শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫৬.১
সাদিয়াসুলতানামনি
রাসেলদের বাড়ি জাওয়াদের দাদা বাড়ির পরের গলিতেই। পূর্ণতারা যেয়ে দেখতে পায়, আরিয়ানকে নিয়ে রাসেল সবে বসেছে খাবারের টেবিলে। রাসেলের মা আর বউ খাবারের বাটি গুলো নিয়ে আসছে। জাওয়াদ-পূর্ণতাকে দেখে রাসেলের স্ত্রী মাইমুনা এগিয়ে আসে আর পূর্ণতার হাত ধরে তাকে টেবিলের কাছে নিয়ে আসে। তারা বসতেই রাসেলের মা তাদের খাবার বেড়ে দিতে থাকেন। সবাই মনোযোগ দিয়ে খাবার খেলেও সকলের মাঝে একটা ব্যক্তি ছিল ভিন্ন, যে কিনা খাবার না খেয়ে শুধু প্লেটে হাত দিয়ে বসে আছে।
হ্যাঁ, ব্যক্তিটি হচ্ছে আরিয়ান। প্লেটের ভাত শুধু নাড়াচাড়াই করছে কিন্তু খাচ্ছে আর না কিছুই। রাসেলের মা হবু মেয়ে জামাইকে ভীষণ আদর নিয়ে এটা-সেটা বেড়ে দিতে দিতে প্লেটটা একদম ভরিয়ে ফেলে, কিন্তু আরিয়ান সেসবের কিছুই তেমন একটা খায় না। অল্প কিছু খাবার খেয়ে সে হাত ধুতে চলে যায়। সবাই তার যাওয়া দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
বাকি সবাই নিজেদের মতো খাওয়া শেষ করে সামনের রুমে এসে বসে। আরিয়ান চলে যাওয়ার জন্য দাঁড়াতেই রাসেল শান্ত ভঙ্গিতে ও গলায় কিছুটা আবেগ নিয়ে বলল–
—”আমার বাবা যখন মারা যায় তখন আরুটার বয়স কত হবে তোর মনে আছে আরিয়ান?”
রাসেলের কথার আগামাথা কিছুই বুঝতে পারে না আরিয়ান। আর নাই বা বুঝতে পারে রাসেল তাকে হঠাৎ করে এটা কেন জিজ্ঞেস করল। সে প্রশ্নবোধক দৃষ্টি নিয়ে রাসেলের দিকে তাকিয়ে থাকে। রাসেল তার মনোভাব বুঝতে পেরে একটা শ্বাস ফেলে আবারও বলা শুরু করে–
—”কত আর হবে? চার পেরিয়ে পাঁচে পা দেওয়া এক মাসুম বাচ্চা। বাবা ছিলো ওর সুপারম্যান আর ও বাবার প্রিন্সেস। বাবার মৃত্যুটাও বুঝার মতো বয়স হয়ে উঠেছিল না ওর। আমরা যেদিন ঢাকা ছেড়ে গ্রামে চলে আসলাম, সেদিন ও পুরোটা রাস্তা একটা প্রশ্নই করছিলো, আমরা কেন বাবাকে না নিয়ে কোথাও ঘুরতে যাচ্ছি। বাবাকে সাথে না নিয়ে গেলে আম্মা ওকে খেলনা, চকলেট এসব কিনে দিবে না।
মামার বাড়িতে উঠার পর মামীদের অত্যাচারে অত্যাচারে মেয়েটা সেই ছোট বয়সেই কেমন শান্ত হয়ে গেলো। আমার প্রজাপতির মতো বোনটা মেপে মেপে হাসত, কথা বলত এমনকি খেতোও। পরবর্তীতে আমি আর মা কত চেষ্টা করেছি ওকে আবার আগের মতো প্রাণবন্ত করে তোলার, কিন্তু ঐ যে ছোট বেলার একটা ট্রমা ও কোনদিনই কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
শুধু মাত্র ওকে দারিদ্রতা, অভাব, অপূর্ণতা বুঝতে না দেওয়ার জন্যই আমি আর মা পরিশ্রম করতাম। আমার বোনটার মুখের এক চিলতে হাসি আমাদের দু’জনের সকল কষ্ট নিমিষেই দূর করে দিতো। আমি তো তাও বুঝ হওয়া অব্দি বাবার ভালোবাসা পেয়েছিলাম, তার আদর-যত্ন পেয়েছিলাম। কিন্তু আমার বোনটা অবুঝ বয়সেই বাবাকে হারিয়ে যেন নিজের শখ-আহ্লাদ, দুষ্টুমি বলা চলে নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছিল। বাবা যে সন্তানের জীবনে কি ও সেটা অনেক ছোট বয়সেই উপলব্ধি করতে পেরে গিয়েছিল।”
রাসেল একটু সময় নেয় পরবর্তী কথাগুলো বলার জন্য। ইতিমধ্যে তার চোখে নোনাজল জমতে শুরু করেছে। আরওয়ারও মাও শাড়ির আঁচল চেপে কাঁদছে নিঃশব্দে। রাসেলের কথা শুনে পূর্ণতার চোখেও জল জমেছে এরই মাঝে। সে বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পারছে আরওয়ার কষ্টটা ঠিক কতটা গভীর। কারণ সেও তো সেই পথেরই পথিক। তাঁকে নীরবে কাঁদতে দেখে পাশে বসা জাওয়াদ সকলের নজর বাঁচিয়ে পূর্ণতার হাতের উপর হাত রাখে। জাওয়াদের স্পর্শ পেয়ে পূর্ণতা তার দিকে তাকালে জাওয়াদ ইশারায় তাকে কাঁদতে নিষেদ করে।
—”যেই বোনের জন্য আমার নিজের জীবনের কত-শত ত্যাগ, কষ্ট সহ্য করা, সেই বোনকে তার প্রিয় মানুষটির থেকে আলাদা করে তাকে চিরজীবনের জন্য কাঁদতে দেখতে আমি অন্তত পারব না।”
রাসেল এবার আরিয়ানের হাত চেপে ধরে ধরা গলায় বলল–
—”আমার বোনটাকে অনেক ভরসা করে তোর হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমার এই সিদ্ধান্তের মান রাখিস দোস্ত। কখনো কষ্ট ওকে কষ্ট পেতে দিস না। ওর চোখের অশ্রুর কারণ যেন তুই না হোস।”
আরিয়ান তাঁকে হুট করেই জড়িয়ে ধরে কেঁদে দেয়। ছেলে মানুষের নাকি কান্না বারণ। যারা দূর্বল তারাই নাকি শুধু কাঁদে। কিন্তু আজ জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তির পর আরিয়ান শত চেষ্টা করেও নিজের কান্না আটকে রাখতে পারে না। বাল্যকালের বন্ধুকে জড়িয়ে কেদে দেয় ছেলেটা।
তারা আর কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে দশটার দিকে বাড়িতে চলে আসে। কাল সকালে আহনাফ সাহেবকে নিয়ে আবারও রাসেলদের বাড়িতে যেতে হবে। বিয়ের ডেট ঠিক করে পরশুই তারা ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা করবেন। জাওয়াদ-পূর্ণতা, আরিয়ান, আহনাফ সাহেব সকলেরই অফিস পড়ে রয়েছে। বছরের এই সময়ে সবাই কাজের চাপ একটু বেশিই থাকে। তাও তারা নিজেদের ব্যস্ততাকে পাশ কাটিয়ে এই অজপাড়াগাঁয়ে ছুটে এসেছে একজোড়া ভালোবাসার মানুষকে মিলিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য। উপরওয়ালার অশেষ কৃপায় তারা সফলও হয়েছে সেই কাজে।
পূর্ণতা বাড়িতে এসে দেখে তার একমাত্র রাজপুত্র তাজওয়াদ ততক্ষণে জাওয়াদের কাজিনদের সাথে খেলতে খেলতে তাদের কাছেই ঘুমিয়ে গিয়েছে। এত এত মানুষের একমাত্র মধ্যমণি বর্তমানে সে। অনেকটা বিদেশিদের মতো দেখতে বাচ্চাকে তার নিজের বাড়ির লোকেরা যেমন আদর করছে, তেমনই পাড়া-পড়শীরাও এসে এসে তাকে দেখে যাচ্ছে আর চকলেট ও দোয়া দিয়ে যাচ্ছে।
জাওয়াদের মেঝো চাচার মেয়ে আফসানাকে তাজওয়াদের ভীষণ মনে ধরেছে। মেয়েটা সকলের মাঝে তার একটু বেশিই খেয়াল রাখে। সদ্য ইন্টার পাশ করা মেয়েটার সাথেই আজ দিনের বেশিরভাগ সময় ছিল তাজওয়াদ। রাতে মায়ের হাতে খেয়ে তার কাছে চলে গিয়েছে সুন্দর সুন্দর রূপকথার গল্প শুনতে। গল্প শুনতে শুনতে ক্লান্ত বাচ্চাটা কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে সে নিজেও জানে না।
জাওয়াদ ছেলেকে আফসানার কাছ থেকে নিয়ে এসে নিজেদের রুমে। তারপর পূর্ণতা তাঁকে একটা ছোট প্যান্ট আর পাতলা একটা গেঞ্জি গায়ে দিয়ে দেয়। গ্রামের বাড়িতে এখন প্রচুর গরম আর গ্রীষ্মের ফল-ফলাদি খাওয়ার ধুম পড়েছে।
জন্মের পর থেকে ঠান্ডা পরিবেশে বড় হওয়া এবং পরবর্তীতে দেশে ফিরে এসির মধ্যে থাকার কারণে তাজওয়াদের একটু বেশিই সমস্যা হচ্ছে গ্রাম বাংলার গরম। বাংলাদেশের গরম সম্পর্কে বাচ্চাটার একটুও ধারণা নেই। অতিরিক্ত গরমে ঘেমে ঘেমে সর্দি লাগিয়ে ফেলেছে অলরেডি। গ্রামে এসেছে আর ছোটাছুটি করবে না ছোট মানুষ ব্যাপারটা কেমন একটা হয়ে যায় না?
তাজওয়াদকে আজ সারাদিনে বহুবার কড়া গলায় বলেও পূর্ণতা ঘরে রাখতে পারেনি। এর-ওর সাথে গ্রাম ঘুরতে বেরিয়ে গিয়েছে। আর ফিরেছে হাত ভর্তি চকলেট, চিপস আর খেলনা নিয়ে। তাজওয়াদ তো ভীষণ খুশি গ্রামে এসে। রাতে খাবারের সময় সকলের সামনে সে আদোও আদো গলায় ঘোষণা দিয়েছে–
—”এবাল থেকে এভ্রি সামার হলিডেতে আমি একানে আসব। আমাল বিচন পচন্দ হয়েছে গ্লাম। একানেল সবাই অনেক ভালু।”
জাওয়াদের দাদী থেকে শুরু করে তার চাচা-চাচী ও তাদের বাচ্চারাও তাজওয়াদের আদুরে কথা শুনে একচোট হেঁসেছে যেমন, তেমন ভীষণ আনন্দিতও হয়েছে। পূর্ণতা অবশ্য ছেলের গ্রামে আসার কারণ বুঝতে পেরে কৌতুক পূর্ণ গলায় জিজ্ঞেস করে –
—”আপনার হঠাৎ গ্রামের প্রতি এই ভালোবাসার কারণ কি আব্বাজান? চকলেট-চিপস নাকি?”
মায়ের কাছে ধরা খেয়ে তাজওয়াদ কিছুটা চমকে গিয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। এর মানে হলো, আম্মু তুমি কীভাবে বুঝলে? পূর্ণতা ছেলের মুখে আরেক লোকমা খাবার দিয়ে বলল–
—”আমার থেকে আপনি জন্ম নিয়েছেন আব্বাজান। আপনার রগের প্রতিটা শিরা-উপশিরার সাথে আমি পরিচিত। একবার শুধু তুমি আমায় বলে দেখো, মাম্মা দাঁত ব্যথা করছে। তারপর দেখো কি করি আমি।”
মায়ের হুমকি শুনে তাজওয়াদ খাওয়ার পরপরই গিয়ে নিজ উদ্যোগে দাঁত ব্রাশ করেছে।
—”অ্যাঁই বউ, ছেলেকে একটু ঐপাশে দিয়ে মাঝে আসো না।”
পূর্ণতা ছেলেকে দেওয়ালের সাইডে দিয়ে নিজে মাঝে এসে শুয়ে পড়ে। সে শুতেই জাওয়াদ তার কাছে এসে তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে কাঁধে মুখ গুঁজে দেয়। খাট নড়ার কারণে তাজওয়াদও নড়েচড়ে ওঠায়, পূর্ণতা ছেলের দিকে কাত হয়ে শুয়ে তার বুকে আলতো হাতে চাপড় দিতে থাকে।
আজ সারাদিন তারা নিজেরাও তেমন একটা রেস্ট করার সুযোগ পায়নি। ভাইয়ের সম্বন্ধ নিয়ে কথা বলার জন্য পূর্ণতা গ্রামে আসলেও, বড় বউ হয়ে চুপচাপ হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারেনি। যদিও তার চাচী শ্বাশুড়িরা তাকে কিচ্ছুটি করতে দিতে চায় নি, কিন্তু সন্ধ্যায় তার দেবর-ননদদের আবদারে নুডলস, চিকেন ফ্রাই, পেঁয়াজু আর চা বানিয়েছিল সবার জন্য সে। এছাড়া আজ সারাদিনই কেউ না কেউ এসেছে তাকে দেখতে। শ্যাম পুরুষ জাওয়াদের এমন চোখ ধাধানো বউ আর ছেলে দেখে অনেকেই বিস্ময়ে কথা বলতে ভুলে গিয়েছে।
তাজওয়াদ ঘুমের ঘোরেই মায়ের মুখ হাতাতে থাকে। এমনটা সে তখনই করে যখন সে কোন খারাপ স্বপ্ন দেখে। পূর্ণতা ছেলেকে নিজের হাতের বাহুতে শোয়ায়। তারপর কিছু দোয়া-দুরুত পড়ে ছেলের পুরো শরীরে হাতে ফু নিয়ে মাসেহ করে। একটু পর তাজওয়াদ শান্ত হয়ে গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়। তাজওয়াদকে শান্ত হতে দেখে পূর্ণতাও চোখ বন্ধ করে। কিন্তু ঘুমায় না।
জাওয়াদ পূর্ণতার কাঁধে মুখ গুঁজে রেখেই ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করে–
—”ঘুমিয়ে পড়েছো?”
—”উঁহু। বলুন।”
—”কষ্ট হচ্ছে এখানে গরমের কারণে?”
—”আপনি হয়ত ভুলে গিয়েছেন আমার জীবনের একটা লম্বা সময়ের সঙ্গী ছিল কষ্টই। তাই কষ্ট এখন আমায় আর কষ্ট দেয় না, বরং আমরা একে-অপরের অনেক ভালো বন্ধু হয়ে গিয়েছি। আর এখন তো আমি প্রচণ্ড সুখে আছি, ভালো আছি। সেখানে এমন কষ্ট কোন কষ্টই নয়।”
পূর্ণতার কথার পরিপ্রেক্ষিতে জাওয়াদ একদমই চুপ হয়ে যায়। বলার বা জিজ্ঞেস করার মতো কিছুই পায় না। ভালোসময় আসার পরও কিছু কিছু সময় খারাপ সময়টার কথা মনে করে চুপ থাকতে হয়। এতে সময় ও পরিস্থিতিকে আরো ভালো করে কদর দেওয়া যায়।
পূর্ণতা ছেলেকে হাতের উপর রেখেই সটান হয়ে শোয়। এতে করে জাওয়াদ পূর্ণতার কাঁধ থেকে নিজেকে সরিয়ে এনে তার বুকে মাথা রাখে। পূর্ণতা তার অপর হাতটি উঠিয়ে জাওয়াদের চুল আলতো হাতে টেনে দিতে থাকে। জাওয়াদ আরাম পেয়ে পূর্ণতার সাথে আরেকটু গভীরভাবে চিপকে থাকে।
—”তাজের পাপা, একটা কথা জিজ্ঞেস করি?”
—”অবশ্যই জান।”
—”সকালে যে রাসেল ভাইয়াকে বললেন, সঙ্গীর মৃত্যুর পর না চাইতেও পরিস্থিতির কারণে দ্বিতীয়াকে বেছে নিতে হয়। তাহলে আমি যদি মা”রা যাই, আপনিও দ্বিতীয়া গ্রহণ করবেন। তাই না?”
জাওয়াদ একটুও অবাক হয় না পূর্ণতার প্রশ্ন শুনে। তার কেন জানি মনে হচ্ছিল, পূর্ণতা তাকে এই প্রশ্নটা করবেই। আর তার ভাবনাকে সত্যি প্রমাণ করে দিয়ে, হলোও তাই। জাওয়াদ একটু রয়ে-সয়ে নিজের মাথা পূর্ণতার বুকের উপর থেকে তুলে তার দিকে তাকায়। হালকা ডিম লাইটের আলোতে সে স্পষ্ট দেখতে পূর্ণতার বিচলিত দৃষ্টি। উত্তর জানার জন্য সে বড়ই ব্যাকুল হয়ে রয়েছে।
—”আমার কথার ভাবার্থ হলো, আমাদের একটা সুন্দর লাইফ লিড করার জন্য ভালোবাসা, যত্ন, হ্যাপিনেস প্রয়োজন। আর এসব আমরা কার কাছে পাই? আমাদের সঙ্গীর কাছেই তো, তাই না?
সঙ্গী ছাড়া লাইফ লিড করা ভীষণ কষ্টে। বাচ্চাকে নিয়ে একজন পুরুষ মানুষের জন্য তো তা অকল্পনীয়। আর দিনশেষে আমরা সবাই একটু স্বস্তি নিয়ে প্রিয় মানুষটিকে আলিঙ্গন করে ঘুমাতে চাই। মন খারাপের কারণ গুলো তার কাছে উগলে দিয়ে মনটাকে হালকা করতে চাই। কখনো বা রাত জেগে এমন কিছু স্মৃতি তৈরি করতে চাই, যা কিনা আমাদের বৃদ্ধ বয়সে সোনালী অতীত হয়ে জ্বলজ্বল করবে।
আর রইলো, তোমার কিছু হলে আমি কি কোন সঙ্গী গ্রহণ করবো? উত্তর হলো, অবশ্যই করবো।”
পূর্ণতা এতক্ষণ মনোযোগ দিয়ে জাওয়াদের কথা শুনছিল। কিন্তু তার শেষোক্ত কথাটি পূর্ণতার মনটাকে একরাশ বিষাদে ছেয়ে যায়। সে জাওয়াদের নজর থেকে নিজের নজর সরিয়ে নিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে। তার অবচেতন মন জাওয়াদের পাশে আরেক নারীকে কল্পনা করে মনে মনেই ফুঁপিয়ে ওঠে।
জাওয়াদ হাত বাড়িয়ে পূর্ণতার মুখটা নিজের দিকে ঘোরায়। পূর্ণতা অভিমান করে তাকাতে চায় না তার দিকে, কিন্তু জাওয়াদ তাকে নিজের দিকে ঘুরিয়েই ছাড়ে। জাওয়াদ ঠোঁট টিপে হেঁসে পূর্ণতাকে বলে–
—”শুনবে না, তুমি চিরকালের জন্য চলে গেলে কাকে সঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করবো?”
—”না। সতীন সম্পর্কে শুনতে আমি একটুও ইন্ট্রেসটেড নই। চুপচাপ ঘুমান, অন্যথায় আপনার বালিশে পাঠিয়ে দিবো কিন্তু। “
—”আরে শুনো না। একটু শুনো।”
—”মেজাজ খারাপ করছেন কিন্তু তাজের পাপা। সরুন আমার উপর থেকে। আমার বুকের উপর শুয়ে থেকে, আমাকেই আবার সতীনের কাহিনি শোনাতে চাচ্ছেন। সাহস তো কম না আপনার।”
—”কখন থেকে সতীন সতীন করে চলেছো। আমি কি একবারও বলেছি, আমি কোন মেয়েকে সঙ্গী বানাবো?”
—”তাহলে কি কোন ছেলেকে বানাতে ইচ্ছুক আপনি?”
দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলে পূর্ণতা। জাওয়াদ তার কথা শুনে নাকমুখ কুঁচকে বলে–
—”আসতাগফিরুল্লাহ তিনশ তেত্রিশ বার। ইয়াক! আমি কোন মানুষ সঙ্গী করবো না, বরং আমার আমার মৃত্যুকে আলিঙ্গন করবো তোমার কিছু হয়ে গেলে। তুমি আমার অনেক রাতের অশ্রু বিসর্জন ফল। একসময় নিজ দোষে তোমায় হারিয়ে আমি বুঝেছি, তোমার মতো কেউ আমায় এতটা ভালোবাসতে পারবে না।
পূর্বে আমার গায়ের রঙের কারণে, আমি কোন নারীরই আকাঙ্ক্ষিত পুরুষ ছিলাম না। আঞ্জুমানের বিষয় আলাদা। আমি তার আবেগ ছিলাম, ভালোবাসা না।
আর বর্তমানে অনেক নারীই আমায় সঙ্গী হতে চাইলেও, তারা আমায় চায় না। আমার পজিশন, টাকার মোহে পড়ে তারা আমার সঙ্গিনী হতে চায়। আমার জীবনে একমাত্র ব্যক্তিগত নারী তুমিই থাকবে, যে কিনা আমার শূন্য অবস্থাতেও আমাকে পাগলের মতো চেয়েছো। আমাকে ভালোবেসে অনেককিছু হারিয়েছো।”
পূর্ণতা অশ্রু ছলছল চোখে জাওয়াদের দিকে তাকিয়ে থাকে। লোকটাকে সে সত্যিই ভীষণ ভালোবাসে। এতটাই ভালোবাসে যতটা ভালোবাসলে নিজেকে বিষাদের সাগরে ডুবিয়ে নিতেও সে দ্বিতীয়বার ভাবেনি।
পূর্ণতা কিছুক্ষণ পর নিজেকে সামলে ধরা গলায় বলল–
—”আপনিও যদি আমার সাথে চলে যান, তাহলে আমাদের ছেলের কি হবে? ওকে কার ভরসায় ছেড়ে যাবেন আপনি?”
—”উফফফ! কি শুরু করলে রাত-বিরেতে! থামবে তুমি নাকি উঠে চলে যাবো? যখন এসব হবে তখন দেখা যাবে। আর আমাদের ছেলেকে দেখার মানুষের অভাব রয়েছে? যদি কেউ নাও দেখে, তাহলে ও নিজেই নিজের ছায়া হবে। পরিস্থিতি সবাইকে অনেক কিছুই শিখিয়ে দেয়। এখন এসব কথা বাদ দাও। আর কখনো এসব বলবে না।
উপরওয়ালার কাছে সবসময় দোয়া করবে, আমাদের বাবা-ছেলের জন্য হলেও যেন তোমায় সুস্থ রাখে, যাতে তুমি আমাদের সাথে অনেক বছর সুখ ভোগ করতে পারো। তোমার ভাগের সুখটুকু না ভোগ করেই এসব ছেড়ে যাওয়ার কথা বলছো কেনো?”
পূর্ণতার চোখের কোণ বেয়ে টুপ করে এক বিন্দু অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। সে ভেজা গলায় বলে–
—”আমার সুখ বেশিদিন স্থায়ী হয় না জাওয়াদ। একদম ছোট থেকেই এমনটা হয়ে আসছে। সুখের পিছু পিছু দুঃখও এসে হাজির হয় আমার ভাগ্যের আঙ্গিনায়।”
—”এবার তোমার দুঃখের ভাগ নেওয়ার জন্য এই জাওয়াদ আছে।”
নিশুতিরাতে আরো এক জোড়া কপোত-কপোতী নিজেদের ঘুম বিসর্জন দিয়ে জেগে রয়েছে। বিচ্ছেদের পরও যে এমনভাবে আবারও এক হওয়া যায় তা ভেবেই তাদের ঘুম উবে গিয়েছে। যান্ত্রিক ফোনের ওপাশে থাকা ব্যক্তিটিকে দেখতে না পেলেও, তারা অনুভব করতে পারছে তাদের হৃদয়ের স্পন্দনগুলো একই কারণে স্পন্দিত হচ্ছে।
প্রিয় ব্যক্তিটিকে চিরজীবনের জন্য নিজের করে পাওয়ার খুশিতে তারা আজকের এই রাতে জেগে থেকে একে-অপরের অনুভূতিকে অনুভব করেই কাটিয়ে দেওয়ার পায়তারা করছে। এমনকি বিগত কয়েক ঘন্টা ধরে তারা কোন বাক্য ব্যয় ব্যতীত তাই করছে।
—”ঘুমাবেন না? রাত তো পেরিয়ে যাচ্ছে।”
নীরবতা ভেঙে আরওয়া জিজ্ঞেস করে বসে আরিয়ানকে। আরিয়ান আরওয়ার প্রশ্ন শুনে একটু নড়েচড়ে বসে। তারপর ধীরেসুস্থে জবাব হিসেবে বলল–
—”আজ না কেন জানি ঘুম পাচ্ছে না। মন চাইছে এভাবেই একে-অপরকে অনুভব করতে করতেই রাতটা কাটিয়ে দেই। আচ্ছা তোমার কি ঘুম পেয়েছে? ঘুম পেলে তুমি ফোনটা তোমার বালিশের পাশে রেখে ঘুমিয়ে পড়ো। আমি জেগে থেকে তোমার নিঃশ্বাসের শব্দ শুনবো।”
আরওয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। বুকের ভেতরটা অদ্ভুত এক অনুভূতিতে ভরে উঠেছে তার। এই মানুষটা খুব শীঘ্রই তার হতে চলেছে। সম্পূর্ণ তার। যাকে একসময় হারিয়েই ফেলেছিল সে।
—”এতক্ষণ আমার নিঃশ্বাসের শব্দ শুনে কি করবেন?”
আরিয়ান ক্ষীণ হেসে বলল—
—”নিজেকে বুঝাবো, তুমি সত্যিই আমার জীবনে আসতে চলেছো। এটা কোনো স্বপ্ন না।”
কথাটা শুনে আরওয়ার আঙুলগুলো অন্যমনস্কভাবে চাদরের উপর আঁকিবুঁকি কাটতে থাকে।
—”আপনি কি এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না?”
—”না।”
—”কেন?”
—”কারণ আমি অনেক কিছু পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। মানুষ যখন কোনো জিনিস পাওয়ার আশা ছেড়ে দেয়, তখন সেটা হঠাৎ করে পেয়ে গেলে বিশ্বাস করতে একটু সময় লাগে।”
আরওয়া নির্বাক হয়ে যায়। আরিয়ান ধীর কণ্ঠে আবার বলল—
—”জানো আরওয়া, আজকে বারবার মনে হচ্ছে, যদি এই রাতটা একটু দীর্ঘ হতো! যদি সময়টা এখানেই থেমে যেত! জীবনের সব ব্যস্ততা, সব দুশ্চিন্তা, সব হিসাব-নিকাশের আগে আমি শুধু এই অনুভূতিটাকে কিছুক্ষণ উপভোগ করতে চাই। এই অনুভূতিটা যে তুমি আমার, আর আমি তোমার।”
ফোনের ওপাশ থেকে কোনো উত্তর আসে না। কেবল খুব ক্ষীণ একটা নিঃশ্বাসের শব্দ ভেসে আসে। নাক টানার শব্দ সম্ভবত।
আরিয়ান মৃদু হেঁসে চোখ বন্ধ করে নিয়ে প্রশ্ন করে–
—”কাঁদছো?”
—না…
কিন্তু কণ্ঠটা তাকে মিথ্যাবাদী প্রমাণ করে দেয়।
—”তাহলে গলাটা এমন শোনাচ্ছে কেন?”
আরওয়া ঠোঁট কামড়ে ধরে। কিছু কিছু সুখ মানুষকে কাঁদিয়েও দেয়। আজকের এই মুহূর্তটা ঠিক তেমনই।
রাতের খাবার খেতে বসেছে মি.শেখ আর জিনিয়া। জিনিয়া খাওয়ার মাঝেই বাবাকে এটা সেটা তুলে দিচ্ছে পাতে। মিসেস শেখের মৃত্যুর পর জিনিয়াই বাবার সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। খাবার খাওয়া শেষ মি.শেখ নিজের রুমে চলে যান। জিনিয়া কাজের খালার হাতে হাতে সবটা গুছিয়ে বাবার জন্য এক কাপ আদা চা নিয়ে আসেন। তার বাবার পুরানো অভ্যাস রাতের খাবার খাওয়ার পর এক কাপ আদা চা খাওয়ার।
জিনিয়া চায়ের কাপটা মি.শেখের দিকে এগিয়ে দিলে, মি.শেখ সেটা হাতে তুলে নেন। এরপর জিনিয়াকে বললেন–
—”আমার পাশে বসো তো মা। তোমার সাথে কিছু কথা আছে।”
জিনিয়া তার পাশে বসতেই মি.শেখ সময় নিয়ে ধীরে সুস্থে বলা শুরু করেন–
—”আমাদেট এলাকার একদম শেষ একটা বাড়ি আছে না, আলম সাহেবের বাড়ি যেটা। মোটা, লম্বা করে লোকটা। চিনতে পেরেছো?”
—”হুম বাবা চিনতে পেরেছি আঙ্কেলকে। কি হয়েছে উনার?”
—”কিছু হয়নি উনার। আজ আসরের নামাজের পর মসজিদের বাহিরে তার সাথে দেখা হয়েছে আমার। ভদ্রলোক তার ছোট ছেলের জন্য তোমার হাত চেয়েছেন। ছেলে সফটওয়্যার ইন্জিনিয়ার। তাদের পরিবারের সবাই উচ্চশিক্ষিত। উনিও এককালে জাহাঙ্গীর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন।”
বাবার কথা শুনে জিনিয়ার চক্ষু কপালে। তার বাবা দেখি অদূর ভবিষ্যতে তার আর টনির প্রেমকাহিনীতে ভিলেন হতে চলেছে। সে তার বাবাকে ইনিয়েবিনিয়ে নিষেধ করে বলল–
—”কিন্তু বাবা আমি এখনই বিয়ে করতে চাই না। ভাবীপু আর তাজ কয়দিন হলো আমাদের বাড়িতে এসেছে। তাছাড়া কয়েকমাস পর আমার ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা। এখন এসব নিয়ে ভেবে মন-মানসিকতা নষ্ট করতে চাইছি না।”
—”এসব কথা তোমার মায়ের বলার কথা থাকলেও, তার অনুপস্থিতিতে আমিই তার দায়িত্ব নিজের কাধে তুলে নিলাম।দেখো মা, মেয়ে হয়ে জন্মেছো যখন তোমাকে একদিন না একদিন পরের বাড়িতে যেতেই হবে। সম্বন্ধ নিয়ে কথা বলেছে মানে এই না যে, আমি আমার রাজকন্যাকে এখনই তাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দিবো। আলম ভাই আর তার মিসেস তোমাকে দেখতে আসতে চাইছেন সামনের সপ্তাহে।
উনি আজ আমায় এমনভাবে চেপে ধরলেন যে, আমি আর মানা করতে পারি নি। তোমার ভাইয়া-ভাবী গ্রাম থেকে ফেরার পর তাদের সাথে আমি কথা বলি এই বিষয়ে। তোমার ভাই খোঁজ-খবর নিক। তারপর তোমার যদি ছেলেকে পছন্দ হয় তাহলে আমরা নাহয় কথা আগাবো।”
জিনিয়া তার বাবার কথার উপর আর কোন কথা বলতে পারে না। কিন্তু তার বুকের ভেতর যেই কালবৈশাখী ঝড় শুরু হয়েছে, সেটা কবে থামবে সে নিজেও জানে না। মি.শেখ আরো কিছুক্ষণ মেয়েকে কোমল ভাবে বিয়ে সম্পর্কে বুঝান। তার চা খাওয়া হতেই জিনিয়া কাপটা নিজের সাথে করে নিয়ে বাবার রুম থেকে বের হয়ে আসে।
[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্প প্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন। ]
শব্দসংখ্যা~২৭২০+
চলবে?
[গল্পের রিচ দেখে মনটা চাচ্ছে, তিনটা জুটির মধ্যে একটাকে আলাদা করে দেই।😇 একটু বেশি রেসপন্স করিয়েন সবাই, হ্যাঁ?🥺
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স। ]
Share On:
TAGS: শেষ পাতায় সূচনা, সাদিয়া সুলতানা মনি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪৪.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫১.৩
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫১.২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫৬.২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫১.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪৭.২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫৭.১