?
টনি হাসি থামিয়ে আগন্তুকের দিকে তাকালে, তার মাথা গরম হয়ে যায়। আগন্তুক আর কেউ না তার সেই ফুফুর মেয়ে, যাকে বিয়ে করবে না বলে পাঁচ বছর আগে জাফর সাহেব তার সাথে ওমন অন্যায় করেছিল। মেয়েটির নাম রুশা।
টনি রেগে গম্ভীর গলায় বলে–
—কারো রুমে প্রবেশ করার আগে তার পারমিশন নিতে হয় এটাও দেখি জানো না। তাহলে এত বছর বিদেশে থেকে, সেখানে পড়ে লাভটা হলো কি? সেই তো মূর্খের পরিচয়ই দিচ্ছো।
টনির কথা শুনে রুশার গা জ্বলে ওঠে অপমানে। তাও সে নির্লজ্জের মতো হাসতে হাসতে বেডের কাছে এগিয়ে আসতে নিলে, টনি এবার ধমক দিয়ে বলে–
—গেট আউট ফ্রম মাই রুম, নাহলে ঘাড় ধরে বের করতে বাধ্য হবো।
—এতদিন পর আমাদের দেখা হলো, কই দু’টো ভালো-মন্দ কথা বলবে, তা না করে বের করে দিচ্ছি। এটা কি ঠিক হচ্ছে টনি?
—টনি কি হ্যাঁ? অ্যাই আমি তোর বড় না ছোট? চাপকে সোজা করার আগে বের হো আমার রুম থেকে। আর কোনদিন যদি আমার রুম বা রুমের ত্রিসীমানাতেও দেখেছি, তাহলে সেদিন দেখিস কি করি। গেট আউট ইডিয়ট।
টনির তর্জন-গর্জন শুনে রুশার কলিজার পানি শুকিয়ে মরুভূমি হয়ে গিয়েছে। সে তড়িমড়ি করে বের হয়ে আসে তার রুম থেকে।
রুশা বের হয়ে যাওয়ার পরও টনি রাগে ফোঁস ফোঁস করতে থাকে। তার বিধ্বংসী ক্রোধকে শান্ত করতে এক পশলা বৃষ্টির ন্যায় হাজির হয় তারই প্রিয়তমা। জিনিয়া চিন্তিত ও কোমল গলায় ডেকে ওঠে–
—জুনায়েদ… আপনি ঠিক আছেন?
কথায় বলে না, পুরুষরা শান্ত হয় তার একান্ত ব্যক্তিগত নারীর সংস্পর্শে এসে। তেমনটাই ঘটে এখন টনির ক্ষেত্রে। সে রুশার আগমনে এতটা বেখেয়ালি হয়ে যায় যে ভুলেই গিয়েছিল জিনিয়া তখনও কলে রয়েছে।
টনি ঝটপট ফোনটা হাতে নিয়ে ভিডিও কলের ক্যামেরা অন করে। ক্যামেরা অন হতেই জিনিয়ার চিন্তিত মুখশ্রী দেখে তার ঠোঁটের কোণ বেঁকে যায়। মেয়েটাকে নিজের জন্য চিন্তিত দেখে তার ভীষণ ভালো লাগে। মনে হয়, সে অবহেলিত, একাকী কেউ নয়। কোন একজনের কাছে সেও স্পেশাল, তার জন্যও কেউ চিন্তা করে।
—কে এসেছিল যার জন্য এত রেগে গেলেন আপনি? আপনি যে এখনও সুস্থ নন, মনে নেই আপনার?
—তেমন কেউ না। মি. জাফরের পরিবারের কেউ।
—রাগ কমেছে আপনার? বুকে কোথাও সমস্যা হচ্ছে না তো?
—আ’ম অ্যাবসুলুটলি ফিট এন্ড ফাইন সোনা। অযথা চিন্তা করে পিম্পল নিয়ো এসো না চাঁদ মুখখানায়।
জিনিয়াকে টেনশন ফ্রি করতেই টনি হেয়ালি করে কথাগুলো বলে। তাদের কথার মাঝেই তাজওয়াদ তার হোমওয়ার্ক শেষ করে লম্ফঝম্প করতে করতে পিপির কোলে এসে বসে পড়ে। জিনিয়া তাজের দু’গালে ঠেসেঠুসে কতগুলো চুমু দেয়। তাজওয়াদও তাঁর পিপিকে আদরে আদরে ভরিয়ে দেয়।
তাঁদের দুই ফুফু-ভাতিজার মহব্বত দেখে টনি বিরবিরিয়ে বলে–
—দেখো দেখো, আমার জিনিসে কীভাবে ভাগ বসাচ্ছে পুচকুটা। ভেবেছিলাম আমার মেয়ের সাথে এর বিয়ে দিবো, কিন্তু এদের মহব্বত দেখে বিষয়টা নিয়ে আরো একবার ভাবতে হবে আমার।
পিপিকে আদর দেওয়া শেষে তাজওয়াদ টনিকে জিজ্ঞেস করে–
—টনি আঙ্কেল, তুমি কেমন আতো?
—আলহামদুলিল্লাহ ভালো চ্যাম্প। তুমি কেমন আছো?
—ভালু আচি।
তাজওয়াদ আরো কিছুক্ষণ তার সাথে কথা বলে চলে যায় নিজের মায়ের কাছে আদর নিতে। জিনিয়াও কথাবার্তা শেষ করে নিচে কিচেনে আসে পূর্ণতার কাছে। সে এসে তার হাতে হাতে এগিয়ে দিতে থাকে কাজে। কাজ করতে করতে জিনিয়া খেয়াল করে পূর্ণতা মিটমিটিয়ে হাসছে। সে কয়েকবার জিজ্ঞেসও করে হাসির কারণ, কিন্তু পূর্ণতা তেমন সদুত্তর দেয় না। এতে জিনিয়ার কেমন একটা খটকা লাগতে শুরু করে।
[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্প প্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন। ]
শব্দসংখ্যা~২২১৮
#চলবে?
[ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স। ] See less
Share On:
TAGS: শেষ পাতায় সূচনা, সাদিয়া সুলতানা মনি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫৩.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫৪.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪৫.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫৪.২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩+বোনাস
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৬০.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪৭.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৬১.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫০.২